স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৬
সানজিদা আক্তার মুন্নী
তৌসির, রুদ্র, নাযেম চাচারা পাল বেঁধে সবাই বাড়ির সদর দরজা পার করেন। এই কয় দিনের ভেতর ইকরা আর ধ্রুবের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামী পরশু তাদের বিয়ে ধার্য করা হয়েছে। বিয়ে উপলক্ষে গীত-গান বাজতেছে বাড়িতে। বিকেলের সময় এখন, গ্রামের মহিলারা একে একে এসেছেন বাড়িতে নাচ গান এসবে তাল দিতে। বাড়ি ভর্তি আজ মহিলা মানুষ।
তৌসিররা ঢুকতেই কিছু মানুষ আতংকে আঁতকে উঠেন। আর উঠারই কথা, কারণ তৌসিরের হাতে একটি রশি ধরা, যেটা একটা সিংহের বাচ্চার গলার সাথে বাঁধা। তৌসির সিংহ পুষে তবে বাড়িতে নয়, কুঠিরে। এটা তার সিংহ আর সিংহির বাচ্চা। এটাকে আজ সে নিয়ে এসেছে বাড়িতে। এর নাম ওরা সবাই মিলে দিয়েছে ‘প্রিন্স’। প্রিন্স মানুষখেকো না, তবে সে বেশ চঞ্চল জাতের। যেমনটা তার কর্তা, তেমনটাও সে। তৌসির রশি বেঁধে এনেছে কারণ ও লাফালাফি করে বেশি। দাদাজান সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, কিন্তু এই পরিস্থিতি দেখে উনি তৌসিরকে বকে ওঠেন, “হালা মগা! এইডা সরা।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তৌসির সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ভয় পাইয়েন না আফনারা, এইটায় কারো কোথাও গুতা দিত না। এইটা ভদ্র জাতের প্রাণী।”
সিমরান তৌসিরের পাশ দিয়ে চায়ের ট্রে নিয়ে যাচ্ছিল। তৌসিরের মুখের ভাষা শুনে ও নাক মুখ ছিটকে ওঠে, “কথায় কথায় গালি দেওয়া ছাড়া তুমি আর কিছু পারো না ভাইজান?”
তৌসির সিমরানের কথায় ওর দিকে গ্রীবা হেলিয়ে তাকিয়ে বলে, “আমি মিসকিন মানুষ। গালি ব্যতীত আমার কাছে কিছু দেওয়ার নাই, তাই আমি কথায় কথায় গালিই দেই।”
তৌসিরের কথায় সবাই হেসে ওঠেন। সিমরান আর কিছু বলে না। তৌসিররা প্রিন্সকে নিয়ে বসার ঘরের এক কোণে সোফায় গিয়ে বসে। ইনডোরে খেলার বিষয় নিয়ে আলাপ করতে থাকে। তাদের এইসব আলাপের মাঝখানেই ওর কানে আসে বিবিজানের একটা কথা। আর তা হলো, উনি গ্রামের মহিলাদের বলছেন, “এই দেখ্যাহ আমার তৌসিরের বউ। একদম রুপে রুপাঞ্জনা আনছি আমার নাতির লাগি বাইছা। দেখো, নাক-মুখ এক্কেরে চুরির মতো ধার।”
এটা শুনে তৌসির আর কথা বলতে পারে না তাদের সাথে। মন কচ করে ওঠে এই কথায়। জানান দেয় তার নাজহা এখানে এসেছে। পিছনে ফিরে সে সেই দিকে তাকায়। দেখে নাজহা হাতে সুপারির তালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবার সামনে। আজ নাজহা একটি গাঢ় পান্না সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে। কামিজের গলা, হাতার কাফ এবং নিচের অংশে রূপালী সুতোর কাজ করা। মাথায় ড্রেসের সাথে মিলিয়ে একি কালারের সিল্ক অর্গানজা বড় দোপাট্টা টানা।
তৌসিরের চোখের অবাধ্য চাহনি, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি আটকে গেছে তার সবুজ বাঘিনীর ন্যায়। আর পারছে না সে তা ফিরাতে। নাজহা খুব শান্তভাবে কথা বলছে সবার সাথে। কথা বলতে যে যা জিজ্ঞেস করতেছেন, তাই হ্যাঁ-না মাথা নাড়ছে। তৌসিরের কানে আসছে নাজহার প্রশংসা গাওয়া কথা। এক বৃদ্ধা কাশতে কাশতে বলছেন, “নূরজাহান, নাতির বউ তো আনো নাই ঘরে, আনছো তো দেখি চান্দের টুকরা! আইজকাইল এমন সুন্দর মাইয়া পাওয়া তো সাত কপালে ভাইগ্য। তোমার নাতির নিয়তিতে তো আটকে গেছে এমন হুর।”
