Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪৯

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪৯

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪৯
আরোবা চৌধুরী আরু

গাড়ি চলল কিছুদূর— ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে সাইফান স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করল। মুখটা কঠিন, কিন্তু চোখ বোঝা যাচ্ছে… কিছু একটা ভাবছে। জারিন পাশ থেকে তাকাল।
“কি হয়েছে? এমন মুখ কেন?”
সাইফান একমুহূর্ত চুপ। তারপর বলল,
“তুমি রিশার সাথে একটু থাকবে। এই কয়দিন। মেয়েটা একদম ভেঙে পড়ছে।”
জারিন শান্ত গলায় বলল,
“থাকবো। তুমিই তো বলেছো… ওর পাশে থাকতে আর আমার বেস্ট ফেন্ড ও এটা ভুলে যেও না ।”
সাইফান মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। গাড়ির ভেতর দু’জনের মাঝে একটা অদ্ভুত নীরবতা তৈরি হলো। হঠাৎ সাইফান বলল,

“ তোমার কি মনে হয়… আকাশের এই আচরণটা ঠিক?”
জারিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল,
“ঠিক–ভুল দিয়ে সবকিছু মাপা যায় নাকি? ছেলেটা ভয় পেয়েছে। পালাচ্ছে। কিন্তু ভুলে যেতে বললেই কি হয়? মানুষের জায়গা মানুষই নেয়?”
সাইফান গভীরভাবে তাকিয়ে থাকল জারিনের দিকে।
“তুমিএমনভাবে কথা বলছিস কেন?”
জারিন হেসে বলল,
“কথা বললেই সমস্যা?”
“হ্যাঁ।
সাইফানের চোখ সোজা ওর চোখে।
“তুমি যেভাবে কথা বলো… তাতে মনে হয় তুমি অনেক কিছু বুঝো।”
জারিন মুখ ফিরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল,
“হ্যাঁ, বুঝি। কিন্তু তুমি বুঝতে চাও না।”
এ কথায় সাইফান চুপ হয়ে গেল। দু’জনের মাঝে আবার নীরবতা নেমে এল। গাড়ি একটা মোড় ঘুরতেই সাইফান বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“চশমা…”
“হ্যাঁ?”
“আমি না থাকলে… নিজের খেয়াল রাখবে? রিশারও?”
জারিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
“তুমি কি যাচ্ছো যুদ্ধ করতে? নাটক বাদ দাও।”
সাইফান হাসল একটু, খুব হালকা…
“শুধু বললাম। তুমি থাকলে… আমার মনটা শান্ত থাকে।”
জারিন তাকিয়ে রইল তার দিকে। সাইফানের চোখে অদ্ভুত নরমতা।
যা সে দেখেনি আগে। হঠাৎ বায়ুতে একটা মোড় ঘোরার মতো অনুভূতি। গাড়ি থামল বিমানবন্দরের কাছে। সাইফান বাইরে নেমে দাঁড়াল। জারিনও নামল। হাওয়া বইছিল।জারিনের চুল মুখে এসে লাগল। সাইফান আস্তে করে চুল সরিয়ে দিল। জারিন দম আটকে গেল,

“এই! কি করছো?”
সাইফান মলিন হাসল,
“যাচ্ছি তো… তাই ভাবলাম…”
জারিন চোখ পাকাল,
“এভাবে চুপচাপ চলে যেও না। ফোন দিও।”
“দিবো।”
তারপর একটু থেমে,
“তুমি ধরবে তো? তুমি আমার সাথে ভালো কথা বলতে চাও না ”
জারিন ঠোঁট কামড়াল, চোখ ঘুরিয়ে বলল,
“মood ভালো থাকলে ধরবো।”
সাইফান হেসে ফেলল এবার,
“ঠিক আছে। মুড ঠিক রাখতে চেষ্টা করবো।”
ঠিক তখনই অফিসের একজন কামচারী এসে বললো বলল,
“স্যার , সময় হয়ে গেছে।”
সাইফান এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

