বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৫
রানী আমিনা
জেসারের কথা শুনে আঁতকে উঠলো ফ্যালকন। ছুটে কোকোর কাছে গিয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে উঠাতে উঠাতে বলল,
“এ ভাই এ, হিজ ম্যাজেস্টি এসেছেন রে, উঠ!
তুই না আর্মি চিফ? শালা তোর সকালেই রামাদি সামা চলে যাওয়ার কথা! তোকে শেহজাদীর কামরায় চ্যাগাইয়া ঘুমাইতে দেখলে হিজ ম্যাজেস্টি শেহজাদার আগে তোর মুণ্ডুটা কাটবে!”
কোকোকে উঠানো গেলোনা সে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে ফ্যালকনের হাত সরিয়ে দিয়ে লুসিকে নিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লো আবার।
ফ্যালকন মনে মনে কপাল চাপড়ালো, আজ এরা তো মরবেই সাথে ওকেও মারবে৷ ফ্যালকন গিয়ে এবার ইলহানকে ডাকাডাকি শুরু করলো,
“শেহজাদা, শেহজাদা!”
চাপা স্বরে ডাকলো যেন আনাবিয়ার আবার ঘুম না ভেঙে যায়! ইলহানের পাতলা ঘুম কয়েকটা ডাকেই ভেঙে গেলো। উঠে বসে সে ফ্যালকনের আতঙ্কিত চেহারা দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে?”
“ম্যানসনে হিজ ম্যাজেস্টি এসেছেন, শেহজাদা! আপনাকে এখুনি এখান থেকে বের হতে হবে!”
ফ্যাকাসে মুখে তড়িঘড়ি উত্তর দিলো ফ্যালকন। ইলহান কোনো প্রতিক্রিয়া জানানোর আগেই শব্দ করে খুলে গেলো দরজা, পরক্ষণেই ভেতরে ভেতরে প্রবেশ করলো মীর৷
ফ্যালকন আনুগত্য জানাতে এক কোণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তৎক্ষনাৎ। মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে শুরু করলো সে৷
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কামরায় ঢুকে ইলহানকে দেখা মাত্রই কিছুক্ষণের জন্য বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইলো মীর। ইলহান নিজেও অপ্রস্তুত হলো, আতঙ্ক ভর করলো ওর চেহারায়। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে মীরের দিকে দৃষ্টি রেখে ধীর গতিতে উঠে দাঁড়ালো মেঝেতে৷
মীরের চেহারার বিস্ময় কেটে গেলো পরক্ষণেই, সেখানে ক্রমশ এসে ভর করলো ক্রোধ! চোয়াল শক্ত করে ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টিতে, ভারী পা ফেলে সে এগিয়ে গেলো ইলহানের দিকে৷ ইলহান ভয় পেলেও নড়লো না, স্থীর হয়ে রইলো নিজের স্থানে৷
সেই মুহুর্তেই হন্তদন্ত হয়ে কামরায় প্রবেশ করলো জায়ান সাদী। দুই ভাইকে মুখোমুখি দেখে রক্ত হীম হলো তার। আজও বুঝি আরেকবার রক্তের বন্যা বয়ে যাবে তার বাড়িতে!
জায়ানের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো মীর। দাঁতে দাঁত চেপে উগ্র স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“নিজের বাড়িতে বিশ্বাসঘাতকের চাষাবাদ শুরু করেছো, জায়ান সাদী? আর কাকে আড়াল করেছো? কতজনকে আশ্রয় দিয়েছো, কতজনকে লুকিয়েছো আমার থেকে?”
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি, আ-আই ক্যান এক্সপ্লেইন! আমাকে একটা সুযোগ দিন, আমি আপনাকে…..”
“থামো! তোমার নিরর্থক কৈফিয়ত শুনতে আমি বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নই। সবগুলো বেঈমানকে আশ্রয় দিয়ে এখন কিসের এক্সপ্লানেশন দিতে চাইছো তুমি? তোমার এই ধৃষ্টতার কোনো ক্ষমা নেই, জায়ান সাদী!”
গর্জে উঠে বলল মীর। ইলহান গলা খাকারি দিয়ে শান্ত সুরে বলে উঠলো,
“জায়ান সাদীর কোনো দোষ নেই এখানে, আনাবিয়া বলেছিলো বলেই সে আমাকে আশ্রয় দিয়েছে।”
মীর বিধ্বংসী চোখে ফিরলো ইলহানের দিকে। ক্ষিপ্র বেগে এসে ইলহানের গলা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
“তোকে কথা বলার অনুমতি কে দিয়েছে?