আরেকজন বলে ওঠে, “এমন আসমানের চাঁদের মত সুন্দর মাইয়া তো মশাল দিয়া খুঁজলেও পাইতা না। চোখ দুইটা সবুজ না হইলে আরো সুন্দর লাগতো।”
শেষের কথাটা তৌসিরের খুব গায়ে লাগে। যেই চোখের চাহনিতে তৌসির ঘায়েল, সেই চোখ না হলে ভালো হতো? বাঙ্গালী তো খুত ধরবেই। তৌসিরের রাগ হয়, খুব রাগ হয়। এর মাঝেই কেউ একজন বলে, “নয়া বউয়ের হাতে তো দেহি মেহেদী-টেহেদী নাই। আনো লাগাইয়া দেই। দেবরের বিয়া উপলক্ষে সেও একটু পরে নিক।”
বিবিজান সহমত পোষণ করে হেসে বলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, লাগাও লাগাও। আমার নাতির নাম হাতে লেইখা দাও এক্কেরে গাঢ় কইরা।”
এ বলে বিবিজান নাজহার হাতে ধরে টেনে এনে সবার মাঝখানে সোফায় নাজহাকে বসিয়ে দেন। নাজহার সারা অঙ্গ ঝলসে যাচ্ছে এসবে। সে কিছু করতে পারতেছে না ইজ্জতের ভয়ে আর প্রাণের ভয়ে। বিবিজান ওকে তৈরি করিয়ে নিয়ে এসেছেন। এখানে আসার আগে জব্বর হুমকি দিয়ে নিয়ে এসেছেন। তালাতে মেহেদী নিয়ে আসে সিমরান। নাজহার কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে এই অত্রকাহিনিতে। ভালো লাগছে না তার এগুলো, একদমই না। নাজহার মানসিক অবস্থা বিপর্যয়ের চরমে। সকাল বেলা যে হাত লাল করেছে রক্তে, সে হাত এখন লাল করবে মেহেদীতে? তাও তৌসিরের নাম দিয়ে? নাহ! নাজহার পক্ষে এ সম্ভব নয়। নাজহা এই বিপর্যয় থামানোর বৃথা চেষ্টায় মাথা নিচু করে আমতা-আমতা করে বলে, “আ… আজকে থাক। বিয়ে বাড়ি অনেক কাজ, আমি আম্মা-চাচীআম্মাদের সাথে একটু সাহায্য করি গিয়ে কাজে।”
বিবিজান ওর বাহানা বুঝে বিরক্ত হয়ে হালকা ধমকেই বলেন, “তোর কাজ করতে হবে না নয়া বউ তুই! তোর কাজ কি? তুই মেহেদী পর।”
এ বলে বিবিজান গ্রামের দুইজন মহিলার দিকে তাকিয়ে বলেন, “সাদিয়ার মা আর সোফিয়ার মা, লাগাও তো সুন্দর মেহেন্দি আমার নাতবউয়ের হাতে।”
বিবিজানের কথায় সেই মহিলারা মাথা নেড়ে হেসে বলেন, “সে তো লাগিয়ে দিচ্ছি।”
এ বলে উনারা নাজহার সামনে এসে বসে পড়েন দু পাশে দুইজন। আর বলেন, “হাত দাও তো মা।”
নাজহা আর কি করবে? নিজের দুই হাত বাড়িয়ে দেয়। বিতৃষ্ণায় গা গুলাচ্ছে ওর। নাজহা মুখ তুলে চারপাশে একবার তাকায়। তখনি তার চোখ পড়ে তৌসিরদের দিকে, যেখানে রুদ্র স্পিকার সেট করতেছে গান বাজানোর জন্য। সবাই হাসি ঠাট্টায় মেতেছেন, কিন্তু তৌসির এসবের কিছুই করছে না। সে এক মোহবিষ্ট নেত্রে নাজহার দিকে তাকিয়ে আছে। তৌসিরের এই চাহনিতে নাজহার অন্তরের অন্তস্তল মুচড়ে ওঠে। আগে যখন তৌসির ওর পানে এভাবে তাকাতো, নাজহা মনে করতো তৌসির হয়তো তাকে ভালোবেসেই এভাবে তাকাচ্ছে। কিন্তু তার এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল, সম্পূর্ণ ভুল। তৌসির তাকে ভালোবাসেনি, আপন ভাবেনি। এতদিন যাই করেছে সবি ধোঁয়াশা ছিল, সবি ধোঁয়াশা। এইটা ভেবে নাজহার বড্ড কষ্ট হচ্ছে, বড্ড বেশিই কষ্ট হচ্ছে। কি করে পারলো তৌসির ওকে দিয়ে খুন করাতে? এতটা নিচু কাজ কিভাবে করলো?
