বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৩
রানী আমিনা
“আমাকে কবে বিয়ে দিবেন আম্মা?”
লাল ফ্রক পরা লুসিকে কাঁধের ওপরে বসিয়ে ঘরময় পায়চারী করতে করতে শুধোলো কোকো। আনাবিয়া আয়নার সামনে ঝুঁকে ঠোঁটের লিপস্টিক ঠিক করছিলো, উত্তর দিলো,
“তুই যেদিন চাইবি সেদিনই বিয়ে দিবো।”
“আমি তো এখনি চাই আম্মা!”
ফ্যালকন কাউচে বসে ছিলো, চাপা স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“এহ্, দিনে চৌদ্দবার বাসর করে এখন আসছে বিয়ে করতে!”
কোকো ওর মাথায় একটা চাটি মেরে চাপা ধমকে বলল,
“একশবার করবো, তোর তাতে কি রে হাঁসের বাচ্চা?”
আনাবিয়া শুনেও না শোনার ভান ধরে পড়ে রইলো, তার ছেলেগুলো দিনে দিনে বজ্জাত হচ্ছে। কোথায় কার সামনে কি বলছে সেগুলো দেখার প্রয়োজন মনে করছে না।
কোকোর মুখে ফ্যালকনের হাঁসের বাচ্চা সম্বোধন শুনে লুসি আধো বোলে ফ্যালকনকে ডাকলো,
“হাঁতেল বাত্তা!”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কোকো হেসে উঠতেই ফ্যালকন ফুসে উঠে লুসিকে এক টানে কোকোর ঘাড় থেকে নামিয়ে নিজের কোলে নিয়ে কোকোকে দেখিয়ে লুসিকে বলল,
“আর ও একটা গণ্ডার! বলোতো লুসি, গন-ডার”
“দন-দাল”
ফ্যালকন দাঁত মেলে পৈশাচিক হেসে কোকোর দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“দনদাল৷”
কোকো কটমট করে তাকিয়ে লুসিকে কেড়ে নিতে গেলো ফ্যালকনের থেকে, তখুনি দরজায় কড়া নাড়লো কেউ।
ফ্যালকন এগিয়ে গিয়ে পীপহোল দিয়ে দেখলো বাইরে কে আছে৷ ম্যানসনের এক মেয়ে কর্মচারীকে দেখে দরজা খুলে দিলো সে। মেয়েটি ভেতরে ঢুকে আনাবিয়াকে দেখে থমকালো ক্ষণিকের জন্য, পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে আনুগত্য জানিয়ে বলল,
“শেহজাদী, বিয়ের কার্যক্রম খুব শীঘ্রই শুরু হবে, মিস্টার সাদী আপনাকে নিচে নামতে অনুরোধ করেছেন।”
“ঠিক আছে, আমি আসছি।”
মেয়েটি আনুগত্য জানিয়ে চলে গেলো বাইরে। লুসির সাথে কোকো, ফ্যালকনকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে আরেকবার ঠিকঠাক করে আনাবিয়া নিজেও এগোলো বিয়ের আসরের দিকে।
ম্যানসনের হলরুমের মস্ত বিয়ের আসরের একাংশে বিরাট রেড ভেলভেট পর্দা টানানো৷ পর্দার ওপাশে বসে আনাবিয়া, তার আশেপাশে ছোটা ছুটি করছে লুসি। মাঝে মাঝেই আনাবিয়ার সম্মুখে রাখা ট্রে থেকে খাবার উঠিয়ে কুট কুট করে চিবোচ্ছে৷
পর্দার ওপারের দৃশ্য আনাবিয়ার নিকট দৃশ্যমান হলেও সে সকলের অগোচরে। মীরের থেকে নিজেকে আড়াল করতে জায়ান তাকে এই ব্যাবস্থা করে দিয়েছে৷ আনাবিয়া তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে আছে হলরুমের প্রবেশদ্বারের দিকে। যে কোনো মুহুর্তে প্রবেশ করবে মীর৷ সে প্রবেশ করলে তবেই বিয়ে পড়ানো হবে৷
কত দিন হচ্ছে?
