Home দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন শেষ পর্ব

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন শেষ পর্ব

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন শেষ পর্ব
আফরোজা আশা

ব্যস্ত সড়ক, ব্যস্ত মানুষজন। শহরতলীতে তখন মানুষের আনাগোনা অত্যধিক। বিকেলের শেষভাগ বলে শহরের সব মানুষ যেন এখন ঘরের বাইরে। কেউ কেউ কর্মস্থল থেকে সারাদিনের ক্লান্ত শরীর ঠেলে বাড়ি ফিরছে, তো কেউ মাত্র বেরিয়েছে সঙ্গীদের সাথে এককাপ চায়ের সাথে জমিয়ে আড্ডা দেওয়ার উদ্দেশ্য। যান-জোট পেরিয়ে সাদা-কালো মিশেলের জীপটা এসে থামল আর্মি মেডিকেলের সামনে। একজোড়া ক্লান্ত চোখ মেডিকেল গেটপানে চেয়ে খুঁজে কাউকে। কাঙ্খিত ব্যক্তির দেখা না পেয়ে, হাত ঘড়িতে সময় দেখে। নাহ! ঠিক সময়েই এসেছে।
মিনিট দশেক পর সেখানে আগমন ঘটে এক রমণীর। অলিভলিভ গ্রিন রঙের পোশাক, কাঁধে ক্যাপ্টেনের দুটো সোনালী বার, বেরেট, কালো বুট আর বুকের কাছে ছোট নেমপ্লেট ‘ক্যাপ্টেন ডা. বেলা পাটোয়ারী’। রমণীর উপস্থিতি টের পেয়ে তার দিকে চোখ ফেরাল দিগন্ত। পরক্ষণেই হাতদুটো বুকে বেঁধে সীটে মাথা হেলিয়ে দিল। কপাল কুঁচকে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলল,

‘ হ্যালো, ক্যাপ্টেন! আজ এতো দেরী হলো যে? ’
সহসা প্রফেশনাল সেনা সদস্যের ন্যায় শরীর টানটান করে সোজা হয়ে দাঁড়াল বেলা। কঠিন গলায় বলল,
‘ স্যরি স্যার। ইমারজেন্সি ছিল। ’
ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল দিগন্ত। তা দেখে সুঠাম দাঁড়িয়ে থাকা বেলা ছ্যাঁত করে উঠল,
‘ এই অসময়ে হাসবেন না। ইমোশনে কন্ট্রোল রাখতে শিখুন। ’
চুলের ভাজে হাত গলিয়ে ভাবলেশহীন দিগন্ত বলল,
‘ ওকে ম্যাডাম। আপনার ডিউটি শেষ হলে এবার গাড়িতে বসেন। ’
মাথার বেরেটটা খুলতে খুলতে গাড়িতে বসল বেলা। তা দেখে নড়েচড়ে সোজা হলো দিগন্ত। বেলার মুখপানে চেয়ে আওড়াল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ প্রেম করবেন? আজ সন্ধ্যাটা প্রেম নিবেদনে কাটালে মন্দ হয় না কিন্তু। ’
চোখ কুঁচকে জবাব দিল বেলা,
‘ নো! থ্যাংকস। ’
মুখে আঁধার নামল দিগন্তের। চাবি ঘুরিয়ে জীপ স্টার্ট দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
‘ দিন দিন বড্ড বেরসিক হয়ে যাচ্ছে কেউ। ’
পাল্টা জবাব আসে বেলার কাছ থেকে,
‘ দিন দিন বড্ড রসিক হয়ে যাচ্ছে কেউ। ’
তার দিকে বিরক্তিসূচক চাহনি দিয়ে দিগন্ত নিশ্চুপ হয়ে গেল। কিছুটা সময় যাওয়ার পর অপরপাশ থেকে কোনো কথা না পেয়ে, ঠোঁট হেলিয়ে কিঞ্চিৎ হাসল বেলা। রাগ করেছে তার সাহেব! দোষ তারো নেই। পূর্বের বেলা পাটোয়ারী আর বর্তমানের বেলা পাটোয়ারীর মধ্যে আসমান জমিন ফারাক। সময়ানুবর্তিতা আর কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলের এর মাঝে থেকে থেকে এখন আর তার মাঝে কোনো অনিয়ম নেই, নেই কোনো নির্বোধ কাজ-কর্ম। বয়স বেড়েছে তার, দায়িত্বও বেড়েছে কয়েকগুণে।
সেনানিবাস ছাড়ার সাথে সাথে উপরের কাঠিন্যভাব ছেড়ে নরম কাটল বেলা। অতঃপর আদুরে গলায় ডাকল,

‘ শুনেন? ’
রাগী স্বর দিগন্তের, ‘ শুনতে চাই না। ’
ঠোঁট ফুলিয়ে বলল বেলা, ‘ বলতে চাই তো। ’
‘ বলেন। ’
‘ কোথায় যেন যেতে চাইলেন? সেখানেই যাই। হাতে একঘণ্টা সময় আছে। এক ঘণ্টার মাঝে বাড়ি ফিরে ওদের খাওয়াতে হবে। ’
‘ ঘড়ি-ঘণ্টা মেপে প্রেম হয় না। কোনো দরকার নেই যাওয়ার। মুড চলে গিয়েছে। ‘
দুষ্টু হাসল বেলা। হাত বাড়িয়ে দিগন্তের শার্টের কলার চেপে ধরে মিহি কণ্ঠে বলল,
‘ আমি আছি কি কাজে! ’

স্টিয়ারিং এ একহাত রেখে আরেকহাতে বেলার হাত সরিয়ে দিল দিগন্ত। গমগমে গলায় বলল,
‘ কোনো কাজের না আপনি। পারেন শুধু আমাকে আর আমার মনকে জ্বালাতে। ’
‘ বউয়ের রূপের আগুনে একটু আধটু না জ্বললে চলে না। আরো জ্বলতে চান? ‘
সুযোগ পেল দিগন্ত। বেলার মতো কঠোর গলায় জবাব দিল,
‘ নো! থ্যাংকস। ’
‘ কপিরাইট ইস্যুতে দিগন্ত তালুকদারকে সাজা দেওয়া উচিত। ’
‘ নো! ম্যাডাম। এ কাজ করবেন না। আমার বউ-বাচ্চারা তবে আপনাকে অভিশাপের সমুদ্রে ডুবিয়ে মারবে। ’
ব্যস, দিগন্তের নাটুকে কথা শুনে খিলখিলিয়ে হাসল বেলা। সে মোহনীয় হাসির ঝংকারে প্রশান্ত হলো দিগন্তের হৃদগহীন। সারাদিন পর ওই হাসিটুকুতে ওর সকল ক্লান্তি কাটল বৈকি! একপলক রমণীর হাস্যজ্জ্বল মুখখানা দেখল সে। আপনা থেকেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। অতঃপর বাড়ি না পৌঁছানো পর্যন্ত, ওই পথটুকুতে তাদের খুঁনশুঁটি চলতেই থাকল।