নাজহা তৌসিরের থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়। আর তাকায় না তৌসিরের পানে। আর কখনো তাকাবেও না, এটাই শেষ তাকানো। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যতদিন তৌসিরের বন্দিনী হয়ে থাকবে, ততদিন সে তৌসিরের সাথে না বলবে কথা, আর না তার দিকে তাকাবে। তাকাবে না সে এই মানবের দিকে, যে তাকে আটকে রাখার জন্য হাজার পথ থাকা সত্ত্বেও নিকৃষ্ট একটা পথ বেছে নিয়েছে। যে নিজের বিবিজানের কথায় তাকে মেরেও ফেলতে পারে! নাজহা যখন তৌসিরের দিকে চেয়েছিল, অতিশয় শান্তি অনুভব করেছিল তৌসির তাতে। কিন্তু যখন সে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে ঘৃণ্য তাচ্ছিল্যে, তখন মনে হয়েছে একটা ঘৃণার পাহাড় তৌসিরের বুকে ধ্বসে পড়েছে। মেহেদী দিয়ে নাজহার ডান হাতের পাতায় লেখা হয় ‘তৌসির’ আর বা হাতের পাতায় লেখা হয় ‘মেয়র সাব’। নাজহা এক দৃষ্টিতে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রয়। কি ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সে পড়লো! নিজের খুঁড়া খাদে আজ নিজেই পড়ল, খুব বিধ্বস্ত ভাবে পড়ল। যে মানুষটা নিজ স্বার্থে তাকে খুনি বানালো, যে মানুষটাকে সে ঘৃণা করে, তার নামই হাতে লিখতে হচ্ছে। আর সেটা নীরবে তাকে দেখতে হচ্ছে। গ্রামের মহিলারা টুকটাক গান গীত গাইতেছেন। তারই মাঝে স্পিকারে রুদ্র বাজিয়ে দেয়:
একবার খইলাউ, তুমি রাজি
আমি ঘটক পাঠাইমু,
তোমায় লইয়া আমি
সারা সিলেট শহর ঘুরাইমু।
আমেরিকা, প্যারিস শহর
যাইমু যাইমু রে লন্ডন
মিডিল ইস্টর সব দেশ ঘুরমু
খালি আমরা যে দুইজন।
তোমার লম্বা মাত খান থও,
লম্বগিনি গাড়ি লও
এত হস্তায়নি ফাইলাইতায়
আমার মন।
সোনা পাখি গো আমার,
লক্ষ্মী পাখি গো
আমি দেশে দেশে ঘুরি
আমার ময়নার লাগি গো।
আমার প্রেমর সাগর গো,
আহ্লাদের টুখরা গো
আমি মন দিমু,
দিল দিমু তুমি খতা রাখলে গো।
সেদিক সামলিয়ে তৌসিরের পাশে এসে বিবিজান দাঁড়ান। এতে নাজহা আড়াল হয়ে যায় তৌসিরের দৃষ্টি হতে। তৌসির বিবিজানের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আমার ছিনাল ফ্যাত ফ্যাত করতেছে না তো আর?”
বিবিজান আলতো মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেন, “না, এক ডোসে ঠিক হয়ে গেছে!”
তৌসির আবারো জিজ্ঞেস করে, “ভাত খাইছে?”
“হু খাইছে। জ্ঞান ফিরার পর ঝাড়ি হুমকি দিয়া বুঝাইয়া গোসল করাইছি, ভাত খাওয়াইছি। এখন এসব বাদ দে, লিস্ট লেখ।”
তৌসির ভ্রু কোঁচকায়, “কিতার লিস্ট?”
বিবিজান নুহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “নুহমান লেখ, কাপড়ের বাজারের লিস্ট। ঘরের লাইগা। আগে লুঙ্গি আর সেন্ডু গেঞ্জির হিসাব কর।”
নুহমান বলে, “খাতা কলম নিয়া আইতেছি।”
“নিয়ে আয়।”
তৌসির লুঙ্গি গেঞ্জির কথা শুনে মিনহাজ মামাকে জিজ্ঞেস করে, “মামা, লুঙ্গির দাম কত নিম্নে?”
মিনহাজ মামা একটু ভেবে উত্তর দেন, “সাড়ে তিনশো হয়তো।”
সাড়ে চারশো শুনে তৌসিরের মাথায় হাত। বিগত তিন বছরে নিজে কিনেনি লুঙ্গি, তাই জানা ছিল না। এত দাম শুনে ও বলে ওঠে, “লুঙ্গির যেই ঠাটা পড়া দাম, সামনে তো দেখতাছি লুঙ্গি কোমরে না লাগাইয়া বউয়ের ওড়না পেচাইয়া হাঁটতে হইবো।”
বিবিজান তৌসিরের কথায় বলেন, “তো হাঁটিস। তোর বউয়ের তো লন্ডনি-আমেরিকানি রঙ বেরঙের ওড়না আছে।”
তৌসির হালকা তাচ্ছিল্যে হাসে, “চাচা-ফুফুরা, লন্ডনি-আমেরিকানি আর ছিনালের কাপড়ের অভাব নাই। প্রতিদিন দেখবা নয়া নয়া রূপে। আমি সাফ সাফ বলছি, আমি ওরে দুই ঈদে দুইটা দিমু। তাই যেন নয়াগুলা যত্ন কইরা তুইলা রাখে।”
বিবিজান বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, “ক্যান? দুইটা দিবি ক্যান? ও তোর বউ, এত টাকাপয়সা দিয়া কি করবি তুই? ওর যা মন চায় পরতে-খাইতে, তাই ওরে খাওয়াস, তাই ওরে পরাইস। মনে রাখিস টাকা পয়সা হাতের ময়লা, শখ যেন অপূর্ণ না থাকে।”
তৌসির মুখ বাঁকিয়ে বলে, “দিমু তো। তবে সীমিত, খুবই সীমিত। ওত সাউয়া মারাইবার প্রয়োজন নাই।”
নাযেম চাচা তৌসিরের এই হাড় কিপ্টেমিতে খুবই বিরক্ত। উনি বিবিজানের কাছে বিচার দেন, “আম্মা, ওরে একটু বুঝাইয়া কও একটু কম কিপ্টামি করতে। নিজে একটা জাইঙ্গা পর্যন্ত কিনে না, আমার দুইটা আছে ঐটা নিয়ে ও টানাটানি করে। বেশরম একটা!”
