প্রিয় রাগিনী পর্ব ১১
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
খালি গায়ে সোফায় বসে পর পর সিগারেট টানছে নাসির কায়সার। চোখ দুটো লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দৃশ্য দেখে। টেবিল থেকে হুইস্কির বোতল নিয়ে ঢোক ঢোক করে খেতে লাগলো।
তখনই দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো নিহিড়। কায়সার ওর দিকে তাকাতেই নিহিড় বললো –
– স্যার, সকালের মেয়েটার সব খোঁজ-খবর নিয়েছি। ইসলাম পরিবারের মেজো ছেলে হামিদ ইসলামের ছোট কন্যা। নাম লামিয়া ইসলাম। বেশ চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে, ভীষণ রাগি।
কায়সার বাঁকা হেসে বললো –
– তাহলে ইসলাম পরিবারের সাথে দেখো কোনো ডিল করা যায় কি না। আগে কম্পানির সাথে বন্ধুত্ব করি, গভীর সম্পর্ক তৈরি করি, তারপর না হয় ব্রাউনিকে ছুঁড়ে দেখা যাবে।
বলেই হেসে উঠলো।
নিহিড় ভয়ে ভয়ে বললো –
– স্যার, সেটা না হয় কোনোভাবে করা যায়, কিন্তু ওই ডিটেকটিভ অফিসার যে আমাদের এত বড় ক্ষতি করলো… এখন কী হবে?
– অনেক কিছুই হবে। সেসব পরে দেখা যাবে। এখন বলো, আমার খাবার কোথায়?
– জি স্যার, আপনি অনুমতি দিলে নিয়ে আসি।
কায়সার সিগারেট টানতে টানতে বললো –
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– নিয়ে আসো, তাড়াতাড়ি। ভীষণ খিদে পেয়েছে আজ।
নিহিড় মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর ইকবাল সাহেবের মেয়েকে এনে রুমে দিয়ে গেলো।
মেয়েটিকে দেখে কায়সার হেসে উঠলো। মেয়েটি ভয়ে গুটিয়ে কান্না করতে করতে বললো –
– আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছেন? প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমি বাসায় যাবো।
কায়সার সিগারেট ফ্লোরে ফেলে দিয়ে হুইস্কির বোতল হাতে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। মেয়েটির দিকে এগোতে এগোতে বললো –
– ছেড়ে দেবো তো, কিন্তু খাবার খাওয়া শেষে। আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত, বেবি।
বলেই মেয়েটিকে ধাক্কা মেরে বিছানায় ফেলে দিলো।
অন্ধকার রুম কেঁপে উঠলো ছোট্ট মেয়েটির কান্নার শব্দে। ধীরে ধীরে সেই শব্দ মিলিয়ে গেলো।
ঘণ্টাখানেক পর কায়সার নিজের ক্ষুধা মিটিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বুজতেই হঠাৎ ভেসে উঠলো সেই হালকা সোনালী রঙের তেজি চোখ। কায়সার ফট করে চোখ খুলে উঠে বসলো। বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরতেই দেখলো ছোট্ট মেয়েটি অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।
নিক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে মেয়েটির উপর চোখ বোলালো। তারপর বিরক্ত হয়ে ফোনে কল করে বললো –
– এই মেয়েকে নিয়ে যাও।
বলেই কল কেটে দিলো।
কিছুক্ষণ পর নিহিড় এসে অচেতন মেয়েটিকে নিয়ে চলে গেলো।
কায়সার আবার সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিতে দিতে চোখ বন্ধ করলো। তখনই ভেসে উঠলো সেই শ্যামবর্ণের মুখটা—কুকুরছানাকে কোলে তুলে রাগি চোখে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে।
