The Silent Manor part 50
Dayna Imrose lucky
সন্ধ্যা সাতটা বাজে। সুফিয়ান সে-ই বিকেল থেকে ঘরের সামনে আধমরা অবস্থায় বসে আছে।বর্তমান তাঁর সঙ্গী সিগারেট। বদরু কে দিয়ে সিগারেট আনিয়েছিল।একটার পর একটা টেনেই যাচ্ছে। ফারদিনার কব’রের কাছে মশাল দিতে বলেছিল অনুচরদের।অন্ধকার রাতে ফারদিনা একা ভয় পাবে বলে।দু’জন অনুচর তাঁর কথা মত দুটো মশাল কবরের পাশে দিয়ে এসেছিল।
বিন্তি রান্না করেছিল দুপুরের পরের সময়ে।ভাত, নদীর ক’পদের মাছ,সাথে ছিল হাঁসের মাংস। সুফিয়ান খায়নি। অনেক বার বিন্তি ডেকেছিল খেতে।সুফিয়ান যায়নি।এরপর বিন্তি খাবার প্লেটে তুলে সুফিয়ান এর কাছে নিয়ে এসেছিল।সে তখনো খায়নি।শুধু সিগারেট টেনে যাচ্ছে। বিন্তির সামনে কখনো সিগারেট খায়নি।আজ খাচ্ছে। বিন্তি সিগারেট খেতে বারন করেছিল।কাজ হয়নি।আজ যেন সুফিয়ান বেলাগাম হয়ে গেছে।
বিন্তি তখন সুফিয়ান কে ছেড়ে বদরু,হাবলু, লাল মিয়া, সোলেমান ওঁদের খেতে দিয়েছিল।খেতে চাচ্ছিল না ওঁরা।তখন সুফিয়ান ওঁদের বলেছিল ‘তোরা না খেয়ে মরতে চাচ্ছিস নাকি, তোরা খেয়ে নে।কাজ করতে হলে শরীরে শক্তি দরকার। আমিত মরেই গেছি। শুধু দেহটা তোদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত বেড়ে যাচ্ছে ধরণীতে। সে-ই সাথে সুফিয়ান এর ভাঙ্গা হৃদয়ের যন্ত্রণাও যেন ধীরে ধীরে বাড়ছে। সোলেমান ওঁরা পাশেই বসে আছে তাঁর।কত কি বলে তাঁকে একটু সামাল দিতে চাচ্ছে।পারছে না।বিন্তি সদর দরজার সাথে মাথা হেলিয়ে সুফিয়ান এর দিকে তাকিয়ে আছে।কত সুন্দর হাঁসিখুশি ভরা জীবন ছিল তাঁদের।সব হঠাৎ করে যেন ভেঙ্গে তছনছ হয়ে গেল। ওঁর চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ছে।মোছার ইচ্ছে টুকুও নেই ওঁর। চোখের সামনে নিজের ভাইকে তিলে তিলে শেষ হতে দেখতে ওঁর ভালো লাগছে না।
সন্ধ্যা আরো ঘন অন্ধকারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। চারপাশে মানুষের উপস্থিতি থাকলেও, বাড়ির আঙিনায় এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।যেন কেউ শ্বাস ফেললে তাও শোনা যাবে।
ফারদিনার কবরে দুটো মশাল টিমটিম করে জ্বলছে।হাওয়া বয়ে গেলেই আগুনের শিখা দুলে উঠছে।যেন বাতাসেও ফারদিনার আতঙ্ক, তার নির্জনতা, তার অভিমান, সবকিছুই বহন করে আনছে।
সোলেমান,বদরু,হাবলু, লাল মিয়া এসে সুফিয়ান এর পাশে বসে।সোলেমান সুফিয়ান কে লক্ষ্য করে বলল “নিজেকে তিলে তিলে মারছেন কেন?এতে করে ফারদিনা তো আর ফিরে আসবে না।”
সুফিয়ান র’ক্তে ভেজা লাল চোখ দুটো নিয়ে জবাব দিল “আত্ম’হ’ত্যা পাপ বলেই তিলে তিলে মর’তে হয়।”
“ইচ্ছে করে নিজেকে তিলে তিলে মারাও পাপ।” বলল বদরু।
