Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৯

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৯

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৯
সাইদা মুন

পেছন ফিরতেই দেখতে পেল এক মহিলা মেহরীনের চুল টেনে ধরে, তার গাল চেপে ধরে আছে । তালহা এগোতে নিলেই মহিলাটি মুহুর্তেই এক ধাক্কায় তাকে মাটিতে ফেলে দিল। ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল মেহরীন। সঙ্গে সঙ্গে আবার তেড়ে আসতেই তালহা বিলম্ব না করে, এক ঝটকায় তাকে নিচ থেকে তুলে নিয়ে নিজের বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরে।
তালহার চোখ রক্তাভ টকটকে হয়ে উঠেছে, শ্বাস ভারি হয়ে আসছে। মাথায় রাগে যেনো রক্ত টগবগ করছে। এ রাগ কোথা থেকে আসছে সে নিজেও জানে না। কিন্তু মেহরীনের গায়ে হাত পড়েছে, এই দৃশ্য তার ভেতরে ঝড় তুলেছে। মনে হচ্ছে মহিলার হাত দুটো চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে পারলে শান্তি লাগবে। বজ্রপাতের মতো গর্জন তুলে চিৎকার করে উঠল,

-“হাউ ডেয়ার ইউ! সাহস হলো কি করে ওর গায়ে হাত দেওয়ার?”
তালহার রুদ্রমূর্তি দেখে মহিলাটিও দ্বিগুন রেগে তেড়ে এল মেহরীনের দিকে, সঙ্গে লাঠি হাতে এক লোকও ছুটে আসছে। তালহা আরও শক্ত করে মেহরীনকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। হাত উঁচিয়ে রাগ উপচে পড়া কণ্ঠে আবারও গর্জে উঠল,
-“আর এক’পা এগোলে জেলের ভাত খাওয়াবো একেকটাকে”
সঙ্গে সঙ্গে দুজন থেমে যায়, মহিলাটি তেজি গলায় বলে উঠল,
-“এই ছেলে তুই কে রে? এ আমাদেএ মাইয়া, আমরা যা খুশি তাই করমু। তাতে তোর কি! এই নষ্টারে ছাড়, আজকে মাইরাই ফেলমু। গ্রামে আমাগোর মানসন্মান খুইচ্ছে।”
তালহা সমান তালে চেঁচিয়ে উঠল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

-“মুখ সামলে কথা বলুন। ওর গায়ে একটা ফুলের টুকা লাগালেও আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
এদিকে মেহরীন ভয়ে ফুপিয়ে কেঁদেই চলেছে। এক হাতে তালহার কোর্টের ভেতরের শার্ট মুঠো করে ধরে আছে, অন্য হাতে তার কোমর আঁকড়ে আছে। মুখটা এমনভাবে তালহার বুকে চেপে রেখেছে যেন ভিতরেই মিশে যেতে চাইছে।
তখনই মেহরীনের চাচি কটাক্ষ ছুড়ে দিলেন,
-“ওই পোলা, তোরে কি এই মাইয়া শরীর দিয়া হাত কইরা লাইছে? এর লাইগা তুই এত বড় বড় কথা কস? দেখেন দেখেন কি বেহায়া মাইয়া। সবার সামনে পোলার লগে চেপ্টা খাইয়া আছে! কইছিলাম না, এ মেয়ে বেডা নিয়া ভাগছে। দ্যাখগা কতো বেডার লগেই শুইছে।”
আশপাশে লোকজন ফিসফাস শুরু করেছে। এতো বাজে বাজে কথা শুনে তালহা আরও রেগে উঠে। সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠে,

