Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৮

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৮

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৮
আরোবা চৌধুরী আরু

ঘড়িতে তখন বিকেল প্রায় সাড়ে পাঁচটা।
বাইরে সন্ধ্যার আবহ ধীরে ধীরে নামছে। আকাশের রঙটা যেন একটু আগেও ছিল গোধূলির কমলা–আর এখন সেটায় ধীরে ধীরে নীলচে সাদার পরত পড়ছে। ূসর মিলিয়ে একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা।
মাথায় ওড়না পেঁচানো, সাদা আনারকলিতে মোড়া শরীরটা ধীরে ধীরে নিচে নামছে।
দাঁড়িয়ে থাকা রুহি হঠাৎ থমকে গেল। চোখ বড় হয়ে তাকিয়ে বলল,,

“তোকে তো সাদা পরী লাগছে রে!”
পাশ থেকে রিশা গদগদ গলায় বলে উঠল,
“আমি সিলেক্ট করে দিয়েছি ড্রেসটা! এজন্যই তো এমন লাগছে!”
এই কথা শুনে রুহি রিশার মাথায় এক গাট্টা মেরে বলল,
“চুপ কর! নাফু এমনিতেই অনেক সুন্দর। ও যা পরবে তাই মানাবে! এটা তোর কৃতিত্ব না!”
এই বলে রুহি এগিয়ে গিয়ে এক হাত দিয়ে নাফিসাকে জড়িয়ে ধরল। ওর ঠাণ্ডা গালটা রুহির কাঁধে লাগতেই হালকা কেঁপে উঠল নাফিসা। সে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, ওরা যা বলছে সব কিছুই অবাক হয়ে দেখছে।
রিশা আবারও বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“সত্যি বলছি, নাফু! তোকে আজ দেখাচ্ছে যেন ‘মেহের’ নামের কোনো সিরিয়াল নায়িকা!”
ওদের কথার মাঝে নাফিসা একটাও শব্দ বলল না। শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, যেন কথাগুলোর মানে বুঝে ওঠার আগেই শব্দগুলো বুকের মধ্যে গলে যাচ্ছে।
ঘরের কোণার সেই নরম ধূসর রঙের সোফাটিতে চুপচাপ বসে আছে সায়মান।
বাঁ পা ভাঁজ করে ডান পায়ের উপর তুলে বসেছে সে। মোবাইলটা তার দু’হাতের মাঝে কখনো স্ক্রল করছে, স্থির হয়ে কিছু দেখছে যেন।
পরনে হালকা আকাশি রঙের কটন শার্ট। প্যান্ট ম্যাচিং করে হালকা স্টোন গ্রে কালারের, হাতের বাঁ পাশে ঝকঝকে একটা ঘড়ি, কালো ডায়াল, সিলভার বডি,, ব্র্যান্ডেড, কিন্তু সেটা জানানোর মতো করে নয়, বরং যেন স্বাভাবিক সৌন্দর্যে জড়িয়ে থাকা।

ও কিছু না বলে, ফোনটা কানে রেখে নিচু গলায় কিছু একটা বলছিল। তারপর একসময় ফোনটা কেটে পকেটে রাখল। এতখন ওদের কথা শুনেছে কি শুনেনি বোঝা গেল না।
ওদের দিকে তাকিয়ে বলল,,
“রেডি সবাই? চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
ওর গলা একেবারে স্বাভাবিক, অথচ একটানা, মাথা নিচু করে একটু থেমে বলল।
নাফিসা এবার চোখ তুলে তাকাল।
ওর চোখ সায়মানের চোখে আটকে গেল।
সেই চোখের গভীরতায় এক অদ্ভুত কিছু আছে, যেটা কড়া না নেড়েই বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
ও কিছু বলল না, শুধু মাথা নোয়াল।
সায়মান এবার চোখ নামিয়ে বলল,,

“চলো।”
সামনের উঠানে পার্ক করা সাদা SUV গাড়ির দরজাগুলো চকচক করছে। রুহি আর রিশা আগে চলে গিয়ে গাড়িতে উঠেছে। একেবারে স্বাভাবিকভাবে পিছনের যাত্রী সিটে বসেছে রুহি, রিশা বসে পরে ।
নাফিসা একটু পিছনে পড়ে গিয়েছে। ও প্রথমবার কোনো প্রাইভেট গাড়িতে উঠছে, আর তার ওপর SUV।
গাড়ির দরজাটা সে বুঝতে পারছে না কীভাবে খুলবে।
সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা সায়মান সেটা খেয়াল করল।
এক সেকেন্ড কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল, তারপর সামনে এসে নিজেই দরজা খুলে দিল। দরজার খোলা আওয়াজটা যেন নাফিসার বুক কাঁপিয়ে দিল।

