প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৮
আরাফাত আদনান সামি
সকাল প্রায় ৯টা। বাইরের আকাশে রোদের মিষ্টি উষ্ণতা, হালকা বাতাসে দুলছে জানালার পর্দা। ঘরের ভেতর নরম আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে।
প্রায় সকাল ৭টার দিকেই সূর্যের ঝাপসা আলোয় কৌশিকের ঘুম ভেঙেছিল। ঘুম ভাঙার পর থেকেই ফ্রেশ হয়ে বসেছে ল্যাপটপের সামনে দুই ঘণ্টা ধরে কী যেন ঘাটাঘাটি করছে সে। চোখে মনোযোগ, ঠোঁটে একরকম চিন্তার রেখা। অন্যদিকে, এখনো গভীর ঘুমে ছিল মায়া। রাতের ক্লান্তি শরীরটাকে যেন আরও ভারী করে রেখেছিল। কৌশিকের গানের সময়, সেই মুগ্ধ সুরের ভেতরেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে নিজেও জানে না।কৌশিক অবাক হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়েটাকে ডাকেনি। শুধু নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল মায়াকে। তার চুলগুলো কাঁধে লুটিয়ে পড়েছিল, মুখে নিস্পাপ শান্তি। কৌশিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল তারপর নিঃশব্দে ফিরে এসেছিল নিজের কাজে।
সূর্যের আলোয় চোখ কচলাতে কচলাতে জেগে উঠল মায়া। চুলগুলো এলোমেলো, চোখে আধো ঘুম, তবুও মুখে এক অজানা কোমলতা।
মায়াকে উঠতে দেখে কৌশিক ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই হাসিমুখে বলল,
“সুপ্রভাত মায়াবতী।”
মায়া এক টান দিয়ে হাত-পা ছুঁড়ে একটা বড় হাম্মি তুলল। তারপর নিঃশব্দে হেসে উত্তর দিল,
“সুপ্রভাত।”
কৌশিক ল্যাপটপে কিছু টাইপ করতে করতে মাথা না তুলেই বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“টেবিলে কিছু ফল আর বিস্কিট রাখা আছে, ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নে।”
মায়া ততক্ষণে আধো ঘুমভাঙা চোখে বিছানায় একটু সোজা হয়ে বসল। দু’হাঁটু জড়িয়ে হাত রাখল তার ওপরে, তারপর ড্যাবডব চোখে তাকিয়ে রইল কৌশিকের দিকে। মুখে হালকা অভিমান মিশ্রিত কোমল সুর,
“সারারাত অনেক কষ্ট হইছে তাই না, কৌশিক ভাই?”
কৌশিক ভ্রু তুলল, ঠোঁটে এক চিলতে হাসি,
“কষ্ট কেন হবে, শুনি?”
মায়া ঠোঁট ফুলিয়ে ধীরে বলল,
“এই যে বিছানা ছেড়ে সারারাত সোফায় কাটাতে হয়েছে।”
কৌশিক এবার চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে, শান্ত গলায় বলল,
“কে বলেছে? আমি সারারাত তোর সাথেই একই বিছানায় ছিলাম।”
মায়ার চোখ গোল হয়ে গেল। মুহূর্তেই মুখে অবাক ভাব,তারপর এক দুষ্টু হাসি চেপে রেখে বলল,
“ইয়েহ্… এত মিথ্যা কথা কেমনে বলেন?”
“মুখ দিয়ে।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে, চোখ ছোট করে তাকাল,
“আমি কিন্তু দেখেছি আপনি সারারাত সোফায় কাটিয়েছেন। তারপরও মিথ্যা বলে নিজেকে অসভ্য প্রমাণ করেন কেন?”
কৌশিক ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল মায়ার দিকে। মুখে টানল একচিলতে দুষ্টু হাসি যে হাসির ভেতর খেলা করে অজস্র রসিকতা,
“জানি না, কিন্তু তোর সাথে অসভ্যতামি করতে আমার ভালো লাগে। তুই যখন তোর ওই মিষ্টি কণ্ঠে, নরম ঠোঁট জোরা ব্যবহার করে আমাকে অসভ্য বলিস,তখন কথাটা একদম আমার বুকে এসে লাগে। তাই ইচ্ছা করে অসভ্যতামি করি, শুধু তোর মুখ থেকে শুনব বলে,‘অসভ্য! অসভ্য নীর চৌধুরী!’ বুঝলি, পাগলী?”
