Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৬

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৬

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৬
নুরিয়া ইসলাম

রাতের নিস্তব্ধতায় ঘরের ভেতর শুধু ইনায়ার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।সে তো এমন জীবন কখনো চায়নি, না চেয়েছে এরিকের মতো এমন জীবনসঙ্গী । কিন্তু নিয়তির নির্মম খেলায়, জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের মানুষটাই তার সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
ইনায়া অনেকবার চেয়েছে এরিককে ঘৃণা করতে, দূরে ঠেলে দিতে। কিন্তু হৃদয়ের এক গোপন কোণে গুঞ্জরিত এক অনুভূতি তাকে বারবার টেনে আনে যেটা সে অস্বীকার করতেও পারে না, স্বীকারও করতে পারে না।
এই নিষিদ্ধ আবেগগুলো আজকাল তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

সে কিছুতেই চায় না, … কোনোভাবেই এই অনুভূতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায় না।
সে নিজেকে বোঝাতে চায়,ওই বেপরোয়া, উন্মাদ পুরুষের মোহে সে কিছুতেই নিজেকে জরাবে না,যার হৃদয়ে তার ধর্ম নেই।কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।ইনায়া ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে কেবল আল্লাহর দরবারে বলতে থাকে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—”হে আল্লাহ, তুমি কেন এমন একজনের সঙ্গে আমার জীবন জুড়ে দিলে,যে তোমাকেই মানে না?”
তার দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে থাকে বালিশে, বুকের ভেতর জমে থাকা ভার একটুও হালকা হয় না। বিশ্বাস আর অনুভূতির এই অসম যুদ্ধের মাঝখানে সে ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে, নিঃশব্দে, নিঃসঙ্গভাবে।
একটু ভালোবাসা চাইতে গিয়েও, আজ সে বয়ে বেড়ায় শুধু এক অনাহুত নিষেধের গ্লানি।
তারা ভরা আকাশের আঁধারেও নেই তার কোনো আশার আলো।
তবু সে থেমে থাকে না…
চোখ বন্ধ করে নিঃশব্দে প্রার্থনা করতে থাকে,
—”হে আল্লাহ, তুমি যদি তার হৃদয়কে না বদলাও… তবে আমার হৃদয়টা নিস্তেজ করে দাও। আমি আর কিছু অনুভব করতে চাই না…”

মিস্টারা প্যালেস,
হলরুমে সারভেন্টরা এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, সবার মুখে আতঙ্কের ছাপ। ওপরে অলিভিয়ার চিৎকারে পুরো বাড়ি কাঁপছে, তার সঙ্গে ভাঙচুরের শব্দে পরিবেশ আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে। রাগে তার মাথা ঠিক নেই — কেউ তার সামনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না।
এরিক ইনায়াকে বিয়ে করেছে, এই খবরটা শোনার পর থেকেই এক ভয়ংকর ঝড় বয়ে গেছে অলিভিয়ার ভেতরে। সে মানতেই পারছে না এই সত্যটা — এরিক এখন আর তার নয়, অন্য কারও হয়ে গেছে।
কথাটি ভাবতেই, অলিভিয়ার রাগ তড়তড় করে বেড়ে ওঠে, সে রাগে নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সামনে রাখা ফুলদানিটা তুলে আছাড় মারতে যাবে ঠিক তখনি অলিভিয়ার বাবা স্ট্যান স্মিথ পিছন থেকে অলিভয়ার হাত চেপে ধরে বলে ওঠে,

—পাগল হয়ে গেছ তুমি অলিভিয়া, এইসব কী করছো তুমি, এত রাগ ভালো নয় মামনি।
অলিভিয়া নিজের রাগকে প্রশমিত করতে বাবাকে জরিয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলে উঠলো,
—ড্যাড, এরিক আমার সাথে এইটা কীভাবে করতে পারলো?ওহ কী বুঝে না আমি ওকে কতটা ভালোবাসি?
মিস্টার স্মিথ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলো, কিন্তু সে বিফল হলো। অলিভিয়া একেবারেই শান্ত হতে পারছিল না। তার মন ভেঙে গিয়েছে যে। এরিককে ছাড়া সে কিভাবে বাঁচবে—এমন চিন্তা তাকে ভেঙে দিচ্ছিল।
চিন্তায় ডুবে থাকা অলিভিয়া হঠাৎ সামনের দিকে থেকে একটা ছু*রি তুলে নিলো। তার আচানক এমন কাজে মিস্টার স্মিথ ভয় পেয়ে গেলো। মেয়েটি এতটাই জেদি যে, নিজের জেদ বজায় রাখতে সে যেকোনো কিছু করতে পারে।
অলিভিয়ার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কায় মিস্টার স্মিথ কাঁপা কন্ঠে বললো,

