Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৪
আরাফাত আদনান সামি

দুপুর প্রায় ১টা। সূর্যের আলো তখন মাথার উপর থেকে যেনো সরাসরি ঝরে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা পাখিদের কিচিরমিচিরও যেন থেমে গেছে প্রখর রোদের তাপে। দূরের কাঁচা রাস্তা ধুলোয় ভরে আছে, মাঝে মাঝে হালকা হাওয়ায় সেই ধুলো উড়ে গিয়ে আবার স্থির হয়ে যায়। গাছের ছায়ার নিচে বসে কেউ হয়তো হাতপাখা দুলিয়ে স্বস্তি খুঁজছে। কাকগুলো ডালে বসে হাঁফ ছাড়তে ছাড়তে ডাকছে, মনে হয় তারাও ক্লান্ত এই দুপুরের উত্তাপে।

এমন সময় রান্নাঘর থেকে ভেসে আসতে লাগলো নানান রকম সুমধুর রান্নার ঘ্রাণ। ক্ষুধার্ত দুপুরে সেই ঘ্রাণ যেনো আরও ব্যাকুল করে তুলছে মনকে। চৌধুরী বাড়ির রান্নাঘরে আজ যেন উৎসবের আমেজ। দুই জা মাহিমা চৌধুরী ও সায়েরা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন নানা পদ রান্নায়।
রান্নার ফাঁকে সায়েরা চৌধুরী বলে উঠলেন,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-“ভাবি, যে গুলো রান্না হয়েছে সেগুলো আমি গিয়ে টেবিলে রেখে আসি।”
-“আচ্ছা, যা। তবে সাবধানে রাখিস।”
-“ভাবি, একটা কথা ছিলো…”
“কী কথা?”
-“বড় ভাই আর রোহিতের আব্বু কোথায়? সকাল থেকে কাউকে তো দেখছি না। কোথাও গেছে নাকি?”
-“হ্যাঁ, ওরা তো সকাল সকাল নাস্তা করে বেরিয়ে গেছে। আমাকে বলেছে আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে।”
-“ওহ্ তাই, আমি বেজায় চিন্তা করছিলাম। তা ভাবি, কৌশিক কোথায়?”
মাহিমা একটু বিরক্ত স্বরে বললেন,
“কোথায় আর থাকবে! পরে পরে ঘুমাচ্ছে হয়তো। সকাল থেকে কিছু খায়নি।”
ঠিক তখনই রান্না ঘরে ঢুকল তিয়াশা। মুখে একরাশ হাসি, খাওয়ার লোভ লুকানো যেনো তার পক্ষে বড়ই কঠিন। বলল,

“উফ্! তোমরা কী রান্না করেছো? কী দারুণ ঘ্রাণ বের হচ্ছে! খিদে তো আরও বেড়ে গেলো। তারাতাড়ি খেতে দাও আমাকে।”
তিয়াশার মা “সায়েরা চৌধুরী” হেসে বললেন,
“তুই টেবিলে গিয়ে বস, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
তিয়াশা টেবিলের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মাহিমা চৌধুরী ডাক দিলেন,
“তিয়াশা, শোন!”
তিয়াশা পিছন ফিরে বলল,
“কী বড় আম্মু? কিছু বলবে?”
মাহিমা চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,
“হ্যাঁ, তুই কৌশিককে ডেকে দে তো। ছেলেটা সকাল থেকে এখনো কিছু খায়নি।”
তিয়াশার চোখে যেনো ঝলমলিয়ে উঠলো দুষ্টু খুশি। কৌশিকের কাছে যাওয়ার বাহানা তো সে সবসময়ই খুঁজে বেড়ায়।
মুচকি হেসে সে উত্তর দিল,