তা মনে পড়তেই কায়সার বাঁকা হেসে বিরবির করে বললো –
– অনেক সাদা চামড়ার মেয়ে দেখেছি… আবার কালো চামড়ার মেয়ে দেখেছি… কিন্তু কাউকেই মনে ধরে নি। আর এই মেয়েটা আমার ঘুম উড়িয়ে নিয়ে গেছে।
বলেই হেসে উঠলো। তারপর বললো –
– তোমাকে তো আমার চাই, ব্রাউনি। যেকোনো মূল্যে… লাগবেই।
বলে বাঁকা হাসলো।
এসব ভাবতে ভাবতেই রাত কেটে গেলো নির্ঘুমে।
ভোর সকাল। চারপাশে মৃদু হালকা বাতাস বইছে। পাখিরা কিচিরমিচির শব্দ করে গান গাইছে। লাবিব খালি গায়ে শর্টস পরে ব্যায়াম করছে তাদের বাগানে। সকাল সকাল উঠে ব্যায়াম না করলে তার আবার ভালো লাগে না।
হঠাৎ তালুকদার বাড়ির দিক থেকে শোনা গেলো মরা কান্নার আওয়াজ। লাবিব ভ্রু কুঁচকে তাকালো। গেট দিয়ে কান্না করতে করতে বেরিয়ে এলো ময়না বেগম, তার পিছনে মতিন তালুকদার। ময়না বেগম রাস্তার মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়ে বসে উঠলো হাউমাউ করে—
– আমার মাইয়া আর নাই রে! আমার মাইয়া আর নাই…
তার এমন চিৎকার শুনে আশেপাশের মানুষ দৌড়ে এলো।
নামাজ পড়ে আবার ঘুমিয়েছিলো লামিয়া। হঠাৎ এমন কান্নার আওয়াজে বিরক্ত হয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো সবাই রাস্তায় ভিড় করছে। বিরক্তি নিয়ে নিচে নেমে গেট পেরিয়ে তাকাতেই দেখলো সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ময়না বেগম মাঝখানে বসে কান্না করছে।
আজমেরী বেগম দৌড়ে গিয়ে পাশে বসলেন। ময়না বেগম তার হাত চেপে ধরে হাউমাউ করতে লাগলো –
– খালা, আমার মাইয়া নাই। গেছে গা, আর আইবো না গা…
এমন কথা শুনে অনেকেই কান্না জুড়ে দিলো। কেউ কেউ বললো ইস মেয়েটা ভালো আছিলো, অল্প বয়সের মেয়ে কীভাবে মারা গেলো।
কেউ ইন্না লিল্লাহ পড়তে লাগলো।
হামিদ সাহেব তার তিন মেয়ের দিকে তাকালেন। বড় মেয়ে কাপড়ে চোখ মুছছে, মেজো মেয়ে বই হাতে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে, আর ছোট্ট মেয়ে আধো ঘুমে বোনের গলা জড়িয়ে ঢুলছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন।
খান পরিবারের সবাই মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। শারমিন চোখ মুছতে মুছতে হামিদার গলা জড়ালো, রাশেদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
খালি গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাবিব সামনে তাকাতেই দেখলো লামিয়া ঘুম জড়ানো চোখে দাঁড়িয়ে ঝিমুচ্ছে। বিরক্ত হলো। আশেপাশের মেয়েরা লাবিবকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে—কিন্তু লাবিবের খেয়াল নেই।
ময়না বেগমের কান্নার তীব্রতায় নাকের সর্দি ঠোঁটে গড়িয়ে এসে পড়ছে হা করে কান্নার ফলে সর্দি মুখে ঢুকে গেলো। আজমেরী বেগম তা দেখে তার শরীরের ঘিনঘিন করে উঠলো।
নিজেকে সামলে বললেন –
– ওই ছেড়ি, কান্দিস না। আল্লাহ যা করেন ভালো জন্যই করেন।
এক মহিলা জিজ্ঞেস করলো –
– তোমার মেয়ের লাশ কোথায়?
লাশ কথায় ময়না বেগম আঁতকে উঠলো –
– কা-কার লাশ?