আর একটা শব্দ করবি তো তোর জিভ গোড়া থেকে টেনে উপড়ে ফেলবো!”
ইলহান দ্বিতীয় শব্দ করলো না, মীরের হাতের মুঠির ভেতর থেকে তাকে চেতিয়ে দিলে অবস্থা খারাপ বৈ ভালো হবে না।
মীর জায়ানের দিকে ফিরলো আবার, গর্জে উঠে জিজ্ঞেস করলো,
“আর কাকে কাকে আশ্রয় দিয়েছো? আর কোন কোন বিশ্বাসঘাতকের চিহ্ন পড়েছে এই বাড়িতে? তুমি না আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ছিলে জায়ান সাদী, কবে থেকে তুমি নিজেই বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠলে?”
কোকোর কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙলো মীরের এবারের গর্জনে৷ উঠেই সামনে মীর ইলহানকে আক্রমণাত্মক অবস্থায় মুখোমুখি দেখে পিলে চমকে গেলো তার। লুসিকে বুক থেকে নামিয়ে তড়িঘড়ি উঠে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে গেলো সে৷
ওর উঠে দাঁড়ানোর শব্দে ফিরে তাকালো মীর। এতক্ষন সে খেয়ালই করেনি তাকে। এই অসময়ে আনাবিয়ার কামরায় কোকোকে দেখে সে যারপরনাই অবাক হলো, পরক্ষণেই তার চোখ পড়লো ফ্যালকনের দিকে। ফ্যালকন তাকিয়ে ছিলো তারই দিকে, দৃষ্টি মিলতেই ঝটপট চোখ নামালো সে।
মীর জায়ানের দিকে ফিরে কঠোর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“ওরা এই কামরায় কি করছে?
আমি বলেছিলাম কোনো পুরুষ যেন এই কামরায় প্রবেশ না করে, নট ইভেন ইয়োর সানস্! সেখানে শেহজাদীর কামরায় তুমি দুজন বাহিরের পুরুষকে কোন সাহসে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছো? শুধু অনুমতি দিয়েই ক্ষান্ত হওনি, ওরা এখানে এসে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে! এই টেক কেয়ার করছো তুমি শেহজাদীর?”
শেষোক্ত প্রশ্ন গুলো হুঙ্কার দিয়ে করলো মীর৷ জায়ানের থুতনি যেন বুকে এসে ঠেকলো! ইলহান দুকদম এগিয়ে এসে নরম সুরে বলল,
“হাইপার হস না, তুই যেমন ভাবছিস তেমন কিছুই না। ওরা আনাবিয়ার জন্য ক্ষতিকর নয়, তাছাড়া এখানে আমি উপস্থিত আছি। আমি থাকতে আনাবিয়ার গায়ে একটা টোকাও পড়তে দিবো না নিশ্চয়!”
মীর দাঁতে দাঁত চাপলো, ক্রোধে উন্মাদ হয়ে ক্ষিপ্র বেগে নিজের বজ্রমুষ্ঠির এক শক্তপোক্ত আঘাত হানলো ইলহানের মুখের ওপর। মুহুর্তেই ইলহান গিয়ে ধাক্কা খেলো পেছনের দেয়ালে। ঠোঁটের কোণা কেঁটে রক্ত বেরিয়ে এলো তার! মীর ক্ষ্যাপাটে গলায় বলল,
“একটাও শব্দ করবিনা! নট ইভেন অ্যা সিংগেল ওয়ান! আমার হাত থেকে একটা হাটুর বয়সী মেয়ের অনুগ্রহে বেঁচে ফিরেছিস! কাওয়ার্ডের মতো মেয়েদের আচলের তলে লুকিয়ে বেঁচে আবার আমার মুখে মুখে কথা বলার স্পর্ধা দেখাস!”