“চশমা…”
“হুম?”
“খেয়াল রেখ। নিজের।”
জারিন কথা বলতে গেলেও গলা আটকে গেল।সাইফান ঘুরে হেঁটে গেল ভিতরের দিকে।জারিন দাঁড়িয়ে রইল জায়গাটায়… যতক্ষণ না সাইফান চোখের আড়াল হয়ে গেল। তারপর ধীরে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“পাগল ছেলেটা…”
মুখ ঘুরিয়ে হাঁটতেই মুখোমুখি,
আকাশ। হঠাৎ করেই।চোখ থেকে চশমা খুলে নিল সে।
দু’জনের চোখ কয়েক সেকেন্ড আটকে রইল। আকাশের চোখে ক্লান্তি। অস্থিরতা। জারিন কঠিন গলায় বলল,
“তোমার সাথে কথা বলা লাগবে আকাশ ভাই । অনেক।”
আকাশ ঠোঁট চেপে বলল,

“আজ নয়। আমি… আমি ব্যস্ত।”
জারিন এগিয়ে এক ধাপ সামনে দাঁড়াল।
“রিশাকে ভুলে যেতে বলেন? ভুলে গেলে তো তুমি স্বস্তিতে থাকার কথা। তাহলে আমাকে দেখে তোমার মুখ সাদা হয়ে গেল কেন?”
আকাশ কিছু বলল না। তার চোখে ভয়টা আরও স্পষ্ট। জারিন ঠোঁট বাঁকাল,
“ভাগো।
ভয় থেকে পালাও। কিন্তু মনে রাখো মানুষের জায়গা মানুষই নেয়… আর যারা ভয় পায়… তাদের জায়গা একদিন শূন্য হয়ে যায়।”
আকাশ কিছু বলতে পারল না।তার মুখে কোনো শব্দ এল না।
শুধু চোখ দুটো লাল হয়ে উঠল। কোনকিছু না বলে চলে গেলো। জারিন আকাশের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো।

হাসপাতালের সাদা আলোটা যেন আজ আরও বেশি কটু লাগছে সবার চোখে। কয়েক মুহূর্ত আগেও সবার অবস্থা যতই টেনশনের হোক, অন্তত একটা জিনিস সবাই নিশ্চিতভাবে জানতো—নাফিসা শুধু পড়ে গিয়েছে, মাথায় আঘাত লেগেছে, শরীর খারাপ হয়েছে। এর বেশি কিছু না। কিন্তু ডাক্তার যে এক বাক্য বলল, সেটাই যেন মুহূর্তে বাতাস থমকে দিল।
ডাক্তারের মুখে কথাটা শোনার পর আফিয়া বেগমের ভ্রুগুলো কুঁচকে গেল। তিনি যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না, তিনি ঠিক শুনেছেন কি না। হঠাৎ শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। চোখের মণিটা বড় হয়ে গেল অবাক হয়ে।
“মানেটা হচ্ছে নাফিসা প্রেগন্যান্ট। তিন মাস রানিং।”

ডাক্তারের স্বরটা ছিল পুরো শান্ত, খুব স্বাভাবিক একটা খবর জানাচ্ছে। কিন্তু এই খবরটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না।
আফিয়া বেগমের মুখ প্রথমে নিস্প্রাণ হয়ে গেল, তারপর মুহূর্তের মধ্যেই রাগে লাল হয়ে উঠল মুখ। কথাটা বিশ্বাস করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। এত বছর এত কাছে রেখে মানুষ করেছেন নাফিসাকে—তার মেয়ে এমন কিছু করবে? এইটা ভাবলেও বুকের ভেতরে শূন্য হয়ে যায় তাঁর। তিনি হতভম্ব চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনি কী জাতা মাতা বলতেছেন? ঠিকভাবে বলেন! আপনার ভুল হইছে কি না দেখেন আগে!” ——— গলার স্বর কেঁপে উঠল।
ইমা বেগম সাথে সাথে এগিয়ে এসে তাঁর কাঁধে হাত রাখল,
রিশা আর মেহেরিন এক মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। এরা দুজনেও যেন আকাশ থেকে পড়েছে। এতক্ষণ যা শুনেছে

—সবই যেন ভুল!
মেহেরাবের মুখের কালার পাল্টে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে এসেছে। হাত দুটো ফাঁকা হয়ে ঝুলে আছে। মেহেরিন ভাইয়ের হাতটা চেপে ধরল শক্ত করে। বোঝার মতো করে চোখে একটা আশ্বাস দিল,
“চিন্তা করো না, আগে নিশ্চিত হই…”
রিশা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,