তিন বছরের ছোট ছোট দুটো লিলিপুট একজন আরেকজনের পেছনে ছুটছে। সামনের জন দুহাতে দুটো চকলেট নিয়ে মহানন্দে দৌড়াচ্ছে। আর পেছনের জন হাউমাউ করে কাঁদছে আর ছুটছে। তাদের দুজনের পেছনে আবার ছুটছে এক রমণী।
ছুটতে ছুটতে বসার ঘরের দিকে চলে এসেছে বাচ্চা দুজন। সেসময়ে হুট করে স্থির হতে হলো তারা। দৌড়ানোর গতিতে তালা লাগল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মাকে দেখে। পেছনে কাঁদতে থাকা বাচ্চাটা যেন আশার আলো খুঁজে পেল। থুপথাপ পা ফেলে ক্রন্দনরত মুখে এসে মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে উঠল।
এদিকে ছেলেকে কোলে নিয়ে তার চোখমুখ মুছে দিল বেলা। কান্নারত সরল গলায় আওড়াল বাচ্চাটা,

‘ ভাই চকেত নিয়ে নিচে। ’
‘ চকলেট? এই ভরসন্ধ্যায় চকলেটের জন্য কাঁদছো? তবে কিন্তু আমি মারব বিহান। কান্না থামাও। ’
পরমুহূর্তেই আরেক ছেলের দিকে কড়া দৃষ্টিতে চেয়ে ধমকাল রমণী,
‘ অসময়ে চকলেট হাতে নিয়েছো কেনো? ’
মাকে দেখে মুখ উজ্জ্বল হলেও তার ধমক খেয়ে ক্ষুদে চোখ দুটো মুহূর্তেই টলমলে হয়ে গেল। ঠোঁট ফুলিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলল,
‘ পুতু পুপি দিচে। ’
সহসা কিছুদূরে দাঁড়ানো প্রত্যাশার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল বেলা,

‘ ওদেরকে চকলেট দিতে বারণ করেছি না? ’
ভাবির প্রশ্নে মিইয়ে গেল কিশোরী। বাচ্চারা চকলেট খাবে বলে কি বায়নাটাই না ধরেছিল। উপায়ন্তরহীন বেচারি দিয়েছে তাদের। এখন তাকে ফাঁসিয়ে, মায়ের সামনে সাধু সাজছে তারা। চোরা আওয়াজে বলল সে,
‘ একটুই দিয়েছি। সুগার ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য বাচ্চাদের মাঝে মধ্যে চকলেট দিতে হবে নাকি। সেদিন ইউটিউবে ভিডিও দেখেছিলাম। ’
‘ কি চলছে? ’ বলতে বলতে ভেতরে ঢুকল দিগন্ত। জীপ পার্ক করে আসতে সময় লাগল তার। যেই না দরজায় পা রেখেছে অমনি একটা ছোটখাটো শরীর এসে তার সম্মুখে দাঁড়াল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে। এদিকে ছেলেকে কাঁদতে দেখে তড়িঘড়ি করে তাকে কোলে তুলল দিগন্ত। দুগালে আদর রেখে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল,
‘ কি হয়েছে আমার বিভান আব্বুর? ’

দুহাতে চোখ কোঁচলিয়ে বলল বিভান, ‘ আম্মু বকেচে। ’
অসন্ত্বোষ চিত্ত্বে বেলার দিকে তাকাল দিগন্ত। তাতক্ষণাৎ খেঁকিয়ে উঠল বেলা,
‘ বকব না? রাতের খাবার খাওয়ার সময়ে চকলেট চাইবে কেন? নিশ্চয়ই ওরা জেদ করেছে বলে মেয়েটা দিতে বাধ্য হয়েছে। দাঁতে পোকা খেয়েছে, বারবার মানা করেছি চকলেট খাওয়া যাবে না। শুনে আমার কথা? বাপের মতো ঘাড়বাঁকা হয়েছে। ’
ব্যস, বেলার শেষ চোপট এসে দিগন্তের ওপরেই পড়ল। দিন পাল্টে, সময় পাল্টে তেমন পাল্টেছে দিগন্তের কপালও। এক মাঘে নাকি শীত যায় না! আসলেই তাই। এককালে বাপ নিয়ে বড্ড খুঁচিয়েছে সে। এখন বেলার রাজ চলছে। বাচ্চারা যাই করুক সবশেষে দোষ তাদের বাবার। তাদের মায়ের এ যেন অলিখিত এক রীতি। দুপাশে না ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়ে ফোঁস করে শ্বাস টানল দিগন্ত।

তখন ঘড়িতে রাত নয়টার সময় চলছে। তালুকদার বাড়ির ডাইনিং টেবিলে একে একে সকলের উপস্থিতি ঘটছে। বিহান-বিভানকে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে নিচে নামল বেলা। মাথায় চাপানো ওড়নাটা আরো ভালোভাবে টেনে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে এলো। মিতালী আর বাণী মিলে রান্নাঘর থেকে খাবারের বাটিগুলো এনে টেবিলে রাখছে। বেলাও গিয়ে হাত লাগায় তাদের সাথে। সবার প্লেটে খাবার তুলে দিতে শুরু করে।
এর মধ্যে এগারো বছর বয়সী একটা বাচ্চা ছেলে বেলার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
‘ বড় খালাআম্মু,বোরহান এখনো নিচে আসেনি। ’

তার প্লেটে সবজি তরকারি তুলে দিতে দিতে নরম গলায় জবাব দিল বেলা,
‘ দেখলাম তো পড়ছে। পড়া শেষ হলে চলে আসবে। তোমার না আজ পরীক্ষা ছিল। কেমন হয়েছে বাবা? ’
সহসা মুখ লটকে নিল বাচ্চাটা। ওপাশ থেকে বাণী গজগজিয়ে বলল,
‘ পড়াচোরটা গেছে নাকি পরীক্ষার রুম পর্যন্ত? বাড়িতেই না ওর পেট ব্যথা, হাত ব্যথা, পা ব্যথা শুরু হয়েছিল। ’
‘ হায় হায়! বড় অসুখ করেছে যে। দিলশাদ তালুকদারকে তাহলে বড় বড় দুটো মোটা’তাজা সুই ফুঁড়তে হবে। ’
সুঁইয়ের কথা শুনে মুখ শুকিয়ে এলো দিলশাদের। আতংকিত গলায় চেঁচিয়ে উঠল,
‘ ব্যথা করেনি। আমি..আমি বাহানা করেছি। ’
চোখ পাকিয়ে ছেলের দিকে তাকাল বাণী। তা দেখে বেলার আড়ালে লুকালো দিলশাদ। এদিকে বাণীর নজর দেখে মিনমিনে গলায় বলল দিহান,