প্রায় দুবছর সাত মাস, ন’শ তেতাল্লিশ দিন, সে লোকটাকে একটা পলকের জন্যও দেখেনি! তাদের সুখময় দিন গুলোতে মীরকে একটা দিন না দেখতে পেলে দম আঁটকে আসতো আনাবিয়ার, ছটফট করতো সে। ঘাড় গুজে পড়ে থাকতো নিজের কামরায়, একটা দানাপানি মুখে তুলতোনা, বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় খারাপ ব্যাবহার করে ফেলতো সকলের সাথে।
মীর নিজেও বুঝতো সেটা। আনাবিয়াকে রেখে কোথাও গেলে তাই যত দ্রুত সম্ভব ছুটে আসতো সে, নইলে প্রাসাদে তার ছোট্ট বউটি ঝড় তুলে ফেলবে যে! প্রাসাদে ফিরে আনাবিয়াকে বুকের মাঝে নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা রেখে প্রশমিত করতে হতো তার ক্রোধ, মিষ্টি আদরে পুষিয়ে দিতে হতো বিচ্ছেদের সময় টুকু।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আনাবিয়ার বুক চিরে৷ দৃষ্টি দিলো সে বিয়ের আসরের দিকে৷ জাভেদের বিপরীতে স্বচ্ছ লাল পর্দার অপর পাশে বসা মেহেরিন মেয়েটি। বউ সাজে তাকে পরীর মতোন লাগছে। জাভেদ পর্দার ওপার থেকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেহেরিনের দিকে। পাশেই দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পর পর দুষ্টু দুষ্টু কথা বলে চলেছে ফারিশ, জেসার আর জুনায়েদ। আনাবিয়া শুনতে পেলোনা ওদের কথা, কিন্তু খুব যে এনজয় করছে সবগুলো সেটা ঠিকই বুঝলো সে। মৃদু হেসে কোকোকে খুঁজলো সে ভিড়ের ভেতর।
ভিড় ঠেলে কোকো এসে দাঁড়ালো ফারিশের পাশে। ফারিশ চাপা সুরে জুনায়েদকে জিজ্ঞেস করলো,
“শেহজাদী কোথায় আছেন, জানোস?”
“হু, চতুর্থ তলার ডান দিকের উইংটা বাবা শেহজাদীকে দিয়েছেন। ওনার তো এতক্ষণে চলে আসার কথা এখানে৷”
“দেখছি না তো কোথাও!”
চতুর্দিকে সন্ধানী চোখে চেয়ে বলল ফারিশ। জুনায়েদ চাপা স্বরে বলল,
“বাবার বোধ হয় শেহজাদীকে নিয়ে কোনো প্লান আছে।”
“কিসের প্লান?”
“উনি বোধ হয় শেহজাদীকে হিজ ম্যাজেস্টির হাতে তুলে দিবেন। সেরকমই শুনেছি!”
ফারিশ আঁতকে উঠলো এক প্রকার৷ ছটফটিয়ে উঠে বলল,
“আমি আসছি!”
জুনায়েদ সাথে সাথে ওকে আঁটকে দিয়ে বলল,
“শেহজাদীকে জানিয়ে দিতে যাচ্ছেন নিশ্চয়? কিন্তু তা হচ্ছে না। বাবা বলেছেন আপনার ওপর নজর রাখতে, এবং আপনাকে শেহজাদীর আশেপাশে ঘেঁষতে না দিতে৷ তাই এখানেই থাকুন।”
“কাজটা তোরা একদমই ঠিক করছিস না। শেহজাদী যেতে চাননা হিজ ম্যাজেস্টির কাছে, তো তাকে জোরজবরদস্তি করে কেন পাঠানো লাগবে? এমন তো কথা ছিলোনা! তোরা সবাই মিলে শেহজাদীকে ধোঁকা দিচ্ছিস!”