—”অলিভিয়া ছু*রি*টা রাখ,তোমার এরিককে আমি তোমার কাছে এনে দিব!এরিক শুধু তোমারই থাকবে।”
অলিভিয়া যেন কিছু শুনতে চাইলো না। সে জানে, তার বাবা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে তাইতো ছু*রি*টা আরো শক্ত করে চেপে ধরলো, এতে মিস্টার স্মিথ ভয় পেয়ে বলে উঠলো,
“— কী করছো তুমি অলিভিয়া? সাবধানে কেটে যাবে তো।”
মিস্টার স্মিথের গলায়,ফুটে উঠলো অসহায়তা কিন্তু অলিভিয়ার মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। সে চেঁচিয়ে মিস্টার স্মিতের উদ্দেশ্য বলে উঠলো,
—”কেটে যেতে দাও, ড্যাড!এরিক যদি আমার না হয়, তাহলে আমার এই জীবন রাখার কোনো মানে নেই। আমি এরিককে ছাড়া বাঁচতে চাই না।
অলিভিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই পিছন থেকে মিস্টার রিচার্ড বলে উঠলেন,

—”পাগলামি বন্ধ কর, অলিভিয়া!তোমার এরিক তোমারি থাকবে!কথা দিলাম তোমায়।”
মিস্টার রিচার্ডের আশ্বাসভরা কথাগুলো শুনে অলিভিয়ার ভেতরের ঝড় যেন একটু থামলো। সে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাত থেকে ছু*রি*টা ফেলে দিলো।
পর মুহূর্তে সে দৌড়ে গিয়ে মিস্টার রিচার্ডকে জড়িয়ে ধরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বললো,
“—আংকেল, আপনি সত্যি বলছেন?এরিককে আপনি এনে দিবেন?কিন্তু এরিক তো ইনায়াকে ভালোবাসে। ”
অলিভিয়ার মুখ থেকে ইনায়ার নামটি উচ্চারিত হতেই মিস্টার রিচার্ডের ভেতরে জমে থাকা রাগটা তড়তড় করে বেড়ে উঠলো। এরিকের সেই মেয়েটির জন্য এত পাগলামি কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না তার।কিন্তু তিনি নিজেকে কোনোমতে সংবরণ করলেন। চোখ বুঁজে একবার গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে, শান্ত কণ্ঠে বললেন,

—”তাকে এরিকের জীবন থেকে সরিয়ে দাও!”
মিস্টার রিচার্ডের কথা শুনে অলিভিয়া মুহুর্তেই সেইখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, সে যা শুনেছে তা কী ঠিক শুনেছে?অলিভিয়া সিউর হওয়ার জন্য মিস্টার রিচার্ডকে জিজ্ঞেসা করে,
“—আংকেল,আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন? ”
অলিভিয়ার বোকামি ভরা কথা শুনে মিস্টার রিচার্ড কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে ওঠে,
—”সেটাও কী আমায় বলে দিতে হবে অলিভিয়া?তুমি এতটাও ইমম্যাচুইর নও!”
মিস্টার রিচার্ডের কথায় অলিভিয়া একটা বাঁকা হাসি দিয়ে, ড্রয়ার থেকে এরিক ইনায়ার সেইদিনের পিকটা বের করে সেটাতে লাইটারের সাহায্য আগুন জ্বালিয়ে বলে উঠলো,

“তোমাদের এই নিখুঁত ভালোবাসা? হ্যাঁ, এই ছবির আগুনের মতোই পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।
তুমি ভেবেছো, আমাকে ফেলে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে, এরিক?
না, কখনো না… তুমি আমার ছিলে, আমারই থাকবে—অথবা কারো না!
তোমরা যখন সাতপাকে বাঁধবে, মনে রেখো;আমি সাতটা আগুন জ্বেলে রেখেছি, তোমাদের চারপাশে।
ভাববে না, আমি হেরে গেছি… আমি তো কেবল শুরু করেছি!
ভালোবাসি বলেই তোমার উপর আমার রাইট আছে এরিক, আর যেটা আমি ভালোবাসি না, তাকে নিঃশেষ করি বিন্দুমাত্র দয়া না রেখে।
ইনায়া… সে তো শুধু একটা নাম…
তোমার পাশে ওর অস্তিত্ব আমি মুছে দেব,ছায়ার মতো… নিঃশব্দে… ধ্বংস করে।
এই আগুন শুধু ছবিতে না, এরিক… তোমার জীবনেও জ্বলবে… চিরকাল!”

