Naar e Ishq part 12
তুরঙ্গনা
দুপুর গড়িয়েছে অথচ কেকে কিংবা সুহিন—কারোরই বাড়ি ফেরার নাম নেই৷ সকাল সকাল কি ঘটল কে জানে। মাঝখান থেকে জাভিয়ানের নজর সরতেই সে শুনতে পেল, কেকে আর সুহিন নাকি বাড়ির বাহিরে গিয়েছে। কিন্তু কোথায় আর কেনো গিয়েছে,তা কেউ জানে না। সবমিলিয়ে জাভিয়ান বেশ চিন্তিত রইলেও, কেউ যেন সন্দেহ না করে—সে দুশ্চিন্তায় কাউকে কিছু বলতেও পারছে না।
যতই হোক, দেশ জুড়ে কাহসানদের নাম-পরিচয় ছড়িয়ে আছে। এমন একটা খবর বাহিরে পৌঁছালে ঠিক কি ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে,তার সঠিক আন্দাজও সে করতে পারছে না। কিন্তু এখন কেকে সুহিনকে নিয়ে কোথায় গায়েব হয়েছে,তাই তার মাথায় ঢুকছে না। আচ্ছা, সত্যি সত্যি সে আবার ওমন কিছুই করে ফেলতে যায়নি তো? না! না! এতো দ্রুত কিভাবে কি সম্ভব। সকাল বেলায় তাকে জানিয়ে দুপুরের মধ্যে সবকিছু সেড়ে ফেলা…অসম্ভব। তেমন কিছু হলে,কেকে নিশ্চয় বিয়ের ব্যাপারটা নিয়ে তার সাথে কথাই বলতে আসত না।
না! সবমিলিয়েও জাভিয়ানের মন শান্ত হচ্ছে না। কাউকে বলতেও পারছে না, কিছু সহ্যও করতে পারছে না। মাথার মধ্যে চলছে তো অনেক কিছুই,কিন্তু সুহিনের সাথে সরাসরি একবার কথা না বলে কোনো পদক্ষেপও নিতে পারছে না।
এরিমধ্যে হুট করে কেকে ও সুহিনের আগমন হলো। কেকের ভাবভঙ্গি বরাবরের মতোই স্বাভাবিক। ডার্ক ফিকশনের কোনো ভিলেনের মতোই, শান্ত-শীতল ডেড আইজ কিংবা নিষ্প্রাণ চোখজোড়ায় তীক্ষ্ণ-গভীর দৃষ্টি;বরাবরের ন্যায় চুলগুলো এলোমেলো। হাতের ডগায় নিজের প্রিয় কালো মোড়কে সজ্জিত সিগারেট টেনে,ভাবলেশহীন নির্বিকার ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে।একইসাথে গুনগুনিয়ে তার পছন্দসই ‘মে হু না’ খ্যাত সুরে শিস বাজাচ্ছে।
অন্যদিকে তার পেছন পেছন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে সুহিন। পরনে সকাল বেলায় বাড়ি হতে এক কাপড়ে বেরিয়ে যাওয়া পোশাক দেখে,জাভিয়ান যেন কিছুটা আশ্বস্ত হলো। তবে তার এমন চুপচাপ মাথা নুইয়ে থাকার ব্যাপারটাকে তাকে নিশ্চিন্ত করছে না।
জাভিয়ানকে না দেখার ভঙ্গিতে, কেকে নিজ ভাবগম্ভীর্য বজায় রেখে, দোতলার দিকে এগিয়ে যাবে—ঠিক তৎক্ষনাৎ পাশ থেকে জাভিয়ান বলে উঠল,
“কাশিফ! কোথায় গিয়েছিলে?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—“জাহান্নামে! উড ইউ লাইক টু গো?”
জাভিয়ান তার এহেন অভিব্যক্তিতে,বিস্মিত স্বরে আওড়াল,
“কেকে! এটা কোন ধরনের ব্যবহার?”
কেকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পাশে মুখ ফিরিয়ে,কিঞ্চিৎ ঘাড়টা কাত করে বলল,
“সরি,বাট আই’ম নট সরি ফর দ্যাট।”
এই বলতে না বলতেই,সে পুনরার শিস বাজিয়ে ওঠে। এবং মুখ ফিরিয়ে তৎক্ষনাৎ দোতলায় চলে যায়। অন্যদিকে তার পেছনে রয়ে যাওয়া সুহিনকে দেখে,জাভিয়ান বলে,
“এসবের মানে কি? ও তোমায় কোথায় নিয়ে গিয়েছিল?”
জাভিয়ানের অভিব্যক্তিতে,সুহিন তার দিকে ফিরে মুখ তুলে তাকায়। তৎক্ষনাৎ চশমার আড়ালে দেখা মেলে, ভেজা একজোড়া শীতল নীলচে চোখের চাহনি। জাভিয়ান এতে অজান্তেই অজানা এক সংশয়ে ঘাবড়ে যায়। সে উদ্বিগ্ন স্বরে বলল,
“কি হয়েছে তোমার? তুমি ঠিক আছো তো? কোথায় গিয়েছিলে তোমরা?”
সুহিন ভারী ঢোক গিলে, নিজেকে সামলে নিয়ে মিহি স্বরে আওড়াল,
“হসপিটালে গিয়েছিলাম। আমার ফ্রেন্ড জোয়া অসুস্থ। ওকেই দেখতে গিয়েছিলাম।”
তার কথায় জাভিয়ানের কপাল কুঁচকে যায়। সে ভ্রুকুটি করে বলল,
“কোন জোয়া?… এক সেকেন্ড, ফয়সাল সাহেবের মেয়ে জোয়া?”
“জ্বী!”,সুহিন আলগোছে মাথা ঝাকিয়ে বলল।
—“কি বলছো, কখনকার ঘটনা এটা? আমাকে তো কেউ কিছুই জানাল না।”
—“হয়তো সকালের ঘটনা।শুনলাম ওর এক্সিডেন্ট হয়েছে।”
—“কি বলছো এসব, ও এখন ভালো আছে তো?”
—“হুম,এখন কিছুটা সুস্থ। জ্ঞান ফিরেছে।”
জাভিয়ান তার কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। একইসাথে সুহিনের দিকে ফিরে, তাকে খানিকটা পরখ করে নিয়ে বলল,
“শোনো এতো চিন্তা করো না। জ্ঞান যেহেতু ফিরেছে,তাহলে খুব শীঘ্রই সুস্থ হয়ে যাবে। আর তুমি বরং তোমার রুমে গিয়ে বিশ্রাম করো। মাথা ঠান্ডা করে,আগে নিজে স্বাভাবিক হও। তোমায় নিস্তেজ দেখাচ্ছে।”
এই বলেই জাভিয়ান থামল। পরক্ষণেই আবার কি যেন ভেবে আওড়াল,
“সুহিন,জানিনা আসলে আমার আদৌও এই কথাটা বলা উচিত কিনা। তবে তোমাকে যেহেতু এতোদিন নিজের মেয়ের মতো ভেবেই,দেখাশোনা করেছি। সেক্ষেত্রে একটা পরামর্শ থাকবে,তুমি কেকের আশেপাশ থেকে যতটা পারবে দূরে থাকো।
কিছুটা হলেও তো জানো,ও কেমন স্বভাবের ছেলে। ছোট থেকেই উগ্র-বেপোরোয়া৷ এতো বছরেরও ওর মন-মরজি কাজকর্ম করা বন্ধ হয়নি। আমরা না হয়, কাছের লোক তাই বিষয়টা বুঝে মেনে নেই। কিন্তু আশেপাশের লোকজন তো এইসব বুঝতে যাবে না।