নাফিসা ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠল। হাতটাও যেন কাঁপছে।
পেছনে রিশা-রুহি নিজেদের মধ্যে ব্যস্ত, কেউ নাফিসার দিকে তাকাচ্ছে না।
গাড়ির ভেতরটা শীতল। AC চলছে, একটা হালকা পারফিউমের গন্ধ ভাসছে, উদ্ভিদ-ভিত্তিক সুগন্ধি, চোখ বন্ধ করলেও বোঝা যায় এটা সায়মানের ব্যবহৃত।
সায়মান গাড়ির স্টার্ট দিতে গিয়ে থেমে গেল।
“সিটবেল্ট পরো।”

নাফিসা দ্রুত তার বেল্ট খুঁজে নিচ্ছে। কিন্তু প্রথমেই হাত যাচ্ছে না ঠিক জায়গায়। বারবার ট্রাই করছে। একবার ভুল জায়গায় চাপছে, একবার হাত নিচে গিয়ে বেল্টটা খুঁজছে।
সায়মান এবার একদৃষ্টিতে ওকে দেখতে লাগল।
তারপর ধীরে ধীরে একটু এগিয়ে এল,,
কিছু না বলে ওর দিকটা একটু ঝুঁকে এল সায়মান। ওর হাত ছুঁয়ে গেল নাফিসার হাতের কাছ ঘেঁষে। নাফিসার চোখ বড় হয়ে উঠল।
তবে তার থেকেও বড় হলো অনুভূতিটা।
সায়মানের শরীর থেকে আসা সেই গন্ধটা আরও স্পষ্ট হয়ে ধাক্কা মারল নাফিসার স্নায়ুতে। কানের পাশে, কাঁধে, মুখে যেন কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে, আর সেই স্পর্শে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরজুড়ে।
হাত দিয়ে সিটবেল্টটা ধরতেই সায়মান সামান্য ঝুঁকল, আর সেই সময়েই,,
নাফিসা একটু ঘুরে তাকাল।
ঠিক তখনই,,

সায়মানের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল নাফিসার কপাল।
এক ঝলক থেমে গেল সবকিছু।
গাড়ির ভিতরের শব্দ, বাইরের বাতাস, গাছের পাতার দোল, এমনকি হৃদস্পন্দনও।
নাফিসার মনে হলো, কেউ যেন ওকে নিঃশব্দে একটা আলোর মধ্যে ছুঁড়ে ফেলেছে। পুরো শরীর হিম হয়ে এল, ঠোঁট কেঁপে উঠল, চোখ বড় হয়ে গেল।
সায়মানও থমকে গেল।
কিছুক্ষণ যেন কেউ কোনো কথা বলল না।
তারপর সায়মান হঠাৎ বুঝতে পেরে সরে এল।
চোখ নামিয়ে বসে পড়ল নিজের সিটে। ঠোঁট শক্ত করে রেখেছে।
পিছন রুহি ও রিশা এতক্ষণ ফোন নিয়ে মধ্যে কথা বলায় ব্যস্ত ছিল। সায়মান গাড়ি এখনো ড্রাইভ করছেনা দেখে রুহির কণ্ঠ এল,,

“দা ভাই, গাড়ি চালাচ্ছ না কেন?”
সায়মান চুপ। এখনো মনে হয় ঘটনার মধ্যে আটকে আছে।
রুহি আবার বলল,
“দা ভাই!!!”
সায়মান চমকে উঠল।
“হ্যাঁ বল?”
“বলছি, ? গাড়ি চালাও তো!”
সায়মান সংক্ষেপে বলল,
“হ্যাঁ, ।”
তারপর একবার তাকাল নাফিসার দিকে।
নাফিসা মাথা নিচু করে বসে আছে। গালদুটো গোলাপি হয়ে গেছে, ঠোঁটে টান, কাঁধ গুটিয়ে আছে।
সে আর কিছু বলল না। শুধু একবার বলল,