বিবিজান কি বিচার করবেন? উনি উল্টো নাযেম চাচার দিকে আড়ো চোখে তাকিয়ে বলেন, “তোর শরম করে না? ভাতিজা যখন তোর জাইঙ্গা নিয়া টানাটানিই করে, তখন ঐগুলো ওরে দিলেই তো পারস। নিজে নয়া দুইটা কিন্যা নে।”
নাযেম চাচা মায়ের কথায় বড়ই হতাশ হোন। উনি আর সুবিচার পেলেন না। তৌসির হাসতে হাসতে বলে, “অন্যের পাছায় বাঁশ ঢুকাইতে গিয়া নিজের পাছায় তালগাছ ঢুইক্কা যাওয়ার নামই হইলো অতি চালাকি।”
মিনহাজ মামা নাযেম চাচার কাঁধে হাত দিয়ে সমবেদনা দিয়ে বিবিজানকে বলেন, “খালাম্মা, তুমি কিন্তু আমার বন্ধুরে সুবিচার দিলা না।”
বিবিজান গায়ের চাদরটা ঠিক করে ওদের পাশে সোফায় বসতে বসতে বলেন, “তুই সুবিচার মারাইছ না। তোর উপর আমার মেজাজ খারাপ।”
মিনহাজ মামা যেমন তৌসিরের মামা, তেমনি বিবিজানের ছোট বোনের ছেলে; অর্থাৎ তৌসিরের মা হলো তৌসিরের বাবার খালাতো বোন। মিনহাজ মামা ‘মেজাজ খারাপ’ কথাটা শুনে কপালে কয়েক ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করেন, “আমি কিতা করলাম আবার?”
এর মধ্যে নুহমান খাতা কলম নিয়ে হাজির হয়। বিবিজান সেগুলো হাতে নিতে নিতে নুহমানের দিকে আড়ো চোখে তাকিয়ে বলেন, “খাতা কলম আনতে গেছিলি, নাকি ইন্ডিয়া থেকে শেখের মাইয়ারে আনতে গেছিলি? এত সময় লাগলো ক্যান?”
নুহমান রুদ্রের পাশে বসতে বসতে বলে, “খাতা কলম আনতে গিয়া মুতে ধরে নিছিল, তাই বাথরুমে গেলাম।”
তৌসির বিবিজানকে নুহমানের কথা শুনে বলে, “বিবিজান ওর ঐটা অটো হয়ে গেছে, মিনিটে মিনিটে ওর মুতে ধরে যায়। ওর ঐটা চেঞ্জ করতে হইবো।”
রুদ্র আর কেরামত সাথে সাথে বলে ওঠে, “আস্তাগফিরুল্লাহ!”
বিবিজান আলতো হেসে বলেন, “চেঞ্জ কইরা তোরটা দিয়া দে।”
তৌসির ঠোঁট কেটে হেসে বলে, “দাদারটা দিয়া দিতে পারো, এমনিতেও লস প্রজেক্ট।”
এসব মজার মধ্যেই তৌসিরের বেখেয়ালিতে প্রিন্স ওর হাত থেকে ছুটে যায়। প্রিন্স চঞ্চল, খুব চঞ্চল। সে নাজহার একটা বিড়ালকে সদর দরজায় দেখে সেদিকেই ছুটে যায়। এ দেখে তৌসির চোখ বড় বড় করে উঠে দাঁড়ায়। লুঙ্গির কোণ হাতে নিয়ে সে আর রুদ্র দৌড় দেয় প্রিন্সকে আটকাতে। বিড়ালটাকে খেয়ে না ফেলে, এ ভয়ে। বিড়ালটাকে ধাওয়া করে প্রিন্স ওকে বাড়ির উঠানে নিয়ে এসেছে। বিড়াল আগে দৌড়াচ্ছে, প্রিন্স তার পিছনে। তৌসির, রুদ্র, নুহমান, নাযেম চাচা দৌড়াচ্ছেন তাদের আশেপাশে, কিন্তু প্রিন্সকে ধরতে পারছেন না। তৌসির রুদ্রকে চিৎকার করে বলে, “মাঙ্গের নাতি! কুত্তার বাইচ্চারে ধর! ও যদি আমার বউয়ের বিড়ালের কিছু করে, তো আমার বউ আমার পরনে থাইকা লুঙ্গি খুইল্যা নিব। তাড়াতাড়ি ধর ওরে।”
রুদ্র প্রিন্সকে ঝাপটা মেরে ধরার জন্য আগাতে আগাতে বলে, “ধরতে পারলে তো ধরমু।”
তৌসির সুযোগ বুঝে প্রিন্সের গলায় বাঁধা রশিটা টেনে ধরে তাকে আটকায়। আর রুদ্র বিড়ালটাকে কোলে নেয়। প্রিন্সকে ধরে তৌসির নাযেম চাচার হাতে তার রশি দিয়ে বলে, “তুমি কষ্ট কইরা এরে কুঠিরে নিয়া যাও, আমি আইতাছি।”
তৌসির নাযেম চাচার হাতে প্রিন্সকে দিয়ে রুদ্রের কাছ থেকে বিড়ালটা কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। নাজহার দিকে এগিয়ে যায়। নাজহার ভেতর ফেটে যাচ্ছিল এতক্ষণ। কিছু করতেও পারতেছিল না, আর না বলতে। ও তো মনে করেছিল তৌসিরের সিংহ হয়তো তার বিড়ালকে শেষ করে দিয়েছে। কিন্তু না, তেমন কিছু হয়নি, ওর বিড়ালটা সুস্থ আছে। তৌসির বিড়ালটাকে নাজহার কাছে যাওয়ার জন্য ছেড়ে দিয়ে দূর থেকে বলে, “তোমার বিলাইয়ের কিচ্ছু হয়নি, আমি হতে দেইনি।”
নাজহা তৌসিরের দিকে না তাকালে মাথা নাড়ায়। তৌসির ভেবেছিল নাজহা ওর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়াবে, কিন্তু সে তাকালো না। কেন তাকালো না? আবার ঘৃণা করতে শুরু করেছে? অবশ্য সে যে কাজ তৌসির করেছে, সেটা ঘৃণারই যোগ্য। তারপরও তৌসির নিজ জায়গা হতে সরে না, বেহায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যদি একটিবার ভুল করে হলেও, যদি নাজহা ওর দিকে তাকায়! তাহলে তৌসিরের অন্তর-আত্মা শান্তি পাবে। তৌসির নিজের এই ব্যাকুলতার কি নাম দিবে বুঝে উঠতে পারে না। শুধু তাকিয়ে রয়, একটিবার যেনো নাজহা ওর পানে দৃষ্টি বুলায়। কিন্তু নাজহা তাকায় না, মাথা নিচু করেই রয়। তৌসিরের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। দাঁত চেপে মনে মনে বলে, “দাঁড়া লো চুতমারানি ছিনাল! তোর সাউয়ার সাউয়ার আমি বের করমু। একবার খালি একলা পাই তোরে, তোর সাউয়ার ঝল আমি থাপ্পড়াইয়া নামামু। নটি কোথাকার!”
