Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২
অনামিকা তাহসিন রোজা

ধারা মারাত্মক লজ্জা পেয়েছে। এত লজ্জা সে এ জনমে কখনো পায়নি। লোকটা যে এভাবে পল্টি খেয়ে তাকে এত আশ্চর্যজনক জিনিস করাতে চাইবে তা মেয়েটার মাথাতেও আসেনি। শেষমেশ ভয় পেয়ে বেচারি রুম থেকেই বের হলো না। শ্রাবণ নিচে আসার আগে সে ঘুরে ঘরে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। শ্রাবণ অফিসে না যাওয়া পর্যন্ত এ ঘর থেকে কোনোমতেই বের হবে না। হবে না মানে হবেই না।
শ্রাবণ ভেবেছিল অফিস যাওয়ার সময় ধারাকে খুব সিনেমাটিক ভাবে বিদায় জানাবে। অথচ সেই সময় মেয়েটাকে খুঁজে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকালো শ্রাবণ। অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। তাই বেশি না ভেবে বেরিয়ে পড়লো। মনে মনে ভাবলো অফিস থেকে এসে মেয়েটাকে আঁছাড় মারবে।

সালমা বেগম থালাবাসন গুছিয়ে সামিউল শেখের জন্য বিছানা ঠিক করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। শ্রাবণের ঘরের কাছে এসে দরজার নক করে ডাকলেন ধারা কে। সালমা বেগমের কন্ঠে এতক্ষণ পর হুঁশ ফিরে ধারার। তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দেয়। সালমা বেগম মুচকি হেসে ঘরে ঢুকে পড়েন। তারপর বিছানায় বসতে বসতে বলেন,
—” শ্রাবণের কী হয়েছে বল তো? সত্যি সত্যি জাদুটোনা করেছিস?”
লজ্জা পেলো ধারা। তবে মনের অনুভূতি মনেই চেপে মিনমিন করে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—” না না। কিছু করিনি তো মা!”
ধারার সরলতা দেখে ফিক করে হাসলেন সালমা বেগম। মুখে হাসি রেখেই বললেন,
—” হুম হুম বুঝেছি। এখন যা তো, তোর ঘর থেকে সব জিনিসপত্র নিয়ে আয়। আমার ছেলে নাকি তোকে পার্মানেন্টলি এ ঘরে রাখবে। তো এখন আর কিই বা করার! চল, দুজন মিলে জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলি!”
ধারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। দু’চোখ কপালে তুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো সালমা বেগমের দিকে। ভদ্রমহিলা এতো সহজভাবে কথাটা বলে দিলেন? মনে হলো যেন এটাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার! অথচ ধারার ভেতরে এখনো ঘূর্ণিঝড় বইছে। গাল জ্বলে যাচ্ছে লজ্জায়, বুকের ভেতর ধুকপুক থামছেই না। এটা কোনো কথা! এ ঘরেই থাকতে হবে? আর ঘুমোবে কোথায়? শ্রাবণের সাথে? সে কি সর্বনাশ!
কাঁপা কাঁপা গলায় ধারা বলল,

—” মা…এভাবে কি হয় নাকি?”
সালমা বেগম গম্ভীর মুখ করে একবার মেয়েটার দিকে তাকালেন, পরক্ষণেই আবারো মুচকি হেসে উঠলেন। কঠোর মুখভঙ্গি করে বললেন,
—” কেনো হবে না? হতেই হবে। আর আমার হীরের টুকরো ছেলেও বলেছে, স্বামীর ঘরে থাকবে বউ—এটাই তো নিয়ম। নাকি তুই অন্যরকম কিছু ভেবেছিস?”
ধারা ঠোঁট কামড়ে নিচে তাকিয়ে রইলো। কিছু বলতে পারলো না। মনে হলো সালমা বেগম যেন সবই বুঝে গেছেন। তিনি আবারো মিষ্টি গলায় বললেন,