“আচ্ছা বড় আম্মু, এই যাচ্ছি। এই বলে তিয়াশা খুশি মনে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো।
এদিকে কৌশিক এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাতভর অশান্ত চিন্তা, মনের অতিরিক্ত চাপ আর একটার পর একটা সিগারেট খাওয়ার ক্লান্তিতে তার শরীর ভেঙে পড়েছে। খাটের উপর মরা লাশের মতো পরে ঘুমাচ্ছে সে। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ, কপালে ঘামের বিন্দু জমে আছে। বিছানার পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সিগারেটের খালি প্যাকেট আর অর্ধেক ভাঙা লাইটার। ঘরের ভেতর ভাসছে বাসি ধোঁয়ার গন্ধ মনে হয় সেই ধোঁয়াই যেন তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছে। তিয়াশা কৌশিকের রুমের কাছে এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। আস্তে করে কয়েকবার টোকা দেয়। কিন্তু কৌশিক তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাই কোনো সাড়া দেয় না। সাড়া না পেয়ে তিয়াশা এবার একটু জোরে ডেকে ওঠে,

“কৌশিক ভাই,কৌশিক ভাই, ঘুম থেকে উঠো! বড় আম্মু তোমায় নিচে যেতে বলেছেন।”
তবুও কোনো উত্তর নেই। বিরক্ত হয়ে তিয়াশা এবার একের পর এক জোরে টোকা দিতে শুরু করে। তার চিৎকার আর টোকা মিলে যেন গোটা ঘর কেঁপে ওঠে। এত তীব্র শব্দে কৌশিক চমকে উঠে এক লাফ দিয়ে বসে যায়। কিন্তু রাতে অতিরিক্ত সিগারেট খাওয়ার কারণে মাথাটা ভারি ভারি লাগছিল। উঠতে গিয়েও আবার বিছানায় হেলে পড়ে যায়। বাইরে তিয়াশা তখনো থামেনি একটার পর একটা ডাক দিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা বিরক্ত হয়ে কৌশিক রাগান্বিত স্বরে বলে ওঠে,

“কি হয়েছে? এত জোরে চেচাচ্ছিস কেন তিয়াশা?”
তিয়াশা ঠোঁট বাঁকিয়ে জবাব দেয়,
“কতবার ডাকলাম, শুনতে পাওনি নাকি? আর কত বাজে খেয়াল করেছো? বড় আম্মু মানে তোমার মা তোমায় ডাকছে। এই বলে তিয়াশা চলে যায়।”
কৌশিক নিজেকে সামলে বিছানার মাথায় বালিশ ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। পাশে রাখা টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে টাইম দেখে ভ্রু কুঁচকে ওঠে।
“মাত্র একটা বাজে! আর এই মেয়েটা এমন চিক্কার পেরে গেলো, যাই হোক একদম আমার কানের বারোটা বাজিয়ে দিলো। ফাজিল মেয়ে কোথাকার!”

রাগ চেপে কৌশিক বিছানা থেকে উঠে সাইড টেবিল থেকে তোয়ালে নিয়ে শাওয়ার নিতে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর শাওয়ার সেরে ভিজে চুল মুছতে মুছতে বের হয়। গায়ে তখন শুধু একটা তোয়ালে জড়ানো। আলমারির ভেতর থেকে একটা কালো প্যান্ট আর সাদা টিশার্ট বের করে দ্রুত পরে নেয়। হাত দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে নেয়, তারপর সাইড টেবিল থেকে ঘড়িটা হাতে পরে। সব ঠিকঠাক করে অবশেষে নিজের রুম থেকে বের হয়ে যায় কৌশিক।
নিচে সবাই খাবার টেবিলে বসে আছে। নানান রকম রান্নার গন্ধে গোটা ডাইনিং রুম ভরে গেছে। ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে কৌশিক নিচে নামতে শুরু করলো।
কৌশিক কে দেখতে পেয়েই মাহিমা চৌধুরী হালকা স্বরে বলে উঠলেন,

