Home শ্রাবণ ধারার রূপকথা শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৫

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৫

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৫
অনামিকা তাহসিন রোজা

ধারা সিদ্ধান্তে অটল ছিল। সত্যি সত্যি শ্রাবণের সামনে আর যায়নি। সারারাত বেচারা শ্রাবণ একাই ছিল। মনে মনে সেও অভিমান করেছে। বউ টা সত্যি সত্যি তার কাছে আসলো না? মেয়ের দলবল নিয়ে ঘুমিয়ে গেলো? এ কি অন্যায়। এটা তো চরম অনাচার! এর প্রতিশোধ নেবে শ্রাবণ। সকাল সকাল আজ সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। গায়ে হলুদ বলে কথা। বাড়িটা খুব সুন্দর করে হলদে সৌন্দর্যে ফুটিয়ে তোলা হলো। ধারা অবাক না হয়ে পারলো না। বিয়ে তে যে এত সুন্দর করে আয়োজন করা হয় তা জানা ছিল না। হা করে তাকিয়ে সবকিছু দেখতে থাকলো ধারা। সালমা বেগম গতরাত থেকেই অনেক ব্যস্ত ছিলেন বলে ধারার খোঁজ নেওয়ার সময় পাননি। সকাল বেলার কাজ প্রায় শেষের দিকে চলে গেলে সালমা বেগম শ্রাবণকে ডেকে দেন, আর নিচে এসে ধারাকে ঘুরঘুর করতে দেখে ডাকেন,

—” বউমা! কী করছো? এসে খেয়ে নাও।”
ধারা সালমা বেগমকে দেখে হাসিমুখে বলল,
—” একটু বাড়িটা ঘুরে দেখি মা? বাইরে নাকি আরো সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। আমি এখন খাব না।”
সালমা বেগম আর কী বলবেন। মেয়েটার হাসিমুখ দেখে তিনি রাজি হলেন ধারার কথায়। একটু পরে শ্রাবণ নামলো নিচে। মমিনুর সাহেব মাত্রই বাড়িতে ঢুকেছেন। এই অসুস্থতা নিয়ে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছে তাকে। যদিও সামিউল শেখ সবকিছুর দায়িত্ব নিয়ে নিজে নিজেই সবকিছু করছেন। তবুও মেয়ের বাবা তো! একটু তো চিন্তা হবেই। তিনি শ্রাবণ কে দেখে বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

—”উঠে পড়েছো বাবা? যাও, নাস্তা করে নাও।”
সালমা বেগম কথায় আরো একটু জোর দিয়ে বললেন,
—” হ্যাঁ রে আয়। নাস্তা করে প্যান্ডেলে যা। গোছগাছ কর। সাজানো প্রায় শেষের দিকে। বাকিটা দেখে আয়।”
শ্রাবণ মুচকি হেসে মাথা নাড়ালো। কিন্তু মমিনুর সাহেব আঁতকে উঠে বললেন,
—” ছিঃ ছিঃ কী বলছেন ভাবি? ও কেনো করবে এসব?”
সালমা বেগম অবাক হলেন প্রথমে, মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
—” আপনি কি আমাদের পর করে দিচ্ছেন ভাইজান? শ্রাবণ তো আপনারই ছেলে! আয়োজনে একটু সাহায্য করলে কি বা এসে যায়। মুনিরা ওকে ভাই ডেকেছে। ভাই হিসেবে বোনের বিয়েতে দৌঁড়ঝাপ করা নিতান্তই স্বাভাবিক!”
শ্রাবণও মাথা দুলিয়ে বলল,
—” জ্বি সেটাই। আপনি টেনশন করবেন না আঙ্কেল। আমরা আছিই তো। আপনি বরং ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন।”
মমিনুর সাহেব কৃতজ্ঞতার সহিত হাসলেন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি ভেবেছিলেন মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান করতে তাকে কোঁমড় বেঁধে নেমে পড়তে হবে। অথচ তিনি ভাবেনও নি যে শেখ পরিবার এতটা আন্তরিক। পরিবারের প্রত্যেক সদস্যই চমৎকার মনমানসিকতার।