“Are you sure, doctor? আমার মনে হয় কোথাও ভুল হইছে…”
ডাক্তার এবার visibly irritated।
“আমি ভুল বলব কেন? রিপোর্ট দেখেন। তিন মাসের প্রেগন্যান্সি—একদম clear। আর আপনারা বাসার মানুষ হয়ে জানেন না? হাজব্যান্ড কোথায় ওর?”
শব্দটা—হাজব্যান্ড—এই মুহূর্তে সবাইকে আরেকবার কেটে দিল ছুরির মতো। আফিয়া বেগম এবার সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেলেন। মুখে কোনো শব্দ নেই। চোখ দুটো বিস্ফোরিত যেন। ইমা বেগম তাঁকে ধরে দাঁড়িয়ে।
ডাক্তার আবার বলল,

“ও পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু luckily বাচ্চার কোনো ক্ষতি হয়নি। এটা অনেক বড় বিষয়। অল্প বয়সে এই প্রেগন্যান্সি risky। পুরো rest প্রয়োজন। স্ট্রেস নিওয়া যাবে না। গাইনি স্পেশালিস্ট দেখাবেন। আমি একটা ইনজেকশন দিয়েছি—কিছুক্ষণ পরই জ্ঞান ফিরে আসবে। বাসায় নিতে পারবেন।”
এত বলেই ডাক্তার ফাইলটা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল। ডাক্তার বের হতেই পুরো রুমটায় নিস্তব্ধতা নেমে এলো। যেন হঠাৎ সবাই শুনতে পেল নিজেদের হৃদস্পন্দন। এক এক করে সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কেউ কথা বলছে না। কেউ ব্যাখ্যা দিচ্ছে না। সবাই একই প্রশ্নে আঘাতে আঘাতে ভেঙে যাচ্ছে
নাফিসা… প্রেগন্যান্ট?
কীভাবে? কবে? কার?

মেহেরিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে দাঁড়ানো মেহেরাব একদম নিস্তব্ধ। তার মুখে কোনো শব্দ নেই। মুখের এক্সপ্রেশন দেখেই বোঝা যাচ্ছে—সে ভিতর থেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
বোন হিসেবে মেহেরিন খুব ভালো করেই বোঝে ভাইয়ের মুখ। গত কয়েক বছর ধরে ও দেখছে কিভাবে মেহেরাব নিজের মনটা নাফিসার দিকে হেলে দিচ্ছে। ওর মাঝে কতটা দুর্বল হয়ে আছে ভাই।
আর আজ…
যে মেয়েকে ভাই নিঃশব্দে নিজের মনে জায়গা দিয়েছিল—সে মেয়েই… প্রেগন্যান্ট?
কিন্তু মেহেরিন নিজের মনেই নিজেকে থামালো,

“না, কিছু একটা ভুল হতেই পারে। এমন কিছু হতে পারে না। নাফিসা এমন না।”
ঠিক তখনই আফিয়া বেগম ধীরে ধীরে বললেন,
“কেউ এখন ওকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না। আমি চাই না বাইরে কোনো সিনক্রেট হোক। বাসায় নিয়ে যাই। তারপর যা হওয়ার হবে। আমি বিশ্বাস করি আমার মেয়ে এমন কিছু করে নাই। আমার মেয়ে… আমি ওকে নিজের হাতে মানুষ করছি। ওকে আমি চিনি।”
তার কণ্ঠে দৃঢ়তা কিন্তু কষ্টের কম্পন মিশে আছে।
এমন সময় নাফিসার চোখ সামান্য কাঁপল। দীর্ঘ শ্বাস নিল।
জ্ঞান ফিরছে।
সবাই একসাথে নড়েচড়ে তাকালো ওর দিকে। কেউ আগে কথা বলল না। কেউ এগিয়েও গেল না আতঙ্কে—কারণ সবাই ভয়ে আছে সত্যিটা জানার।
আফিয়া বেগম দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।

