চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৮
ইশরাত জাহান জেরিন
এলাহী বাড়ির বৈঠকখানায় সোহান এসে মাত্র বসেছে। রাজন একটু আগেই গোসল করেছে। সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পড়ে উপস্থিত হয়েছে বৈঠকখানায় সে।বৈঠকখানায় ঢুকতে না ঢুকতেই রাজন, নদীকে কড়া গলায় চেঁচিয়ে বলল ,”জলদি চা নাস্তার ব্যবস্থা কর। সব তোরে কী মুখে তুইলা বইলা দিতে হইব?”
নদী সেই ধমকে কেঁপে উঠল। কিন্তু সহ্য করা ছাড়া নদী আর কিছুই পারেনা। তবে সে এতটুকু জানে যেদিন সহ্য করার ক্ষমতা হারাবে, সেদিন একই সঙ্গে আরো অনেক কিছুই তাকে হারাতে হবে। নদী বৈঠকখানা থেকে বের হয়ে রান্না ঘরে যেতেই সিফাত এবার রাজনকে বলল, “আপনি তো আরেকটা বিয়া করছেন। ভাবি জানে?”
“কিসের ভাবি? ওরে কোন দিন জানি আমি মাইরাই ফেলি। দেখলেই জবাই করতে মন চায়। অসহ্যকর মাইয়া লোক। কেমন ময়লা গায়ের রঙ। এলাহী বাড়ির কোন বউটা ওর মতো এমন কালা টিক্কার ছালি দেখতে? এমন কালা মাইয়া মানুষ নিয়া একঘরে শুইতেও বহুত কষ্ট হয়।”
হঠাৎ সোহান বলল, “রাবসার কথা জানে তোমার বউ?”
“জানলেই কি আর না জানলেই কি? ওর জানা না জানাতে আমার কিছু আসে যায় না।”
“তবে মাইয়াটার চোখ-মুখে মায়া আছে। কালা না, শ্যামলা গায়ের রঙ। আচ্ছা একটা কথা, এই বউ নিয়া এত ঝামেলা তো ধান্দায় লাগাইয়া দেও। বেঁইচা দিলেই হয়।”
“মায়ার প্রেমে রাজন পড়ে না। আর মায়া দিয়া কি করমু? মায়া খারাপ জিনিস। তবে এই টুকু জানি এই বালের বউরে লাত্তি মাইরা কোনদিন জানি বাড়ি ছাড়া করি। এটারে খালি রাখছি কারণ এটা আস্ত একটা বলদ। যা কই তাই করে, নইলে বউ যদি চিত্রার মতো হইত তাইলে তো কবেই মরত। ওই মাতারি কিন্তু সেয়ানা আছে।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সোহান রাজনের দিকে আচমকা রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকাতেই রাজন থেমে যায়। “দেখো রাজন, আমরা কাজের ক্ষেত্রে পার্টনার। ভালো সম্পর্ক। তাই বইলা আমি যারে পছন্দ করি তারে নিয়া বাজে কথা কইলে মোটেও ছাইড়া দিমু না। আমার মায়ের শেষ ইচ্ছা বউ দেখার। আর আমার শেষ ইচ্ছা চিত্রারে বউ করার।”
“দেশে এত মাইয়া থাকতে কেন ওই চিত্রাই? ফারাজের সাথে এমনিতেও কি কম ঝামেলা বাইধা আছে?”
“হ চিত্রাই। তার শুরুর দিনই আমার হওয়ার কথা ছিল। ওরে আমি কিন্না নিছি বুঝছো? ওই বুইড়া যদি পালাইয়া না যাইয়া এই চিত্রার কথা আমারে কইত, তাও ওরে বাঁচাইয়া রাখতাম। কিন্তু ওই হালায় পালাইছিল! সাহস কত বড়!”
“এখন তুমি যে কইলা সোহান ভাই, একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে সেইটা কী?”
