চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৫
আরোবা চৌধুরী আরু
ওরা সবাই নিচে নামতেই, আফিয়া বেগম আর ইমা বেগম এগিয়ে গিয়ে রুহিকে সাইড দিয়ে ধরে আগলে নিয়ে স্টেজের দিকে নিয়ে গেলেন। চারপাশে লোকজনের ফিসফাস, হালকা আলো-আঁধারির পরিবেশ, বাতাসে ফুলের হালকা সুগন্ধ মিশে আছে।
নাফিসাকে দেখেই দৌড়ে এলো মিষ্টি আর রাহিল।
মিষ্টি নিঃশ্বাস ফেলে উচ্ছ্বাসে বলল,
—— খালামণি! তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলা? আমি তো কতক্ষণ ধরে তোমাকে খুঁজছি!
তারপর বড় বড় আঁখিপল্লব মেলে নাফিসার দিকে তাকাল সে। ছয় বছরের শিশুর চোখ যেন হীরের মতো চকচক করে উঠল।
—— ওয়াও খালামণি! তোমাকে তো অনেক সুন্দর লাগছে আজ!
রাহিলও হাসতে হাসতে তাকিয়ে রইল, তারপর এক নিঃশ্বাসে বলে উঠল,
—— ইউ আর সো গর্জিয়াস, কিউটি!
নাফিসা ওদের পাকা পাকা কথাবার্তা শুনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ঝরাল।
—— শুধু পাকা পাকা কথাই জানো তোমরা দু’জন, হুম!
কথাটা শেষ হতেই মিষ্টি হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলল,
—— খালামণি! চলো চলো, আমরা একসাথে ছবি উঠি।
রাহিলও সাথে সায় দিল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
—— ইয়েস, চল কিউটি, ছবি ছবি!
দু’জনেই নাফিসার দুই হাত শক্ত করে ধরে টানতে লাগল। কোনো সুযোগই দিল না কিছু বলার। দৌড়ের ভেতর তাদের ছোট ছোট নিঃশ্বাসের শব্দে চারপাশ গমগম করে উঠল। নাফিসা ওদের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে লাগল। শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে, পায়ের নুপুর টুংটাং শব্দ করছে, সে হাঁপাতে হাঁপাতে বারবার বলছে,
—— আস্তে আস্তে… পড়ে যাবা, আস্তে!
কিন্তু ততক্ষণে দৌড় যেন পাগলাটে ছন্দে রূপ নিয়েছে। হঠাৎই নাফিসার কারো সাথে ধাক্কা লাগল। শরীরটা সামনের দিকে হেলে পড়ে যেতে যেতেও সে দ্রুত আঁচল সামলে নিজেকে সামলে নিল। মিষ্টি আর রাহিল ভয়ে আঁতকে গিয়ে তার হাত ছেড়ে দিল।
ধাক্কাটা কার সাথে লাগল দেখতে নাফিসা ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরল। ঘুরতেই আঁখিপল্লব স্থির হয়ে গেল, নিশ্বাস গলা থেকে আটকে গেল। এক মুহূর্তের জন্যও নাফিসার মাথায় আসলো সায়মান বাড়িতে ফিরেছে। চার বছর পর! হ্যাঁ, ঠিক চার বছর পর তার চোখে ধরা দিল সেই পুরুষটি ——
—— সেই চিরচেনা গম্ভীর চেহারার মানুষটা। অথচ আজ তাকে দেখে নাফিসার মনে হল বয়স যেন উল্টো কমে গেছে। আগের চেয়েও বেশি সুদর্শন, তীক্ষ্ণ চাহনি আর দৃঢ় ব্যক্তিত্বে যেন আরো পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শ্যামলা বর্ণ, দৃঢ় অবয়ব, চোখে অনাবিল দৃঢ়তা চোখের ভেতরে একরাশ ঝড় লুকানো। বাতাসের মতোই অচেনা অথচ ভীষণ পরিচিত সেই উপস্থিতি।
চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু শোনা যাচ্ছিল নাফিসার ভেতর থেকে আসা দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ, আর বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের বেপরোয়া ঢেউ। সময়টা যেন থমকে দাঁড়াল—— একই সাথে অবাক, বিস্মিত, আর অদ্ভুত বেদনার কাঁপুনি তার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।
নাফিসা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, চোখের পল্লব নড়ছে না, ঠোঁট কাঁপছে সামান্য। অবিশ্বাসে, অভিমানে, আর বুক ভরা যন্ত্রণা নিয়ে সে যেন নিঃশব্দে বলতে চাইছে কিছু কথা——
চারিদিকে গমগম করছে অতিথিদের ভিড়, আলো ঝলমল, সাজসজ্জায় ভরা উঠান, কোথাও হালকা বাদ্য বাজছে। অথচ সেই কোলাহলের মাঝেই যেন এক নিস্তব্ধ শূন্যতা ঘিরে ধরল তাদের দুজনকে।
সায়মানও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হঠাৎ চোখে চোখ পড়ল। যেন এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হলো। কোনো শব্দ নেই, তবুও চোখে চোখে কথার ঝড় বইছে। নাফিসার আঁখিপল্লব কেঁপে উঠল, আর হঠাৎই সেখানে জমে থাকা অশ্রু টুপ করে গড়িয়ে পড়ল গালে। এক ফোঁটা অশ্রু—— কিন্তু সেই ফোঁটার ভেতর লুকিয়ে ছিল চার বছরের জমে থাকা অভিমান, যন্ত্রণা আর না বলা হাজারো কথা।
ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে এল এক কণ্ঠস্বর——
—— সায়মান, একটু এদিকে আয় তো… তাহমিদ ইকবাল এসেছে, তোকে খুঁজছে।
মঈন রাশিদের কণ্ঠ। মুহূর্তেই যেন স্বপ্নভঙ্গ হলো। নাফিসা ও সায়মান দুজনই হুঁশে ফিরল। নীরবতা ভাঙল। সায়মান নিজের কণ্ঠ গম্ভীর রেখেই জবাব দিল,
—— আসছি।
এ কথা বলে এক পা এগোতেই সে টান অনুভব করল হাতে। ঘড়ির সাথে কিছু যেন আটকে গেছে। চোখ নামাতেই দেখতে পেল——তার ঘড়ির চেন নাফিসার শাড়ির আঁচলের কোনায় জড়িয়ে আছে।
সায়মান ধীরে ধীরে দৃষ্টি তুলল। আঁখিপল্লব উঠতে লাগল আস্তে আস্তে—— আর সেই দৃষ্টি গিয়ে থামল রমণীর চোখে। নাফিসা তখনও স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নিঃশ্বাস ভারী, ঠোঁট শুকিয়ে আসছে, চোখে তৃষ্ণার্ত আকুলতা। যেন এই একটি মুহূর্তে সে মন ভরে নিতে চাইছে, চার বছরের অদৃশ্য বেদনার পর এতদিনে চোখের সামনে পাওয়া সেই শ্যামবর্ণ পুরুষকে।
এমন সময় মিষ্টি ভীত সুরে বলল,
—— খালামণি, তুমি ঠিক আছো তো?
রাহিলও অনুতপ্ত স্বরে বলল,
—— সরি কিউটি… আমাদের এইভাবে টানাটানি করা ঠিক হয়নি। তুমি পড়ে যেতে… আঘাত পেতে।
কিন্তু তাদের কোনো শব্দই যেন নাফিসার কানে ঢুকলো না। তার দৃষ্টি, তার হৃদস্পন্দন—— সবকিছু এখনো শুধু সায়মানকে ঘিরেই বন্দি হয়ে আছে। শুকনো ঠোঁট নড়ল ধীরে ধীরে, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বেরোল মাত্র এক শব্দ,
—— সরি…
সায়মান এক ধাপ এগিয়ে এল। হাত বাড়িয়ে আস্তে আস্তে নিজের ঘড়ি থেকে শাড়ির আঁচল ছাড়াতে লাগল। তার কণ্ঠ ভারী, গম্ভীর, অথচ ভিতরে অদ্ভুত কম্পন——
—— কেন?