‘ ভয় পাচ্ছে ছেলেটা। ’
আর কিছু বলল না বাণী। নিশ্চুপ নিজের কাজ করল। স্বামী-সন্তান আর এই পরিবার নিয়ে দিন চলছে তার। আস্তেধীরে এ পরিবারের এক কর্তী হয়ে উঠছে সে। দিহান বাণীর একমাত্র ছেলে দিলশাদ। যার এগারো বছর বয়সে এসেও আর কোনো সন্তান আসেনি তাদের কোলে।
প্লেট হাতে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল বেলা। স্টাডি টেবিলের ওপর টেবিল লাইট দিয়ে শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে পড়ছে এক ছেলেবাচ্চা। নিশব্দে তার পেছনে এসে দাঁড়াল বেলা। একহাতে প্লেট রেখে আরেকহাত দিয়ে দুলতে থাকা ছেলের পিঠে হাত দিয়ে বলল,
‘ উমমম! ব্যাড ম্যানারস। পড়ার সময় বডি স্ট্রেইট রাখতে হয়। মুভমেন্টে প্রেশার বাড়ে আর ব্রেইনে নতুন কিছু ক্যাপচার হতে দীর্ঘসময় নেয়। ’
ব্যস, সোজা শীটশীটে হয়ে গেল বাচ্চাটার ঘাড়-বাহু। তা দেখে কাঁধে আলতো দুটো শাবাশী চাপড় মেরে আওড়াল বেলা,

‘ পারফেক্ট। ’
মায়ের কাছে শাবাশ পেয়ে গম্ভীর মুখাবয়বে এক চিলতে হাসি ফুটল তার। মেলে রাখা বইখানা বন্ধ করে, টেবিলে লাইটের সুইচ বন্ধ করল। অতঃপর চেয়ার থেকে নেমে সেটাও টেবিলের সাথে গুছিয়ে রেখে বেলার সম্মুখে দাঁড়াল।
এদিকে ছেলের ডিসপ্লিন বরাবরের ন্যায় আজো মুগ্ধ হলো বেলা। বড় ছেলে তার খুব বাধ্য। জন্ম হওয়ার পর থেকেই তাকে জ্বালিয়েছে কম। কম বলতে একদমই স্বল্প। ছেলে বাচ্চা যে এতো নরম হতে পারে বেলার জানা ছিল না। জেনেছে নিজের বড় ছেলেকে দেখে। এই বড়ছেলেকে নিয়ে সে কত লড়াই যুদ্ধ করেছে জীবনে। পড়াশোনার কতগুলো বিশাল ধাপ পাড়ি দিয়েছে।তার স্বামী-সন্তান দুজনেই যেন একই বুঝদার! কি অগাধ সময় দিয়েছে তাকে তার লক্ষ্য পূরণ করার জন্য। এই যে তাদের বড় ছেলে বোরহান তালুকদার, তার একুশ বছর বয়সে কোল আলো করে এসেছিল। এখন তার সাত বছর চলছে। এই সাত বছরে বেলা খুব বেশি সময় দিয়েছে কি তাকে! ওই কেবল রাতটুকু। তাও বেলার ঘুমানোর সুযোগ করে দিয়ে, দিগন্তই বেশিরভাগ সময় তাকে নিজের কাছে রেখেছে। আর দিনেরবেলা যখন দিগন্ত বেলা দুজনকেই নিজেদের কাজে যেতে হতো তখন সামলেছে বাণী।
বেলা পাটোয়ারী তিন ছেলে সন্তানের জননী এখন। দিগন্তবেলার বড় ছেলে বোরহান তালুকদার। আর তাদের যমজ দুই ছেলে বিভান তালুকদার ও বিহান তালুকদার।

বোরহানকে নিয়ে ডিভানে বসল বেলা। মায়ের হাত থেকে প্লেট নিয়ে নিজে খেতে চাইলে বেলা আটকাল তাকে। সবদিকে ডিসিপ্লিন মেনে চললেও খাওয়ার দিকে খানিক গাঁইগুঁই আছে ছেলের। আধপ্লেট খেয়ে বলবে পেট ভরে গেছে। কিছুটা সময় নিয়ে হাতে তুলে খাইয়ে দিল বেলা। অতঃপর ছেলের সাথে ভালোমন্দ দুটো কথা বলে, তাকে তার বাবার কাছে দিয়ে নিচে এলো। হাতের কিছু কাজ বাকি।
বেলা যখন ডাইনিং এর প্লেটগুলো গোছাচ্ছিল তখন মিতালী এক গ্লাস দুধ হাতে সেখানে আসে। গরম ধোঁয়া ওঠা দুধের গ্লাসটা বেলার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাঁফ ধরা গলায় বলে,
‘ খা তো বাপু, তাড়াতাড়ি খা। তোদের দু’বোনকে দুধ খাওয়াতে যে ভোগান্তি পোহাতে হয়, সারাদিন গায়ে-গোতরে খেটে কাজ করলেও আমার এতো ভোগান্তি হয় না। ’

দুধ দেখে মুখ ফ্যাকাসে হলো বেলার। খাদ্য রুটিনে তার বিশদ পরিবর্তন হয়েছে। শরীর স্বাস্থ্য ফিট রাখার জন্য সব শাক-সবজি তার নিত্যদিনের খানা। নিয়মের বাইরে এই একটা জিনিস। এটা দেখলেই ভেতরের নাঁড়িভুড়ি যেন পেঁচিয়ে যায়। শুধু তার না বাণীরও একই সমস্যা। দু’বোন মোটেও দুধ খেতে পারে না। আর মিতালী জোর করে হলেও ঘুমানোর আগে দুজনকে ধরে-বেঁধে দুধ খাওয়াবেই। বলা বাহুল্য, এটা যেন তাদের শ্বাশুরি বউদের মধ্যে নিরব সংর্ঘষ।
এখনো গ্লাস হাতে বেলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রেগে গেল মিতালী। ঝট করে দুআঙুল দিয়ে বেলার নাক চেপে ধরল। অতঃপর দুধের গ্লাসটা ওর মুখে ঠেসে ধরে শাসনের সুরে বলল,

‘ গেল বজ্জাত মেয়ে। ’
উপায়ন্তরহীন বেলা ঢুক ঢুক করে খেয়ে নিল। গ্লাস ফাঁকা হতেই মিতালী ছেড়ে দিল ওকে। কাঁচুমাঁচু করে মিতালীর আঁচলে মুখমুছে ভার গলায় বলল বেলা,
‘ তিন বাচ্চার মায়ের সাথে এরকম করে কেউ। এসব এখন বাচ্চাদের খাবার। আমার খাওয়ার বয়স আছে নাকি! ’
বেলার কথা শেষ হতেই বেসিনের দিকে ছুটল সে। পেটের ভেতর যা ছিল সবকুটু উগলে বেরিয়ে যাচ্ছে। পেছন পেছন মিতালীও ছুটে এলো। নাভির দিকে চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা চালাল। কিছুসময় পর চোখেমুখে পানির ছিটা দিয়ে ক্লান্ত বেলাকে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিল। অভিজ্ঞ চোখ তার কিছু একটা আঁচ করেছে দুদিন আগেই। আজ সরাসরি বলে ফেলল,