ধারা বাইরে এসে দেখলো ইকরা প্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সেও গিয়ে দাঁড়ালো ইকরার পাশে। চারিদিকে গাঁদা ফুলের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন সরঞ্জামে ভর্তি করা হয়েছে ইয়া বড় একটা ডালা। কয়েকজন ভদ্র মহিলা হলুন বাটছে, বাটা শেষের দিকে। ইকরা সবকিছুই দেখছে। ধারা নিজে থেকেই বলল,
—” আজ গায়ে হলুদ হবে ইকরা আপু?”
ইকরা হেসে বলল,
—” হ্যাঁ। আজ গায়ে হলুদ। কাল বিয়ে।”
ধারা অবাক হলো। গ্রামে সে হাজারো বিয়ে দেখেছে। বিয়েতেও এত বড় প্যান্ডেল বানানো হয়না, যত বড় গায়ে হলুদা এনারা বানিয়েছেন। মুগ্ধ হলো ধারা। হুট করে মনে পড়লো মুনিরাকে সাজানোর কথা একটু পর। তাই সে ফট করে বলল,

—” মুনিরা আপুকে সাজাবে না?”
ইকরা ঠোঁট চেপে ভাবলো কিছুক্ষণ। তারপর বলল,
—” ভালো কথা মনে করিয়েছো। চলো যাই। ওকে সাজাতে হবে। সব আয়োজন তো শেষের দিকে।”
ধারার চোখ চকচক করে উঠলো। কীভাবে সাজানো হবে, মুনিরা কে কতটা সুন্দর লাগবে তা দেখতে সে ভীষন আগ্রহী। তাই ইকরার সাথে সদর দরজার দিকে এগোতে থাকলো। কেবলই বের হয়েছিল শ্রাবণ। শ্রাবণকে বের হতে দেখে ধারা ফট করে ইকরার পেছনে লুকিয়ে পড়ল। ইকরা দাঁড়িয়ে পড়লো, বুঝলোনা হঠাৎ ধারার লুকোলো কেনো। তারপর শ্রাবণ কে দেখে বুঝতে পারলো কিছুটা। ধারা লুকিয়ে পড়ার আগেই শ্রাবণ তাকে দেখে ফেলেছে। বিচ্ছুটা তার সাথে লুকোচুরি করছে? শ্রাবণ ইকরার সামনে দাঁড়ালে ইকরা মেকি হেসে বলল,

—” হোয়াটস আপ ব্রো? এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার কী দরকার ছিল?”
শ্রাবণ এদিক অদিক তাকিয়ে বলল,
—” তাড়াতাড়ি তো উঠতেই হবে। গোছগাছের ব্যপার।”
পেছন থেকে ধারা ইকরার কামিজ চেপে ধরে ছিল, যার ফলে ইকরা কোনোমতে হেলেদুলে শ্রাবণকে মানানোর চেষ্টা করে আবারো বলল,
—” আপ…মানে, দাঁড়িয়ে আছিস কেনো?”
শ্রাবণ দুহাত বুকে গুঁজে নিয়ে বলল,
—” তোর পেছনে যেই ফড়িং এর বাচ্চাটা লুকিয়ে আছে, ওটাকে বের হতে বল। তার চাঁদপানা মুখটা দেখি একটু।”
ধারা মোটেই ধরা দিতো না। কিন্তু ফড়িং এর বাচ্চার মত এত সাংঘাতিক গালি শুনে সে চুপ থাকতে পারলো না। অগ্নিঝরা রূপে বের হয়ে এসে শ্রাবণের সামনে দাঁড়িয়ে দুহাত কোঁমড়ে রেখে বলল,
—” কী বললেন আপনি? কীসের বাচ্চা বললেন?”
শ্রাবণ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,

—” ফড়িং এর।”
ধারা অবাক হলো। হতবাক হয়ে আতঙ্কিত হয়ে বলল,
—” আপনার এত্ত বড় সাহস! আপনি আমাকে ফড়িং এর বাচ্চা বলে গালি দিলেন?”
ইকরা পড়লো মহা দোটানায়। ফড়িং এর বাচ্চা কি কোনো গালি? আজ পর্যন্ত এই গালি টা শোনে নি কেনো সে? নতুন করে আমদানি হয়েছে নাকি। মাথা চুলকে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলো সে। শ্রাবণ এবারে এক ধাপ এগিয়ে আসলো ধারার দিকে, মাথা নামিয়ে ধারার মুখোমুখি হয়ে আঙুল দিয়ে কপালে টোকা দিয়ে জোরগলায় বলল,
—” অবশ্যই তুমি একটা ফড়িং এর বাচ্চা। শুধু এটাই নও, তুমি একটা পিঁপড়ার বাচ্চা, মৌমাছির বাচ্চা, জেলিফিশের বাচ্চা, টিয়াপাখির বাচ্চা, মুরগির বাচ্চা, আর….আর অবশ্যই চড়ুই পাখির বাচ্চা!”
ধারা বলতে দিলো না আর। চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

