তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৯
ঐশী আফরিন
মাধবী ধীরে ধীরে সিরির দিকে পা বারায়। মুখটা যথা সম্ভব শক্ত করে বাধে। কোমর থেকে ছোট্ট ছুরিটা বের করে হাতে নেয়। মাধবীর ধারনা প্রতিটা মেয়েরই নিজের আত্মরক্ষার জন্য সাথে কোন ধারালো জিনিস রাখা। তাই মাধবীর কোমরে সবসময়ই একটা ছুরি থাকে। আপাদমস্তক পুরোটাই চাদরে মোরা মানুষটার পেছনে মাধবী নিঃস্বে দাঁড়ায়। পেছনে থেকেই আস্তে করে বসে পরে। টাখনুর অনেকটা উপরে লুঙ্গি পরায় মাধবীর সুবিধা হয়। মাধবীদ লোকটার ডান পায়ের টাখনু বরাবর ছুরিটা দিয়ে স্বজোরে টান বসায়। তাজা তরল রক্ত মাধবীর হাতে ছিটকে আসে। তৎখনাত মাধবী বড় পিলারের পেছনে লুকিয়ে পরে। মোটা পিলারের কারনে মাধবীর চিকন শরীর দৃশ্যমান হলো না। লোকটা মৃদু আর্তনাদ করে আবার মুখ চেপে বসে পরে। পেছনে ফিরে দেখল কেউই নেই। লোকটা পেছনে ফেরায় মাধবী দ্রুত অন্দরের কাছের পিলারটায় প্রস্থান করে। লোকটা পা চেপে ধরায় কাঁধ থেকে কাপড় কিছুটা পরে যায়। মাধবী আবারও লোকটার কাঁধে ছুরি বসায়। এবার একদম গেঁথে দেয়। আবার সাথে সাথেই টান মেরে বের করে আনে। লোকটা এবার অস্পষ্ট গোঙ্গিয়ে উঠে।
মাধবী এবার দেয়ালের সাথে আড়াআড়ি ভাবে লাগানো দুটো কোষবদ্ধ তলোয়ার থেকে একটি নেয়। দেয়ালে ঝোলানো মশালের আলোয় চারদিক আলোকিত। অন্দরের দরজার দুপাশে ছোট্ট ছোট্ট পিলার করা মোম রাখার জন্য। মোমদানির উপর বিছানো পাতলা মখমলের কাপড়টা নেয়। তারপর এক মিনিটও দেড়ি না করে এক টুকরা কাপড় দিয়ে হাত বেধে ফেলে আরেক টুকরা কাপড় মুখে গুজে দেয়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এখনও লোকটা মাধবীকে দেখেনি।মাধবী এতক্ষন যা করেছে সবটাই পেছন থেকে। সবকিছু খুব তাড়াতাড়িই ঘটে গেল। এবার লোকটার চোখে মুখে আতঙ্ক ছরিয়ে পরে। সে বেশ বুঝতে পারছে এটা কে হতে পারে। এই পুরো রাজ্যে এরকম তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারী তিন জনই আছে। যাদের তীক্ষ্ণতার কাছে হিংস্রতাও হাড় মানে। সে জেনে শুনে রাজবাড়ির ঘুমন্ত দুই সিংহের আওতাভুক্ত সিংহীর ফাঁদে আটকে গেছে। তাদের রাণী মা,আরিয়ান আর মাহফুজ চৌধুরী এদের দৃষ্টির কাছে সিসিটিভি ক্যামেরাও হেরে যাবে। আরিয়ান কে গ্রামে রেখে তার অন্দরে ঢোকা উচিত হয়নি যদিও এখন রাণী মা ই তার কি অবস্থা করবে তা ভেবেই লোকটার ঘান ছুটে যায়। নিজে একটা প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ হয়েও একটা পিচ্চি মেয়ে তাকে কাবু করে ফেললো। অবশ্য এই মেয়ের শান্ত তীক্ষ্ণতার কাছে সে কিছুই না। যেই বয়সে মেয়েররা বনে বাদারে