তেমনি তোমাদের দুজনের মাঝের সম্পর্কটাও স্বাভাবিক নয়। এই বাড়ি সহ এলাকার মোটামুটি সবাই জানে তোমাদের সম্পর্কটা…যাই হোক,সময়ের সাথে সাথে আমি বিভিন্ন ভাবে ম্যানেজ করে লোকজনের মাথা হতে এসব সরিয়েছি। শুধুমাত্র লোক-সমাজে যেন আমাদের হেনস্তার স্বীকার না হতে হয়। কিন্তু এটা ভুলে গেলে তো চলবে না যে, সবাই এখন চুপ রয়েছে মানে সবাই অতীতের সবটাও ভুলে গিয়েছে।
এখন কেকে যদি সামান্যও পাগলামি করে,আর তা যদি সমাজে ছড়িয়ে পড়ে—ভাবতেই পারছ,পুরোনো ঘাঁ আবারও তাজা হবে। তখন তুৃমি হোক বা আমি, সবাইকে লোকের ঘৃণ্য কথা শুনতে হবে। কিন্তু কেকে! ওর কিন্তু কিছুই হবে না। ও শুরুতেই যা ছিল, পরেও ঠিক তাই থাকবে। তাই বলছি,তুমি যতটা পারবে ওর থেকে দূরে থাকতে। আমি ওদের এনেছিলাম ভালো উদ্দেশ্যে। ভেবেছিলাম দেশে থাকতে যা করার করেছে,এখন হয়তো এতো বছর সবকিছুই পরিবর্তন হয়েছে। হ্যাঁ, পরিবর্তন তো হয়েছে। তবে ভালো কোনো লক্ষ্মণ দেখছি না। এ যেন, সময়ের সাথে সাথে ওর নিজস্ব উম্মাদনা আরো বেড়ে চলেছে।”
সুহিন চুপচাপ শুধু জাভিয়ানের কথাগুলো শুনে যায়। তার নিজের মস্তিষ্কেও এই কথাগুলো বেশ প্রভাবিত হলো। মিথ্যে নয়, সে যা দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি,সেটা কেকে বাস্তবে করে দেখিয়েছে। এখন নিজের প্রতিও তার আর কোনো বিশ্বাস নেই। শূন্য লাগছে তার, সম্পূর্ণ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য!
সে মাথা নুইয়ে স্রেফ এইটুকুই আওড়াল,
“আমি রুমে যাচ্ছি।”
এই বলেই সে পা বাড়াতে নেবে, ঠিক তখনই আবার জাভিয়ান বলে ফেলল,
“আর শোনো, কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে সন্ধ্যা নয়তো বিকেলে আমার সাথে একটু দেখা কোরো। তোমার সাথে কিছু জরুরী বিষয়ে কথা বলার আছে।”
সুহিন জানে না, এই জরুরী বিষয়টা ঠিক কি হতে পারে। তবে আপাতত এসব নিয়ে আর ভাবতেও চাচ্ছে না। যথারীতি সে কেবল মাথা নুইয়ে সম্মতি জানিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল।
রুমে এসে দরজা লাগিয়ে সুহিন সরাসরি গোসলে চলে যায়। এবং শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে, লাগাতার সে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। মাথা কাজ করছে না তার। কি করবে সে? কাকে বলবে? কার কাছে গেলে সাহায্য পাবে? কিভাবে মুক্তি মিলবে এই নরক থেকে? কিভাবে পাবে কেকে নামক সাইকোটা থেকে মুক্তি? ঐ লোকের প্রতিটি পদক্ষেপ,প্রতিটা কার্যক্রম তাকে বরাবরের মতো শেষ করে দেয়। এতোই যখন তাকে তিলে তিলে শেষ করে দেওয়ার নিয়ত, তবে সে তাকে কেনো একেবারেই মেরে ফেলে না?