“আমি যে পাপ করেছি, সে-ই পাপের থেকে বড় আর কোন পাপ হতে পারে না।খুব জ্বালাতন করছে পাপগুলো আমাকে। ভেতরের আমি টা আর বাঁচতে চাইছে না।” বলে সুফিয়ান হাতের সিগারেট ফেলে দিল।
সোলেমান বলল “যদি আপনি সত্যিই পাপ করে থাকেন, তাহলে মরেও শান্তি পাবেন না।তখন আরো কষ্ট হবে। পাপের জন্য সাজা ভোগ করতে হবে।”
সুফিয়ান এবার চোখ তুলে ওঁর দিকে তাকাল। মর্মাহত কন্ঠে বলল “বেঁচে থেকেই কঠিন সাজা ভোগ করছি।মরে গেলেও আবার সাজা ভোগ করতে হবে।কি ভাগ্য আমার” চোঁখে ভরা জল তাঁর।বিন্তি সুফিয়ান এর হাহা’কার সহ্য করতে পারছে না। চাপা স্বরে কেঁদে উঠল। ওঁর কান্নার শব্দ পৌঁছাল সুফিয়ান এর কানে।সে ঘুরে তাকাল পেছন পানে।বিন্তি দাঁড়িয়ে আছে দরজা চেপে। সুফিয়ান হাত বাড়িয়ে ডাকল ওকে। “আয়, ভাইয়ের কাছে আয়।” বিন্তি ধীর পায়ে সুফিয়ান এর কাছে গেল। তাঁর পাশে বসল। সুফিয়ান বিন্তির দিকে তাকিয়ে বলল “ভাইয়ের আজ করুণ অবস্থা হয়েছে। কষ্ট হচ্ছে নিশ্চয়ই তোর। বোনের কাছে ভাইয়ের দুঃখ সহ্য হয় না।আমি জানি।”
এতটুকু বলে থেমে আবার বলল “মা বাবা কে হঠাৎ করে হারিয়ে ফেললাম।বোন কে হারালাম।দাদা দাদু’কে হারালাম। বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা তখন মরেই গিয়েছিল। জীবনটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।আর ঠিক সেই মুহূর্তে ফারদিনা এসে জীবনটা আবার আলোকিত করেছিল। বিশেষ এক প্রদীপ হয়ে।কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার। সেই আলোর মূল্য আমি দিতে পারিনি।নিজের হাতে প্রদীপ শিখা ধ্বং’স করে ফেলেছি।মে’রে ফেলেছি ফারদিনাকে।”
বিন্তি সুফিয়ান এর জলক্রান্ত মণির দিকে তাকিয়ে বলল “তোমার কান্না আমার সহ্য হচ্ছে না ভাই।এখন কেন যেন সৃষ্টির বিরুদ্ধে গিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে ইচ্ছে করছে,যাতে উনি ফারদিনাকে আবার ফিরিয়ে দেন।”
“সৃষ্টির নিয়ম বাঁধা দেয় বলেই এখনো আত্মা’হত্য করছি না। কতক্ষন এই নিয়ম মেনে চলতে পারব জানি না। কষ্ট হয় জানিস তো।”
সুফিয়ান এর মুখে বাক্য গুলো শুনে বিন্তি নীরবে আবার কেঁদে উঠল। সোলেমান ওঁরাও কাঁদল।বদরু বলল “আপনার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমাদের কে দেখবে?এই গ্রাম বাসীদের কে দেখবে? আপনার বোনের র’ক্তের বন্ধন বলতে একমাত্র আপনিই আছেন। একবার ভাবুন, মৃ’ত্যুই কি সবকিছুর সমাধান? ভাবুন, আপনাকে আজ আমি ভাবার সময় দিলাম।”
বদরু চোঁখের জলের মাঝে ক্রোধের নমুনাও প্রকাশ করল। সুফিয়ান চুপচাপ বসে রইল।বিন্তি সুফিয়ান এর কাঁধে হাত রেখে বলল “ভাই, তুমি আমায় রেখে চলে যাবা?