খেলে বেরায় সেই বয়সে এই মেয়ের ভয়ংকর ভয়ংকর ঘটনার রেকর্ড আছে। পর্দার আড়ালে থেকেও ১০-১২ জন পুরুষের সাথে একাই লড়ার ক্ষমতা আছে এই মেয়ের। এই মেয়ের জীবনে এমন ঘটনা অনেক আছে যেখানে সে বড় বড় পালোয়ানদের সাথে তলোয়ারী যুদ্ধে জিতে গেছে তাও আবার পর্দার আড়ালে থেকে। এমনকি মাহফুজ চৌধুরীও তীর ও তলোয়ারী যুদ্ধে মেয়ের কাছে হেরে যান। তীর ও তলোয়ার এই দুটো জিনিস মাধবী নিপুণ হাতে সামলে নিতে পারে।
এতক্ষনের ভাবনার মাঝেই মাধবী অন্দর থেকে রশি নিয়ে এসে তাকে পিলারের সাথে বেধে কাপড় দিয়ে চোখ ঢেকে ফেলেছে। লোকটার চোখ বেধে মাধবী নিজের মুখ খুলে ফেলে। লোকটার মুখের কাপড়টা সরিয়ে দেয় তারপর গালে হালকা করে তলোয়ারটা ছুঁইয়ে হিসহিসিয়ে বলে ” জানোয়ারের বাচ্চা কোন সাহসে তুই রাতের আড়ালে অন্দরে ঢুকেছিস? তোদের মত চুন পুটির জন্য আমি হাত নষ্ট করবো না। তাড়াতাড়ি বল কেন এসেছিস?”
” রাণী মা আমি সত্য কইতাছি আমি খালি চুরি করনের লাইগা আইছি। আর কোন খারাপ উদ্দেশ্য আমার নাই। আমি গরিব মানুষ এবারের মত আমারে ছাইড়া দেন। কসম আর জীবনেও এই গেরামে পা রাখুম না”
” কোন গ্রামের তুই?”
” লগের গেরাম থাইকা আইছি। রাণী মা এবারের মত মাফ কইরা দেন ”
” মাফ শব্দটা আমার একদম অপছন্দণীয় শব্দ। কাল পুরো গ্রামের সামনে তোর হাত কাটা হবে ”
লোকটার মুখ ফেকাসে হয়ে যায় ” রাণী মা আমনের পায়ে ধরি এবারের মত ছাইড়া দেন। আমার হাত কাটলে আমার বউ বাইচ্চারা না খায়া মরবো। আমি চুরি ছাইড়া দিমু আমার হাত কাইটেন না ”
মাধবীর ব্যাপারটা হজম হলো না। কোন সাধারণ মানুষ শুধুমাত্র চুরি করার জন্য রাজবাড়িতে ঢুকবে?তাও আবার মাধবীর অন্দরের সামনে ? কত বড় কলিজা।
” আমি মাফ করা শিখিনি আমি প্রতিটা অন্যায়ের শাস্তি দিতে শিখেছি। আমার চোখে পড়া সমস্ত অপরাধীদের আমি নিজ হাতে শাস্তি দিয়েছি। আর ভবিষ্যতেও দেব। অপরাধ যাই হোক আর অপরাধীও যেই হোক । তাই কাল সকালে গ্রামের বড় মাঠে তোর হাত কাটা হবে। আজ সারারাত এখানেই থাকবি ”
লোকটাকে আর কিছু বলার সুযোগ মা দিয়েই মাধবী লোকটার মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দেয়। তারপর নিস্তব্ধ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে অন্দরে ঢুকে পরে।