“এখন ঘুম থেকে ওঠার সময় হলো, চৌধুরী মশাই? খাওয়া-দাওয়া বাদ দিয়ে সারাদিন-রাত ঘুমিয়ে কাটালেই হলো না কী?”
কৌশিক সামান্য বিরক্ত মুখে টেবিলের সামনে এসে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো। গলা পরিষ্কার করে শান্ত স্বরে বলল,
“আসলে মা, রাতে একটু কাজ করেছিলাম সেই কারণে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে। আচ্ছা, এইসব পরে হবে, আগে আমাকে কিছু খেতে দেও খুব খিদে পেয়েছে।”
মাহিমা চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন,
“খিদে তো পাবেই সকাল থেকে তো কিছুই খাও নি। সব রান্না করাই আছে, দাঁড়াও আমি এখনি দিয়ে দিচ্ছি।”
ডাইনিং টেবিলে সবাই খাওয়ায় ব্যস্ত। এমন সময় সায়েরা চৌধুরী হাতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে কৌতূহলী কণ্ঠে বললেন,

“ভাবি, বড় আপা’রা কি বাসায় পৌঁছে গেছে? একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করো তো।”
মাহিমা চৌধুরী হাতের তরকারি নামিয়ে উত্তর দিলেন,
“হ্যাঁ, ফোন করেছিলাম। ওরা আরও এক ঘণ্টা আগেই বাসায় পৌঁছে গেছে।”
চামচ হাতে খাবার খেতে খেতে কৌশিক তাদের কথা শুনছিলো। তাদের কথা শুনে কৌশিক থমকে গেলো। খানিকটা চারদিকে তাকিয়ে হঠাৎই বলে উঠলো,
“মা, ফুফা-ফুফু কি চলে গেছে?”
মাহিমা চৌধুরী তরকারি বারতে বারতে বললেন,
“হ্যাঁ, ভোর সকালেই চলে গেছেন তারা। তোকে বলতে উপরে গিয়েছিলো তোর ফুফু তুই ঘুমাচ্ছিলি দেখে তাই আর তোকে ডাক দেয় নি।”

কথাটা শুনেই যেন কৌশিকের খাবার গলায় আটকে গেল। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে প্রায় হতবাক হয়ে বলে উঠলো,
“কি বলো মা? দুই দিনও তো হয়নি ফুফু এসেছিলেন! উনি তো বলেছিলেন, অন্তত এক সপ্তাহ থাকবেন। তাহলেই বা এত তাড়াহুড়া করে চলে গেলো কেন?”
মাহিমা চৌধুরী বললেন,
“ওসব আমি জানি না বাবা। যাওয়ার সময় শুধু বললেন, কিছু কাজ আছে। এর বাইরে আর কিছু বলেনি কেউ।”
কৌশিকের মুখে তখন বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। রাগে গলা ভারী হয়ে উঠলো। বিড়বিড় করে সে নিজের মনে বলতে লাগলো,

“এটা নিশ্চয়ই মায়ার কাজ। কতদিন পালাবে, আমার জঙ্গলি মেও! কতদিন পালাবে আমার হাত থেকে আর নিজের ভাগ্য থেকে? কৌশিক নাম তোর ভাগ্যের সঙ্গে জুড়ে গেছে। আর কতদিন ? শেষ পর্যন্ত তোকে এই কৌশিক নীর চৌধুরী কাছে আসতেই হবে। আমার কাছে তোকে ধরা দিতেই হবে, সুইটহার্ট। এত সহজে তোকে এই কৌশিক নীর চৌধুরী ছাড়ছে না।”
হঠাৎ করেই কৌশিক অর্ধেক খাবার রেখে হাত ধুয়ে চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত গতিতে পা বাড়াতে লাগলো বাহিরের দিকে।
এমন সময় মাহিমা চৌধুরী বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,

“কী হলো কৌশিক? না খেয়ে কোথায় যাচ্ছো? কিছুই তো খেলে না।”
পিছন ফিরে সামান্য থেমে গম্ভীর স্বরে কৌশিক উত্তর দিলো,
“না মা, আর খাবো না। পেট ভরে গেছে।”
মাহিমা চৌধুরী কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
-“আচ্ছা,তবে যাচ্ছো কোথায়।”
-“ফুফুদের বাসায়।”
কৌশিক এই বলে আর কোন কথা না বাড়িয়ে হনহন করে সোজা বাহিরের দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলো । চুপচাপ গ্যারেজের দিকে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির চাবি হাতে নিলো। একঝটকা স্টার্ট মেরে গাড়ি নিয়ে সোজা বেরিয়ে পড়লো নিজের গন্তব্যের দিকে।