মায়া ঠোঁট ফুলিয়ে, মুখে আধা রাগ আধা হাসি নিয়ে বলল,
“ইস্! কত ভালুপাষা! জমায় রাখেন,ভাতের মারের মতো উতলায় পড়ে যাচ্ছে!”
কৌশিক হেসে উত্তর দিল,
“পড়তে দে। আমি তোর ভাত হতে চাই, মার না।”
মায়া অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকাল,
“মানে?”
“মানে টানে পরে যা, আগে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নে।”
মায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে, গলায় একটু মিষ্টি অভিমান মিশিয়ে বলল,
“যাচ্ছি যাচ্ছি!”
বলেই বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে হাঁটল। পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখল কৌশিক আবার কাজে ডুবে গেছে।প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেল।কিন্তু মায়া এখনো ওয়াশরুমে!
কৌশিক এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে ডেস্কে যত্ন করে রেখে দিল। হাতঘড়ি পরে দরজার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল,
“কী হলো মায়া? তোর এখনো হয়নি তোর? এত সময় লাগে নাকি?”
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে মায়ার কণ্ঠটা ভেসে এল স্বাভাবিকের চেয়ে একটু জোরেই,
“না কৌশিক ভাই! হাত-মুখ ধুতে এসে পুরো ভিজে গেছি! আপনি একটা কাজ করেন, আমার রুম থেকে একটা শাড়ি বা থ্রিপিস নিয়ে আসেন, আমি ততক্ষণে শাওয়ার নিয়ে ফেলি।”
“কীহ্! আমি পারবো না! তুই তোর রুমে চলে যা।”
ওপাশ থেকে মায়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“মাথা ঠিক আছে আপনার? আমি এই অবস্থায় এখান থেকে বের হতে পারবো না! দেন না, প্লিজ নিয়ে আসেন না।”
কৌশিক হাসি চেপে বলল,
“আমার তো কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু থ্রিপিস আনতে গিয়ে যদি ফুপি দেখে ফেলে পরে তোর সমস্যা হবে না?”
ওপাশ থেকে এবার নির্লজ্জ ভঙ্গিতে মায়ার উত্তর,
“এমনেও একদিন না একদিন সবাই জানতেই পারবে! কোন সমস্যা নাই, আপনি যান।”
কৌশিক দুই হাত তুলে নাটকীয় গলায় বলল,
“বাবারে বাবা! তোর কলিজা আছে, মানতে হইবো! আচ্ছা, আমি যাচ্ছি। দুই মিনিট ওয়েট কর, আমি দশ মিনিটে চলে আসছি।”
মায়া ভেতর থেকে হাসতে হাসতে বলল,
“দুই মিনিট না, দশ মিনিট না,আপনি ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট পরে আসেন, আমার কোনো সমস্যা নাই। শাওয়ার নিতে আমারও সময় লাগবে।”
কৌশিক মাথা নাড়ল, ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বলল,
“ঠিক আছে।”
বলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। করিডরের দিকে হেঁটে যেতে যেতে নিজের মনে বিড়বিড় করল,
“এই মায়াও না…একটা না একটা ঝামেলা শুরু করবেই করবে!”
বলেই কৌশিক রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মায়া রুমের দিকে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময়, করিডরে হঠাৎ রোহিত এসে হাজির। কৌশিক তাকিয়ে বলল,
“কী ব্রো? কোথায় যাওয়া হচ্ছে, শুনি?”
রোহিত আড়চোখে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল,
“সেটাই তো আমার প্রশ্ন!এইদিকে কই যাচ্ছো কৌশিক ভাইয়া? তোমার রুম তো ওইদিকে তাই না? আচ্ছা আচ্ছা, তুমি আমার ভাবির জন্য জামা আনতে যাচ্ছো না তো?”
রোহিতের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কৌশিক স্থির হয়ে গেল। চোখ বড় করে অবাক হয়ে বলল,
“তোকে কে বলেছে এইসব?”
রোহিত বেজে গেলো হালকা রসিক ভঙ্গিতে,
“এই জন্যই মানুষ বলে,বিয়ের পর ভাই আর আপন থাকে না, ভাবিই হয় আপন। আর তুমি, এখনো বিয়েই হয়নি, অথচ আমার থেকে এত বড় কথা লুকালে? আমি কী বলে দিতাম নাকি সবাইকে?”
