Naar e Ishq part 11
তুরঙ্গনা
নিজের রুমের এককোণে বিন-ব্যাগে গা এলিয়ে বসে আছে কেকে। বাম হাতে আনমনে ধরে রাখা ফোনটার স্ক্রিনে কিছু একটা জ্বলজ্বল করছে। ফাওয়াদ গতরাতে তাকে কিছু ফাইল সহ একটি মেসেজও পাঠায়। যাতে স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে,নতুন রিপোর্ট অনুযায়ী গাড়ির দূর্ঘটনার আগেই রাফায় আমিনের ফুসফুসে স্লো-পয়জনের লক্ষণ ছিল! আর এইটুকু জানার পর, কেকে’র পুরোনো বিশ্বাস আরও একবার শাণিত হলো—এটা শুধু দুর্ঘটনা ছিল না।
গতরাত হতেই সে এসব সহ আরো নানান বিষয় ঘেঁটে ঘেঁটে জটলা পাকিয়েছে। কিছু তো একটা করতেই হবে। যথারীতি ঘরের ভেতর বেশ খানিকক্ষণ ধরে আরো কিছু ভাবনা-চিন্তার পর সে উঠে দাঁড়াল।
সকাল হতে না হতেই, কেকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে চলল জাভিয়ানের সাথে দেখা করতে। জাভিয়ান হায়দার গতরাতে প্রায় বারোটার পর বাড়ি ফিরেছে। এতোদিন তিনি কাজের ক্ষেত্রে শহর ও দেশের বাহিরেই ছিল। অবশেষে সব ব্যস্ততা শেষে তার বাড়ি ফেরা হয়েছে।
এদিকে কেকে যেন বিশেষ করে তারই অপেক্ষাতে ছিল। তবে এতো অপেক্ষা যেহেতু এই’কদিন করেছে,তাই আর গতরাতে জাভিয়ানের সাথে দেখা না করে,আজকের নতুন সকালটাকেই বেছে নিল।
কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার ভাবগম্ভীর্য খানিক ভিন্ন। নিজ রুম হতে বের হওয়ার আগে,সে বেশ ভালোমতোই সেজেগুজে বের হলো। যেন নিচে থেকে আরো বিশেষ কোনো এক কাজেও তাকে যেতে হবে।
যথারীতি কালো রঙের পোশাকে সজ্জিত হয়ে, সে চলল সরাসরি নিচতলার জাভিয়ানের স্টাডি রুমে। সেখানে গিয়ে দেখল,জাভিয়ান সকাল সকালই ব্যবসাহিক নানান ফাইল নিয়ে বসেছে। তাকে দেখে কেকের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ক্ষীণ তির্যক হাসি ফুটল। অন্যদিকে জাভিয়ান তাকে দেখার সাথে সাথেই, বেশ উৎসাহিত কন্ঠে বলে উঠল,
“আরে কেকে যে! এসো, এসো…। কিন্তু এতো সকাল-সকাল? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে আওড়াল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“আই নিড টু টক টু ইউ অ্যাবাউট সামথিং ইম্পর্টেন্ট।”
জাভিয়ান এইবার তার ফাইল ছেড়ে, কেকের দিকে বেশ উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। এদিকে কেকে ততক্ষণে নিজে হতেই, সোফায় গিয়ে পায়ের উপর পায় তুলে, গা এলিয়ে বসে পড়েছে। একইসাথে সিগারেট জ্বালিয়ে তাতে ধোঁয়া ছাড়ছে। হাতের লাইটারটাও আঙ্গুলের ডগায় ঘোরাচ্ছে—নির্বিকার ভঙ্গিতে।
তার এমন নির্লিপ্ততায়,জাভিয়ান নিজেকে খানিক তটস্থ করে, টেবিল ছেড়ে সোফার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“হ্যাঁ, অবশ্যই। বলো কি বলবে।”
এই বলতে না বলতেই,সে কেকের সম্মূখের সোফায় বসে পড়ল। অন্যদিকে কেকে ক্ষীণ মুচকি হেসে,নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“আমি রাফায় আমিনের মেয়ে সুহিনকে বিয়ে করতে চাই। বিকজ আই থিংক,আই লাভ হার।”
জাভিয়ান যেন বিস্ময়ে থমকে গেল। নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য হিতাহিতজ্ঞানশূন্য মনে হতে লাগল। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে, অস্ফুটস্বরে বলতে লাগল,
‘বাবা হয়ে নিজের সৎ মেয়েকে বিয়ে করবে!সম্পর্কে ও তোমার মেয়ে হয়। ওকে কি করে তুমি ভালোবাসতে পারো? মাথা ঠিক আছে তোমার?”
মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি তথা জাভিয়ানের তীক্ষ্ণ-রুক্ষ কথায়,তার সম্মূখে পায়ের উপর পা তুলে, নির্বিকারে সিগারেট টেনে ধোঁয়া উড়ানো, কালো রঙের পোশাকে সুসজ্জিত সুদর্শন—বিরক্তির সাথে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,
“ওহ্,যাস্ট শাট-আপ আঙ্কেল! এসব সম্পর্কের নীতিফীতির ধার ধরি না আমি।ওকে বিয়ে করতে চাই মানে, বিয়ে আমি করবই।”
তার এহেন কথায়,জাভিয়ান ভারী শ্বাস ফেলল। এ ছেলে প্রচন্ড উগ্র, বেপরোয়া। সমাজ থেকে বিছিন্ন থেকেছে দীর্ঘকাল। সমাজ-সম্পর্ক,নিয়ম-নীতি সবই যেন তার ইচ্ছের কাছে তুচ্ছ। তবে এবার সে যা চাইছে,তা কি করে সম্ভব হতে পারে!
সে পুনরায় ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“পাগলামি করো না কেকে! সবকিছুর একটা সীমা আছে। তুমি প্রতিবার এই সীমাগুলো অতিক্রম করতে চাইলেও, এবার কিন্তু তা কোনোমতেই সম্ভব না। তুমি জীবনে যা যা করতে চেয়েছো,তাতে আমি সর্বদা সাহায্য করেছি। কিন্তু এর মানে এই না যে,আমি এখন তোমার এই উদ্ভট আবদারও পূরণ করব।”
জাভিয়ানের কথায় কেকে শান্ত ভঙ্গিতে তির্যক হাসে। সোফায় পায়ের উপর পা তুলে, দুদিকে হাত ছড়িয়ে,গা এলিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছে সে। চোখে-মুখে নির্লিপ্ততার পাশাপাশি, তাচ্ছিল্যের আভাস তীব্র। পরনে তার ম্যাট কালো লেদার জ্যাকেট,কালো টিশার্ট-প্যান্ট। মাথা ভর্তি ওল্ফ হেয়ার কাট দেওয়া, কাঁধ অব্দি একঝাঁক রেশমের ন্যায় সিল্কি ঝাঁকড়া চুলগুলো—বরাবরের মতো এলোমেলো। কিছু চুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে কপালের সম্মূখেও পড়ে আছে।
হাতের দুই আঙুলের ভাজে ট্রেজারার লন্ডন এক্সক্লুসিভ ব্ল্যাক নামক ব্র্যান্ডের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কালো রঙের সিগারেট—এটি ব্যতীত ভিন্ন কিছু, সর্বদা নেশায় মত্ত কেকের হাতে তেমন দেখা যায় না।
ঠোঁটে সিগারেট ছুঁইয়ে,সে দীর্ঘ টান দিয়ে নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। চোয়াল শক্ত কেকের ভাবগম্ভীর্যে, তার সম্মূখের মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিটি খানিক ভেতর ভেতর ঘাবড়ে যায়। এই ছেলে কি করতে চাচ্ছে,কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু ভাবভঙ্গিও তো সুবিধার নয়। এরিমধ্যে কেকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে তির্যক হেসে বলল,
“আই’ম কেকে! কেকে চৌধুরী! আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার আমি কাউকে দেইনি।”