– আরে তোমার মেয়ের লাশ।
ময়না বেগম কেঁপে উঠে মতিন তালুকদারের দিকে তাকালো –
– ওগো, এরা কী বলতাছে! আমাদের মাইয়ার লাশ মানে কী?
সবাই হাঁ হয়ে তাকালো। মহিলা বিরক্ত হয়ে বললো –
– কিছুক্ষণ আগেই তো তুমি বললে মাইয়া নাই। তাইলে?
ময়না বেগম হঠাৎ আরও জোড়ে কান্না শুরু করলো। সবাই ভরকে গেলো।
ময়না বেগমের চিৎকার শুনে লামিয়ার বেশ বিরক্ত হয়ে পিট পিট করে চোখ খুলে সামনে তাকাতেই
চোখের ঘুম ছেড়ে উড়ে গেলো। কারণ সামনে দাঁড়ানো লাবিব—খালি গায়ে, শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘাম নেমে যাচ্ছে নাভির দিকে। লামিয়ার বুক ধকধক করছে। শুকনো ঢোক গিলে চোখ সরাতে চাইছে, কিন্তু পারছে না। একের পর এক চোখ লাবিবের পেশিবহুল শরীরে আটকে যাচ্ছে। চোওড়া কাঁধ, মেদহীন পেট, ছয়টি পেশীর রেখা স্পষ্ট। মাথা ঘুরে আসছে তার।
ঠাৎ লামহার গলা খামচে ধরলো লামিয়া । ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো । সবাই লামহার দিকে তাকাতেই সে ব্যাক্কেল হাসলো। লাবিব তাকিয়ে দেখে লামিয়া ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করেছে। বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে ঘুরে গেলো।
আজমেরী বেগম এবার ময়না বেগমকে ধমকালেন –
– আবার কান্দিস কেন? মেয়েটার লাশ কোথায়?
বিরক্ত হয়ে ময়না বেগম কান্না জড়ানো কণ্ঠে বললো –
– আমার মাইয়ার কিছু হয় নাই তো! লাশ পাইবা কই?
সবাই হতবাক। রাশেদা বেগম জিজ্ঞেস করলেন –
– তাইলে কান্দিস কেন?
ময়না বেগম হাউমাউ করে উঠলো –
– আমার মুন্নি ওই হকারের লগে পালায় গেছে গা…
সবাই থ হয়ে গেলো। এতক্ষণে সবাই ভেবেছিলো মেয়ে মারা গেছে, আর এখন শোনা গেলো পালিয়েছে! রেগে সবাই ময়না বেগম বকাঝকা করলো।
হামিদা আর শারমিন ক্ষেপে বকল, আরেক পাশে মাহির বিরক্ত হয়ে বললো –
– যাহ্ বাল, হকারের জন্য এই কান্নাকাটি? করছে আর আমরা কি না কি ভেবে কান্না করছিলাম।
লামিয়া চোখ খুলে তাকাতেই দেখলো—লাবিব এক ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে হেসে অন্যদিকে ফিরলো সে।
ঠিক তখনই পাশ থেকে এক বৃদ্ধা চেঁচিয়ে উঠলো –
– কি লো চ্যাংড়া পোলা, এই ভোরে নেংটা হইয়া বাইর হয়েছোস ক্যান?
