Home প্রণয়ের ঘোর রাত প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৭

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৭

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৭
আরাফাত আদনান সামি

সময় ঠিক এগারোটা।
কুয়াশার ধূসর চাদর অনেক আগেই সরে গেছে। রাস্তায় রোদের হালকা ঝিলিক পড়েছে আর গাড়ি আপন গতিতে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু গাড়ির ভেতর নেমে আছে খানিকটা ভারী নীরবতা,যেন কোনো অদৃশ্য দেয়াল মায়া আর কৌশিকের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। কৌশিক মাঝে মাঝে আড়চোখে মায়ার দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ পর কৌশিকই নীরবতা ভাঙল।

“চুপ চাপ যে?”
মায়া ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। চোখে কোনো বাক্য নেই, মুখে একটিও শব্দ নেই। কৌশিক আবার বলল, এবার একটু জোরে,
“কী হলো, কথা বলছিস না কেন?”
মায়া সামান্য গম্ভীর মুখ করে, খুব নরম স্বরে বলল,
“এমনি।”
“এমনি?”
“হু।”
কৌশিক ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?”
মায়া জানালার বাইরে তাকিয়েই ছোট্ট করে বলল,
“না।”
“আমার সাথে?”
মায়া মাথা নাড়ল,
“হু।”
কৌশিক ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি চেপে বলল,
“ঠিক আছে, বলিস না।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

মায়া আর কিছু বলল না। শুধু মুখ গম্ভীর করে চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে রইল,যেন চারপাশের সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। কৌশিক আবারও আড়চোখে তার দিকে তাকাল। মায়ার চোখে চোখ পড়তেই সে মিটিমিটি হাসল। বিস্মিত বিরক্তিতে মায়া তাকিয়ে বলল,
“একটু পরপর আপনি আমাকে দেখে এইভাবে মিটিমিটি করে হাসছেন কেনো?”
কৌশিক গম্ভীর ভঙ্গি করার চেষ্টা করলেও কথার ভেতর স্পষ্টই খুনসুটি,
“তোকে দেখে না, কৌশিক তার চিপকালি’কে দেখে হাসছে। তোর কোন সমস্যা? আমার হাসিতে নজর দিস না। সমস্যা থাকলে চোখ বন্ধ করে রাখ।”

“ওই চিপকালিটাই আমি।”
“যাক শিকার করলি তাহলে।”
মায়া বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“অসহ্য!”
কৌশিক হালকা হেসে গ্লাসে টোকা মারল,
“এইতো, আর একটু অপেক্ষা কর। বিয়ের পর তোর সব ধাচ মিটাচ্ছি।”
বিয়ের শব্দটা মায়ার কানে যেতেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত বলল,
“কৌশিক ভাই, শুনেন না…”
“হ্যাঁ, কী বল?”
মায়ার কণ্ঠটা একটু কেঁপে উঠল,

“বিয়ের বিষয়টা নিয়ে আর একটু ভেবে দেখলে হয় না?”
কৌশিক সরাসরি বলল,
“ভেবে আর কাজ নেই।”
“কিন্তু কেনো?”
“শুভ কাজে দেরি করতে নেই!”
মায়ার চোখ-মুখে আতঙ্কের ছায়া স্পষ্ট। কণ্ঠটা কেঁপে উঠে শব্দ করল,
“আমার খুব ভয় করছে কৌশিক ভাই…”
কৌশিক হালকা হেসে তাকে আশ্বস্ত করল,
“আমি আছি তো নাকি! ভয় পাবার কিছু নেই।”

কৌশিকের এই আশ্বাসও যেন মায়ার বুকের ভেতরের অস্থিরতা পুরোটা নামাতে পারল না। সে আবারো চুপ হয়ে গেল। ঠোঁট সিল করে নিল, মুখ দিয়ে আর একটাও শব্দ বের হলো না। গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কৌশিকও কিছু বলল না। ঠিক ১১টা বাজে ৫০ মিনিট। কৌশিকের গাড়িটি এসে থামল শহরের এক বিশাল উঁচু বিল্ডিংয়ের সামনে। দরজা খুলে দুজনে নেমে পড়তেই ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা কৌশিক আর মায়ার মুখে এসে লাগল। মায়া সাথে সাথে চাদরটা আরো ভালো করে শরীরের সাথে চেপে ধরল। গাড়ির দরজা খুলে অপর পাশ থেকে কৌশিক নামতেই আশেপাশে থাকা মেয়েরা আচমকা থমকে গেল। তাদের দৃষ্টিতে যেন বিস্ময়, মুগ্ধতা আর কৌতূহলের মিশ্রণ। কৌমিকের সুঠাম জিম করা দেহ, প্রশস্ত কাঁধ, স্পষ্ট সিক্স প্যাকের অবয়ব,কারও চোখই যেন সরছিল না। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা দুই তরুণী নিজেদের সামলাতে না পেরে ফিসফিসিয়ে বলল,