পড়ন্ত বিকেল সবসময়ই যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে আসে। শহরের ব্যস্ততার ভিড়ে লুকিয়ে থাকা সেই প্রশান্তি কেবল সন্ধ্যার আভাতেই ধরা দেয়। আকাশে সূর্যটা তখন ঢলে পড়ছে উঁচু ভবনের আড়ালে। তার আলো প্রতিফলিত হচ্ছে কাচের জানালায় আর আশপাশের দেয়ালে। রোদ ঝিমিয়ে এসেছে, গাঢ় কমলা আর লালচে আভা মিলে যেন এক স্নিগ্ধ মায়া ছড়িয়ে দিয়েছে চারপাশে। রাস্তার ধুলো ও ধোঁয়ার মাঝেও বাতাসে এক অদ্ভুত পরিবর্তন টের পাওয়া যায়। অফিস থেকে ফেরা মানুষের ভিড় ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমে এসেছে। কারো মুখে ক্লান্তি, কেউ আবার রিকশায় বসে মগ্ন হয়ে আছে মোবাইলের পর্দায়। পথের ধারের চায়ের দোকানগুলোতে তখন জমে উঠছে ভিড়। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে যেন সন্ধ্যার প্রথম স্বাদ। কত রকম আড্ডা বয়স্ক থেকে শুরু করে তরুণেরা সবাই একসাথে মেতে উঠেছে আলাপ-আলোচনায়। শহরের রাস্তায় সারি সারি গাড়ির দীর্ঘ ভিড় জমে গেছে। হর্নের শব্দ, পথচারীর হাঁকডাক আর গাড়ির চাকার শব্দ মিলেমিশে তৈরি করেছে ব্যস্ততার এক নিজস্ব ছন্দ। তবুও আকাশের দিকে তাকালে ভিন্ন এক দৃশ্য চোখে পড়ে চাঁদের হালকা মুখ উঁকি দিচ্ছে আকাশের কোণে। শহরের সীমানা যেন ধীরে ধীরে আধারের কোলে ঢলে পড়ছে।

এমন বিকেল শহরের জন্য এক নিঃশ্বাস ফেলার মুহূর্ত দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাতের আলোর প্রস্তুতি।
সেই সময় ছাদে বসে আছে মায়া। নরম সাদা সোফায় হেলান দিয়ে, ভীষণ ক্লান্ত শরীর আর চোখে ঘুমঘুম ভাব নিয়ে। বাসায় ফিরে শাওয়ার নিয়ে, খাওয়া-দাওয়া সেরে চুল শুকোতে এসেছিল সে। কিন্তু ছাদের আকাশ দেখে আর নিচে নামতে মন চাইলো না। আকাশটাও যেন অপেক্ষায় ছিল মায়ার জন্য। কবে সে ছাদে আসবে, আর তার অপরূপ সৌন্দর্যে হারিয়ে যাবে। বাতাসও যেন মৃদু দোলা দিয়ে মায়াকে সেই সৌন্দর্যের মাঝে ডেকে নিচ্ছে। ঠিক তাই হলো মায়া এসে প্রকৃতির টানে আর ফিরে যেতে পারলো না। মেয়েরা প্রকৃতিপ্রেমী হয়েই থাকে, মায়া তার ব্যতিক্রম নয়। চোখ বুজে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে ফিসফিস করে বললো,
“কী অপরূপ তুমি, প্রকৃতি! তোমার আবহাওয়া, তোমার সৌন্দর্য সবকিছুই অসাধারণ। ইশ্, কেউ যদি আমায় নিয়ে এই পুরো পৃথিবী ঘুরিয়ে দেখাতো! আমি তোমার রূপ কাছ থেকে দেখতে চাই, তোমার সৌন্দর্যকে স্পর্শ করতে চাই।”

এভাবে বলতে বলতে, প্রকৃতির মায়ায় ডুবে, মায়া অচেতনেই ছাদে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।
আকাশের একপাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে, যেন কেউ বিশাল ভাবে গভীর ছায়া এঁকে দিয়েছে। মৃদু হাওয়া বইছে চারপাশে, আকাশ বারবার হালকা গর্জন করে উঠছে। ছাদের এক কোণে সোফায় তখনও গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে মায়া। গাছের পাতাগুলো কাঁপতে শুরু করেছে, যেন মুহূর্তেই ঝরঝর করে বৃষ্টি নেমে আসবে। দূরে কোথাও বজ্রপাতের ক্ষীণ শব্দে আচমকাই ঘুম ভাঙলো মায়ার। ঘুম ভাঙতেই চোখের সামনে ধরা দিলো এক ভয়ংকর দৃশ্য, আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, চারপাশে অদ্ভুত এক স্তব্ধতা। মাঝে মাঝে শুধু হালকা বাতাসের সুর কানে বাজছে। পাখিরা অস্থির হয়ে উঠেছে, কেউ ছুটছে আপন নীড়ে, কেউ আশ্রয়ের খোঁজে ডানা ঝাপটাচ্ছে। মানুষজনও তড়িঘড়ি করে নিজের কাজ গুটিয়ে নিচ্ছে। কেউ কেউ ছাতা নিয়ে ছুটে পড়েছে রাস্তায়।
এমন সময়েই আকাশে ঝরলো প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির স্পর্শে কেঁপে উঠলো মায়ার দেহ। মনপাড়ায় দোলা দিলো অচেনা এক অনুভূতি। অদ্ভুত আকুলতা, কারও খুব কাছাকাছি যেতে ইচ্ছে করছে তার। চোখ বুজতেই হঠাৎ কৌশিকের স্নিগ্ধ মুখশ্রী ভেসে উঠলো মনের পর্দায়। মায়া ঘাবড়ে গেল। অনুভূতির সাগরে ডুবতে ইচ্ছে করছে, আবার সেই অতীত ও মনে করে ভয় পাচ্ছে।

চোখ মেলে নিচে তাকাতেই হৃৎস্পন্দন থেমে গেলো মায়ার। ছাদের নিচের বাড়ির পেছনের দিকটা স্পষ্ট দেখা যায় সেখান থেকে। কালো প্যান্ট আর ভেতরে গুঁজে দেওয়া সাদা শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিক।
মায়া কিঞ্চিৎ চমকে উঠলো। এ কি কেবল আমার কল্পনা? না কি সত্যি? চোখ দুটো দু’হাতে ডলে নিয়ে আবার তাকালো। না, ভুল নয় এই তো কৌশিক ভাই! তার দিকেই তাকিয়ে আছে সে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে পাপড়িগুলো ভারী হয়ে আছে, তবু পলকহীন দৃষ্টিতে কেবল মায়াকেই দেখছে কৌশিক।

মায়া কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। তারপর আচমকা পা বাড়িয়ে তড়িঘড়ি করে ছুটলো নিচে। বাড়ির পেছনে গিয়ে সত্যিই থমকে দাঁড়ালো, কৌশিক ভাই, সত্যিই এসেছে! অবিশ্বাসে চোখ ভরা বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রইলো মায়া।
ধীরে ধীরে এক পা, দুই পা করে কৌশিক এগিয়ে আসছে মায়ার দিকে। দুইজনই ভিজে গেছে পুরোপুরি বৃষ্টিতে। তবু যেন কিছুই টের পাচ্ছে না কেউ। দু’জনের মাঝে এক হাত সামান্য দূরত্ব একা একা অজানা টান তাদের আরও কাছে টেনে আনছে।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৩

কিছুক্ষণ তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হঠাৎ গভীর, নেশাগ্রস্ত ঘোরে কৌশিক বলে উঠলো,
“সুইটহার্ট…”
মায়া যেন আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়লো এই শব্দে। পুরো শরীর কেঁপে উঠলো কৌশিকের ডাকে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো মায়ার।

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ৫