সময় এগিয়ে চলছে তার নিজের নিয়মে। এরিক ও ইনায়ার বিয়ের এক সপ্তাহ কেটে গেছে। এই ক’দিনে ইনায়া ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে ফেলেছে, দূরে সরে গেছে সবার কাছ থেকে।
চুপচাপ, নিঃশব্দে কেটে গেছে দিনগুলো। ভার্সিটির ক্লাসও বন্ধ পড়ে আছে তার জন্য।
আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই একধরনের অস্থিরতা অনুভব করে ইনায়া। কতদিন আর এইভাবে পালিয়ে থাকা যায়? আর কতদিন সে এরিককে এড়িয়ে চলবে? নিজের সাথেই যেন ক্লান্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
একসময়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রাখে সে। আজকেই সে ভার্সিটি যাবে—এই সিদ্ধান্তে স্থির হয়।

সে নিজেকে প্রস্তুত করে কালো রংয়ের আবায়ায়, সঙ্গে ম্যাচিং করে পরেছে ধূসর রঙের হিজাব, যা তার চেহারার প্রশান্ত ভাবটাকে আরও গাঢ় করে তোলে। নিজেকে আয়নায় একবার ভালো করে দেখে নেয়, চোখে একটুখানি আত্মবিশ্বাসের ছায়া।
তারপর ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে ইউনিভার্সিটির পথে।
ভরদুপুরের আলোয় ক্যাম্পাসের সামনে যখন এসে নামে, তখনই ফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে সোফিয়ার নাম। ইনায়া এক মুহুর্ত দেরি না করে ফোনটা পিক করে,ওপাশ থেকে সোফিয়া বলে উঠে,

—কীরে কতদূর, তুই? ক্লাস শুরু হয়ে যাবে তাড়াতাড়ি আয়।
সোফিয়ার কথা শুনে ইনায়া বলে ওঠে,
—আমি ইউনিভার্সিটির সামনেই আছি, একটু ওয়েট কর!আমি আসছি!
ইনায়ার কথার জবাবে সোফিয়া বলে ওঠে,
—”ঠিক আছে, দ্রুত আয় আমি অপেক্ষা করছি!”
কথাটা বলেই সোফিয়া কল কেটে দেয়। ইনায়া ফোনটা ব্যাগে পুরে একবার চারপাশটা দেখে নেয়। ক্যাম্পাসের গেটের ওপারে রাস্তা, আর রাস্তার এপারে সে—একটা স্বাভাবিক, নীরব দুপুর।
সে পা বাড়ায় রাস্তা পার হওয়ার জন্য।

ঠিক তখনই এক ঝটকায় সামনে এসে দাঁড়ায় একটি কালো রঙের গাড়ি। ব্রেকের তীক্ষ্ণ শব্দে ইনায়া থমকে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে চার-পাঁচজন মুখোশধারী পুরুষ।
তাদের হঠাৎ করে সামনে দেখে ইনায়ার হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায়। ভয় মেশানো কণ্ঠে বলে ওঠে,
“কারা আপনারা? আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
লোকগুলো একটুও কথা না বলে এগিয়ে আসে। ইনায়া চিৎকার করতে গেলে, এক ব্যক্তি আচমকাই একটা ভেজা রুমাল চেপে ধরে তার মুখে। চোখে ভয়, শরীর ছটফট করছে, কিন্তু ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসছে তার চেতনা।
মুহূর্তের মধ্যে তারা তাকে টেনে তোলে গাড়ির ভিতরে।
সাথে সাথে গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
পথের ধুলো আর বাতাস পেছনে ফেলে কালো গাড়িটা গতি তুলে ছুটে চলে… এক অজানা, অন্ধকার গন্তব্যের দিকে।

এরিক অনেক আগেই নিজের গার্ডদের কাছ থেকে খবর পেয়েছে ইনায়ার ইউনিভার্সিটিতে আগমনের। সেই মুহূর্ত থেকেই সে অপেক্ষা করে আছে, একটানা, নিঃশব্দে। অপেক্ষা যত দীর্ঘ হয়, ইনায়ার প্রতি তার রাগ তত গভীর ও স্থির হয়ে ওঠে। রোদের তাপ্ত নিঃশ্বাস পড়ছিল তার মাথার ওপর, শরীর ঘামে ভিজে উঠলেও তার দৃষ্টি একবিন্দু নড়েনি—পুরোটাই নিবদ্ধ ছিল ইনায়ার প্রতীক্ষায়।এতদিনে জীবনে কোনো মানুষের জন্য এতটা অপেক্ষা করেনি সে। ইনায়া তার ধৈর্যের এমন এক পরীক্ষা নিচ্ছে, যা সহ্য করাও এক প্রকার যন্ত্রণা।
তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, এই তপ্ত রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার যে যন্ত্রণা সে সয়েছে, তার প্রতিদান সে শাস্তি দিয়েই আদায় করে নেবে ইনায়ার কাছ থেকে।