কেকে আর কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। এবং ব্যক্তিটির আর কোনো কথাও শোনার প্রয়োজনও মনে করল না। এদিকে সেই মধ্য বয়স্ক ব্যক্তিটি তথা জাভিয়ান হায়দার এর চোখ-মুখ শুঁকিয়ে গিয়েছে। সে অস্ফুটস্বরেই বলে ওঠে,
“কিন্তু…”
জাভিয়ানের কথা শুরু হবার আগেই,কেকে পেছনে ঘাড় ফিরিয়ে,নিরেট কন্ঠে আওড়ায়,
“আই ক্রিয়েট মাই ওয়োন রুলস—এন্ড ব্রেক দেম মাই ওয়োন ওয়ে।”
এই বলেই সে বড় বড় পা ফেলে,স্টাডি রুম হতে বেড়িয়ে যায়।এদিকে জাভিয়ান যেন কোনোমতেই এতোবড় ধাক্কাটা সামলাতে পারল না। এ ছেলে কি, নিজের বংশ সহ তার নাম-ধামও ডুবিয়ে ছাড়বে! এটা কোন মুসিবতের চ্যালা। দেশে থাকলেই সব ঝামেলা নিজের কাঁধেই টেনে আনে।
জাভিয়ান আর নিজেকে সামলাতে না পেরে,দ্রুত কাউকে ফোন করল। শাহমীর কাহসানের ছেলে আর কাশিফ কাহসান নেই, সে এখন হয়ে উঠেছে কেকে। নামটা যতখানি সংক্ষিপ্ত হয়েছে,তার চেয়েও সহস্র গুনে বেড়েছে তার পাগলামি, উগ্রতা ও উশৃংখল জীবনযাপন। এটাকে বশে আনার চিন্তা করাটা স্রেফ বোকামি হবে। তাই কেকে কিছু করার আগে তাকেই কিছু একটা করতে হবে। নিশ্চিত ভেতরে ভেতরে কেকে কোনো এক ঝামেলা পাকাচ্ছে। কিন্তু সে কোনোভাবেই দুইয়ে-দুইয়ে চার করতে পারছে না।
সকলের ব্রেকফাস্ট প্রায় শেষ। অথচ আজ সকালে ব্রেকফাস্টে কেকে আসেনি। জাভিয়ান নিজেকে কোনোমতে স্বাভাবিক করে, কেকের খোঁজ করতে চলে এসেছিল। কিন্তু সে তাকে পায়নি। এবং যখন শুনেছে,কেকে তখন তখনই বাড়ির বাহিরে চলে গিয়েছে—এরপর হতে তার টেনশন যেন আরো বেড়েছে।
তবে এক দিয়ে নিশ্চিত, সুহিনের ভাবগম্ভীর্য দেখে—যতদূর তার বিশ্বাস, সুহিন হয়তো এখনো এসবের কিছু জানে না। খেলাটা এতো এলোমেলো কেনো কে জানে! ঝামেলাটা কোথায় পাকানো হচ্ছে, তা-ও তো মাথায় আসছে না। আগে কেকের সাথে সবটা ক্লিয়ার করতে হবে। সাথে হয়তো,সুহিনের সাথেও এবার কথা বলতে হবে।
কিন্তু এখনও জাভিয়ান বেশ চিন্তিত। এতদিন পর একসাথে সকলে মিলে ডাইনিং এ খাবার খেতে বসেও,তার মনে শান্তি নেই। এদিকে সুহিন আর সাদের খাবার খাওয়া শেষ হতেই,তারা গল্পে গল্পে ডাইনিং হতে উঠে দাঁড়ায়। সুহিন এঁটো খাবারের প্লেট গুছিয়ে নিতে লাগল।
এরিমধ্যে বাড়িতে প্রবেশ করল কেকে। যেভাবে জাভিয়ানের সামনে দেখা দিয়েছিল, ঠিক সেই পোশাকেই। কোথায় থেকে এলো কে জানে। তবে তাকে দেখে জাভিয়ান খানিক অবাক হলো। ভাবগম্ভীর্য বরাবরের মতোই দৃঢ় হলেও,কিছু তো একটা ঝামেলা মনে হচ্ছে। সকাল সকাল তাকে ওসব কথা বলে,এই বান্দা গিয়েছিলটা কোথায়?
বাকিদের নজরে সে তেমন বিশেষিত না হলেও,জাভিয়ান ঠিকই আঁড়চোখে তাকে পরখ করতে লাগল। এরিমধ্যে সাদের নজরে পড়তেই, সে বলে উঠল,
“কি রে, তুই ব্রেকফাস্ট না করে সকাল সকাল কোথায় গিয়েছিলি? তোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে….”