—” তুই যা-ই ভাবিস না কেনো ধারা, আমার কিন্তু মনে হয় তোর হাতেই আসল চাবিকাঠি। শ্রাবণকে এত বছর আমি দেখেছি, ও কাউকে পাত্তাই দিত না। অথচ তোকে নিয়ে ওর এই বদলটা…আমি কিন্তু শুধু দেখছি না, উপভোগও করছি! আমার মুখচাপা ছেলেটাকে লাগামছাড়া করে ছাড়লি!”
ধারা এবার সত্যিই মরে গেলো লজ্জায়। ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকতে গিয়েও থেমে গেলো। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন অদ্ভুত এক শিহরণ হলো। সালমা বেগম আর লজ্জা দিতে চাইলেন না মেয়েটাকে। ধপ করে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন,
—” যা, তাড়াতাড়ি জিনিসপত্র গুছা। বিকেলের ভেতরেই সব সরিয়ে দিবি। আমি আছি, সাহায্য করছি, ভয় পাস না।”
বলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ধারা বিছানায় বসে পড়লো। ভেতরে একরাশ ভয়, লজ্জা আর কেমন যেন মিষ্টি মিষ্টি অনুভূতি। মনে হলো, জীবনটা হঠাৎ করেই অন্যরকম রূপ নিতে চলেছে। তবে এই সুখ কি স্থায়ী! ধারার কপাল যে ভালো না! সে যে অভিশপ্ত! আদৌও কি এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হবে? নাকি পৃথিবীর সব সুখানুভূতি পেয়ে আবারো হারিয়ে ফেলবে?

অফিসে পৌঁছানোর পর শ্রাবণ অনুভব করল, সে সত্যিই পাগল হয়ে গেছে। একদম পুরোপুরি পাগল হয়েছে সে। কিছুদিন পর মেন্টাল আইসোলামে থাকতে হতে পারে। এইযে সে অফিসে এসেছে। তার মনটা তো অফিসে থাকার কথা, তাই না? অথচ তার অবাধ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া মন টা পড়ে আছে বাড়িতে থাকা এক সপ্তদশীর নিকটে। এটা কি আদৌও যুক্তিযুক্ত। শ্রাবণ শেখ মোটেই এমন আনমোনা নয়। কাজের সময় মনোযোগ দিয়ে কাজ করা তার ব্যাক্তিত্ব। অথচ আজও তার মন ফাঁকি দিয়ে প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে মেয়েটার আশেপাশে বিচরণ করছে। অফিসে বসেই শ্রাবণ শেখ এক জোড়া সম্মোহনী চোখ, ঘন কালো চুলের অবাধ্য বিচরণ, ছোট্ট চিকন একটা নাক আর গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁটজোড়া দেখতে পাচ্ছে। চোখ বন্ধ করলেও দেখছে, চোখ খুললেও দেখছে। এটা কি পাগল হওয়ার ইঙ্গিত নয়।

ভাবনার মধ্যেই চেয়ার হেলান দিয়ে থাকা শ্রাবণ ধপ করে চোখজোড়া মেলে তাকালো। নাহ, এসব আর নেয়া যাচ্ছে না। মেয়েটার মিনমিন কন্ঠস্বরটা শোনার জন্য চৈত্রের খরা নেমেছে তার হৃদয়ে। বৃষ্টিতে সিক্ত করা খুবই জরুরি। আর এই সময় একমাত্র ওই মিষ্টি কন্ঠস্বরটাই পারে হৃদয় সিক্ত করতে। তাই দ্রুত গতিতে শ্রাবণ ফোন বের করল। কনটাক্ট লিস্ট থেকে ধারা নামটা বের করে তৎক্ষনাৎ কল দিল।

শ্রাবণের পাশে যে ঘরে ধারা কে থাকতে দেয়া হয়েছিল। সে ঘরের আলমারির দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে ছিল ধারা। মনে মনে ভাবছিল এই কাপড়গুলো শ্রাবণের ঘরের কোথায় রাখবে। শ্রাবণের আলমারিতে রাখবে নাকি অন্য কোথাও! আর তো জায়গা নেই। নাকি কাপড় এ রুমেই থাকুক? ঠোঁট কাঁমড়ে এসবই ভাবছিল মেয়েটা।
হুট করে তার হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো। এই ফোনটা তার শ্বশুর সামিউল শেখই তাকে দিয়েছে। খুব বেশি চালায় না ধারা। সালমা বেগম আর সামিউল শেখ ছাড়া কারোর নাম্বারই সেভ করা নেই। এমনকি শ্রাবণেরও না। তাই শ্রাবণের নাম্বার আননোন দেখালো। ধারা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কলটা ধরল, ভদ্র ভাবে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