এক মিনিট… দুই মিনিট… এভাবে করতে করতে পঁচিশ মিনিট কেটে গেল, তারপর তিরিশ। কিন্তু ইনায়ার কোনো খোঁজ নেই। তার আসার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
এরিক আর নিজেকে থামিয়ে রাখতে পারল না। মনের মধ্যে জমে থাকা রাগ আর বিরক্তি একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সোজা ইনায়ার ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ল।
ক্লাস তখন চলছে, প্রফেসর বোর্ডে কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু এরিকের তাতে কিছুই আসে যায় না। সে কারও তোয়াক্কা না করে সোজা সোফিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,

“I’m giving you only five minutes,Sofia. Step out— No excuses.”
এরিকের কথাটা পুরো ক্লাসরুম জুড়ে ঝংকার তুলে বেজে ওঠে। মুহূর্তেই সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। ছেলেমেয়েরা নিঃশব্দে একবার এরিকের দিকে, আরেকবার সোফিয়ার দিকে তাকায়,কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, আসলে কী ঘটছে এখানে?
কিন্তু এরিক সেসব কিছুকে একেবারেই তোয়াক্কা না করে নিঃশব্দে ক্লাসরুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়।
তার এই আচরণের পর, সোফিয়াও চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়। কোনো কথা না বলেই ধীর পায়ে এরিকের পিছু নেয়। ক্লাসরুমের দোরগোড়ায় এসে, সে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
এরিক টের পায় সোফিয়া এসে গেছে। একবার চোখ তুলে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে উঠে—

—”ইনায়া তোমায় ফোন করেছিল,” এরিকের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় সোফিয়া।
এরিক এক মুহূর্তও দেরি না করে জিজ্ঞেস করে,
—”তোমাদের মধ্যে কী কথা হয়েছে?”
সোফিয়া জানে, এরিক ইনায়াকে নিয়ে কতটা ভাবে, তার কতটা কেয়ার করে। তাই বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সে বলল,

—”সে বলেছে, ইউনিভার্সিটির সামনেই আছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে।”
এরিক এর বিচক্ষণ মস্তিষ্কটা হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করতে পেরেছে।আর দেরি না করে, সে তৎক্ষণাৎ জ্যাকের নাম্বারে ডায়াল করতে থাকে,
এইদিকে জ্যাক নিজের ওয়াইফের সাথে পারসোনাল কিছু মুহুর্ত কাটাচ্ছিলো। ঠিক তখনি জ্যাকের ফোন কেঁপে ওঠে, BZZZ… BZZZ…”
স্ক্রিনে ভেসে উঠে ” Devil boss calling…..
জ্যাকের চোখে-মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে।
সে দম নিয়ে বলে উঠে,

—”শালা খাটাস একটা!ফোন করার আর সময় পেলো না।কেন রে শালা, সবসময় আমার কোয়ালিটি টাইমের মধ্যে তোকে হাড্ডি হয়ে ঢুকতে হবে!”
তার ওয়াইফ হালকা হেসে বলে,
“Pick it up… maybe it’s urgent.”
জ্যাক বিরক্ত মুখে ফোন রিসিভ করে,তখনি ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে ওঠে এরিকের রাগান্বিত গম্ভীর স্বর,
—”জ্যাক, ক্যাম্পাসের বাইরের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ হ্যাক করে আমাকে সেন্ড কর,Right now. I give you only FIVE minutes. No more damn excuses.”
এরিক কথাটা শেষ করেই, জ্যাককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে, ফোনটা কেটে দেয়। এরিকের এই হুটহাট ফোন করার অভ্যাসে জ্যাক খুব বিরক্ত বোধ করে। মনে মনে এরিককে হাজারটা গালি দিতে দিতে, সে জামা-কাপড় পরে নেয়। তারপর হাত বাড়িয়ে, বিছানার পাশে অবহেলায় পড়ে থাকা ল্যাপটপটা তুলে নেয়। রাগে গজগজ করতে করতে, ল্যাপটপ খুলে হ্যাকিং শুরু করে দেয় জ্যাক।
—“এমন একটা দিনও নাই, যেদিন এই ডেভিলটা আমাকে শান্তিতে থাকতে দিয়েছে।”