“সোজা হয়ে বসো। আমি সিটবেল্ট লাগিয়ে দিচ্ছি।”
এইবার তড়িঘড়ি করে ওর দিকে হাত বাড়াল, খুব ঠাণ্ডা মুখে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিল। তারপর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ি চলতে লাগল ধীরে ধীরে…
কিন্তু কারো হৃদয় যেন দৌড়াচ্ছে অনেক দ্রুত।

ঢাকার ব্যস্ততম এক সন্ধ্যা।
সাদা SUV গাড়িটা রাজপথ পেরিয়ে ঢুকে পড়ল বসুন্ধরা সিটির পার্কিং লটে। বাইরে তখন হালকা বাতাস। গোধূলির আলো পুরোপুরি মিলিয়ে গেছে, আর চারদিকের কাঁচঘেরা দোকানগুলো আলোয় ঝলমল করছে।
শপিং মলের বিশাল লবিতে ঢুকতেই নাফিসার চোখ ছানাবড়া!
কাঁচের দেয়ালের ভেতর যেন একটা পুরো শহর আলোয় ঝকমক, চারপাশে মানুষের ভিড়, রঙিন পোশাক, সজ্জিত দোকানগুলোতে সাজানো হাজারো জিনিস।
ও থেমে গেল এক মুহূর্ত। মাথাটা একটু ঘুরে গেল হঠাৎ।
এই প্রথম কোনো বড় শপিংমলে এল ও।
রুহি ও রিশা ওকে টেনে নিয়ে চলল ভেতরে, বলল,

“চল নাফু, আগে লেডিস সেকশনে চল!”
ওরা দুজন মিলে ঢুকে পড়ল প্রথমেই একটা নামী ব্র্যান্ডের দোকানে।
শীতল এসি ঘরে ঢুকেই হালকা একটা ফুলের সুগন্ধ নাকে এল।
চারপাশে সারি সারি ম্যানিকুইনের গায়ে ঝুলছে দামি গাউন, কুর্তি, ওয়েস্টার্ন ফ্রক।
রুহি বলল,,

“এই ড্রেসটা দেখ! তোর গায়ের রঙের সাথে একদম পারফেক্ট!”
রিশা পেছন থেকে আরেকটা নিয়ে বলল,,
“এইটা দেখ, হালকা টিউল গাউন! তোকে একেবারে পরী বানিয়ে দেবে!”
কিন্তু নাফিসা দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে। দু’হাতে ওড়না শক্ত করে ধরা, ঠোঁটে একটা হালকা হাসি,
“আমার কিছু লাগবে না রে…”
রুহি বিরক্ত হয়ে বলল,
“আবার সেই না! তুই আসছিস না, তাহলে কেন এলি রে!”
রিশা বলল,

“চুপ কর! তুই দেখিস, আমি নাফুর জন্য এমন একটা ড্রেস আনব, দেখেই ওর কথা বন্ধ হয়ে যাবে!”
দুই বোন এবার নিজেরাই ব্যস্ত হয়ে গেল শপিং-এ। একটার পর একটা ড্রেস বের করছে, কখনো জুতা মিলিয়ে নিচ্ছে, কখনো ব্যাগ, কখনো আবার একসঙ্গে টাওয়েল, কসমেটিকস, পারফিউম, স্যান্ডেল, হেয়ার অ্যাক্সেসরিজ, সব কিছুই।
নাফিসা এক পাশে দাঁড়িয়ে। চোখ বড় বড় করে সব দেখছে, চারপাশের আলো, দোকানের ভিতর ঢুকে থাকা অন্য ক্রেতারা, দামি জামাকাপড়, শৌখিন জিনিস।
হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেল কোণের এক ড্রেসে।
হালকা পিংক রঙের গাউন, একদম ঝকমকে নয়, বরং মোলায়েম৷ সাদা ফুলের নকশা, কোমরে হালকা কোমরবন্ধ, আর নিচে নরম টিউলের ভাঁজে ভাঁজে পড়ে আছে।
নাফিসা এগিয়ে গেল।
চোখে বিস্ময়, মনের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
আঙুল দিয়ে গাউনটা ছুঁয়ে দেখল, ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে তাকাল প্রাইস ট্যাগে।
৳৯০,৫০০!
নাফিসার চোখ ছানাবড়া। গলার ভেতর শুকিয়ে গেল।
ওর মাথায় বাজল,