—” কে বলছেন?”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকালো। মনে মনে তো বলতে ইচ্ছে করল, তোমার অনাকাঙ্ক্ষিত স্বামী, আর কাঙ্খিত প্রেমিক বলছি। কিন্তু না, বলবে না এখন। কারন এই কথা বললে মেয়েটা নির্ঘাত লজ্জা পাবে। আর লজ্জামাখা মুখটা শ্রাবণ দেখতে পাবে না, মিস করে যাবে। তাই বলল না তেমন কিছু। বরং প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে নিজে থেকেই বললো,
—” কী করছো তুমি?”
এই পুরুষের কন্ঠস্বর চিনতে ভুল হবে না ধারার। কখনোই হবে না। পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত! ধারা নিজেও এই মুহুর্তে বুঝতে পারলো, সে না চাইতেও শ্রাবণের কন্ঠস্বর শোনার অপেক্ষায় ছিল। এতক্ষণের ভেতরকার অস্থিরতা টা নিমিষেই মিলিয়ে গেলো। অদ্ভুত প্রশান্তিতে মন ভরপুর হলো। মিনমিন করে বলল,

—” কিছু না। আপনি পৌঁছেছেন?”
শ্রাবণের বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে এলো। সত্যিই এতো তৃপ্তি, এতো শান্তি সে আগে পায়নি। ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল। এভাবে, একেবারে সোজাসাপ্টা ভাবে কেউ তাকে জিজ্ঞেস করেছে কি না—সে পৌঁছেছে কিনা! মানে, কেউ কি আদৌও কখনো ভেবেছে তার জন্য? মা ছাড়া এভাবে কেও তো তার জন্য চিন্তিত ছিল না। এই মুহুর্তে মনে হলো, মা ছাড়াও বাড়িতে আরো একজন আছে, অন্তত একজন আছে যে তার জন্য ভাবে। সে কণ্ঠে অকারণ দৃঢ়তা এনে বলল,
—” হ্যাঁ, পৌঁছেছি। কিন্তু একটা জিনিস আনতে ভুলে গেছি! ”
ধারা ভাবলো গুরুত্বপূর্ণ কিছু। তাই খু্ব সিরিয়াস কন্ঠে বলে উঠলো,
—’ কী?”
—” আমার মন! ”

ধারা থমকে গেল। ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ঠোঁট কামড়ে লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। সে যে কথা বলছে, তাতে লুকানো আগুনও আছে, মমতাও আছে। হঠাৎ বুকের ভেতর ধক ধক বেড়ে গেল ধারার।
শ্রাবণ কেনো যেন দুরে থেকেও বুঝলো মেয়েটা মারাত্মক লজ্জা পেয়েছে। তবে এতে তার কিছুই যায় আসে না। সে এবার একটু থেমে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,
—” শোনো ধারা, আসলেই আমার মনটা আনতে ভুলে গেছি। ওখানেই আছে। একটু খোঁজো, আশেপাশেই কোথাও হবে। তুমি একটু দেখেশুনে রেখো!”

ধারা এক মুহুর্তের জন্য ভাবলো, লোকটার মাথা পুরোই গেছে। আবার মনে হলো, কিছু একটার ইঙ্গিত পাচ্ছে। নাহ, সে বুঝেছে। কাল রাতেই বুঝেছে। কিন্তু এভাবে চুপ আছে বলে যে শ্রাবণ শেখ নিজের বউয়ের সাথে এমন ফ্লার্টিং করবে তা তো অভাবনীয়! ধারা চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত শুনল। মনে হলো, কথাগুলো সত্যিই তার বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। যতই হোক না কেনো, তার শুনতে ভালো লাগছে। একদম কানের কাছে সেই কন্ঠস্বর! তার উপর, এতটা খোলাখুলি প্রকাশ শুনতে সে অভ্যস্ত নয়। ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেলেও কেমন যেন অদ্ভুত এক শান্তিও পেল।
মিনমিনে স্বরে বলল,

