শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২ (২)
অনামিকা তাহসিন রোজা
ধারা ভেবেছিল কেনাকাটা বলতে নিজের জন্য করবে শ্রাবণ শেখ। অথচ তাকে চমকে দিয়ে শ্রাবণ গেলো মেয়েদের শপিং সাইডে। ধারাকে পাশে দাঁড় করিয়ে একটা করে জামা হাতে নিয়ে দেখছে, আর প্যাক করতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ পর্যন্ত শাড়ি দুইটা, গাউন তিনটা, কুর্তি কয়েকটা নিয়েছে শ্রাবণ। ধারা ভেবে পেলো না এত কাপড় কে পড়বে? কিছু বলতে গেলেই শ্রাবণ রাম ধমক মারছে—”চুপ করো গাধা!”
নাহ! এসব তো মানা যায় না। ধারা এখনো ভেবেই পাচ্ছে না ব্যাপারটা। চারপাশে লম্বা সারি সাজানো মেয়েদের পোশাক, গ্ল্যামার ভরা আলো, কাচে ভেসে আসা নিজের প্রতিচ্ছবি, সব কিছুই তার জন্য যেন স্বপ্নের মতো অচেনা। সে তো ভেবেছিল, শ্রাবণ নিজের জন্য দামি শার্ট-প্যান্ট কিনবে। অথচ লোকটা নির্বিকার ভঙ্গিতে একের পর এক মেয়েদের জামা তুলে নিচ্ছে।
একটু পর একটা গাঢ় নীল শাড়ি হাতে নিল শ্রাবণ। দুই সেকেন্ড তাকিয়ে থাকল ধারার দিকে, তারপর হঠাৎই সেলসগার্লকে বলল,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—”প্যাক করে দিন।”
ধারা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার চেষ্টা করতেই শ্রাবণ পাশ ফিরে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
—”তোমাকে মুখটা বন্ধ রাখতে বলেছি, গাধা! কিছুই বলবে না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকবে।”
অবস্থা দেখে ধারার ভেতর অদ্ভুত রাগ জমতে লাগল, আবার ভেতরে ভেতরে কেমন যেন গলাও নরম হয়ে গেল। এতগুলো কাপড় সে পড়বে কবে? এগুলো দিয়ে গুলিস্তানে অনায়াসে একটা দোকান দেয়া যাবে! কিন্তু যতই ভাবুক না কেন, শ্রাবণের দৃঢ় ভঙ্গি দেখে কিছু বলতে সাহস পেল না। গাউন, কুর্তি, শাড়ি, একটার পর একটা পোশাক যাচ্ছেই প্যাকেটে। চারপাশের মানুষ এমন দৃশ্য দেখে হাসি চাপছে। মনে হচ্ছে যেন এই দম্পতির মধ্যে বউয়ের জন্য একতরফা শপিং চলছে।
কিন্তু শ্রাবণ এখানেই থামল না। ধারার দৃষ্টি এড়িয়ে একসময় সে ভেতরের এক বিশেষ সেকশনে ঢুকল, ওখানে পার্টি ড্রেসের প্রদর্শনী চলছে। লাইটের নিচে ঝলমলে একদম সাদা রঙের লম্বা ফ্লোয়ারি ড্রেস, গলায় মুক্তার কাজ, হালকা নেটের আবরণ।
শ্রাবণ কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ড্রেসটার দিকে তাকিয়ে থাকল। চোখে মৃদু হাসি ফুটল। এটা ধারা ছাড়া আর কারো গায়ে কল্পনা করা যায়? উহু! যায় না। সে কাউকে কিছু না বলেই সেলসম্যানকে ইশারা করল,
—”এটাও প্যাক করুন। গিফট র্যাপ করে দিন।”
ধারার চোখে পড়েনি, সে তখনো পাশের আয়নায় নিজের সাদাসিধে কুর্তিটা টানাটানি করছে। কিন্তু শ্রাবণের চোখে তখন ভবিষ্যতের ছবি। ধারার চুল এলোমেলো ভঙ্গিতে কাঁধে ছড়িয়ে, ঠোঁটে হালকা লাল লিপস্টিক, আর শরীরে এই সাদা ড্রেসের অনবদ্য মায়া। মনে মনে শ্রাবণ কেবল একটাই কথা বলল,
—” স্নিগ্ধ রমণী!”