“বাবা যা করতে বলেছেন আমি তাই করছি, তার আদতেই কি পরিকল্পনা সেটা আমিও জানিনা, ধারণা করেছি মাত্র।”
“জুনায়েদ, ছেড়ে দে আমাকে৷ আমি এখানে আর এক মুহুর্তও থাকবোনা৷”
জুনায়েদ ফারিশকে টেনে একপাশে নিয়ে এসে বলল,
“কোকো আপনার কথা শুনতে পেলে অবস্থা খুব খারাপ হবে ফারিশ ভাইজান৷ আর আপনি এত উতলা হচ্ছেন কেন? শেহজাদী হিজ ম্যাজেস্টির বিবাহিতা স্ত্রী। তিনি তার স্ত্রীর সাথে যা ইচ্ছে করবেন এখানে আপনার বা আমার কোনো স্যে নাই। আমরা তার হুকুমের গোলাম মাত্র, সেখানে আপনি কোন ছার যে তার হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে শেহজাদীকে এ কথা জানিয়ে দিবেন? আপনার মনে শেহজাদীকে নিয়ে কি চলে আমি জানি, ইভেন সবাই-ই জানে।
সাধু সাজার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি কেন তাকে হিজ ম্যাজেস্টির আশেপাশে যেতে দিতে চাননা সেটাও আমাদের অজানা নয়। তাই আপনাকে সাবধান করবো, যা করবেন ভেবেচিন্তে করবেন। আপনার প্রতিপক্ষ সাধারণ কেউ নয়, স্বয়ং বাদশাহ নামীর আসওয়াদ দেমিয়ান!”
ফারিশ বললোনা কিছুই। শীতল চোখে চেয়ে রইলো জুনায়েদের দিকে৷ পরমুহূর্তেই হাতের জুসের গ্লাসটি হতে সম্পুর্ন জুস নিজের পোশাকে ঢেলে দিয়ে বলল,
“উপস্, আমার পাঞ্জাবি নষ্ট হয়ে গেছে। চেঞ্জ করতে হবে, গেলাম।”
বলেই জুনায়েদের থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলো হলরুমের বাইরে৷ জুনায়েদ ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই।
ক্ষণিক পরেই বিয়ে পড়ানোর কার্যক্রম শুরু হলো, আনাবিয়া অধীর হয়ে তাকিয়ে রইলো প্রবেশমুখের দিকে। মীর এখনো উপস্থিত না হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে পড়ানো শুরু হলো কিভাবে? তবে কি সে এখানে আসবে না?
মন টা খারাপ হয়ে গেলো আনাবিয়ার, হঠাৎ অভিমানে ফুলে উঠলো ঠোঁট! সদ্য প্রেমে পড়া কিশোরী মেয়েটির প্রেমিকের ওপর তুচ্ছ কারণে অভিমানের মতোই অভিমান হলো তার।
তার কি এখানে আসার কথা ছিলো? তবে সে এলোনা বলে আনাবিয়ার অভিমান কেন হবে? সে তো এখন আনাবিয়ার কেউ না! আনাবিয়া নিজেই যে বাতিল করেছে সমস্ত সম্পর্ক! তবে সে কেন উতলা হচ্ছে? সে কেন চাইছে মীর আসুক! সে আজ এত সাজগোজ করেছে কেন? তার অবচেতন মন কি চাইতো মীর তাকে দেখুক? তাকে দেখে থমকে যাক? তাকে কামনা করুক, সেই প্রথম প্রেমের মতোন?
চোখে হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে জল জমলো আনাবিয়ার, দ্রুতই সেটুকু মুছে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো সে। হলরুম ফাঁকা হয়ে এসেছে, সকলেই এখন বাইরে। তারও এখানে থাকার আর কোনো প্রয়োজন নেই।
কিছুক্ষণ স্থীর দাঁড়িয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই নিজের সামনে মীরকে দেখে আঁতকে উঠলো আনাবিয়া! আতঙ্কিত হয়ে চকিতে পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম! মখমলি পর্দায় পা বেঁধে পড়ে যেতে নিতেই ক্ষিপ্র বেগে ওর হাতখানা খপ করে ধরে টেনে দাঁড় করালো মীর। তারপর মোলায়েম গলায় বলে উঠলো,
“হ্যালো, মা’ প্রিটি লিটল সুইট বেইবি গার্ল।”
আনাবিয়া কিয়ৎক্ষণ হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে রইলো মীরের দিকে। সে কেন ঘূর্ণাক্ষরেও টের পেলোনা মীর তার পেছনে দাঁড়িয়ে? কতক্ষণ দাঁড়িয়ে সে? সে কি দেখেছে আনাবিয়ার উতলা হওয়ার দৃশ্য, প্রবেশপথের দিকে অধীর অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকার দৃশ্য? সে কি কোনো ভাবে কিছু বুঝতে পেরেছে?