—” আমি তো আশেপাশে কিছুই খুঁজে পাচ্ছিনা। আপনার রেখে যাওয়া জিনিস টা বোধহয় অদৃশ্য!”
শ্রাবণ হেসে ফেলল, গলা নামিয়ে মিষ্টি দৃঢ়তায় বলল,
—” মোটেই না। তোমারই চোখ নেই। মনের চোখ দিয়ে দেখো গাধা!”
ফোনের ওপাশ থেকে মৃদু হাসলো ধারা। না চাইতেও এক হাত নিজের ওড়না খুটতে থাকলো। এ পর্যায়ে শ্রাবণ আবারো জিজ্ঞেস করতে চাইলে ধারা নিজে থেকেই বলে উঠলো,
—” একটা কথা বলি?”
শ্রাবণ কি আর মানা করতে পারে নাকি! হেসে বলল,
—” অবশ্যই বলো।”

ধারার বুকটা থেমে থেমে উঠলো-নামলো। গাল গরম হয়ে এলো লজ্জায়। ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা জমল, কিন্তু সেই নীরবতাও দু’জনের ভেতর অদ্ভুত মিষ্টি আবেশ ছড়িয়ে দিল। এরপর ধারা সময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—’ আমি কি আমার জামাকাপড় গুলো আপনার ঘরে রাখতে পারি?”
এক মুহুর্তের জন্য শ্রাবণের ইচ্ছে করল, এখনি গিয়ে মেয়েটাকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে। এটা কোনো জিজ্ঞেস করার মত কথা! দীর্ঘশ্বাস ফেলল শ্রাবণ,
—” নাহ, আমার ঘরে রাখার দরকার নেই। পাশের বাসার আঙ্কেলের ঘরে রেখে এসো যাও!”
ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট উল্টালো ধারা,
—” আপনি সবসময় পাশের বাসার আঙ্কেল আন্টিকে অকারনে টানেন কেনো?”
শ্রাবণ হেসে দিল একচোট, হাসিটা এতটাই দুষ্টু যে ফোনের ওপাশ থেকেও টের পাওয়া গেল। চোখ আধবোজা করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

—” কারণ ওনারা খুব ভাগ্যবান। পাশের বাসায় থেকে তোমার মত ঝড় তুলে দেওয়া মেয়ে দেখতে পায়। আমি তো দেখি শুধু আমার ঘরে আসলে। তাই মজা করি ওদের নাম ধরে।”
ধারা ঠোঁট কামড়ে চুপ মেরে গেল। গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে লজ্জায়। ওদিকে শ্রাবণ মিষ্টি গলায় আরও যোগ করল,
—” আচ্ছা বলো তো, সত্যিই কি তুমি আমার ঘরে জামাকাপড় রাখবে কিনা জিজ্ঞেস করছো? নাকি আমার ঘরের কোথায় রাখবে সেটা জিজ্ঞেস করছো?”
শুধু অজুহাত বানাচ্ছো তাই না!”
ধারা আঁতকে উঠল। শ্রাবণের কথাটা একদম সত্যি। ধারা আসলেই শ্রাবণের ঘরের কোথায় কাপড় রাখবে সেটাই জিজ্ঞেস করতে চাইছিল। কিন্তু লজ্জায় বলতে পারলো না, তাই এবারো বলল,

—” না না, আমি কেনো অজুহাত বানাবো?”
শ্রাবণ খুনসুটি ভরা স্বরে বলল,
—” বানাবে না কেনো? মনের ভিতরের কথা মুখে বলতে লজ্জা লাগে, তাই না? তাই অজুহাত খুঁজে নাও।”
ধারা এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। বুকটা কেমন যেন ধড়ফড় করছে। একটু বিরক্তি, আবার অদ্ভুত মায়াও গলার স্বরে মিশিয়ে বলল,
—” আপনার মাথা পুরোই গেছে। অফিসে বসে এসব ভাবছেন?”
শ্রাবণ হালকা হেসে উত্তর দিল,

—” আমার আলমারিতে বহুত জায়গা আছে। তাই আমার কাপড়ের পাশে অনায়াসে তোমার কাপড়ের জায়গা হয়ে যাবে। খুব খুশি হবো, যদি “আপনার ঘর, আপনার ঘর” না করে “আমাদের ঘর” বলে সম্বোধন করো! বুঝেছো?”
ধারা মাথা নামালো। হাতে থাকা ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল। মিনমিন করে বলল,
—” রাখছি!”
শ্রাবণ আটকে দিল। কিছু একটা ভেবে বলল,
—” দুপুরের আগে একটু তৈরী হয়ে নিও। তোমায় নিয়ে বাইরে যাব!”
ধারা অবাক হলো। জিজ্ঞেস করল,
—” কোথায়?”
শ্রাবণ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

