Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৮

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৮

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৮
নুরিয়া ইসলাম

বেভারলি হিলস ঝলমলে এক আলোর শহর। রাতের বেলা বেভারলি হিলসের পরিবেশটা খুবই শান্ত থাকে।বিলাসবহুল বাড়িগুলো নরম আলোয় ঝলমল করে, চারপাশে নিস্তব্ধতা বিরাজ করে, শুধু দূর থেকে শহরের আলো ঝিলমিল করে।

এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই প্যাম গাছের সারি ভেদ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এরিকদের বিশাল সানরাইজ ম্যানশনটি। বাইরে গেট থেকে শুরু করে পুরো ম্যানশন জুড়ে সোনালী আর সিলভার ফেয়ারি লাইট, ঝুলছে বিশাল ক্রিস্টাল চ্যান্ডেলিয়ার, আর মার্বেল ফ্লোরে লাইটের রিফ্লেকশনে চোখ ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা।
বাগানে LED স্পটলাইটে গাছপালা আলোকিত, গাছের ডালে ঝুলছে ছোট ছোট লণ্ঠন, আর মাঝখানে ফুলে সাজানো টেবিল।বাগানের মাঝখানে রাখা হয়েছে ফুলশয্যার মতো সাজানো বিশাল টেবিল, টেবিলের ওপর রঙিন ফুলের তোড়া, আর পাশে ছোট ছোট ঝর্ণা পানির শব্দে বাগানটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
কেকগুলো রাখা হয়েছে মার্বেল টেবিলের ওপর, প্রতিটা কেকের ওপরে সোনালী চকোলেটে “Happy Birthday Eric” লেখা,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

কেকের চারপাশে রঙিন ক্যান্ডি, চকোলেট আর ফুলের ডিজাইন করা।
এরিকের জন্মদিন উপলক্ষে মিস্টার রিচার্ড অ্যাসফোর্ড আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শহরের নামকরা সব বিজনেস টাইকুনকে।এছাড়াও পার্টিতে উপস্থিত আছে অলিভিয়া, এলিনা, অ্যালেক্স, অ্যারেনসহ আরো বন্ধুরা সবাই একসাথে বাগানের ঝলমলে সাজে মুগ্ধ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই এরিকের আগমন ঘটে, কালো সিল্ক শার্ট, ওপরে লেদার জ্যাকেট, ডার্ক জিন্স, হাতে সিলভার চেইন আর চোখে হালকা শেড তাকে দেখতে একেবারে হলিউড হিরোদের মতো লাগছে। এরিককে দেখে অলিভিয়া ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি কন্ঠে বলে,

“বেইবি, হ্যাপি বার্থডে!”
কিন্তু আজ অলিভিয়ার আলিঙ্গনে এরিকের মনে অজানা অস্বস্তি জেগে উঠে । তাইতো সে ধীরে অলিভিয়াকে সরিয়ে দেয়, নিজের আচরণে সে নিজেই অবাক হয়ে যায়-এর আগে তো এমন কখনো হয়নি!নিজের মনে সে বিড় বিড় করে বলে,
“এক মিনিট…আমি কী বদলাচ্ছি? হাস্যকর।
না,আমি এরিক অ্যাসফোর্ড। আমাকে কেউ বদলাতে পারে না, কেউ না।
সব গড়বড় ওই মেয়েটার জন্য?
হা, ও আসার পর থেকেই সব বিষিয়ে গেছে।
কিন্তু আমি? আমি কারো জন্য বদলাই না, এটা ওই মেয়েটার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে।
অলিভিয়া এরিকের আচরণে কিছুটা অবাক হলেও, সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না। ঠিক তখনই মিস্টার রিচার্ডের গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা শোনা যায়,

