Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৩

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৩

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৩
নুরিয়া ইসলাম

লাইব্রেরির এক কোণের নিরিবিলি টেবিলে ইনায়া গভীর মনোযোগে পড়াশোনা করছে। তার সামনে খোলা কোরআনের তাফসীর, ছড়িয়ে থাকা কিছু নোট আর একটা হাইলাইটার সব মিলিয়ে ওর মুখে এক প্রশান্তি, চোখে মনোযোগের দীপ্তি। বাইরের জগতের কোলাহল থেকে দূরে, ইনায়া নিজের জগতে ডুবে আছে।
এমন সময় লাইব্রেরিতে প্রবেশ করে এরিক। সে মূলত রিসার্চের বই খুঁজতে এসেছে, কিন্তু ইনায়ার শান্ত মুখ দেখে থেমে যায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মনে মনে বলে,

“How can someone look this peaceful… when I’m a goddamn storm?”
(কেউ এতো শান্ত কীভাবে থাকতে পারে?যেইখানে আমি জলন্ত এক আগুন।)
এরিক চুপচাপ ইনায়ার কাছের টেবিলে গিয়ে বসে, এমন দূরত্বে যেখান থেকে ইনায়াকে স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু কথা বলা অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। কয়েক মিনিট পর, ইনায়া হালকা বিরক্তিতে চোখ তুলে তাকায়, দু’জনের চোখে চোখ পড়ে যায়; নীরবতা ভেঙে ইনায়া ঠান্ডা গলায় বলে,
“আপনি সবসময় আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন কেন? দয়া করে, এমনভাবে আমার দিকে তাকাবেন না।”
এরিক ভ্রু উঁচু করে বলে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“কেন, কোন সমস্যা?”
ইনায়া ভ্রু কুচকে উত্তর দেয়,
“হ্যা, সমস্যা। অনেক বড় সমস্যা। ইনফ্যাক্ট, আপনি নিজেই আমার জন্য একটা সমস্যা।”
এরিক মকিং হাসি দিয়ে বলে,
“উপায় নেই সহ্য করা ছাড়া। তুমি নিজেই আমাকে প্রতিনিয়ত ডিসট্রাক্ট করছো, এতে আমার কিছু করার নেই।”
ইনায়া মুচকি হেসে বলে,
“মানুষের ভিতরে অনেক স্তর থাকে, মিস্টার অ্যাসফোর্ড। আপনার ধারণা সীমিত, সেটা আমি জানি।”
এরিক একটু চুপ করে থেকে স্বীকার করে,
“হয়তো ঠিক বলছ। তবে ইদানিং কিছু জিনিস… বোঝার চেষ্টা করছি।”
ইনায়া এবার একটু নরম হয়ে বলে,
“বোঝার চেষ্টা করলেই সব বুঝে ফেলা যায় না।”
এরিক মাথা নিচু করে মৃদু হাসে,

“সব বুঝে ফেলতে চাইও না, বেবিগার্ল। কিছু রহস্য থাকাই ভালো। কিন্তু এটাও সত্যি, তোমাকে দেখে আমি বারবার ডিসট্রাক্ট হই।”
ইনায়া চোখ সরিয়ে নিচু স্বরে বলে,
“তাহলে চোখ নামানো শিখে নিন, মিস্টার অ্যাসফোর্ড। Not everything you notice belongs to you.”
এরিক নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বলে,
“I know.”
সারা লাইব্রেরি জুড়ে নেমে আসে নিস্তব্ধতা। এরিক উঠে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আগে থেমে বলে,
“তুমি আলাদা। খুব বেশি আলাদা। আর সেটা আমাকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছে, যা আমি নিজেও কল্পনাও করিনি।”

ক্যালিফোর্নিয়ার ঝলমলে এক হাই-এন্ড লাউঞ্জে, জমকালো আলো আর হালকা জ্যাজের ছোঁয়ায় এ্যারেন, এ্যালেক্স, এলিনা আর জুলি পুরো গ্যাং এক টেবিলে বসে রয়েছে । সামনে ড্রিংক আর হালকা স্ন্যাকস, অথচ এরিক টেবিলের কোণে চুপচাপ, গ্লাসটা হাতে শুধু নাড়িয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ এ্যারেন হেসে বলে,
“তো মিস্টার ব্যাড বয়, আর কতদিন লাগবে ওই হিজাবি কুইনকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে? বাজির টাইমলাইন শেষ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! উফ্, Poor girl doesn’t even know she’s the center of a damn bet!”
(বেচারি মেয়ে, জানেই না সে আমাদের বাজির কেন্দ্র বিন্দু)
এ্যালেক্সঃ “সত্যি বল তো ভাই, কতদিন লাগবে মেয়েটাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে? ম্যান… ইউর গেম স্লো হয়ে যাচ্ছে। তুইই তো বলছিলি, ‘দুই সপ্তাহের মধ্যে মেয়েটাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলবি।’”
এলিনা একটু মুচকি হেসে বলে,