তার কথা শেষ হলো না বরং তার আগেই, কেকে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“হানি উপরে আয়।”
এই বলেই সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।এদিকে সাদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুহিন, ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে চেয়ে আছে। পাশ থেকে আবার সাদ ততক্ষণে বলে ফেলল,
“ও কি তোমায় ডাকল?”
জাভিয়ান সংকীর্ণ চাহনিতে সুহিনকে দেখছে। তার মাথায় কি চলছে তাও বোঝা মুশকিল। এদিকে সুহিন খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর বলল,
“হয়তো।”
—“তাহলে এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? উপরে যাও। বেটাকে তো ভালোই সিরিয়াস মনে হলো।”
সুহিন সাদের কথায় থতমত খেল। এখন আবার উপরে যেতে হবে? লোকটা এই সময় এভাবে কেনো ডাকল? কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না।
সে নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে আওড়াল,’আ…আমি গিয়ে দেখা করে আসছি।’, এই বলেই সে উপরে চলে গেল। অন্যদিকে জাভিয়ান যতটা পারছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। মাথা গরম করলে,পরিস্থিতি অন্যদিকে বিগড়ে যেতে পারে। যা করার ঠান্ডা মাথাতেই করতে হবে। অন্তত সুহিনের ভাবভঙ্গি ও তার প্রতি এইটুকু বিশ্বাস আছে—কেকে যদি তখন ওসব কথা সিরিয়াসলি বলে থাকে,তাহলে অন্তত এমন প্রস্তাবে সুহিন কখনোই রাজি হবে না।
সুহিন ঘুরেফিরে শেষ অব্দি কেকের রুমের সামনে এসেই দাঁড়াল। দরজাটা খোলাই তবে ভিড়িয়ে রাখা। সে আলগোছে দরজাটা ঠেলে দিয়ে বলল,
“আসবো?”
সুহিনের কথা শেষ হতে না হতেই, ভেতর হতে এক গম্ভীর-তীক্ষ্ণ স্বর ভেসে এলো,
“আয়।”
সুহিন মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল,কেকে উল্টোঘুরে বারান্দার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবগম্ভীর্য খুব একটা সুবিধার ঠেকছে না। তবে সে অনুমতি পেয়েই,রুমের ভেতর প্রবেশ করল। আর ওমনি আবারও কেকে বলে উঠল,
“দরজাটা লাগিয়ে দে।”
তার এহেন শীতল-গম্ভীর অভিব্যক্তিতে,সুহিন কিছুটা হকচকিয়ে যায়। তবুও নিজেকে শান্ত রেখে,দরজাটা আলগোছে বন্ধ করে দিয়ে,পুনরায় তার দিকে ফিরে তাকায়।
—“কোনো সমস্যা হয়েছে কি? আমাকে কিছু করতে হবে?”
সুহিনের কথা শেষ হতে না হতেই,কেকে তার দিকে ঘুরে ফিরে তাকাল। এলোমেলো কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুহিন যথাসাধ্য নিজেকে শান্ত রাখে।
—“এদিকে আয়।”
সুহিন পুনরায় হকচকিয়ে যায়। মন বলছে,কিছু একটা ঝামেলা আছে। বেশ খানিকটা দ্বিধা নিয়েই,সে কেকের দিকে এগিয়ে যায়।খানিকটা ব্যবধান রেখে দুজনে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াতেই কেকে সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে অকপটে বলে উঠল,
“ভালোবাসিস আমায়?”
তার এহেন কথায় সুহিনের ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে এলো। সে বিস্ময়ের নজরে কেকের দিকে তাকিয়ে রইল। এরিমধ্যে কেকে পুনরায় অকপটে বলল,
“ভালোবাসিস না, তাই তো? ইট’স ওকে, আমায় বিয়ে করতে হবে,করবি?”
সুহিন যেন এবার হিতাহিতজ্ঞানশূন্য ন্যায় স্তব্ধ হলো। মাথায় ঢুকছে না, এসব সত্যি নাকি তার দুঃস্বপ্ন!
সে কিছুটা সময় নিয়ে, কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়াল,
“আ…আপনি কি পাগল? আপনার হুঁশ আছে,আপনি কি বলছেন?”
—“যা বলছি,ভেবেচিন্তেই বলছি। বিয়ে করবি কিনা বল।”
কেকের এমন নির্লিপ্ততায়, সুহিন পুনরায় হতভম্ব। মানুষ এতোটা সাইকো কি করে হয়? কি বলছে না বলছে, আদৌও তার কি হুঁশ আছে?