‘ তোর চোখমুখ কেমন ভরা ভরা। দুদিন আগেই খেয়াল করেছি আমি। ’
ঘাবড়াল বেলা। দৃষ্টি এলোমেলো করে ভীত স্বরে আওড়াল,
‘ আসলে, ইদানিং শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। উনাকে কিছু বলো না। আগে শিয়োর হই আমি। ’
‘ ভয় পাচ্ছিস কেনো? ’
ছলছল হলো বেলার আঁখিপল্লব। মিতালীর কোমড় জরিয়ে ধরে ভেজা গলায় বলল,
‘ প্রথম থেকেই লোকটা মেয়ে পাগল। আমিও চাই আমাদের ঘরে একটা মেয়ে আসুক। কিন্তু প্রথমবারের মতো এবারেও তাকে না জানিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেবার তো কিছু বলেনি। এবার যদি রাগারাগি করে, মানতে না চায়। ’
মুচকি হাসল মিতালী। বেলার মাথায় হাত রেখে ভরসার সুরে বলল,
‘ মোটেও আমার ছেলে অমন না। একটু রাগ-সাগ করলেও, অতো দূরে যাবে না। ’

রাত এগারো টা নাগাদ ঘরে আসে বেলা। বিছানায় তার তিন পুত্র গভীর ঘুমে মগ্ন। তাদের পাশে ল্যাপটপ হাতে কাজ করছে দিগন্ত। বড় ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে বসেছে সে। বেলা না আসা অব্দি তার কাজ চলবেই।
দরজা চাপিয়ে দিগন্তকে একপলক দেখল রমণী। গায়ের ওড়নাটা খুলে চেয়ারের মাথায় ভাজ করে রাখল। অতঃপর সারাদিনের কাজ শেষে নিজের চেহারাটা দেখার জন্য ঝকঝকে দর্পণের সামনে দাঁড়াল। দিনশেষে এই রাতে নিজেকে দেখার অবকাশ মেলে তার। কখনো বা দেখে, কখনো বা দেখে না। আজ একটু ঘুরে ফিরেই নিজেকে দেখছে বেলা। বয়স তার উনত্রিশ কোঠায় উঠেছে। লম্বা-চাওড়া আর শরীরের দিক থেকে বেড়েছে অনেকাংশে। পিঠ সমান চুলগুলো এখন কোমড় ছাড়িয়ে নিচে নেমেছে আরো। নিজেকের দেখার একফাঁকে টের পেল রমণী, কারো বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। পেছন থেকে দুটো হাত আঁটসাঁটভাবে আকড়ে ধরেছে তাকে। মাথাখানা আলগোছে তার বক্ষে ছেড়ে দিল বেলা। আয়নার দিগন্তের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে গাঢ় গলায় বলল,

‘ দেখেন আপনি দিন দিন জোয়ান হচ্ছেন আর আমি বুড়ো হচ্ছি।’
বেলার ফুলো নরমগালে নাক ঘষে ঘোর লাগা স্বরে আওড়াল দিগন্ত,
‘ বুড়ো হলেও আমার, না হলেও আমার। ’
‘ বলছেন? ‘
‘ জানেন না বুঝি! ‘
বিস্তর হাসল বেলা। এই সুযোগ, পেটের কথাটা এখনি বলা উচিত তার। একটা শুকনো ঢোক চেপে মিহি কণ্ঠে বলে উঠল,
‘ আমার না ডেট মিস গেছে। শরীরটাও ভালো নেই। ভয় লাগছে। আমি মোটেও এবার কিছু করিনি। কিছু হলে আমার দোষ নেই। ’

ঘাড় থেকে মুখ উঠিয়ে সন্দিহান গলায় শুধাল দিগন্ত,
‘ কি বলতে চাইছিস? ’
সোজাসাপ্টা জবাব দিল বেলা,
‘ টেস্ট করতে হতো। ’
সহসা ক্ষেপে গেল দিগন্ত। এমন ভুল করার অবকাশ রাখেনি সে। নিশ্চয়ই ধান্দাবাজ মেয়ে নিজে নিজে মাতব্বরি করেছে। বেলাকে ঘুরিয়ে ওকে ড্রেসিং টেবিলের সাথে চেপে ধরল দিগন্ত। রাগান্বিত গলায় বলল,
‘ তুই পাগল? তিন বাচ্চাকে মানুষ করা কত বড় দায়িত্ব। নতুন আরেকজনকে কিভাবে সামলাবি? এতো ধকল শরীরে কূলাবে?’
দুহাতে রাগী দিগন্তের গলা পেঁচিয়ে ধরল বেলা। নির্ভয়ে জবাব দিল,

‘ আপনি আছেন তো। ‘
চাপা আওয়াজে খেঁকিয়ে উঠল দিগন্ত,
‘ পারব না। ’
ভাবলেশহীন বেলাও দিগন্তের সুরে বলে উঠল,
‘ তবে বাপের বাড়ি রেখে আসব। আমার আব্বু আপনার মতো কিপ্টে না। ‘
‘ হ্যাঁ, সেই। সব কথা তো শোনায় আমাকে। ’
‘ বললেই হলো? কত সুন্দর জামাই আদর পান, আমি চোখে দেখি না বুঝি। আপনার জাতের খাসিলত, আমার আব্বুর নামে এক ঢোক পানি বেশি খাওয়া। ’

বাবার কথা বলতেই রমণী চেতে গেছে। টের পেয়ে আর সে বিষয়ে গেল না দিগন্ত। শুধাল,
‘ এনে রাখব। সকালে জানবেন। শরীরে কূলাবে তো? ’
বিগলিত হাসল বেলা। ঘাড় বাড়িয়ে দিগন্তের ওষ্ঠকোণ ছুঁয়ে জাবাব দিল,
‘ আমার ফিটনেস টপনচ। এমনি এমনি সেনা সদস্য হয়নি। ’
ঠোঁট কামড়ে আলতো হাসল দিগন্ত। বেলার নাকের সাথে নাক লাগিয়ে বলল,
‘ তাহলে এবার ঘুমানো যাক। ’
সায় জানাল রমণী। বিছানা জুরে তাদের তিন ছানার রাজত্ব। তারই এক কোণে আঁটসাঁট হয়ে শুয়ে পড়ল দুই মানব-মানবী। কিছু আলাপ চলল দীর্ঘক্ষণের। অতঃপর পাঁচজনের একটা ছোট্ট পরিবার একসাথে ঘুমের রাজ্যে হারালো।