রাগে ফুসতে রইলো মীর। তার মন চাইলো ইলহানকে এখানেই কুপিয়ে দিতে! কিন্তু প্রচন্ড কষ্টে নিজেকে কোনো রকমে সামলালো সে।
ইলহান নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ালো আবার। হাত দিয়ে মুছে নিলো ঠোঁটের রক্তাক্ত কোণা। কিন্তু বিপরীতে প্রতিক্রিয়া দেখালো না কোনো।
জায়ান ছুটে এলো দুজনের মাঝে। মীরের সামনে দাঁড়িয়ে আনুগত্যের সুরে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, দয়া করে নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করুন! অন্তত কিছু দিনের জন্য। আপনারা শেহজাদীর এই অবস্থায় এখানে এভাবে ঝামেলা শুরু করলে শেহজাদীর ওপর এর বাজে প্রভাব পড়তে পারে। ডাক্তার বলে গেছিলেন শেহজাদীর ওপর যেন কোনো ভাবেই কোনো প্রেশার না পড়ে! আপনি দয়া করে শান্ত হোন ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মীর তার চক্ষু যুগল সরিয়ে নিলো। চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে তার, হাত জোড়া মুষ্টিবদ্ধ। তার অভ্যন্তরীণ ক্রোধের লেলিহান শিখা তাকে প্ররোচিত করছে সামনে যাকে পাবে তাকেই খণ্ড খণ্ড করে দিতে! তার চতুর্দিকের কেউই আর তার স্বজন নয়, সকলেই বিশ্বাসঘাতক! এই অপমানের শোধ সে নিবে, অবশ্যই নিবে! শুধু কিছু দিনের জন্য নিয়ন্ত্রণ করবে নিজের হিংস্রতাকে। এই সাময়িক নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র সালিমের মেয়েটার জন্য!
জায়ান মীরকে কিঞ্চিৎ শান্ত হতে দেখে ইতস্তত স্বরে বলল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, সকালে হেকিম এসে শেহজাদীকে হাই পাওয়ায়ের স্লিপিং পিল দিয়ে গেছেন। আগামী ষোল থেকে আঠারো ঘন্টা তিনি ডীপ স্লিপে থাকবেন। এই সময়ে কোনো ভাবে ওনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটলে, বা জেগে গেলে সেটা তার শরীরের জন্য ভালো হবে না৷ হেকিম বলেছেন পর্যাপ্ত ঘুম হলে তার মস্তিষ্ক ট্রমা কাটিয়ে উঠে আবার পূর্বের ন্যায় কর্মক্ষম হয়ে উঠবে৷ এতে ব্যাঘাত ঘটালে শেহজাদীর জন্য তা একদমই ভালো হবে না। এই মুহুর্তে আপনারা দুজন শুধুমাত্র শেহজাদীর কথা ভেবে নিজেদের শত্রুতা পার্শ্বে রেখে তাকে সুস্থ করতে তৎপর হোন, দয়া করে৷”
মীর ফোস করে শ্বাস ছাড়লো একটা। নিজেকে শান্ত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। ঘুমন্ত আনাবিয়ার দিকে চেয়ে মনে মনে বলল,
“কেবল তুমি পিচ্চির জন্য আমাকে এই অসহনীয় সংযম! সুস্থ হয়ে উঠো একবার, তারপর তোমার ব্যাবস্থা আমি করবো!”
জায়ান চোরা চোখে নজর রাখছিলো মীরের মুখভঙ্গির প্রতি। মীরকে ক্রমশ শান্ত হয়ে যেতে দেখে সে কোকো আর ফ্যালকনকে ইশারায় বেরিয়ে যেতে বলল কামরা থেকে। কোকো লুসিকে কোলে নিয়ে ফ্যালকনকে সহ চুপিচুপি বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। ওদের পিছু পিছু বেরিয়ে গেলো জায়ানও৷
ইলহান চুপচাপ বসে রইলো আনাবিয়ার পাশে। মীর ধীর, ভারী পায়ে পায়চারী শুরু করলো ঘরময়। রাগটা ভিসুভিয়াসের আগ্নেয়গিরির মতো উথলে উঠতে চাইছে বারংবার, কিন্তু অতি কষ্টে তা গলাধঃকরণ করে নিচ্ছে সে।
কিছু মুহুর্ত পর আচমকা ঘুমের ভেতরেই ছটফট শুরু করলো আনাবিয়া। ইলহান চমকে উঠে এগিয়ে গেলো ওর কাছে, মীর নিজেও এসে দাঁড়ালো শিয়রে, মনোযোগী চোখে পর্যবেক্ষণ করলো আনাবিয়ার আতঙ্কিত চেহারাখানা।
মুহুর্ত পরেই শান্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলো আনাবিয়া। মীর এবার একটু নরম হলো যেন। জিজ্ঞেস করলো,
“জেগেছিলো কখন?”
“ভোর বেলা উঠে বসে ছিলো, কাউকে কাছে ঘেঁষতে দিচ্ছিলোনা, চিৎকার চেচামেচি করছিলো। কোকো আমাকে জানালে আমি ভোরেই চলে এসেছি।”
শান্ত স্বরে উত্তর দিলো ইলহান। মীর গম্ভীর হয়ে এলো আবারও। গমগমে স্বরে বলল,
“তবে তোর অবস্থানের কথা এখানের সকলেই জানতো এতদিন?”