“ওয়াও কী বডি! কী হ্যান্ডসাম দেখতে ছেলেটা!”
তারই পাশের বান্ধবী অতিরিক্ত সাহস সঞ্চয় করে একটু জোরেই বলে উঠল,
“হেই, হ্যান্ডসাম বয়, চকলেট বেবি তোমার নাম্বারটা দেওয়া যাবে?”
কথাগুলো যেন সোজা তীরের মতো গিয়ে বিদ্ধ হলো মায়ার কানে। প্রতিধ্বনির মতো তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। আর সহ্য হলো না। কৌশিক মুখ খুলে সামান্য কিছু বলতে যাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে মায়া তার চাঁদর বাড়িয়ে কৌশিককে ঢেকে দিতে লাগল। কৌশিক সাথে সাথে অবাক হয়ে বলল,
“কী করছিস?”
সে চাঁদরটা সরাতে যাবে, এমন সময় মায়া তার দিকে চোখ রাঙিয়ে, গলা একটু উঁচু করে বলল,
“এই চাঁদরটা যদি আপনার শরীর থেকে এক ইঞ্চিও সরে, তাহলে আপনাকে আমি সোজা পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিব। বলে দিলাম!”

কথা শেষ করেই সে ঘুরে তাকাল ওই দুই মেয়ের দিকে। তারা এখনো কৌশিকের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে। মায়া আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। রাগে গা কাঁপতে কাঁপতে দু’জনের সামনে গিয়ে আঙুল তুলে বলল,
“তোদের ঘরে বাপ-ভাই নাই নাকি? রাস্তাঘাটে পরপুরুষ দেখে কীভাবে কথা বলতে হয় তোদের এটা শেখায় নি? এভাবে একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে এইসব কথা বলতে তোদের একবারও লজ্জা করল না? নির্লজ্জ! বেহায়া! অসভ্য মেয়ে কোথাকার!”

মায়ার কণ্ঠ এতটাই দৃঢ় আর উচ্চ যে আশেপাশের প্রায় সবাই শুনে ফেলল। অনেকেই থেমে তাকিয়ে রইল। কারও মুখে হাসি, কারও চোখে বিস্ময়। মেয়েদুটো লজ্জায় চুপসে গেল। মুখ ভেঙে ছাপার মতো ভঙ্গিতে দ্রুত জায়গা ছেড়ে সরে গেল তারা। মেয়েদুটো লজ্জায় মুখ ঢেকে চলে যেতেই চারপাশ আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠল। কিন্তু মায়ার ভেতর তখনো ঝড়। মায়া ততক্ষণে আগুনে ফেটে পড়ছে। আর কৌশিক? সে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাক,এক হাতে চাঁদর চেপে ধরে, আর মুখে এমন অদ্ভুত হাসি যেন পরিস্থিতির ভেতর লুকিয়ে থাকা আদুরে ভালোবাসা সে পুরোপুরি উপভোগ করছে। মায়া কড়া চোখে তাকাতেই সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল,কারণ সে জানে, এই মেয়েটার রাগে আগুন ধরালে সে-ই শেষমেশ পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। কৌশিক কিছু বলার আগেই মায়া মুখ খিচে গম্ভীর গলায় বলল,
“আপনাকে আমিইইইই…!”