আনাবিয়ার বিস্ময়ে পূর্ণ চোখ জোড়াতে নিজের কোমল, স্বর্ণাভ দৃষ্টি রাখলো মীর। দৃষ্টিগোচর হলো আনাবিয়ার চোখের জলে লেপ্টে যাওয়া কাজল। হাত বাড়িয়ে আলতো করে সেটুকু মুছে দিয়ে মীর শুধোলো,
“কে কাঁদিয়েছে তোমাকে?”
মীরের হাতের শীতল স্পর্শে শিহরণ বয়ে গেলো আনাবিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে! মুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে দৃষ্টি নত করলো সে, মীরের থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে শক্ত গলায় বলে উঠলো,
“আমার হাত ছাড়ুন!”
মীর আনাবিয়ার অন্য হাত খানাও ধরে, দুই হাত একত্রিত করে নিজের ডান হাতের মুঠির ভেতর ভরে আনাবিয়াকে নিজের পেছন পেছন টেনে নিয়ে যেতে যেতে গমগমে স্বরে বলল,
“আজ থেকে তোমার পালানো বন্ধ। তোমার সাথে আমার অনেক বোঝাপড়া বাকি আছে পিচ্চি। এখন আমি শুধু বলবো তুমি শুনবে, আর আমার প্রশ্নের উত্তর দিবে৷ তবে সেটা এখানে নয়, আমার প্রাসাদে।
আমার সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে তবেই তুমি মুক্তি পাবে, তবে সেটা প্রাসাদের বাইরে নয়, ভেতরেই।”
আনাবিয়া আতঙ্কিত হয়ে উঠলো। মীর শক্ত করে হাত ধরে আছে ওর, এই হাত থেকে ছাড়া পাওয়া ওর পক্ষে সম্ভব নয় কোনো ভাবেই। জোরে জোরে পা ফেলছে মীর, আনাবিয়া কদম ফেলার সময় পাচ্ছে না, তার আগেই মীর টেনে নিয়ে চলেছে ওকে, কয়েকবার পোশাকের সাথে বেঁধে পড়ে যেতে গিয়েও পড়েনি!
মীরের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য সবরকমের কসরত করতে করতে সে আর্তনাদের সুরে বলে উঠলো,
“ব্যাথা পাচ্ছি আমি! ছেড়ে দিন আমাকে!”
মীর থামলোনা, টেনে নিয়ে যেতে রইলো আনাবিয়াকে ওভাবেই৷ আনাবিয়া পা দিয়ে মেঝে আঁকড়ে ধরে রইলো, সে কোনো ভাবেই যাবেনা, মীর তবুও টেনে নিয়ে চলল ওকে, আনাবিয়া নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে রুক্ষ স্বরে জোর গলায় বলে উঠলো,
“আমাকে শাস্তি দিতে চাইলে এখানেই দিন, আপনি যে শাস্তি দিবেন আমি মাথা পেতে নিবো! কিন্তু আমাকে শেষ করে ফেললেও আমি ওই দেমিয়ান প্রাসাদ নামক জাহান্নামে ফিরে যাবোনা!”
হঠাৎ থেমে গেলো মীর। পেছন ফিরে আনাবিয়ার তেজস্বী মুখাবয়বের দিকে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে বলল,
“ওই প্রাসাদ কেন তোমার জন্য জাহান্নাম সেটাই শুনতে চাই আমি, এখনি। বলো, কি করেছে তোমাকে ওই প্রাসাদ? আর আমি-ই বা কি করেছি? তুমি আমার থেকে কেন পালিয়ে চলেছো? তোমার আত্মগোপনের কারণ শুধুমাত্র ইলহানকে সেইফটি দেওয়া নয় সেটা আমি ভালো করেই জানি। সুতরাং খুলে বলো।”
“কিছুই বলবোনা।”
“যতদিন না বলছো ততদিন তোমার মুক্তি নেই, ইয়্যু আর আ রয়্যাল ক্যাপটিভ, রাজদ্রোহীতার অপরাধে তোমাকে বন্দি করা হলো, আজ থেকে ঘর বন্দি থাকবে তুমি।”
“আমাকে মেরে ফেললেও আমি শিরো মিদোরিতে ফিরবোনা।”
নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল আনাবিয়া। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে মীরের দিকে। মীর নিঃশব্দে হাসলো, গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“দুই আঙুল মানুষ তুমি, তোমার এত তেজ কই থেকে আসে শুনি?”