-“মেহরীন আমার ওয়াইফ।”
কথাটা বলতেই আশেপাশের সবার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। মেহরীন চমকে উঠল। ভয় কান্না সব ভুলে ফট করে মাথা তুলে তাকাল তালহার মুখের দিকে। তালহা থেকে মেহরীনের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে আবারও বলল,
-“মেহরীন আমার বউ, আমার অর্ধাঙ্গিনী। তার কোনো কলংক নেই। সে পবিত্র, আমার পবিত্র ফুল। যার গায়ে-মনে কোনো অংশেই পাপের কোনো দাগ নেই। আছে শুধু নির্মলতা, স্বচ্ছতা।”
মেহরীন বিস্ময় নিয়ে শুনছিল প্রতিটি শব্দ। কী আছে কথাগুলোয় সে জানে না, তবে অন্তরে অচেনা এক আবেগ ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য বিজয়ের উল্লাস তাকে ভর করেছে। তালহার চোখে-মুখে যেন নিজের জন্য নতুন কিছু দেখছে। তার চাহনি মেহরীনের ছোট্ট মনের মধ্যে এটাই প্রবেশ করছে, তালহা তাকে বউ হিসেবে মেনে নিয়েছে। মনের মধ্যে নাড়া দিয়ে উঠে, তালহা তারই থাকবে, শুধুই তার।
তালহা মেহরীনের থেকে চোখ সরিয়ে তার চাচির দিকে তাকাল,

-“আমার স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করার যোগ্যতা আপনার মতো মহিলার নেই। নিজের যোগ্যতায় থাকবেন।”
বলেই আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মেহরীনকে সবার সামনেই কোলে তুলে নিল। গাড়িতে বসিয়ে নিজেও ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে পড়ল। মুহূর্তেই গাড়ি স্টার্ট দেয়। এদিকে মেহরীনের চাচি থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাগে শরীর কাঁপছে, যেন তাদের মুখে জুতা মেরে চলে গেছে। চারপাশে লোকজন বলাবলি করছে “মেহরীনের তো ভাগ্য খুলেছে। এমন বড়লোকের ছেলেকে বিয়ে করেছে। ভালোই হয়েছে, এমন অত্যাচারী চাচির হাত থেকে বেঁচে গেল।” এবার যেনো আস্তে আস্তে সবার মুখ খুলছে। মেহরীনের প্রতি করা লাঞ্ছনা, অবহেলা, সবই লোকজন বলতে শুরু করেছে। চাচা-চাচির মুখোশ খুলে যাচ্ছে দেখে চুপসে যায়। সম্মান বাঁচাতে মুখ গুঁজে সরে যায় সেখান থেকে।

তালহা ফুল স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। মেহরীন মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। চোয়াল শক্ত করে সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে গাড়ি চালাচ্ছে তালহা। এখনও রাগে ফুঁসছে, বোঝাই যাচ্ছে। মেহরীনের মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে, জিজ্ঞেস করতে চাইছে, কিন্তু তালহার কঠোর মুখ দেখে সাহস জোগাতে পারছে না। তাই নীরবতা রেখেই আশেপাশের রাস্তা দেখছে।
গাড়ি ছুটছে হাইওয়ে রোডে। আকাশে যেন ভারি আবহ নেমে এসেছে। চারপাশ অস্বাভাবিক নীরব, গাছের পাতায় অস্থিরতা খেলে যাচ্ছে। বাতাস থমথমে, ভারি হয়ে উঠছে, মাঝে মাঝে ঝোড়ো দমকা হাওয়া এসে মাটির গন্ধ উড়িয়ে দিচ্ছে। রাতের আকাশে কালো মেঘ জমে আরও অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে। যেন বৃষ্টির আগমনী বার্তা।
পরিবেশ দেখে তালহা বিরক্ত কণ্ঠে বলল,

-“ড্যামিট, তোমার জন্য গাড়ি নিয়ে আসিনি। দেখে তো মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে যেকোনো সময়।”
তালহার কথায় মেহরীন মুখ গুটিয়ে বসে রইল। ইতিমধ্যেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। তালহা গাড়ির স্পিড আরও বাড়িয়ে দিল। আশপাশে নির্জন রাস্তা, কোথাও হোটেল তো দূরে থাক, ঘরবাড়িরও দেখা নেই। বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে, একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি শুরু। প্রায় পাঁচ মিনিট পর একখানা বাড়ির দেখা মেলে। তালহা আর দেরি না করে গাড়ি রাস্তার ধারে রেখে মেহরীনকে নিয়ে ছুটে গেল সেদিকে।
গেটের সামনে এসে তালহা একবার মেহরীনকে পরখ করে নিলো। ভেজা কাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। নিজের হাতেই তার মাথায় দেয়া ওড়নাটা টেনে কোমর অব্দি শরীর ঢেকে পেচিয়ে দিয়ে বলল,
-“আমার পিছে দাঁড়াবে। একদম উঁকি-ঝুঁকি দেবে না। আগে দেখি ভেতরে কে আছে।”
মেহরীন ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। তালহা তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা দিল। তিন-চারবার ধাক্কানোর পর ভেতর থেকে এক বয়স্ক পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এলো,