রিপোর্ট হাতে থম মেরে বসে আছে এক রমণী। চোখ বেয়ে উপচে পরছে আশ্রুজল। সেদিকে খেয়াল নেই তার। কেবল বারবার চোখ বুলিয়ে দেখছে একটা শব্দই ‘পজেটিভ’। এতো আনন্দের দিন তার এই প্রথম এলো বোধহয়। প্রথম মা হওয়ার সেই সুখ সুখ অনুভূতিটা নিগূঢ়ভাবে অনুভব করছে।
মাত্র ঘরে পা রেখেছিল রায়হান। সহসা একটা নারীদেহ ছুটে এসে তার বুকে পড়ল। হু হু করে কাঁদল মেয়েটা। হতবাক রায়হান মাইশার পিঠে একহাত রেখে শুধাল,
‘ কি হলো? কাঁদছো কেনো? ’
অস্পষ্ট গলায় জবাব এলো অপরপাশ থেকে,
‘ রিপোর্ট পজেটিভ এসেছে। ’

তাতক্ষণাৎ হৃদকম্পন জোরাল হলো রায়হানের। চোখজোড়া ভিজে এলো অচিরেই। একজীবনে সব সুখ পাওয়া কি এতোই সহজ! দীর্ঘ আট বছর চেষ্টা করার পর এ সুখের মুখ দেখছে তারা। হাতে ধরে রাখা ফাইলটা সেখানেই ফেলে দিয়ে মাইশাকে কোলে তুলে নিল রায়হান। চোখমুখ ভরিয়ে কতগুলো চুম্বন রাখল তার হিসেব থাকল না! আনন্দে আত্মহারা দুই নর-নারীর জীবনে এক আঁধার অধ্যায় কাটিয়ে আলোর ছিটা এসেছে সবে। বিয়ের এতোগুলো বছর পর এসে বাবা-মা হতে যাচ্ছে তারা।
‘ দোস্ত আমি বাবা হচ্ছি। ’

মুখের সামনে আনা কাপখানা থেমে গেল দিগন্তের। প্রথম প্রথম শুনে বন্ধুর সাথে সেও আনন্দ উল্লাস করেছে। কিন্তু গত দুদিন যাবৎ রায়হানের মুখে যেন সেই এককথা সে বাবা হচ্ছে। উঠতে বসতে এই এক গানা শুনতে শুনতে এবার বুঝি তার কানগুলো পঁচে যাবে। চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সপাট এক লাথি বসাল সে, রায়হানের হাঁটুতে। কিঞ্চিৎ ব্যথা পেল রায়হান! কিন্তু আমলে নিল না। এই কাজে অভ্যস্থ সে। পুনরায় বলে উঠল,
‘ জানিস আমিও বাবা হচ্ছি। ’
গালমুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়ল দিগন্ত। কত বড় বেহায়া ছেলে! মারার পরের আবার সেই কথা বলছে। বিতৃষ্ণা ভরা গলায় আওড়াল,
‘ জানি। আর কতবার বলবি? একটু তো লাগাম রাখ মুখে।আপাতদৃষ্টিতে আমি তোর বউয়ের ভাই হই। শালা, সম্পর্কেরও মান রাখে না। ’
বাঁকা গলায় বলল রায়হান,
‘ তবে শালাটা কে হলো? আমি না তুমি? ’
হতাশা দিগন্ত। আর টু শব্দও করল। নিজের চেয়ারে বসে আবারো চা খেতে শুরু করল। এর মাঝে রায়হান ফের বলল,

‘ দোস্ত, আমার মেয়ে হলে তোর কোন ছেলের সাথে বিয়ে দিবি? ’
ভাবাবেগহীন দিগন্ত প্রতিত্তরে জানাল,
‘ যে ভালোবাসে নিজের করতে চাইবে, সেই। ’
ভাবুক হলো রায়হান। সেভাবেই আওড়াল,
‘ আর যদি এবার আমার ছেলে আর তোর মেয়ে হয় তাহলে তো জমে খির হবে রে। ’
উচ্ছ্বাসিত রায়হানের এহেন কথা আদৌ দিগন্তের পছন্দ হলো কি? মোটেও হলো না! নাকমুখ কুঁচকে বলে উঠল,
‘ এই খবরদার এসব চিন্তাভাবনা মাথায় আনবি না। পাঁচ মাস চলছে বেলার। আমার মেয়ে হলে, তোর ছেলের থেকে বয়সে বড় হবে। একদম এসব বালপাকনামি কথাবার্তা মাথায় আনবি না। ’
মুখ বেঁকিয়ে ক্রুর হাসল রায়হান। ভরাট স্বরে আওড়াল,

‘ আমি না বললেও আমার ছেলে আর তোর মেয়ে প্রেম ট্রেম করে দুনিয়া উল্টে ফেলবে। জানি আমি। বাপের মান অবশ্যই রাখবে আমার বাচ্চাকাচ্চা। ’
‘ বা’ল জানো তুমি। ‘ কাপটা শব্দ করে টেবিলে রাখল দিগন্ত। নাক উঁচু করে বিরাট অহনিকা নিয়ে ফের বলল,
‘ আমার মেয়ে হলে ওকে আমি রাণীর হালে বড় করব। কোনো ছোকরার বদনজর পড়তে দিবো না। কে হয় হোক! কারো না। ’
হে হে করে বিদ্রুপাত্মক হেসে উঠল রায়হান। ঠেস মেরে বলল,
‘ কত মানুষের কত রঙঢঙ দেখলাম। পাটোয়ারীর মেয়ের দিকে নজর দেওয়া ছোকরা আবার বুক ফুলিয়ে কি বলছে শুনো। ’
ব্যস, স্টুডিও কক্ষে বসে দু’বন্ধুর খুঁটখাঁট গুঁতোগুঁতি শুরু হলো সেখানেই।

“ প্রেমের কাহিনী গান, হয়ে গেলো অবসান
এখন কেহ হাসে, কেহ বসে ফেলে অশ্রুজল
এখন কেহ হাসে, কেহ বসে ফেলে অশ্রুজল
সখী চলো!
এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না
শুধু সুখ চলে যায়, এমনই মায়ার ছলনা ”