পায়নি! সহস্র আর্তনাদ করেও সে কোনো উত্তর পায়নি। অবশ্য উত্তরটা দেবেই বা কে? প্রায় বেশ ঘন্টাখানেক সময় নিয়ে একটানা ভেজার পর, গোসল সেড়ে রুমের বাহিরে এলো।
যাবার সময় সকালে কালো রঙের একটা জামা পড়াছিল। আপাতত সেটা পরিবর্তন করে, ধূসর রঙের লং শার্ট ও কালো প্লাজো পড়ে সাদা ওড়না জড়িয়ে নিল। হালকা ঢেউ খেলানো বাদামী রঙের ভেজা চুলগুলো, ঠিকমতো না শুঁকিয়েই আলগোছে অবহেলায় মেলে দিল।
চশমা ছাড়া আয়নার সামনে দাঁড়াতেই, সবকিছু কেমন যেন একদমই ঝাপ্সা দেখতে পেল। তাই সে চশমাটা নিয়ে, চোখে তুলতেই আয়নার সামনের দৃশ্যটা আর কেবল ঝাপসা রইল না। বরং তা হয়ে উঠল মর্মান্তিক।
নীলচে চোখের কোণগুলো তার কান্নার তোড়ে রক্তিম আভায় মিইয়ে আছে। কিন্তু দৃষ্টিটা আটকে গেল কেবল একটি বিন্দুতে। আলতোহাতে জামার গলাটা সরিয়ে দিতেই, উন্মোচিত হলো বামপাশের তীক্ষ্ণ কলারবোন সংলগ্ন ত্বকখানি।
এখানে নেই কোনো উষ্ণ চুম্বনের চিহ্ন। রয়েছে কেবল এক হিংস্র অধিকারের ফলন।
আঘাতটা মৃদু কিংবা লালচে নয়, বরং গাঢ় নীলচে-কালচে রঙের কালশিটে ক্ষত হয়ে জ্বলজ্বল করছে। যার মাঝে স্পষ্ট ফুটে উঠে আছে মানুষের দাঁতপাটির ছাপ।
তবে ছাপগুলো দেখতে মোটেও মোলায়েম নয়। সেগুলো দেখতে সম্পূর্ণ অস্বাভাবিকভাবে তীক্ষ্ণ, অসম ও গভীর মনে হলো। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে,যেন কেউ উন্মত্ত ক্রোধে কামড়ে ধরে ত্বক ছিঁড়ে নিতে চেয়েছিল। অথচ সেটাই ছিল ব্যক্তির নিজস্ব ভালবাসার ধরণ।
বুকের ঠিক উপরে, সেই স্পর্শকাতর কলারবোনের উপোরোক্ত চামড়ায় এভাবেই আরো দু-তিনটে ছোট ছোট, বিন্দু আকারের ক্ষতগুলো ছড়িয়ে আছে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে,একসাথেই ব্যক্তি বাদবাকি চিহ্ন সাজিয়েছে।
এটাকে কোনো সাধারণ ‘লাভবাইট’ বলা ঠিক হবে না।এটি ভালোবাসার মোড়কে লুকিয়ে থাকা এক সাইকোপ্যাথিক মানবের, আক্রমণের শীতল-নিষ্ঠুর স্বাক্ষর। যা দিয়েই সুহিনের গলায় অন্ধকার-কর্তৃত্ববাদী গল্প খোদাই করে রেখে দিয়েছে। দৃশ্যটি দেখামাত্রই সুহিন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে, ঠোঁট চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বেদনার চেয়েও বেশি,যা ছিল ভয় ও অসহায়তার আর্তনাদ।
কত চেষ্টা করল বাঁচবার। অথচ তাকে এইটুকু সময়ের মাঝে কেউই পারল না বাঁচাতে। সব শেষ করে দিয়েছে। দানিয়েলকে কতবার ফোন করেছে। অথচ সে নেটওয়ার্কের বাহিরে। সুহিন জানে না দানিয়েল এখন কোথায়, কিংবা কেমন আছে। জানা মতে আজ নিমরা আর তার একত্রে বাড়ি ফেরার কথা ছিল। অথচ সবসময় যে মানুষটা ফোন নিয়ে সতর্ক থাকতে বলে,সেই মানুষটাকেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনের সময় কাছে পেল না। এমনকি সামান্য যোগাযোগটুকুও করতে পারল না।
সুহিন আবারও দু’হাতে মুখ চেপে,হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এরিমধ্যে আচমকা দরজায় ঠকঠক শব্দ হতেই,সে নিজেকে শান্ত করল। বাহিরে তাকিয়ে দেখে,এখন প্রায় দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। কিন্তু এই সময় আবার কেউ কেন এলো?