-“কে রে এতো রাতে?”
বলতে বলতেই দরজা খুলল। আধভেজা যুবককে দেখে কপাল কুঁচকে গেল তার,
-“কি চাই বাবা?”
তালহা ভদ্রতার সুরে বলল,
-“আসসালামু আলাইকুম আংকেল, আসলে বিপদে পড়েছি। এই বৃষ্টিতে আটকে গেছি। আশপাশে কোনো হোটেল নেই। আপনার বাড়িই চোখে পড়লো, তাই ভাবলাম আপনার এখানে…”
তখন ভেতর থেকে এক বৃদ্ধা উঁকি দিয়ে হেসে বললেন,

-“বুঝেছি, বুঝেছি। সমস্যা নেই, আসো ভেতরে আসো। আজ রাত বুড়ো-বুড়ির সাথেই কাটাও।”
তালহা হেসে মাথা নাড়ল, তারপর পেছন থেকে মেহরীনের হাত টেনে সামনে আনে। মেয়েটিকে দেখে তাদের মুখের হাসি ম্লান হয়ে গেল। তাদের সন্দেহ আঁচ করে তালহা তাড়াতাড়ি বলল,
-“ভুল বুঝবেন না, ও আমার ওয়াইফ।”
শুনে তারা আশ্বস্ত হয়ে সরে দাঁড়ায়। দুজন ভেতরে ঢুকে পড়ে।
রাত তখন ১২টা। মেহরীন দাঁড়িয়ে আছে বৃদ্ধার সামনে।
-“এটাই পড়ে নাও। আমি তো শাড়ি ছাড়া কিছু পড়ি না, তোমাকে জামা কোথা থেকে দেব রে মা?”
মেহরীন মুখ ছোট করে বলল,
-“কিন্তু আমি তো শাড়ি পড়তে পারি না।”
মহিলাটি হেসে ব্লাউজ আর পেটিকোট হাতে ধরিয়ে দিলেন,
-“কম বয়সে বিয়ে হয়েছে বুঝি?”
মেহরীন মাথা নাড়ল।

-“যাও, এগুলো পরে আসো। আমি শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছি। ভেজা কাপড়ে ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”
মেহরীন বাধ্য মেয়ের মতো গিয়ে ব্লাউজ-পেটিকোট পরে আসে। মহিলাটি তাকে মেরুন রঙের সুতির শাড়ি সুন্দর করে পরিয়ে দিলেন। তারপর নিয়ে গেলেন মাঝের ঘরে, যেখানে তালহা আর বৃদ্ধ লোকটা বসে আছেন।
মেহরীন সামনে এগোতেই চোখে পড়ল তালহাকে। লুঙ্গি আর সেন্টু গেঞ্জি পড়া। হয়তো ওই লোকেরই জামা। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সে। এই প্রথম লুঙ্গিতে দেখল তালহাকে, অথচ অদ্ভুতভাবে সুন্দর লাগছে। যেন প্রকৃত বাঙালি বর। গেঞ্জিতে তার সুঠাম দেহ আরও ফুটে উঠেছে। বাহুর পেশীগুলো স্পষ্ট। সে হেসে হেসে গল্প করছে কিছু একটা নিয়ে। সব মিলিয়ে মেহরীনের হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠল। মনে মনে ভাবছে, একজন মানুষকে সব কিছুতেই কিভাবে ভালো লাগতে পারে। এটা কি কেবল তার ভালোবাসার চোখে দেখছে বলে, নাকি সত্যিই সে অসাধারণ?
তার ভাবনা কাটে মহিলার কথায়,

-“তুমি এখানে বসো ওদের সাথে, আমি কিছু খাবারের ব্যবস্থা করি। না খেয়ে আছো নিশ্চয়ই।”
কথাটা শুনে তালহা না করতে পাশ ফিরতেই থমকে যায়, মেহরীনের দিকে তাকিয়ে। চোখ আটকে যায় তার উপর। এই প্রথম সে মেয়েটাকে সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করছে। শাড়ি গায়ে কেমন যেনো প্রাপ্তবয়স্ক লাগছে, বড় হয়ে উঠেছে যেনো। বুকের ভেতর ধকধক করে ওঠে তার, অজান্তেই ঢোক গিলে কয়েকবার। কই, আগে তো কতবারই তাকিয়েছে, তখন তো এমন লাগেনি, বাচ্চা মেয়েই মনে হতো। আজ হঠাৎ এতো পরিণত বয়সি মেয়ে লাগছে কেনো। এতো বউ-বউ লাগছে কেনো। শাড়ি পড়ায়?
তালহার ধ্যান ভাঙে বৃদ্ধ লোকটার কথায়,
-“চলো খাবার খেয়ে নিবে।”
বলেই তিনি উঠে যান। মেহরীন দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই। তালহা তার দিকে তাকিয়েই আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে এখনো অবাকতার রেখা। সেই লোকের পিছু নিতেই হালকা গলায় বলল,

-“চলো…”
তালহার কথায় মেহরীনও তাদের সাথে যায়। সবাই বসে আছে টেবিলে। তালহারা খাচ্ছে আর বয়স্ক দম্পতি বসে বসে এটা-সেটা গল্প করছে। তালহাও সহজ সুরে, হাসিমুখে কথা বলছে খাবারের ফাঁকে।
তবে, বিপত্তি ঘটে থাকা নিয়ে। তাদের দুটো রুম, একটিতে তারা থাকেন, আরেকটা খালি। খালিটাতেই তালহাদের থাকতে দিয়েছে। দুজনেই একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। এক ঘরে থাকার কথা শুনে অস্বস্তি বেড়ে যায়। তালহা কিছুটা ইতস্তত করলেও আর কিছু বলে না, যদি আবার সন্দেহ করে বসে। তাই চুপচাপ তাদের দেওয়া রুমে ঢুকে পড়ে।
মেহরীনের বুক ধুকপুক করছে। তালহার সাথে এক ঘরে, ভাবতেই গা শিরশির করছে। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে, যদিও সেটা অপছন্দ থেকে নয়। তবুও হুট করে একটা ছেলের সাথে এক রুমে। এরমধ্যেই দরজা আটকানোর শব্দে চমকে উঠে দাঁড়ায়,

-“দ..দরজা লাগাচ্ছেন কেনো?”
তালহা কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে,
-“দরজা খুলে রাখলে সন্দেহ করতে পারে।”
মেহরীন কিছু না বলে কাচুমাচু হয়ে গিয়ে বসে পড়ে বিছানার এক কোণায়। তালহা এগিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসে তার অস্থিরতা দেখে বলল,
-“তুমি বিছানায় ঘুমাও।”
মেহরীন ফট করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
-“আর আপনি?”
-“আমি এখানেই রাত কাটিয়ে দিতে পারবো।”
চেয়ারে বসে কেমন করে রাত পার করবে সেটা ভাবতেই মেহরীনের চোখ পড়ে বিছানায়। আমতা-আমতা করে বলল,

-“আপনি চাইলে বিছানায় ঘুমোতে পারেন, বড়ই আছে খাট।”
তালহা সোজাসুজি বলল,
-“না।”
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
-“কেনো?”
তালহা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“এমনি… তুমি বুঝবে না। ঘুমাও কথা না বলে।”
কথাটা বলেই সে অন্যদিকে ঘুরে ফোন টিপতে থাকে। মেহরীনও আর কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। মাথায় তবুও ঘুরপাক খাচ্ছে, কি এমন হবে বিছানায় শুলে। হঠাৎ মাথায় কিছু আসতেই দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে বলল,
-“আপনি কি লুঙ্গি নিয়ে চিন্তা করছেন? আরে আসুন শুয়ে পড়ুন, আমি আপনার ঘুম ভাঙা অব্দি আপনার দিকে তাকাবো না। কিছু দেখবো না।”

এমন কথায় তালহা মোবাইল নামিয়ে চকিত নয়নে তাকায়। কেমন যেনো লজ্জা পেয়ে যায় সে। কি সব বলে এই মেয়ে। মেয়েটা একেবারে খোলামেলা, যা মুখে আসে বলে ফেলে। তবে সে কি এজন্যই বলছিলো? এক বিছানায় ছেলে-মেয়ে থাকা যায় নাকি। তার ওপর শাড়ি পড়ে আছে, তার কেমন অদ্ভুত লাগছে। কড়া চোখে বলল,
-“বেশি কথা না বলে চুপচাপ ঘুমাও।”
মেহরীন দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তবে তার চিন্তা থেমে থাকে না। বারবার ভাবছে, তালহা কি তাকে সত্যিই বউ হিসেবে মানে? নাহলে তখন সবার সামনে এমন বলল কেনো? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু তার রাগের ভয়ে সাহস পাচ্ছে না। এদিকে তালহার চোখও বারবার ঘুরে ফুরে এসে থামছে মেহরীনের ওপর।
তাকে এভাবে অস্থির হতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

-“কোনো সমস্যা?”
মেহরীন মাথা নেড়ে না বোঝায়।
তালহা বলল,
-“তাহলে এতো নড়াচড়া করছো কেনো? গরম লাগছে?”
মেহরীন সাহস সঞ্চয় করে বলে,
-“আসলে একটা প্রশ্ন…”
তালহা কৌতূহলী হয়ে তাকায়,
-“কি?”
মেহরীন উঠে বসে তার দিকে তাকায়,
-“আপনি তো বলেছিলেন এই বিয়ে মানেন না।”
-“হুম, তো?”
-“তো আপনি তখন সবার সামনে আমাকে বউ বলে পরিচয় দিলেন কেনো?”
তালহা কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে তার চোখের দিকে। মেয়েটির চঞ্চল চাহনি। শান্ত গলায় বলে,
-“তোমাকে তাদের হাত থেকে বাঁচাতেই বলেছিলাম।”
মেহরীনের মন খারাপ হয়ে যায়। নিচু স্বরে বলে,
-“ওহ, তাহলে মিথ্যা বলেছেন।”
তালহা গম্ভীর কণ্ঠে,

-“মিথ্যা কোথায়! যা বলেছি তা সত্যই। তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়েছিলো ভুলে গেছো?”
মেহরীন তাচ্ছিল্য করে বলে,
-“কিন্তু আপনি তো আমাকে বউ হিসেবে মানেন না, তাহলে বিয়েটা কিভাবে স্বীকার করছেন?”
তালহা চুপ হয়ে যায়। মেয়েটাকে আজ কেমন সব দিক দিয়ে পরিণত লাগছে। তার প্রশ্নগুলোও কেমন জটিল, গভীর। তালহার জবাব না পেয়ে মেহরীন হঠাৎ বলে উঠল,
-“আমাকে মেনে নিলে কি হয়?”
বলেই সাথে সাথে নিজের মুখেই নিজে হাত দেয়। ভয়ে ভয়ে তাকায় তালহার দিকে। কিন্তু তালহা শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। তবুও মেহরীনের মনে হচ্ছে, এখনই হয়তো চিৎকার করে উঠবে। নিজেকে গালাগালি দিচ্ছে, কেনো তার মনের কথা মুখ ফসকে বের হয়।
তালহা স্বাভাবিক সুরে উত্তর দেয়,

-“তুমি অনেক ছোট। আমাদের বয়সের ফারাক ১১ বছর।”
তার জবাবে মেহরীন সাহসী গলায় বলে,
-“তো বয়স দিয়ে কি হয়? আমাদের গ্রামে তো আমার থেকেও ছোট মেয়েদের বিয়ে হতো ৩০-৩২ বছরের পুরুষদের সাথে। তারা তো সংসার করছে ঠিকই।”
তালহা একদৃষ্টে তাকিয়ে তার দিকে। আগেই আন্দাজ করেছিল মেহরীন তার প্রতি দুর্বল, কিন্তু আজ নিশ্চিত হলো। চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
-“বয়স আমার কাছে অনেক কিছু মিন করে।”
-“কেনো?”
তালহা তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,

-“খুব অল্প বয়সেই বাবা হারিয়ে পরিবারের হাল ধরেছি। বড় ছেলে হওয়ার কারণে মা-বোনকে আমারই সামলাতে হয়েছে। মা ভেঙে পড়লে আমিই তাকে সামলাই। ছোট বোন সারাক্ষণ বাবা-বাবা করত, কেনো আসে না জিজ্ঞেস করত। তাকেও আমিই সামলেছি। এখনো তাদের একমাত্র ভরসা আমি। তাদের এই পরিবার সব আমি সামলে নেই। তবে আমাকে? আমাকে সামলানোর মতো কেউ নেই। আমি সবাইকে সামলাই, কিন্তু আমাকেই যে আমার মতো করে কেউ সামলাবে, তেমন কেউ নেই।”
মেহরীন বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। শক্তপোক্ত এই লোকের গলা কেমন ভেঙে আসছে। তার বলা প্রতিটি শব্দ বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছে। তালহা আবার বলে,
-“দিনশেষে আমার দরকার এমন একজন, যে সত্যি আমাকে বুঝবে, সামলাবে। যার সামনে আমি আমার কঠোরতা ভেঙে শিশুসুলভ আচরণ বা দুর্বলতা দেখাতে পারবো, ভুল বুঝার ভয় ছাড়াই। এক কথায় সে শুধু আমার জীবনসঙ্গিনী নয় ফ্রেন্ড ও হবে।”
মেহরীন মৃদু স্বরে বলল,

-“আমি আপনাকে সামলাবো।”
শুনে তালহা হেসে এগিয়ে এলো,
-“তুমি এখনো আবেগ-বিবেক বোঝো না, আবার আমায় বুঝবে? দেখা গেলো উল্টো তোমাকেই বুঝিয়ে শুনিয়ে আমার বড় করে তুলতে হবে। একটু রাগ করলে ভ্যা ভ্যা করে কান্না শুরু করবে। সামলানো তো দূরে থাক, তখন উল্টা তোমাকেই সামলাতে হবে আমায়। বিকজ তুমি এনাফ ম্যাচিউর না।”
তার কথায় মেহরীন মাথা নিচু করে নেয়। তবুও মৃদু গলায় বলে,

-“আমি বাচ্চা নই। আমি যথেষ্ট বড়। আমি সব বুঝি, সত্যিই আপনাকে সামলাতে পারবো।”
তা শুনে তালহার মুখে হাসি আরও প্রশস্ত হয়। কথাগুলো শিশুসুলভ হলেও তার ভেতর অন্যরকম ভালো লাগা আছে।
হঠাৎ সে বিছানার দিকে এগোয়। মেহরীন ভড়কে তাকায়। সে যত এগোয়, মেহরীন তত পিছোয়। তালহা এভাবে এগোচ্ছে কেনো ভাবতেই, হার্টবিট যেনো বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। শ্বাস ভারি হয়ে যাচ্ছে। খাটের সাথে ঠেকে যেতেই আতঁকে ওঠে, চোখ মুখ আঁকড়ে ধরে, আঁচল খামচে ধরে বসে থাকে।
তালহা শব্দ করে হেসে বিছানার অন্য পাশে শুয়ে পড়ে,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮

-“এইটুকুই সামলাতে পারলে না আবার আমাকে সামলাবে? পুচকি মেয়ে, নাকে টিপ দিলে দুধ বের হবে, সে আবার আমার দায়িত্ব নেবে সখ। ঘুমাও এবার।”
তালহার কথায় লজ্জায় চোখ তুলে তাকায় মেহরীন। আর কিছু বলে না, গুটিসুটি মেরে অন্য পাশে শুয়ে পড়ে। লজ্জায় তার কান-গাল জ্বলে যাচ্ছে। সারা রাত ভীষণ অস্থিরতায় কেটে যায় তার। তালহা যখন কাছে এসেছিলো, শরীরজুড়ে যে অচেনা কাঁপন জেগেছিলো, তা ভাবতেই তার বুক ধড়ফড় করে ওঠে, কান-গাল আগুনের মতো গরম হয়ে যায়….

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ১০