—” থামুন আপনি। আমি মোটেই এসব নই। বরং আপনি একটা রাজহাঁস, তিমি মাছ, লাল পিঁপড়া আর…
এবারে শ্রাবণ আটকে দিয়ে ধমক দিলো,
—” শাট আপ। ”
ধারা দমলো না। উল্টো বলল,
—” আপনি শাট আপ।”
ইকরা দুজনের দিকে এক পলক করে তাকালো। এ সে কাদের মাঝে আছে। এরা নাকি ম্যচিইউর্ড! এ কেমন ভয়ানক ম্যাচিউরিটি। এভাবে তো এরা মানুষদের পাগল বানিয়ে দেবে। ইকরা মনে মনে অংক কষার মত ভাবতে থাকলো এরা যদি এতকিছুর বাচ্চা হয়, তবে এদের বাচ্চা কী হবে? এসব ভাবনার মাঝেই ধারা ইকরার হাত ধরে বলল,
—” চলো তো ইকরা আপু। এনার সাথে আর কথাই বলব না, হুহ।”
বলেই মুখ ভেঙচিয়ে ইকরার হাত ধরে হেলেদুলে চলে গেলো ধারা। শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলো। মনে মনে ভেবে নিলো এই জোরগলায় তার সাথে ঝগড়া করার জন্য আজ রাতে ধারার ভবলীলা সাঙ্গ করার ভয়ানক ব্যবস্থা করবে।

মুনিরা কে প্রথমে কমলা রঙের একটা সুন্দর শাড়ি পড়ানো হলো। ইকরা পড়িয়ে দিলো শাড়িটা। ধারা হাসিমুখে তাকিয়ে রইলো। একটা পর্যায়ে ইকরা কে বলল,
—” মুনিরা আপু কে সুন্দর লাগছে।”
ইকরা একটু ভাব নিয়ে বলল,
—” এখনো তো মেকআপ করেই দিইনি। মেকআপ করার দেখবে কতটা সুন্দর লাগছে। একদম চমকে যাবে।”
ধারা মুগ্ধ হয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। বিছানায় বসে বসে দেখতে থাকলো। একটু পরে মুনিরার কাজিন রা গাঁদা ফুলের মালা গুলো এনে রাখলো বিছানার উপর। এগুলো দিয়ে মুনিরাকে সাজানো হবে। মুনিরা এবারে ধারা কে বলল,

—” তুমি শাড়ি পড়বে না ধারা?”
ধারা মাথা নেড়ে বলল,
—” পড়ব তো। আগে তুমি সেজে নাও। তোমার সাজ দেখে যাই। আমার তৈরী হতে সময় লাগবেনা!”
ইকরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” সময় লাগবেনা মানে? তুমি সাজবেনা?”
ধারা আমতা আমতা করে বলল,
—” আমি আর কী-ই বা সাজবো?”
মুনিরাও এবারে তাল মিলিয়ে বলল,
—” এসব কী কথা? মোটেই না। তোমাকে সাজতে হবে। অবশ্যই সাজবে তুমি। ইকরা সাজিয়ে দেবে তোমায়।”
ইকরাও মাথা নেড়ে সহমত প্রকাশ করলো। বলল,
—” মুনিরাকে সাজানোর পর তোমায় সাজিয়ে দেব।’
ধারা ঠোঁট চেপে ভাবলো কিছু একটা। মুখে আচ্ছা বললেও মনে মনে কেনো যেন একটু হতাশ হলো। মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকলো মুনিরাকে। ইকরা দক্ষ হাতে মেকআপ শুরু করলে ধারা উঠে এসে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো। ফট করে বলল,

—” বিয়েতে কি সবাই-ই এত সুন্দর করে সাজে?”
ধারার প্রশ্নে প্রথমে হাসলো মুনিরা। এরপর বলল,
—” অবশ্যই। বিয়ে নিয়ে সবারই অনেক স্বপ্ন থাকে। সবাই-ই সাজগোছ করে তো।”
ধারা হতবাক হওয়া অনুভূতি টা সরাতে পারলো না। হা করে মুনিরার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে কাতর হয়ে বলেই ফেলল,

—” কই আমি তো এভাবে সাজতে পারিনি! এত সুন্দর করে আমায় কেনো…
বলতে বলতে থেমে গেলো ধারা। মনে পড়লো কিছু একটা। মুনিরা কেবলই গাঁদা ফুলের বানানো কানের দুলটা পড়তে যাচ্ছিল। ধারার কথা শুনে সেও থমকে গেলো, শুকনো ঢোক গিলে নিজের প্রতি বিরক্ত হলো নিজের বোকামির জন্য। ধারার সামনে বিয়ে নিয়ে এসব কথা বলা উচিত হয়নি। উহু, একদমই উচিত হয়নি। ইকরা বোঝেনি কিছু। তবে মুনিরার মুখ দেখে বুঝতে পারলো ভালো কিছু হচ্ছে না।
ইকরা তো জানে না কিছু। সে তাই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে ধারাকে বলল,

