প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১২
আরাফাত আদনান সামি
মায়া নিভু নিভু চোখে ফোনটা হাতে তুলে কল রিসিভ করে বলল,
“কে? কে বলছেন আপনি?”
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“শালি তোর ভবিষ্যৎ সোয়াবি বলছি।”
“মানে? ফাজলামো করার আর জায়গা পান না? একে তো ঘুমের সময় ফোন করে আমার ঘুমটা নষ্ট করেছেন, তার ওপর কীসব উল্টাপাল্টা বলছেন। এই ভাই, কে আপনি? নামটা বলতে পারেন না?”
ওপাশ থেকে কৌশিক দাঁতে দাঁত পিষে ধমকের স্বরে বলল,
“শালী, তুই তোর ‘ছাইয়া’র বদলে ‘কৌশিক ভাইয়া’ বলে যারে ডাকিস, সেইই আমি।”
কথাটা কানে পৌঁছাতেই মায়া যেন আচমকা বজ্রাঘাতে চমকে উঠল। এক লাফে উঠে শুয়া থেকে উঠে বসল বিছানায়। কিছুক্ষণ আগেও চোখে লেগে থাকা ঘুমের কণা মুহূর্তেই কল্পনার জগতে গলে মিলিয়ে গেল। কৌশিকের কণ্ঠে বিরক্তির রেশটা সে স্পষ্টই টের পেল। এতদিনে সে তাকে বেশ চিনে ফেলেছে কৌশিকের গলায় এমন টান মানেই রাগ তুঙ্গে।
ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠল মায়ার। কাঁপা গলায় আমতা আমতা করে বলল,
“কৌ… কৌশিক ভাই, আপনি?”
একটু থেমে সাহস জুগিয়ে আবার বলল,
“না মানে… আপনিই তো! কিন্তু আমার নাম্বার পেলেন কোথা থেকে?”
ওপাশে হঠাৎই এক বিস্ফোরণ। কৌশিকের গলা রাগে থরথর করে উঠল,
“ফোন করছি, আগে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করবি, তুই তার বদলে জিজ্ঞেস করতাছোস তোর নাম্বার পাইলাম কই? শ্লার কপাল আমার!”
মায়া কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“সরি সরি… তা ভাইয়া, কেমন আছেন আপনি?”
কৌশিক গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“ভালো না।”
মায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেনো?”
“এই মন শুধু তুই তুই করে কিন্তুই তুইই তো কাছে নেই তাহলে ভালো থাকবো কীভাবে?একটা কাজ করি আজ রাতে আবার আসি, জান।”
“এই এই, খবরদার! একদমই আসবেন না, বলে দিলাম।”
“কেনো? আমার কথা, আমার আদর এইসব মিস করিস না তুই? আমি তো খুব মিস করছি তোকে।”
“নাহ্।”
মায়ার কথা শুনে কৌশিকের কণ্ঠ রাগে থরথর করে উঠল,
“শালি কী বললি তুই?”
“আরে আরে, এত রাগ করার কী আছে? মেয়েদের ‘না’ মানেই তো ‘হ্যাঁ’, এটাও বুঝেন না আপনি?”
“ওহ্ তাই বল। তাহলে আজ রাতে তোমাদের বাড়িতেই চলে আসছি আমি।”
“এই না!”
“তার মানে হ্যাঁ?”
“কোন হ্যাঁ-ট্যা না! ‘না’ মানে একেবারে না।”
“কিন্তু কেনো?”
“আপনি আদৌ কিছু বুঝেন?”
“কী বুঝবো?”
“কিছু না… বাড়িতে আসার কোনো দরকার নেই।”
মায়ার কথাটার শেষ হওয়া মাত্র কলের এপাশ থেকে ওপাশে নেমে এলো এক অদ্ভুত নীরবতা। কৌশিককে কিছু বলতে না দেখে মায়ার বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা আশঙ্কা জন্ম নিল। একটু আমতা আমতা করে সে বলল,
“কিছু বলছেন না কেনো কৌশিক ভাই? রাগ করলেন নাকি?”
কৌশিক হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কী বলবো? আর আমি কোন রাগ টাগ করি নাই।”
“তাহলে ঠিক আছে।ওই শুনেন না…”
“কী?”
চোখে একরাশ ঝিলিক নিয়ে মায়া বলল,
“জানেন, আমাদের বাসা থেকে একটু দূরে বড় একটা মেলা বসেছে।”
ফোনের ওপাশ থেকে কৌশিক শান্ত স্বরে বলল,
“তো?”