করুণ শোনাল বিন্তির কন্ঠ।আবার বলল “বড় ভাই তো বাবার সমতুল্য হয়।মা বাবাকে সে-ই কবেই তো হারিয়ে ফেললাম। প্রিয় বোন কে হারিয়ে ফেললাম। তারপর থেকে তোমার মাঝে পৃথিবীকে খুঁজলাম। তোমার হাত ধরে বড় হতে লাগলাম। সে-ই এখন তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছো?”
সুফিয়ান এর কন্ঠে জবাব নেই।জবাবের বিপরীতে শুধু চোখ বেয়ে জল পড়ছে।চোখের সামনে তখন অতিতের স্মৃতি ভেসে উঠল।তাঁর মায়ের সাথে কাটানো কিছু মুহূর্ত। বিন্তি যখন খুব ছোট্ট তখন থেকেই ও সুফিয়ান এর ভক্ত।ভাই ভাই বলে সুফিয়ান কে সারাদিন বিরক্ত করত। সুফিয়ান একদিন বিন্তি কে বলেছিল “তুই আমাকে আর বিরক্ত করলে চলে যাব তোর থেকে।তখন আর আমায় পাবি না।” শুনে ছোট্ট বিন্তি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে। এরপর আচমকা বাঁধ ভাঙার মত কেঁদে উঠেছিল।ফারিনা বেগম সেদিন সুফিয়ান কে বলেছিল “তুই কখনো বিন্তির মনে আ’ঘাত দিয়ে কথা বলবি না। মানুষ তো চিরদিন বেঁচে থাকে না। একদিন আমিও বেঁচে থাকব না।কথা দে, আমার অনুপস্থিতিতে, এবং আমি না থাকাকালীন কখনো বিন্তি কে কষ্ট দিবি না!ও তোকে খুব ভালোবাসে।” সুফিয়ান হেঁসে উঠে তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে কথা দিয়েছিল।
আজ সে-ই দিনটা সুফিয়ান এর মনে পড়ল। বিন্তিকে নিজের কাঁধে শুইয়ে বলল “কাদিস না।যাব না আমি কোথাও।তোর জন্য না হয় থেকে যাব দুনিয়ার বুকে।”
সুফিয়ান এর কথায় জোর নেই।তবু বিন্তি বলল “সত্যি তো ভাইয়া!’
“হুঁ।” বলে সুফিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিন্তি সোজা হয়ে বসে বলল “তুমি আজ কতদিন ধরে খাওয়া দাওয়া করছ না।আজ অন্তত কিছু খেয়ে নাও।তোমার পছন্দের হাঁস রান্না করেছি।খাবে?”