নাফিসা চোখ বন্ধ করে গভীর এক নিঃশ্বাস নিল। গলা শুকিয়ে এলো, ঢোক গিলতে গিলতে বলল,
—— আপনাকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে… ভুল করে লেগে গেছে।
সায়মান হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
—— আমি কি কিছু বলেছি এজন্য? নিজের মতো করে ভেবে নেওয়ার স্বভাব এখনো গেল না তোমার।
কথা বলতে বলতে আঁচল থেকে ঘড়ি ছাড়ানো শেষ হলো। কিন্তু তখনই সায়মানের দৃষ্টি ঘুরে গেল চারপাশে। চারিদিকে উজ্জ্বল আলো, কোলাহল, ভিড়ের মধ্যে নাফিসাকে এইভাবে শাড়ি পরে সবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার চোখ লাল হয়ে উঠল। রাগের স্রোত উথলে উঠল মাথায়। ঠোঁট কেঁপে উঠল কিছু বলার জন্যই——
কিন্তু সেই মুহূর্তে পিছন থেকে আবার ডাক ভেসে এলো।
—— ভাইয়া! তোমাকে ডাকছে।
সায়ফান দৌড়ে এলো। সায়মান ঘুরে তাকাতেই দেখল সায়ফান হাত নেড়ে ডাকছে।
—— ভাইয়া, চলো। তাহমিদ আঙ্কেল অনেকক্ষণ ধরে তোমাকে খুঁজছেন।
সায়মান আবার একবার দৃষ্টি ফেরাল সামনের দিকে। দেখল——মিষ্টি আর রাহিল মিলে নাফিসার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভিড়ের ভেতরে। নাফিসা আর একবারও চোখ ফেরায়নি।
গভীর নিঃশ্বাস টেনে সায়মান গম্ভীর গলায় বলল,
—— চল।
তারপর সাইফানের হাত ধরে গম্ভীর মুখে এগিয়ে গেল।
.সায়মান ভিড়ের ভেতর দিয়ে এগোতেই কানে এলো ডাক—
—— সায়মান! তোমার তো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোথায় ছিলে?
চেনা কণ্ঠে ঘুরে তাকাতেই সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তাহমিদ ইকবাল।
সায়মান ভদ্রতাভরে এগিয়ে এসে বলল,
—— আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
তাহমিদ ইকবাল হালকা বিরক্ত সুরে বললেন,
—— আরে, এখানেও স্যার বলা লাগবে? আঙ্কেল বলো। কতবার বলেছি তোমাকে—— প্রফেশনাল লাইফ আর পার্সোনাল লাইফ আলাদা। এখানে তো আমি তোমার আঙ্কেলই, স্যার না।
গভীর মুখে মাথা নাড়ল সায়মান,
—— জ্বী আঙ্কেল।
তাহমিদ ইকবাল ঠোঁটে হাসি টেনে মৃদু দৃষ্টি ফেললেন তার দিকে,
—— ইয়াং ম্যান, তুমি একদমই চেঞ্জ হলে না। সেই আগের মতোই গম্ভীর, একই রকম। কী বলো, আবার সিলেটে চলে যাবে, নাকি এবার ট্রান্সফার নিয়ে ঢাকাতেই সেটল করবে?
সায়মান কোনো পরিবর্তন না এনেই আগের মতোই গম্ভীর স্বরে উত্তর দিল,
——এখনো ডিসাইড করা হয়নি, আঙ্কেল।
ঠিক তখনই আরেকজন এসে সালাম দিল,
—— আসসালামু আলাইকুম স্যার।
রাজীব। সায়মানও তাকিয়ে সালামের জবাব দিল শান্ত স্বরে।
তাহমিদ ইকবাল চারপাশে তাকিয়ে হঠাৎ বললেন,
—— সে কই? তাকে তো দেখছি না।
সায়মান খানিকটা বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো,
—— কার কথা বলছেন আঙ্কেল?