রাগে তেতে আছে এরিক। ক্যাম্পাসের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে,তার চোখ মুখ কঠিন, চোয়াল আঁটসাঁট, হাত দুইটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। তার চোখে তাকাতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। গার্ডরা দূর থেকে দাঁড়িয়ে তার প্রতিক্রিয়া বুঝে নিতে চেষ্টা করছে, কিন্তু তার শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছে—একটুও ভুলচুক বরদাশত করবে না সে।
অবশেষে, গার্ডদের একজন সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে আসে। তার পা ভারী হয়ে উঠেছে, কণ্ঠ শুকনো, তবু দায়িত্বে অবহেলা করতে পারে না সে। অতি ধীরে, মাথা নিচু করে এরিকের সামনে এসে দাঁড়ায়।কন্ঠ ক্ষীণ করে বলে ওঠে,
—”বস, মাফ করবেন। আমরা ম্যাডামের দিকে ঠিকভাবেই নজর রাখছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছি না কীভাবে এমনটা হলো।”

এরিক এমনিতেই আগুন হয়ে ছিল। গার্ডদের হঠাৎ বলা সেই নির্লিপ্ত কথাটায় তার ভিতরের রাগটা যেন দ্বিগুণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ল শরীরের প্রতিটি কোণে। চোখমুখ আরো কঠিন হয়ে গেল। মুহূর্তেই সে বিস্ফোরিত হলো।
চিৎকার করে উঠলো,
—শালা বাস্টার্ড, একটা কাজও তোরা ঠিকঠাক করতে পারিস না। তোদের কী বা*ল করতে আমি পুষি?”
ঠিক তখনই এরিকের ফোনে একটা নোটিফিকেশনের শব্দ বেজে ওঠে। বিরক্ত মুখে সে পকেট থেকে ফোন বের করে, স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে,জ্যাক কিছু ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়েছে।
নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে একটানা চোখ রেখেই ভিডিওগুলো চালাতে থাকে। প্রথম দু-একটা ভিডিও দ্রুত স্কিপ করে, মনোযোগ দেয় না তেমন। কিন্তু হঠাৎ এক জায়গায় এসে তার আঙুল থেমে যায়। চোখ স্থির হয়ে আসে স্ক্রিনে।
একটি নির্দিষ্ট ফুটেজে কিছু দেখে তার ভ্রু সামান্য কুঁচকে ওঠে, তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক রহস্যময় বাঁকা হাসি।ফিসফিস করে সে বলে ওঠে,

—”শালা,মাদার ফা*কার, আমার জানের দিকে হাত বাড়িয়ে তুই ভালো কাজ করিসনি!তোকে আমি মাটিতে পুতে ফেলবো, আই সোয়ার কিন্তু তার আগে এর পিছনের আসল মাথাটাকে খুঁজে বের করা জুরুরি !”
বলেই এরিক ঠোঁটের কোণে সেই রহস্যময় হাসিটা ধরে রেখে শিষ দিতে দিতে পিছন ফিরে হাঁটতে শুরু করে। আঙুলে চাবিটা ঘুরতে থাকে তাল মিলিয়ে, ধাতব আওয়াজে এক অদ্ভুত ছন্দ বাজে চারপাশে। গার্ডদের দিকে আর একবারও ফিরে তাকায় না।
সে নিজের শ্যাডো রাইডারের কাছে গিয়ে থামে—কালো বাইকটা দাঁড়িয়ে আছে তার মতোই নীরব, অথচ বিপজ্জনক ভঙ্গিতে । চাবি ঘোরাতেই ইঞ্জিন গর্জে ওঠে, গম্ভীর শব্দে কেঁপে ওঠে ক্যাম্পাসের বাতাস।
এরিক হেলমেট না পরেই বাইকে চড়ে বসে, গতি তোলে নিঃশব্দে।
এরিক বাইকে চড়ে চলে যাওয়া মাত্র গার্ডদের চোখেমুখে একটা স্বস্তির ছাপ পড়ে—যেন দমবন্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সবাই।

সানরাইজ প্যালেসে তুফান বয়ে চলেছে। এরিক প্রচন্ড রাগে হলরুমে দাঁড়িয়ে মিস্টার রিচার্ডের নাম ধরে চিৎকার, চেঁচামেচি করছে।
—মিস্টার রিচার্ড ! Enough hiding! Come out right now!
We need to talk, now!
(মিস্টার রিচার্ড, অনেক লুকোচুরি হয়েছে, এইবার বেরিয়ে আসুন, আমাদের কথা বলতে হবে।)
“মিস্টার রিচার্ড এরিকের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনে তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না; একপ্রকার বাধ্য হয়েই নিচে নামতে নামতে বললেন,
—”don’t Shout eric!এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। তোমার মাস্তানি করার জায়গা না। ”
মিস্টার রিচার্ডকে দেখামাত্র এরিক হুংকার দিয়ে বলে উঠে,
“Where is she, Dad?”
এরিকের মুখভঙ্গি আর চোখের ভাষা দেখে মিস্টার রিচার্ড যা বোঝার, তা বুঝে নিলেন, ছেলেটা ঠিক কী জানতে চাইছে। তাই তো তিনি তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