কারণ যেটাই হোক না কেনো,সুহিনের ইচ্ছে নেই এই মূহুর্তে কারো সাথে কথা বলার।সকালের পর আর তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি। তাই সে, শুষ্ক গলাখানি ভিজিয়ে বলল,
“আমি এখন কারো সাথে কথা বলতে চাই না। আমি একা থাকতে চাই।”
সুহিন এই বলেই ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। মাথা নুইয়ে রীতিমতো হাঁপাতে লাগল। অন্যদিকে দরজার কিছুক্ষণ আওয়াজ না হলেও,পরক্ষণেই একইভাবে ঠিক তিন-চারবার শব্দ হতে লাগল। না বেশি জোরে, না বেশি আস্তে। একটি নির্দিষ্ট ছন্দে।
সুহিন এবার প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে দাঁড়ায়।সে চোখদুটো কোনোমতে মুছে নিয়ে, দরজাটা খুলতেই বলে ওঠে,
“বলছি তো আমি একা থাকতে চাই। তবে কেনো বিরক্ত…”
সুহিন থমকে গেল। চোখের সামনে খাবারের প্লেট হাতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কেকে দাঁড়িয়ে। দেখে মনে হচ্ছে, সে-ও গোসল সেরেছে। পরনে কালো টিশার্ট-প্যান্ট। ধবধবে ফর্সা ত্বকের পেশিবহুল বলিষ্ঠ বাহুজোড়ায় খানিকটা লালচে বর্ণের নখের আঁচরও দৃশ্যমান। তবে সেসব নিয়ে নূন্যতম ভাববার আগ্রহ সুহিনের নেই। সে কেকের মুখের উপর দরজার লাগিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে বলল,
“চলে যান এখান থেকে।”
এই বলেই সে সজোরে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে যেমনি লাগাতে নিয়েছে,ওমনি কেকে পা ও ডান-হাতের সাহায্যে দরজাটা ঠেকিয়ে, নিস্পৃহে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে—শীতল-গম্ভীর স্বরে আওড়াল,
“বেইবি! ডোন্ট ডু দিস,হা?”
সুহিন নিজেকে কোনো মতে স্বাভাবিক রেখে, ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলল,
“সব তো শেষ করেছেন। এখন আবার কি চান?”
কেকে ক্ষীণ তির্যক হেসে আওড়ায়,
“তোকে চাই।”
সুহিনের চোখমুখ শুকিয়ে যায়। কথাটার অর্থের সাথে উদ্দেশ্যটা ঠিক এখনও বুঝে উঠতে পারছে না। সে ভীত হয়ে কিছু বলবে,তার আগেই কেকে আলগোছে ঘরে দুই’পা এগিয়ে আচমকা থেমে গিয়ে বলল,
“মে আই কাম ইন?”
সুহিনের ভাবমূর্তি নিমিষেই পরিবর্তন হলো। ইচ্ছে করল, এই লোকটাকে ধরে চিবিয়ে খেতে। সে দাঁতে দাঁত পিষে নিজেকে শান্ত রাখে। অন্যদিকে কেকে ততক্ষণে রুমে প্রবেশ করে দরজার লাগিয়ে দিতে নিলে,সুহিন বলে ওঠে,
“খবরদার দরজা লাগাবেন না।”
তার কথা কেকে মোটেও গ্রাহ্য করল না। নির্বিকারে দরজাটা শক্তকরে লাগিয়ে দিল। অতঃপর সরাসরি বিছানার পাশে গিয়ে, সাইড-টেবিলের উপর খাবারের প্লেটটা একপ্রকার তেজ দেখিয়ে শব্দ করে রেখে দিল।
এদিকে সুহিনের কিছুটা ভয়-ভয় হচ্ছে। সে আলগোছে পিছিয়ে ক্লোজের পাশে দেয়ালের দিকে চলে যায়। ততক্ষণে কেকে ঘুরে তার দিকে ফিরেছে। একইসাথে ঘাড়টা মৃদু বাঁকা করে,নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে আসতেই গম্ভীর স্বরে বলল,
“এখন বল কি হয়েছে।”
—“কিচ্ছু হয়নি,আপনি আমার কাছে আসবেন না।”
কেকে ক্ষীণ হেসে,ঘাড়-গলায় হাত ঘষে আওড়ায়,
“ব্লু-বেরি! ইউ নো হোয়াট,আই লাভ টু ডু হোয়াট এভার আই ওয়ান্ট।বাট যারা আমার কথা অমান্য করে জেদ দেখায়, আমি তাদের একদমই পছন্দ করিনা।”
এই বলতে না বলতেই, সে পুনরায় মন্থর গতিতে সুহিনের দিকে এগিয়ে যায়। সুহিন তার হাবভাবে পুনরায় সংকীর্ণ হয়ে ভীত স্বরে আওড়ায়,
“বললাম না কাছে আসবেন না! তবে শুনছেন না কেনো!”
