Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৫

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৫

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৫
জান্নাত চৌধুরী

রাতের আধাঁরীর মাঝেই টর্চ হাতে দক্ষিণ পাড়ায় ঢুকছে রেজা , ইরফাদ সহ মোট চারজনের একটা দল। সময় টা তখন হবে ১২টা নাগাদ। মধ্যে রাতে এক মিশনে এসেছে সকলে। যেখানে রাত ৮ বাজলেই গ্রাম অঞ্চলে জনমানব শূন্য হয়ে পড়ে। সেখানে মধ্যে রাতে কেউ জেগে থাকার প্রশ্নই উঠে না।
শালের আড়ালে মুখ লুকিয়ে টর্চ হাতে খন্দকার বাড়ির পিছনের বেশ সাবধানে এসে থামলো চারজন। ইরফাদ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়েই পাহাড়া র‌ইল। বাকি দুজন সহ , রেজা পিছন পথে ঘুরে এসে ঠিক খন্দকার‌ বাড়ির প্রবেশ গেটে এসে দাঁড়ালো। রেজা , আশপাশে তাকিয়ে দেখলো। কোথাও কেউ নেই , অতি সাবধানে গেট লাগানো লাইটের তার কেটে দিয়ে অন্ধকার করলো। তারপর সঙ্গি দুজনের দিকে তাকলো। ছেলে দুটো এক বস্তা বয়ে এনেছে , বস্তা গায়ে রক্তের দাগ। রেজা চোখের এক ইশরা করলো , টর্চের মৃদু আলোতে সে ইশারা দেখে বস্তার মুখ খুললো ছেলে দুটো।

রেজা হাতের টর্চ মুখে চেপে , বস্তা হতে এক কাটা মন্ডু টেনে বের করল। যার চোখ দুটো যত্নে উপড়ে নেওয়া হয়েছে, চোখ হতে রক্তে গড়িয়ে পড়ছে। রাতের আধারিতে এ দৃশ্য দেখলেই যে কারো দম বেড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে। রেজা মন্ডু টা মাটিতে রাখলো। তারপর পকেট হতে একটা দড়ি বের করে হাত ইশারায় পেছনো এক ছেলে কে ডাকলো।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ছেলেটা এগিয়ে যেতেই রেজা মুখের লাইট তার দিকে এগিয়ে দেয়‌। ছেলেটা লাইট হাতে দাঁড়িয়ে থাকলো , রেজা কাটা মন্ডু দড়িতে বেঁধে নিয়ে খন্দকার বাড়ির প্রবেশ দাড়ে ঝুলিয়ে দিলো।
ইরফাদ বেশ অনেকটা সময় ধরেই পাইচারি করছিলো। আশপাশে নজর বুলিয়ে দেখছে বার বার , একবার ধরা খেলে এ গ্রাম হতে জান নিয়ে বেড়োনো দায় হয়ে যাবে।

তবে লোকে ঠিক যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ইরফাদ পাইচারি করছে ঠিক এমন সময়, খন্দকার বাড়ির পাহাড়া কুকুর এসে সেথায় হাজির হলো। ইরফাদ মুর্তি নেয় থমকে দাঁড়ালো,তারপর কুকুরে দিকে তাকিয়ে বেক্কল হাসল। হাতের দ্বারা দুই একবার হুস হুস করলো। কুকুরটা গেলো না। ইরফাদ কপাল কুঁচকে নিলো ;
রেজার কাজ প্রায় শেষ। কাটা মন্ডুর রক্ত পড়ছে , রক্তে ভেজা বস্তটা গেটের পাশে রাখবে ঠিক এমন সময় কুকুরের আওয়াজ কানে এলো তার। রেজা সর্তক হলো , দ্রুত বস্তা রেখেই শালে মুখ প্যাঁচিয়ে ছুট দিলে , পেছনে বাকিরাও।
ইরফাদের কুকুরে ভয় , বেচারা নড়ার অবস্থায় নাই। রেজা এসে তাকে টেনে রাস্তা দিকে আনবে ঠিক তখনি , খন্দকার বাড়ির খোলা জানালার ফাঁক গলিয়ে অবয় গিয়ে পড়লো এক ঘরে। ঘর টা কার জানে না রেজা , তবে কুকুর আওয়াজের সাথে কারো একটা গলা শুনতে পেলো।

-“কেডা , কেডা ওইহানে।”
রেজা ইরফাদের হাত টেনে এক ছুটে রাস্তায় আসবে ঠিক তখনি কিছুটা একটার সাথে ধাক্কা খেয়ে শুকনো পাতায় ধপ করে পড়লো দু’জন। রেজা ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো ,
এদিকে পেছনে কেউ আসছে , কয়েকটা পায়ের শব্দ ভেসে আসছে। কানে বাজছে সেই পায়ের শব্দ । ইরফাদ টেনে টুললো রেজাকে , আবারো ছুটছে চারজন।