এটা মনে মনে শুধিয়ে তৌসির ভারী মন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। নাজহাকে বুকে টেনে নেওয়ার আক্ষেপে তার প্রাণ পুড়ে যাচ্ছে। তবে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। ভেবেছিল এখন বাড়ি এসে নাজহাকে একা পাবে, পেয়ে তার গালে দুটো চুমু খাবে, খানিক্ষণ তাকে বক্ষ মাঝারে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু তা হলো না।
—————সন্ধ্যার পর——————–
মারজান ভিলা আজ এক টুকরো উৎসবের স্বর্গরাজ্যের রুপ ধারণ করেছে চারদিকে আলো, হাসি, সুর আর মানুষের ভিড়ে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে। বিকেলের হালকা সোনালী আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো বাড়ি ও উঠানজুড়ে জ্বলে উঠেছে হাজারো ফেয়ারি লাইট। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে গাঁদা ও রজনীগন্ধার মাতাল করা সুবাস।
এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে কনে ইকরাকে নিয়ে আসে তার কাজিনরা। মেহেদী রঙের জমকালো লেহেঙ্গায় ইকরাকে আজ অপূর্ব লাগছে। পোশাকে সোনালি জরির কাজ আর খচিত পাথরগুলো কৃত্রিম আলোয় হীরের মতো ঝিকমিক করছে। মাথায় ফুলের টিকলি, হাতে-পায়ে আধা-শুকনো মেহেদীর আলপনা, আর মুখে সেই চিরাচরিত লাজুক হাসি সব মিলিয়ে তাকে পুরোদস্তুর বধূ লাগছে।
স্টেজের সজ্জাও দেখিবার মতো। চারপাশ ফুলে মোড়া, উপরে ঝুলে থাকা ছোট ছোট বাতিগুলো তারার মতো জ্বলছে। ইকরাকে স্টেজে বসানোর পরপরই তার কাজিন, ফুফা-ফুপি, বন্ধু-বান্ধব সবাই তাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়ায়। কেউ মোবাইল উঁচিয়ে ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, আবার কেউ মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। ইকরা আসার কিছুক্ষণ পরেই ডিজে সাউন্ড সিস্টেমে বিট বাড়তেই চারদিক কেঁপে ওঠে। কাজিনরা দলবেঁধে মঞ্চের সামনে এসে শুরু করল ধামাকা নাচ। তাদের তালে তাল মিলিয়ে অতিথিরাও করতালিতে মুখর হোন। ঢোল বাদকদের ঢোলের বাড়ি পড়তেই পরিবেশ হয়েছে আরও রঙিন।
একপাশে খাবারের এলাহি আয়োজন। ফুচকা লাইভ স্টেশনে লম্বা লাইন, কেউ চটপটি আর চাটে মগ্ন, আবার কেউ কাবাব আর গ্রিলের গন্ধে জিভে জল আনছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কাচ্চি বিরিয়ানির মনমাতানো সুবাস। শিশুদের হাতে আইসক্রিম, বড়দের হাতে জুসের গ্লাস সবাই উৎসবের আমেজে ডুবে আছে। ফটোবুথেও ভিড় কম নয়, ফুলের দোলনায় বসে কনের সাথে ছবি তুলতে ছোট-বড় সবারই প্রবল উৎসাহ। ফটোগ্রাফাররা এদিক-সেদিক দৌড়ে মুহূর্তগুলো বন্দী করতে ব্যস্ত কখনও ক্যান্ডিড, কখনও ক্লোজআপ, আবার কখনও ড্রোন শটে পুরো বাড়ির উৎসবের চিত্র নেওয়া হচ্ছে।
এত কিছুর মাঝে স্টেজে বসে ইকরা সব দেখছে। তার হাতে এখনো মেহেদী লাগানো বাকি, নাচ-গান শেষেই সে মেহেদী পরবে। তার ঠোঁটের কোণে হাসি থাকলেও মনে মনে সে ভাবছে অন্য কথা। এই যে এত আত্মীয়-স্বজন আজ তাকে ঘিরে নাচছে, খাচ্ছে এদের অনেকেই একসময় তার বাবার সম্পত্তি নিয়ে কী ভয়ানক কামড়াকামড়িটাই না করেছিল! স্বার্থপরের দল সব। ইকরা আর বসে থাকতে পারল না। ইকরা এবার উঠে দাঁড়িয়ে তার চাচাতো ভাই মাহবুবকে ডাক দেয়।
“মাহবুব, আমি যে গানে নাচব বলেছিলাম, সেটা বাজা তো ভাই আমার।”