—”সেটা গেলেই দেখতে পাবে। তবে দুপুরের খাবার বাইরে খাব আমরা, মাকে বলে দিও। আর তুমি সাদা রঙের কিছু একটা পড়ে নিও তো!”
সাদার মধ্যেই সবচেয়ে নির্মল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। ধারা কে সেই রূপে শ্রাবণ দেখতে চায় আজ। কোনো অজুহাত দিলেও শুনবে না সে। ধারার বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ভিতরে ভিতরে লজ্জায় ভরে গেল, অথচ অজানা উত্তেজনাও কাজ করল। কিছু বলার মত শব্দ খুঁজে না পেয়ে সে শুধু মাথা নামিয়ে মিনমিন করে উত্তর দিল,
—” আচ্ছা…দেখি।”
শ্রাবণ এবার খানিক নরম স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,

—” শুধু দেখে নয়, সত্যিই পড়বে। নইলে বুড়িগঙ্গা চেনো তো?”
মিষ্টি হুমকি টা আজ পাত্তা দিল না ধারা। আর কিছু না বলে ফোন কেটে দিল। গাল দুটো জ্বলছে লজ্জায়, চোখে একরাশ অচেনা আলো জ্বলজ্বল করছে। হাতে থাকা ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরল। সে উপলব্ধি করল, মানুষটা সামনে না থাকলে সেও কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ে।
ওদিকে শ্রাবণ ফোনটা নামিয়ে নিজের চেয়ারে হেলান দিল। কিছুক্ষণ কনটাক্ট লিস্টে “ধারা” দিয়ে সেভ করা নাম্বার টা দেখে ভ্রু কুঁচকালো। খুব সহজভাবে ইডিট করে ধারার নাম্বর টা সেভ করল, — “মিসেস শেখ” দিয়ে। হুম, এবার ভালো লাগছে দেখতে। শান্তি পেলো সে। ঠোঁটে তৃপ্তির এক মায়ামাখা হাসি ফুটে উঠল শ্রাবণের। মনে মনে বিড়বিড় করল,
—” মায়াবী চোখে কি মায়া, যেন গোধূলি আবীর মাখা,
কি নেশা ছড়ালে! কি মায়ায় জড়ালে?”

অনেক সংকোচ লজ্জা একসাথে মিশিয়ে ধারা সালমা বেগম কে বলেছে দুপুরে তারা বাড়িতে খাবে না। ধারা ভেবেছিল একগাদা প্রশ্ন করবেন সালমা বেগম। অথচ তিনি ধারার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলেন। সাদা রঙের একটা কুর্তি দিলেন ধারা কে। খুব খুশি হলেন ছেলে-বউয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক পর্যায়ে যাচ্ছে বলে। শ্রাবণ যত দ্রুত সম্ভব সমস্ত কাজ শেষ করল। এমনিতেও সে চাইলে এই মুহুর্তেই বেরিয়ে যেতে পারে। কারন এই অফিস তার চাচা তথা ছোট আব্বু রবিউল শেখের। তবে সে নিজের কাজের প্রতি হেলা করে না। তাই কাজ শেষ করেই বেরোবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। এর মধ্যে একটা ছোট্ট মেসেজ ধারা কে পাঠালো,

—” মনে করে চোখে কাজল দেবে কিন্তু!”
মেসেজ টা বারবার পড়লো ধারা। যতবার পড়ল ততবারই শিহরিত হলো মন। সত্যি সত্যিই হালকা করে টানা কাজল দিল মেয়েটা। আজ আরেকটা ভয়ানক কাজ করল। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিক টা দিলো ঠোঁটে। সাদা কুর্তিটার উপরে লাল রঙের ফুলের ডিজাইন করা ছিল। তাই লাল লিপস্টিক টা অনায়াসে মানিয়ে গেলো ধারা কে। সে তৈরী হওয়ার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে নিজেকে দেখলো। লজ্জায় সংকচুতি হতেও ভুলল না। আচ্ছা লোকটা কি তার দিকে তাকাবে? একবার বলবে কেমন লাগছে দেখতে? প্রশংসা আশা করা যেতে পারে বোধহয়!