আবারো জ্বর এসেছে ইফরাহর , সারাদিন জ্বরে ভীষণ কাবু সে। আরাধ্য সেই সকালে বেড়িয়ে ফিরছে সন্ধ্যায়। বিছানায় শুয়ে কাঁপছিলো ইফরাহ‌। আরাধ্য কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখতেই বুঝলো জ্বর এসেছে। সে আন্দাজ করেছিলো এমন কিছু। তবে জ্বর মাত্রাধিক ছিলো , আরাধ্য দিশেহারা হয়ে পড়ে। মেয়েটার বয়স কম একের পর এক ধকলে শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। আজ‌ও হয়তো ভয়েই জ্বর এসেছে।
কিছু সময় ইফরাহর মাথার কাছে বসে থেকে গিয়ে ডাক্তার এনেছিলো। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে , অরুনিমা এসে খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে গেছে।
এখন গভীর রাত, আরাধ্য বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো , কাজের চাপ বাড়ছে তার। এর মাঝেই হয়তো কোন একদিন রাজধানী যেতে হতে পারে। অমাবস্যার রাত , আকাশে চাঁদ নেই। আরাধ্যের ভালো লাগছিলো না , বিশাল আকাশে মাঝে ওই চাঁদ টা আরাধ্যের ভীষণ। প্রিয় হবার একটা বিশেষ কারণ আছে , চারপাশে এতো মানুষের মাঝে আরাধ্য যেমন একা। তার কেউ নেই , তেমনি হাজার তারার মাঝে ওই চাঁদ টাও একা। দুটো জিনেস ভীষণ মিল !

সন্ধ্যার পর ইফরাহ ঘুমালে একবার বেড়িছিলো আরাধ্য , ফিরলো খানিক আগে , বেশ দরকারি এক কাজ সেরে এসেছে সে। হাতে পায়ে রক্তের দাগ ,রক্ত হাতেই সিগারেট ফুঁকছে। বাম হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুলটাও কেটেছে কিছুটা। মাথার চুলগুলো উস্কো খুস্কো , চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। বিধ্বস্ত লাগছে , ঘুমন্ত মেয়েটা জেগে থাকলে রক্ত দেখে হয়তো কয়েকশ’ প্রশ্ন করে বসতো। দূরের ঘরটায় আলো জ্বলছে, আরাধ্য আরো কিছু সময় থাকলো নীরব বেলকনিতে। সিগারেট ফুরিয়ে এলে ওটা ছুঁড়ে ফেলে ঘরে এলো।
গায়ের জড়ানো গেঞ্জিটা খুলতে খুলতে সোজা হেঁটে গোসল খানায় গেলো। ভরা বালতি হতে পানি নিয়ে একনাগাড়ে ১৫ থেকে ২০ বার গায়ে ঢাললো। গায়ে থাকা রক্তের ছিটে ছিটে দাগ গুলোতে জোড়ে জোড়ে সাবান লাগিয়ে ঘোষলো-
প্রায় অনেকক্ষণ পানিতে ডুবে , কোমড়ে তোয়ালে পেঁচিয়ে বেড়িয়ে এলো আরাধ্য। আলমারি হতে , একটা কালো রঙের লুঙ্গি আর পড়ে , উদাম গায়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো।

জঙ্গল পথে ছুটে চলছে চার। এদিকে তার পেছনেই পুরো প্রায় দশ, বারো জনের লম্বা এক দল মর্শাল হাতে ছুটে আসছে। এক মিনিটের জন্য থেমে দাড়াইলে আজ আর বেঁচে ফিরতে পারবে না কেউ।
খন্দকারের চ্যালাপ্যালা পিছু নিয়েছে। গজারি বন , বিলাশ বিস্তর গাছ , ঝোপ ঝাড় পেরিয়ে লাইন ধরে ছুটে চলেছে , রেজা, ইফরাদ সহ বাকি দুজন। জঙ্গলের পথ বেশ লম্বা , জঙ্গল পেরিয়ে খানিক সামনে গেলে তবে চকের মাঝে দুই চারখান জনবসতি। রাতের দ্বিপ্রহর চলছে ….