মাহবুব মাথা নেড়ে ইশারায় ডিজে-কে গান বদলাতে বলে। ইকরা ধীর পায়ে স্টেজের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়ায় গিয়ে। গান বেজে ওঠে :
রায় দেখেছে দেশের মানুষ
খুশি আজ আমরা
বঙ্গকন্যার ফাঁসিতে
মিছিলও দেও তোমরা।
রায় দেখেছে দেশের মানুষ
খুশি আজ আমরা।
জুলাই হত্যা বিডিয়ার
শপল হলো ম্যাছছাকার।
ডাইনি খুনি পালাইছে,
জুলাই যুদ্ধার হলো জয়।
ফাঁসি চাই (শেখ হাসিনা)
ফাঁসি চাই ( শেখ হাসিনা)
ফাঁসি চাই (শেখ হাসিনা)
ফাঁসি চাই (শেখ হাসিনা)
জয় বাংলা , ফাঁসি এবার সামলা।
জয় বাংলা শেখ হাসিনার মামলা।
জয় বাংলা, ফাঁসি এবার সামলা।
জয় বাংলা শেখ হাসিনার মামলা।
স্পিকারে গান বাজতেই ইকরা আর তার কাজিন মহল ফেটে পড়ে উচ্ছ্বাসে এটা তাদের আগ থেকেই প্ল্যাব করা। গানের তালে তালে তাদের সেই ‘উরাধুরা’ নাচ দেখে উপস্থিত অনেকেই ভিমরি খাওয়ার জোগাড়! নিজের মেহেদী অনুষ্ঠানে কনে এমন গানে নাচতে পারে, তা অনেকেরই কল্পনার বাইরে। মাহবুব ভিড় থেকে একটু সরে এসে পকেট থেকে ফোন বের করল। ওপাশে ধ্রুবকে ভিডিও কল দিল, কিন্তু ধ্রুব ফোন ধরছে না।
ওদিকে ধ্রুবর অবস্থা তথৈবচ। সে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে বাথরুম আর বেডরুমের মধ্যে পায়চারি করছে। হাতে এক বোতল হারপিক। ইকরাকে বিয়ে করার চেয়ে মরে যাওয়াই তার কাছে শ্রেয় মনে হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, হারপিক খাওয়ার সাহসটা সে সঞ্চয় করতে পারছে না যদি সত্যি সত্যি মরে যায়! কত কান্নাকাটি, কত আহাজারি করল সে, কিন্তু বাবার এক কথা বিয়ে না করলে ত্যাজ্যপুত্র করে দেবেন। অগত্যা মাহবুবের অনবরত কলের অত্যাচারে সে ফোনটা রিসিভ করে।
মাহবুব ভিডিও কলে ইকরার নাচ দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলে, “দুলাভাই, দেখো! তোমাকে পাওয়ার আনন্দে ইকরা আপু কেমন নাচতেছে!”
ধ্রুব বিরক্ত মুখে ঠান্ডা গলায় বলে, “তোর আপার কাছে ফোন দে।”
মাহবুব ফোন নিয়ে ভিড় ঠেলে ইকরার কাছে যায়। ইকরা নাচের ফাঁকে ফোনটা হাতে নিয়ে একটু আড়ালে সরে আসে হাঁপাতে হাঁপাতে ও ধ্রুব জিজ্ঞেস করে, “কেমন লাগছে আমাকে?”
ধ্রুব নাক-মুখ কুঁচকে উত্তর দেয়, “ডাইনি লাগছে, একদম ডাইনি।”
ইকরা চোখ বড় বড় করে ধমকে ওঠে, “তোমার ওই বগা-মার্কা মুখ দিয়ে কি কোনোদিন ভালো কথা বের হবে না? আমি তোমার হবু বউ, একটু সুন্দর করে বলতে পারো না যে সুন্দর লাগছে?”
ধ্রুব দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “শোন ইকরা, একটা কথা তোকে জানিয়ে রাখি। তোকে বিয়ে করছি শুধু পরিবারের চাপে। কিন্তু আমি দ্বিতীয় বিয়ে করব, আর সেটা করব নিজের পছন্দে।”
কথাটা শুনে ইকরা মুচকি হাসে। তারপর খুব ঠান্ডা গলায়, মারাত্মক ভঙ্গিতে বলে, “হারামজাদা, বেশি উড়িস না বিয়ে বিয়ে করে নয়তো বিয়ে করার যন্ত্রণায় কেটে রেখে দিব আমি ইকরা, মনে রাখিস।”
ইকরার মুখে এমন কথা শুনে ধ্রুবর চোখ কপালে সে তোতলে বলে, “ছিঃ! তুই কতটা নোংরা! তোকে বিয়ে করার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।”
“তো মর না! আমি কি আটকে রেখেছি নাকি? যা, মর গিয়ে।”
“সম্মান দিয়ে কথা বল, আমি তোর স্বামী হতে যাচ্ছি।”
“তুমি আমার বাল হতে যাচ্ছ! রাখলাম ফোন, গাধা কোথাকার!”