“কইতাছি। তার আগে কও রোশান কি নতুন ডিলটা সামলানোর জন্য রাজি হইছে? কারণ ওইটা সে ছাড়া কেউ সামলাইতে পারব না।”
“সে সিংহ থাইকা ভেজা বেড়াল হইছে। বউয়ের আঁচল ছাড়া কিছুই বুঝেনা। আমি তারে অনেকবার বুঝাইছি। আমার টাকার দরকার। তার কারণে যদি ডিল হাতছাড়া হয়, খোদার কসম কেয়ামত হইয়া যাইব। আমি রাজন ভালো কইরাই জানি সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল কেমন কইরা বাঁকাইতে হয়।”
“তবে সমস্যা কিন্তু এখন চতুর্দিক দিয়া একজনই ঘটাইতাছে।”
“কেডা?”
“কেডা মানে? ফারাজ এলাহী ছাড়া আর কে? সে এইখানে আসার পর থেকে ঝামেলা শুরু হইছে। তার মায়ের খুনের পেছনে তোমার বাপ-মাও আছে৷ বাপের খেল তো খতমই করছে। তার পোলাপানগোরে কি ছাড়বো? জোহানও কিন্তু ছাড় পায় নাই।”
রাজন একটু চিন্তায় পড়ে গেল। আসলেই এই ফারাজ এলাহীর জন্য কিছুই হচ্ছে না। কিছু তো একটা করা লাগবে। সোহান উঠে দাঁড়ালো। রাজনের কাঁধে হাত রেখে বলল, “ফারাজের একমাত্র দূর্বলতা চিত্রা। আমরা যদি সেইখানে হাত দিবার পারি তো কাজ হইব।”
“মাইরা ফেলবা চিত্রারে?”
“আরে দূর। ওরে তো আমি পছন্দ করি। ওরে বউ বানামু। তবে ওরে ব্যবহার কইরা ফারাজরে কিন্তু মারা যাইব।”
“এটা অসম্ভব। ওরা দুইটা আঠার মতো সারাদিন লাইগা থাকে। কত পিরিতি!”
“আমি সেই আঠা হাতে সরিষার তেল মাইখা টাইনা ছিড়মু। আমারে খালি সময় দেও। চিত্রারে আমার হইতে সাহায্য করলে আমার ভাগের আরো ২০% শেয়ার আমি তোমার নাম কইরা দিমু। এখন কি চাও? শেয়ার নাকি ফারাজ এলাহীর পায়ের তলায় পইড়া থাকতে?”
রাজন চুলে বুলাতে বুলাতে কি যেন ভাবল। হঠাৎ সেইসময় নদী এসে চা নাস্তা নিয়ে বৈঠকখানায় প্রবেশ করল। একটা সাদামাটা শাড়ি পড়েছে। শ্যামবর্ণা নদীকে এই রঙেও ভীষণ মানিয়েছে। কোঁকড়া চুলগুলো তার খোঁপা করা। মাথায় টেনে ঘোমটা দেওয়া। হঠাৎ নদী ঝুঁকে সিফাতকে চা দিয়ে রুম থেকে বের হতেই সিফাত রাজনকে কি একটা ইশারা করল। নদী তা বুঝল না। সে চলে যেতেই সিফাত, সোহানকে আবদার করে বলল, “ভাই আমার কিন্তু রাজনের বউরে ভালোই পছন্দ হইছে। ব্যবস্থা করা যাইব না কোনো?”
সোহান, রাজনের দিকে চাইতেই রাজন বাঁকা হেসে জবাব দিলো,”বিয়া করাইয়া দিমুনে একেবারে?”