“লেডিস এ্যান্ড জেন্টেলম্যান, এ্যাটেনশন প্লিজ। আজ আমার একমাত্র ছেলে এরিকের জন্মদিন। এই আনন্দের দিনে আমি আপনাদের সঙ্গে দুটো বিশেষ খবর শেয়ার করতে চাই।”
পার্টির ঝলমলে আলোয় অতিথিদের কৌতূহলী দৃষ্টি নিবদ্ধ মিস্টার রিচার্ডের দিকে।
তিনি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে গম্ভীর অথচ গর্বিত কণ্ঠে বলেন,
“আমার ছেলে এরিক শীঘ্রই Vertex Dynamics-এর পরবর্তী CEO হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে চলেছে।
আরেকটি আনন্দের খবর হলো, Vertex Dynamics ও Silvergate Industries বহু বছর ধরে পার্টনারশিপে কাজ করছে।

এই পার্টনারশিপকে চিরস্থায়ী করতে আজ আমি আমার প্রিয় বন্ধু স্ট্যান স্মিথের একমাত্র কন্যা, অলিভিয়া স্মিথের সঙ্গে এরিকের আনুষ্ঠানিক এনগেজমেন্ট সম্পন্ন করতে চাই।”
এই ঘোষণা শুনে এরিকের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, তার চোখে ক্ষিপ্ত আগুন জ্বলে ওঠে।
সে রেগে মিস্টার রিচার্ডের দিকে এগিয়ে এসে কোল্ড ভয়েজে বলে,

Congratulations, Dad.
তোমার speech দারুণ ছিলো।
But next time, my life decisions announce them without me.
I don’t remember giving you that right.
এরিকের কণ্ঠ ছিল বরফের মতো ঠাণ্ডা, চোখে ঝলসে উঠছিল ক্ষিপ্ত আগুন। সে তার বাবার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে এক বিদ্রূপাত্মক হাসি টেনে বললো,
“Impressive, Dad.
তুমি নিজের গল্পে আমাকে নায়ক বানাতে চাও, অথচ স্ক্রিপ্টটা আমাকেই পড়তে দাওনি।
I don’t play roles I didn’t choose.
তোমার সিদ্ধান্ত, তোমার ইচ্ছা, সবই তোমার মর্জি।
বলেই এরিক মিস্টার রিচার্ডের দিকে এগিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো, My life, my rules. Remember that.”

মিস্টার রিচার্ডের মুখ শুকিয়ে গেল, কিন্তু এরিক থামেনি। সে একপাশে থাকা ওয়়াইনের বোতলটা এক ঝটকায় ধরে ফেললো, আঙুলের ফাঁকে চেপে ধরলো কাঁচের টুকরো, রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় টপকাতে লাগলো তার হাত বেয়ে।
“See this, Dad?
Pain doesn’t scare me.
But living someone else’s life? That’s my nightmare.
So, next time think twice before you write my script.”
গ্লাসের টুকরোগুলো মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে সে পা বাড়ালো দরজার দিকে। শেষবারের মতো পিছন ফিরে বললো,
“এখনই এনগেজমেন্ট বাতিল করো। নাহলে, তোমার Vertex Dynamics, আমি নিজ হাতে পুড়িয়ে ছাই করে দেব।”
আই রিপিট, একেবারে জ্বালিয়ে দেব।
বলেই এরিক চলে যেতে উদ্যত হলে, ঠিক তখনই অলিভিয়া ছুটে এসে পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলে,

“প্লিজ এরিক, আমার সাথে এমনটা কোরো না। আমি তোমায় ভালোবাসি… আর তুমিও তো আমায় ভালোবাসো, এরিক।এরিক এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কোল্ড ভয়েজে বলে,
“Don’t touch me, Olivia.
I’m not your hero, and I never will be.”
কথাটি বলেই এরিক চলে যেতে নিলে পিছন থেকে মিস্টার রিচার্ডের পুরুষালি কন্ঠস্বর ভেসে উঠে,
Eric, আমার নীরবতাকে আমার দুর্বলতা ভেবো না। You’re just a boy playing at being a man.You think you can walk away from me?
Try it.
See how far you get without my name.
You’re reckless, impulsive
and still, you’re nothing without me.
Don’t forget who made you, Eric.
তুমি যা পেয়েছো, সব আমার দেওয়া।
Don’t test me, son.

