Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২
আরাফাত আদনান সামি

রাত প্রায় ১১ টা ছুঁই ছুঁই । চারপাশে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। বাতাসে মিশে আছে হালকা শীতলতা, যেন অচেনা কোনো হাত এসে নিঃশব্দে গায়ের উপর দিয়ে ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাক সেই নীরবতাকে খানিকটা ভেঙে দেয়, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আবার সব শান্ত হয়ে যায়। আকাশের ফাঁকা জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে অগণিত তারার ঝিকিমিকি মাঝে মাঝে কালো মেঘ এসে তাদের আড়াল করে ফেলে। গলির এক কোণে ভাঙা ল্যাম্পপোস্টের আলো কাঁপতে কাঁপতে জ্বলছে যেন সেও রাতের ক্লান্তিতে ঢলে পড়তে চাইছে।

এই শীতল বাতাসে ভাসছে এক অজানা অস্থিরতা যেন কিছু ঘটতে চলেছে। দূরের অন্ধকারে কে যেন লুকিয়ে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মুখ স্পষ্ট নয়। নিঃশ্বাসের শব্দ নিজের কানে ভারী শোনাচ্ছে, হৃদস্পন্দনও অজান্তে বেড়ে গেছে।
বিকেলের ঘটনার ভার যেন এখনও বুকের ভেতর জমে আছে । সেই সন্ধ্যা থেকে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মায়া নিঃশব্দে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। শীতল বাতাস এসে তার এলোমেলো চুলের গোছা মুখের উপর ছুঁড়ে দিচ্ছে, কিন্তু সে সেগুলো সরানোর চেষ্টা করছে না। চোখের পাতা ভারী, যেন অনেকক্ষণ ধরে কান্না চেপে রেখেছিল। অবশেষে কিছুটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

তার দৃষ্টি বাইরে, কিন্তু মন পড়ে আছে আগের সেই মুহূর্তগুলোতে, যখন কৌশিকের কাছে থাকার স্বপ্ন বুনত সে। প্রতিটি স্মৃতি যেন আজ তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো বুকের ভেতর বিঁধে যাচ্ছে।
আনমনে, এক অদ্ভুত কষ্ট মিশ্রিত স্বরে ফিসফিস করে উঠল মায়া,
“ভুল হোক বা ইচ্ছে করেই হোক এটা কী করলাম আমি? এটা কী হয়ে গেলো আমার সাথে? এটা তো হবার কথা ছিলো না। কেন বারবার আপনি আমাকে পরীক্ষার মাঝে ফেলান, কৌশিক ভাই? আমি তো সবসময় আপনার কাছেই থাকতে চেয়েছিলাম। তখন আপনি আমাকে চাননি অবহেলা করেছেন,প্রতি মুহুর্তে। আমার দিকে তাকাতেও যেন কষ্ট হতো আপনার। আর আজ, যখন আমি সব মেনে নিয়ে নিজেকে সরিয়ে এনেছি, এখন কেন আপনি আবার আমাকে চাইছেন?”

তার গলা কেঁপে উঠল, শ্বাস যেন বুকে আটকে গেল, কিন্তু সে থামল না,
“আমি কি বোকা বলেই আমার কাছে আসা সহজ মনে হচ্ছে? যখন ইচ্ছে হবে তখন আসবেন যখন ইচ্ছে হবে না তখন আসবেন না। নাকি ভেবেছেন আমার উপর জোর খাটানো যায় বলে আপনি এগিয়ে আসছেন? দরকার নেই, কৌশিক ভাই, আমার কোনো কৌশিক ভাইয়ের দরকার নেই। আমি এমন কাউকে চাই নাআমার জীবনে।”
শেষ কথাটা বলেই মায়া কান্নায় ভেঙে পড়ল। চোখের জল আর শব্দহীন কান্না একসাথে মিলেমিশে ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা তৈরি করল। বাইরের অন্ধকার গাঢ় হয়ে জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ল ঘরের কোণে, যেন তার নিঃসঙ্গতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াল। রাতের শীতল হাওয়া পর্দা দুলিয়ে তার চোখের জলে ভেজা মুখ ছুঁয়ে গেল এমন স্পর্শে সান্ত্বনা ছিল না, ছিল শুধু শূন্যতার ঠাণ্ডা ছোঁয়া।