কৌশিক কাঁধ একটু সরিয়ে বলল,
“আরে, আমার ভাই, আমাকে ভুল বুঝিস না। হুট করে সব হয়ে গেছে, তো বলার মতো তেমন সুযোগ হয়নি।”
কৌশিক কথাটা বলে একটু থামল তারপর আবার রোহিতের পানে চেয়ে বলল,
“আচ্ছা,তোকে এইসব কথা কে বলেছে, শুনি?”
কৌশিক মুখ চেপে হাসল,
“বলব না।”
“তোর বলতেও হবে না। কাল মায়ার সাথে কথা হয়েছে তাই না? সেই নিশ্চয়ই বলেছে আমাদের সম্পর্কের কথা, ঠিক বললাম তো?”
“হ্যাঁ, তা নয়তো আর কে বলবে আমাকে! তুমি?”
“আরে সরি ইয়ার।”
“ইটস্ ওকে।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর কৌশিক হেসে বলল,
“ওহ্, সেই জন্যই বলি,আমরা একি বাড়িতে, একি রুমে সারারাত থাকার পরেও এখনো পর্যন্ত কেউ না আমার খোঁজ নিল না মায়ার। এটাও নিশ্চয়ই তুই হ্যান্ডেল করেছিস, তাই না?”
রোহিত মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ।”
রোহিতের কথাটা শেষ হতেই কৌশিক হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রোহিত কিছুটা অবাক, কিছুটা আপ্লুত। কৌশিকের কণ্ঠে তখন আবেগ মেশানো উষ্ণতা,
“থ্যাংস ভাই! তুই আমার ছোট হয়েও ছোট থেকে আমার কত খেয়াল রাখিস… আমাকে সব বিপদ থেকে বাঁচাস। অথচ এইসব আমার করার কথা ছিল। শুন তোর যখন যা ইচ্ছা বা তোর কোনো সাহায্যের দরকার পড়লে অবশ্যই আমাকে বলবি। বুঝলি? না হলে আমি আমার ছোট ভাইয়ের কাছে আজীবন ঋণী হয়ে থাকব। একটু হলেও তোর ঋণ পরিশোধ করার সুযোগ দিস আমায়।”
রোহিত তাড়াতাড়ি কৌশিকের কাঁধে হাত রাখল, মুখে হালকা হাসি,
“আরে আরে ভাইয়া! তুমি এইসব কী বলছো! আমি করি আর তুমি করো বিষয়টা তো একিই, তাই না?”
কৌশিক হেসে মাথা নাড়ল,
“তারপরেও বল, তোর কী চাই?”
রোহিত মাথা নেড়ে বলল,
“আমার কিছু চাই না, তুমি আছো আমার সাথে আমার পুরো পরিবার আছে এটাই অনেক।”
“আমি আছি, আর সারাজীবন থাকবও। আমরা এমনি ভাই উরুফে ফ্রেন্ড হয়েই থাকব। তার পরেও বল, তোর কী চাই! আমি প্রমিজ দিচ্ছি, তুই যা চাবি তাই পাবি।”
রোহিত হেসে চোখ তুলে তাকাল,
“পাক্কা?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, পাক্কা প্রমিজ।”
রোহিত একটু ভেবে নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা, এখন আমার কিছু চাই না। কিন্তু কখনো যদি কোনো কিছুর দরকার পড়ে, অবশ্যই চেয়ে নেব। তুমি তোমার প্রমিজ মনে রেখো।”
কৌশিকের ঠোঁটে একরাশ মায়া মেশানো হাসি ফুটল।
“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। আচ্ছা তুই নিচে যা, তাহলে আমি মায়ার রুম থেকে আসি।”
রোহিত মাথা নাড়িয়ে হাসল,
“আচ্ছা ভাইয়া।”
বলেই দুইজন দুই দিকে চলে গেল।
কৌশিক চুপচাপ মায়ার রুমে ঢুকল। সে দেখল রুমে কেউ নেই। চটপট সবকিছু লক্ষ্য করে, মায়ার জামা কাপড় খুঁজতে লাগল। নানা কোণা খুঁজে, তাকিয়ে, উল্টে অবশেষে সে পেল জামাকাপড়ের ব্যাগটা। ব্যাগ থেকে তিনটে জিনিস বেছে নিল পাতলা দেখেই একটা নীল শাড়ি, সাথে নীল ব্লাউজ আর ইননার স্কার্ট। এগুলো সাবধানে একটি শপিং ব্যাগে ভরে সে রুম থেকে বের হলো।
নিজের রুমে ফিরে খাটের কোনায় শপিং ব্যাগটি রেখে কৌশিক মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মায়া শোন, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। থ্রিপিস আনি নি, শাড়ি খাটের কোনায় রাখা আছে, নিয়ে নিস।”
মায়া ওয়াশরুম থেকে মুখে ছোট্ট স্বর মিশিয়ে উত্তর দিল,
“ঠিক আছে।”
মায়ার কথার সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক চলে গেল।প্রায় ঘণ্টাখানিক সময় পার হয়ে গেল। ওয়াশরুমের দরজা খুলে মায়া রুমের চারপাশে নজর বুলিয়ে কেউ আছে কিনা দেখল। কেউ নেই দেখে, তারাতাড়ি খাটের কোনা থেকে শপিং ব্যাগটি তুলে আবার ওয়াশরুমে ঢুকল।পাঁচ মিনিটের মধ্যে শাড়ি পরে, ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুড়ে বের হল মায়া। তারপর রুমে ঢুকেই চুল শুকানোর জন্য ফ্যানের ভোল্টেজ বাড়িয়ে দিল।চুল থেকে তোয়ালেটা সরিয়ে নিলেই চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করল। মুখে একটু রাগ মেশানো বিস্ময়,
“এই সব তোয়ালে দিয়ে চুল মুছা যায়? এটা তোয়ালে না ষাঁড়ের চামড়া!”