— “Such aggression… for what? A girl? A Muslim girl?”
( এতটা উন্মদনা এরিক,কার জন্য, ওই মুসলিম মেয়েটার জন্য)
মিস্টার রিচার্ডের বারংবার ইনায়াকে নিয়ে এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা এরিকের মোটেও ভালো লাগে না। এতে মিস্টার রিচার্ডের সামনে এরিকের হিংস্রতা বারংবার প্রকাশিত হয়। স্পাতের মতো শক্ত পুরুষালি দেহটা ক্ষিপ্ততাই কেঁপে উঠে। সে রেগে গিয়ে মিস্টার রিচার্ডের উদ্দেশ্য বলে উঠে,
“Don’t you dare reduce her to her religion, Dad! She’s not just a Muslim girl. She’s a — someone I love.

(তার ধর্ম নিয়ে তাকে ছোট করা, আমি বরদাস্ত করবো না, ড্যাড!সে শুধু একটা মুসলিম মেয়েই নয়, সে হলো আমার এক অন্তহীন আশক্তি, যার প্রতি আমি আশক্ত)
তাই শান্তভাবেই জিজ্ঞেস করছি,”ইনায়া কোথায়?” বলে দাও! আমি একদম নিশ্চিত, এ সব কিছুর পেছনে তুমিই আছো!এরিককের কথা শুনে মিস্টার রিচার্ড দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠে,
—”বাজে কথা বলো না, এরিক! তুমি কি সত্যিই আমাকে সন্দেহ করছো?”
মিস্টার রিচার্ডের কথা শুনে এরিক তলাচ্ছিলের হাসি দিয়ে বলে উঠে,
—”সন্দেহ নয়, ড্যাড। আই’এম ড্যামন সিউর, এই কাজটা তুমিই করেছো?
“তাই, আবারও বলছি,সত্যিটা বলে দাও,” এরিকের কণ্ঠে ছিল অদম্য দৃঢ়তা।
তার কথা শুনে মিস্টার রিচার্ড ধীর দৃষ্টিতে এরিকের দিকে তাকিয়ে বললেন,তুমি এতটাই উগ্র হয়ে উঠেছো যে, নিজের বাবাকেও অবিশ্বাস করছো।

—আমি জানি না, তোমার সো কল্ড মুসলিম লাভার কোথায়?
মিস্টার রিচার্ডের এইরকম খামখেয়ালি জবাব এরিকের রাগকে আরও উসকে দেয়। তার চোখেমুখে প্রতিটি রক্তকণা জ্বলতে থাকে ক্রোধে।
এক মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে পাশে থাকা টেবিলটায় প্রচণ্ড জোরে পা চালিয়ে ফেলে দেয় সেটিকে। টেবিলটা বিকট শব্দে উল্টে পড়ে যায়।
সে চিৎকার করে বলতে থাকে,
— “এইভাবে কথা বলবে না তুমি!তার কন্ঠে রাগ, মিস্টার রিচার্ডের প্রতি বিদ্বেষ স্পষ্ট ফুটে উঠে।
এরিক এরপর আর কিছু বলে না।
নীরব, নিশ্চুপ হয়ে, ধীরে ধীরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে এক ঝটকায় বন্দুকটা বের করে আনে,আর নিঃশব্দে সেটি ঠেকিয়ে দেয় নিজের কপালে।

— “তোমাকে কিছু করতে পারবো না… কারণ তুমি আমার বাবা…”
“কিন্তু নিজেকে শেষ করে দিতে আমার এক সেকেন্ডও লাগবে না।”
— “তোমার ইম্পায়ার, তোমার সম্মান, তোমার অহংকার — সব কবরের নিচে যাবে আমার সাথে।”
মিস্টার রিচার্ড জানে, তার ছেলে এক বদ্ধ, উন্মাদ। সে যা বলে তাই করে। তার উপর ওই মেয়েটার প্রতি তার পাগলামি আকাশছোঁয়া। সে একটা সামান্য মেয়ের জন্য নিজের একমাএ ছেলেকে হারাতে চাই না,সে এরিকের পাগলামি দেখে ভয় পেয়ে বলে উঠে,