“এত দাম? এই এক ড্রেসের দামে তো ওদের গ্রামের বাড়িতে অনেক পরিবারের মাসের খরচ চলে যায়!”
চোখ নামিয়ে ও ধীরে ধীরে সরে এলো।
আর তখনই…
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সায়মান লক্ষ্য করল ওকে।
ওর শপিং শেষ। সায়মান নিজের জন্য শপিং করতে গিয়েছিল জেমস সেকশনে, ০ওদের শপিং শেষ হয়েছে কি দেখতে আসছিল ও আসতে আসতে চোখ পড়ল নাফিসার দিকে।
তাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিছু বলল না, কিন্তু সরে যাওয়া, সেই গাউন দেখার মুহূর্ত সবকিছু ওর চোখ এড়িয়ে গেল না।
সায়মান এগিয়ে এসে রুহিদের বলল,

“হয়ে গেছে তোদের? নাকি এখনও পুরো শপিং মল বাকি?”
রুহি হেসে বলল,
“মেয়েদের শপিং এত তাড়াতাড়ি শেষ হয় নাকি দাভাই!”
সবাই ব্যস্ত হয়ে শেষ কিছু জিনিস কিনে বেরোল। এক ঝাঁক ব্যাগ নিয়ে ওরা যখন গাড়ির দিকে এগোচ্ছে, তখন নাফিসার মনে হচ্ছিল—

“এত জিনিস! এদের কাছে বুঝি জামাকাপড় শেষ হওয়ার ভয় থাকে?”
মনেমনে ভাবতে থাকে,“আমি তো দুইটা জামা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরে মাস পর মাস পার করে দিতাম…”
বসুন্ধরা শপিংমলের পাশেই বিলাসবহুল ‘Pan Pacific Sonargaon Hotel’ এর ভিতরের রেস্টুরেন্টে এসে ঢুকল ওরা।
ওরা বসেছে এক কোণার টেবিলে।
রুহি আর রিশা অলরেডি মেনু দেখে অর্ডার দিয়ে ফেলেছে।
নাফিসা চুপচাপ। ও চোখ নিচু করে বসে আছে। মেনু কার্ডটা হাতে নিলেও খোলেনি ঠিকমতো।
রিশা জিজ্ঞেস করল,

“নাফু, তুই কি খাবি?”
নাফিসা মাথা নাড়ল,
“কিছু লাগবে না…”
রিশা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোর সবকিছুতেই না না না! এক্সপেরিয়েন্স করবি না কিছু?”
তারপর নিজের মতো করে রিশা বলল,
“ওর জন্য পাস্তা অর্ডার করলো হোয়াইট সস।”
ওয়েটার মাথা নেড়ে চলে গেল।
সায়মান বসে আছে। ও কিছু অর্ডার দেয়নি।
মোবাইলে চোখ, একগাল গাম্ভীর্য। হঠাৎ বলল,

“আমি বাইরের খাবার খাই না।”
রুহি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“আহা দাভাই, বাইরে একদিন খেলে কিছু হয় না!”
খাবার এলো।
সবাই খাচ্ছে। রুহি তার প্লেট নিয়ে ব্যস্ত, রিশা ও সেন।
কিন্তু নাফিসা বসে আছে চুপচাপ। কাঁটাচামচ দিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করছে খাবারে। খাচ্ছে না।
ওর চোখ এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ তাকাচ্ছে ওর দিকে বারবার ওর মনে হচ্ছে।
হঠাৎ সায়মানের গম্ভীর গলা শোনা গেল,

“তোমাকে কেউ দেখছে না, তাই খাওয়াই মন দাও এদিক ওদিক না তাকিয়ে।
নাফিসা চমকে উঠল।
সায়মানের দিকে তাকালো।
সায়মান আবার বললো,“কি হয়েছে? খাও শুরু করো।”
চোখ নামিয়ে আস্তে আস্তে খেতে শুরু করল।
খাবার শেষে সবাই গাড়ির দিকে ফিরছে।
তবে এবার সায়মান তাদের সঙ্গে উঠল না।
সামনের গাড়ি থেকে একজন গার্ড বেরিয়ে এল।
সায়মান তাকে বলল,