লাবিব ভ্রু কুঁচকে নিজের দিকে তাকালো, তারপর মহিলার দিকে –
– আমি তো নেংটা না, প্যান্ট পরেছি।
– ওমন প্যান্ট পরলে কী, নেংটাই লাগতাছে।
পাশ থেকে লামিয়া ফিক করে হেসে উঠলো। লাবিব বিরক্ত হলো। বৃদ্ধা আবার বললো –
– এইরকম হইয়া বাহির হইও না। আমিই তো কন্ট্রোল করতে পারতাছি না, আশেপাশের ছিড়িরা তোরে গিলা খাইতাছে চোখ দিয়া।
বলে লজ্জায় চলে গেলো।
লাবিব হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইলো। লামিয়া খিকখিক করে হেসে বললো –
– শেষে কি না, মঞ্জুর দাদী আপনাকে দেখে কন্ট্রোললেস হয়ে গেলো।
সব ভাইবোন ঠোঁট টিপে হাসছে। লাবিব বিরক্ত চেহারা করলো।
শেষে আজমির সাহেব নির্দেশ দিলেন মেয়েকে আর ওই হকারকে খুঁজে আনার। মতিন তালুকদার-ময়না বেগম চলে গেলো, ধীরে ধীরে ভিড় ঠেলে বাসায় গেলেন।
একে একে সবাই স্থান ত্যাগ করলো। লামিয়া বাসার দিকে পা দিতেই
লাবিব ডাকলো –
– এই দাঁড়া।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে ঘুরে তাকালো।
– সারাদিন এমন খিকখিক করে হাসিস কেন? একদম বিশ্রী লাগে তোকে।
– আপনিও তো খালি গাঁয়ে মেয়েদের সামনে দাঁড়িয়ে শরীর দেখান , তখন ও তো বিশ্রী লাগে । আপনাকে সে কথা কী আমি একবার ও বলেছি?
– আমাকে বিশ্রী লাগে?
– জি, খুব। তবে…
– তবে কী?
– তবে প্যান্টটাও খুলে নিন, তাহলে আর তেমন বিশ্রী লাগবে না।
– বলছিস তাহলে?
– হ্যাঁ বলছি।
লাবিব দুষ্টু হেসে শর্টসের দিকে হাত নিয়ে বললো –
– তুই যখন বলছিস, ট্রাই করে দেখতে পারি।
– মা…মানে?
লাবিব কোমড় থেকে পেন্ট নামাতে নামাতে বললো
– দেখ তো এখন কেমন লাগছে ?
প্যান্ট একটু নামাতেই লামিয়া চোখ বড় বড় করে –
– আস্তাগফিরুল্লা!
বলেই দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।
লাবিব পেছন থেকে চেঁচিয়ে বললো –
– দাঁড়া! কমেন্ট দিয়ে যা কত সুন্দর লাগতেছিলো এই পাটকাঠি।
কিন্তু লামিয়া আর ঘুরলো না।
তা দেখে লাবিব ঠোঁট কামড়ে হেঁসে উঠলো।
পিছন ঘুরতেই দেখলো মনিকা দাঁড়িয়ে আছে, চোখ চকচক করছে। দৌড়ে এসে বললো –
– লাবিব, show me. আমি কমেন্ট করবো তোমাকে কেমন লাগবে।
লাবিব বিরক্ত হয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলো। মনিকা রাগে ইসলাম বাড়ির দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে লাবিবের পিছনে হাঁটলো।
অফিসে যাবার জন্য আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন শফিউর খান। টাইটা ঠিক করতে করতে হঠাৎ পিছন থেকে ছোট্ট কণ্ঠ ভেসে এলো—
– বাবা, আসবো?
শফিউর খান আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার মেয়ে শারমিন। তিনি মিষ্টি হেসে বললেন—
– এসো।
শারমিন আস্তে আস্তে বাবার সামনে এগিয়ে এসে থেমে গেলো। মুখ দেখে সহজেই বুঝতে পারলেন, মেয়েটা কিছু বলতে এসেছে। তাই তিনি কোমল গলায় বললেন—
– কিছু বলবে?
শারমিন মাথা নেড়ে ছোট্ট স্বরে বললো—
– বাবা… আমি আমাদের কোম্পানিতে জয়েন হতে চাই।
শফিউর খান ভ্রু উঁচিয়ে তাকালেন, তারপর শান্তভাবে বললেন—
– কবে থেকে?