জঙ্গল পেরিয়ে নিয়ে চকের মাঝে এসে চারজন চার পথে ভাগ হয় যায় তারা। পেছেনে তখনো মর্শালের আলো নজরে আসছে। রেজা একবার পেছনে ফিরে নিয়ে ক্ষেতে আইল ধরে ছুটে যেতে থাকে।
কিছুদূর যেতেই মাতব্বর বাড়ি আসে। রেজা মাতব্বরের দরজায় এসে কয়েকবার ডাকে। দরজা খুলে না , উপায় নেই। আরো দৌড় ধরে , সামনে কিছুটা গিয়েই থেমে আশেপাশে তাকায়। একটা বাড়ি , রেজা খুব একটা খেয়ালে না নিয়েই ভাঙা টিনের গেট ঠেলে ভিতর ঢুকে যায়।
লুকানোর রাস্তা খুঁজে , এদিক ওদিক তাকিয়ে প্রথমে টিউবওয়েল পাড়ে ঢুকে যায়। তবে ভাঙ্গাচোড়া এ ছাপড়ায় যেন লুকানো উপায় নেই। বেড়িয়ে আসে , এদিক ওদিক আরো একবার তাকিয়ে হাতের বাম দিকের ঘরে গিয়ে দরজা ধাক্কায় সাহায্যের জন্য ;

রাইসা তখন গভীর ঘুমে , হঠাৎ দরজায় খিলের খট খট শব্দে ঘুম আলগা হলো তার। তবে , ভয় পেলো না। প্রায় মাঝ রাতেই , জহুরা বেগম এসে জিজ্ঞেস করে মেয়েটা ঠিক মতো শুয়েছে কিনা ,কোয়েল দিয়েছে কিনা। রাইসার মনে হলো তখন মাঝ রাত , আজ সে সন্ধ্যা রাতেই ব‌ই পড়তে পড়তে শুয়েছে, এইতো সামনেই তো তার বার্ষিক পরীক্ষা।
রাইসা ঘুম ঘুম চোখ কচলে একরাশ বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতে খুলতে মৃদু রাগ নিয়ে বলল-

-উফফ আম্মা , প্রত্যেক রাইতে এমনে জ্বালাইবেন না..
আরো হয়তো কিছু বলতো তবে, তার আগেই মুখে এক শক্ত পুরুষালী হাতের চাপ অনুভব করলো রাইসা। রেজা তার মুখ চেপে নিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকছে। রাইসা ভয় পেয়ে যায়। ভয় পাবার কথা তার , রাতের বেলা এক কিশোরী মেয়ের ঘরে জুয়ান পোলা ঢুকছে এতো ভীষণ ভয়ের। রেজা রাইসা কে নিয়ে। ভেতরে ঢুকে ঘরে খিল লাগিয়ে দিলো। রেজার শরীর চাদরে আবৃত , পকেট হতে টর্চ বের করে আবারো জ্বালাতেই রাইসা ভীত কন্ঠে বলল-
-ক ..কে আপনি ?
রেজা উত্তর করলো না , আশেপাশে তাকাতেই বুঝলো মাঝের চাটির বেড়ার ওপারে আরেকটি ঘর। রাইসা কিছু বলবে তার আগেই রেজা আবারো চেপে ধরে তার মুখ। আলগোছে গায়ের চাদর নামিয়ে নিজের মুখ প্রদর্শন করায় রাইসাকে –

টর্চের সাদা আলোতে রেজা কে চিনতে খুব একটা কষ্ট হলো রাইসার। রেজা তাকে টেনে ঘরের এক কোণে নিয়ে গিয়ে মুখ হতে হাত সরিয়ে বলল –
–আমায় সাহায্য করো পাজিমেয়ে ?
রেজা হাত জোড় করে বলল কথাটা।রাইসা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো রেজা চোখে। রেজার পায়ে গোচ গেঁথেছে, ব্যাথার পা খানা টনটন করছে। মাথার মগজ ঘুরে উঠছে তার। পড়ে গিয়ে হাতেও ছুলেছে , রেজা আবার বলল- .
-দোয়া করো পাজি মেয়ে , একটু আশ্রয় দেও খন্দকারের লোক পিছু নিয়েছে। বেশ কষ্টে বেঁচেছি।
রাইসার ধ্যান ভাঙ্গলো , দৃষ্টি নামিয়ে নিতেই চোখ পড়লো রেজা হাতের খত স্থানে রক্ত ঝড়ছে।রাইসা দ্রুত রেজার হাত ধরে বলল- “ রক্ত , রক্ত পড়ছে।”

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৪

-রেজার হাতের রক্ত গড়িয়ে মাটিতে পড়ছে। রাইসা মাটির দিকে একবার তাকাতেই আরো একবার চমকায়। রেজার দাড়ানো জায়গায় রক্ত ভেজা। টর্চের আলোতে ঠিক বোঝা না গেলোও তবে ভেজা ভেজা জায়গায় ঠিক খেলায় করলো সে।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৩৬