Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৮

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৮

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৮
Tahmina Akhter

— আলোদের বাড়িতে গিয়েছিলাম আজ সকালে…
মাহরীনের কথা শুনে মেঘালয় মাথা উঁচু করে তাকালো।
—আলোর বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব রেখেছি। উনি হ্যা বা না কিছুই জানায়নি।
মাহরীনের কথায় যেন মেঘালয়ের মাঝে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। এদিকে মাহরীন মন খারাপ করে বসে আছে। মেঘালয় ধীরেসুস্থে ভাত খেলো। তানিয়া আর মাশফি মেঘালয়ের খাবার শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করছে। মেঘালয় চেয়ার ছেড়ে বেসিনে গিয়ে হাত ধুলো তারপর টাওয়ালে হাত মুছে মাহরীনের চেয়ারের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহরীন মেঘালয়ের হাত ধরে বলল,

— আমার ভীষণ নার্ভাস ফিল হচ্ছে মেঘালয়! যদি আলোর বাবা না করে দেয়?
— এটা তো তাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এখন অপিনিয়ন যাই আসুক মেনে নিতে হবে। দুশ্চিন্তা না করে ঘরে গিয়ে আরাম করো।
মাহরীন উঠে চলে গেল তার ঘরের দিকে। মেঘালয় নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে তানিয়ার ডাক শুনে মেঘালয় ফিরে তাকালো।
— কিছু বলবেন, ভাবি?
— দশমিনিট সময় হবে? কিছু কথা বলার ছিল।
নাইট ডিউটি পর মেঘালয়ের ঘুমে চোখ ভেঙে আসছিল।কিন্তু, তানিয়ার ডাক উপেক্ষা করে যাওয়া মানে বেয়াদবি। অগত্যা মেঘালয়কে আবারও সেখানে যেতে হলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— আমি, মাশফি এবং আম্মু গিয়েছিলাম সেই মেয়েটির বাসায়।
কথাটি বলে সামান্য বিরতি নিয়ে আবারও বলতে শুরু করল তানিয়া।
— সরকারি বাসা। বাসাগুলো তেমন উন্নত না। ধরো তোমার আলোর সঙ্গে বিয়ে হলো। কিন্তু তুমি এক ঘন্টার জন্য তোমার শ্বশুরের বাসায় টিকতে পারবে না। মানে এতটাই অবস্থা শোচনীয় তাদের।
মাশফি এবার তানিয়ার পক্ষ নিয়ে বলল,
— দেখ মেঘালয়,মা হচ্ছে আবেগ্রপ্রবণ মানুষ। তার কথায় তো হ্যা বললে হবে না! তুই কি সেই আগের মত ছোট আছিস?

— মায়ের কথা আমি সবসময় অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি ভাইয়া। আজও করব। মা যেই ডিসিশন নিয়েছে সেটা নিশ্চয়ই অনেক ভেবেচিন্তে নিয়েছে।
— মেয়ের পরিবার গরীব। তানিয়া ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলল।
— মেয়ের পরিবার গরীব? তো কি হয়েছে? মেয়ের পরিবার মানুষ হলেই চলবে। কারণ মানুষের সঙ্গে সংসার করা গেলেও মানুষরুপী শয়তানগুলোর সঙ্গে সংসার করা সম্ভব নয়।
মেঘালয় কথাটি বলেই তার ঘরের উদ্দেশ্য চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই তানিয়া বলে উঠল,
— তারমানে তুমি ওই মেয়েকে বিয়ে করবে?
— ওই মেয়ের খুব সুন্দর একটা নাম আছে, ভাবি। নাম সম্বোধন করে কথা বললে শুনতে ভালো লাগে। আলো মনে হয় না আমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে। তাই নিশ্চিত থাকতে পারেন।

— যদি রাজি হয়?
তানিয়ার কটাক্ষ করে বলা কথাখানি শুনে মেঘালয় হেসে ফেলল। মাশফির দিকে তাকিয়ে বলল,
— ভাইয়া, তোমার বউ কেন আলোকে নিয়ে ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে?
— মা যে আলো বলতে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে সেটা দেখেই ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে। ভাবছে আলো তোর বউ হয়ে এলে মা’কে হাতের মুঠোয় রাখবে।
মাশফি কথাটি বলেই হো হো করে হেসে ফেলল। সেই সঙ্গে মেঘালয় হেসে ফেলল। এদিকে তানিয়ে রেগেমেগে উঠে চলে গেল সেখান থেকে। কারন, মাশফি তানিয়ার মনের অবস্থা বুঝে জায়গা মত তীর ছুঁড়েছে।
তানিয়া চলে যেতেই মাশফি মেঘালয়কে বলল,
— এদিকে আয়, পাশে এসে বস। কয়েকটা কথা বলি।
মেঘালয় মাশফির পাশের চেয়ার বসতে বসতে বলল,
— বলো, কি বলবে?
— আলোর বাবা একজন রেলওয়ে কর্মকর্তা। এলাকায় বেশ ভদ্রলোক মানুষ হিসেবে পরিচিত। আলো ভীষণ ভালো একটা মেয়ে। আমি খোঁজখবর নিয়েছি। টাকাপয়সা সব না মেঘালয়। জীবনসঙ্গী হিসেবে আলো অনেক অনেক ভালো হতে পারে। কারণ, যেই মেয়ে রাস্তায় অজানা মানুষকে হেল্প করতে পারে সেই মেয়ে নিজের মানুষদের হয়ত আরও বেশী আগলে রাখবে।

— আরে ভাইয়া, তোমরা কি শুরু করেছো বলো তো? আরে মাত্র বিয়ের প্রস্তাব গিয়েছে তাদের বাড়িতে। তারা বিবেচনা করুক। তারপর, না হয় এসব কথা বলো?
মেঘালয়ের কথার মাঝে মাশফি কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছোট ভাই দু’টোকে সে ভীষণ ভালোবাসে। বিয়ের পর স্ত্রীর জন্যই হয়ত পরিবার থেকে কিছুটা ছিটকে পরেছে। কিন্তু ভালোবাসা সেই আগের মতই আছে। মেঘালয় কি মায়ের কথা মানতে গিয়ে নিজের সঙ্গেই না আবার অন্যায় করে বসে? সেই চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
— আলো মেয়েটাকে তোর কেমন লাগে, মেঘালয়?
মাশফির কথা শুনে মেঘালয় থমকে যায়। কারণ, বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাদের এত সখ্যতা হয়নি যে এমন ব্যাপার নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে পারবে।

— উত্তর দিতে হবে?
মেঘালয় দুষ্টুমি করে জবাব দেয়। মাশফি সিরিয়াস ভঙ্গিতে মেঘালয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— জবাব চাই। কারণ, তুই আর মা মিলে কথা পেটে নিয়ে ঘুরিস। তোরা সোজাসাপটা কথা বলিস না কখনো।
— জবাব নেই আমার কাছে। আমি চললাম। ঘুম পাচ্ছে। সারারাত হসপিটালে খেটে এসে নিজের বিয়ের আলাপ করতে এ্যানার্জি পাচ্ছি না। গুড বায়।
মেঘালয় চলে গেল। এদিকে মাশফি চিন্তিত ভঙ্গিতে মোবাইল ফোন বের করে কল করল কাব্যের নাম্বারে। কাব্যের কি মতমত সেটাও তো জানা জরুরি।

আলো সবেমাত্র বাসায় ফিরেছে। সকাল থেকে বাড়িতে ছিল না। সকালে গিয়েছিল কোচিংয়ে। কারণ শনিবার দিন সকালে কোচিংয়ে পড়ায়। কোচিং শেষ করে টিউশনি পড়াতে চলে যায়। টিউশনি শেষ করে এতক্ষণে ফিরল। বাসায় ফেরার পর আজ সিতারা বেগমকে বেশ আনন্দিত মনে হচ্ছিল আলোর কাছে। তবুও নিজের ছোট মস্তিষ্কে চাপ না দিয়ে গোসলে ঢুকল। গোসল শেষ করে। বের হয়ে দেখল সিতারা বেগম ভাত প্লেটে বেড়ে রেখেছে। আজ যে তার মায়ের মন ভীষণ ভালো, আলো টের পেল। কারণ, তার মায়ের মন যেদিন ভালো থাকে সেদিন আলোকে ভীষণ আদর করে। যেমন করে একজন মা আদর করে তার সন্তানকে। আলো নিঃশব্দে ভাত খেলো। আলোর ভাত খাওয়া শেষ হতে না হতেই আফসার সাহেব দুই ব্যাগভর্তি বাজার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। সিতারা বেগম এগিয়ে যায়। ব্যাগদুটো রান্নাঘরে রেখে ফিরে এসে আলোকে বলল,

— তোর বাবার নাকি কি কথা আছে তোর সঙ্গে! তোর বাবার ঘরে যা।
— বাজারগুলো গুছিয়ে দেই তোমায়। একা পারবে?
— পারব। তুই যা।
আলোর যেন আজ অবাক হবার দিন। অবাকের রেষ কাটিয়ে চলে গেল তার বাবার ঘরে। তার বাবা সবেমাত্র পরনের ঘমার্ক্ত কাপড়গুলো ছেড়ে লুঙ্গি পরছেন। ঠিক ওইসময় আলো তার বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— বাবা। আসব?
— আয়। অনুমতি নেয়ার কি আছে?
আলো ধীরপায়ে হেঁটে ওর বাবার খাটে গিয়ে বসল। আফসার সাহেব খাটের পাশে রাখা একটা প্লাষ্টিকের চেয়ারে বসলেন।

— তোর সঙ্গে জরুরি কিছু কথা ছিল। তুই যদি অনুমতি দিস তাহলে বলি?
— অনুমতি নেয়ার কি আছে?
আলো কথাটি বলতেই আফসার সাহেব হেসে বললেন,
— আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছিস!
আলো মুচকি হেসে বলল,
— এমন স্পর্ধা আমার নেই বাবা। তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার সময় অনুমতি নেবে কেন? আমি না তোমার মেয়ে? মেয়েদের কাছে বাবারা অনুমতি নেয় না।
আলোর কথা শুনে আফসার সাহেবের আনন্দে বুক ভরে উঠল। মেয়ের কথাবার্তা প্রায়ই তাকে মুগ্ধ করে। মেয়ে দেখতে তার মত হলেও, কথাবার্তার ধাঁচ পেয়েছে তার মায়ের।

— তোর জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তুই অনুমতি দিলেই আমি তাদের আসতে বলব আগামীকাল।
আলো থমকে যায়। হুট করে মনের মাঝে আবারও আতংক ভর করে। কারণ, তাকে দেখতে আসা মানে আরও একটা অপমানের দিন তার জীবনের অধ্যায়ে যোগ করা। তার বাবার মলিন মুখ, তার মায়ের কটাক্ষ কথাবার্তা হজম করা আলোর পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব নয়।

— বাবা, আমি বিয়ে করতে না চাইলে কোনো অসুবিধা আছে? “বিয়ে” “আমাকে দেখতে আসবে” এসব শব্দ আমার কাছে এখন আতংকের শব্দ। বাবা, আমাকে এসব শব্দ থেকে মুক্তি দেয়া যায় না?
আলোর কথা শুনে আফসার সাহেবের মন খারাপ হয়ে যায়। মেয়ের কথাগুলো মনে দাগ কেটে রক্তাক্ত করে তোলে। সমাজের নিয়ম মানতে হয় বলেই তো মেয়েদের বিদায় দিতে হয়। নয়ত, কে চায় নিজের অংশকে পরের ঘরে দিতে?আফসার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মেয়েটাকে নিয়ে ইদানিং ভীষণ চিন্তা হয়। কিন্তু, মাহরীন আহমেদের কাছ থেকে আজ মেঘালয়ের জন্য আলোর বিয়ের প্রস্তাব শুনে আনন্দে ভরে উঠেছে আফসার সাহেবের মন।

— মা’রে মেয়েদের জন্ম হয়েছে পরের ঘরের জন্য। মেয়েরা হচ্ছে পরের বাড়ির আমানত। পরের বাড়ির আমানতকে পেলে পুষে বড়ে করে মেয়ের বাবা-মায়েরা। একদিন আমানত ফিরিয়ে দেয়ার সময় ঘনিয়ে আসে। আমানত ফিরিয়ে দিতে হয়। বাবা মাকে শত কষ্ট বুকের মাঝে রেখে মেয়েকে বিদায় দিতে হয়। সমাজের নিয়ম, সৃষ্টিকর্তার নিয়ম যে ভঙ্গ করা যায় না। যদি নিয়ম ভঙ্গ করার জন্য আমি অনুমতি পেতাম তাহলে আমি নিয়ম ভেঙে তোকে আমার কাছে রেখে দিতাম। কিন্তু, এমন নিয়ম যে কোনোদিনও হবে না।
আলোর চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পরছে। মাথা নীচু করে রেখেছে বিধায় আফসার সাহেব টের পেলেন মেয়ের নিঃশব্দ কান্না টের পেলেন না।

— মাহরীন আহমেদ এসেছিল আজ সকালে। তোকে উনার ছোট ছেলে মেঘালয়ের জন্য চাইছে। ছেলে চট্রগ্রাম মেডিক্যালের ইন্টার্নি চিকিৎসক।
ব্যস তিনটা বাক্য শুনে আলো চমকে তাকালো তার বাবার দিকে। কি বলছে তার বাবা
“মেঘালয়!” “মাহরীন আন্টি! ”
তাকে কেন চাইবে? তার মাঝে স্পেশাল কিছুই নেই। মেঘালয় মানুষটাকে সেই প্রথমদিন থেকেই আলো মিথ্যা বলেছে, এড়িয়ে গেছে। শেষবার তো তার সামনে অপ্রীতিকর অবস্থায় পরেছিল।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭

— তুই অনুমতি দিলে আমি তাদের আগামীকাল আসতে বলব।
আলোর অবাকের রেষ কাটতে না কাটতেই আফসার সাহেবের শেষের কথাটুকু শুনে আলো চট করে উঠে দাঁড়ালো। এই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে তার বাবাকে বলে গেল,
— আমি তাদের যোগ্য নই, বাবা। তাদের আসতে বারণ করে দেবে। আমার এত সৌভাগ্য হয়নি আমি মাহরীন আহমেদের ছেলের বউ হতে পারব।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৯