“ওদের ঠিক মতো বাসায় নামিয়ে দিও। সাবধানে চালাও।
রুহি অবাক হয়ে বলল,
“দাভাই? তুই যাচ্ছিস না?”
সায়মান মাথা নাড়ল,
“কাজ আছে। আমি পরে যাব।”
তারপর একবার চারপাশে তাকাল।
নাফিসা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। হাতের ব্যাগটা বুকের সঙ্গে চেপে ধরেছে। চোখে একধরনের জিজ্ঞাসু ভাব। কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
সায়মান গাড়ির দিকে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল।
পেছনে থেকে নাফিসার চোখ শুধু তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে, স্থির।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
ঢাকার ঝলমলে রাত পেরিয়ে গাড়িটা ছুটে চলল বাড়ির পথে।
সড়কের দু’পাশে আলো জ্বলছে, ল্যাম্পপোস্টের নিচে থমকে থাকা মানুষ, ফুচকার দোকানে লাইন, রিকশা চলাচল, বাইকের হর্ণ, সবই যেন একটা ব্যস্ত ছন্দ।

রাত তখন ন’টা পার করেছে। ঢাকার ব্যস্ত দিন এখন অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে। চারপাশে এখনও গাড়ির শব্দ শোনা যায় বটে, তবে সেটা যেন দূর থেকে আসা কোনো দূরের ঝঙ্কার যা কানে লাগলেও, মন ছুঁয়ে যায় না।
নাফিসা নিজের রুমে ফিরে এসেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। নিঃশব্দে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে। আয়নায় ওর প্রতিবিম্বটা কেমন যেন অপরিচিত লাগছিল।
ফ্রেশ হয়ে নিয়ে সে অজু করে এশার নামাজ আদায় করল।
নামাজ শেষে মোনাজাতে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ মুখে কিছু না বলেও মনে মনে কি যেন চাইল। কিছু না চাইতেও যেন সৃষ্টিকর্তার কাছে কিছু অভিমান করে বলল… আবার কিছু বলতেও যেন ভয় পেল।
তারপর ধীরে ধীরে গিয়ে বসে পড়ল নিজের খাটের ওপরে রাখা উপন্যাসের বই নিয়ে।

“শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’” সেই পুরনো ছাপা কাগজের গন্ধ, পাতায় পাতায় কালি ছড়ানো অক্ষর সব কিছুই আজ হঠাৎ খুব আপন মনে হচ্ছিল। নাফিসা যেন নিজেকেই ‘বিলাস’ আর ‘বিজয়া’র মাঝামাঝি কোথাও খুঁজে পেতে লাগল।
পড়তে পড়তে হঠাৎ বই বন্ধ করে জানালার কাছে এগিয়ে এল। তার সাদা পর্দা হালকা বাতাসে দুলছে।
বেলকনির কাচের দরজা খুলে ও দাঁড়াল বাইরে।
রাতের আকাশটা আজ যেন অন্যরকম।
নীরব, শান্ত, উদার। তারার ঝিকিমিকির মাঝে উঠে এসেছে এক থালার মতো পূর্ণচাঁদ। চারপাশে হালকা নীলাভ ছায়া, যেন আকাশ নিজেই একটা চাদরে মোড়া গল্প হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
আকাশের দিকে তাকিয়ে নাফিসার চোখে এক অদ্ভুত আবেশ ছড়িয়ে পড়ল।
আজকের দিনটা… কত কিছু ঘটল!

সায়মান… এর সেই মুহূর্ত… তার গায়ের গন্ধ, সেই অনিচ্ছাকৃত ছোঁয়া সব যেন এখনও শরীরে রয়ে গেছে, মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। যতবার ভাবছো ততবার গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে। ওর মনে হচ্ছে ওকে কেউ বিদ্যুতের ঝাটকা দিয়েছে।
চোখ বন্ধ করতেই সেই মুহূর্তটা আবার ফিরে এল।
ঠিক তখনই,
টুক…টুক…
রুমের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
নাফিসা চোখ মেলে ধীরে ধীরে বলল, “কে?”
বাইর থেকে একটা নরম গলা ভেসে এল,
“আমি… মামনি।”
নাফিসা সাথে সাথেই দরজার কাছে গিয়ে খুলে দিল।

সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আফিয়া বেগম। মুখজুড়ে এক শান্ত-স্নেহময় হাসি, পরনে নরম কটনের একটা পাকিস্তানি থ্রি-পিস, বুটিক স্টাইলের ডিজাইন। চোখেমুখে দিনের ক্লান্তি থাকলেও তাতে একটা পরিপূর্ণতা আছে, একজন দায়িত্ববান মায়ের ক্লান্তি। যদিও বা এ বাড়িতে হেল্প করার মত মানুষের অভাব নেই। অনেক স্টাফ রয়েছে তাকে সাহায্য করার জন্য। আফিয়া বেগম নিজের ইচ্ছায় রান্নাটা নিজে করে।
তিনি ঘরে ঢুকে নাফিসাকে একদম কাছে টেনে নিলেন। নাফিসা যেন আবার নিজের ছোটবেলার মায়ের আঁচলে ঢুকে পড়ল।

