কাজলরেখা পর্ব ৪০
তানজিনা ইসলাম
আঁধার বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো। কল রিসিভ করার আগে একবার উঁকি দিযে দেখলো কক্ষে। চাদনী নেই, নিজের রুমে গেছে হয়তো। ভালোই ভালোই সব জিনিস নিয়ে আসলেই হয়। এতো বিটলামি করে ওর সাথে।
আঁধার কল রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে শাবিহার উদ্বিগ্ন স্বর ভেসে এলো
-“অন্ধকার!কীরে বন্ধু। তোর তো কোনো খবরই নাই। কখন আসবি? এক্সাম তো শুরু হতে চললো, আর পাঁচ মিনিট আছে।”
আঁধার স্বাভাবিক স্বরে বললো
-“এক্সাম দেবো না।”
-“মজা করিস না।”
-“মজা না। আমি এখন চট্টগ্রামে।”
-“কী? চট্টগ্রামে কখন গেলি তুই?”
-“একদিন হলো এসেছি।”
-“মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর?এই এক্সাম টা কতোটা ইম্পর্ট্যান্ট জানিস!একবছর গ্যাপ যাবে। শেষ সময়ে এসে এতো বড় ডিসিশন কী করে নিলি তুই?ক্যারিয়ারের বারোটা কেন বাজিয়ে দিচ্ছিস?”
-“অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে এসেছি,চিন্তা করিস না। একটা বছরই তো, দেখতে দেখতে কেটে যাবে।”
-“ভাই তুই পাগল হয়ে গেছিস!ফোর্থ ইয়ারে এসে এসব করছিস তুই। তুই তো নিজের পড়াশোনা নিয়ে অনেক সিরিয়াস, ইয়ার। এটা কী করলি তুই?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-“পড়াশোনার চেয়েও সিরিয়াস একটা ব্যাপার যে এখানে ছিলো। ওটা আমার ক্যারিয়ার, এটা আমার জীবনের প্রশ্ন।”
-“কোনো সমস্যা হয়েছে? তোর বাড়ির সবাই ঠিক আছে?”
-“হু, চিন্তা করিস না। মনোযোগ দিয়ে এক্সাম দে।”
-“তারপর যে আমি তোর সিনিয়র আপু হয়ে যাবো?”
-“তখন আমি তোকে বড় আপা ডাকবো।”
শাবিহা খট করে ফোন কেটে দিলো। আঁধার উদাস দৃষ্টিতে তাকালো আকাশের দিকে। এক্সাম টা দেওয়া হলো না এবারে ওর। একটুর জন্য মিস হয়ে গেছে। সব তো ঠিকই ছিলো, তারপর চাদনী চলে এলো এখানে। মেয়েটা একটু সেক্রিফাইজ করলে কি হতো! এতো রাগ ওর উপর চাদনীর! যতই বলুক একটা বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে, তারপরও একটা আফসোস তো থেকেই যাবে আঁধারের।যখন ওর বন্ধুরা ওর চেয়ে উপরের ক্লাসে চলে যাবে, সিনিয়র হয়ে যাবে। ওরা মাস্টার্স করবে, আঁধারকে আবার ফোর্থ ইয়ারের ক্লাস করতে হবে। থাক, এতো আফসোস কিসের! এ আফসোস টুকু কেটে যাবে কিন্তু চাদনী হারিয়ে গেলে সে আফসোস আধারের আজন্ম বিরহ হয়ে থেকে যেতো।
চাদনী চোখ মুখ কুঁচকে বসে আছে নিজের কক্ষে।ওর মুখটা গোমড়া। নাক ফুলাচ্ছ বারংবার।একটা পাখি ওর হাতে। থেমে থেমে হাত বুলাচ্ছে ওর গায়ে। আঁধার পরপর কক্ষে ঢুকলো। এসেই বললো
-“কিরে আসলি না যে?”
চাদনী মুখ ফুলিয়ে বললো
-“এখানে কেনো আততো?তোমার বিএপএপ কল দিতে না, ওর কাতেই দাও।”
-“তোতলার মতো কথা বলছিস কেন? তোতলা মহিলা একটা!”
-“যাও তো যাও। মাথা টা খারাপ কইরো না।”
-“কী হয়েছে? আশ্চর্য! এমন করছিস কেন?”
-“শাবিহা আপু তোমার বিএফএফ কখন থেকে হয়ে গেলো। বলেছিলে না, তোমাদের রিলেশনশিপ ভেঙে গেছে।”
-“তাতে কী? ও প্রথম থেকেই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো। রিলেশন ভেঙেছে, ফ্রেন্ডশিপ না। তোর কী জেলাস হচ্ছে?”
-“কেন হবে? তোমার মনে হয় আমি তোমার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড!”
আঁধার উপরের দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে গাঁটা মারলো ওর মাথায়। বিছানা থেকে চাদনীর বালিশ হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ ছেড়ে।চাদনী মুখ বাকালো সেদিকে তাকিয়ে।
ড্রইংরুমের সোফায় একজন মধ্যবয়সী লোক বসে আছেন। ওনার গায়ে সাদা জুব্বা, মাথায় টুপি। আঁধার সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে পেছন থেকে দেখেই চেনার চেষ্টা করলো তাকে। ওঁকে না-কি জরুরি ভিত্তিতে খবর দেওয়া হয়েছে দেখা করতে আসার। চিনতে পেরে হাসলো আঁধার। ওর ছোটবেলার শিক্ষক। আঁধার ওনার মক্তবেই পড়তো।ওর পুরো বাচ্চাকাল টা কেটেছে ওনার বেতের বাড়ি খেয়ে।
আঁধার ওনার সামনে এসে হাসিমুখে বললো
-“আসসালামু আলাইকুম।”
হুজুর তাকালেন ওর দিকে।মুচকি হেঁসে বললেন
-“ওয়ালাইকুম আসসালাম।এসেছিস? অনেক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম তোর জন্য!”
আঁধার ওনার সামনের সোফায় বসলো। ছোটবেলায় খুব বেশিই দুষ্টু ছিলো ও। কারো কথা শুনতো না। সারাদিন নিজের মনমর্জি করতো। একে ওঁকে ধরে মারতো। প্রতিদিন সবাই একটা না একটা অভিযোগ নিয়ে আসতো সবাই ওর নামে।অপূর্ব শিকদার অতিষ্ঠ হয়েই একপ্রকার ওঁকে মক্তবে দিয়ে এলেন। আঁধার তো যাবে না, ও কারো কথা শুনবে না। বহু ধমকে-ধামকেও ওঁকে দিয়ে আসা গেলো না। তারপর অপূর্ব শিকদার আঁধার কে ওনার হাতে তুলে দিলেন।তিনি সেসময় মক্তবের হেডমাস্টার ছিলেন। অচেনা মানুষ দেখে আঁধার ভয় পেলো। মুখ কালো করে, ভদ্র ছেলের মতো চলে গেলে মক্তবে। প্রথম দিন সুন্দর ভাবে সবার সাথে থাকলেও, দ্বিতীয় দিন থেকে আঁধার আবার নিজের বিটলামি শুরু করলো। ও কারো কথা শুনতো না, কাউকে মান্য করতো না।
কোনো ছেলের মাথা ফাটিয়ে দিতো, কাউকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতো। প্রতিদিন ওঁকে মারামারি করতেই হতো।শিকদার বাড়ির ছেলে বলে অন্য হুজুররা ওঁকে কিছু বলতেও পারতেন না। কিন্তু একদিন হুজুরের হাতে এমন বেতের বারি খেয়েছে আঁধার! ওর এখনো মনে আছে। তবুও আঁধার শোধরায়নি। নিজেকে একটুও বদলায়নি। তারপর একদিন মক্তব থেকে পালিয়ে ওর বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠলো। পুরো একদিন বাড়িতে ফিরলো না। বয়সে ছোট হলে কী হবে, কলিজা ওর সবসময়ই বড়। যেদিন বাড়ি ফিরলো, এরপর থেকে আর কোনোদিন ওঁকে মক্তবে যেতে হয়নি। বর্ষা বেগম দেননি।তখন থেকেই আঁধার এখনো একরকম আছে।আর না আঁধার বদলেছে।নিজেকে শুধরেছে।
হুজুর ওর দিকে তাকিয়ে বললেন
-“কেমন আছিস?ঢাকা থেকে কখন এসেছিস?”
-“ভালো। এইতো একদিন হচ্ছে।”
-“তুই তো আমাকে ভুলেই গেছিস!”
-“নাহ, না আপনাকে কি করে ভুলতে পারি! এখনো আমার পিঠে আপনার বেতের দাগ থেকে গেছে!”
-“এতো মেরেও তো তোকে মানুষ বানাতে পারলাম না। শুনেছি ঢাকা গিয়ে উল্টাপাল্টা করিস তুই।এখনো সেই দুষ্টুই আছিস?”
-“কে বলেছে এসব? একেবারেই মিথ্যে কথা।”
আঁধার দৃঢ় স্বরে বললো।
-“তাই?”
-“হ্যাঁ।”
কথা ঘুরিয়ে বললো
-“নাস্তা করুন। কিছুই তো নিচ্ছেন না।”
টেবিলের উপর থেকে চায়ের কাপটা নিলেন তিনি। চুমুক দিয়ে বললেন
-“শুনেছি বিয়ে করেছিস?”
-“জ্বি।”
-“ভালো, ভালো।”
আঁধার কথা বলার জন্য কোনো টপিক খুঁজে পেলো না। মেঝের দিকে তাকিয়ে,দু’হাতের তালু মৃদু ঘষতে থাকলো। আঁধার ওনাকে খুব রেস্পেক্ট করে। শুধু ওনার সামনেই কথা বলতে কেমন যেন নার্ভাস হয়ে যায়। চট করে একটা কথা মাথায় আসতেই, ওনার দিকে তাকিয়ে বললো
-“একটা কথা বলি,কিছু মনে করবেন না তো।”
-“দশটা বল।তোর সাথেই কথা বলতে এসেছি।”
আঁধার আশেপাশে তাকিয়ে দেখে নিলো কেও আছে কি-না। নেই দেখে ফিসফিস করে বললো
-“হুজুর, একটা বশীকরণের দোয়া বলেদিন!”
উনি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বললেন
-“কাকে বশ করবি বাপ?”
-“একটা জেদ্দি কে! ত্যাড়ামিতে পিএচডি করে এসেছে।আমার একটা কথা শোনে না। প্লিজ এমন কোনো দোয়া বলুন যেটা পড়লে ও আমার সব কথা মেনে চলবে।আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। কোনো কথা অমান্য করবে না। আমার সাথে খুব সুন্দর একটা এটাচমেন্টে থাকবে।”
-“সোজা বাংলায় বল, কালো জাদু করতে চাচ্ছিস!”
আঁধার আঁতকে বললো
-“না, কালো জাদু না। এসব তো ভালো না। যার উপর প্রয়োগ করা হয় সে অসুস্থ হয়ে পরে। ও এমনিতেই মাসের মধ্যে পনেরোদিন অসুস্থ থাকে।অনেক উইক! আমি এটা বলছি না। শুধু চাই ওর মন আমার প্রতি নরম হোক। ও আমাকে ছাড়া কিছু না বুঝুক।”
-“কিন্তু এভাবে বশ করা কালো জাদুর মধ্যেই পরে। আর আমি তোকে কখনোই এসব কালো জাদু করতে দেবো না।”
-“কালো জাদু না? সেটা কেন হবে? নিজের মানুষের সাথে কেও কালো জাদু করে না। শুধু একটা দোয়া বলুন। কাউকে নিজের প্রতি দূর্বল করার দোয়া। আমি আসলে আর কোনো উপায় পাচ্ছি না। এতো ম্যান্যুপুলেট করার চেষ্টা করছি ওঁকে! তবুও আমাকে একটুও বুঝছে না ও। আপনি আমাকে চেনেন, ও আমার সাথে থাকতে না চায়লে আমি মেরে কেটে হলেও ওঁকে আমার সাথে রাখবো। দরকার হলে বেঁধে রাখবো, জোর করবো। কিন্তু ওঁকে আমার জোর করতে ইচ্ছে করে না। এমনিতেই ওর অনেক কষ্ট। ও কাঁদলে আমার ভালো লাগে না। আমি চাই ও আমার সাথে হাসিখুশি ভাবেই থাকুক।”
-“মানে ও তোকে অনেক ভালোবাসবে?”
-“হু,অনেকক।যতটা ভালোবাসলে ও আমাকে ছাড়া আর কিচ্ছু বুঝবে না। কোনো ছেলের দিকে তাকাবে না। কোনো ছেলের প্রতি ইন্টারেস্ট দেখাবে না। আমাকে এতোটাই ভালোবাসবে, যতটা ভালোবাসলে ওর অন্য কাওকে ভালোবাসার ইচ্ছেটাই মরে যাবে!”
হুজুর জুব্বার পকেট থেকে একটা রঙিন কলম আর টুকরো কাগজ বের করলেন। লিখে আধারের দিকে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বললেন
-“সকাল-সন্ধ্যা নামাজের পর পড়বি। এমনিতে যখন মন চায় পড়তে পারবি!নামাজ-কালাম পড়িস তো, না?”
আঁধার উত্তর দিতে পারলো না। ও নামাজ পড়ে না। ও কোনো ইবাদত পালন করে না। ও ঢাকায় ইট-পাথরের ভীড়ে নিজেকে, নিজের সত্ত্বাকেই ভুলে গেছে। নিজের পরিচয় ভুলে গেছে চাকচিক্যের আড়ালে।হায়ার ক্লাস বন্ধুবান্ধবের সাথে নিজের ক্লাস মেলাতে গিয়ে নিজের সব কিছু ভুলে গেছে। ওঁকে কেও শাসন করেনি। কেও শাসন করে, ঠিক ভুল দেখায়নি। সবসময় নিজের মতো থেকেছে।ভুলভাল কাজ করেছে। উচ্ছন্ন গেছে তো বহু আগেই। এখন এসব ও কী করে বলবে?
হুজুর বড্ড অসন্তুষ্ট হলেন ওর উত্তর না। অসন্তোষ নিয়ে বললেন
কাজলরেখা পর্ব ৩৯
-“তুই নামাজ পড়িস না?”
আঁধার মাথা নুইয়ে ফেললো। মাথা নেড়ে বললো
-“আজ থেকে পড়বো।”
-“সূরা মনে আছে?”
-“রিভাইস দেবো আজকে।”
-“সব ভুলে গেছিস?”
আঁধার দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হুজুর যাওয়ার আগে ওঁকে অনেক বোঝালেন। অন্যের মন নরম করার আগে, নিজের মন নরম করতে হবে।যে নিজের সৃষ্টিকর্তা কে ভুলে যায় সে আরেকজনের ভালোবাসা পাবে কী করে? আগে তাকে সৃষ্টিকর্তার ভালোবাসা অর্জন করতে হবে। তবেই না তার ভালোবাসার মহত্ব অন্য একজন বুঝবে৷
হুজুর চলে যাওয়ার পরও আঁধার বসে থাকলো সোফায়। কাগজ হাতে নিয়ে পড়তে থাকলো,
মন নরম করার দোয়া
“আল্লাহুম্মা আল্লিফ বাইনা কুলোবিনা।”
(”হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ও ঐক্য সৃষ্টি করে দাও।”)