মায়া তোয়ালে দিয়ে আস্তে আস্তে চুল ঝাকাতে লাগল। একবার চুলকে সামনে নিয়ে, আবার পেছনে সব চুল একত্র করে তোয়ালে দিয়ে মুছার চেষ্টা করছিল। এমন সময় হঠাৎ রুমের দরজা খুলে প্রবেশ করল কৌশিক। তার চোখ থমকে গেল মায়ার উন্মুক্ত ফর্সা পিঠ দেখে। মায়া তখনো টের পাইনি যে কেউ রুমে ঢুকেছে। কৌশিক এক পা দু’পা করে এগিয়ে গেল। মায়ার কাছে এসে হালকা ঝুঁকতেই ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা।মায়া সব চুল মাথা নাড়িয়ে পেছনে নিতেই লম্বা, ঘন, ভেজা চুলগুলো সব কৌশিকের মুখে এসে বারি খেল।
কৌশিক চিটকে মুখ চেপে দূরে সরে গেল।
“দিলি তো পুরো মুডের ১৩টা বাজিয়ে!”
মায়া অবাক হয়ে পেছনে তাকিয়ে বলল,
“কৌশিক ভাই! আপনি কখন আসলেন?”
কৌশিক এক হাত দিয়ে মুকের ওপর পড়ে থাকা চুলের পানি সরাতে লাগল,
“মাত্রই আসলাম। আর এত জোরে কেউ চুল ঝাকায় নাকি!”
“সরি সরি! আমি খেয়াল করি নি। মনে হয় খেয়াল না করে ভালোই করেছি। আপনার মনে কী ছিল, শুনি?”
কৌশিক একটু ধীর কণ্ঠে বলল,
“কী আর হবে, তোর চুলে ভেজা ঘাড়ে একটা চুমু খেতে চেয়েছিলাম। তা আর হলো কই!”
মায়া হেসে মুখ চেপে বলল,
“বেশ হয়েছে।”
কৌশিক গম্ভীর স্বরে ফিরে বলল,
“কী বললি?”
হঠাৎ কৌশিকের এমন গম্ভীর কণ্ঠ শুনে মায়া পেছনে আমতা আমতা করে বলল,
“সরি সরি! কিছু না।”
কৌশিক এক পা দুপা করে মায়ার দিকে এগোতে লাগল, আর মায়া এক পা দুপা করে পেছনে সরে গেল।কৌশিক হালকা হাসি নিয়ে বলল,
“বাই দ্য ওয়ে, মায়া, তুই কিছু ভুলে যাচ্ছিস না তো?”
মায়া কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে বলল,
“ক..কী?”