তাহমিদ ইকবাল হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
—— আরে, তোমার বউয়ের কথা…
বলেই সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঠোঁটে দাঁত বসালেন। সায়মানের চোখের পরিবর্তন তিনি স্পষ্ট দেখলেন। মুহূর্তেই যেন বাতাস ভারী হয়ে উঠল। দ্রুত নিজের কথা ঘুরিয়ে দিলেন তিনি——
—— মানে, নাফিসা মামুনির কথা বলছি। অনেকদিন দেখিনি। একটু নিয়ে এসো না, দেখা হবে।
সায়মানের ঠোঁট শক্ত হলো, চোখ আরও গম্ভীর। সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
—— ওকে।
চারপাশে একবার চোখ বুলিয়েই তার দৃষ্টি স্থির হলো রিশার ওপর। রিশা আর জারিন দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কিছু নিয়ে প্ল্যান করছে। সায়মান সরাসরি ডাক দিল,
—— রিশু, এদিকে আয়।
রিশা অবাক চোখে তাকিয়ে এগিয়ে এল,
—— হ্যাঁ দা ভাইয়া, বলো।
সায়মান সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
—— ওকে ডেকে নিয়ে আয়।
—— কাকে? —— রিশা বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করতেই পাশে দাঁড়ানো তাহমিদ ইকবাল হেসে বললেম ,
—— নাফিসা মামনিকে ডেকে আনো, মামনি।
রিশা মাথা নেড়ে ভদ্রভাবে বলল,
—— আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল, কেমন আছেন?
তাহমিদ ইকবাল মিষ্টি হেসে উত্তর দিলেন,
—— এইতো আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি মামনি। তুমি কেমন আছো?
—— আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই আছি। —— হেসে জবাব দিল রিশা।
তারপর সামান্য ভদ্র ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বলল,
—— আপনারা দাঁড়ান, আমি নাফিসাকে ডেকে নিয়ে আসছি।
এ কথা বলে রিশা দ্রুত পা বাড়াল ভিড়ের ওপারে, নাফিসাকে ডাকতে।
মিষ্টি আর রাহিল যেন একপ্রকার পাগল করে দিচ্ছে নাফিসাকে।
কখনো বলছে—
—— খালামণি, একটু হাসো না, ক্যামেরায় হাসি ফুটছে না!
আবার কখনো রাহিল উচ্ছ্বাসে বলে উঠছে,
—— কিউটি, দাঁড়াও দাঁড়াও, এই এঙ্গেলটা দারুণ হবে!
দু’জনের এমন বাচ্চাসুলভ উচ্ছ্বাসে নাফিসা হাপিয়ে উঠছে। তবু শিশুদের আনন্দ নষ্ট করতে চাইছে না বলে একের পর এক ছবি তুলছে। এদিকে শাড়ির আঁচল বারবার সরে যাচ্ছে, আর ক্লান্ত দৃষ্টিতে সে চারপাশে তাকাচ্ছে।
ঠিক তখনই পাশ থেকে এক ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠ ভেসে এল——
—— আরে বেয়ান, একা একাই ছবি উঠছেন? এইটা কিন্তু ঠিক না!
চমকে সামনে তাকাতেই নাফিসার চোখ পড়ল রিয়াদের ওপর। মুখভরা শয়তানি হাসি, ভুরু নাচিয়ে কথাগুলো বলল সে। চোখেমুখে বিদ্রূপের ছাপ স্পষ্ট।
নাফিসার বুকের ভেতর মুহূর্তেই ক্ষোভের ঢেউ খেলল। ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল, চোখে কঠিন দৃষ্টি নেমে এল।মানে, লজ্জা যদি একটু থাকত, তাহলে মানুষ এইভাবে আবার কথা বলত?
রিয়াদ হেসে উল্টা উত্তর দিল,
— আরে বেয়ান, এত সিরিয়াস হচ্ছো কেন? আসো না, একসাথে একটা ছবি তুলি।
আবার নাফিসার ঠোঁটে কষাঘাতের মতো শব্দ ঝরে পড়ল,
—— ছবি তোলার মতো সম্পর্ক আমাদের মাঝে নেই, সেটা মনে রাখাই ভালো হবে।
সে এগিয়ে মুখ খোলার আগেই পিছন থেকে আরেকটা দৃঢ় কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে——
—— কুত্তার লেজ কখনো সোজা হয় না, রিয়াদ। আজ হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম!