—” কেনো? তুমি সাজো নি কেনো?”
ধারা মলিন হেসে বলল,
—” সুযোগ হয়নি তো। ধরেবেঁধে বিয়ে দিয়েছে। গায়ে হলুদও হয়নি আমার। আর উনি তো আরো অপ্রস্তুত ছিল..! কি যে রেগে গিয়েছিলেন আমাকে দেখে!”
বলেই ফিক করে হাসলো ধারা, যেন খুবই হাস্যকর একটা কথা বলেছে সে। কিন্তু মুনিরা আর ইকরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে অসহায় দৃষ্টি ফেলল।

যতই হোক না কেনো। ধারাও মেয়ে। তারও কিছু শখ আছে। চাওয়া পাওয়া আছে। বিশেষ করে বিয়ে নিয়ে প্রত্যেক মেয়েরই অনেকটা চাওয়া-পাওয়া থাকে, যার একাংশও পূরণ হয়নি ধারার ক্ষেত্রে৷ না সে স্বাভাবিক ভাবে বিয়ে করতে পেরেছে, আর না সে বিয়ের পর স্বাভাবিক জীবন পেয়েছে। বাসর রাতের কাহিনী তো সবারই জানা। তাই এখন এই মুহুর্তে অন্য একটা মেয়ের বিয়েতে এত আনন্দ, এত হুল্লোড় দেখে হতবাক হওয়াটা স্বাভাবিক ধারার জন্য। এমনকি এসব দেখে মনে মনে কষ্ট পাওয়াটাও অস্বাভাবিক হবে না। সালমা বেগম পায়েশ এনেছিলেন সবার জন্য। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সবকিছুই শুনেছেন তিনি। ধারার কথা শুনেই থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। সত্যি বলতে এখানে আসার পর তিনি এই ভয় টাই পাচ্ছিলেন। কখন না জানি মেয়েটা কষ্ট পেয়ে বসে এই ভয়েই তিনি ছিলেন। অবশেষে মাতৃমনের আতঙ্ক ফলে গেলো। পায়েশ দিতে আর ঘরে ঢুকলেন না সালমা বেগম, শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করে নিচে নেমে গেলেন।

দিনটা বেশ ভালোই কাটলো। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানও বেশ জমজমাট করে হলো। গানবাজনা করা হলো। সকলেই আনন্দ করলো। দুপুরে খাওয়ার টেবিলে ধারা কে কোথাও দেখলো না শ্রাবণ। তাই বিকেলে ঘরে এসে বসে রইলো। সে জানে কফি দিতে নিশ্চয়ই ধারা আসবে। কিন্তু ধারার বদলে এলেন সালমা বেগম। শ্রাবণ ল্যাপটপ নিয়ে বসেছিল। সালমা বেগম কে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—” কিছু বলবে মা?”
সালমা বেগম কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
—” হুম বলব।”
—’ বলো।”
শ্রাবণ ল্যাপটপে চোখ রেখেই কথাটা বলল।
সালমা বেগম বিরক্ত হয়ে ছেলের কাছে এসে বললেন,
—” তুই বউমা কে নিয়ে আজ-ই বাড়িতে ফিরে যা।”
শ্রাবণ এবারে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সন্দিহান দৃষ্টিতে বলল,
—” কেনো? বিয়ে তো শেষ হয়নি।”
সালমা বেগম এবারে ছেলের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বললেন,

—” আমি মোটেই একটা এতিম মেয়েকে কষ্ট দিতে চাই না। যার বিয়ে হয়েছে এতিমের মত, তাকে এত জাঁকজমক বিয়ে দেখিয়ে কষ্ট দিতে চাই না আমি। যে কিনা নিজের বিয়েতে চোখের পানির বন্যা বইয়েছে, তাকে অন্য কাওকে বিয়েতে এত আনন্দিত হতে দেখাতে চাই না আমি। আমি চাইনা স্বাভাবিক কিছু দেখুক ও। কারন তার-ই তো সবকিছু অস্বাভাবিক ভাবে হয়েছে।”
শ্রাবণ বুঝলো না। ভ্রু কুঁচকে বলল,
—” মা কী বলছো এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
সালমা বেগম এই প্রথমবার নিজের ছেলের প্রতি এতটা বিরক্ত হলেন। তিনি আর কোনো কথাই বললেন না। উঠে চলে যেতে থাকলেন। দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন, বললেন,
—” ঠিক আছে, কোথাও যেতে হবেনা। কাল মুনিরা আর জিহানের বিয়ে হবে। তুই শুধু ধারার চোখদুটো দেখিস, খোদা করুক যদি কিছু নজরে আসে। আর কিচ্ছু বলব না।”