কারণ আমি চাইলে, তোমার সবকিছু এক মুহূর্তে কেড়ে নিতে পারি।
এরিক মিস্টার রিচার্ডের কথা শুনে পিছনে ঘুরে বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
Nice speech, Dad.
এরিক একবার চোখ তুলে সব অতিথিদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“Ladies and gentlemen, Here stands the king of a sunrise empire , but I want to tell him something,
“Fuck your money,fuck your legacy!”
এরপর সে একটু চুপ থেকে, হাস্কিস্বরে বলে উঠে,

“Cheers to the empire, Dad. I’ll build my own shadows.”
বলেই এরিক শেডো রাইডারটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। তার পেছনে ছুটে যায় তার বন্ধুরাও। কারণ,এরিক এই মুহুর্তে প্রচন্ড রেগে আছে, তাকে এই মুহুর্তে একা ছাড়া মানে কোন বিপদ ডেকে আনা।
তারা জানে, এরিক কোথায় যেতে পারে।
এরিকের একটা বাজে অভ্যাস আছে, এরিক যখন ফ্রাস্ট্রেটেড থাকে, তখন নিজেকে স্যাটিসফাই করতে প্রচুর ড্রিঙ্ক করে, তারপর অন্ধকার রাস্তায় ঝড়ের গতিতে রেসিংয়ে নামে।
মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করে , নিজের সীমা টেস্ট করতে ভালোবাসে সে।
বন্ধুরা বারবার বোঝালেও, এরিকের একটাই উত্তর
“এতেই তার ইগো স্যাটিসফাইড হয় , তাকে পৈশাচিক শান্তি দেয়।
এমন নয় যে ভাগ্য তাকে সবসময় বাঁচিয়ে দিয়েছে।
এই রিস্কি রেসিংয়ে বহুবার হাতে-পায়ে চোট লেগেছে, রক্ত ঝরেছে।
তবুও, নিজের জেদ আর স্যাটিসফেকশন ফিল করতে বারবার সে এই অন্ধকার পথকেই বেছে নিয়েছে।

এরিক ড্রিংকের গ্লাসটা হাতে নিয়ে ক্লাবের আলো-আঁধারিতে বসে ছিল।
একটার পর একটা ড্রিংক করছিল, চোখে ছিল তার একরকম উদাসীনতা।
এলিনাঃ “এরিক, এইসব পাগলামি বন্ধ কর। বাড়ি চল, আংকেল অনেক রেগে আছে।”
এরিক গম্ভীর কণ্ঠে, চোখ রাঙিয়ে এলিনাকে বলল,
“Let him be mad. I don’t care.”
সে একটু থেমে, গ্লাসটা হাতে ঘুরিয়ে আবার বলল,
“Tell him to save his anger. I’m not coming home tonight.”
এ্যারেনঃ, “বাড়ি যাবি না, তাহলে এখানে সারারাত বসে বাইক রেসিং করবি নাকি?”
এরিক ঠোঁটে মদের গ্লাস তুলে কোল্ড ভয়েসে বলল,
“Maybe I’ll race, maybe I’ll just disappear. Tonight, rules don’t apply to me, bro.”
এলিনা কাঁপা গলায় বলল, “একদম না, তুই এই রকম কিছুই করবি না। কেন বারবার নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলিস?”