মায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, বাইরে ম্লান আলোয় চারপাশ কেমন যেন অস্পষ্ট লাগছিল। ঠিক সেই সময়, অপ্রত্যাশিতভাবে, তার কোমরে অনুভূত হল এক দৃঢ় হাতের স্পর্শ।
মায়ার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। শরীরের রক্ত যেন মুহূর্তেই বরফে জমে গেল। আতঙ্ক আর কৌতূহলের মিশ্র অনুভূতিতে ধীরে ধীরে পিছন ফিরতেই তার দৃষ্টি আটকে গেল, কৌশিক কে দেখে।
কালো রঙের ঢিলেঢালা টি-শার্টে ঢেকে থাকা ছেলেটির শরীর, মুখে অদ্ভুত এক গভীরতা, চোখে অব্যক্ত কিছু।
মায়া কিছু বলার আগেই কৌশিক হঠাৎ তাকে কোলে তুলে নিল। চারপাশের নীরবতা যেন এক নিমিষে ভেঙে গেল মায়ার কাঁপা কণ্ঠে,

” ক…ক…কী করছেন ক…কৌশিক ভাই? নিচে নামান আমাকে কেউ দেখে ফেলবে! আমি চাই না আমার জন্য দুই পরিবারের মধ্যে আবার কোনো ঝামেলা হোক। প্লিজ, আমায় নামিয়ে দেন।”
কৌশিক একটিও শব্দ উচ্চারণ করল না। তার গভীর দৃষ্টি যেন মায়ার অন্তরের সব গোপন ভেদ করে ফেলছে। কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে মায়া আবার বলল,
“আমাকে নিচে নামান, কৌশিক ভাই। আচ্ছা, আপনার কি কোনো লজ্জা নেই?”
গম্ভীর স্বরে কৌশিক ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
” কী হয়েছে? এত চেঁচাচ্ছিস কেন? তুই জানিস না,আমার এত লজ্জা-টজ্জা নেই। ”
সে এখনও মায়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সব সময় থমকে গেছে। মায়া বিরক্ত হয়ে বলে উঠল,
“আশ্চর্য! আমি কী করে জানবো কে হন আপনি আমার?আর আমি কি বাচ্চা মেয়ে নাকি? নামান আমাকে, কৌশিক ভাই!
কিন্তু মায়ার কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই কৌশিকের। তার ভেতরে যেন কিছু বদলে যাচ্ছে ঘুমন্ত দেহে আগুনের শিখা জ্বলে উঠছে, চোখে জমে উঠছে নেশার ঘন কুয়াশা। মায়া বুঝতে পারল, এই চাহনি স্বাভাবিক নয়। লজ্জা মিশে থাকা রাগে চোখ নামিয়ে অনুরোধ করল,

“ছাড়ুন…”
কিন্তু কোনো সাড়া নেই। মায়া আবার বলল,
“কৌশিক ভাই, ছাড়ুন আমাকে। আমার খিদে পেয়েছে, আমি নিচে যাব।”
ভারী কণ্ঠে কৌশিক বলল,
“নিচে যেতে হবে না। আমি আজ তোকে যা খাওয়াবো, তাতেই তোর পেট ভরে যাবে।”
বিস্ময়ে মায়া তার দিকে তাকাল,
“কী বলছেন এসব?আমায় নামিয়ে দিন, আমি খেতে যাব।”
চোখের গভীর নেশা আরও গাঢ় করে কৌশিক আবারও বলল,
“নিচে যেতে হবে না,আমি যা খাওয়াব খাবি তুই?যা খেতে হবে না তোকে একবার খালি টেস্ট করে দেখ,আই সোয়ার,এই টেস্ট সারাজীবন তোর মুখে লেগে থাকবে।”

“অসভ্য…!”
মায়া কথাটা বলতেই কৌশিক আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দৃঢ় হাতে মায়ার মাথা চেপে ধরে ধীরে ধীরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কৌশিক এক হাতে তার শার্টের উপরের কয়েকটা বোতাম খুলে নিলো। তার বিশাল দেহের ছায়ায় ঢেকে গেল মায়ার কোমল অবয়ব। জানালার বাইরে অন্ধকারে বাতাস যেন থমকে দাঁড়াল। কৌশিকের গভীর দৃষ্টি আটকে রইল মায়ার মুখে। ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো, যেন নিজের আয়ত্তে নিতে চায় সরু, নরম ওষ্ঠজোড়া।
প্রথমে হতভম্ব হলেও মায়া টের পেল কৌশিকের স্পর্শে আছে এক অদ্ভুত মায়াবী আকর্ষণ। তার দেহ থেকে ভেসে আসা কস্তুরীর মোহময় সুগন্ধ মায়ার মাথা ঝিমঝিম করে তুলছে। মন-প্রাণ ধীরে ধীরে হার মানছে সেই অদৃশ্য ঘোরের কাছে।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে গেল। আচমকা করিডোরে ভেসে এলো কারও ডাকার শব্দ মায়াকে ডাকছে যেন কেউ। চমকে উঠে মায়া কৌশিককে মৃদু ধাক্কা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কণ্ঠে ব্যাকুলতা,