মায়ার শিশুসুলভ অনুরোধের স্বরে বলল,
“তো আবার কী?মেলায় আমাকে নিয়ে যান না, কৌশিক ভাই…”
“পারবো না।”
“নিয়ে যান না প্লিজ প্লিজ।”
“কেন তোর পা নাই?”
“আছে তো।”
কৌশিক নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“তাহলে পা দুটো ব্যবহার করে চলে যা।”
“না,না আমি আপনার সাথে মেলায় যাবো।”
“না আমি নিয়ে যাবো না তোকে।”
কৌশিকের মুখের দৃঢ় উত্তরটা শুনে মায়ার মুখটা মুহূর্তেই গোমড়া হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে নিচু চোখে তাকিয়ে সে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“আপনি আমাকে মেলায় নিয়ে যাবেন না?আপনি নিয়ে যাবেন আপনার চৌদ্দ গুষ্টি নিয়ে যাবে। দেখি এবার না করেন কীভাবে।”
মায়ার চোখে মুখে দুষ্টুমির ঝিলিক খেলে গেল। ঠোঁটের কোণে একটা ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। নিজের ভেতরের সেই জেদটাকে এবার একটু নরম করে মিষ্টি স্বরে সে বলল,
“মেলায় না নিয়ে গেলে কিন্তু অনেক মিষ্টি চেয়েও মিষ্টি কিছু মিস করে ফেলবেন, কৌশিক ভাই…”
“মানে?”
“মানে হলো এই যে, আমাকে যদি আপনি মেলায় নিয়ে যান তাহলে আপনাকে আমি…”
কৌশিক এবার কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ফোনের ওপাশ থেকে বলল,
“কী?”
মায়া মনে মনে বলল,
“এই তো বাছা, এবার পথে এসো।”
ফোনের ওপাশ থেকে কৌশিক খানিকটা অস্থিরতা ভরা কণ্ঠে বলল,
“কী হলো পুরো কথাটা শেষ কর।”
“কিস…”
কৌশিকের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“কিস?মানে তোকে মেলায় নিয়ে গেলে আমাকে কিস করবি?”
মায়া গাল লাল করে লাজুক স্বরে বলল,
“হ্যাঁ…”
“সত্যি বলছিস তো?”
মায়া ভ্রু কুঁচকে মুখ ফিরিয়ে নিল,
“এক কথা বারবার বলতে পারবো না।”
কৌশিক হেসে ফেলল, ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলল,
“আচ্ছা জান, তাহলে তুই রেডি হয়ে বাড়ির পিছনের গেইটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকিস। আমি সেখানেই আসবো তোকে নিতে।”
“আচ্ছা।”
“আচ্ছা তাহলে আমি ফোন রাখছি।”
“এই আরেকটা কথা শুনেন।”
“কী?”
“সাবধানে আসবেন।”
“উফ্ জান তুই আমাকে নিয়ে কত চিন্তা করিস!ঠিক আছে সাবধানে আসবো,ফোন রাখলাম।”
“আচ্ছা।”
মায়া কথাটা বলতেই কৌশিক ফোনটা কেটে দিল। ঠিক সেই সময় কৌশিকের ঘরে ঢুকল রোহিত।
রোহিত বলল,
“কী করছো, কৌশিক ভাই?”
কৌশিক উত্তর দিল,
“কী আর করবো! তোর ভাবি নাকি মেলায় যাবে, সেখানেই নিয়ে যেতে হবে। তুই যাবি আমার সাথে?”