কথা আটকে গেল তার, কিন্তু রাগে লাল হয়ে থাকা মুখ দেখে কৌশিক বিস্মিত। পরক্ষণেই ঠোঁট কামড়ে দুষ্টু হেসে ফেলে সে।
“জেলাস। বহুত জেলাস।”
মায়া আরও চটে উঠে বলল,
“আপনার জেলাসের গুষ্টি! আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না।”
“আমি কেন কথা বলবো না? এখানে আমার কী দোষ শুনি?”
কথাটা বলে কৌশিক উদাস ভঙ্গিতে হাত ভাঁজ করল।
মায়া যেন বিস্ফোরিত হলো,

“তো আপনার দোষ না? খালি গায়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন? ও আচ্ছা! আচ্ছা! মেয়েদের নিজের বডি আছে তা দেখানোর জন্য তাই না? ছেলেদের এইসব চালাকি আমি খুব ভালো করেই জানি!”
কৌশিক বিরক্ত হয়ে মাথা চুলকাল,
“তোকে বাঁচাতে গিয়ে না আমার শার্ট…”
তার কথা আর শেষ করতে দিল না মায়া। ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল,
“এখন বাহানা দিবেন না একদম। এক্সট্রা একটা শার্ট গাড়িতে রাখা যায় না?”
ভুল যারি হোক না কেন ঘুরেফিরে সরি ছেলেদেরই বলতে হয় কৌশিক সেটা ভালো করে বুঝতে পারল। কথা গুলো ভাবতেই কৌশিক এবার হেসেই ফেলল। মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে মায়ার কাছে এগিয়ে এলো। নরম, শান্ত স্বরে বলল,
“সরি জান আর এমন ভুল আর হবে না। এবার শান্ত হো এখন থেকে একটা নয়,দুটো করে শার্ট রাখবো, খুশি?”
মায়া কোন উত্তর দিল না। কৌশিক আবার বলল,

“সরি বললাম তো জান।”
মায়া আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে! ঠিক আছে!”
বলেই মায়া মায়া উল্টো দিক দাঁড়াল। কী মনে করে বিল্ডিংটার একটু উপরের দিকে তাকাল সে,উঁচু, বিশাল বড়। ঠিক তখনি তার দৃষ্টি আটকে গেল পঞ্চম তালায় ঝুলে থাকা সাইনবোর্ডটায়। বড় বড় অক্ষরে লেখা
“কাজি অফিস”
সেই শব্দ দুটো চোখে পড়তেই মায়ার পদক্ষেপ থেমে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন এক লাফে বেড়ে গেল। গলা শুকিয়ে এল। মনে মনে বিড়বিড় করে ওঠল সে,

“তাহলে কি সত্যিই আজ আমরা এখানে বিয়ে করতে এসেছি? তাহলে কৌশিক ভাই গাড়িতে এতক্ষণ মজা করেননি? সত্যিই আজ আমারা বিয়ে করতে চলেছি?”
কথাগুলো ভাবতেই তার পায়ের তলায় জমিন কেমন যেন নরম হয়ে এল। চারপাশ যেন কেঁপে উঠল অস্থিরতায়। ঠিক তখনিই কৌশিক নরম স্বরে বলে উঠল,
“এই যে হ্যালো ম্যাডাম! পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে আর নাটক না করে ভেতরে ঢুকে আমাকে উদ্ধার করুন, প্লিজ!”
মায়া মুখটা কুচকে তাকাল একবার। বিরক্তি? নাকি লজ্জা? কে জানে! কোনো উত্তর দিল না। শুধু সোজা মাথা নিচু করে হাঁটা ধরল বিল্ডিংয়ের ভেতরের দিকে। আর কৌশিক তার সাথে সাথে, এক পা পিছিয়ে নয়, বরং মায়ার হাঁটার তালে তালে হাঁটছে কৌশিক। তারা দু’জন ভেতরে পা রাখতেই ঠান্ডা মার্বেল ফ্লোরে শব্দ তুলে এগিয়ে গেল লিফটের দিকে। লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই কৌশিক চারপাশে তাকাল। প্যানেলে লাইট জ্বলছে না, লিফটের দরজাটাও বেশ ফাঁকা। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী একজন লোককে থামিয়ে কৌশিক জিজ্ঞেস করল,

“ভাই, লিফট কি চলছে না?”
লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল,
“না ভাই, সপ্তম তলায় আটকে আছে। সকাল থেকেই চেষ্টা করতেছে ঠিক করতে, কিন্তু হবে কিনা কিছু বলা যাচ্ছে না।”
কথাটা বলেই লোকটা চলে গেল। কৌশিক ভ্রু কুঁচকে তাকাল মায়ার দিকে। মায়া গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটু পরপর আঙুলগুলো জড়াচ্ছে আবার ছাড়ছে। কৌশিক এগিয়ে গিয়ে হালকা গলায় বলল,
“লিফটের জন্য দাঁড়িয়ে লাভ নেই। আসবে না।”
মায়া অবাক চোখে তাকাল,