— “Eric… stop this madness.”
কিন্তু হায়, মিস্টার রিচার্ড কিছুতেই এরিককে থামাতে পারছে না।তার ভিতরের উন্মদনা তাকে হিংস্র করে তুলেছে ক্রোমশে। শেষে, তিনি আর কোন উপায় না পেয়ে এক প্রকার বাধ্য হয়ে বলে উঠে,
“…She’s in the Warehouse 47…”
মিস্টার রিচার্ডের জবাবে এরিকের হিংস্র মস্তিষ্কটা জ্বলে উঠলো আগুনের মতো, সে আর কোনো রকম সময় অপব্যয় না করে ছুটে চলল দরজার কাছে,পিছন ফিরে মিস্টার রিচার্ডকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“If anything happens to her, I swear to God, I won’t care if you’re my father or the King of the goddamn world — I’ll burn this house of lies down myself!
(“ও আমার সবকিছু। ওর যদি বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয়, আই সোয়ার টু গড,আপনার গড়া পুরো সাম্রাজ্য আমি আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবো।আমি রিপিট —একেবারে ধ্বংস করে দেবো!”)

অন্ধকার গুদাম ঘর,
ইনায়ার জ্ঞান ফিরতেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল একটি স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার গুদামঘরের ভেতর, শক্ত করে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায়। ধীরে ধীরে চোখের পাতা খুলতেই চোখের সামনে ধরা দিল এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
তার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল অলিভিয়া যার চোখে ছিল রহস্যময় ঠান্ডা দৃষ্টি। তার পাশে ছিল আরও দুইজন পুরুষ,একজনকে ইনায়া আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছে, আর অন্যজন ছিল স্পষ্টতই একজন গ্যাংস্টার টাইপের লোক, কোমরে গোঁজা আগ্নেয়াস্ত্র, মুখভর্তি কঠোরতা। এদের পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিল মুখোশ পরা, কালো পোশাকের বেশ কয়েকজন গার্ড।পরিস্থিতি বুঝে উঠতেই ইনায়ার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। ভয়, বিভ্রান্তি আর আশঙ্কার মাঝেও সে চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে স্মরণ করে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে:
“হে আল্লাহ, তুমি সহায় হও,
রক্ষা কর আমায়,এইসব হিংস্র মানুষদের হাত থেকে। ”
অলিভিয়া ধীরে ধীরে এক পা, দুই পা করে ইনায়ার দিকে এগিয়ে এল।তার চোখে স্পষ্ট ইনায়ার প্রতি বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। সে কোন কথা না বলেই হঠাৎ করেই ইনায়ার গালে এক শক্ত থাপ্পড় বসিয়ে বলল,
—”এই থাপ্পড়টা কেন দিলাম জানিস?আমার থেকে আমার এরিককে কেড়ে নেওয়ার জন্য।”
ইনায়ার নরম গালে অলিভিয়ার পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ব্যথায় দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ইনায়া চেপে ধরল নিজের অনুভূতিগুলো। অলিভিয়ার এই সব পাগলামিতে তার ধৈর্যের বাঁধ ছিঁড়ে যেতে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকে অলিভিয়া তার ওপর নিজের আক্রোশ ঝরিয়ে আসছে,ইনায়া আর সহ্য করতে পারল না। আক্ষেপ ভরা কন্ঠে সে বলে উঠে,

—”অলিভিয়া, তুমি যা করছো তা ভুল। ভালোবাসা কখনো জোর করে বা জবরদস্তি করে পাওয়া যায় না। আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত দিক। ”
ইনায়ার নীতি কথা শুনে অলিভিয়া তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে, সে ইনায়াকে আরেকটা থাপ্পড় মেরে বলে উঠে,
—”আমার এরিককে কেড়ে নিয়ে তুই এখানে আমাকে নীতি কথা শুনাচ্ছিস!”
“আজ আমি চিরকালের জন্য তোকে এরিকের জীবনের থেকে দূর করে দেব। তোর অস্তিত্বের কোনো জায়গা আমি এরিকের জীবনে বরদাশত করব না। এরিক শুধুমাত্র আমার হবে।”
এই কথা বলেই অলিভিয়া তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যাংস্টারের রাইট হ্যান্ডকে জোরালো কণ্ঠে বলে উঠল,
—”শুট হার!”
অলিভিয়ার অর্ডার পেতেই, লোকটা ব*ন্দু*ক টেনে ইনায়ার কপালের ঠিক মাঝখানে ঠেকিয়ে দেয়।বাঁকা হেসে, তার বস কে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,