বাড়ির বাইরে থেকে চেনা গাড়ির হর্ন শুনতেই চমকালো ধারা। বুঝলো শ্রাবণ চলে এসেছে, অপেক্ষা করছে তার জন্য। সালমা বেগম কে বিদায় জানিয়ে রীতিমতো দৌঁড়ে বের হলো ধারা। ওড়না সামলাতে সামলাতে উঠোনের সিড়ি বেয়ে নামার সময়টাতেই চোখ ফেরালো শ্রাবণ। তৎক্ষনাৎ তার হৃদয়, চোখ একসাথে থমকালো। ওড়না সামলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকা ধারার দিকে চুম্বকের ন্যয় চোখ আটকালো শ্রাবণের। যেন মুহূর্তেই সময় ভুলে গেল। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাত দুটো শক্ত হয়ে গেলেও চোখ সরাতে পারল না সে। সিঁড়ি বেয়ে নামছে ধারা। হালকা দুলতে থাকা সাদা কুর্তি, তার উপর সূক্ষ্ম লাল ফুলের নকশা, যা একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ওর লাল ঠোঁটের রঙে। চুলগুলো অবাধ্য ঢেউয়ের মত ছড়িয়ে পড়েছে কাঁধে থেকে কোঁমড়ে। বাতাসে দুলে দুলে কখনো গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে, কখনো কপালে নেমে আসছে। সেই ঢেউয়ের ভেতরে ধারার মুখটা যেন মেঘের আড়াল ভেদ করা পূর্ণচাঁদ, অপরূপ উজ্জ্বল, অথচ নিভৃত লাজুক।

শ্রাবণের বুকের ভেতর তীব্র ঢেউ তুলল সেই দৃশ্য। এই মুহূর্তে সে বুঝল, ধারা কোনো সাধারণ মেয়ে নয়, সে এক জীবন্ত সর্বনাশ। তাকে খু*ন করার এক সুখের যন্ত্রনাদায়ক অস্ত্র। একেকটা চুলের ঝাঁক, একেকটা দুলন্ত ভঙ্গি যেন লাইন পর লাইন লেখা হয়ে যাচ্ছে শ্রাবণের অন্তরে। চোখের দৃষ্টি আটকে গেল তার ওড়না সামলানোর ভঙ্গিতে। ইশ! এই ছোট্ট অস্থিরতা, এই গোপন তাড়াহুড়োর মাঝেও কতটা মায়া ছড়িয়ে দিল মেয়েটা! শ্রাবণের ঠোঁট ফাঁক হয়ে এল, চোখে অসহায় বিস্ময় জমল। হয়তো শ্রাবণ যদি কবি হতো, তবে এই এক দৃশ্য নিয়েই সারা জীবন লিখে যেতে পারত।

শ্রাবণের চোখের মণি নড়লো না, দৃষ্টি সরে গেল না এক চুলও। গাড়ির দরজা খুলাই ছিল। ধারা এসে ধীর গতিতে বসে পড়লো গাড়িতে৷ একবারো শ্রাবণের দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। অপেক্ষা করল একটুখানি প্রশংসার। গাড়ির ভেতরটা মুহূর্তেই যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শ্রাবণের চোখ যেন বের হয়ে আসছে বিস্ময়ে। দৃষ্টি আটকে আছে শুধু তার দিকেই। একবারও চোখ নড়ছে না, ঠোঁটও কাঁপছে না, কোনো শব্দই বের হচ্ছে না। কেবল তাকিয়ে আছে, অবিশ্বাসে, মুগ্ধতায়, আর এক অদ্ভুত মোহে।