কথাটা বলতে বলতে মায়া এক পর্যায়ে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেকে গেল। কৌশিক ধীরে এগিয়ে এসে এক হাত দেওয়ালে দিয়ে দাঁড়াল, রুমের আলোয় তার চোখে মৃদু কৌতূহল ঝিলমিল করছিল। হালকা ঝুঁকে কৌশিক বলল,
“এই যে, কালকে ফ্রিতে আমার গান শুনে দিব্বি ঘুমালি। গান শুনে বললিও না কেমন গাইলাম, বা একটা থ্যাংকস পর্যন্ত দিলি না। ডাইরেক আরামছে ঘুমের দেশে পারি দিলি।”
মায়া কপালে হাত রেকে, চোখে লজ্জা আর অপ্রস্তুতি নিয়ে বলল,
“ওহ্, সরি সরি কৌশিক ভাই… আসলে…”
মায়া কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কৌশিক এক হাত দিয়ে মায়ার কোমল পেটে শক্ত করে গুজে দিয়ে মায়াকে হালকা উচু করে নিজের কাছে নিয়ে আসল। মায়া হকচকিয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে অনুনয় করল,
“ক…কী ক…করছেন ক-কৌশিক ভাই!”
কৌশিক মায়ার ঠোঁটের দিকে ঝুকে বলল,
“দেখতে পারছিস না কী করছি?”
“সরি বললাম তো!”
“সরিতে কাজ হবে না! এখন থেকে তুই সামান্য পরিমাণ ভুল করলে এটার একমাত্র শাস্তি হবে কিস আর একটু বড় ভুল করলে শাস্তি হবে বাস….”
কৌশিক কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মায়া কৌশিকের ঠোঁটে আঙুল রেখে দিয়ে বলল,
“অসভ্য! যখনি দেখো তখনি মুখে আজে বাজে কথা!এই আপনার মুখ দিয়ে কী ভালো কথা বের হয় না?”
“না বের হয় না।”
“অসভ্য!”
“কড়াহ্ করে একক্ষাণ কিসি দে তো জান।”
“আমি পারবো না।”
“দিবি না?”
“না।”
“দিবি না তো?”
“বলছি না আমি পারবো না।দিব না মানে দিব না না ন….”
মায়ার কথার মাঝেই কৌশিক তার ঠোঁট দিয়ে মায়ার গোলাপী ঠোঁট জোরা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। মায়া সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে কৌশিককে আঁকড়ে ধরল। কৌশিকের বুক বরাবর দু’হাত রেখে মায়া চেষ্টা করল সরবার জন্য, কিন্তু পারল না। কৌশিক এক হাত দিয়ে মায়ার কোমর আরো শক্ত করে চেপে ধরল, আর অন্য হাত দিয়ে মায়ার ঘাড় ধরল। পিছনে দেওয়াল আর সামনে কৌশিক কোনো পথ না থাকায় মায়া বিন্দুমাত্র নড়তে পারল না। কৌশিক পাগলের মতো মায়ার গোলাপী ঠোঁট চুমু দিতে লাগল।
প্রায় দশ মিনিট পর ঠোঁট ছেড়ে কৌশিক মায়াকে এক টানে উল্টো ঘুরিয়ে দেওয়ালের সঙ্গে ঠেসে ধরল। মায়ার পিঠ থেকে সমস্ত চুল সরিয়ে দেওয়ায় ফর্সা পিঠ আবারো উন্মুক্ত হয়ে গেল। কৌশিক সঙ্গে সঙ্গে মায়ার পিঠে চুমু দিতে থাকল। এক পর্যায়ে মায়ার ঘাড়ে মুখ ঘুজে দিয়ে গভীর চুমু দিতে লাগল। যেখানে চুমু দিচ্ছিল, সেখানে লালচে দাগ পড়তে লাগল। কৌশিক পাগলের মতো মায়ার ঘাড়ে চুমু খাচ্ছিল। মায়া এবার সহ্য করতে না পেরে আস্তে করে শব্দ করে উঠল,
“আহ্…”
শেষে মায়া আর সহ্য করতে না পেরে গুনগুন করে কেঁদে উঠল। কৌশিক টের পেয়ে মায়াকে সামনে ঘুরিয়ে দিয়ে ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
“উম্ম… জান, কী হলো? কাঁদছিস কেন? আমার মুড নষ্ট করিস না তো।”
মায়া কান্না ভেজা স্বরে বলল,
“আ..আমি আ..আর সহ্য করতে পারছি না কৌশিক ভাই।”
কৌশিক ঘোর লাগা স্বরে বলল,
“উমম জান মুড নষ্ট করিস না তো। তুই কাছে থাকলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি নারে জান।”
মায়ার এবার একটুরেও জোরেই কেঁদে উঠল।বলল,
“প্লিজ কৌশিক ভাই আমি আর নিতে পারছি না।”
“এই এই কান্না করছিস কেনো? ধ্যাৎ যা আর কিছু করবো না খুশি?”
কৌশিকের কথা শুনে মায়া কৌশিককে জরিয়ে ধরে বলল,
“কখনো ছেড়ে যাবেন নাতো?”
“ছাড়া ছাড়ির কোন প্রশ্নই উঠে না।”
“প্রমিজ!”
“প্রমিজ।”
কৌশিক ধীরে ধীরে মায়ার মুখটা তুলে তার দিকে তাকাল, চোখে একধরণের মৃদু উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনা। ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
“এখন তো থামিয়ে দিলি, কিন্তু যেইদিন আমার হাতে পারমানেন্ট লাইসেন্স চলে আসবে না, মায়া, আই সোয়ার,এমন আদর করবো… এমন আদর করবো…”
একটু থেমে, হালকা ঝুঁকে কৌশিক যোগ করল,
“সামলাতে পারবি তো জান?”
মায়া চোখ-মুখে কৌশিকের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে, হঠাৎ কৌশিকের বুকে পাঞ্চ মেরে বলল,
“অসভ্য।”
কৌশিক হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“অসভ্য টসভ্য পরে বলিস। আগে আমার সাথে চল, তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
“সারপ্রাইজ!” শব্দটা শুনে মায়া চোখ বড় করে অবাক হয়ে গেল। খুশিতে তার পা মমেঝেতে লাফিয়ে উঠল । মুখে কণ্ঠে ঝলমল করে বলল,
“ওয়াও! আমার জন্য সারপ্রাইজ! কই কৌশিক ভাই, তারাতাড়ি দেন না..”
“দিচ্ছি দিচ্ছি, তুই আছে বিছানায় বস।”
মায়া আর কথা না বলে খুশিতে সোজা বিছানায় বসে পড়ল। কৌশিক ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগোলো, হাতের মধ্যে কাগজে মুড়ানো একটি মাঝারি সাইজের প্যাকেট।
মায়ার চোখ চকচক করে জিজ্ঞেস করল,
“কৌশিক ভাই, কী আছে এটার ভেতরে?”
কৌশিক এক অজানা হাসি খেলিয়ে বলল,
“আহা! সেটা তো খুললেই দেখবি। একটু ধৈর্য ধর বিশেষ করে তোর জন্যই আনা।আচ্ছা গেস কর তো কী হতে পারে।”
“আগে বলেন খাবার নাকি কোন জিনিস?”
“উমম..বলে দিব?”
“না বলতে হবে না শুধু এটা বলেন যে,খাবার নাকি কোন জিনিস?”
“খাবার।”
মায়া জিব্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কৌতূহক চোখে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে সেটা আমার পছন্দের গুড়ের জিলাপি, তাই না কৌশিক ভাইই?”
কৌশিক প্যাকেটটি খুলে মায়ার সামনে ধরে বলল,
“হ্যাঁ, তোর গুড়ের জিলাপি।”
মায়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। জিব্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল, মুখে শুধু একধরনের খুশি আর আকাঙ্ক্ষা। কৌশিক মুচকি হেসে বলল,
“এইভাবে তাকিয়েই থাকবি নাকি খাবি?”
মায়া প্যাকেটটি কৌশিকের হাত থেকে নিয়ে নিজের দিকে নিয়ে নিল। সকালে খিদে তার উপর জিলাপি দেখেই খিদেটা আরও বেড়ে গেল। লোভ সামলাতে না পেরে একটা জিলাপির টুকরো হাতে তুলে নিয়ে খেতে শুরু করে দিল। কৌশিক মায়ার খাওয়ার দিকে আনমনে তাকিয়ে হেসছে। তার খাওয়ার স্পিড দেখে কৌশিক হাসি ধরে রাখতে পারল না,
প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ১৭
“জান, আস্তে খা! এইভাবে কেউ খায় নাকি? ভিষম খাবি তো। চুষে চুষে রসটা বের করে করে খা জান,মজা পাবি।”
মায়া খাওয়ার মাঝে অল্প রাগ আর খিদে মিশিয়ে বলল,
“আমার কাছ থেকে জিলাপি খাওয়ার শিখে এখন আপনি শিখাচ্ছেন কীভাবে আমি জিলাপি খাবো? নিকুচি করি আস্তে খাওয়ার! জানেন, আমার ছোট্ট পেটে কত খিদা জমেছে! সকাল থেকে কিছুই খাইনি আমি। তাই আমার খাওয়ার মাঝে ডিসটার্ব করবেন না তো।”
কৌশিক ভ্রকুচকে মাথা নেড়ে বলল,
“করলাম না, ডিসটার্ব। মন ভরে গিল তুই।”
“উমমম…”