রিয়াদ চমকে ঘুরে দাঁড়াল। দেখল——রিশা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখেমুখে তীব্র কঠোরতা।
রিশা এক ইঞ্চিও না সরে ঠাণ্ডা অথচ ধারালো গলায় বলে চলল——
—— তোকে যদি নাফিসার আশেপাশে আবার দেখি আমি তোর কুত্তার লেজে সুপার গ্লু আঠা দিয়ে সোজা করে দেব। তাই সাবধান!
কথার প্রতিটি শব্দ যেন ছুরি হয়ে বিঁধল রিয়াদের বুকের ভেতর। মুহূর্তেই তার মুখ থমথমে হয়ে গেল। শয়তানি হাসি মিলিয়ে গেল, চোখেমুখে অপমানের দাগ গাঢ় হয়ে উঠল।
রিশা আর সময় নষ্ট করল না। নাফিসার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিল নিজের দিকে।
—— চলো নাফু, এর মতো বেহায়াদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার নেই।
বলেই নাফিসাকে নিয়ে ভিড়ের ভেতরে চলে গেল রিশা। আর রিয়াদ দাঁড়িয়েই রইল অপমানিত, নির্বাক হয়ে।
রিশা নাফিসাকে হাত ধরে সায়মানের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজে ধীরে ধীরে হেঁটে চলে গেল। নাফিসা নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; সে কিছু বলল না, শুধু রিশার দৃঢ় হাতছানার দিকে নির্ভর করল। পরিচিত সেই গন্ধ শোঁপে হঠাৎই যেন তার মনে এক অচেনা নস্টালজিয়ার ঢেউ ঢুকল। নিঃশব্দে সে পাশে তাকাল——সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সায়মান। চার বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পরে চোখের সামনে থাকা সেই মানুষের দৃঢ় উপস্থিতি যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ভিড়ের মধ্য থেকে একটি উচ্ছ্বাসপূর্ণ কণ্ঠ ভেসে এলো——
—— মামনি! কেমন আছো? অনেক বড় হয়ে গেছো তো… ওএমজি!
নাফিসার মুখে অজান্তেই একটি চমক ফুটে উঠল। পরিচিত সেই কণ্ঠ, দীর্ঘদিন পরে শুনে অবাক হওয়ার অনুভূতি এবং হালকা লজ্জা—— সবকিছু মিলিয়ে মনের মধ্যে এক অদ্ভুত ঢেউ উঠল। সে স্বাভাবিক কণ্ঠে জবাব দিল,
—— আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
তাহমিদ ইকবাল মৃদু হাসি নিয়ে প্রশ্ন করতে থাকলেন, চোখে উচ্ছ্বাস, গলায় কৌতূহল—
—— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো মামনি। এখন কোন ক্লাসে পড়ছো? আমি তো তোমাকে দেখে বিশ্বাসই করতে পারছি না। বাই দা ওয়েঃ, তোমার বয়স কত এখন?
নাফিসা একনাগাড়ে উত্তর দিল,
—— জি, এবার HSC দিব। ১৮ বছর হয়েছে।
তাহমিদ ইকবাল সন্তুষ্টির সাথে মাথা নিলেন।
—— দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেলে! যাইহোক, মামনি, ভালো করে পড়াশোনা করো। লাইফে নিজের পায়ে দাঁড়াবে ঠিক আছে।
নাফিসা মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো।
এই কথার মাঝেই রাজীব এগিয়ে এসে ভদ্রভাবে বলল,
—— আসসালামু আলাইকুম, ভাবি কেমন আছেন?