বলেই চলে গেলেন সালমা বেগম।
শ্রাবণ সত্যিই বুঝলো না কিছু। এক মুহুর্তের জন্যও ধরতে পারলো না সালমা বেগমের কথা। মনে করলো সকালে ওভাবে ঝগড়া করার জন্য ধারা বোধহয় মন খারাপ করেছে। তাই ও ল্যাপটপ রেখে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। আশেপাশে খুঁজলো ধারা কে। পেলো না কোথাও। একটু পর ইকরাকে দুর থেকে দেখলো প্লেট হাতে নিয়ে কোথাও যেতে। সে জোর গলায় হাঁক ছুঁড়ে বলল,
—” মিকি মাউস! এই যে এদিকে।”
ইকরা সিঁড়ি দিয়ে নামতে চেয়েছিল। শ্রাবণের ডাক শুনে থেমে তাকিয়ে বলল,

—” কী? তুই না বিশ্রাম নিবি।”
শ্রাবণ জিজ্ঞেস করলো,
—” ধারা কোথায়?’
ইকরা ঠোঁট কাঁমড়ে ভেবে বলল,
—” একটু আগে তো বাড়িতে ঢুকতে দেখেছি। হয়তো ছাদে গেছে। শাড়ি ধুয়ে দিয়েছিল তো, ওগুলো তুলতে গেলো বোধহয়।”
শ্রাবণ আর কিছু না বলে ছাদের দিকে ছুটলো। ছাদে এসেই ধারাকে ডাকলো। ধারা শাড়ি হাতে নিয়ে রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। নিচের আয়োজন দেখছিল। আজ রাতে নাকি সবাই আনন্দ করবে। গান বাজাবে, সেসবেরই প্রস্তুতি চলছে। শ্রাবণের ডাক শুনে সাড়া দিলো সে,

—” এইযে আছি তো।”
শ্রাবণ দৌঁড়ে এসে ধারার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—” এই মেয়ে, তুমি ঘরে আসছো না কেনো হ্যাঁ? গত রাত থেকে ইগনোর করছো আমায়।”
ধারা অবাক হলো,
—” কই না তো। আমি এই এখনি ঘরে যেতাম।”
শ্রাবণ চোখ সরু করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” তুমি কি রাগ করেছো?”
ধারা সরল ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
—” না না।”
—” সকালে যে ফড়িং এর বাচ্চা বলেছি সেটার জন্য রাগ করেছো?”
ধারা ঠোঁট চেপে হেসে ফেলল, বলল,
—” আমি যে আপনাকে হাঁসের বাচ্চা বলেছি। আপনি রাগ করেছেন?”
শ্রাবণ সুযোগের হাতছাড়া করলো না। মুহুর্তেই মুখ অন্ধকার করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

—” হ্যাঁ ভীষন রাগ করেছি।”
ধারা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
—” এটা উচিত না। আমি তো রাগ করিনি। আপনি কেনো রাগ করবেন?”
—” কারন তুমি গত রাতে আমার সাথে ঘুমোওনি।”
ধারা এবারে বুঝ দেয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
—” আমি তো ঘুমোতে চেয়েছিলাম। মুনিরা আপু আটকে দিলো। গত রাতে সবাই অনেক গল্প করেছি জানেন। আমরা অনেক জ্বালিয়েছি মুনিরা আপুকে। রাতের বেলা জিহান ভাইয়ার সাথে কলে কথা বলতে চেয়েছিল, আমরা কথা বলতেই দিইনি।”

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৪

এ পর্যায়ে শ্রাবণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জিহান কলে কথা বলতে না পারলেও স্বয়ং নিজে এসে যে দেখা করে গিয়েছে এ কি আর বলা যায়? তবে সালমা বেগম কেনো এমন কথা বললেন তা এখনো বুঝতে পারলো না শ্রাবণ। এই তো ধারা তো ঠিকই আছে। একটুও অস্বাভাবিক নেই। তবে সালমা বেগম কেনো এমনটা বললেন? শ্রাবণ এ দিক দিয়ে অক্ষম হলো। ভুল করলো ধারার চোখের দিকে না তাকিয়ে।

শ্রাবণ ধারার রূপকথা পর্ব ৪৬