“মা… কেমন লাগতেছে? চোখ খোলো।”
নাফিসা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। চোখে এখনো ঝাপসা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল চারপাশে—রিশা, ইমা, মেহেরিন, মেহেরাব সবাইকে দেখে বিভ্রান্ত হয়ে গেল।
“মামনি … আমি… পড়েছিলাম?”
“হুম। এখন ভালো আছো। বাসায় যাবো।”
নরম, মায়া ভরা স্বর। কিন্তু আফিয়া বেগম এখনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একটা কথাও তিনি এখন বলবেন না নাফিসাকে নাফিসাকে আস্তে করে উঠিয়ে চেয়ারে বসানো হলো। দুই মিনিট পর ওকে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে বের করা হলো।
পুরো সময়টায় কেউ একটি শব্দও করেনি।
মেহেরাব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কেবল একবার তাকালো নাফিসার যাওয়ার দিকে। চোখে এমন দৃষ্টি—অসহায়। মেহেরিন ভাইকে পাশে টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“ভাই… মন খারাপ কইরো না। হয়তো ভুল রিপোর্ট। ডাক্তাররা ভুলও করে। আগে শুনি সব।”
মেহেরাব কিছু বললো না, শুধু মাথা নেড়ে দাঁড়িয়ে রইল।

রাশিদ ভিল্লার গেটটা আজ অস্বাভাবিক নীরব। বিকেলের হালকা আলোয় গাড়িটা ঢুকতেই রুশা গভীর শ্বাস ফেলল। মুখে বিরক্তি আর চোখে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা।
“আরিব, একেবারে জোর করে নিয়ে এসেছে ! এখনই এসব বলার সময় না। সায়মান বাসায় নেই ——এইটাই তো সবচেয়ে বড় সমস্যা।”কত বোঝালো আরিবকে কিন্তু আরিব আজ থামার মতো অবস্থায় নেই।
“আমি পারতেছি না আর, রুশা আপি । আজ নাফিসার শেষ পরীক্ষা… আজকেই আমি ফুপুমনিকে সব বলবো। আমি ওকে ভালোবাসি—এটা আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।”
রুশা চোখ উলটে তাকাল,
“ভালোবাসো বুঝলাম, কিন্তু সময় বলে একটা জিনিস আছে। নাফিসাকে তো সায়মানই নিয়ে এসেছে । সে-ই পুরো দায়িত্ব নিয়েছে। এমন সময়ে এসে যদি তুই বিয়ে–ভালোবাসার কথা তুলিস, উল্টা মা’ই রাগ করে বসবে ও বাসায় আসলে সব বললে ভালো হতো ।”

“আপি চলেই এসেছি এখন আর এতো কথা বলিস না প্লিজ। ”
বাসার ভিতরে ঢুকে বসতেই রুশা একজন গৃহকর্মীকে জিজ্ঞেস করলো আফিয়া বেগম কোথায় আর বাকি রা কই রুমে আছে কি সবাই।
মেডাম তো হসপিটালে গেছে আফা।
রুশা প্রথমেই জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?”
হে আফা নাফিসা আফা অসুস্থ হয়ে পরছে, কলেজ থেকে ফোন এসেছিলো তাই ওখানে গেছে ।
কথাগুলো শুনে আরিবের মুখ সাদা হয়ে গেল। হাত দুটো কাঁপছে।
শরীরটা নিস্তেজ হয়ে গেল এক মুহূর্তে।

“নাফিসা… হসপিটালে?”
স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ পর্যন্ত করতে পারল না সে।
আরিব আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। রুশার হাত ধরে টানল,
“চলো ! গাড়িতে ওঠো । এভাবে দাঁড়িয়ে থেকো না আর। আমরা এখনই যাই।”
ঠিক তখনই,,ভিল্লার বড় গেটের দিকে গাড়িটা এগোতে শুরু করেছে। হঠাৎ রুশা দেখল, গেটের সামনে একটা গাড়ি ঢুকছে ভিতরের দিকে। আরিব তাকাতেই শ্বাস আটকে গেল।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪৭+৪৮

নাফিসা।
ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামছে। পাশে আফিয়া বেগমও আছেন।
আরিবের বুকের ভেতর সবকিছু গুলিয়ে উঠল— নাফিসাকে চোখের সামনে দেখার স্বস্তি।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫০