Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৯

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৯

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৯
আরোবা চৌধুরী আরু

নাফিসা অবাক চোখে তাকিয়ে রইল, আর সায়মানের ঠোঁটে খেলে গেল এক চেনা হাসি।
“ঘুম হয়েছে বউ হে, এখন ওঠো। নিজের প্যাকিং সেরে ফেলো।”
নাফিসা চোখ বড় করে বলল,
“মানে? প্যাকিং?”
সায়মান চোখ টিপে হালকা গলায় বলল,
“মানে আমরা বাইরে যাচ্ছি।”
নাফিসা আরও অবাক হয়ে তাকাল, কপালে ভাঁজ পড়ল।
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
উত্তর না দিয়ে সায়মান ওর দিকে আরও ঝুঁকে এল, একেবারে কাছে এসে নাফিসার কপালে একটা ভালোবাসায় ভরা চুমু দিল।
তারপর নরম গলায় বলল,

“ওঠো, রেডি হও। বাকিটা নিজেই বুঝে যাবে।”
নাফিসা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখেমুখে অজস্র প্রশ্ন, কিন্তু সায়মান শুধু হাসল,
সেই হাসিটা যেন একরাশ রহস্যে ভরা, ভালোবাসায় ভেজা।
নাফিসা এখনো চুপ করে বসে আছে, সায়মানের দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।
সায়মান নিজেই আলমারি খুলে একে একে নাফিসার কয়েকটা জামাকাপড় বের করল। ব্যাগটা টেনে নিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কাপড়গুলো ভাজ করে গুছিয়ে রাখতে লাগল।
ব্যাগ গুছানো শেষ করে সায়মান এবার বিছানার ওপর রাখা একটা শপিং ব্যাগ হাতে নিল। এটা সে আজ বাড়ি ফেরার পথে এনেছে। ব্যাগটা হাতে নিয়ে নাফিসার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা দিল সামনে।
গম্ভীর গলায় বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“এটা পড়ে রেডি হয়ে এসো। যাও।”
নাফিসা ব্যাগের দিকে তাকাল। হাত বাড়ালো না। চোখে সরাসরি প্রশ্ন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবশেষে আস্তে বলল,
“এটা কি আর কোথায় যাচ্ছি আমরা …”
সায়মান কপাল কুচকালো।
“ব্যাগটা হাতে ধরো আর রেডি হয়ে এসো ?”
“আগে বলেন , কোথায় যাচ্ছি? আর হঠাৎ করে কেন?”
সায়মান নিঃশ্বাস ফেলে একটু ঝুঁকে এলো, গলাটা নিচু করল।
“বাড়াবাড়ি না করে রেডি হও। সময় কম। তোমার রেডি হতে ইচ্ছা না করলে আমাকে বলো আমি রেডি করে দিচ্ছি। বলেই সায়মান এগিয়ে এসে নাফিসার জামায় হাত দিতে নিলে…. ”

নাফিসা এবার ব্যাগটা সায়মানের কাছ থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে হাতে নিলেও মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আমি আগে না জেনে কোথাও যাবো না। আপনি বলবে, না হলে আমি যাচ্ছি না।”
সায়মান তখন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর একদম সোজা তাকিয়ে বলল,
“জায়গা জানার দরকার নেই। আমার সঙ্গে যাচ্ছো মানে নিরাপদে যাচ্ছো। দিনকে দিন জেদি তৈরি হচ্ছ। ”
নাফিসা তাকিয়ে রইল সায়মানের দিকে। কথার খোঁচা টের পেলেও কিছু বলল না। শুধু শান্তভাবে বলল,
“বিশ্বাস করি বলেই জানতে চাই। আমার পরীক্ষার মাত্র কয় মাস বাকি আছে। হুট করে রাতবিরেতে কোথাও যাওয়ার মানে নেই, যদি না খুব দরকার হয়।”
সায়মান এবার হাসল। ঠান্ডা হাসি।

“এই যে, এটাকেই বলে বাড়াবাড়ি। এই তুমি একদিনে এত কথা শিখে গেলে কিভাবে। আমার আদরে ভালোই কাজ হয়েছে। পুরো বউ বউ ভাব চলে এসেছে। যাই হোক আমি যা বলি, সেটা করা উচিত। প্রশ্ন না। বুঝেছো?”
এখন সায়মানের সাথে গেলে মামনি কে কি বলবো এই লোকের তো এসব ভাবনা নেই। সে বারবার মিথ্যা কথা বলতে পারবে না এমনিতেই ধোকায় রেখেছে। নাফিসা সাহস সঞ্চয় করে বলল,
— “আমি যাচ্ছি না।”

এটা বলেই সে ব্যাগটা টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সায়মান কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। তার চোখে এবার বিরক্তির কোনো চিহ্ন নেই, বরং ভয়ংকর রকম শান্ত। এমন শান্ত, যা দেখে নাফিসার বুক ধক করে উঠল।
সায়মান Nafisa-এর সামনে এসে থামল। দুই হাত পকেটে, চোখ স্থির।
“শেষ কথা?” নিচু, ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল সে।
“হ্যাঁ।” নাফিসা কাঁপা গলায় বলল, কিন্তু দৃষ্টি শক্ত রেখেই।
সায়মান মাথা নাড়ল খুব ধীরে।
“ঠিক আছে।”

এই দুইটা শব্দ বলেই সে হঠাৎ ফিরে গেল দরজার দিকে। নাফিসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। রাগ করলো নাকি লোকটা। সায়মান দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর পেছন ফিরে তাকাল নাফিসার দিকে।
“পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি। নিচে নামবে। না নামলে নিজের সিদ্ধান্তের ফল নিজের দায়িত্বে সামলাবে।”
সায়মান কথাটা বলেই চলে গেল।
ওর ঠান্ডা গলায় দেওয়া সেই হুমকি শুনে নাফিসা ভেতর থেকে ছোট হয়ে গেল। একটু বেশিই তর্ক করে ফেলেছে, এটা বুঝতে পারছে এখন। ঘরে হঠাৎ একটা ভারি নীরবতা নেমে এলো। নাফিসা গলাটা শুকিয়ে যেতে অনুভব করল, তবু মুখ শক্ত রেখেই টেবিলের দিকে এগোল।
টেবিলের ওপর রাখা শপিং ব্যাগটা হাতে নিল। ভেতরে কী আছে দেখার জন্য ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একে একে বের করল কাপড়গুলো
একটা ডার্ক ব্লু জিন্স, সাথে সাদা রঙের কটন কুরতি, গলার কাছে হালকা সুতোর কাজ করা। আর সাথে হালকা নীল রঙের একটা হিজাব।

নাফিসা ভ্রু কুঁচকালো। এগুলো?
এগুলো তো সে কখনও পরে না। কেন দিল সায়মান?
কাপড়গুলো উলটে পালটে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। পাঁচ মিনিট সময় বলেছে মানে সত্যিই অপেক্ষা করছে নিচে। এখন না পরলে সায়মানের রাগ সামলানো কঠিন হবে।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে কাপড়গুলো হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল নাফিসা।

রাত একটা বাজে। চারপাশে নীরবতা নেমে এসেছে। দূরে কোথাও কুকুরের হালকা ডাকা আর বাতাসে থাকা রাতের শীতলতা এই নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে। রিশার ঘরের বারান্দায় বসে আছে জারিন। রিশাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার পর বুকের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা আর ঘুমহীনতা তাকে এই নিস্তব্ধ রাতের সঙ্গে সময় কাটাতে টেনে এনেছে।

মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে দিনের ঘটনার কুৎসিত স্মৃতি সাইফানের সাথে যা ঘটেছে! মনে পড়তেই বুকের ভেতর মোচড় দেয়। চোখের কোণ ভিজে আসে। এতবার চেষ্টা করেও কেন নিজেকে সামলাতে পারল না? কেন বাধা দিল না সাইফানকে? কেন নিজেই নিজেকে আরও বিপদের দিকে ঠেলে দিল? কারণ যাই হোক না কেন, যেটা হয়েছে এটা ভুল। খুব বড় ভুল। আর এই ভুলের জন্য সে সাইফানকে কোনদিন ক্ষমা করবে না কোনদিন না!
চোখ বেয়ে টুপটাপ করে পানি পড়ছে। কিন্তু এসব দুঃখের মাঝেও তার মনে একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে রিশা? ওর অবস্থা তো আরও করুণ। এত বছর ধরে একজন মানুষকে ভালোবেসে অপেক্ষা করছে, অথচ দুজনের মাঝখানে ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব আর হাজারটা বাঁধা। ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও কেউ মুখে বলতে সাহস পাচ্ছে না। কেউ বলেও পাচ্ছে না। হয়তো এগুলোই নিয়তির খেলা যেখানে কেউ জেতে না।
কিন্তু আজ এসব ভাবলে কাজ হবে না। জারিন ঠিক করে যতটুকু সম্ভব হোক, প্রিয় বান্ধবীর মুখে হাসি ফিরিয়ে আনবে। ওর পাশে দাঁড়াবে, ওকে ভেঙে পড়তে দেবে না।

ঠান্ডা হাওয়ায় হঠাৎ জারিনের মনে হলো হাঁটতে ইচ্ছে করছে। মাথা কিছুটা হালকা হবে হয়তো। মনে হতেই চুপচাপ বারান্দা থেকে উঠে রুমের দরজা খুলে করিডোর পেরিয়ে ছাদের দিকে রওনা হলো। ছাদে এসে দেখল, হালকা চাঁদের আলো ছড়িয়ে আছে চারপাশে। ছাদের বাগানের গাছপালার পাতায় বাতাসের দোলায় সুর তুলছে যেন। গিয়ে দোলনায় বসল জারিন। মাথা পেছনে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে থাকার চেষ্টা করল।
হঠাৎই নাকে এল এক বিরক্তিকর গন্ধ। ভ্রু কুঁচকে উঠে বসল সে—সিগারেটের গন্ধ! সাথে সাথে নাক চেপে ধরে বিরক্ত মুখে চারপাশে তাকালো এত রাতে ছাদে কে আছে?
অপর প্রান্তে সাইফান,

ঘুম না আসায় সাইফানও ছাদে উঠেছিল। মাথা এলোমেলো। বারবার ভেসে উঠছে জারিনের কান্নাভেজা চোখ। কেন যেন মেয়েটার চোখের পানি তার বুক জ্বালিয়ে দিচ্ছে। সে নিজেও জানে না কেন তাকে দেখে এমন অস্থির লাগে। কেন ওই মেয়েটার কষ্ট দেখতে পারে না। কিন্তু আফসোস আজ সে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। মজা করতে গিয়ে, এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যেখানে যাওয়ার কোন অধিকার তার ছিল না।