শপিং শেষ হতে না হতেই শ্রাবণের দুই হাতে কয়েকটা ব্যাগ জমে গেল। ব্র্যান্ডেড কাগজের ব্যাগগুলোয় টানটান ভাঁজ, ভেতরে সাজানো নানান পোশাক। অন্য হাতে ধরা আছে ধারার হাত। মজবুত, দৃঢ় অথচ অদ্ভুত কোমল এক টান নিয়ে ধারার তুলতুলে হাতটা তার মুঠোয়। ধারা হাঁটছে তার পাশে। মুখে হালকা অভিমান। সে এখনো বুঝতে পারছে না, এত কিছু কিনলো কেনো? তবে এটাও ঠিক যে ধারার ভেতরে ভেতরে বুকের ভেতর আনন্দের ঢেউ খেলছে। প্রতি কদমে তার ওড়নার প্রান্ত দুলে দুলে শ্রাবণের কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছে। এভাবে মানুষটার পাশে হাঁটার সৌভাগ্য হবে ভেবেছিল কখনো? দুজনে শপিং মলের চকচকে করিডোরে এগোতে লাগল। চারপাশে কোলাহল, কেউ হাসছে, কেউ ব্যাগ হাতে বেরোচ্ছে, কেউ আবার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে।
শ্রাবণ একপাশে মাথা ঘুরিয়ে বলল,
—” চলো, কিছু খেয়ে নিই। এতক্ষণ ধরে ঘুরছো, ক্লান্ত লাগছে নিশ্চয়ই।”
ধারা হালকা মাথা নেড়ে রাজি হলো। ঠিক তখনই শ্রাবণের চোখ আটকালো এক ঝকঝকে জুয়েলার্স শপের সামনে। কাঁচের ভেতর রোশনাই ছড়ানো সোনার সেট, ডায়মন্ডের নেকলেস, চিকন বালা। শ্রাবণের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। কোনো পূর্বাভাস ছাড়া এক টানেই ধারার হাত চেপে ধরল। ধারা হকচকিয়ে বলল,
—”কোথায় নিচ্ছেন? খাবেন না?”
শ্রাবণ ঠোঁটে সামান্য হাসি টেনে দৃঢ় গলায় বলল,
—”আগে এটা।”
ধারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে সরাসরি জুয়েলার্স শপের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। সোনালি আলোয় ঝলমলে ভেতরে ঢুকতেই ধারা হাঁপ ছেড়ে থমকালো। চারপাশে শুধু অলংকারের ঝিকিমিকি, চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য। শ্রাবণ এখনো তার হাত ছেড়ে দেয়নি। দোকানের ভেতরে ঢুকেও এক মুহূর্তও না তাকিয়ে সে সেলসম্যানের দিকে সোজাসুজি বলল,
—“ নিউ লেটেস্ট কালেকশন দেখান।”
ধারার বুকের ভেতর ধপধপ করছে। এবার আবার কী করতে যাচ্ছে এই লোকটা! এসব আবার কেনো?
ভেতরের নরম হলুদ আলোতে গ্লাস টেবিলের ওপরে সারি সারি ঝলমলে নেকলেস, কানের দুল, আঙটির বক্স সাজিয়ে দিল সেলসম্যান। প্রতিটা গহনার গায়ে আলো পড়ে যেন আগুন জ্বলছে। ধারা চোখ কুঁচকে তাকাল। এতসব দেখেই বুকের ভেতর অদ্ভুত কেমন জানি কেঁপে উঠল। সত্যিই কি ওর জন্য? কিন্তু কেনো? কী দরকার এসবের? শ্রাবণ এক মুহূর্তও দেরি করল না। সামনে রাখা গয়নার ভেতর থেকে একজোড়া পাতলা, চিকন সোনার বালা হাতে তুলে নিল। বালাগুলোতে ছোট্ট লাল পাথর বসানো, আলোয় ঝিকমিক করছে। ধরা মাত্রই তার চোখ সরে গেল ধারার দিকে। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, ঠোঁটে অল্প বাঁকা হাসি টেনে বলল,
—”এটা কিন্তু তোমার হাতে মানাবে।”
ধারা এক ঝটকায় মাথা নাড়ল,
—” না না, এগুলো কেনার দরকার নেই। আমি গয়না পড়ি না। আপনি কেনো শুধু শুধু এত টাকা নষ্ট করছেন?”
শ্রাবণ হেসে বলল,
—” তুমি কী পড়বে, সেটা আমি ঠিক করব না। তবে আমি কী চাই, সেটা আমি জানি। চুপ থাকো!”
বলেই নিজের হাতে ধরে রাখা বালাটা এক মুহূর্তে ধারার কব্জিতে গলিয়ে দিল। ধারা হকচকিয়ে হাত টেনে নিতে চাইল, কিন্তু শ্রাবণের আঙুল শক্ত করে ধরে রইল। তার কণ্ঠস্বর নামিয়ে এনে প্রায় ফিসফিস করে বলল,
—” কথা শোনো, এই গয়নাগুলো তোমার জন্য নয়। পরোক্ষভাবে আমার জন্য। এগুলো যখন তোমার শরীরে তারার মত জ্বলজ্বল করবে, তখন আমার চোখ ভরে যাবে। তাই, না পড়ার অজুহাত দিও না।”
ধারার গাল হঠাৎ লাল হয়ে উঠল। বুকটা ধড়ফড় করছে, ঠোঁট কাঁপছে কিন্তু কোনো কথা বেরোচ্ছে না। আড়চোখে তাকিয়ে শুধু দেখল, শ্রাবণ একনাগাড়ে তার কব্জির বালার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।
এরপর সেলসম্যান আরও কয়েকটা নেকলেস বাড়িয়ে দিল সামনে। শ্রাবণ এবার একটি হালকা সোনালি চেইনে ছোট্ট লাল পাথরের লকেট পছন্দ করল। তারপর জিজ্ঞেস করল,
—” তোমার কোনটা পছন্দ হয়? নাও, পছন্দ করো!”
ধারা ভয়ে কেঁপে উঠল,
—”না, আমি পারব না…!”
শ্রাবণ হেসে এক পা এগিয়ে এলো, লকেটটা হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—” ঠিক আছে। আমার এটা পছন্দ হয়েছে, তাই আমি নিজেই পড়িয়ে দেব।”
ধারার নিঃশ্বাস গলায় আটকে গেল। দোকানের মাঝখানে, অচেনা মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে, তার কাঁপতে থাকা গলায় স্পর্শ নামিয়ে আনল শ্রাবণ। ঠান্ডা সোনার চেইনটা গলায় ছোঁয়ামাত্রই ধারার পুরো শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। চেইনটা ঠিক করে বসিয়ে শ্রাবণ দু’পা পিছিয়ে তাকাল। তার দৃষ্টি এতটাই গাঢ়, এতটাই মুগ্ধ, ধারার মাথা আরও নিচু হয়ে গেল।
শ্রাবণ ধীরে ধীরে হাসল, কণ্ঠে দৃঢ়তা আর অদ্ভুত কোমলতা মিশিয়ে বলল,
—”পারফেক্ট।”
ধারার মনে হলো, বুকের ভেতরটা আজ অদ্ভুত মায়ায় ভরে গেছে। এরপরে আরো কিছু কাচের শোকেস একটার পর একটা খুলে দিচ্ছে সেলসম্যান। নেকলেসগুলো একটার পর একটা সামনের টেবিলে সাজানো হচ্ছে, মুক্তার, সোনালি, রূপালি, রঙিন পাথর বসানো। ধারা নিঃশব্দে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা নেকলেসে। চিকন সোনালি চেইনের সঙ্গে লাল-সবুজ পাথর বসানো সূক্ষ্ম নকশা। যেন ফুলের পাপড়ি একটার ওপর আরেকটা সাজানো। চোখ সরাতে পারল না সে। শ্রাবণ পাশে দাঁড়িয়ে আড়চোখে লক্ষ্য করল। ঠোঁটে অল্প হাসি টেনে বলল,
—” ওইটা দেখাতে বলব?”
ধারা চমকে তাকাল। বুঝতে পারেনি বলে কিছু বলল না। তারপর বলল,
—” না না, আর কেনো দেখবেন? নিয়েছেন তো!”
তবুও সেলসম্যানকে ইশারা করলো শ্রাবণ। ইঙ্গিত পেয়ে নেকলেসটা বের করে রাখলেন তিনি। শ্রাবণ হাতে নিয়ে তাকিয়ে রইল। সত্যিই যেন ওর জন্যই বানানো। তখনই সেলসম্যান দাম বলল। সংখ্যা শুনে ধারার চোখ বিস্ফোরিত হওয়ার উপক্রম। মুখ লাল হয়ে গেল। এত দামের জিনিস সে কখনোই নেবে না। দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলল,
—” না না! এটা নিবেন না। আমার একদমই পছন্দ হয়নি।”
শ্রাবণ ভ্রু উঁচু করল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। শান্ত কণ্ঠে বলল,
—” কিন্তু আমার পছন্দ হয়েছে।”
ধারা বিরক্ত স্বরে বিড়বিড় করল,
—” ইশ! এমনভাবে বলছে যেন উনিই পড়বে এটা..!”
শ্রাবণও ধপ করে বলল,
—” আমি না পড়লেও আমার বউ পড়বে!”
বউ সম্বোধন টা শিহরিত করল ধারা কে। বউ কত মিষ্টি একটা ডাক তাই না? ধারার অবাধ্য মনে আবারো ডাকটা শুনতে আকাঙ্খা করল। তবে এই মুহুর্তে আগে শ্রাবণ শেখের এসব পাগলামি থামিয়ে কিছু বলার জন্য মুখ খুলল,
—” কিন্তু…!”
কিন্তু শ্রাবণ তার কথা কেটে দিল, দৃঢ় অথচ কোমল স্বরে বলল,
—” চলো, আয়নার সামনে দাঁড়াও। গলায় দিয়ে দেখো একবার। তারপর বলো পছন্দ হয়েছে কিনা।”
ধারার বুক কাঁপতে লাগল। চোখ নামিয়ে ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সেলসম্যান নেকলেসটা গলায় পরিয়ে দিতে সাহায্য করল। আলোয় ঝলমল করে উঠল তার ফর্সা গলা। শ্রাবণ দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে অবিরাম মুগ্ধতা, ঠোঁটে এক ফোঁটা হাসি। শুধু কয়েকটা তার মুখ থেকে বেরোল,
—” অদ্ভুত সুন্দর তো! ”
ধারার বুক কেঁপে উঠল। সে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখল, আর বুঝল, এটা সত্যিই তার গলায় অসাধারণ মানাচ্ছে। কিন্তু দামটার কথা মনে পড়তেই আবার মাথা নিচু করে ফেলল। শ্রাবণ বুঝে ফেলল সব। এবার একটু ঝুঁকে তার কানে ফিসফিস করে বলল,
—” দাম আমি দিচ্ছি, মানটা তুমি দিচ্ছ। হিসাব একদম সমান।”
ধারা ভ্রু কুঁচকালো, গলায় নেকলেস ঝলমল করছে। কিন্তু তার মুখের ভঙ্গি একেবারেই অন্যরকম। ঠোঁট কামড়ে নিচু গলায় বলল,
—” না, এটা আমি নেব না। অন্য কিছু দেখুন। আমার ভালো লাগেনি।”
কথা বললেও চোখের ভেতরের আলো গোপন করা গেল না। সে যেভাবেই আড়াল করতে চাইছে, চোখ দুটোতেই স্পষ্ট মুগ্ধতা লেখা আছে। কারন শ্রাবণ নেকলেসটা পছন্দ করেছে তার জন্য। আর সেই পুরুষের চোখের মুগ্ধতার লোভেই ধারার ইচ্ছে করল জিনিসটা নেয়ার। তবুও বলল না। শ্রাবণ হাত গুটিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল। তারপর হালকা ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
—” ধারা, মিথ্যে বলতে গেলে অন্তত চোখ নামিয়ে বলবে। চোখে পছন্দ লেখা, মুখে অপছন্দ। আমি কোনটা বিশ্বাস করব?”
ধারা এক ঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। বিরক্তি মেশানো গলায় বিড়বিড় করে বলল,
—” আমি তো বললাম, এটা একদম ভালো লাগেনি। দামটাও খুব বেশি।”
শ্রাবণ এবার আর শুনল না। সেলসম্যানের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল,
—”প্যাক করে দিন।”
ধারা হতভম্ব হয়ে গেল। হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল শ্রাবণের হাতের কাছে থাকা শার্টের অংশ,
—” এইটা কেনো নেবেন? আমি তো বলছি লাগবে না! এত কিছু তো নিলেনই! আপনি কি টাকার গাছ লাগিয়েছেন?”
শ্রাবণ ধীরে ধীরে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিল। এবার কণ্ঠস্বরটা অদ্ভুত শান্ত, অথচ একেবারেই দৃঢ়,
—” বিয়ের পর তো কিছু দিইনি তোমায়। এই নেকলেসটা বাসর রাতের উপহার ধরে নিতে পারো, আর বাকিগুলো স্বামীর দায়িত্ব থেকে কিনে দেয়া!”
ধারার মুখ লাল হয়ে উঠল। লজ্জা, সংকোচ, বিরক্তি সব একসাথে জমে বুক ধড়ফড় করতে লাগল। তবুও সে জোর করল না। নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুন্দর একটা বাক্সে নেকলেসটা গুঁজে এনে শ্রাবণের হাতে দিল সেলসম্যান। শ্রাবণ বাক্সটা হাতে নিয়ে তাকাল ধারার দিকে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি, চোখে তীক্ষ্ণ মায়া। ধারা মুখ নামিয়ে ফেলল। বুকের ভেতর অদ্ভুত আলোড়ন।
শ্রাবণ হুট করেই কিছু একটা ভেবে বলল,
—” এই ওয়েট, ওয়েট! তোমাকে আমি বাসর রাতের উপহার কেনো দেব? আমাদের তো বাসরই হয়নি, রাইট?”
ধারা এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে মাথা নামালো। এই বিষয়ে কোনো কথাই বলবে না সে। কোনোভাবেই না৷ শ্রাবণ নিজে থেকেই বলল,
—’ এটা এখন তোমায় দেব না। কিনে নিজের কাছে রাখছি। বাসর রাতেই দেব।”
ধারা নিজের করা পণ অনুযায়ী চুপ থাকলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবারো নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালো। কিন্তু হঠাৎ এবার দোকানের দরজা ঠেলে এক তরুণী ভেতরে ঢুকল। আয়নার প্রতিবিম্ব দিয়ে চেনা এক মুখ দেখল ধারা। চোখে-মুখে আলগা হাসি, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেই লুকোনো আছে ধারার জন্য হুমকির ছায়া। মেয়েটাকে দেখা মাত্রই বুকটা কেঁপে উঠল ধারার। নিঃশ্বাস আটকে এলো। এক মুহূর্তও দেরি না করে ধারা ঘুরে দাঁড়াল। কাঁপতে থাকা হাতে ঝট করে আঁকড়ে ধরল শ্রাবণের বাহু। যেনো আঁকড়ে ধরল তার একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। আঙুলগুলো কেঁপে কেঁপে শক্ত হয়ে গেল শ্রাবণের হাতায়।
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে অবাক হলো। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখল ধারা সাদা কুর্তির ভেতর কাঁপতে কাঁপতে তার বাহু আঁকড়ে ধরেছে। চোখ নিচু, ঠোঁট কামড়ে ধরা। ভেতরে ভেতরে আতঙ্কে জমে গেছে মেয়েটা। শ্রাবণ এক মুহূর্ত তাকাল দরজার দিকে। মেয়েটিকে চিনে ফেলল সে। চোখ সরু হয়ে এলো। ঠোঁটে এক ফোঁটা বাঁকা হাসি টেনে আবার ধারার দিকে তাকাল। নরম অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
—” ভয় পেও না, আমি আছি।”
ধারা চোখ তুলল না। বরং আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শ্রাবণের বাহু। বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি এতটাই বেড়ে গেছে, যেন বাইরে ছিটকে বের হবে। সেদিনের ঘটনা ভুলেনি ধারা। শ্রাবণ আস্তে করে নিজের অন্য হাতটা বাড়িয়ে তার আঙুলগুলো ধরল। নিঃশব্দে দৃঢ়ভাবে হাতের মুঠোয় নিল, যেন চারপাশের পৃথিবী উধাও হয়ে গেছে, শুধু তারা দু’জন আছে।
তন্নি নিজেও ভাবেনি এই দোকানে এসে শ্রাবণকে দেখবে, তাও আবার ধারার সাথে। সে নিজেও অনেক চমকে গেলো। কিন্তু নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্য এক নারীকে সহ্য হলো না। তন্নি ভেতরে ঢুকে দুই-একটা গয়নার দিকে তাকানোর ভান করল। কিন্তু চোখ একটুও স্থির থাকল না সেই গয়নার উপর। চোখ আটকে গেল শ্রাবণের দিকে। আর ঠিক তার পাশে, শ্রাবণের বাহু আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ধারা।
এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস যেন থমকে গেল তন্নির। ঠোঁটের কোণে আড়ষ্ট হাসি জমে গেল, যা জোর করেও আর টেনে ওঠাতে পারল না। ভেতরটা ঝড়ের মতো কাঁপছিল, কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে নিস্পৃহ ভাব ধরে রাখল। তবু চোখগুলো বারবার ছুটে যাচ্ছিল ধারার দিকে। প্রতিবারই সেই দৃষ্টি ছিল অস্বস্তি ভরা, বিদ্বেষে ঠাসা। যেন চোখ দিয়েই ধারাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে। ধারা ঠোঁট কামড়ে নিচু হয়ে গেল, অনুভব করল তন্নির সেই দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা। বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি আরো বেড়ে গেল। হাতের চাপটা আরও শক্ত করে দিল শ্রাবণের বাহুর উপর। কিন্তু তন্নি কিছু বলল না। ঠোঁট একবার শক্ত করে চেপে ধরল, দৃষ্টি নামাল আবার তুলল, প্রতিবারই ধারার দিকে।
এমন ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকানো যেন একেকটা তীর ধারার বুক চিরে ঢুকে যাচ্ছে।
শ্রাবণ কেবল একবার তন্নির দিকে তাকাল। চোখে রুক্ষ কড়া দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল, তারপর নির্বিকারভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল। যেন সে এই মুহূর্তে শুধু একজনকেই দেখতে চাইছে, তার পাশে দাঁড়িয়ে কেঁপে ওঠা মেয়েটাকে। তবে, শ্রাবণ খুব ভালো করেই বুঝতে পারল তন্নির চোখের ভাষা। একেকটা দৃষ্টি যেন ধারাকে বিদ্ধ করছে। কিন্তু সে দৃষ্টি সহ্য করবে কেনো? তার পাশে দাঁড়ানো ছোট্ট মেয়েটার হাত এখনো শক্ত করে আঁকড়ে আছে তার বাহু। বুকের ভেতর সেই কম্পন, লজ্জা, ভয় সবই শ্রাবণ অনুভব করছে। সে মুহূর্তে কোনো দ্বিধা না করে, শ্রাবণ নিজের বাহু থেকে হাত সরিয়ে নিলো না। বরং একটুখানি ঝুঁকে, নরম অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে নিজের বাহুটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল ধারার কোমরের কাছে।
ধারার শরীর কেঁপে উঠলো। লাল হয়ে উঠল গাল। বিস্ফারিত চোখে একবার শ্রাবণের দিকে তাকালো। শ্রাবণ নির্বিকার, ঠোঁটের কোণে হালকা তৃপ্তির রেখা। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ধারার চুল সরিয়ে দিল কাঁধ থেকে, গলার কাছে পুরোনো চেইনটা ঠিকঠাক করে দিল, যেন সে-ই একমাত্র অধিকারী এই মুহূর্তে।
তন্নি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। সেই দৃশ্যের প্রতিটি ভঙ্গি তার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে সরে গেল মুখটা, কিন্তু চোখ ফেরালো না। ঘৃণা, ব্যথা আর হিংসার মিশ্রণে তার বুক ফেটে যাচ্ছিল। শ্রাবণ এক মুহূর্তের জন্য আড়চোখে তাকাল তন্নির দিকে, অবজ্ঞা মেশানো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তারপর মৃদু স্বরে, ঠিক ধারার কানের কাছে ঝুঁকে বলল,
—” চমৎকার মানিয়েছে আমাদেরকে একসাথে! আয়নায় দেখো!”
ধারা ভেতরে ভেতরে গলে যাচ্ছিল। কিন্তু বাইরে থেকে একচুলও নড়ল না, শুধু চোখ নামিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল ঠোঁট। এরপর সত্যি সত্যি আয়নায় তাকালো। আসলেই তাদেরকে অনেক সুন্দর লাগছে। পাশাপাশি নিজেদের দেখে বুকটা যেন সিক্ত হলো বৃষ্টিতে। ধারা নিজেকে দেখলো না। তবে পাশে দাঁড়ানো মানুষটা কত সুন্দর তাই না? আদৌও তার মত মেয়ে কে এই অসম্ভব সুন্দর মানুষটার পাশে মানিয়েছে?
তন্নির চোখে এবার অদ্ভুত এক পরিবর্তন এলো। ঘৃণায় ভরা দৃষ্টি হঠাৎই নরম হয়ে গেল। অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল তার চোখের কোণ। যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়তে বসেছে, প্রিয় মানুষকে অন্য নারীর পাশে দেখে বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। কিন্তু সেই একই সঙ্গে ভেতরে লুকোনো কামনা জেগে উঠল। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নামলো শ্রাবণের গলায়, প্রশস্ত কাঁধে, তারপর বুকের উপর। অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা ভরে গেল চোখে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে কামনাময় একটা বাঁক খেলল। সে চোখ ফেরাতে পারছিল না। শ্রাবণের প্রতিটা ভঙ্গি, প্রতিটা নড়াচড়া যেন তাকে টেনে নিচ্ছিল গভীর অন্ধকারে, যেখানে শুধু লোভ, কামনা আর অধিকারবোধ।
শ্রাবণ খুব স্পষ্টই টের পেল সেই দৃষ্টি। কিন্তু নির্বিকার ভঙ্গিতে একটুও পাত্তা দিল না। বরং একচুল ঝুঁকে ধারার গলায় আঙুল বুলালো। সেই দৃশ্য যেন তন্নির বুকের ভেতর দাউ দাউ করে আগুন ধরিয়ে দিল। আর শ্রাবণের আঙুলের স্পর্শ পেয়ে ঢোক গিলল ধারা।সে প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তন্নির দৃষ্টি বারবার শ্রাবণের শরীরে নেমে আসছে দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল। সে নিজেও জানত না কেনো হঠাৎ মনটা ভারী হয়ে গেল। শিশুসুলভ অভিমান জমে গেল চোখে। আস্তে আস্তে মুখ ঘুরিয়ে আড়চোখে তাকালো শ্রাবণের দিকে। ওর চোখে ঝলমল করছিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন, আপনি শুধু আমার না?
ধারার ঠোঁট ফুলে উঠল, কপাল ভাঁজ পড়ল। মনে হলো একেবারে ঈর্ষায় জর্জরিত হয়ে বসেছে। অথচ কোনো কথা বের হলো না। বুকের ভেতর কেমন হাহাকার জমে উঠল। শ্রাবণ অনুভব করছিল সেই অভিমানী দৃষ্টি। সে বুঝতে পারল, ধারার চোখে এখন কেবল ছোট্ট শিশুর মত অধিকারবোধ। যেন সারা পৃথিবীর সবকিছু ভাগ করা যাবে, কিন্তু শ্রাবণ শেখ কেবল তারই হবে, অন্য কারো নয়। ভালো লাগলো শ্রাবণের। কিছু বলল না।
শ্রাবণ একটা জিনিস খেয়াল করেছে। শপিং করে বের হওয়ার পর থেকেই ধারার মনটা ভীষণ খারাপ। শ্রাবণ ভেবে নিল তন্নিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে দেখে ধারার মন ভালো নেই। তাই এটা-সেটা বলে বোঝালো, কিন্তু বুঝলো না মেয়েটা। হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে আবারো মুখে অন্ধকারের চাদর চেপে ধরল। আজ আর শ্রাবণ অফিসে গেলো না। আজকের জন্য বাড়িতেই রয়ে গেলো। তাই ফিরেই দুপুরে ঘুমিয়ে গেলো সে।
এদিকে খাওয়ার পর্ব শেষ করে ধারা গেলো সালমা বেগমের কাছে। দামি দামি শাড়ি, গয়না গুলো দায়িত্বের সাথে নিজে থেকে তুলে দিল শ্বাশুড়ির হাতে। প্রথমে নিতে চাইলেন না সালমা বেগম, অবাক হলেন ধারার এমন আচরণে। কিন্তু ধারা বলল,
—’ এত দামি দামি জিনিস যত্ন করতে পারব না মা। আপনি নিজের কাছে রেখে দিন। আমার যখন প্রয়োজন হবে, তখন চেয়ে নেব!”
অবাক হলেন সালমা বেগম। বারবার বললেন,
—” এসব তোর জিনিস ধারা। আমি কেনো রাখব বল? নিজে থেকে এসব গোছানো শিখবি না? একটা সময় তো তোরও অনেক দামি দামি শাড়ি, গয়না হবে। সব তো গুছিয়ে রাখা শিখতে হবে!”