“কেনো আসবে না?”
কৌশিক হালকা হাসল,
“লিফট নাকি আটকে গেছে। মানে সমস্যা হয়েছে।”
মায়া বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বলল,
“তাহলে এখন কী করবো?”
কৌশিক কাঁধ ঝাঁকাল,
“কী আর করবো,সিঁড়িই ভরসা। সিঁড়ি বেয়েই উঠতে হবে।”
মায়া দু’চোখ বড় করে বলল,
“পঞ্চম তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে? না বাপু আমি পারবো না।”
কৌশিক কাছে এসে বলল,
“আরে, গল্প করতে করতে চলে যাবো টেরই পাবি না। আয়, আমি আছি তো।”

যা কথা তাই কাজ সিঁড়িতে পা রাখার পর থেকেই দু’জনের মধ্যে শুরু হলো খুনসুটি। মায়া একটু রাগ দেখালে কৌশিক মজা করে আরও বেশি রাগানোর চেষ্টা করছে, আর মায়া মাঝে মাঝে ধমক দিচ্ছে, মাঝে মাঝে না চাইলেও হেসে ফেলছে। এইভাবে প্রথম তলা পেরিয়ে দ্বিতীয় তলা, তারপর তৃতীয় তলার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হঠাৎ মায়া থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আর দাঁড়িয়েও থাকতে পারল না, ধপ করে সিঁড়িতে বসে পড়ল। তার মুখ লাল হয়ে গেছে, কপালে ঘাম, শ্বাস দ্রুত পড়ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মায়া,
“আমি আর পারবো না কৌশিক ভাই। আমার পা ব্যথা করছে। আমি ধারায় আর হবে ন…”
বাক্যটা শেষ হবার আগেই কৌশিক কোন কথা না বলে সামনে ঝুঁকে মায়াকে কোলে তুলে নিল। ঘটনাটা এতটাই হঠাৎ যে মায়া চমকে তার দুই হাত দিয়ে শক্ত করে কৌশিকের ঘাড় জড়িয়ে ধরল।

“আরে!”
হালকা ভয়ে মায়ার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
সিঁড়ির কোণে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন লোক থমকে তাকিয়ে আছে অবাক, মুচকি হাসছে কেউ কেউ। এই দৃশ্য চোখে পড়তেই মায়া কান লাল করে ফেলল। লজ্জায় মাথা নিচু করে কৌশিকের কানে ধীরে বলল,
“কি করছেন? সবাই তাকাচ্ছে!”
কৌশিক নির্লজ্জ আত্মবিশ্বাসে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলল,
“দেখুক। তাতে আমার কী? আমি আমার প্রাণকে নিয়ে যাচ্ছি।”
মায়া লজ্জায় লাল হয়ে ফিসফিস করে বলল, “ইশ্… অসভ্য।”
কৌশিক হেসে উঠল,

“তোরই তো।”
মায়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী আমারি তো?”
কৌশিক হালকা ঠাট্টার স্বরে ফিসফিস করে উত্তর দিল,
“এই যে আমি নামক অসভ্যটা।”
কৌশিকের সেই দুষ্টু বাক্য শুনে মায়ার গাল মুহূর্তেই পাকা লাল টমেটোর মতো হয়ে উঠল। সে এক মুহূর্তের জন্যও কৌশিকের চোখের দিকে তাকাতে পারল না। লজ্জায় মুখটা লুকিয়ে ফেলল কৌশিকের উষ্ণ, উন্মুক্ত বুকে। চাঁদরে জড়ানো সেই বুকে আশ্রয় নিয়ে যেন নিজেকে আরও ছোট করে ফেলল। মাথা নিচু করেই ধীরে ধীরে বলল,
“আচ্ছা,আপনার লজ্জা করে না? গায়ে কোনো টিশার্ট-শার্ট নেই, শুধু চাঁদর জড়ানো। আর সেই অবস্থায় আমাকে কোলে নিয়ে সবার সামনে দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে হাঁটছেন!”
কৌশিক একচোট হেসে বলল,