সিএনজিতে ধ্যান মেরে বসে ছিল এক রমণী। দৃষ্টি তার বাইরের রাস্তা পানে। এক আকাশসম বিষাদেভরা মন। এর মাঝে চলন্ত গাড়িতে গান ছেড়েছে ড্রাইভার। গানের লাইনগুলো রমণীর কর্ণগোচর হতেই সোজা হয়ে বসল সে। ঝাঁঝাল গলায় ধমকে বলল,
‘ এই মামা! গান বন্ধ করেন। রাস্তায় বেরিয়েছে আল্লাহ-রাসুলের নাম নাই মুখে। সামনে না কবরস্থান। এখানেই গান বাজাতে হয় আপনাদের? ’
রমণীর কথা শুনে সাউন্ডবক্স বন্ধ করল ড্রাইভার। পাশ থেকে স্কুল ড্রেস থাকা প্রত্যাশা শুধাল,
‘ তুমি বাড়িতে কবে আসবা আপু? ’
প্রত্যাশার প্রশ্নে চোয়াল শক্ত হলো দিশার। খিটখিটে মেজাজে উত্তর করল,
‘ বেঁচে থাকতে আর ও বাড়ির ত্রি-সীমানায় আমার পা পড়বে না।’
মুখ লটকে নিল প্রত্যাশা। আর কিছু বলল না। যে স্কুলে সে পড়ে, সে স্কুলে শিক্ষকতা করে দিশা। রোজ দেখা দুজনের। মাঝেমধ্যে স্কুল ছুটি হলে প্রত্যাশা দিশার সাথে ওর বাসায় যায়। আজো যাচ্ছে। মূলত একজনের সাথে দেখা করার জন্য।

নিশ্চুপতার মাঝে সিএনজিটা যখন কবরস্থান এর পাশ ঘেঁষে চলছিল, তখন নিত্যদিনের স্বভাববশত একটা কবরের দিকে নজর রাখে দিশা। সেখানে শায়িত পুরুষটা সেই যে আরামের নিদ্রায় ডুবেছে তো ডুবেছেই! দুনিয়া স্বার্থপর! নাকি স্বার্থপর এ দুনিয়ার মানুষজন! তা জানা নেই দিশার। কেবল জানে তার জীবনে আসা সব মানুষগুলোই স্বার্থপর। তন্মধ্যে ফাহাদ দেওয়ান নামক পুরুষটা বেশিই স্বার্থপর। নিজের আখেরটুকু গুছিয়ে আর কাউকে চোখে দেখেনি।
নিরবে চোখ বেয়ে নোনাজল গড়ালো দিশার। সীটে মাথা হেলিয়ে দিয়ে, ওই কবরপানে চেয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
‘ তুমি মরেও গেলে, আমায় মেরেও গেলে। ’

দরজায় কড়া পরলে ঝাঁকড়া চুলের এক পুরুষ এসে দরজা খুলে দিল। সম্মুখে দাঁড়ানো নারীকে দেখে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য উদ্যত হতেই, চোখে পড়ল তার পেছনে দাঁড়ানো প্রত্যাশাকে। আর কিছু বলা হলো না তার। দরজা খুলে রেখেই নিরবে ঘরের দিকে চলে গেল।
প্রত্যাশাকে নিয়ে ভেতরে আসে দিশা। তাতক্ষণাৎ চার বছর বয়সী একটা বাচ্চা মেয়ে এসে আঁকড়ে ধরে ওকে। আধো আধো বুলি আওড়ায়,

‘ কালামুনিকে মিস করচি। ’
দুহাত বাড়িয়ে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয় প্রত্যাশা। দুগাল ভর্তি আদর দিয়ে উচ্ছ্বাসিত গলায় বলে,
‘ খালামণিও দিয়াকে অনেক মিস করে। ’
বাচ্চাটা আদুরে ভঙ্গিতে প্রত্যাশার গলা পেঁচিয়ে ধরল। তখনি ওয়াশরুম থেকে চোখমুখে পানি দিয়ে বের হলো দিশা। ওদের একসাথে রেখে পাশের ঘরে চলে এলো। কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে মেঝেতে বসে খুটখুট করে কাজ করতে থাকা পুরুষের উদ্দেশ্যে বলে,
‘ কিছু এনে দেও বাজার থেকে। ’
বাবড়ি চুলগুলো ঠেলে প্রশ্নাত্মক গলায় বলে রতন,
‘ কি আনব? ’

প্রশ্নটা যেন শান্ত রমণীর মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিল। চড়া মেজাজে বলল,
‘ প্রত্যাশা এসেছে দেখিস নি? কি আনতে হবে সেটাও আমি বলে দিবো? ’
দীর্ঘশ্বাস ফেলল রতন। বলল, ‘ ফ্রিজে ডিম আছে। ’
গটগট পায়ে প্রস্থান করে দিশা। ওর যাওয়ার দিকে ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে আছে রতন। তাদের জীবন জুড়েছে আজ থেকে পাঁচ বছর পূর্বে। জয়নাল তালুকদার হুট করে একদিন তার সিদ্ধান্ত জানান, রতনের সাথে দিশার বিয়ে দিবেন তিনি। ও বাড়ির এক সদস্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে ছেলেটার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে গেছে। তাই তিনি চেয়েছিলেন রতনকে জামাতা করে, ব্যবসায় তার চেয়ারটা রতনকে দিতে।

ওদিকে তখন আজানা কোনো এক কারণে তাদের চঞ্চলে মেয়ে দিশা একেবারে পাল্টে যাচ্ছিল। টকটকে রূপ লাবণ্য তার নষ্ট হচ্ছিল অচিরেই। তা দেখে কারো কথা শুনতে নারাজ জয়নাল তালুকদার নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে, একদিনেই দিশাকে বাধ্য করেছে রতনকে বিয়ে করতে। নিজের এলোমেলো মানসিক অবস্থা আর বিপর্যস্ত জীবন নিয়ে দিকহারা দিশা, রাগ-অভিমান নিয়ে সেদিনই তালুকদার বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়েছে। তারপর আর ওবাড়িমুখী হয়নি। ভাই-ভাবিদের সাথে টুকটাক যোগাযোগ থাকলেও বাবা-মায়ের সাথে একশব্দও বিনিময় হয়নি।
সকলের বাঁধা উপেক্ষা করে সেই যে একটা ভাড়া বাসায় উঠেছে মেয়েটা তারপর থেকে তার জীবন চলছেই। দিশা-রতনের ঘরে এখন এক মেয়ে হয়েছে। বলা বাহুল্য, সংসার জীবন তাদের পাংশুটে। মিল-মহব্বত নেই বললেই চলে। শুধু নিয়মের বেড়াজালে যেভাবে দিন কাটাতে হয় সেভাবেই কাটাচ্ছে।

যতক্ষণ প্রত্যাশা দিশার বাড়িতে থাকল ততক্ষণ আর ঘর থেকে বের হলো না রতন। মেয়েটা আজো তাকে ভয় পায়।
বিকেলের দিকে দিগন্তের জীপ এসে থামল দিশার দোরগোড়ায়। দিগন্ত আর গেল না ভেতরে। একমাত্র আদরের বোনের ওই শুকনো চোয়ালের মুখখানা দেখলে বুক ফেটে যায় তার। মেয়েটাও জেদী। এই কুঁড়েঘরে কষ্ট করবে তাও বাপ-ভাইয়ের এক পয়সাও নিবে না। রতনকে ব্যবসার কাজে জড়াতে চাইলেও দিশা সাফ সাফ মানা করেছে। ছেলেটা এখন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে। খুব বেশি আয় নেই। যা আসে তা দিয়ে ওদের দিন যায়। আর দিশা নিজের বিরস সময় কাটাতে কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করছে। হুট করেই জীবন তার রঙহীন হয়েছে। একটা মেয়ে আছে, তাকেও সময় দেয় না ঠিকভাবে। বেশিরভাগ সময় একলা একটা রুমে ঠাণ্ডা মাছের ন্যায় পরে থাকে।