“কী রে মা, আজকের শপিং কেমন কাটল? যা যা দরকার ছিল সব নিতে পেরেছিস তো?”
নাফিসা মাথা নিচু করে বিনয়ের সাথে হাসল, তারপর হালকা স্বরে বলল,
“হ্যাঁ মামনি। ভালোই ছিল।”
আফিয়া বেগম মুখে হাত রেখে ওর গালটা স্পর্শ করলেন। মুখের এক কোণে যেন একটু কৌতূহলও ছিল, সেই সঙ্গে স্নেহ,,
“খুব ক্লান্ত লাগছে দেখছি! চল, নিচে চলো। সবাই খেতে বসেছে।”
নাফিসা সাড়া না দিয়ে পারল না। চুপচাপ উঠে পড়ল।

সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় নাফিসা দেখল, ঘরের ভেতরটা সুন্দর আলোয় ঝলমল করছে।
সবাই একসাথে বসেছে। এই বাড়ির নিয়মই এমন রাতের খাবার সবাই একসাথে খায়, যতোই ব্যস্ত থাকুক।
ইমা বেগম ছোট্ট রাহিলকে খাওয়াচ্ছেন। পুচকে ছেলেটা আজ একটু অসুস্থ, তাই চুপচাপ বসে আছে। কোনো দুষ্টুমি নেই চোখেমুখে, শুধু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছে।
রুহি তার পাশে বসেছে, মুখে ফোন, একহাতে চামচ নিয়ে খাচ্ছে।
বিলকিস আরা একপাশে বসে আছেন নিজের মতো।মাঝে মাঝে ইমা বেগমের সাথে কথা বলছে।
নাফিসা এসে সবার একপাশে বসে পড়ল চুপচাপ। মাথা নিচু।
তার সামনে এসে বসল… সাইফান।
ছেলেটা হালকা গা-ঢাকা টিশার্ট আর ট্র্যাক প্যান্টে। দেখলেই বোঝা যায়, রীতিমতো ফ্রি মেজাজের। তার মুখে এক চিলতে দুষ্টু হাসি।
সামনাসামনি চোখে চোখ পড়তেই… নাফিসার বুক ধক করে উঠল।
সাইফান মুখে এক হাসি রেখে বলল,

“এই যে পিচ্চি আপু, আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছো মনে হচ্ছে?”
নাফিসা চমকে উঠল, কিছু বলতে পারল না।
সাইফান হেসেই চলেছে,
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই! তুমি আমার মেলায় হারিয়ে যাওয়া বোন! দেখো না, আমার গায়ের রং এর সাথে তোমার গায়ের রং হুবহু মিল! আমি তো তোমায় দেখে প্রথমেই থমকে গিয়েছিলাম।”
নাফিসার চোখে বিস্ময়। সে ভেবেছিল ছেলেটা নিশ্চয়ই রাফ-টাফ, হয়তো কথা বলবে না, ভয়ংকর সিরিয়াস টাইপ। কিন্তু এখন যা বলছে, আর যেভাবে বলছে, একেবারে বিপরীত।
সাইফান আবার বলল,
“আমি আবার ছোটদের বেশিক্ষণ আপনি করে বলি না। তুই করে বললাম… প্লিজ মাইন্ড করিস না, ছটু!”
নাফিসার মুখে এবার এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটল।
সে আস্তে করে বলল,

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৭

“না ভাইয়া, মাইন্ড করিনি।”
এই ঠিক সময়,
ঘরের দরজায় ঢুকলেন সৈয়দ মাহবুব রাশিদ ও সৈয়দ মঈন রাশিদ, দুই ভাই। পরনে হালকা , একজনে কালচে নীল শার্ট, আরেকজন হালকা ধূসর। অফিস থেকে ফিরেছে সম্ভবত।
তারা এসে নিজেদের আসনে বসল। একজন বসলো ইমা বেগমের পাশে, আরেকজন গিয়ে বসল আফিয়া বেগমের পাশে।
ঘরে এখন এক অন্যরকম পূর্ণতা ছড়িয়ে পড়েছে।
নাফিসা নিঃশব্দে চারপাশে তাকাল।
মাহবুব রাশিদ চোখ গেল……………

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৯