ইলহান এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলোনা। আনত চোখে বসে রইলো চুপচাপ। মীর তাচ্ছিল্য হাসলো তাতে, এই মেয়েটা সুস্থ হলে সে কি করবে সে নিজেও জানেনা! হয়তো সবাইকে মুছে ফেলবে ওর জীবন থেকে, এই পৃথিবী থেকে। বিশ্বাসঘাতকের কোনো চিহ্ন রাখবেনা সে নিজের জীবনে।
ওর চোয়াল শক্ত হতে দেখে ইলহান বলল,
“তুই যদি ভেবে থাকিস সকলে আমার কারণে আমাকে বাঁচিয়েছে বা তোর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে তবে তুই ভুল করছিস। আমার জন্য এখানে কোনো আয়োজন নেই আসওয়াদ। এখানের যত আয়োজন, যত আনন্দ, যত খুশি সব এই মেয়েটার জন্য। ওর খুশির জন্য এখানের প্রত্যেকটা লোক জান কুরবান করতে পারে, এমনকি আমি বা তুইও।”
মীর চুপ রইলো, ওর দৃষ্টি তখনো আনাবিয়ার ফ্যাকাসে মুখশ্রীর দিকে। ওই মুখে তাকালে আশ্চর্যজনক ভাবে হৃদয় নরম হয়ে আসে তার, উবে যায় ক্রোধ, এক শীতল শান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে যায় বুক। মীর এর কারণ জানেনা, কিন্তু এখন আর ওর রাগ হচ্ছে না। চাইলেও রেগে থাকতে পারছেনা। মনে শুধুই বলছে গতকাল ফারিশ নামক জানোয়ার টাকে ওর তুলার বালিশের মতন ছিড়ে ফেলা উচিত ছিলো,
কিন্তু আফসোস…!
ইলহান আনাবিয়ার পায়ের দিকে সরে গিয়ে মীরকে জায়গা করে দিলো, বলল,
“বস, দাঁড়িয়ে থাকবি কতক্ষন।”
মীর বসতে ইতস্তত করছে দেখে ইলহান আবারও বলল,
“আমি চলে যাবো কিছুক্ষণ পর, ওর কাছে তোকেই থাকতে হবে। অন্য কাউকে ও সহ্য করবে না কোনো ভাবেই।”
মীর বসলো আনাবিয়ার শিয়রে।
আনাবিয়া গভীর ঘুমে, ঠোঁট জোড়া ভাজ হয়ে আছে মাঝ হতে। ছোট্ট বাচ্চার মতোন দেখাচ্ছে তাকে। মীরের মন যেন গলে গেলো তাতে। ঠোঁটের কোণে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা দেখা দিলো। পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে উঠলো সে আবারও, আনাবিয়ার ভাজ পড়া ঠোঁটে তাকিয়েই সে ইলহানের উদ্দ্যেশ্যে বলে উঠলো,
“আমার নিরবতাকে দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবি। বাহিরে মোলায়েম বলে এই নয়, যে আমি ভালো হয়ে গেছি। ভুলেও আমার সাথে ইনফর্মাল হওয়ার চেষ্টা করবিনা। তোর প্রাপ্য সময় মতো পরিশোধ করে দিবো, প্রস্তুত থাকিস। আর আজকের পর থেকে এই পিচ্চির ত্রিসীমানাতেও ঘেঁষবিনা তুই।”
ইলহান বললোনা কিছুই। কিন্তু তার চেহারায় দেখা দিলো না কোনো ক্রোধ, অসন্তোষের চিহ্ন। বরং বেশ ফুরফুরে মেজাজেই রইলো সে। নিজের এমন পরিবর্তন দেখে সে নিজেই যেন অবাক হয়ে গেলো। বিছানা থেকে নেমে যেতে যেতে বলল,
“মেয়ে হয় ও আমার। ওর কাছে আমি যখন খুশি আসবো, সে অধিকার আছে আমার৷ তোর পিচ্চি নিজেই দিয়েছে। ওর ওপর যদিও আমার তোর মতো বিস্তৃত অধিকার নেই, কিন্তু একটু তো আছেই! আমি যে ওর বাবার স্থান নিতে পেরেছি এতেই আমি সন্তুষ্ট, ওর খেয়াল রাখার দায়িত্ব তাই আমার ওপরও বর্তায়। আমি কখনো এর বেশি কিছু আশা করবোনা, নিশ্চিন্তে থাকতে পারিস৷”