দিশার সাথে ভালোমন্দ দুটো কথা বলে উঠে দাঁড়াল বেলা। দিয়াকে কোলে নিয়ে খুব আদর দিল। চোখ টলমলে তার। কতগুলো ভাইয়ের এক বোন দিয়া। অথচ বাচ্চা এখানে একাকী থাকে। দিশা তাকেও যেতে দেয় না ওবাড়ি।
বেলার ভেজা আঁখি দেখে বিমর্ষ কণ্ঠে বলে উঠল দিশা,
‘ এই ভরা পেট নিয়ে এতোদূর আসার দরকার ছিল না। বাড়ির গাড়ি পাঠালেই চলে যেত প্রত্যাশা। ’
বেলা নাক কুঁচকে বলল,
‘ আমি এসেছি আমাদের দিয়াকে দেখতে। এখন কি আমার আসাতেও বারণ দিতে চাইছো? ’
চুপ হয়ে গেল দিশা। দিশার সে বিরস নিশ্চুপ বদনখানা দেখে বুক মোচড়ে উঠল বেলার। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সংযত রাখল নিজেকে। হয়তো সে জানে হুট করে রমণী এই বিশদ পার্থক্যের কারণ। হয়তো কি? আলবাৎ জানে সে। সেকথা কেবল সে আর মাইশা জানে। দুজনেই আর কাউকে জানায়নি, নাই বা টের পেতে দিয়েছে। যে মানুষ নেই, তার সাথে দিশাকে জরিয়ে কোনো কথা বলার কারণ নেই। সেটা চাপা থাক তাদের মাঝেই।
অতঃপর আধঘণ্টার মতো থেকে প্রত্যাশাকে নিয়ে চলে যায় তারা। এদিকে বাড়ি ফাঁকা হতেই রতনের ঘরে দিয়াকে ছেড়ে, অপর ঘরে গিয়ে দোর আটকায় দিশা। একাকী থাকলে শান্তি পায় সে।

অন্ধকার রজনী। বিছানার এককোণে গুঁটিশুঁটি মেরে ঘুমিয়ে আছে দিশা। শীত শীত পরিবেশের মাঝেও পুরো শরীর তার ঘেমে জবজবে। গভীর ঘুমের ঘরে স্বপ্নের রাজ্যে ছুটে বেড়াচ্ছে মেয়েটার অচল মস্তিষ্ক। হুট করে দেখল সাফেদ কাফনে মোড়ানো একটা পুরুষের চেহারা। সেই কালো হয়ে যাওয়া মুখাবয়বের ভারটুকু একটুও সইতে পারল না তার অবচেতন মন। সহসা কেউ যেন গলা চেপে ধরল তার। কণ্ঠানালির কাছে দমটুকু আটকে গেল রমণীর। হাত-পা ছড়িয়ে জোরে জোরে শ্বাস টানার প্রয়াস চালাল। কিন্তু চিমটি পরিমাণ অক্সিজেনও যেন ভেতরে গেল না। জান যায় যায় অবস্থার মাঝে কেউ একজন টেনে তুলল তাকে। মুখের সামনে ইনহেলার ধরে ভেতরে আটকে যাওয়া দমটা টানতে সাহয্য করল। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা অলস চোখজোড়া খুলে সম্মুখে রতনকে পেল দিশা।

বেশ খানিক সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল রমণী। এদিকে রতন অসহায় চোখে চেয়ে দেখছে তাকে। পুরনো সে দিশা আর এই দিশার মাঝে কোনো মিল আছে! চোখের নিচে কতগুলো কালোস্তর জমেছে। ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস এলো তার। জানে না সে, দিশার এরূপ পরিবর্তনের কারণ। জানবেও বা কিভাবে? তাদের মাঝে কথা হয় কতটুকু! কেবলমাত্র অনিশ্চিত এক ধারণা করেছে সে। তা এই, মেয়েটা কাউকে ভালোবাসত। তার সাথে বিয়ে হওয়ায় এরকম হয়ে গেছে। নিয়তির দোষ দিবে নাকি নিজের বুঝতে পারে না রতন। ভেতরে ভেতরে নিজেকেই দোষী ভাবে।
শ্বাসকষ্টটা জীবনের সাথে আজীবনের জন্য জুরে গেছে দিশার। সেই যে সেদিন এ রোগের উৎপত্তি ঘটল, তারপর থেকে এটা তার সঙ্গী। ফাহাদ দেওয়ান তাকে উপহার দিয়ে গেছে হয়তো। আঁধারের মাঝে ক্লান্ত চোখ দরজার দিকে গেল দিশার। পাশের ঘরে মেয়ের কাছে চলে গেছে রতন। ফাঁকা ঘরে, অধরে সূক্ষ্ম এক শ্লেষাত্মক হাসি ফুটল রমণীর। বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
‘ দেখার জন্য মানুষ আছে, বোঝার মানুষ যে নেই আমার। ’

ঝলমলে রৌদ্রজ্জ্বল দিন। সাধারণ মানুষের জীবনে এই দিনটা অন্যান্য দিনের মতো হলেও, দুজন মানুষের নিকট এই দিনটা ঈদ আনন্দের মতো।
কোর্টের বাইরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে দিগন্ত আর রায়হান। মনার কেসের শুনানি হয়েছে আজ। স্টুডিও মালিকসহ তার ছেলেকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে সফল হয়েছে তারা। ছাড়া পরত না জুনায়েদ তালুকদারও। যেদিন সে জানতে পেরেছে দিগন্ত ভিডিও দেখেছে। সেদিনই ব্যাগপত্র গুছিয়ে দেশ ছেড়েছে সে। ছেলের কাছে মুখ দেখার মতো আর কোনো অবকাশ ছিল না তার। কেবল পালিয়েছে! এদেশ ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে সুদূর লন্ডনে। সেখানেই ঘাপটি মেরে আছে। এদেশে আসলে তার নিজ সন্তান-ই তাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিবে। শুধু মনার কেসের আসামী নয় সে, মিউজিক চ্যানেলের অনেক টাকা আত্মসাৎ করেছে তারও কেস আছে জুনায়েদ তালুকদারের উপরে। আপাতত সে পালাতক।

কোর্টের কাজ শেষে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল দিগন্ত। বেলার ডেলিভারি ডেট প্রায় কাছেই। এসময় তাকে সময় দিচ্ছে সে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতেই। পুরো বাড়ি প্রায় ফাঁকা। মন খোঁচখোচ করল তার। পকেট হাতড়িয়ে ফোন বের করতেই চোখ ছানাবরা হলো। বাড়ি মানুষদের কল, মিসড কলে নোটিফিকেশন ভর্তি। কিছু একটা আন্দাজ করে আতংকিত হলো তার চেহারা।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় দিগন্ত অবাক লোচনে চেয়ে আছে সম্মুখের কেবিনপানে। কেবিনের বাইরে পাটোয়ারী বাড়ি আর তার বাড়ির লোকজন সব। দিগন্তের হাত কাঁপছে। ঠিক প্রথমবার বাবা হওয়ার সময় যেন পুরো শরীর জমে গিয়েছিল তার। আজো একই দশা!