“কৌশিক ভাই, প্লিজ এখনই চলে যান। কেউ দেখে ফেললে অনেক সমস্যা হবে।”
কৌশিক কোনও উত্তর দিল না। শুধু গভীর দৃষ্টিতে মায়ার চোখে চোখ রাখল। পরের মুহূর্তেই, এক হাতে তার কোমর জড়িয়ে টেনে নিল নিজের বুকের কাছে। অপ্রস্তুত মায়া প্রতিরোধ করার আগেই, কৌশিক নিজের ঠোঁট মায়ার ঠোঁটে এঁটে দিল দৃঢ়, দাবিদার এক চুম্বন।
চুম্বনের গভীরে হঠাৎই আস্তে করে মায়ার ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে দিল সে, যেন অধিকার ঘোষণা করে দিল নীরবে। ব্যথা আর শিহরণে মায়ার গলা থেকে চাপা এক নিঃশ্বাস বেরোল; চিৎকার দিতে চেয়েও পারল না। কষ্টে ও লজ্জায় মৃদু ধাক্কা দিয়ে কৌশিককে সরিয়ে দিল মায়া।
কৌশিক এবারও কিছু বলল না শুধু চোখে এক রহস্যময় দৃষ্টি আর ঠোঁটে এক চটজলদি মুচকি হাসি রেখে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার চলে যাওয়া যেন ঘরটাকে আরও নিস্তব্ধ করে তুলল।
মায়া গভীর শ্বাস নিয়ে এলোমেলো চুল ঠিক করল। ধীরে ধীরে গিয়ে জানালার পাশে বসল, বাইরে তাকাল এক অজানা শূন্যতার দিকে। ঠিক তখনই বাইরে থেকে আবার ভেসে এলো সেই ডাক,

“মায়া… মায়া…”
এবার ডাকে ছিল এক ধরনের তাড়া। হঠাৎ রুমের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলেন রুবিনা পাটোয়ারী।
হকচকিয়ে উঠে দাঁড়াল মায়া। তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে পিছনে ফিরল। বলল,
“মা তু…তুমি এখানে?”
রুবিনা পাটোয়ারীর কপালে ভাঁজ পড়ল। কড়া স্বরে বললেন,
“এভাবে জানালার পাশে মেঝেতে বসে ছিলে কেন, মায়া?”
মায়া কোনো উত্তর দিল না, শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ যেন কিছু খেয়াল করে এগিয়ে এলেন রুবিনা পাটোয়ারী।
“ঠোঁটে চোট পেলে কীভাবে?”
মায়া এবার একটু ভয়ে কেঁপে উঠল, তোতলাতে লাগল,

“আ…আসলে…”
ভ্রু আরও কুঁচকে উঠল রুবিনা পাটোয়ারীর। বললেন,
“কী আসলে আসলে করছ? বলো, চোট পেলে কীভাবে?”
মায়া এবার এক মুহূর্তে চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরে বলল,
“আসলে মা, সুকেশ থেকে চামচ নিতে গিয়ে একটা কাটা চামচ ঠোঁটের কোনায় লেগে গিয়েছিল। সেখান থেকেই চোটটা লেগেছে।”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১

রুবিনা পাটোয়ারী এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন,
“একটু দেখে শুনে তো কাজ করবে। এখন চলো, খেয়ে নাও।”
মায়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না মা, আমার খিদে নেই।”
সঙ্গে সঙ্গেই রুবিনা পাটোয়ারীর কণ্ঠে কঠোরতা ফিরে এল,
“এত কথা আমার পছন্দ নয়। আর এক্ষুনি আমার সাথে চলো। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে সবাই একসাথে খাবে বলে।”
মায়া জানত, তার মায়ের সঙ্গে তর্ক করার অর্থ শুধু পরিস্থিতি আরও খারাপ করা। তাই কোনো কথা না বলে, মুখে এক নিঃশব্দ ক্লান্তি নিয়ে, মায়ের সঙ্গে বেরিয়ে গেল নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