আড়চোখে সবই টের পেল ধারা। বুকের ভেতর ঢাকের শব্দ যেন আরও জোরে বাজতে লাগল। সে লজ্জায় কুঁকড়ে গেল, তবুও মনে হলো ভেতরে ভেতরে একটু হাসি খেলছে ঠোঁটের কোণে। প্রশংসার চেয়েও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠল এই গভীর নিরব দৃষ্টি। এক মুহূর্তের জন্য ধারা মনে করেছিল হয়তো সে মনের মত সেজে আসতে পারেনি। কিন্তু আড়চোখে শ্রাবণের দৃষ্টি এলোমেলো করে ফেলল তাকে।
শ্রাবণ চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনে তাকালো। যখন ভাবলো নিজেকে শান্ত করবে, তখনই বাতাসে হালকা চুলের সুগন্ধ ভেসে এসে শ্রাবণের বুক ভরিয়ে দিল। গাড়ির ভেতর ছোট্ট এক দুনিয়া তৈরি হলো, যেখানে কোনো শব্দ নেই, শুধু দুজনের ভেতরের আলোড়ন আর চুপচাপ মায়ায় ভরা দৃষ্টি।
শ্রাবণ নিজেও জানে এখন যদি সে চুপ থাকে, হতে পারে মেয়েটা মন খারাপ করবে। সে কি আদৌও বুঝেছে যে শ্রাবণের বুকে কতটা তীব্র গতিতে ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। তা কি আর বুক চিঁড়ে দেখাতে পারে শ্রাবণ? তাই অন্য দিকে দৃষ্টি রেখে শ্রাবণ বলে উঠলো,

—” সুন্দর লাগছে তোমায়!”
শুধু ফর্মালিটির খাতিরে এটুকু বলল শ্রাবণ। সে তো আর মুখ ফুটে বলতে পারে না,
—” তোমায় ভয়ানক সুন্দর লাগছে ধারা। আমায় এলোমেলো করে দেয়ার মত সুন্দর, আমায় খু*ন করে দেয়ার মত সুন্দর! কাজলটানা চোখগুলো টানছে আমায়। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য আমি দেখতে পাচ্ছি! সৃষ্টিকর্তার সব সৃষ্টিই সুন্দর, কিন্তু আমার ধারা বোধহয় একটু বেশিই স্নিগ্ধ!”
নাহ, মুখ ফুটে এটা তো আর বলা হলো না। তাই তিন শব্দেই প্রশংসা বাণী শেষ করল শ্রাবণ। বড় করে শ্বাস নিয়ে গাড়ি চালানো শুরু করল। মনে মনে বারবার নিজেকেই বলল,— “কন্ট্রোল শ্রাবণ, কন্ট্রোল। মেয়েটা ছোট। সামলাতে পারবেনা।” রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি! ধারা ওসব বুঝলো না। শুধু তিন শব্দের ওই প্রশংসাবাণী শুনে মাথা নামিয়ে রাখলো।

শ্রাবণের গাড়ি এসে থামলো শহরের এক বিশাল শপিং মলের সামনে। চকচকে কাঁচের দেয়ালে রোদের আলো প্রতিফলিত হয়ে চারপাশে ঝিলমিল করছে। ধারা অবাক হলো। শপিং মলে কেনো?মনে মনে ভেবেছিল হয়তো কোনো পার্কে বা রেস্তোরাঁয় নিয়ে যাবে লোকটা। কিন্তু এখানে কেন? কিছু বলার আগেই শ্রাবণ ঠোঁটের কোলে হালকা হাসি টেনে নিজে থেকে বলল,

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২১

—” কিছু কেনাকাটা করতে হবে। নেমে এসো!”
ধারা দ্বিধা নিয়ে আস্তে করে গাড়ির দরজা খুলল। ওড়না ঠিক করতে করতে পা বাড়াতেই হুট করে শ্রাবণ এগিয়ে এলো। ধারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হাত বাড়িয়ে শক্ত করে ওর নরম আঙুলগুলো ধরে ফেলল। ধারার বুক ধড়ফড় করে উঠল। চোখ মেলে তাকাতে গেলেও পারল না, চোখ নামিয়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে। এত লোকের ভিড়ে শ্রাবণ শেখ কি না এমন অবলীলায় হাত ধরে ভেতরে টেনে নিচ্ছে! চারপাশে মানুষের আসা-যাওয়া, কোলাহল, কিন্তু ধারার কানে কেবল নিজের হৃদয়ের শব্দ বাজছে। শ্রাবণের হাতের মুঠোয় যে অদ্ভুত নিরাপত্তা, সেই অনুভূতিটাই তাকে স্তব্ধ করে দিল। মলের ভেতরে প্রবেশের সময় শ্রাবণ একবারও হাত ছাড়ল না। বরং আঙুলের চাপ সামান্য আরও বাড়িয়ে দিল।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২ (২)