কেবিনের ভেতরে বেলার পাশে বসে আছে রহমান পাটোয়ারী। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন তিনি। অর্ধচেতন বেলার ঠোঁটজোড়া নড়ছে। হয়তো আব্বুর সাথে কথা বলছে সে। দূর থেকে দিগন্ত দেখল সেসব। কিছুক্ষণ পর একটা ছোট প্রাণ এলো তার কোলে। কি ফুটফুটে একটা ছোট্ট মুখ! একদম তার মতো লাগছে। বাচ্চাটাকে খুব ভালোভাবে কোলে ধরে রাখে সে।
মিনিট খানেক সময় নিয়ে ঘুমন্ত নিষ্পাপ শিশুটার চোখ,মুখ,নাক,ঠোঁট,গাল,চিকন ভ্রুঁ আর মাথাভর্তি কালচে চুলগুলো অবলোকন করে মুখভর্তি হাসে দিগন্ত। চোখভর্তি পানি ভিড় জমে অচিরেই। পাশ থেকে রাসেল পাটোয়ারী বলে উঠে,
‘ মেয়ের বাবা গেলে। ’
মেয়ে? কেঁপে উঠল দিগন্তের বক্ষস্থল। সত্যিই তার মেয়ে হয়েছে। এক মেয়ের বাবা হয়েছে সে। কাঁপাকাঁপা পা জোড়া তার কেবিনের ভেতরে চলে এলো। রহমান পাটোয়ারী আড়চোখে দেখলেন দিগন্তকে। উঠলেন না। দিগন্ত তাকে দেখল একপলক। অতঃপর বিছানায় শুয়ে থাকা বেলার উদ্দেশ্যে মৃদু স্বরে আওড়াল,

‘ আমার মেয়ে হয়েছে। ’
লোকটা যে মেয়ে পাগল লোক তা তো বেলা জানে! কিন্তু এতোক্ষণ একা কষ্ট করল সে আর এখন দেখো কেমন বুক ফুলিয়ে এসেছে মেয়ের বাবা হতে। রাগ হলো বেলার। মুখ থেকে কিছু বের হলো না। দিগন্ত ফের বলল,
‘ আমার মেয়ে হয়েছে, বেলা। সত্যি! আমার মেয়ে হয়েছে। ’
গজগজিয়ে উঠে বেলা। ক্রন্দনরত গলায় রহমান পাটোয়ারীর দিকে চেয়ে বলে,
‘ এ লোক পাগল! পাগল লোককে বিয়ে করেছি আমি। একবারো আমার কথা জিজ্ঞেস করল না। এসে থেকে মেয়ে মেয়ে করছে। আমি ভুল লোক বেছেছি আব্বু! ’
মেয়ে জামাইয়ের কথাশুনে বেক্কল বনে গেল রহমান পাটোয়ারী। এখানে আর তার থেকে কাজ নেই। তবে যাওয়ার আগে দিগন্তকে শুনিয়ে বেলার উদ্দেশ্যে বললেন,

‘ ভুল হলেও আর কিছু করার আছে। আপনি নিজেই বেছে নিয়েছেন আম্মা। ’
কথাটুকু শেষে বাইরে চলে গেলেন তিনি। শ্বশুরের খোচানিমূলক কথা এককানে শুনে আরেককান দিয়ে বের করে দিয়েছে দিগন্ত। আপাতত বাপ-মেয়ের অযথা কথা শোনার সময় নেই তার। মেয়ে নিয়ে মহাব্যস্ত দিগন্ত তালুকদার।
দিগন্তের অসাড় শরীরটা বেলার পাশ ঘেঁষে বসল। বেলার গালে একহাত রেখে উচ্ছ্বাসিত গলায় বলল,
‘ আমার মেয়ে আমার মতো দেখতে হয়েছে। ‘
এবার জোরে শব্দ তুলে কাঁদল বেলা। গাল থেকে দিগন্তের হাত সরিয়ে দেওয়ার প্র‍য়াস চালিয়ে অবুঝ গলায় আওড়াল,

‘ কেমন লোক! এসে থেকে শুধু ওর কথাই বলছে। ভালো লাগে এসব? ’
টলমলে চোখে বিস্তর হাসে দিগন্ত। পূর্ণতার এ হাসি সচরাচর পাওয়া যায় নাকি! অভিমানী স্ত্রীর সারা চোখমুখে টুকরো টুকরো অসংখ্য আদুরে স্পর্শ রেখে বলে সে,
‘ একদম আমার মেয়ের সাথে হিংসে করবেন না। বাপ-মা আর তিন ভাইয়ের একমাত্র আহ্লাদী সে। ’
‘ আগে আমি আহ্লাদী ছিলাম। ’
‘ আপনি বড় হয়েছেন। ’
‘ অমন বড় হওয়ার দরকার নেই আমার। ’
‘ বেলা পাটোয়ারী নিজের মেয়ের সাথেও হিংসা করছে। ’

দিগন্তবেলার প্রেমান্দোলন পর্ব ৬০

এবার দমে গেল বেলা। নরমাল ডেলিভারির কারণে এখন নড়াচড়া করতে পারছে সে। দিগন্তের সাহায্যে আস্তেধীরে উঠে আধশোয়া হয়ে বসল। তার কোলে বাচ্চাকে দিল দিগন্ত। মেয়ের ছোট্ট মুখটা দেখে হাসি ফুটল বেলার মুখে। ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমাচ্ছে মেয়েটা। এদিকে বেলার হাস্যজ্জ্বল মুখটা দেখে প্রশান্তি পেল দিগন্ত। মেয়ে হওয়ার পর রমণীর সাদা ফর্সা বদনখানা চিকচিক করছে। ঠোঁট কামড়ে হাসল দিগন্ত। অতঃপর তার কাঁপা কাঁপা ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিল বেলার কোলে থাকা ছোট্ট কপালটার মধ্যিখানি। পরক্ষণে বেলার কপালের মাঝ অংশেও চুম্বন রেখে মিহি কণ্ঠে আওড়াল,
“ আমার বিন্দু আর বিন্দুচারিণী। ”

সমাপ্ত