এরিক এলিনার চোখে তাকিয়ে কোল্ড ভয়েজে বলল,
“Pain, risk-these are my comfort zone, Elin. ও তুই বুঝবি না।”
এই বলে এরিক ক্লাবের সবাইকে উদ্দেশ্য করে ঘোষণা করল,
Tonight, whoever beats me gets my Shadow Rider.”
তার কথা শুনে ক্লাবজুড়ে নেমে এলো স্তব্ধতা।
সবাই জানে, এরিককে রেসে হারানো প্রায় অসম্ভব।
তবুও, ইথান নামের এক ছেলে এগিয়ে এলো,
চোখে তার এরিকের শেডো রাইডারটা পাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা ফুটে উঠল ।
তা দেখে,এরিকের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক রহস্যময় কুটিল হাসি।
কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হলো জমকালো রেস।
রাতের শহর জেগে উঠলো ইঞ্জিনের গর্জনে।
এরিক তার Shadow Rider নিয়ে এলোমেলোভাবে ছুটে চলল,
মধ্যরাতের অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো সবার দৃষ্টির আড়ালে।
এরিকের বাইকটা রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই, ক্লাবজুড়ে নেমে এলো এক চাপা দীর্ঘশ্বাস।
সবাই নিঃশব্দে প্রার্থনা করলো,
এই রাত যেন কোনো দুর্ঘটনার সাক্ষী না হয়।
এরিকের চার বন্ধু চোখে উদ্বেগ নিয়ে গাড়িতে উঠলো, নীরব রাস্তায় এরিকের ছায়া অনুসরণ করতে করতে ছুটে চলল তারা।

সান ফ্রান্সিসকোর বুকে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার।দূর থেকে ইনায়াদের দোতলা বাড়ি থেকে ভেসে আসছে মৃদু হাসির শব্দ।
ইনায়া দ্রুত পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো।
নেমেই দেখলো, তার ভাইয়া আর আদরের ভাইজি টেবিলে বসে হাসিমুখে খাবার খাচ্ছে।
মৃদু হেসে ইনায়া এগিয়ে গেল তার ভাইয়ার দিকে,
“আসসালামুওয়ালাইকুম ভাইয়া।”
তানভীর হাসিমুখে জবাব দিল,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, বস। তোর সাথে আমার একটু কথা আছে।”
ইনায়া নিঃশব্দে চেয়ার টেনে ভাইয়ের পাশে বসল।
তানভীর স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,

“ইউনিভার্সিটি কেমন লাগছে? কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?
আমি জানি, নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে সময় লাগে।
তবুও, যদি কোনো সমস্যা হয়, আমাকে অবশ্যই বলবি।”
ভাইয়ার এমন স্নেহভরা কথা শুনে ইনায়ার মন ছুঁয়ে গেল। ইচ্ছে করলো, ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে সব কষ্টের কথা খুলে বলে মনটা হালকা করে নিতে।
কিন্তু ইনায়া পারলো না, ভাইয়ের প্রতি তার ভালোবাসা সীমাহীন, মা-বাবা চলে যাওয়ার পর ভাই আর ভাবিই তো তার আপনজন।
ভাইয়ের টেনশন আর চাপ বাড়াতে চায় না সে,

তাই ইনায়া নিজের কষ্ট নিজের ভেতরেই রাখার সিদ্ধান্ত নিলো।তাছাড়া, কোনো অন্যায় সে করেনি,
শুধু শুধু তারা ধর্ম টেনে এতো বড় সিনক্রেট করলো। কিন্তু সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো,
সবার ভুল ভাঙিয়ে দেবে সে,
ইসলাম নিয়ে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গির কড়া জবাব সে দিবে।
ইনায়া ঠিক করলো, কালই প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলবে,
ক্লাসের সবাই যেভাবে তাকে হেনস্তা করছে, সেটা জানাবে।
আর ওই ‘মিস্টার লাফ্যাংগা’ এরিক আর তার ফ্যানগার্লদেরও বুঝিয়ে দেবে,
তার সাথে এমন আচরণ কেউ করতে পারে না।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৭

রাত গভীর হতেই এরিকের শেডো রাইডারটা ফ্রান্সিসকোর নিস্তব্ধতা ভেদ করে ইনায়াদের বাড়ির সামনে এসে থামে। এরিক বাইকের সাথে হেলান দিয়ে এক দৃষ্টিতে ইনায়ার জানালার দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে,
“Unbelievable, Eric.
এই ব্যাকডেটেড মেয়েটার জন্য তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস? Pathetic.”
হাউ লো ক্যন ইউ গো?
গেট ওভার ইট। শি’জ নট ইউর টাইপ, নেভার ওয়াজ।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ৯