“আজকে রাতেই দিতেন।”
” আজকে রাবসার কাছে যামু রাইতে। বাসায় ফারাজ থাকব। আইসা যদি কাম সারতে পারো তো সারো। পরে গোয়া মরা খাইলে আমি দেখতে পারুম না।”বলেই হাসল রাজন। নদী দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। মিষ্টি নিয়ে ঢুকবে বলে, কিন্তু স্বামীর কথা গুলো থমকে দিলো তার পা। বুকটা কেঁপে উঠল। চোখে জল। তার স্বামী রাতে তার রুমে অন্য পুরুষকে যেতে বলছে? বউয়ের সঙ্গে নোংরামি করতে বলছে। হঠাৎ রুমের দরজা খুলে রাজন বের হয়ে এলো। তার পেছনে বাকিরাও আছে। নদীর শরীরটা কেঁপে উঠল। নদীকে দেখে রাজন বলল,”তোর বালের আর আপ্যায়ন মারাইতে হইব না। সামনে থেকে যাহ।”
একপ্রকার ধাক্কা দিয়েই নদীকে সামনে থেকে সরিয়ে দিয়ে হুরহুর করে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় সিফাত নোংরা ভাবে নদীর দিকে চাইল। শিস বাজিয়ে যেতেই নদীর চোখের স্রোত বাড়তে থাকল। রাজন কিছুই বলল না। ফিরে তাকালোও না কিছু বলা তো দূরের বিষয়। তবে সোহান বাইরে যাওয়ার আগে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে চিত্রাকে নামতে দেখল। চিত্রা আর তার চোখাচোখি হয়েও তাড়াহুড়োয় অন্য কোথাও হারিয়ে গেল। একটা জুরুরি কল এসেছে। মানুষ মারার কাজ হয়তো। সোহান বাইরে গিয়ে সরাসরি গাড়িতে উঠে বসল। তারপর মোছে হাত বুলিয়ে সিফাতকে আলতো করে বলল,”চিত্রা কি আসলেই তালুকদার বাড়ির মাইয়া? তোর কি মনে হয় না ফারাজরে চিত্রা এখনো ক্ষমা করে নাই?”
“এমন ভাবার কারন?”
“কেউ নিজের বাপ-মায়ের খুনিরে ভালোবাসতে পারে? যাক এত কিছু জানার দরকার নাই। তবে কথা হইলো চিত্রার বিষয়ে আমি আরো ভালো কইরা জানতে চাই। তালুকদার বাড়িতে সাতাশজন মানুষ মরল, একা সে বাঁইচা গেল। আর এখন ঘুইরা ফিইরা এই মেয়েই তার পরিবারের খুনির বউ। খুব স্বাভাবিক হইলেও খানিকটা অস্বাভাবিক তাই না?”
রাতে কাজ শেষ করে রাজমিস্ত্রির দলটা এলাহী বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা বড় রাস্তাটার দিকে পা বাড়াল। এলাহী বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া এই রাস্তাটার নামই ‘এলাহী সড়ক’। সড়কে ঢুকে একেবারে শেষ মাথায় গেলেই এলাহী বাড়ি। কিশোরগঞ্জ সদরে এলাহী নামটাই মানুষের মুখে মুখে। বেশিরভাগ জায়গা-জমি এলাহীদের নিজস্ব। এক সময় জমিদার ছিল—এইটুকু নাম আর আধিপত্য তো এমনি এমনি আসেনি। দলটা এলাহীদের পারিবারিক কবরস্থানের পাশ দিয়ে বড় রাস্তায় উঠতে বাঁক নিতেই হঠাৎ রশু থেমে বলল,
“ভাই, প্রস্রাব পাইছে। আপনারা যান, আমি আইতাছি।”
বাকি লোকজন দাঁড়াল না। অভ্যস্ত পথ, অভ্যস্ত রাত। রশু সিগারেট ধরাল, একটা বিরিতে আগুন জ্বেলে বাঁশঝাড়ের সামনে গিয়ে বসে পড়ল। লুঙ্গি ঠিক করে ঠোঁটে চেপে ধরল সিগারেটটা। ধোঁয়া টেনে নিল। তারপর বাতাসে ছেড়ে দিল। গুনগুন করতে করতে নিজের কাজে মন দিল। ঠিক তখনই হঠাৎ তার গান থেমে গেল।
প্রথমে পাত্তা দিল না। রাতের নীরবতায় অনেক সময় মাথার ভেতরের শব্দও চুপ করে যায়। কিন্তু পরমুহূর্তেই বুকের ভেতর কেমন একটা খচখচ শুরু হলো। ভয়? না, পুরুষ মানুষের আবার ভয় কিসের? সে কান খাড়া করল।পাতার নড়াচড়া নেই। বাতাসও থেমে আছে।
তবু… মনে হলো—কেউ একজন তার একদম পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। রশুর গলা শুকিয়ে এল। সিগারেটের ধোঁয়াটা এবার কেমন যেন গলা জ্বালিয়ে দিল। সাহস করে সে ধীরে ধীরে পেছন ফেরানোর চেষ্টা করল। খুব ধীরে। যেন পুরোটা ঘুরলেই যদি কিছু বদলে যায়।পুরোটা ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই রশুর নাকে একধরনের তীব্র, অচেনা গন্ধ এসে লাগল। বুঝে ওঠার আগেই মাথার ভেতরটা কেমন ঝিমিয়ে এলো। শব্দগুলো দূরে সরে যেতে লাগল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, নিজের নিঃশ্বাস সব যেন পানির নিচে চলে গেছে। সে কিছু বলতে চাইল। গলা দিয়ে শব্দ বেরোলো না। চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো, এমন ভারী যে খুলে রাখাই কষ্টকর। চারপাশটা ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে লাগল। বাঁশঝাড়, অন্ধকার সব গলে গিয়ে একটানা কালচে ছোপে মিলিয়ে গেল। শেষ মুহূর্তে শুধু মনে হলো, ভুল জায়গায় থমকে গেছে সে।তারপর চোখটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে এলো।
বাজিতপুর হাসপাতাল। দূরের ওয়ার্ড থেকে ভেসে আসে কাশি, স্ট্রেচারের চাকার শব্দ, নার্সের হালকা পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। করিডোরের সাদা আলোয় দেয়ালগুলো কেমন নিষ্প্রাণ লাগছে। মার্জিয়া জানালার পাশে বসে ছিল হাসপাতালের দেওয়া পাতলা চাদরটা গায়ে জড়িয়ে। চোখ দুটো আগের মতো ফাঁকা নয়। অনেকদিন পর চোখে একটা স্থিরতা এসেছে।
স্বামী, সন্তান, বউমা এক এক করে সবাই চলে যাওয়ার পর যে মানুষটা দিনের পর দিন কথা বলত না, আজ সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাকিয়ে থাকা এইটুকুই এখন তার বড় জয়। দরজার পাশে হালকা শব্দ হতেই সে ঘুরে তাকাল। সোহাগ ঢুকছে। সারাদিনের ক্লান্তি তার মুখে স্পষ্ট। ধুলো-মাখা জামা, কাঁধ ঝুলে পড়েছে। তবু মাকে দেখেই সে একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“আইছোস?” মার্জিয়ার কণ্ঠটা শুকনো।
সোহাগ চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। ” হ্যাঁ আম্মা। দেরি হইছে। কাজটা আজ একটু বেশি ছিল।”
” খাইছস কিছু?”
” দুপুরে। রাতে আর খাই নাই।”
মার্জিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, কাজ বেশি কইরা শরীর ভাঙিস না। তোরে দেইখা আমার ভয় লাগে।”
সোহাগ হালকা হাসল। ” ভয় পাইও না। আমি ঠিক আছি।”
” ঠিক আছিস বলেই তো ভয় লাগে। সবাই ঠিকই ছিল…” কথাটা সে শেষ করল না মার্জিয়া।
কিছুক্ষণ নীরবতা। হাসপাতালের দূরের ঘড়িতে টিকটিক শব্দ। “আম্মা…”
“ক?”
” আজ ডাক্তারের লগে কথা হইছে। উনি কইছে, তুমি আগের চাইতে ভালো আছো।”
মার্জিয়া জানালার দিকে তাকিয়েই বলল, ভালো মানে কী, সোহাগ?”
“মানে… তুমি আগের মতো চুপ থাকো না। কথা কও। মানুষ চিনতে পারো।”
” মানুষ চিনতে পারাই তো কষ্ট।”
সে একটু থেমে যোগ করল, ” তবু… মাথার ভেতরের শব্দটা এখন কম।”
সোহাগ মাথা নিচু করে বলল, ” এইটাই অনেক, আম্মা।”
মার্জিয়া ছেলের দিকে তাকাল। অনেকদিন পর এমনভাবে তাকাল৷ “তুই সারাদিন আমার লাইগা খাটস। তোরও তো একটা জীবন আছে।”
সোহাগ ধীরে বলল, “আমার জীবন তো এখন কেবল আপনি।” চোখের সামনে ঝাপসা করে ভাসল চিত্রার ছবি। ওই ছবিটা চোখের সামনে এলেই বুক ফাটে।মার্জিয়া কিছু বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে ছেলের কাঁধে রাখল। হাতটা কাঁপছিল না—এটাই সবচেয়ে বড় কথা।
বাজিতপুর হাসপাতালের রাতটা আবার নীরব হয়ে এল।
মায়ের ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে সোহাগ করিডোরে এসে দাঁড়াল। দেয়ালে হেলান দিয়ে সে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। মনে হলো শ্বাসটা ফুসফুসে ঢুকছে না, কোথাও আটকে যাচ্ছে। সারাদিন কাজের পর এই ক্লান্তি নতুন না। নতুন হলো—এই ক্লান্তির ভেতরেও বিশ্রাম নেই। তার চোখের সামনে হঠাৎ দিনের দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল। মাটির গন্ধ, ঘামের তাপ, মানুষের রূঢ় কথা, টাকা না থাকার হিসাব। সকালে বেরোনোর সময় মাকে দেখে এসেছে, রাতে এসে আবার দেখে যাচ্ছে এই দুই মুহূর্তের মাঝখানে তার নিজের জন্য কিছুই নেই।
সে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে নীরব রাস্তা, দূরে মেঘনার দিক থেকে আসা ঠান্ডা হাওয়া। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে এল। “আমি কতদিন এভাবে টানতে পারবো?” প্রশ্নটা কাউকে করেনি, নিজেকেই।
মায়ের কথা মনে পড়ল। “তুই থাকলেই জানি আমি একা না।” এই কথাটাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি, আবার সবচেয়ে বড় বোঝা। সে ভয় পায়, একদিন যদি ভেঙে পড়ে? ভয় পায় যদি কাজ হারায়? ভয় পায় যদি মায়ের সামনে শক্ত থাকতে না পারে?
সোহাগ দুই হাত দিয়ে মুখটা ঢাকল। চোখে জল আসে না। কাঁদতেও পারে না। কাঁদলে যেন সব কিছু একসাথে বেরিয়ে আসবে। সে ভয়টাই বড়।
হঠাৎ ওয়ার্ডের দরজা একটু শব্দ করে খুলল।
মার্জিয়ার কণ্ঠ ভেসে এল,” সোহাগ?”
সে তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল। গলা পরিষ্কার করে বলল, ” হ্যাঁ আম্মা, আছি।”
ভেতরে ঢোকার আগে একবার নিজের বুকটা চাপ দিয়ে ধরল।আরেকটু। শুধু আরেকটু শক্ত থাকতে হবে।
বাজিতপুর হাসপাতালের রাতটা তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলল না। কিন্তু সোহাগ জানে এই নীরবতার মধ্যেই তার লড়াই চলছে। কঠিন এক লড়াই।
মাছের গোডাউনটা কিশোরগঞ্জের পুরোনো নদীবন্দরের ধারে। বরফ গলানো পানির সঙ্গে মাছের আঁশ আর রক্ত মিশে মেঝেতে চিকচিক করছে। চারপাশে বড় বড় কাঠের ক্যারেটে রুই, কাতলার স্তূপ, চোখগুলো নিস্তেজ হয়ে তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। ছাদের ফাঁক দিয়ে ঝুলে থাকা হলুদ বাল্বগুলো আলো দেয় কম, ছায়া দেয় বেশি। ফারাজ একটা উল্টে রাখা ক্যারেটের ওপর বসে আছে। কপালের ভাঁজে বিরক্তি, গন্ধটা তার সহ্য হয় না, কখনোই হয়নি। সে এই শহরের মানুষ, তবে এই শহরের স্বভাবও তার নয়। ঠিক তখনই অভ্র এসে ঢোকে গোডাউনে। ফারাজ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “বললাম না আসার সময় স্প্রে নিয়ে আসবি? এই মাছের গন্ধে দম নেওয়া যায়?
অভ্র কিছু বলার আগেই ফারাজ তার হাত থেকে স্প্রে কেড়ে নেয়। একের পর এক চাপ দেয় নিজের চারপাশে। তবু গন্ধ যায় না, শুধু একটু সহনীয় হয়। কিছু করার নেই। কিশোরগঞ্জের মানুষ এরা। মাছই এদের ধর্ম, ব্যবসা, সব। ফারাজ চোখ তুলে তাকায় খারাপ।স্প্রে নামিয়ে হঠাৎ কণ্ঠটা কড়া হয়ে ওঠে। “কিরে, ওই রাজমিস্ত্রি… রাশু না হিশু ওটা কই? ধরে আনতে বলেছিলাম না?
অভ্র গলা খাঁকারি দেয়। ” হিশু না মানে রাশুকে পাইনি ভাই। অনেক খুঁজেছি।”
ফারাজ ঠোঁট বাঁকায়। “টু মাচ ছোটলোকি কারবার।”
” সত্যি ভাই, কোথাও পাইনি।”
ফারাজের চোখ সরু হয়। ” আমার ওর চোখ দু’টো চাই।”
অভ্র ধীরে বলে, “দেখছি ভাই।”
ঠিক তখনই ফারাজের ফোন বেজে ওঠে। সে উঠে দাঁড়ায়, এক হাতে ফোন ধরে অন্য হাতে প্যান্টের ভাঁজ ঠিক করে। কথা শেষ করে পকেটে ফোন ঢোকায়।
অভ্র সাবধানে জিজ্ঞেস করে, “কোথাও যাবেন নাকি ভাই?”
ফারাজ হালকা হাসল।” হু। একটা কাজ আছে। গাড়ি বের করো, কুদ্দুসের বাপ।”
একটু থেমে চোখ মেরে বলে, ” ভাবছিলাম চোখ বের করে বাংলা মদ দিয়ে হাত ধুয়ে পবিত্র করব। বাসায় গিয়ে কলিজা ভুনা দিয়ে ভাত খাবো।হলো নারে। কষ্টে মাইরি, পেছনটা অবধি নড়ে উঠছে।
অভ্র মুখ কুঁচকে ফেলল, ” ছ্যাহ! কিসব ছোটলোকি কথাবার্তা।”
ফারাজ কিছু বলল না। শুধু গোডাউনের ভেতরটা একবার দেখে নিলো। মরা মাছের চোখের সারি, বরফের ওপর জমে থাকা নোংরা পানি, আর এই শহরের গন্ধ, যেটা সে কোনোদিন আপন করতে পারবে না। নাকি মাতৃভূমির টানে আপন করেই নিবে? এসব ভাবতে ভাবতে সে বেরিয়ে যায়।
গাড়ি ফেলে ফারাজ হেঁটে ঢোকে জঙ্গলের ভেতর। পিচের রাস্তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। এরপর শুধু কাঁচা মাটি, শুকনো পাতা আর জঙ্গলের ভেজা গন্ধ। গাছগুলো এখানে লম্বা নয়, কিন্তু ঘন। এমন ঘন যে আকাশের একটা টুকরোও ঠিকমতো দেখা যায় না।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। চওড়া না, কিন্তু গভীর। নদীর ধারে কাদা জমে আছে, তার ওপর ছাপা পায়ের ছাপ। বোঝা যায়, এখানে কেউ আসে। তবে নিয়মিত না। নদীর একেবারে কিনারায় একটা বাড়ি। একটাই বাড়ি এখানে। চারপাশে আর কোনো ঘর নেই, কোনো আলো নেই, কোনো মানুষের শব্দ নেই। যেন এই বাড়িটা ইচ্ছে করেই আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়ালগুলো পুরোনো, চুন উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। টিনের চালটা জং ধরা, কিছু অংশ নিচু হয়ে বসে গেছে। জানালাগুলো কাঠের, শিক কাঁপা, কয়েকটার পাল্লা আধখোলা। ভেতরটা দেখা যায় না, শুধু অন্ধকার জমে থাকে।
বাড়িটার সামনে একটা শুকনো উঠোন। ঘাস নেই, শুধু শক্ত মাটি আর ছাইয়ের মতো ধূসর ধুলো। উঠোনের একপাশে একটা মরা কাঁঠালগাছ। ডালগুলো নখের মতো আকাশের দিকে উঠে আছে। নিচে পড়ে থাকা পাতা আর পচা ফলের গন্ধ বাতাসে ভাসছে। জঙ্গল এখানে চুপ করে থাকে। পাখির ডাক নেই পোকামাকড়ও যেন শব্দ করতে ভুলে গেছে। শুধু নদীর গা ঘেঁষে মাঝেমধ্যে একটা শব্দ হয়। পানি নাড়াচাড়া করলে যেমন হয়, কিন্তু কিছু দেখা যায় না। এই জায়গাটা এমন এক জায়গা, যেখানে কেউ লুকাতে চাইলে লুকাতে পারবে। আবার কেউ হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়ার লোকও থাকবে না।
ফারাজ একা দাঁড়িয়ে থাকে। এই বাড়ি তার কাছে নতুন না। কয়েকবার এসেছে। তবে নিয়মিত না। গুলি লাগার আগের দিন শেষবার এসেছিল। ফারাজ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত থামে। কাঠের দরজাটা পুরোনো, হাতলটা ঘষে ঘষে মসৃণ হয়ে গেছে। ঠেলতেই দরজাটা একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ করে খুলে যায়। ভেতরে ঢুকেই ঠান্ডা লাগে। জঙ্গলের ঠান্ডা না, পুরোনো দেয়ালের ভেতরে জমে থাকা ঠান্ডা।
ঘর অন্ধকার না, আবার আলোও না। জানালার ফাঁক দিয়ে নদীর দিক থেকে আসা নীলচে আলো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। মাটির মেঝে, কিছু জায়গায় ফাটল। দেয়ালে স্যাঁতসেঁতে দাগ। মানুষের হাতের ছাপের মতো।
ভেতরে আর কোনো শব্দ নেই। ঘড়ির টিকটিক নেই, রেডিও নেই, এমনকি ইঁদুরের নড়াচড়াও না। ফারাজ ধীরে হাঁটে। বাড়ির ভেতরের একমাত্র রুমটার দরজা আধখোলা। ফারাজ দরজাটা ঠেলে দেয়। রুমটা ছোট। খুব গোছানো না, আবার অগোছালোও না। যেন কেউ এখানে আছে, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রেখে যেতে চায় না। একপাশে লোহার খাট, পাতলা চাদর বিছানো। খাটের পাশে ছোট একটা টেবিল তার ওপর একটা গ্লাস, ভেতরে অর্ধেক পানি। জানালার কাছে একটা কাঠের চেয়ার, তার ওপর ভাঁজ করা কাপড়। খাটের ধারে বসে আছে একটা তরুণী। চুল খোলা, কাঁধ ছুঁয়ে নেমে গেছে। মুখটা আধো আলোয় চেনা নয়, অচেনাও না। চোখ দুটো বড়, কিন্তু ভয় নেই। কৌতূহলও না। শুধু অপেক্ষা। ছিমছাম গড়নের এই তরুণী হঠাৎ করে পেছন ফিরে তাকায়। ফারাজকে দেখা মাত্র মুখের মীলন হাসি ফুটে ওঠে। সে ফারাজকে বলে, “আপনি তাহলে এসেছেন?”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৭
“এলাম তো।”
“আমি আর কতদিন এভাবে একা থাকব, বলতে পারবেন?”
“যতদিন তোমায় একা রাখি।”
“চিত্রাকে আমার কথা বলুন। আমার এই একলা জীবন আর ভালো লাগছে না। এই অপেক্ষা, একাকিত্ব নিয়ে বাঁচা যায়?”
“দেখা করতে চাও।”
“হুম।”
ফারাজ জবাব দিলো না। ব্লেজারটা খুলে মেয়েটির দিকে তাকালো। ছুঁড়ে দিলো একটা রহস্যময় ঠোঁটের বাঁক।
