Home চারুবৃত্ত চারুবৃত্ত পর্ব ১৩

চারুবৃত্ত পর্ব ১৩

চারুবৃত্ত পর্ব ১৩
জুলি জোনাকি

ভ্যাপসা গরম । চারদিকে মানুষের ভীড় নেই । চারু এখনো থমকে আশ্চর্যে কপালে ভাজ ফেলে আবাক চোখে তাকিয়ে আছে । বৃত্ত চারু নামটা নিয়ে, এলোমেলো পায়ে দৌড়ে এসে আচমকা চারুর হাতের নিচ দিয়ে দু হাত পেচিয়ে জড়িয়ে ধরলো । বৃত্তের বা কাধে চারুর ঠোঁট ছুইছুই হলো । বৃত্ত সস্থির শ্বাস ছেড়ে বলল,
” আই এম সরি ।”

চারুর চোখ দুট বন্ধ ছিল , বৃত্তের কণ্ঠে হারিয়ে ফেলার ভয় । হাতে থাকা ময়লার ব্যাগটা হাত থেকে পরে গেল । এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল বৃত্তকে । বৃত্ত দু পা পিছিয়ে গেল । চারু কিছু বলতে গিয়েও বৃত্তের মুখের দিক তাকিয়ে থেমে গেল ।
সাদা শার্ট টা ঘামে ভিজে গেছে । চোখে মুখে ঘাম চিকচিক করছে । চুলগুলো কেমন এলোমেলো অগছালো । কেমন রুক্ষ্ণ দেখাচ্ছে, কেমন বেহাল দশা হয়েছে । চারুকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বৃত্ত এক পা এগিয়ে এলো, চারু এক পা পিছিয়ে গেল । চার দিকটা চোখ বুলিয়ে কম্পিত সুরে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” আ আ আপনি এ এখানে ? ”
বৃত্তের সুরে পরিবর্তন দেখা দিল । সেই আগের মতো করে বলল,
” বা রে তুমি এখানে আমিও তো এখানেই থাকবো , এটা কি স্বাভাবিক না? ”
” কেন এসেছেন ?”
বৃত্ত একটু ঝুঁকে বলল,
” যদি বলি তোমার জন্য ?”
চারুর চোখ ছলছল হলো, ঠোঁট কামরে কান্না আটকে তাকাল । বৃত্ত হাসলো , চারুর মাথার দুল গুলো অনুমতি ব্যতীত ছুইয়ে এলোমেলো করে বলল,

“আমার থেকে পালিয়ে এই ওবদি এলে ? ”
চারু মাথাটা সরিয়ে নিয়ে বলল,
” আমার খোঁজ পেলেন কি করে ?”
” সাত দিল হলো তোমায় দেখি না , আর আমার থেকে দূরেও তো যেতে পাড়লে না , খুঁজে পাওয়া কি স্বাভাবিক না? ”
” তাহলে এবার অনেক দূরে যাব , যেখানে আপনি যেতে পারবেন না । ”
” ট্রাই করতেই পরো । ”
চারু গা ঘুড়িয়ে উল্টো পথে পা বাড়াল, দু পকেটে হাত গুজে বৃত্ত পেছন পেছন ছুটলো । চারু আড় চোখে পেছনে দেখলো , হুট করে বৃত্ত বলে উঠলো ,
“পেছন ঘুরেই ভালো করে দেখতে পারো , সামনে থেকে আড় চোখে দেখে শান্তি পাবে না । ”
চারু কেশে আওরাল,
” আমি কখন দেখলাম ?”

বৃত্ত শব্দ করে হেসে চারুর সামনে গিয়ে উল্টো পায়ে চারুর মুখোমুখি হাটতে হাটতে বলল,
” এবার দেখতে পারো । তুমি চাইলে আমি দাড়াতেও পারি , যেভাবে দেখে সুবিধা । ”
সেই আগের হাসি চোখে মুখে আঁচরে পড়লো বৃত্তের । চারু তাকালো না , বেশ হাসফাস করছিল । বৃত্ত ওভাবে হাটতে হাটতে রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিলেই চারু হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললো । বৃত্ত হাতটা ধরে দুষ্ট সুরে ব্যাঙ্গ করে বলল,

“ওহো , চারু ।”
চারু হাত ছেড়ে দিল । চটপট করে বলল,
“আপনি আমার পেছন পেছন আসবেন না ।”
” তোমার কথা কেন শুনবো ?”
” কারণ …….”
বৃত্ত ঠোঁটে হাসি টেনে মুখটা একটু চারুর দিক এগিয়ে এনে ফিসফিস করে বলল,
” কারণ কি ……?”
চারু মুখ দিয়ে একটা শ্বাস ছেড়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,

” দেখুন …”
” এ মা ছিঃ আমি এতো খারাপ্ও না চারু ।”
চারু তোঁতলালো ,
” আ আমি কখন … আপনার ভাবনা গুলো বাজে ।”
“আমি কি করলাম , তুমিই তো দেখাতে চাচ্ছ ।”
“দেখেন আমার পিছু পিছু আসবেন না । ”
“ওওওওওওও , ঠিক আছে । যাও ।”
চারু পায়ের গতি বাড়িয়ে চলে যেতেই বৃত্ত চেঁচিয়ে বলল,
” শুনো চারু, আবার দেখা হবে , যখন তখন ।”
চারু আরো জোরে পা চালিয়ে চলে গেল । বৃত্ত মুখ থেকে হাসি সরছেই না । মাথা চুলকে একাএকাই হাসলো ।

“কি হয়েছে চারু , হাপাচ্ছ কেন ?”
“এ একটু পানি দাও ।”
লতা পানি এনে দিতেই এক নিমিষে শেষ করে, বুকে হাত রেখে জোরে শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়লো । লতা ফের বলল,
” ও চারু ,কি হয়েছে গো , এমন করছো কেন ? ভুঁত দেখলে নাকি ?”
” হ্যা, ভুঁতের ও বড় ভুঁত । ”
“কি বলো , তাবিজ লাগাতে হবে নাকি ?
“কেন ?”
“ওমা ভুঁত তারানোর জন্য ।”
চারু দাত বের করে হেসে ফেললো । তারপর কথা ঘুরিয়ে বলল,

” কাস্টমার কেমন আসছে ?”
“তুমি নিজের চোখেই দেখো ।”
চারু উঠে গিয়ে উঁকি দিল , বেশ লোকের ভীড় । চারু আবাক হয়ে বলল,
“অন্য দিনের থেকে আজ বেশি মানুষ মনে হচ্ছে ।”
“হ্যা, সবার খাবার ভালো লেগেছে । ”
“হুমমম । মা কোথায় ।”
“মা তো রান্না করছে ।”
” চলো আমরাও এবার হাত লাগাই ।”
“ওকে বস ।”

দুজনি অট্ট হাসিতে মেতে উঠলো । তারপর কোমড়ে ওড়না বেধে কাজে লেগে পড়লো । বেশ কিছু খাবারের অর্ডার এলো । চারু তা নিজ হাতে বানিয়ে বানিয়ে দিতে লাগলো , আর লতা তা দিয়ে আসলো । চারু মাকে বসিয়ে রাখলো ।
কিছু দিন হলো ফুড কার্ডের দোকান টা দিয়েছে । বেশ চলছিল , লতা কাজ ছেড়ে দিয়ে চারুর হাতে হাতে সাহায্য করে । একটা খোলামেলা জায়গা , গাছের নিচে কিছু টেবিল আর চেয়ার পেতে রেখেছে ।

“বৃত্ত, খাবি আয় ।”
বৃত্ত ঘরের ভেতর পয়চারি করছিল , এমন সময়ে তার মা এলো , ভেতরে না ঢুকেই বাইরে থেকে আওয়াজ দিল । চারু যাওয়ার পর থেকে মায়ের সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে । খাওয়া -দাওয়া টাও বাইরেই বেশি করা হয় । আজও বাইরে থেকেই খেয়ে এসেছে । মা ডাকতেই বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বলল,
“আমি বাইরে খেয়ে এসেছি ।”
বৃত্তের মা সল্প সময় চুপ থেকে দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
“একটু ভেতরে আসি ?”
বৃত্ত উওর দিল না । দরজা ঠেলে ভেতরে এসে দাঁড়ালো, বৃত্ত ওভাবেই ফোনে মুখ গুঁজে আছে । ছেলের পাশে বসে বলল,

“এমন কেন করছিস বাবা, কার জন্য করছিস ? আমি তোর মা হই , একটা বাইরের মেয়ের জন্য মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছিস ? ওই সব মেয়েরা ভালো হয় না , তোর মতো ছেলেকে ফা…….”
পুরো কথা শেষ করতে দিল না বৃত্ত । পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঘৃণা নিয়ে মায়ের দিক তাকিয়ে বলল,
” তুমি এখনো তেমনি আছো ? মানুষকে নিয়ে তোমার মনে এতো বাজে ধারনা ? সিরিয়াসলি? ”
বৃত্তের মা তেলে বেগুনে তেঁতে উঠলো । দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
” ওই সব মেয়ে ভালো না বৃত্ত । চারু একটা …….”
“তুমি চারুর নামে আর একটা বাজে কথা বললে আমি এই মূহুর্তে বাড়ি ছেড়ে চলে যাব । ”
” মাকে হুমকি দিচ্ছিস , এমন কবে হলে ?”
” আমি তো এমনি । ”
“তোরা বাপ ছেলে এখন বুঝবি না , যখন বুঝবি তখন কপাল চাপড়াবি ।”
মা ছেলে অনেকটা সময় নিয়ে কথা কাটাকাটি করলো । বৃত্তের মা এক প্রকার চারুর ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিয়ে গেল । বৃত্ত মাথা ধরে ধপ করে বসে পড়লো ।

রাত হলো বেশ, আকাশে তারা ঝকঝক করছে । ছোট্ট দোকানটা দুজন মিলে বন্ধ করে সবে ঘরে এসেছে । রাত তখন এগারোটা ছুইছুই, হাত মুখ ধুয়ে এক সাথে খেতে বসলো । খাওয়া শেষে চারু আর লতা টাকা গুনছিল কেমন রোজগার হলো । গুনে দেখলো চার হাজার আশি টাকা । টাকা তিন ভাগ করে দু ভাগ তারা নিলো আর বাকি এক ভাগ টাকা দিয়ে কিছু জিনিস কিনতে হবে বলে রেখে দিল ।
“আচ্ছা চারু , ভালোই তো চলছে দোকান টা , কিছু নতুন খাবারও যোগ করি , ভালো হবে না ?”
“ঠিক বলেছে । একটা কাজ করো , নতুন কিছু আইটেম খাতায় লিখ আমিও লিখি তারপর ভেবে ভেবে দেখা যাবে ।”
“ঠিক আছে ।”

লতা ঘরে চলে গেল । চারুর মা ঘুমচ্ছে , চারু বেশ কিচ্ছুখন মায়ের দিক তাকিয়ে থেকে বলল,
“কাল তোমায় একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব ।”
কিছু একটা মনে করে বেলকুনিতে গিয়ে দাঁড়াল চারু । রাতের পরিবেশটা বেশ ভালো ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা । মনটাও বেশ ফুরফুরে । হঠাৎ বৃত্তের কথা মনে পড়লে । তখনকার কাণ্ড মনে এলো । আনমনেই কখন যে মুচকি হেসে উঠলো খেয়ালটি নেই তার । আচমকা পেছন থেকে কেউ কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“হাসছো কেন চারু ?”
চারু বুকে হাত দিয়ে থতমত খেয়ে তাকাল । চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ভীত সুরে বলল,

“লতা তুমি ? ভয় পাইয়ে দিয়েছো ।”
লতা হিহি করে হাসলো ।বলল,
“আমি তো নতুন খাবারের কিছু তালিকা এনেছিলাম । এসে দেখলাম তুমি মুচকি হাসছো । ”
চোখের পাতা বেশ কয়েক বার ফেললো চারু । তারপর হাসফাস করে বলল,
“কই হাসছি না তো ।”
লতা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারুকে দেখে বলল,

“তোমার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে তুমি হাসছো । ”
” কই না তো ।”
“উহু ।”
“হুমমম ।”
“আবার মিথ্যে বলে ? বলো হাসছো কেন ?”
“হাসছি না আমি । অনেক রাত হয়েছে এখন ঘুমাতে যাও ।”
এই বলে চারু লতার হাতে থাকা কাগজটা নিয়ে লতাকে ঠেলে বের করে দিয়ে ঘর আটকে দিল । লতা যেতে যেতে বলে গেল ,

চারুবৃত্ত পর্ব ১২

“বললে না হাসছো কেন !”
চারু দরজা আটকে দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলো ,
“আশ্চর্য! আমি হাসছি ?”

চারুবৃত্ত পর্ব ১৪