আর এতক্ষনের এই পুরোটা কাহিনী আরিয়ান সিরির নিচে দাড়িয়ে অবলোকন করে। মাধবীর এই রুপে সে ভীষন অবাক। সে মাধবীর স্বভাব জানতো কিন্ত এত নিঃস্ব শান্তভাবে মাধবী কাজ করতে পারে তা জানা ছিল না। বছর খানেক আগের সেই ছোট্ট পরিটা আজ কিশোরী। সময়ের সাথে সাথে যেন রুপের বাহার আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ সে হয়ে উঠেছে দক্ষ রাণী মা। আরিয়ানের এখনও হাসি পায় মাধবীর সেই বাচ্চামো স্বভাবগুলো মনে পরলে। আগে আরিয়ান কে সবসময় গুঁড়ো দুধের প্যাকেট নিয়ে ঘুরতে হতো। মাধবী একটু পরপর আরিয়ানের সামনে এসে হাত পেতে বলতো ‘আমাতে ইত্তু দিবা’ কী সুন্দর করেই না আবদার করতো। আরিয়ান হাতে অল্প দুধ দিলে তা পুরো বাড়ি দৌড়াতো আর খেত। তখন আরিয়ানেরও ঐ পুচকির পেছনে দৌড়ানো লাগতো। আচ্ছা! এখন মেয়েটা কার কাছে আবদার করে? নিশ্চয়ই বাবার কাছে । এখনও কী আগের মত সেই চেটে চেটে গুঁড়ো দুধ খায়? আরিয়ান ঠিক করলো সে মাধবীকে জিজ্ঞেস করবে।
পরক্ষণেই নিজের ভাবনায় নিজেকেই একটা চটকানা দিতে ইচ্ছে করলো। তার সদ্য বিয়ে করা বউটার এমন ভয়াবহ রুপ দেখে কই তার দুঃখ পাওয়ার কথা ছিল আর সে ভাবছে গুঁড়ো দুধের কথা। এই অপূর্বটার সাথে থেকেই তার এমন উন্নতি হচ্ছে। নাহলে সে এতক্ষনে চিন্তায় চিন্তায় চিন্তার সাগরে ডুবে মরতো। এসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতেই আরিয়ান নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে তরে।
পরদিন বেলা এগারোটায় গ্রামের বড় মাঠে বিচার সভা বসে। মাঠটা রাজবাড়ির সামনেই বাঁ দিকে। লোকটা সারারাত ওভাবেই ছিল। সকালে মাহফুজ চৌধুরী মাধবীর অন্দরে নাস্তা নিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করে।পরে মাধবী সবটা খুলে বললে তিনি বিচার সভা ডাকেন। মাধবীর কথা অনুযায়ী বিচারের রায় হয় লোকটার হাত কাটা হবে। সুলতান চৌধুরী এতে বাধ সাধলে মাহফুজ চৌধুরী কড়া চোখে তাকায়। বড় দু ভাইয়ের মাঝে সুলেমান চৌধুরী আর কথা বারায় না।অতঃপর ভরা মাঠে হাজার হাজার মানুষের সামনে লোকটার দেহ থেকে হাত আলাদা করা হয়। তারপর কাটা হাত সহই লোকের সাহায্যে তাকে বাড়ি পাঠানো হয়।
মাধবীদ ছাদে দাড়িয়ে পুরোটা দেখে। বিচার শেষে তিন ভাই বাড়িতে ফিরে আসে। সুলেমান চৌধুরী অন্দরমহলে ঢুকে গেলে মাধবী চলে যেতে নেয়। পরক্ষণেই কানে আসে বাপ-চাচার তর্ক। মাহফুজ চৌধুরীর কন্ঠে যেন আগুন ঝরে পরছে। বুঝতে শিখেছে পর থেকে মাধবী কখনো বাপ-চাচাদের মধ্যৃ ঝগরক হতে দেখে নি। তীব্র তর্ক-বিতর্ক ছাপিয়ে ব্যাপারটা এবার হাতা হাতির পর্যায়ে চলে যায়। সুলতান চৌধুরী মাহফুজ চৌধুরীর কলার ধরতেই মাধবীর বুক ধুক করে উঠে। মাধবী আর কোন দিকে না তাকিয়ে সিরি ভেঙে দৌড়ে নিচে চলে যায়। অন্দর থেকে বের হওয়ার আগেই দেখতে পায় আরিয়ান দুজনকে সরিয়ে দিয়েছে। সুলতান চৌধুরী গটগট পায়ে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