নিজের ওপর অসহ্য রাগ হচ্ছে তার। শান্ত হতে না পেরে সিগারেট ধরেছিল। সাধারণত সে খুব বেশিবার স্মোক করে না। কিন্তু আজ হাত-পা কাঁপছে, মাথা শুন্য, চিন্তা এলোমেলো। তাই একটার পর একটা সিগারেট শেষ করছে।
হঠাৎই অনুভব করল কেউ ছাদে এসেছে। দোলনার দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল জারিনকে। তাদের চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই যেন থমকে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। সাইফান প্রথমে অবাক হলো,, এত রাতে জারিন এখানে কী করছে? কিন্তু পরের মুহূর্তেই খেয়াল করল,, জারিন নাক-মুখ চেপে আছে। বুঝতে তার বেশি সময় লাগল না,, সিগারেটের গন্ধে ও বিরক্ত হয়েছে। একবার জারিনের দিকে তাকালো তারপর কোনো কথা না বলেই সিগারেটটা নিভিয়ে দিল। আধ খাওয়া সিগারেটটা মাটিতে ফেলতেই নিজেই কিছুটা অবাক হলো এটা কি সত্যিই সে করল?
জারিন কপাল গুটিয়ে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে আবার উঠল। নিচে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই সাইফান অদ্ভুত তাড়নায় হাত বাড়িয়ে তার হাতটা ধরে ফেলল।
হঠাৎ হাত ধরা, আর তাতেই যেন আগুনে ঘি পড়ল! জারিন পিছন ফিরল জ্বলে ওঠা চোখে। হাতের দিকে তাকিয়ে তারপর গর্জে উঠল

“কি সমস্যা আপনার? আবার কি ফাজলামো শুরু করলেন? হজম হয়নি একবার! আবার নতুন খেলা? আগে ভাবতাম আপনি একটু ফাজিল টাইপ—কিন্তু এখন বুঝলাম আপনার ক্যারেক্টারেই সমস্যা আছে!”
প্রথম দিককার কথাগুলো চুপচাপ শুনলেও শেষ লাইনটা কানে যেতেই রক্ত গরম হয়ে উঠল সাইফানের। দাঁত চেপে বলল,
“এই মেয়ে, এই চশমা! নিজেকে কি ভাবো? আমার ক্যারেক্টারের দিকে আঙুল তুললে ভালো হবে না। মুখ সামলে কথা বলবা!”
“ও আচ্ছা! এখন আবার নিজেকে ভদ্রলোকও ভাবছেন বুঝি? সরি বলেন আর বাঁচেন সেই চেষ্টা? সরি বলে সব সমাধান হয় না! লজ্জা করে না আপনার?”

সাইফানের ধৈর্য ভেঙে গেল। চোখে রাগ, কণ্ঠে আগুন। এগিয়ে এসে শক্ত করে জারিনের গাল চেপে ধরল,
“জিভ সামলাও! আর একবার ক্যারেক্টারলেস বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো! এই এই মেয়ে নিজেকে কি ভাবিস । আমি যখন প্রথমে তোর দিকে গিয়েছিলাম তখন কেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিস নি। আমাকে বাধা দিস নি কেন। নিজের শরীর ছেড়ে দিছিলে কেন বল।”
জারিন লড়াই করল দুহাতে সাইফানের হাত সরানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারল না। পুরুষের শক্তি বলে কথা তার হাত দুর্বল। চোখে পানি চলে এল লজ্জা, কষ্ট আর রাগে।
সাইফান থেমে গেল ঠিক তখনই, যখন দেখল মেয়েটার চোখে পানি। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল তাকে, কিন্তু নিজেও যেন ভেতরে ভেঙে পড়ল।

“বালের ঝামেলায় পড়েছি আমি! রাজিব ভাই না এগুলো মাথায় ঢুকাতো, মাথা ঠিকই ছিল! কালই ওনার বউয়ের কাছে নালিশ দেবো, বিয়ের পর যেন বাসন ধোয়া বন্ধ করায় ওনাকে! মাথা নষ্ট করে দিল!”
বলে পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে গেল সাইফান। আর জারিন দাঁড়িয়ে রইল স্থবির হয়ে। বুক থেকে কেবল কান্না উঠল শব্দ করে কাঁদতে লাগল দুহাত মুখে চেপে।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩৮

কিছুক্ষণ পর বের হলো বদলে গিয়ে। জিন্স আর কুরতি পরে নিজেকে আয়নায় দেখে যেন নিজেকেই চিনতে পারল না সে।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো। সায়মান…..

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪০+৪১