সুফিয়ান মৃদূ হেঁসে না বলল। “পড়ে খাব।এখন একটু হেঁটে আসি।সে-ই কখন থেকেই তো বসে আছি।”
সুফিয়ান খাবে না বিন্তি নিশ্চিত হল।তবু মুখে মিথ্যা হাঁসি নিয়ে বসা থেকে উঠে ঘরের ভেতরে চলে গেল।
সোলেমান এসে দাঁড়ায় সুফিয়ান এর সামনে।বলল “চলুন, ছোট্ট যে চায়ের দোকানটা আছে, ওইদিক থেকে হেঁটে আসি।”
সুফিয়ান উঠল।একটানা ঘন্টা কয়েক বসে থাকলে কোমর ব্যথা হয়ে যাওয়ার কথা। সুফিয়ান শরীরের ব্যথা অনূভব করতে পারছে না। দাঁড়িয়ে সবার আগে ফারদিনার কব’রের দিকে তাকাল।দূর থেকে মশালের আলো দেখা যাচ্ছে। টিপটিপ করে জ্বলছে।
সিন্ধুতলি গ্রাম থেকে শহর কাছে বলে গ্রামকে ঠিক গ্রাম বলে মনে হয় না। রাস্তায় বের হলেই মানুষের বেশ আনাগোনা দেখা যায়। হায়দার বাড়ির সামনে সরু রাস্তা। রাস্তার ঠিক কিছুটা পাশেই নদী।নদী হলেও আয়তনে বড়। সমুদ্র বললেও ভুল হবে না।
সুফিয়ান হাঁটছে। রাস্তার পাশ ধরে। তাঁর পেছনে বদরু ওঁরা।বেশ কিছুদূর গিয়ে চায়ের দোকানে বসল তাঁরা। দোকানে কিছু গ্রামবাসীরা বসে আছেন। উনারা সুফিয়ান কে দেখে উঠে দাড়িয়ে পড়ল। সুফিয়ান উনাদের বসতে বলল। একজন গ্রামবাসী তখন সুফিয়ান কে লক্ষ্য করে বলল “আপনার অহংকার নাই।”
সুফিয়ান তাচ্ছিল্যের হাঁসি দিল।বলল “অহংকার করে কি হবে? রুহ টা আল্লাহর দান।রুহ টা চলে গেলে দেহটা মানুষের নিয়ন্ত্রণে।কিছুই তো আমার নয়। কিন্তু তারপরও কিছু মানুষ এই ক্ষণিকের ক্ষুদ্রতম সুখের জন্য কত নি’কৃষ্ট কাজ করে।”
সুফিয়ান বাক্যটি নিজের দিকেও ছুঁড়ল।সেও প্রতি’শোধ এর জন্য সবচেয়ে বাজে কাজটা করেছিল।আজ সে অনুতপ্তের আগু’নে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
“হুঁ, আপনার মত অহংকার মুক্ত মানুষ যদি সমস্ত দুনিয়া ভইরা থাকত,তাইলে হয়ত দুনিয়াটা সুন্দর থাকত”
দোকানি চা বানাল। সুফিয়ান এর দিকে এক কাপ চা এগিয়ে দিল।সোলেমান ওঁদের দিল। সুফিয়ান চায়ের ধোঁয়া ওঠা দৃশ্যটি দেখছে। সোলেমান পাশে থেকে ফিসফিসিয়ে সুফিয়ান কে বলল “এখানে বসে অন্তত পাগলামি করবেন না।চা’টা খেয়ে নেন। চায়ে আপনার পেট ভরবে না।খেতে পারেন।”
সুফিয়ান সবার আড়ালে চোখ মুছে চায়ে চুমুক দিল। দ্বিতীয় চুমুক আর দিতে পারল না।রেখে দিল কাপটি। দোকানির কাছে সিগারেট চেয়ে নিল।ম্যাচ দিয়ে ধরিয়ে দ্রুত দোকান থেকে বাইরে বের হয়।ফারদিনার বলা বাক্যগুলো,কাটানো মুহূর্তগুলো চরম ভাবে তাকে আ’ঘাত করছে।মনে পড়ছে। ধাওয়া করছে তাঁকে।
রাস্তা ধরে একদিকে হাঁটতে শুরু করল।কিছু লোক তাঁকে দেখামাত্র সম্মানের সাথে পাশ কেটে গেল।লাইন বেঁধে কিছু ঘোড়ার গাড়ি ছুটে চলে যাচ্ছে।সারথীর যা’যা’ কন্ঠ ভেসে আসল। সুফিয়ান সেসব শুনল না।এখন তাঁর উপরে দিব্যি একটা পাথর পড়লেও বোধহয় সে টের পাবে না।কারণ,তাঁর মনের ক্ষতর থেকে বেশি হৃদয়টা ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে যে।
সিগারেট ফুঁকা শেষ। শেষ খন্ডটি ফেলে দিল। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল তার বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে।তবে তাঁকে একা ছাড়েনি সোলেমান ওঁরা। বিন্তি ওঁদের চারজন কে আড়ালে বলেছিল, সুফিয়ান কে যেন একা না ছাড়ে। সুযোগ বুঝে কখন কি করে বসে বিশ্বাস নেই। ওঁরাও তাঁর পিছু পিছু হাঁটছে।
সুফিয়ান হাঁটতে হাঁটতে মৌলভীর বাড়ির সামনে চলে এসেছে।কাঁচা মাটির দোতলা ঘর।ঘরের সামনে মশাল জ্বলছে।চার পাঁচটা গরু বাঁধা।পাশে একটা ফুল বাগান। দমকা হাওয়াতে ফুলের ঘ্রাণ এসে সুফিয়ান এর নাকে বিধল।তাৎক্ষণিক তাঁর মনে পড়ল আলিমনগর এর কথা। তাঁর সে-ই ছোট্ট মাটির ঘরটার কথা।কতশত স্মৃতি সেখানে জমিয়ে ছিল।যা কখনোই ভুলে যাবার নয়।সে ভুলতে চাইছেও না।
সুফিয়ান এর চোখ দুটো ছলছলিয়ে উঠল। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।পারছে না। গোপন নিস্তব্ধ ঘর দরকার।যে ঘরে সুফিয়ান একা মন খুলে কাঁদতে পারবে।বুক ফাটিয়ে তাঁর কষ্ট গুলো চোঁখের জলে ভাসাতে পারবে। অসহায় লাগছে আজ নিজেকে তাঁর।
সোলেমান ওঁরা দূর থেকে সুফিয়ান এর লক্ষ্য অনুসরণ করে মৌলভীর বাড়ির দিকে তাকাল। সুফিয়ান ঠিক কি দেখছে ওঁরা বুঝতে পারল না।
সুফিয়ান পলক ফেলছে না। সোলেমান তাঁর ধ্যান ভাঙ্গাতে তির্যক কন্ঠে চেঁচিয়ে ডাকল। “সুফিয়ান ভাই, চলুন বাড়ি ফিরে যাই”
সুফিয়ান সোলেমান এর দিকে ঘুরে তাকাতেই আপছা করে মৌলভীর ঘরের সামনে লাল রঙের শাড়িতে একজন নারীকে অস্পষ্ট ভাবে দেখল। তাঁর চালচলন কিছুটা ফারদিনার মত। সুফিয়ান আঁতকে উঠল।ঘাড় ঘুরিয়ে মৌলভীর ঘরের দিকে তাকাল। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। শুধু উনার ঘরের দরজা বন্ধ করার কপাট আওয়াজ আসল।
হ্যালুসিনেশন হচ্ছে বলে সুফিয়ান দৃষ্টি সরিয়ে নিল।স্থান ত্যাগ করার জন্য মনস্থির করল।তখনি মৌলভীর কন্ঠ সুফিয়ান এর আনে আসল। সুফিয়ান থমকে দাঁড়াল। মৌলভী বললেন “বাবা, কোন সমস্যা?”
সুফিয়ান মাথা আওড়ালো ‘না’। মৌলভী কয়েক পা সামনে এগিয়ে আসলেন। আবার বললেন “কিছু কইবা?
“না চাঁচা, হাঁটতে হাঁটতে এদিকে আসলাম।আর এখানে এসেই কেন যেন পা আটকে গেল।”
মৌলভী সাহেব কিছু বললেন না।সুফিয়ান উনাকে অতিক্রম করে উনার ঘরের দিকে ক্লান্ত চোখে তাকাল। এরপর থেমে থেমে ভাঙ্গা গলায় বলল “চাঁচা,একটু জল খাওয়া যাবে?”
একজন জমিদার এর পুত্র হয়ে অসহায় এর মত আবদার মৌলভী সাহেব কে নাড়াল।উনি সুফিয়ান এর মুখটির দিকে তাকালেন।মায়া হচ্ছে উনার। সুফিয়ান ভেতর থেকে ভেঙ্গে পড়েছে, সেই প্রতিচ্ছবি যেন তাঁর বাহির থেকেও এখন দেখা যাচ্ছে।
মৌলভী ধীর কন্ঠে বললেন “ভেতরে এসো।”
সুফিয়ান মৌলভীর ঘরে গেল। ভেতরে প্রবেশ করে একটা চেয়ারে বসে। মৌলভী তাসবিহ হাতে পাশেই বসেন। এরপর উনি লম্বা কন্ঠে জল চাইল। সুফিয়ান কিছু বলছে না। বসে বসে নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতন নখ খুটছে।
মৌলভী পুনরায় মূল ঘরের দিকে উঁকি দিয়ে বললেন “একগ্লাস জল চাইলাম। জমিদার পুত্র আইছে।”
থেমে মৌলভী সুফিয়ান এর দিকে চেয়ে বললেন “ কয়লার মধ্যে স্বর্ণের পদার্পন।” বলা শেষে হাসলেন মৌলভী।
সুফিয়ান বলল “না চাঁচা,আমি মনে করি কোন মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থাকা উচিত নয়।আমি জমিদার পুত্র বলে আলাদা সম্মান দেয়ার মানে হয় না।হায়াতের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে।আপনিও সে-ই ঘরে যাবেন আর আমিও।”
সুফিয়ান এর কথাগুলো যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত, এবং বাস্তব। মৌলভী বেশ খুশি হলেন।উনি শুধু অবাক চোখে সুফিয়ান এর দিকে তাকিয়েই রইলেন।
জল আসল।একটা মাটির পাত্রে।পর্দার আড়াল থেকে জলের পাত্রটি মেয়েলি হাতে কেউ একজন সুফিয়ান এর দিকে এগিয়ে দিল।সুফিয়ান জলটি নিয়ে খেয়ে ফেলল। এরপর পাত্রটি পুনরায় মেয়েলি হাতে পৌঁছে দিল।
সুফিয়ান গলা পরিষ্কার করে মৌলভী কে নিচু স্বরে বলল “জল দিল উনি কে?
“আমার মেয়ে।”
“আগে কখনো দেখিনি।তাই জিজ্ঞেস করলাম।”
“ও ওঁর ফুফু বাড়ি ছিল। গতকাল আইছে। পর্দা করেতো।ঘর থেইকা বের হয় না।”
সুফিয়ান তখন ভুল দেখেছে বলে নিশ্চিত হল। কয়েক মুহূর্তের জন্য মৌলভীর মেয়েকে ফারদিনা ভেবেছে। নিজেকে সামলাতে হবে।যাকে তাকে সে ফারদিনা ভাবতে পারে না।ফারদিনার মত আর কেউ নেই। সুফিয়ান মৌলভীর ঘরে ছেড়ে বেপরোয়ার মত বেরিয়ে আসল।পথ হারিয়ে ফেলেছে যেন। কোথায় যাবে ঠিক বুঝতে পারল না।বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে গেল।
The Silent Manor part 49
সোলেমান সুফিয়ান এর পথ আটকে দাঁড়াল।বলল “ওই দিকে আপনার বাড়ি না।ভুল পথে কেন যাচ্ছেন! চলুন আমাদের সাথে।”
সুফিয়ান ভেজা গলায় বলল “মৃ’ত্যু! মৃ’ত্যু খুঁজছি। কোথায় গেলে নিজেকে দুনিয়ার বুক থেকে মুক্ত করতে পারব সে-ই পথ খুঁজছি। বেঁচে থাকাটাই আমার জন্য এখন সবথেকে বড় লড়াই হয়ে যাচ্ছে।আমি বোধহয় বেঁচে থাকার লড়াইয়েও হেরে যাব” বলে সুফিয়ান রাস্তায় হাঁটু গেড়ে ধপাস করে বসে পড়ল। তাঁর কান্না দেখে সোলেমান ওঁরাও কেঁদে উঠল।