রোহিত হেসে বলল,
“না ভাই, থাক। আমি কেন কাবাব মে হাড্ডি হতে যাব তোমাদের মাঝে? তোমরাই যাও।”
“আরে সমস্যা নেই। তুই না বলে তোর ভাবিকে দেখবি?তাহলে চল, আমার সাথে চল।”
“না ভাই, তোমাদের এত সুন্দর সময়ের মধ্যে আমার না যাওয়াটাই ঠিক হবে।”
“আচ্ছা, তোর যা ইচ্ছা। শুন, যেহেতু তুই যাচ্ছিস না, তাহলে এদিকটা একটু দেখে-শুনে রাখিস।”
“সেটা আর বলতে! তুমি নিশ্চিন্তে যাও।”
“আচ্ছা।”
এরপর কৌশিক রোহিতের সাথে কথা বলতে বলতে কালো স্যুট ও কালো প্যান্ট পরে প্রস্তুত হয়ে নিল। সাইড টেবিল থেকে বাইকের চাবি তুলে নিয়ে রোহিতকে বিদায় জানিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল।
প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল। এদিকে মায়া অনেক আগেই হাত-মুখ ধুয়ে মায়ের লাল রঙের একটা শাড়ি অনেক কষ্টে পরে সুন্দরভাবে হালকা সেজে গুজে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরপর জানালা দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তার কৌশিক ভাই এসেছে কি না, সেটাই দেখার জন্য। এভাবেই আরো অনেকক্ষণ কেটে গেল। অপেক্ষার ক্লান্তিতে মায়া যখন প্রায় বোর হয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার ফোনে সাদা আলো জ্বলে উঠল একটা বাজতে থাকা গানের সুরের সাথে। ফোনটা হাতে নিয়েই সে দেখল, সেই আগের নম্বর মানে তার কৌশিক ভাই ফোন করেছে। অবশেষে মনে হলো, মেয়েটির দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটল।
হাসিখুশি মুখে কল রিসিভ করল মায়া। ফোনের ওপাশ থেকে কৌশিকের কণ্ঠ ভেসে এল,
“জান, কোথায় তুই?”
মায়া মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“এই তো, বাসায়। আপনি কোথায়?”
“আমি তোকে বলেছিলাম না, তোদের বাড়ির পিছনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে?”
“আরে সমস্যা নেই। ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসায় আব্বু-আম্মু কেউ নেই। একটা কাজ করুন, আপনি বাড়ির মেইন গেটের সামনে চলে আসুন।”
“আচ্ছা, ঠিক আছে।”
“আচ্ছা।”
মায়া কথাটা বলতেই কৌশিক ফোনটা কেটে দিল। এদিকে মেলায় যাওয়ার খুশিতে উচ্ছ্বসিত মায়া সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নিচে নেমে এল। অবশেষে বাড়ির গেটে তালা মেরে চাবিটা দারোয়ানের হাতে দিয়ে এক দৌড়ে সোজা বাড়ির বাউন্ডারির মূল গেটের সামনে চলে এল।গেটে এসে সে আস্তে করে দরজাটা একটু খুলে বাইরে তাকিয়ে কৌশিক ভাইকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোথাও কৌশিক ভাইয়ের দেখা নেই। মায়া আরেকটু গেট খুলে চারপাশে ভালো করে চোখ বুলাল, তবু তার কৌশিক ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই।গেটের বাইরে কৌশিককে দেখতে না পেয়ে মায়ার মনে হালকা ভয় ধরল। এবার সে পুরো দরজাটা খুলে বাইরে পা রাখার মুহূর্তেই হঠাৎ করে কেউ একজন তার হাত শক্ত করে ধরে টান দিল। আচমকা টানে ভারসাম্য হারিয়ে সোজা ধাক্কা খেল সে, আর সেই ধাক্কায় তার শরীর গিয়ে পড়ল শক্তপোক্ত, জিম করা কারও বুকের উপর।
মায়া ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকাতেই তার মুখ লজ্জায় সাথে সাথে নিচু হয়ে গেল। গলা কাঁপতে কাঁপতে লজ্জা-জড়ানো স্বরে বলল,
“কৌ… কৌশিক ভাই, আপনিও না! আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম…”
কৌশিককে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মায়া ধীরে চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। কিন্তু মুহূর্তেই আবার লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। আর করবে না-ই বা কেন? কৌশিক একনজরে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঠিক তার দিকেই।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মায়া আস্তে করে বলল,
“এইভাবে কী দেখছেন কৌশিক ভাই? আমার খুব লজ্জা লাগছে কিন্তু…”
কৌশিক তখনও তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে বলল,
“মাশাআল্লাহ… মাশাআল্লাহ… মাশাআল্লাহ…”
কৌশিকের মুখের কথা শুনে মায়া ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
“কী বিড়বিড় করছেন আপনি?”
কৌশিক মায়াকে আরও একটু কাছে টেনে এনে হালকা ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকাল। মুচকি হেসে নরম স্বরে বলল,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১১ (২)
“চিকন ওই ঠোঁটে লাল লিপস্টিক,
টানা টানা চোখে কাজল,
গোলাপি দুই গাল,
গাল’ভরা হাসি, পরনে লাল শাড়ি,
মেঘ’ঘন কেশ…
উফ্ জান, সব মিলিয়ে আমার জীবন শেষ!”