এ বলে ইকরা খটাস করে ফোন কেটে দেয়। বুকের ভেতরটা একটু মোচড় দিয়ে ওঠে তার। সে জানে ধ্রুব তাকে পছন্দ করে না, একটুও না। সব জেনেশুনেই সে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটছে কারণ জেদ আর ভালোবাসার দ্বন্দ্বে সে ধ্রুবকেই আপন করে পেতে চায়।
ঘড়ির কাঁটা এখন এগারোটার ঘর ছুঁই ছুঁই। শিকদার বাড়ির বিশাল প্রাচীরের ভেতর নেমে এসেছে এক অখণ্ড, শ্বাসরোধী মৌনতা। বাগানের জোনাকি পোকাগুলোও আজ ভয়ে আলো নেভাতে ভুলে গেছে বোধহয়। অধোমুখী ঘোর আঁধারের বুক চিরে বাগানের এক কোণে, পুরোনো কয়েক আমল আগের আমগাছটার নিচে চলছে একটা জরুরি বৈঠক। সোফায় গোল হয়ে বসে আছেন শিকদার বংশের বর্তমান ও প্রবীণ কর্তারা: তৌসির, তার বাবা, দাদাজান, এবং পরিবারের শক্ত খুঁটি বিবিজান। তাঁদের ঘিরে আছেন তৌসিরের পাঁচ চাচা সাথে মিনহাজ মামা, রুদ্র, নুহমান, কেরামত।
সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ মাঝখানের টি-টেবিলটার উপর। সেখানে ছড়িয়ে আছে কিছু স্থিরচিত্র। এই স্থিরচিত্রগুলো সাধারণ ছবি নয়, একেকটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, একেকটাতে আছে রোমহর্ষক চিত্রপট। তৌসিরের দৃষ্টি সেদিকেই স্থির। তার চোখেমুখে জমে আছে প্রস্তরকঠিন, মৌনাবিরাম স্তব্ধতা, কিন্তু বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য হাত ওর হৃদপিণ্ডটা ধরে সজোরে, ধীরগতিতে টানছে। জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তৌসিরের।
কিছু মুহূর্ত ছবির দিকে তাকানোর পর, তৌসিরের হাতটা অবচেতনেই এগিয়ে যায় টেবিলের দিকে। আঙুলের ডগায় উঠে আসে এক টুকরো ছবি, কিন্তু তাতে যে ঘোর ভয়ঙ্কর দৃশ্যপট আটকে আছে, তা জীবন্ত বিভীষিকা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওয়াসেম নামের এক পৈশাচিক পুরুষ। তার হাতে উদ্যত একটি তীক্ষ্ণ ছুরি, যার আগা গেঁথে আছে এক নারীর নিচের স্তনের মাঝখানে। সে এটা গেঁথে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দে হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে; সাথে তো আছেই চারিদিকে রক্তের আলপনা। ছবিটার দিকে তাকিয়ে তৌসিরের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা রক্ত জমাট-করা শৈত্যস্রোত নেমে যায়। খুন মানুষ করে, কিন্তু এতটা নৃশংসতা? এতটা বীভৎস উল্লাস আদৌ কীভাবে করতে পারে? কে সে? মানুষ? বোধহয় সে মানুষ নয়। তৌসিরও খুন করে, তথাপি এতটা নির্দয়ভাবে কখনোই সে করে না। নারী বলে কথা, তাকে এভাবে মারা যায়?
কিন্তু তৌসিরের অস্বস্তি শুধু খুনের দৃশ্য নিয়ে নয়, তার চোখ আটকে আছে ঘাতকের চেহারায়, ওয়াসেমের চেহারায়। এ যে তারই প্রতিবিম্ব! আয়নায় দাঁড়ালে যেমন নিজেকে দেখা যায়, ওয়াসেম ঠিক তাই। পার্থক্য শুধু সময়ের ছাপ আর জীবনযাপনে। তৌসিরের গালে সদ্য গজানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর ওয়াসেমের গালভর্তি জংলি দাড়ি। আর একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য, ছবির লোকটার গায়ের রঙে রোদে পোড়া তামাটে ভাব, যেখানে তৌসির দুধ-আলতা ফর্সা।
তৌসিরের ঘোর কাটে। সবার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “গুজরাট আর তামিলনাড়ুর অন্ধকার জগত ছেড়ে ও উত্তর প্রদেশে রাজত্ব করতাছে কীভাবে? ওকে তো গুজরাটেই রাখা হয়েছিল!”
দাদাজান বিরক্তিতে চিবুক নেড়ে ‘চ’ সূচক শব্দ করে গম্ভীর স্বরে বলেন, “এই ধাঁধাঁ আমাদেরও ঘুম হারাম করেছে। ও উত্তর প্রদেশে গেল কী করে? কার ইশারায়? আজ দু’বছর পর এইটুকু তথ্য হাতে এল, আর এর মধ্যেই ও বিভীষিকা হয়ে উঠেছে।”
তৌসিরের বাবা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে, চোখে গভীর উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “এখন কী করবি, বাবা?”
তৌসির হাতের ছবিটা আলতো করে টেবিলে নামিয়ে রাখে। তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস। তারপর ইস্পাতকঠিন গলায় বলে, “আমি ওর সাথে দেখা করমু। কিন্তু তার আগে আমাদের নাগাল্যান্ড যাইতে হইবো। ছোটজনকে খুঁজে বের করাটা এখন সবচেয়ে জরুরি।”
তন্ময় চাচা কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে বলেন, “কিন্তু ও কি আদৌ কিছু জানে? নিজের জন্ম, নিজের অস্তিত্ব, এসব কি ওর মনে আছে?”