“আমি আগেই বলেছি, আমার মনে হয় না মেয়েটা তোর প্রেমের ফাঁদে পড়বে। She’s not like the others, sweetheart.”(সে অন্যদের মতো নয়)
জুলি চোখে রহস্যময় হাসি নিয়ে বলে,
“কী হলো এরিক, কিছু বল? এমনটা নয়তো আবার, মিস্টার এরিক অ্যাসফোর্ড এবার নিজেই ফাঁদে পড়ছে?”
এ্যারেন আবার ঠাট্টা করে বলে উঠে ,
“Bro, everything alright? এত চুপচাপ কেন? Don’t tell me… the player is catching feelings?”

( বলিস না যেন, শিকারী শিকারের প্রেমে পড়েছে)
এরিক ওদের কথায় কান না গিয়ে, নিজের ভাবনায় হারিয়ে যায়, মনে মনে সে বলে উঠে,
ওকে দেখলেই আমার ভিতরের সব রাগ, জেদ, অহংকার নিঃশব্দে গলে যায়।তার চোখের গভীরে ডুবে গিয়ে আমার সমস্ত অস্থিরতা শান্ত হয়ে আসে। ওর সামনে দাঁড়ালেই আমি কেমন যেন খোলা বই হয়ে যায় ,যার প্রতিটি পৃষ্ঠা তার জন্য উন্মুক্ত, আমি তাকে বারবার সুযোগ দিই আমার আত্মার গভীরে ডুব দিতে, আমার সবকিছু পড়ে ফেলতে। তার সামনে আমি নিজেকে বারবার হারিয়ে ফেলি, আবার নতুন করে খুঁজে পাই। প্রতিবারই আবিষ্কার করি এক নতুন আমাকে, এক নতুন অনুভূতিকে। এই বাজিটা আমি জিততে চাই না, বরং চাই সে আমাকে ভেঙে দিক, আমার অহংকারটা চূর্ণ করে দিক, আমাকে এমনভাবে হারিয়ে দিক যেখানে হারটাই হয়ে উঠবে আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। জীবনে কোনোদিন না-হারা এরিক অ্যাসফোর্ড আজ শুধু ওই মেয়ের কাছে, তার ভালোবাসার কাছে, নিঃশর্তভাবে হারতে চায়।
এরিক ধীরে গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো ,

“এই বাজি এখানেই শেষ।”
অ্যালেক্স বিস্ময়ে বলে উঠলো ,
“What?! Are you serious?”
এলিনা অবাক হয়ে বলে,
“Wait… are you saying you actually like her?”
(কী বলতে চাচ্ছিস তুই? তুই কী মেয়েটাকে পছন্দ করিস?)
এরিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“Maybe I am. Maybe I always did.
The storm inside me, it quiets down when she’s around.
But tell me, does a storm ever deserve peace?”
(হয়তো ভালোবাসি তাইতো আমার ভিতরের সমস্ত উম্মদনা একমাএ তার সংস্পর্শে শান্ত হয়ে যায়।আমাকে বল, কখনো কী তুফান নিস্তব্ধতা ডিজার্ভ করে)
এরিকের মুখে নিষিদ্ধ ভালোবাসার স্বীকারোক্তি শুনে, চারজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো।
এ্যারেন ফিসফিসিয়ে বলে,

“Are you mad? She is Muslim.”
(তুই কী পাগল হয়ে গেছিস? সে মুসলিম)
এরিক দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠে,
“So what. I don’t care about her religion. I like her, that’s enough for her.”
(তাতে কী, আমি কোন কিছুর পরোয়া করি না, আমি তাকে ভালোবাসি এটাই তার জন্য যথেষ্ট।)
এরিকের জেদের কাছে চারজনই হার মেনে নেয়। ভালোবাসার এই পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, সেটা ভেবে সবাই একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সকালের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সান ফ্রান্সিসকোর আকাশে। শহরটা এখনও ব্যস্ত হয়নি পুরোপুরি, রাস্তাগুলো আধা-খালি। তবে মসজিদের পাশের ছোট্ট এক গলিতে মানুষেমানুষের আনা-গুনা লেগে আছে।
ইনায়া আজ তার ভাই তানভীরের সাথে ফ্রাইডেতে জুম্মার নামাজ পড়তে এসেছে শহরের পরিচিত এক মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে। কালো বোরকা আর হালকা নীল হিজাবে ঢেকে রাখা ইনায়ার মুখে প্রশান্তি, ফুটে উঠে । মসজিদের করিডোর ধরে হেঁটে যাবার সময়, তার দৃষ্টি অজান্তেই চলে যায় বাইরে। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে পরিচিত এক অবয়ব।