“একদমই করছে না। বরং পারলে চাঁদরটা সরিয়ে দে, আমার আরো ভালো লাগবে।”
“ইশ্! অসভ্য কোথাকার!”
কথাটা বলেই মায়া লজ্জায় কৌশিকের বুকে আলতো করে এক পাঞ্চ মারল। কৌশিক ঠোঁট কামড়ে হাসল। সিঁড়ির পরের ধাপটা উঠতেই একটু ঝুঁকে মায়ার মুখের কাছে এসে দুষ্টু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“সুইটহার্ট,এখানে এই মূহুর্তে তোর ওই গোলাপি চিকন ঠোঁটে যদি কড়াহ্ করে একটা কিস খাই, ব্যাপার টা কেমন হয়?”
কৌশিকের কথা শুনে মায়ার হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তেই দ্বিগুণ হয়ে গেল। গালে আগুন জ্বলে উঠল লজ্জায়। সে কৌশিকের বুকে আরও জোরে মুখ গুঁজে ধরল, যেন পৃথিবী থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে। নরম, কাঁপা কণ্ঠে বলল,

“আপনি একটা অসভ্য নির্লজ্জ বেটাছেলে। আশেপাশের লোকজন শুনলে কী বলবে?”
“কি বলবে?”
মায়া গুঙিয়ে উঠল,
“জানি না,কিন্তু আপনি আপনার মুখে লাগাম লাগান!”
কথাটা বলেই মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। কৌশিকের বুকে মাথা রাখতেই সে প্রথমবার অনুভব করল তার বুক ধুক ধুক শব্দ তুলছে। চারদিকে ঠান্ডা যেন আরও বেশি নেমে এসেছে। সিঁড়িঘরের দেওয়ালে জমে থাকা শীতলতা ধীরে ধীরে তার ত্বকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিল। গা শিউরে উঠতেই সে কৌশিকের দিকে তাকাল।
“আচ্ছা আপনার শীত লাগছে না? আমার তো ভীষণ লাগছে…”
কৌশিক কোনো উত্তর দিল না। বরং ভ্রু উঁচু করে দুষ্টু সুরে হঠাৎ গাইতে শুরু করল,
“শীত শীত ভাব,

এই শীতে চার-পাঁচবার কন্ট্রোল হারিয়ে
শরীর গরম করার জন্য
মায়া তোর ভীষণ অভাব…”
“অসভ্য।”
কৌশিক আবার হাসি চেপে বলল,
“শীত যেন না লাগে সেই ব্যস্ততাই করতে যাচ্ছি।”
“কীভাবে?”
“তোকে আপন করে কাছে টেনে নিয়ে।”
মায়া মাথা তুলল, চোখ বিস্ফারিত,
“কেন! আমি কাছে থাকলে শীত লাগবে না বুঝি?”
কৌশিক দমকা হাসল,

“একটুও না। এই বিষয়ে কোনো দ্বিমত প্রশ্নই ওঠে না। যাকে বলে ১০০ তে ১০০।”
মায়ার গাল দুটো যেন মুহূর্তেই গোলাপের পাপড়ির মতো লাল হয়ে উঠল। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল সে, যেন কৌশিকের দুষ্টু কথাগুলো থেকে নিজেকে আড়াল করতে চাইছে।
“ইশ্, আপনি আর আপনার এই অসভ্য মুখটা বন্ধ করুন। আপনার লজ্জা-সরম নেই, কিন্তু আমার আছে।”
কৌশিক মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,

“ভীষণ লজ্জা বুঝি?”
“খুব।”
“ও আচ্ছা,তাহলে আমি মুখ বন্ধ রাখলে তুই এই লজ্জা থেকে বেঁচে যাবি, তাই তো?”
“একদম,আপনি যখনই মুখ খুলেন, তখনই আমার সাথে কিছু না কিছু অসভ্যতামি করেন। আর আমার খুব…”
এর আগেই কৌশিক তার মুখের খুব কাছে ঝুঁকে এল। দু’জনের নিশ্বাস যেন একই তালে মিলল হল। কৌশিকের কণ্ঠে নেশা ধরানো,

“কীহ্?”
মায়া হকচকিয়ে উঠল। লজ্জায় তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।সে আমতা আমতা করে বলল।
“ক..কি কিছু না।”
“সত্যিই কিছু না?”
মায়া ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করল,

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৬

“ন…না…”
কৌশিক আরেকটু ঝুঁকল। মায়ার ঠোঁট থেকে তার ঠোঁটের দূরত্ব এখন নিঃশ্বাসের মতো ছোট। গভীর, মায়াবী, ঘোর লাগা কণ্ঠে কৌশিক সূরে বলল,
“সুইটহার্ট…”

প্রণয়ের ঘোর রাত পর্ব ২৮