আনাবিয়াকে আর এক পলক দেখে নিয়ে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলো ইলহান। মীর ওর যাওয়ার পানে চেয়ে ভ্রু কুচকে ভাবতে রইলো মাত্র শোনা কথা গুলো।
তার কেন আনাবিয়ার ওপর বিস্তৃত অধিকার থাকবে সেটা ভেবে পেলোনা, ইলহানও যেখানে সেও সেখানে৷ আনাবিয়া তো তার নিকট বিশেষ কিছু নয়! বা সেও আনাবিয়ার নিকট বিশেষ কিছু নয়।
পূর্বে তাদের দুজনের ভেতর কেমন সম্পর্ক ছিলো জানেনা মীর। হয়তো বেশ ভালো সম্পর্কই ছিলো, ফটোগ্রাফ টা থেকে সেটাই প্রতীয়মান হয় মীরের নিকট। কিন্তু তাতে তো তার অধিকার ইলহানের থেকে বেশি বেড়ে যাবে না কোনো ভাবেই! আনাবিয়ার নিকট তাদের দুজনের অবস্থানই সমান।
ওর ভাবনার মাঝেই আবারও ছটফটিয়ে উঠলো আনাবিয়া, মুখ থেকে অদ্ভুত শব্দ বের করতে রইলো, যেন ঘুমের ভেতর স্বপ্নের দেশে কোনো আতঙ্ক থেকে প্রাণপণে বাঁচতে চাইছে সে, ছাড়া পেতে চাইছে কোনো দানবের বজ্রমুষ্ঠি থেকে।
মীর প্রথমটায় ঝুঁকলো ওর দিকে, ভাবলো পূর্বের মতোন এবারও থেমে যাবে। কিন্তু থামলোনা, উত্তরোত্তর বেড়েই চলল।
আতঙ্কিত হলো মীর! দ্রুত হাতে আনাবিয়াকে আগলে নিয়ে ওর চুলের ভাজে আঙুল চালনা করতে করতে মোলায়েম স্বরে বলে উঠলো,
“শ্শ্শ্, ভয় পেয়োনা। আমি এখানেই আছি, কোনো ভয় নেই।”
আনাবিয়া শান্ত হয়ে এলো তৎক্ষনাৎ, মুখের ওপর ছেপে থাকা আতঙ্ক উধাও হয়ে এলো ক্রমশ। স্বাভাবিক হতে হতে ক্রমে মুখখানা ভরে উঠল নির্মল তৃপ্তিতে। ঘুমের ঘোরেই একবার অস্ফুটে আওড়ালো,
“মীরি….!”
আচমকা দুহাতে মীরকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলো সে, মাথাখানা একিয়ে বেকিয়ে উঠিয়ে দিলো মীরের বুকের ওপর। বা’পা খানা সহ নিজের অর্ধেক শরীর উঠিয়ে দিলো মীরের পেটের ওপর। তারপর পরম নিশ্চিন্তে তৃপ্তি মাখা মুখে ঘুমিয়ে পড়লো সেখানেই।
আনাবিয়ার এহেন কান্ডে মীর হতচকিত হয়ে কিছুক্ষণ স্ট্যাচুর মতোন নিঃসাড় পড়ে রইলো। পরক্ষণেই আলতো হাতে, সন্তর্পণে নিজের ওপর থেকে একটু একটু করে নামিয়ে দিতে রইলো আনাবিয়াকে। পেটের থেকে আনাবিয়াকে সরিয়ে দেওয়া মাত্রই ঝট করে জেগে উঠলো আনাবিয়া, ঘুম ঘুম লালচে চোখ নিয়ে মীরের দিকে ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টি দিয়ে সে নিজের ঠোঁটের ওপর তর্জনী ছুইয়ে ঘুম জড়ানো গলায় হুমকি দিয়ে বলল,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৪
“শ্শ্শ্শ্……. ঘুমোচ্ছি চোখে দেখছো না? এবার নামিয়ে দিলে তোমার কিং কোবরাকে খামচি দিবো!”
আনাবিয়ার এমন চাহনিতে থমকালো মীর। নিজেও আনাবিয়ার মতোন ঠোঁটে আঙুল ছুইয়ে বুঝিয়ে দিলো সে আর একটা শব্দও করবে না। আনাবিয়া পরক্ষণেই আবার আছড়ে পড়লো মীরের বুকের ওপর। এবার জুৎ করে ঘুমোতে গিয়ে যেন গুতোগুতি করে ঢুকে যেতে চাইলো মীরের বুকের ভেতর।
আর মীর কপালে ভাজ ফেলে ছাদের দিকে তাকিয়ে স্মরণ করার চেষ্টা করতে রইলো কোনো কালে তার কোনো পোষ্য কিং কোবরা ছিলো কিনা।