মাহফুজ চৌধুরী হঠাৎই আরিয়ান কে জরিয়ে ধরে। মাধবী আরিয়ান দুজনেই মাহফুজ চৌধুরীর হঠাৎ কাজে হতভম্ব। মাধবী স্পষ্ট দেখতে পায় তার বাবার চোখে পানি চিকচিক করছে। মাধবীর দমবন্ধকর কষ্ট হয়।
” বাবা আমার মেয়েটাকে আর কিভাবে নিরাপদ রাখবো। ঐ হারামজাদা যদি মেয়েটার ক্ষতি করতো। এত কড়া নিরাপত্তাও আমার মেয়েটাকে নিরাপদ রাখতে পারছে না ”
” আমার কাছে দিয়ে দিলেই তো পারেন। এত ভং চং এর কী আছে যত্তসব ”
আরিয়ান মনে মনে আওরায়।
কথাগুলো বলতে বলতেই মাহফুজ চৌধুরীর গাল বেয়ে চোখে জমে থাকা পানিটুকু গড়িয়ে পরে। মাধবীর চোখও যে কখন ভিজে উঠেছে সে বুঝতেই পারেনি। নিজেকে হাড়ানোর ভয়ে বাবার চোখে পানি দেখাটা বোধহয় মাধবীর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য মনে হলো। তার পাথরের মত শক্ত বাবার চোখে পানি তাকে হাড়ানোর ভয়ে। কোন পুরুষ মানুষের চোখে মাধবী নিজের জন্য পানি দেখলো ভাবতেই মাধবীর নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। পৃথিবীর সব বাবারাই কী মেয়েদের এত ভালোবাসে? হয়তো হ্যা নয়তো না। কিন্ত সব মেয়েরাই যে বাবা কে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে এটা মাধবী গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবে।
আরিয়ান মাহফুজ চৌধুরীকে আগলে পেছনে না ফিরেই বলে ” মাধবী ভেতরে যা ”
মাধবী অবাক হয়। লোকটা না দেখে কীভাবে বুঝলো এখানে সে দাড়িয়ে আছে। তার চেয়েও বড় কথা তাকে মাধবী বলে ডেকেছে। মধু ছাড়া আরিয়ান তাকে আর কখনো অন্য নামে ডেকেছে কিনা মাধবী মনে করতে পারলো না। তবে খুশি মনে সে সেখান থেকে প্রস্থান করে। তাকে হাড়ানোর ভয়ে বাবার চোখে পানি দেখেছে এর চেয়ে খুশির আর কী হতে পারে।
তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৮
আরিয়ান মাহফুজ চৌধুরীকে সামলে অন্দরে পাঠিয়ে দেয়। তারপর অপূর্বর সাথে দেখা করতে যায়। অপূর্ব কে অতিথিমহলে না দেখে রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে পরে। আজ তার যেভাবেই হোক অপূর্বর সাথে কথা বলতে হবে। ব্যাটা নাকি প্রেমে পরেছে। সময়ের অভাবে জানতেও পারলো না কে সেই মেয়ে ? অপূর্ব যে প্রেমে পরতে পারে এটা সে কোন ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। আর যাই হোক অপূর্বর জীবনে প্রথম প্রেমে পরা নিশ্চয়ই মেয়েটা যেন তেন মেয়ে না। তবে যতই সুন্দর হোক না কেন মাধবীর মত তো জীবনেও হতে পারবে না। মাধবীর সৌন্দর্যের কাছে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যই ফিকে মনে হয় আরিয়ানের কছে। শুধু তার কাছেই না যে কয়েকটা মানুষ মাধবীকে দেখেছে তাদের প্রত্যেকের কাছেই মাধবী অপ্সরা।