সুহিন কিঞ্চিৎ ঢোক গিলতেই,কেকে তা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে,আচমকাই হাস্কি স্বরে গেয়ে উঠল,
‘Blue eyes hypnotize teri kardi ai mennu,
I swear! chhoti dress____
mein bomb lagdi mennu’
এইটুকু গাইতে না গাইতেই, কেকের হাতজোড়া আচমকা সুহিনকে ঘিরে ধরল।তার ডানহাতটা আলতোভাবে শার্টটা বেয়ে উপরে উঠে গেল। এবং সাপের ন্যায় আচমকাই সুহিনের উদর হতে কোমড়ে বিচরন করতেই, সুহিন অজান্তেই এক তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠল। সে প্রচন্ড অস্বস্তিতে কিছু বলে উঠবে,তার আগেই কেকের অন্যহাত চলে গেল তার গাল হতে ওষ্ঠদ্বয়ে।
‘Glossy lips, uff yeh tricks
Baby lagdi ai killer
Oh yeah oh yeah
Katal kare tera bomb figure’
সুহিনকে এক ঝটকায় কাছে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। একদিকে জামার আবরণের ভেতর হতে, উন্মুক্ত উদর-কোমড়ে হাতের দৃঢ় বন্ধন। অন্যদিকে আবার সুহিনের গাল ও মাথার পেছনে হাত রেখে, মুখটা নিজের কাছে টেনে উঁচিয়ে ধরেছে।
স্বাভাবিক ভাবে সুহিন কেকের চেয়ে উচ্চতায় বেশ খাটো। একইসাথে এমন বলিষ্ঠ দেহের মানুষটার সাথে শক্তির জোরে পেরে ওঠা একপ্রকার অসম্ভব। সুহিন কোনো উপায় না দেখে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে, চোখ-মুখ ঘৃন্যতায় খানিক খিঁচে নিয়ে বলল,
“নোংরামি বন্ধ করুন। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। প্রচন্ত ঘৃণা হচ্ছে আপনার প্রতি।”
কেকে সুহিনের মাথার পেছনে ও ঘাড়ে রাখা হাতের বন্ধনে দৃঢ় চাপ প্রয়োগ করল। মূহুর্তেই ব্যাথায় সুহিনের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ব্যাথার চোটে তার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। অথচ কেকে ততক্ষণে সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে অকপটে বলে ফেলল,
“আমার ছোঁয়ায় ঘৃণা হচ্ছে? বাট হোয়াই? এখন তো আমার সম্পূর্ণ অধিকার আছে,রাইট?”