নাফিসা হঠাৎ একটু অস্বস্তিতে পড়ল, এতটা কাছ থেকে ‘ভাবি’ শব্দ শুনে। রাজীব বিষয়টা বুঝতে পেরে ধীরে ধীরে সায়মানের দিকে তাকাল। সায়মানও তার দিকে গভীর, গিলে খাওয়ার মতো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রাজীব একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে দাঁড়াল।
—— না মানে, ছোট আপু কেমন আছো? আবার বলল সে।
—— জি, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। ভাইয়া, আপনি কেমন আছেন? —— নাফিসা শান্ত স্বরে জবাব দিল।
—— এইতো, আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। —— রাজীব হাসি টেনে বলল।
তবে অল্প সময়ের মধ্যেই এনাউন্সার ঘোষণা করলেন, ডান্সের জন্য কাপল ডান্স হবে। সবাই ওই দিকে ফোকাস করল।
আরিব চুপচাপ নাফিসাকে দেখছিল, তার চোখে নাফিসার শাড়ির নরম ঝরঝরে গ্ল্যামার, চারপাশের আলোয় ঝলমল করা চোখ, ছোট ছোট নিঃশ্বাস—— সবই তার হৃদয়ে ধাক্কা দিচ্ছিল। হার্টবিট যেন এক মুহূর্তে থেমে গিয়েছিল।
হঠাৎ সে এগিয়ে এসে বলল,
—— নাফু, আমার পার্টনার হবে, চলো একসাথে ডান্স করি। আমি কাউকে খুঁজে পাচ্ছি না।
সায়মান আরিবের দিকে অগ্নিময় চোখে তাকাল। রাগে পুরো শরীর জ্বলে উঠল, হাত মুঠো করে দাঁতের দাঁত চেপে বলল,
—— ও তোর সাথে কোথাও যাবে না, অন্য কাউকে খুঁজ।
আরিব ছেকা খেয়ে গিয়ে থমকে রইল। সে বুঝতে পারল—নাফিসাকে নিয়ে কথা বলছে সায়মান।
নাফিসা হতবাক, ভেবে পাচ্ছে না কী করা উচিত। আরিব কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু সায়মানের কঠোর দৃষ্টির মুখে চুপ থাকল। এরপর আরিব আবার বলল——
—— আমি এখান থেকে তোকে যেতে বলেছি।
সায়মানের কান্ড দেখে তাহমিদ ইকবাল ও রাজীব মুচকি হাসি দিতে থাকলো।
তাহমিদ ইকবাল বললেন,
—— কোথায় যেন পুরো গন্ধ পাচ্ছি, রাজীব। মনে হচ্ছে চারপাশে আগুন ছড়াচ্ছে।
—— জি, স্যার, আমারও তাই মনে হচ্ছে। — রাজীবও স্বীকার করল।
সায়মান রাজীবের দিকে আগুন চোখে তাকাল।
তাহমিদ ইকবাল গলা খাইরি দিয়ে হালকা কাশি দিলেন।
—— রাজীব, চুপ কর! ঐ আগুনয়ে মনে হচ্ছে , এবার তোমাকে চোখ দিয়ে ধ্বংস করবে।
নাফিসা হা করে তাকিয়ে চারপাশের দৃশ্য বুঝতে পারছিল না। আরিব চলে গেল। সে বুঝতে পারল, সায়মান এমন করল কারণ নিজের ছোট বোনের মতো দায়িত্ব নেওয়া এবং নাফিসার প্রতি অতিরিক্ত সুরক্ষা—সেই সব অনুভূতি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।ও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে আর কিছুদিন হাতেগোনা দুই তিন বছর পর তারপর দাভাইয়ের এর কাছ থেকে ঠিক চেয়ে নেবে এই মেয়েকে। ভেবে একটা মুচকি হাসি দিল।
দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রিয়াদ ভাবছিল নাফিসাকে ডান্সে আমন্ত্রণ জানাবে, কিন্তু সায়মানকে দেখে ভয়ে এগোতে পারল না।