“যেখান থেকেই আসুক তাতে আপনার সমস্যা কোথায়? আমার তেজ কি কেউ আপনাকে দেখতে বলেছে? আমি এখানে মরি বাঁচি তাতে তো আপনার কিছু যাবে আসবে না, তাইনা? তো আপনি আমাকে প্রাসাদে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন কেন?”
“তুমি সালিমের মেয়ে। সালিম আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিলো এটা নিশ্চয় তুমি জানো বলেই আমার ধারণা। সে হিসেবে, ইয়্যু বিলং টু মি। আ’ম ইয়োর সোল গার্ডিয়ান৷ বিসাইডস্, তুমি দেমিয়ান শেহজাদী, দ্যা রেয়ারেস্ট ওয়ানস্। তোমার স্থান দেমিয়ান প্রাসাদের সবচেয়ে সুন্দর কামরায়, নট ইন আ শীট লাইক দিজ।
তুমি আমার পরিবারের সদস্য হয়ে, সালিম ভাইজানের মেয়ে হয়ে এই চাষিদের সাথে একত্রে বসবাস করবে এটা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব। সুতরাং তোমাকে ফিরে যেতে হবে, হবেই।”
“চাষিদেরকে আপনি অসম্মান করছেন?”
“নোপ, আমি তোমাকে তোমার স্থান সম্পর্কে সতর্ক করছি। এগুলো আমার পছন্দ নয়।”
“আপনার পছন্দ অপছন্দের দাম আমি কেন দিবো? কি দায় পড়েছে আমার?”
“রাইট নাও, আ’ম ইয়োর গার্ডিয়ান, অ্যান্ড উইল বি আনটিল ইয়োর ম্যারিয়েজ। সুতরাং আমি যেভাবে বলবো তোমাকে সেভাবে চলতে হবে ইয়ং লেইডি৷”
“আমি কারো ইচ্ছেমতো চলতে পারবোনা, কেউ আমাকে ডমিনেট করুক এটা আমি কখনোই পছন্দ করবোনা।”
“করতে হবে।”
“নো, নেভার!”
জোর গলায় বলল আনাবিয়া, ক্রোধে যেন ফুসতে শুরু করলো সে। মীর বরাবরের মতোই রইলো অটল, শান্ত, দৃঢ়। ক্ষণিক আনাবিয়ার ক্রোধিত চোখপানে চেয়ে থেকে অতঃপর শীতল স্বরে বলল,
“গলা নামিয়ে কথা বলো পিচ্চি। তোমার সামনে একজন বাদশাহ দণ্ডায়মান, ভুলে যেওনা। তোমার সাথে নিশ্চয় আমার বহুদিন পর কথা হচ্ছে! গুরুজনদের সহিত প্রথম সাক্ষাতেই এমন বেয়াদবি করলে সেটা ক্ষমার অযোগ্য হয়ে দাঁড়ায় পিচ্চি। এমন কিছু কোরোনা, যাতে তোমার অপরাধের পাল্লা ক্রমশ ভারী হতে থাকে।”
আনাবিয়া দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইলো। এইটা কি তারও প্রথম সাক্ষাত নয়? মীর কি তাকে ভালোভাবে বোঝাতে পারতোনা? এভাবে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো? আনাবিয়াকে চুপচাপ দেখে মীর মনোযোগী চোখে দেখলো ওকে কিছুক্ষণ। অতঃপর গমগমে স্বরে বলল,
“এমন সাজ পোশাকে আর কখনো বাইরে বের হবে না পিচ্চি। যত সাজুগুজু সব প্রাসাদের ভেতর করবে। বাইরে তখুনি বেরোবে যখন সাথে আমি থাকবো।”
বলেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার এগোলো সামনের দিকে, রুক্ষ হাতের মুঠিতে তখনো বন্দি আনাবিয়ার তুলতুলে হাত। আনাবিয়া বিনাবাক্য ব্যয়ে এগোতে রইলো মীরের পিছু পিছু। আচমকা মীরের বজ্রমুষ্ঠি সামান্য শিথিল অনুভব করতেই এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝড়ো বেগে ছুটে পালালো সে, মুহুর্তেই তাকে আড়াল করে নিলো সাদী ম্যানসনের অগণিত কামরা। এলোমেলো ছুটে সে লুকিয়ে পড়লো কোথাও!
মীর ক্রোধ সংবরণ করে ফোস করে একটা শ্বাস ছেড়ে ধীর পায়ে এগোলো আনাবিয়ার পিছু পিছু।
আনাবিয়া এলোপাথাড়ি ছুটতে ছুটতে কোন দিকে গেলো নিজেও টের পেলোনা। ক্লান্ত হয়ে পড়লে আচমকা ঢুকে পড়লো কোনো এক কামরায়, ঢুকেই লাগিয়ে দিলো দরজা। পরমুহূর্তেই দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস ছাড়লো কয়েকবার।
পিপাসা পেয়েছে তার, একটু গলা ভেজানোর মতোন কিছু পেলে ভালো লাগতো অনেক। ঠোঁট গোল করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চোখ মেলে তাকালো সে। তাকাতেই চোখে পড়লো ফারিশকে; বিস্ময়ে অভিভূত, বিমোহিত, তৃষিত দৃষ্টি তার আনাবিয়ার দিকেই একমনে নিবদ্ধ! ঊর্ধ্বাংশ নগ্ন তার, গায়ের ভেজা পাঞ্জাবিটা পড়ে আছে মেঝেতে, অবহেলায়!
অপ্রস্তুত হলো আনাবিয়া, চোখ নামিয়ে নিলো সাথে সাথেই। লজ্জা লাগলো তার ভীষণ রকম। অসংলগ্ন স্বরে বলল,
“স্-সরি, আমি আসলে বুঝতে পারিনি এখানে আপনি থাকবেন! ক্ষমা করবেন ফারিশ ভাইজান।”
বলেই দরজা খুলতে নিলো সে৷ ফারিশ বিছানা ছেড়ে ছুটে এলো তার কাছে, অস্থির স্বরে বলল,
“আমি আপনাকেই খুঁজছি শেহজাদী, আপনার কামরায় গিয়ে আপনাকে না পেয়ে ফিরে এসেছি মাত্রই। এখানে আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে, সকলে মিলে আপনাকে হিজ ম্যাজেস্টির হাতে তুলে দিতে চাইছে! আমি সেটাই জানাতে চাইছিলাম আপনাকে!”
এক নাগাড়ে কথা গুলো বলে থামলো ফারিশ, তার বিমুগ্ধ দৃষ্টি তখনো আঁটকে রইলো আনাবিয়ার কাজলে মোড়া চোখ, লালচে ঠোঁটে! আনাবিয়া ফারিশের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দরজার নব ঘুরোতে উদ্যত হয়ে অপ্রস্তুত স্বরে বলল,
“বুঝেছি, আমি পরে কথা বলবো আপনার সাথে।”
আনাবিয়া দরজা খুলতেই ফারিশ আবার সেটা লাগিয়ে দিলো, আনাবিয়ার কাছাকাছি এগিয়ে এসে আকুল স্বরে বলল,
“শেহজাদী, আপনি বললে আমি আপনাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো। আর কখনোই আপনাকে এই পঞ্চদ্বীপে ফিরতে হবে না। হিজ ম্যাজেস্টি আপনাকে ভুলে গেছেন, আপনাকে আর কখনোই তিনি খুঁজবেন না। তিনি আপনাকে আর ভালোওবাসবেন না!
দয়া করুন আমার ওপর! আপনি আমার হয়ে যান শেহজাদী, চলুন আমরা দূরে কোথাও চলে যাই যেখানে হিজ ম্যাজেস্টির ছায়াও আপনাকে মাড়াতে হবে না!”
আনাবিয়া পিছিয়ে গেলো, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ফারিশ ভাই! মাথা ঠিক আছে আপনার? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি ভালো হয়ে গেছেন! কিন্তু এখন তো দেখছি আপনি যেমন ছিলেন তেমনই রয়ে গেছেন। কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয়না! আপনি কি কখনোই ভালো হবেন না?
তার সাথে আমার যা-ই হোক সে এখনো আমার স্বামী, মরে যায়নি সে! আমি এখনো তার বিবাহিতা স্ত্রী, তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি! সে ভুলে গেছে বলে এই না আমাদের সম্পর্ক মিথ্যে হয়ে গেছে!
আপনাকে আমি শেষ বার বলছি ফারিশ ভাইজান, এখনো সময় আছে আপনি শুধরে যান৷ আপনার দুটো মেয়ে আছে, তাদের কথা ভুলে যাবেন না! আপনার মেয়ে দুটো না থাকলে আমি আপনার ওপর আজ কোনো দয়া দেখানোর প্রয়োজন বোধ করতাম না!
এর পূর্বেও বহুবার আমি আপনাকে মীরের হাত থেকে বাঁচিয়েছি, তবে দ্বিতীয় বার আপনি কোনো ভুল করার চেষ্টা করলে সেদিন আমি আপনাকে কারো হাত থেকেই রক্ষা করতে পারবোনা৷ দরজা থেকে সরে দাঁড়ান!”
ফারিশ নিশ্চুপে তাকিয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে, পিছিয়েও গেলো কয়েক কদম। আনাবিয়া এগিয়ে দরজা খুলতে নেওয়া মাত্রই আনাবিয়ার হাত আঁকড়ে ধরলো সে, আনাবিয়ার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে ব্যাকুল স্বরে বলল,
“শেহজাদী, আমাকে একটাবার সুযোগ দিন! আমি আপনাকে এত ভালোবাসা দিবো যা আপনি কখনো ভাবতেও পারবেন না! পুরো দুনিয়া এনে আপনার পায়ে ফেলবো আমি শেহজাদী, আপনি একটাবার শুধু আমার হয়ে যান!”
এলোমেলো পায়ে পিছিয়ে গেলো আনাবিয়া, ফারিশ আরও এগিয়ে গেলো আনাবিয়ার কাছে! আনাবিয়ার কোমর ধরে কাছে টানার চেষ্টা করে কাতর স্বরে বলল,
“আমাকে কি একটু ভালোবাসা যায়না শেহজাদী? এতটুকুও না? আপনি একবার বলুন শুধু, একবার বলুন আমাকে ভালোবাসেন! আমি সব ছেড়ে দিবো শেহজাদী, আমি শুধু আপনার জন্য বাঁচবো, আদরে আদরে ভরিয়ে দেবো আপনাকে!”
ফারিশের অসংলগ্ন স্পর্শে আনাবিয়া আতঙ্কিত হয়ে উঠলো হঠাৎ, হাত পা নিস্তেজ হতে শুরু করলো যেন, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুতে চাইলোনা! ফুপিয়ে আর্তনাদ করে বলে উঠলো,
“চুপ করুন দয়া করে, আমাকে ছুবেন না! আমাকে যেতে দিন!”
ফারিশ আরও কাছাকাছি এগিয়ে এলো তার, ঘনিষ্ঠ হতে চাইলো আরও! আনাবিয়া মরিয়া হয়ে ছাড়া পেতে চাইলো তার থেকে, নিজের শক্ত হাতের আঘাতে জর্জরিত করে ফেললো ফারিশকে, কিন্তু ফারিশ যেন আজ আর কোনো বাঁধাই মানতে চাইছেনা।
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো আনাবিয়া, মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিলো তার! ফারিশকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যেতে নিতেই এক ঝটকায় ওকে টেনে আবার নিজের বক্ষে ফেলতে চাইলো ফারিশ। আনাবিয়ার আঁচড়ে, আঘাতে বক্ষ ক্ষতবিক্ষত হওয়া সত্ত্বেও একচুল ছাড়লোনা সে। লোভাতুর চোখে চেয়ে এগিয়ে গেলো আনাবিয়ার লালচে ঠোঁটের উদ্দ্যেশ্যে!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬২
সেই মুহুর্তেই প্রচন্ড শব্দে ভেঙে পড়লো কামরার বিরাট দরজা, ফারিশ চমকে উঠে তাকাতেই দেখলো দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে মীরের কুচকুচে কালো রঙা ভয়ঙ্কর মূর্তি! সেই কালোর ভেতর প্রকট হয়ে ধরা দিলো আগ্নেয়গিরির ন্যায় ঝলসানো এক জোড়া শকুনি চোখ!