– তুমি বললে আজ থেকেই।
মেয়ের আত্মবিশ্বাসী উত্তর শুনে শফিউর খান হেসে উঠলেন। তারপর মেয়ের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলেন—
– আমি অপেক্ষায় করছি। রেডি হয়ে এসো, আজ থেকেই শুরু করো।
শারমিন খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। হাসিমুখে বললো—
– ঠিক আছে বাবা, একটু অপেক্ষা করো। আমি এই যাচ্ছি, এই আসছি।
বলে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো তৈরি হতে।
সাদা শার্টের উপর কালো ব্লেজার, চুলগুলো হাত দিয়ে সেট করে রাশেদ গাড়ি থেকে নেমে অফিসের ভিতরে প্রবেশ করলো। তাকে দেখে স্টাফরা সবাই দাঁড়িয়ে গেল। রাশেদ হাত দিয়ে ইশারা করে বসতে বললো, তারপর নিজের কেবিনে ঢুকলো। গায়ে থেকে কালো ব্লেজার খুলে সোফায় রেখে চেয়ারে বসল।
তখনই কেউ দরজায় নক করলো। রাশেদ আসতে বললো। লোকটি এসে জানালো—
– স্যার, নাসির কে. ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির ম্যানেজার মিঃ কাদের সাহেব এসেছে আপনার সাথে দেখা করতে।
রাশেদ কপাল ভাঁজ করে বললো—
– কেনো?
– তা জানি না স্যার, তবে বললো যা বলার আপনার সাথেই বলবে।
– ঠিক আছে, ওনাকে ভেতরে আসতে বলুন।
লোকটি মাথা নেড়ে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর কাদের সাহেব এল। রাশেদ বসতে বললো।
– তো, মিঃ কাদের সাহেব, আমাদের কোম্পানিতে আপনাদের মতো এতো বড় মানুষের আগমনের কারণ কী?
কাদের সাহেব হালকা হেসে বললো—
– আসলে…
– আসলে নকলে বুঝি না, সোজাসাপ্টা বলুন।
– আমাদের কম্পানির ওনার, নাসির কায়সার স্যার, আপনার কোম্পানির সাথে একটা ডিল করতে চায়।
রাশেদ কড়া সুরে জিজ্ঞেস করলো—
– কেমন ডিল?
কাদের সাহেব সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বললো—
– আসলে, আমাদের কোম্পানি চাইছে আপনার কোম্পানির সাথে জয়েন্ট প্রোজেক্টে কাজ করতে। কিছু বড় ইনভেস্টমেন্ট আছে সামনে, সেটা নাসির স্যার চাচ্ছেন IK গ্রুপের সাথে শেয়ার করতে।
রাশেদ একটু ভেবে বললো—
– ঠিক আছে, আমি সবার সাথে কথা বলে জানাবো।
কাদের সাহেব খুশি হয়ে বললো—
– ঠিক আছে স্যার, জানাবেন। আজ আসি।
বলেই উঠে চলে গেল। রাশেদ চোখ বন্ধ করে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর ফোন হাতে নিয়ে কাকে যেন মেসেজ করতে করতে হালকা হেসে উঠলো।
বাগানে এক পা উঁচু করে কান ধরে মুখ লকটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া, মাহির, তায়েব আর তায়েবা। তাদের সামনে হাতে ঝাটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন লতিফা বেগম। একটু দূরে মাথা নিচু করে মন খারাপ করে বসে আছে কুকুরছানাটা—যার নাম লামিয়া দিয়েছে জ্যাকি। মনে হচ্ছে লামিয়াদের মতো ওরও মন খারাপ হয়ে আছে।
এমন সময় অফিসের জন্য তড়িঘড়ি করে সবাই বেরিয়ে আসলো বাসা থেকে। উঠোনের এ দৃশ্য দেখে তারা থমকে দাঁড়ালো। লাবিব তা দেখে মুখ টিপে হেসে তাদের সামনে এসে কয়েকটা ছবি তুলে নিলো। সেটা দেখে চারজনই বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
শারমিন এগিয়ে এসে বললো—
– মেজো মা, এভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন কেন?
তীব্র রেগে লতিফা বেগম বললেন—
– এই চার বেয়াদব ছেলে-মেয়ে বাড়ির ভেতরে কুকুরের ছানা ঢুকিয়েছে!
তার কথা শুনে সবাই চোখ ফেরালো ছানাটির দিকে।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো—
– মা, ওর নাম জ্যাকি। কুকুরের ছানা না, সম্মান দিয়ে কথা বলো
কথা শেষ হতেই পিঠে ঝাটার বাড়ি এসে পড়লো।
– উফ মা, ব্যথা পাচ্ছি!—বলেই পাশ ফিরলো লামিয়া। চোখে পানি এসে গেলে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো—
– বাবা, কিছু বলবে না?
লতিফা বেগম আবার তেড়ে আসতেই, হামিদ সাহেব কড়া গলায় বললেন—
– আর একটা বাড়ি যেন না পড়ে ওদের শরীরে।
রাগে গজগজ করতে করতে লতিফা বেগম বললেন—
– তাহলে কী করবো? কুকুর নিয়ে এসেছে কেন? এখনই বলেন, এইটাকে বাড়ি থেকে দূরে ফেলে আসুক!
কাঁদো কাঁদো গলায় লামিয়া বললো—
– বাবা, প্লিজ! এই বাচ্চাটা খুব অসহায়। আমরা ওকে কাছে রাখি না? এত বড় বাড়িতে কি ওর একটু জায়গা হবে না? বড় চাচা, বলো না, ও যেন এখানে থাকে।
বলেই নাটকীয় ভাবে ঠোঁট উল্টে কাঁদতে শুরু করলো।
লাবিব ভ্রু কুঁচকে তাকালো লামিয়ার দিকে ।
হামিদ সাহেব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
– ওর দেখা-শোনা করবে কে?
– আমি করবো, বাবা। প্লিজ থাকতে দাও ওকে।
পাশ থেকে শারমিন হেসে বললো—
– আঙ্কেল, ছানাটা কিন্তু অনেক সুন্দর আর কত সুইট!
হামিদ সাহেব বড়ভাই আনিসুল সাহেবের দিকে তাকালেন। আনিসুল সাহেব চোখের ইশারায় সম্মতি দিলেন।
তখন হামিদ সাহেব বললেন—
– ঠিক আছে, থাকতে পারে। তবে তোমাদেরই দেখে রাখতে হবে।
এই কথা শুনেই লামিয়া, মাহির, তায়েব আর তায়েবা খুশিতে লাফিয়ে উঠলো। তাদের সাথে জ্যাকি-ও লাফাতে শুরু করলো। দৃশ্যটা দেখে সবাই হেসে উঠলো। লতিফা বেগম রেগে থাকলেও হাসি চেপে রাখতে পারলেন না, শেষে মিছে রাগ দেখাতে লাগলেন।
লামিয়া দৌড়ে গিয়ে জ্যাকিকে কোলে তুলে নিলো। আজমির সাহেব হেসে বললেন—
– আচ্ছা, চলো, এখন সবাই লেট হয়ে যাচ্ছে।
বলেই সবাই এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে। লাবিব শেষবারের মতো লামিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চলে গেলো। আবির লাবিব কে হাসতে দেখে, এগিয়ে এসে বললো – হেঁসে লাভ নেই ভাই, মেয়ে কিন্তু আগের থেকেই বুকিং অন্যের বউয়ের উপর নজর দিয়ে লাভ নেই।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ১০
তা শুনে লাবিব আবার হেঁসে উঠলো। লাবিবের হাঁসি দেখে আবির ও হেঁসে উঠলো।
গাড়িতে উঠার আগে একবার পিছন ফিরে তাকালো ইসলাম বাড়ির বাগানের দিকে, খিলখিল করে হাসছে লামিয়া।
তা দেখে বিরবির করে বললো – ঢংয়ের রানী। বলেই গাড়িতে উঠে চলে গেলো অফিসে উদ্দেশ্যে।