সুহিন এই পর্যায়ে, ভারী ভারী শ্বাস ফেলে বলতে লাগল,
“অসম্ভব! আপনি পাগল হয়েছেন বলে কি আমারও মাথা খারাপ হয়েছে? আর আপনি তো আগে থেকেই পাগল। কি করেন না করেন,কোনো হুঁশ নেই। কোন মুখে এমন একটা কথা বলে ফেললেন? আপনি কি জানেন,এসব কথা বাহিরে গেলে কতবড় সর্বনাশ হবে? এই বাড়ির মানসম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে। হ্যাঁ,আমি জানতাম আপনি উন্মাদ, উগ্র,বেপরোয়া, সমাজ মানেন না, নিয়ম-নীতির ধার ধরেন না, কিন্তু তাই বলে আপনার মন-মানসিকতা যে এতোটা নিচু তা কোনোদিনও কল্পনা করিনি আমি।”
কেকে সুহিনের সবক’টা কথা নির্বিকারে শুনে গেল। তবে শেষের কথাগুলো শুনে, তার কপালে বেশ খানিকটা ভাজ পড়ে। সে ভ্রুকুটি করে রুক্ষ স্বরে আওড়াল,
“ওয়ান সেকেন্ড! আমার মন-মানসিকতা নিচু? তা এটা তুই কিসের ভিত্তিতে বললি? তোকে বিয়ে করতে চাওয়াটা কি আমার অন্যায় হয়ে গেসে? পাপ করছি আমি?”
—“আবার এটা জিজ্ঞেসও করছেন? আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও তো আমার ঘৃণা হচ্ছে। কতটা নিকৃষ্ট আপনি! ভেবে দেখেছেন, আপনি যা চাইছেন তা সত্যি হলে সমাজ কি বলবে?সে হুঁশ আছে আপনার?এতো বছর ভালোই তো ছিলাম,আবার কোন ঝড় তুলতে চাচ্ছেন আপনি?”
সুহিন এই পর্যায়ে একপ্রকার নিঃশব্দে কেঁদেই ফেলল। সে ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলালেও, কেকে অকস্মাৎ তার সম্পূর্ণ নিকটে এসে,তার বাহু শক্তহাতে চেপে ধরে বলল,
“কি বলবে সমাজ? বল কি বলবে? তুই আমাকে বাপ মানিস? হ্যাঁ,বল আমায় মানিস কিনা?”
সুহিন কোন মতে কেকের হিং*স্র দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে বলে উঠল,
“ছিহ্! সরে যান আমার চোখের সামনে থেকে। ওয়াদা করছি,আজ যা বলেছেন তা আমি কোনোদিন কাউকে বলব না। তবুও নিজেকে শুধরে নিন। আমি না হয়, আজই এই বাড়ি ছাড়ব…”
সুহিনের কথা শেষ হতে না হতেই, অকস্মাৎ কেকে নিজের হাতের বাঁধন শক্ত করে,সুহিনকে এক ঝটকায় নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। এবং তার ভেজা চোখজোড়ায়, নিজের চোখ মিলিয়ে, হিসহিসিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠল,
“এসব নাটক পড়ে করবি। আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে! ভালো করে বলতো, তোর সাথে আমার বিয়ে হলে, ঠিক কি কি ক্ষতি হবে? ধর্ম যাবে? জাত যাবে? সমাজ যাবে? কি হবে,বলতো? তুই কোনোদিন আমায় তোর বাপ হিসেবে মানতে পারবি? নাকি কোনোদিন মেনেছিস? তুই মানতে পারবি যে, তোর ঐ মৃত মায়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক…”
কেকের কথা সম্পূর্ণ হয় না, বরং তার আগেই সুহিন নিজের চোখ-মুখ ঘৃণ্যতায় খিঁচে নেয়। তৎক্ষনাৎ কেকে ক্ষণিকের জন্য থামলেও,পরক্ষণেই আবারও চাপা স্বরে বলে উঠল,
“সুহিনননন! তোর মা যদি আমার একদিনের বড় কিংবা ছোটও হয়, তবুও সে সারাজীবন আমার কাছে নিজের মায়ের মতোই হয়ে থাকবে। তাহলে এই যে সম্পর্কে ঘৃণ্যতা ছড়িয়েছে,এটা কি তবে আমার দোষ?বল আমার দোষ কিনা?”