এরিক তার শেডো রাইডার বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, চোখে সানগ্লাস,কিছু সময় পর পর সিগারেটে ফুক দিচ্ছে আর ধোঁয়া উড়াচ্ছে বাতাসে। চারপাশের মানুষ বিরক্ত হয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে কারণ মসজিদের সামনে ধূমপান, বিশেষ করে নামাজের সময়, সাধারণত একধরনের অসম্মান হিসেবেই ধরা হয় কিন্তু এরিকের মাঝে কোন হেলদোল দেখা গেল না।
ইনায়া চোখ সরিয়ে নেয়। ভ্রু কুচকে উঠে তার, কিন্তু নামাজ শুরু হয়ে যাওয়ায় সে কিছু বলে না। সে কিবলার সামনে দাঁড়িয়ে তাকবির দেয়, নামাজ শুরু করে দেয়।
তবে মনটা ঠিক মনোযোগে বসে না। তার সিজদাহর ভেতরেও ভেসে উঠে এরিকের সেই সিগারেট টানার মুহুর্ত।সে নিজেকে সামলে,

নামাজ শেষে দোয়া করে বের হয়ে আসে । তানভীরকে বলে, “ ভাইয়া তুমি গাড়ি স্টার্ট দাও, আমি একটু আসছি।”
এই বলে ইনায়া ধীর পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় এরিকের দিকে। এরপর কোন কিছুর পরোয়া না করে এরিকের মুখ থেকে একটানে সিগারেটটা কেড়ে পায়ের তলায় পিষে দেয়। কেউ এরিকের মুখ থেকে সিগারেট কেড়ে নিয়েছে এটা এরিক বুঝতে পেরে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে পাঞ্চ মারার উদ্দেশ্য হঠাৎ তার মুখের সামনে ভেসে উঠে পরিচিত নারী অবয়ব।ইনায়া রেগে এরিককে বলে উঠে,
ইনায়া : “আপনি কি জানেন, এটা কতটা অসম্মানজনক? মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন!”
এরিক ইনায়ার দিকে তাকিয়ে সাবলীলভাবে বলল, “তুমি নামাজ পড়ো, আমি সিগারেট খাই।দুইটাই তো শান্তির জন্য, তাই না?”

ইনায়া: “এটাকে শান্তি বলে না, এটাকে বলে অন্যদের বিরক্ত করা! আপনি সবসময় নিয়ম ভাঙ্গেন কেন?”
এরিক সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ইনায়াকে একটু টিজ করে বলে উঠে,
“নিয়ম-রীতির বাইরে চলতে ভালো লাগে। আর, তোমার মতো কাউকে দেখলে তো আরও বেশি।”
ইনায়া : “আপনি কখনো কারও অনুভূতি বুঝতে চান না। সবসময় নিজের মতো চলেন।”
এরিক ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলে,

কী করবো বলো? তোমাকে দেখে আমার সব নিয়ম ভাঙতে ইচ্ছে করে?”
ইনায়াঃ প্লিজ হেয়ালি করবেন না। আর কখনো মসজিদের সামনে এমন করবেন না। এটা পাপ।”
এরিকঃ ঠিক আছে,শুধু তোমার জন্য, কথা রাখলাম। কিন্তু বেবিগার্ল, আমি যে সহজে বদলাই না।”
ইনায়াঃ না বদলালেও, নিজেকে একটু নিয়ন্ত্রণ করতে শিখুন।”
এরিক : “তুমি শিখিয়ে দাও, আমি শিখে নেবো।
ইনায়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এরিককে একের পর এক কথা শুনায়,“আপনি কি ভাবেন, সবকিছু আপনার ইচ্ছেমতো চলবে? কারো অনুভূতির কোনো দাম নেই আপনার কাছে?” এরিক নীরবে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে ইনায়ার প্রতিটা শব্দ গলে যাচ্ছে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১২

তাকিয়ে থাকতে থাকতে, কখন যে এরিকের হাত আনমনে ইনায়ার গালের কাছে চলে গেছে, সে নিজেও টের পায় না। ইনায়া হঠাৎ ছিটকে সরে গিয়ে কাঁপা গলায় বলে ওঠে,
“Don’t touch me! It’s haram… এমনটা আর কখনো করবেন না।”

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ১৪