পরিবেশ: চারপাশে ঝলমল আলো, মানুষের কোলাহল, বাদ্যের সুর, ছোট ছোট নাফিসার নিঃশ্বাস এবং সায়মানের গভীর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে যেন এক রহস্যময়, উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। প্রতিটি ক্ষুদ্র মুহূর্তে হৃদস্পন্দন, চোখের দেখা, নিঃশ্বাস—সবই সেই আবহের অংশ হয়ে উঠেছে।
রুহি ধীরে ধীরে পা ফেলল, চারপাশের আলো ঝলমল করছে, সঙ্গীতের হালকা ছন্দ বাতাসে ভেসে আসছে। মানুষের কোলাহল, ছোট ছোট হাসি আর কথা—সবকিছু যেন তার মনকে আরও অস্থির করে তুলছে। আর সেই মুহূর্তে একজন কাছে এসে বলল,
—— চলুন, ডান্স করি।
রুহি সঙ্গে থাকা রাহুল দিকে তাকাল। তার চোখে কৌতূহল আর উচ্ছ্বাস মিশে আছে। কিন্তু রুহির মন তার চাওয়ার সঙ্গে একমত নয়। মনে মনে সমস্তটা অসহ্য মনে হচ্ছে——শুধু ডান্স নয়, এই পরিবেশের ছোট ছোট উত্তেজনা, চোখের ধাঁধা, শরীরের অস্বস্তি——সব মিলিয়ে তার ধৈর্যের সীমা ছুঁয়েছে।
—— আমার শরীর ভালো লাগছে না, —— রুহি বলল, ধীরে ধীরে, মুখে সামান্য হাসি জড়িয়ে।
—— কেন? কি হয়েছে? বেশি খারাপ লাগছে? উপরে গিয়ে রেস্ট নাও, তারপর—— রাহুল সতর্ক কণ্ঠে বলল।
রুহি নেকি হেসে বলল,
—— তেমন কিছু না, ওই সামান্য।
তার হাসিতে ভেসে আসছে হালকা অস্থিরতা, অথচ সে দৃঢ় চেষ্টায় সেই অস্বস্তি ঢেকে রাখছে। রাহুল হতাশ, মুখে কিছু বোঝাতে পারছে না। কেবল ধীরে বলল,
—— আচ্ছা, থাকো তুমি এখানে বসে। ডান্স করা লাগবে না, আমরা এখান থেকে সবার ডান্স দেখি।
রুহি কোনও শব্দ না করে মাথা নাড়াল। সে জানে, আজকের এই ছোট অসুবিধাগুলোই তার জন্য অনেক বড়——কারণ, রায়হানকে কখনো মাফ করবে না সে। শুধু রায়হানের জন্যই আজকে তাকে এমন অনেক কিছু সহ্য করতে হচ্ছে। মনে মনে সে দৃঢ় সংকল্প নিয়েছে——নিজেকে সামলানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
শরীরের অস্বস্তি, চারপাশের আলো, মানুষের কোলাহল——সবকিছু মিশে রুহির মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করছে। নিঃশ্বাস ভারী, চোখ একটু অস্থির। তবু সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।
আর সেই অস্থিরতা আর ধৈর্যের মধ্যে, রাহুলের শান্ত দৃষ্টি এবং সংলাপ তাকে সামান্য আশ্বস্ত করছে।
স্টেজের পার্শ্বে আলো ঝলমল করছে, চারপাশে মানুষের কোলাহল, হালকা বাদ্যের সুর ভেসে আসছে। আকাশ দাঁড়িয়ে আছে, তার ওপর সস্তা ফরমাল ড্রেস পরা, হাতে আস্থা রেখে সাইফানের সঙ্গে কথা বলছে।
রিশা পাশে দাঁড়িয়ে আছে, চোখে একটি লক্ষ্য স্থির——তার ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড’। কিন্তু সেই তার চোখে আসল প্রতিক্রিয়া এখনো পর্যন্ত দেখতে পেল না , মানুষটি তার কোনো পাত্তা দেয় না । রিশা দ্রুত জারিনের দিকে তাকাল।
—— প্লিজ, দোস্ত, তুই সাইফান ভাইকে একটু ম্যানেজ কর, আমি ওই ব্ল্যাক ডায়মন্ডকে ডান্সের জন্য রাজি করাবো, —— রিশা বলল, মুখে সামান্য উত্তেজনা।
জারিন নাক ছিটকিয়ে বলল,
—— ছিঃ, জানু, তুই তোর ব্ল্যাক ডায়মন্ডের জন্য বান্ধবীকে ওর কাছে পাঠাচ্ছিস? সেম অন ইউ।
রিশা অবিলম্বে জারিনের গালে একটা চুমা দিল।
—— প্লিজ, জানু, আমার জন্য এটুকু করতে পারবি না? প্লিজ, প্লিজ!