ধারা মৃদু হেসে বলল,
—” যতদিন আপনি আছেন, ততদিন আমি কেনো এসব নেব মা? আপনার কাছ থেকে আগে সংসারটা আগলে রাখা শিখে নিই, তারপর এসবও শিখে যাব। দেখবেন, একদিন আমিও আপনার মত দায়িত্বশীল হবো। কিন্তু এত দামি দামি জিনিস নিজের কাছে রাখার মত বুদ্ধি, যোগ্যতা কোনোটাই নেই আমার।”
সালমা বেগমের চোখ জ্বলজ্বল করল। ধারা আবারো বলল,
—” আপনি তো আমার মা। মায়ের কাছেই তো সন্তানের সব কিছু গুচ্ছিত থাকে। আপনিও না হয় এসব গুচ্ছিত রাখুন। আপনি থাকতে এসব নিজের কাছে রাখাটা আমার কাছে খুব নিচু মন-মানসিকতার উদাহরণ মনে হচ্ছে মা। হয়তো এই মনোভাবকে গেঁয়ো বলবেন। তবে সত্যিই, গ্রামের মেয়ে বলেই এমন মনোভাব হয়ে গেছে!”
সালমা বেগম চোখে পানি নিয়ে হাসলেন। গ্রামের মেয়ে হয়েও কত সুন্দর উদার মন-মানসিকতা! কত সুন্দর বিনয়ী আচরণ! এমন মেয়ের সাথে কি কোনো শ্বাশুড়ি খারাপ আচরণ করতে পারে? কখনোই না। বরং তখন শ্বাশুড়ি নামক মহিলাটি নিজেই নিজের কাছে ছোট হয়ে যায়। মন টা চায়, মেয়েটাকে বুকের মধ্যে আগলে রেখে নিজের সবকিছু দিয়ে দিতে। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিলেন সালমা বেগম।
দুপুরের পর শ্রাবণ ঘুমিয়েছিল। তাই সালমা বেগমের রুম থেকে এই ঘরে আসতেই ধারা দেখলো লোকটা গভীর ঘুমে ব্যস্ত। কী যেন ভাবলো ধারা। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল মেঝেতে। হাত বিছানায় রেখে মাথা নামালো খানিকটা। অনিমেষ তাকিয়ে রইলো শ্রাবণের ঘুমন্ত মুখটার দিকে। ইশ! কত সুন্দর লাগছে মানুষটাকে। একটা ঘুমন্ত মানুষকে সর্বদাই নিষ্পাপ বাচ্চা মনে হয়। শ্রাবণকেও তেমনটাই মনে হচ্ছে। এলোমেলো চুল, সরু নাক চিকচিক করা, চোখের পাতা, স্থির ঠোঁটজোড়া, শক্ত চোয়াল, সবকিছুই কত মোহময়! ধারা ঠোঁট কাঁমড়ে নিজের মাথা এলিয়ে দিল শ্রাবণের পাশেই। মেঝেতে বসেই সেভাবে মাথা রেখে দেখতে থাকলো শ্রাবণকে।
শ্রাবণের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই এসির মধ্যেও মানুষটা ঘেমে গেলো কেনো কে জানে? কাঁধের ওড়নাটা ডান হাতে নিয়ে খুব আলতো করে ঘামটা মুছে দিল ধারা। এরপর আবারো তাকিয়ে দেখলো, শ্রাবণের সরু নাকটা। এক আঙুল দিয়ে খানিকটা ছুঁয়েও দেখলা সেটা। তারপর আঙুলটা পাশে এনে গালটাও একটু ছুঁয়ে দিল। খানিকক্ষন বাদে লোকটার চোখের পাতা কাঁপতে দেখে একটু বিচলিত হলো ধারা। হাতটা সরিয়ে নিতে চাইলো। কিন্তু তখনই ফট করে চোখজোড়া খুলল শ্রাবণ শেখ।
চমকালো ধারা। আঙুল টা শ্রাবণের গাল থেকে সরিয়ে নিতে চাইলেও পারল না। খপ করে চোরা চোখে তাকানো ধারা কে ধরে ফেলল। মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠে আধো আধো চোখ খুলে, অথচ এই লোক ফট করে কীভাবে জেগে উঠলো ভেবে পেলো না ধারা। একবার শ্রাবণের হাতের মুঠোয় আটকে থাকা আঙুলটা দেখলো সে। এরপর শুকনো ঢোক গিলে তাকালো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ মুখ কুঁচকে ঘুমঘুম স্বরে বলে উঠলো,
—” এভাবে তাকিয়ে আছো কেনো?”
এক মুহুর্তের জন্য অভিমান হলো ধারার। আজ শপিংমলে যখন তন্নি শ্রাবণকে অনেক গভীর দৃষ্টিতে দেখছিল। সেই মুগ্ধতার আকর্ষণের দৃষ্টি মোটেই সহ্য হয়নি ধারার। কই? তখন তো লোকটা ওই মেয়ে টাকে কিছু বলেনি। তবে এখন কেনো তাকে বলছে? হুট করেই পৃথিবীর সমস্ত সাহস একত্রিত করল ধারা। ঠোঁট উল্টে কান্নার মত করে ঘনঘন শ্বাস নিতে নিতে বলল,
—” আমি আমার বিয়ে করা স্বামীর দিকে তাকিয়েছি। এতে আপনার কী যায় আসে? তাকিয়ে আছি, বেশ করেছি! অকারনেও তাকানোর অধিকার আছে আমার!”
এক পলকেই ঘুম পুরোপুরি উড়ে গেলো শ্রাবণের।
—” তুমি? তুমি এই কথা বলছো? ওয়াও, জোস তো! নাহ, ঠিক আছে। আসলেই অধিকার আছে। কিন্তু কেনো তাকিয়েছো, সেটা জিজ্ঞেস করলাম। তুমি তো অকারনে কিছুই করোনা, তাই….!”