তৌসিরের জবাবে বড্ড নির্লিপ্তে ধারায়, “ওর মনে থাকার কথা। রক্ত কথা বলে, মেজো চাচা। আমার যেহেতু মনে আছে, ওরও থাকবে।”
কথার মাঝখানেই হঠাৎ বারুদ জ্বলে ওঠে। বিবিজান সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ান আর হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন, “আমি ওসব শুনতে চাই না! কে কোথায় গেল, কে হারালো, রসাতলে যাক সব! আমার শুধু একটাই কথা, তামিলনাড়ুর ওই জমি আর টাকা শিকদার বাড়ির হওয়া চাই। আর সাবধান! আমার তৌসিরের গায়ে যেন একটা আঁচড়ও না লাগে। যদি আমার নাতির কিছু হয়, তবে আমি নূরজাহান কসম করে বলছি, এই শিকদার বাড়ি আমি নিজের হাতে জ্বালিয়ে দেব! মনে রাইখো, তৌসিরের দাদা!”
কথাগুলো বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে তিনি গায়ের চাদর ঠিক করতে করতে গটগট করে বাড়ির ভেতরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ান। বিবিজানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তৌসিরের ঠোঁটের কোণে টেনে ধরে এক চিলতে ম্লান হাসি; এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নারী তাকে বড্ড ভালোবাসেন, এই শাসন আর হুমকি সবই ভালোবাসারই বর্ম।
তৌসিরও এবার উঠে দাঁড়ায়। সবাইকে অভয় দিয়ে বলে, “আপনারা চিন্তা করবেন না। ওয়াসেম আমার ছায়াও মাড়াতে পারবে না।”
কথাটা বলে সে যখন বাড়ির অন্দরমহলের দিকে পা বাড়াবে, তখনই ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে। বাড়ির পুরোনো জরাজীর্ণ প্রাচীরের ভাঙা অংশটার দিকে তাকাতেই তার মনে হয় অন্ধকার সেখানে জমাট বেঁধে আছে, আর সেই অন্ধকারের আড়ালেই কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। শিকারি বাঘের মতো কেউ ওঁত পেতে আছে।
তৌসিরের পা থমকে যায়। সে ইশারায় সবাইকে চুপ থাকতে বলে। নিঃশব্দে, বিড়ালের মতো পা ফেলে সেদিকে এগোতে থাকে। কোমরের হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করে চোখের পলকে এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে ওই ভাঙা দেয়ালের দিকে আর সাথে নিস্তব্ধতা খানখান করে গর্জন করে, “কোন খান**কির পোলারে! এখানে যদি কেউ ঘাপটি মাইরা থাকস, জলদি বাইর হ!”
উত্তরের অপেক্ষা না করেই তৌসির দ্বিতীয় গুলিটা চালায়। উপস্থিত সবাই হতভম্ব, কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিপদের গন্ধে তারাও তৌসিরের দিকে ছোটেন।
কিন্তু হায়! নিয়তি এখন আড়ালে হাসছে। তৌসিরের দ্বিতীয় গুলির শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই বিপরীত দিক থেকে বাতাস চিরে ধেয়ে আসে একটা তপ্ত সীসা। অব্যর্থ নিশানা। একটা গুলি এসে সরাসরি বিদ্ধ করে দেয় তৌসিরকে।
মুহূর্তেই তৌসিরের চোখের সামনের পৃথিবীটা দুলে ওঠে। ওর দুনিয়াটা কাত হয়ে যায় একদিকে। হাতের পিস্তলটা ছিটকে পড়ে মাটিতে। যন্ত্রণায় এক অমানবিক আর্তনাদ করে সে লুটিয়ে পড়তে চায়, কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই ওর বাবা আর দাদা ওকে জাপটে ধরেন। তার বাবার বুকটা খালি হয়ে যায়, একমাত্র সন্তান উনার, তৌসির! নিজের সন্তানকে এভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে কলিজা মুচড়ে ওঠে উনার। তিনি তৌসিরের মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠেন, “পুত্ত! আমার বাপ! তোর কী হইলো?”
তৌসিরের প্রাণবায়ু এখন বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে। এর মাঝে বাবার এমন হাহাকার তার কাছে বড্ড বেমানান লাগে। যন্ত্রণার তীব্রতায় আর মেজাজের তিক্ততায় সে বাবার বুকে লেপ্টে থেকেই বিড়বিড় করে ওঠে, “আমার সাউয়ায় কী হইছে ওইটা না দেইখা, গিয়া দেখো কোন বাইনচুদে আমারে গুলি মারল!”
ধীরে ধীরে তৌসিরের চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, চোখ লেগে আসে তার। আজকের রাতটা তার অনেক বড় আক্ষেপের রাত হয়ে রইলো। সে ভেবেছিল, ঘরে ফিরেই তার কৈতরি’কে বুকে জড়িয়ে ধরবে, তার চুলের ঘ্রাণ নেবে। কিন্তু তা আর হলো না। ভালোবাসার উষ্ণতা পাওয়ার আগেই মৃত্যুর একাংশ স্পর্শ তাকে গ্রাস করে নিল। শিকদার বাড়ির বাগানে এখন হাহাকার ভাসছে, আর ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে তৌসিরের তাজা রক্ত।
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ২৬
এইসব কাহিনি নাজহা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল তৌসির কে লুটিয়ে পড়তে দেখে ও নিজের ফোনটা কানে ধরে এনে বলে,” দাদাজান বুড়ি নটির তো লাগেনি গুলি। লেগে গিয়েছে তো আমার গোলামের গায়ে।”