কেকের চোখজোড়া হিংস্রতায় লালচে হয়ে উঠেছে। তার হাতের বাঁধন এতটাই দৃঢ় হয়েছে যে,সুহিনের কোমল হাতটা যেন এখনই ভেঙে যাবে। সবমিলিয়ে সুহিন তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই,ফুঁপিয়ে ঠোঁট চেপে বলে ওঠে,
“আপনি-আমি সত্যিটা জানলেও, সমাজ তো মানবে না। ওরা তো… ”
সুহিনের কথা শেষ হতে না হতেই, কেকে অকস্মাৎ তাকে ছিটকে টান দিয়ে দেয়ালের সাথে দু’হাতে চেপে ধরে। সুহিন ব্যাথায় কুঁকড়ে যেতেই, চোখ-মুখ খিঁচে নেয়। রাগের সময় কেকে নিজেকে খুব একটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তবুও চেষ্টা করছে যেন,সুহিন ব্যাথা না পায়।
সুহিনের দুই’বাহু শক্তহাতে চেপে, কেকে তার সাথে মিশে গিয়ে, শক্ত গলায় বলে উঠল,
“এবার বল, সমাজ কি মানবে না? আগে বল,আমি কোনোদিন সমাজ মেনেছি? মানেনি তো! আরে যে সমাজ আমার জন্ম হতে আমার শৈশব-কৈশোর সব ছিনিয়ে নিয়েছে,সেটাকে আমি কি মানব? এই সমাজ আদৌও কখনো কিছু দিয়েছে আমায়? দেয়নি তো! সব ছিনিয়ে নিয়েছে আমার কাছ থেকে। তবে আমি আমার লাইফের ডিসিশন নিতে কেনো এই সমাজের ধার ধরব? জাহান্নামে যাক এই সমাজ। আই জাস্ট ফা*কিং হেইট দিস সোসাইটি।”
সুহিন পুনরায় ফুঁপিয়ে উঠে আওড়াল,
“পাগলামি করছেন আপনি! আমি জানিনা আপনি কতটুকু ঠিক-ভুল,কিন্তু আমি…আমি আপনাকে পছন্দ করি না। আমি বিয়ে করতে চাই না আপনাকে।”
সুহিন বেশ সাহস নিয়ে আধোআধো স্বরে এইটুকু আওড়ালেও,অদ্ভুত এক সংশয়ে তার ভেতরটা তীব্রভাবে কাঁপছে। এদিকে তার কথাটা যেন কেকের কাছে বেশ মজাদার লাগল। সে সুহিনকে অবাক করে দিয়ে, ক্ষীণ তির্যক হাসল। পরক্ষণেই আবার ডান’হাতটা তার বাহু হতে সরিয়ে, সুহিনের কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে পড়া এলোমেলো চুলগুলো—নিস্পৃহে আঙুলের ডগা দিয়ে ঠিক করে দিল। একইসাথে নাকের ডগায় নেমে আসা চশমাটাকে সামান্য ঠেলে দিয়ে,ঠিকঠাক করে দেয়। সুহিন কেবল তার এমন শান্ত-উন্মাদের ন্যায় ভাবভঙ্গিগুলো, সংকীর্ণ চাহনিতে পরখ করছে।
এরিমধ্যে কেকে ভারী শ্বাস ফেলে, সুহিনের মাথার কাছে ডান হাতটা ঠেকিয়ে,তার মুখের কাছে মুখ এনে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
Naar e Ishq part 10
“আই নো ইউ ডোন্ট লাইক মি।বাট ইউ আর অনলি মাইন।”
সুহিন স্তব্ধ নয়নে তাকে বিস্ময়ের সহিত দেখতে রইল। দুজনের নাকের ডগা একে অন্যের সাথে মিশে গিয়েছে। অথচ কেকে ততক্ষণে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে,তির্যক হেসে সুহিনের কাছ থেকে সরে যেতে যেতে—কপালে আঙ্গুল ঘষে, ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে,আনমনা স্বরে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে,
‘Hai Ye Nasha, Ya Hai Zehar
Iss Pyar Ko Hum Kya Naam Dein!’