শ্রাবণের কথা শেষ করতে দিলো না ধারা। আরেকটু তেঁতে উঠে বলে উঠলো,
—” ওই মেয়েটা যখন অত গভীর চোখে তাকিয়ে ছিল, তখন তো গিয়ে ওকে কারন জিজ্ঞেস করেন নি। তবে আমার বেলাই কেনো করলেন? ও দেখতে সুন্দর বলে, ওর চাহনি ভালো লাগছিল? তাই মানা করেন নি?”
শ্রাবণ অবাকের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো। সে এক ঝটকায় শোয়া থেকে উঠে বসলো। মেয়েটা পাগল হলো কিনা চেক করতে হবে! নাকি কিছু খেয়ে এসেছে। এই ফাঁকে শ্রাবণের হাতের মুঠোয় থাকা আঙুলটাও ছাড়িয়ে নিল ধারা। ধারার লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে শ্রাবণ এক ভ্রু উঁচিয়ে ঠোঁট কাঁমড়ে হাসি আটকে বলল,
—” আর ইউ জেলাস, মিসেস শেখ?”
ধারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। এরপর ঝড়ের গতিতে দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,
—” মোটেই না!”
—” আরেহ আস্তে! এতো জোরে মাথা ঝাঁকালে তো খুলে পড়ে যাবে!”
মিটিমিটি হাসলো শ্রাবণ। তার খুনসুটিতে বিরক্ত হলো ধারা। চলে যেতে চাইলে ফট করে ধারাকে টেনে বিছানায় নিজের পাশে বসালো। কানের কাছে চুল গুঁজে দিয়ে বলল,
—” তোমার কি জ্বলছে, সোনা?”
ধারা দুদিকে মাথা নেড়ে না বোঝালো। মেয়েটা এতই রেগে আছে যে, শ্রাবণ যে তাকে আদুরে ভঙ্গিতে সোনা বলে ডেকেছে সেটা শুনতে পেলো না। তবে এবার শ্রাবণও অন্য জায়গায় মনোযোগ দিল। ধারার কানের কাছে চুল গুঁজে দেয়ায় গলাটা বেশ কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছে শ্রাবণ। তখনি চোখ পড়লো, ধারার গলার পাশে স্থান পাওয়া চিকচিক করতে থাকা লাল তিলটাতে। ঢোক গিলল শ্রাবণ। চুম্বকের ন্যয় তিল টা টানছে তাকে। ঘোর লাগানো দৃষ্টি টা দেখতে পেলো না ধারা। সে তো ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হতে ব্যস্ত!
শ্রাবণ এতটাই ঘোরে চলে গেলো যে, কিছুই মনে রইলো না তার। অনিয়ন্ত্রিত হাতটা নিজে থেকেই উঠে এলো নরম গলাটার কাছে। আলতো করে ছুঁয়ে দিলো লালরঙা তিলটা। প্রিয় পুরুষের শিহরণ জাগানো হাতের স্পর্শে কেঁপে উঠলো ধারা। চোখ বুঁজে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালে আবারো হাত টেনে ধরে শ্রাবণ। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
—” কোথায় যাচ্ছো?”
—” পাশের ঘরের বারান্দায়। বাগানের গাছ গুলোতে পানি দিতে হবে!”
ধারা পুরো কথাটাই অন্যদিকে চোখ রেখে বলেছে। নিতান্তই অযুহাত! শ্রাবণের দিকে তাকানোর সাহস নেই। মনে ঝড় উঠেছে বেসামাল গতিতে। অনাকাঙ্ক্ষিত ছোঁয়াটা আশার বাইরে ছিল।
অথচ পুরো সময়টাই শ্রাবণের চোখ ছিল অন্য কোথাও। খুব সূক্ষ্ণ সেই নেশালো দৃষ্টিটা গাঢ় হতেই শ্রাবণ আবারো ঢোক গিলল। ভুল কিছু হয়ে যাবে বেশিক্ষণ সেই দিকে তাকালে। তাই ধারার গলা থেকে চোখ সরিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,
শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ২২
—” তোমার গলার লাল তিলটা ভীষণ সুন্দর! ”
তৎক্ষনাৎ কেঁপে উঠলো ধারা। লজ্জায় সংকুচিত হলো মন-প্রাণ-শরীর। শ্রাবণ বুঝলো মেয়েটার উৎকন্ঠা। তাই ঠোঁট কাঁমড়ে হেসে ছেড়ে দিল হাতটা। ছাড়া পেতেই ঝড়ের ন্যায় দৌঁড়ে পালালো ধারা। শ্রাবণ অপলক চেয়ে চেয়ে দেখলো নিজের প্রেয়সীর ছুটে চলা! অনুভব করল একরাশ মায়া! উপলব্ধি করল অদ্ভুত এক নেশা, যা অন্য কিছুতে কাটবে না। হয়তো ওই গলার লাল তিলটায় একবার গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিলে খানিকটা শান্ত হবে ব্যাকুল নেশায় মত্ত মনটা!