জারিন অবাক হয়ে নিজের গালে হাত দিয়ে বলল,
—— ছ্যাবলা মহিলা, তুই আমাকে চুম্মা দিলি? যা, তোর জামাইকে দে! আমি তো ছেলেদের পছন্দ করি, মেয়েদের নয়, বুঝেছিস।
রিশা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। জারিনও তার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
—— যা, আর ইনোসেন্ট চেহারা করতে হবে না।
হাসি-খুশি হয়ে জারিন রিশাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ধীরে ধীরে সাইফানের দিকে এগিয়ে আসলো। মিষ্টি হাসি, চোখে চঞ্চল উজ্জ্বলতা—
—— ধলা বিলাই থুক্কু, সাইফান ভাই, আজকে ডান্স পার্টনার হবেন আমার! — জারিন বলল, চঞ্চল কণ্ঠে।
সাইফান তার দিকে তাকালো। হঠাৎ , দেখে অনুভূতি হল, সে প্রথম ভালোবাসার মতো অদ্ভুত, হঠাৎ ছুটে আসা উত্তেজনা, চোখের ছায়া—সবই মিশে এক অদ্ভুত কম্পন তৈরি করল। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে সে চোখ ছোট ছোট করে জবাব দিল,
—— কি ব্যাপার চশমা? আজকে এসে নিজে অফার করছো?
জারিন একটি ঢুক গিলল, মনে মনে ভাবল—এই ব্যাটা খুব চালাক, ঠিক আন্দাজ করে ফেলেছে। তবে সামনে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসলো।
—— কি যে বলেন না, সাইফান ভাই।
সব ঠিক আছে চশমা, কিন্তু ভাই বলাটা কেমন হয়ে গেল না? সাইফান বলে ডাকো।
—— ওকে, সাইফান ভাইয়া, —— জারিন আবার বলল, কিছুটা উত্তেজনায়।
—— আমি ভাই বলতে নিষেধ করেছি, আর তুমি একেবারে ‘ভাইয়া’ বানিয়ে দিলে। ভাই তো ঠিক ছিল, চশমা, —— সাইফান ধীরে জবাব দিল।
জারিন ৩২ পাটি দাঁত বের করে হাসলো। সাইফান ধীরে তার হাত ধরল,
—— চলো, তাহলে একটু ডান্স করি।
স্টেজের দিকে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে নিয়ে গেল। চারপাশে দর্শকের দৃষ্টি, আলো ঝলমল, ছোট ছোট নিঃশ্বাসের শব্দ—সব মিলিয়ে যেন রোমাঞ্চকর এক মুহূর্ত তৈরি হলো।
অন্যদিকে, রিশা আকাশের সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়ে বলল,
—— স্যার, চলেন, ডান্স করি।
আকাশ তার দিকে এক পলক তাকাল। এই মেয়েটা পাগলামো কখন বন্ধ করবে, সে ভাবল। অবুঝ নয় সে, ভালো করেই বোঝে, এই মেয়েটি তার আশেপাশে ঘুরছে কেবল এক উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু ও কি বোঝে এর পরিনিতি কি হবে ভেবে, দীর্ঘশ্বাস ফেলল,
—— না, আমি ডান্স পারিনা।
রিশা মন খারাপ হয়ে গেল।
—— আপনাকে পারতে হবে না, স্যার। আমি শিখিয়ে দেবো, প্লিজ, — সে অসহায়ভাবে বলল।
আকাশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রিশার মন খারাপ দেখল। অদ্ভুতভাবে, তার মনও মানিয়ে নিল।
—— হুম, আচ্ছা, চলো।
রিশার চোখে আলো ঝলমল করে উঠল।
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ২৩+২৪
—— সত্যি, স্যার! — সে উচ্ছ্বাসে বলল।
আকাশ গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে জবাব দিল,
—— হুম।
রিশা খুশিতে আকাশের হাত ধরে ধীরে ধীরে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল।