সুহিন এবার নিজেকে কিছুটা শক্ত করে, জোর গলায় বলে উঠল,
“কিসের অধিকার? আপনি কেবল মাত্র আমায় কষ্ট দিতেই এসব করছেন। আমি জানি জানি, আমি কষ্ট পেলেই আপনি শান্তি পান। আমি আপনাকে ঘৃণা করি। আই যাস্ট হেইট ইউ।”
—“বাট আই ওয়ান্ট ইট ইউ হানি।”
কেকে ঠোঁট কামড়ে এহেন কথা বলতেই, সুহিন বিস্ময়ের সহিত ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়েও রইল। অন্যদিকে কেকে পুনরায় ক্ষীণ তির্যক হেসে আওড়াল,
“বেইবি, তুই হলি আমার অস্তিত্ব। আর কেকে নিজের অস্তিত্বকে যতটা কষ্ট দেয়,তার চেয়েও বহুগুণ বেশি ভালোবাসে। তবে শুধু এটা কেনো ভাবছিস, আমি সারাজীবন তোকে কেবল কষ্টই দেবো? আদরও তো করব, তাই না?”
এই বলতে না বলতেই, মুখ দিয়েই দাঁতের সাহায্যে সুহিনের গলার কাপড়ের অংশটা সরিয়ে দিয়ে, কলার-বোনের ক্ষতের দিকে চেয়ে ক্ষীণ হেসে আওড়ায়,
“ড্যাম… দ্যাটস্ ওয়ান হেল অফ মাই ফাকিং মাস্টারপিস স্ট্যাম্প!”
কেকের চোখ-মুখে অদ্ভুত এক বিভৎস তৃপ্তি জেগে উঠল। এটা তার ইচ্ছেকৃত নাকি সত্যি, তা বোঝা মুশকিল। এরিমধ্যে সে আচমকা, ক্ষতটায় আলতোভাবে নিজের নাক ঘষে দিতেই সুহিন ছটফটিয়ে উঠল। সে দুহাতে চেষ্টা করেও, তাকে সরাতে পারল না। তার হালকা ভেজা-সিক্ত এলোমেলো চুলের ছোঁয়ায়, এইসময় অন্যকারো নারীসত্ত্বা হয়তো সহজেই খেই হারিয়ে ফেলত। কিন্তু তেমনটা সুহিনের ক্ষেত্রে হলো না। সে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বলে উঠল,
“আপনি একটা পাগল,আপনি একটা সাইকো-উম্মাদ। সরুন এখান থেকে। কেনো বুঝতে পারছেন না, আপনাকে আমি কেবল ঘৃণা করি।”
—“তুই আমাকে ঘৃণা করিস, তাই তো?”কেকে এবার সুহিনের গলার কাছে মুখটা আরও এগিয়ে আনল। তার নিশ্বাস সুহিনের ত্বকে উষ্ণ স্রোতের ন্যায় শিহরণ জাগাল।
সুহিন কোনও উত্তর দিতে পারল না। তার সমস্ত শক্তি যেন কেকের এই মানসিক অত্যাচারে শুষে নিচ্ছিল।
”তবে কর ঘৃণা। তোর এই ঘৃণা, এই তেজ—এগুলোই তোকে আমার কাছে আরও বেশি জীবন্ত করে তুলছে। আর আমি তো তোকে আমার অস্তিত্ব বলেছি। আমার অস্তিত্বের ওপর কেবল আমারই অধিকার। তুই চাইলেও এই অধিকার কেড়ে নিতে পারবি না।”
কেকে অবশেষে সুহিনের কলার-বোন থেকে নিজের তীক্ষ্ণ চোখ সরাল। এবং বা হাতের তর্জনী দিয়ে আলতো করে সুহিনের বাম গাল স্পর্শ করল।
Naar e Ishq part 11
”আদরও করব, বলেছি তো!,” কেকে ফিসফিস করে বলল। সুহিন তখন নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে। সে জানে, ঘটনাটা খানিক ভিন্ন। এখানে সবকিছু স্বাভাবিক নেই। কেকে যা করছে,সেটাও সত্যি নয়। এদিকে কেকে ততক্ষণে কিছুটা থেমে আবারও বলে উঠল,
“কিন্তু আমার আদরের ধরণ আলাদা। আমার আদর তোর কাছে কষ্ট মনে হতে পারে। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই। তোর এই শরীর, তোর এই জেদ, তোর সমস্ত অহং-তেজ…সব কিছুর ওপর কেবল আমার অধিকার। বুঝেছিস?”