— “বস… শুট করে দিই? শেষ করে দিই মেয়েটাকে?”
এই বলে লোকটি হিংস্রভাবে হেসে টিগার টেনে ধরলো,ঠিক সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে গ্যাংস্টার লোকটি বলে উঠলো,
“ এই থাম।”
লোকটি সঙ্গে সঙ্গে ব*ন্দু*কটা সরিয়ে বলে উঠলো,
—”কী হলো বস্ থামতে বললেন কেন?”
গ্যাংস্টারটি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বিশ্রিভাবে হেসে বলে উঠে,
—”এত তাড়াতাড়ি এত সুন্দর পাখিটাকে মেরে ফেলবো?আগে একটু টেস্ট করে দেখি না — মুসলিম গার্ল, পিওর ভার্জিন… এই মাংসের স্বাদ নিশ্চিয়ই ভিন্ন হবে…”

নিজের সম্পর্কে লোকটির মুখে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনে ইনায়ার পুরো শরীরটা কেমন ঘিনঘিনিয়ে উঠলো।সে এমন হিংস্র মানবের খারাপ স্পর্শ থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে পানাহ্ চাইলো।
—”হে আল্লাহ, তুমি আমার পবিএতার রক্ষা কর!আমি তোমার কাছে পানাহ্ চাচ্ছি এই ঘৃণিত স্পর্শ থেকে!”
ইনায়ার ভয়ার্ত মুখ দেখে লোকটি যেন খুশি হলো, সে ধীর ধীরে যেই ইনায়ার দিকে হাত বাড়াতে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তেই তীব্র আওয়াজের সাথে সাথেই গুদম ঘরের দরজাটা ছিটকে পড়ে যায়। ধোঁয়ার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে এক ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হতে থাকে…

“এরিক।”
” যার চোখ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলে উঠেছে, মুখে তীব্র রাগের ছাপ, হাতে শক্তভাবে ধরে রেখেছে লোহার রড। পুরো শরীর উত্তেজনায় কাঁপছে,প্রচণ্ড ক্রোধ যেন তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বলে উঠেছে।”
গ্যাংস্টার লোকটি ও তার গার্ডরা মুহূর্তেই সতর্ক হয়ে পড়ে।
এরিক গর্জে উঠে,
— “আমার বউয়ের গায়ে একটা আঙুলও দিলে… এই গুদামের মাটিতে তোদের পুঁতে ফেলবো, শুয়ারের বাচ্চা!”
গার্ডরা একে একে ঝাপিয়ে পড়ে এরিকের উপর, এরিক চরম দক্ষতায় একজনের বুকে লোহার রডের আঘাত করে তাকে নিচে ফেলে দেয়।
আরেকজন এগিয়ে এলে এরিক তাকে ঘুরিয়ে পেছনে ফেলে দেয়, আর সাথে সাথে তার মুখে ঘুষি মেরে অজ্ঞান করে দেয়।

এতে গ্যাংস্টার লোকটি রেগে এরিককের দিকে গুলি ছোড়ার চেষ্টা করে, এরিক কাভার নিয়ে গুলি এড়িয়ে তার দিকে তেড়ে আসে।পিছন থেকে এক লাফে গিয়ে গ্যাংস্টারের হাত থেকে ব*ন্দু*ক ছিটকে ফেলে দেয়।
দুজনের মধ্যে তীব্র মারামারি শুরু হয় — ঘুষি, কিক, চেয়ার ভেঙে পড়ে, চারপাশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
এরিক রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,

— “আই উইল কিল ইউ বাস্টার্ড, আমার বউয়ের দিকে কুনজর দিয়েছিস তুই,তোর চোখ আমি উপরে ফেলবো।
এরিক গ্যাংস্টার লোকটিকে মাটিতে ফেলে দেয়। রাগে তার চোখ লাল হয়ে আছে, নিঃশ্বাস গাঢ় ও ভারী হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে ছিটকে পড়া রডটি তুলে নেয়। তার কণ্ঠ গর্জে উঠে, গ্যাংস্টার লোকটি ছটফট করতে করতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু এরিক হঠাৎ এক ঝাঁপ দিয়ে তার উপর উঠে পড়ে। হাত দিয়ে গ্যাংস্টার লোকটির মুখ চেপে ধরে — চাপটা এত প্রবল যে মনে হয় যেন সে প্রতিটি আঘাতে তার সমস্ত যন্ত্রণা উগড়ে দিচ্ছে।গ্যাংস্টার লোকটি সেইখানেই নেতিয়ে পড়ে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৫

অলিভিয়া এরিকের এই রকম ভয়ংকর রূপ দেখে ভয়ে ঢক গিলতে থাকে। এরিক অলিভিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে, তা দেখে অলিভিয়া একটা বন্দুক তুলে নিয়ে ইনায়ার দিকে পয়েন্ট করে।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