Home নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৮ (২)

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৮ (২)

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৮ (২)
নাজনীন নেছা নাবিলা

টকবক,টকবক করে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে মিহাল খান। প্রফেসরের পাশাপাশি যদি তার আরেকটি পরিচয় থাকে সেটা হল একজন অভিজ্ঞ হর্স রাইডার। হর্স রাইডিং করতে তার বেশ ভালো লাগে। যেখানে এই যুগে এসে সবাই বাইক রাইডিং করে সেখানে এখনো সে হর্স রাইডিং করতে বেশি স্বাচ্ছন্ন বোধ করে।

ভার্সেইলস (Versailles) বলতে সাধারণত ফ্রান্সের প্যারিসের কাছে অবস্থিত বিখ্যাত প্যালেস অফ ভার্সেইলস (Palace of Versailles) বা ভার্সেইলস প্রাসাদকে বোঝানো হয়।সে সেখানেই নিজের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে।কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। পরনে তার কালো প্যান্ট, এস কালারের টি-শার্ট এবং তার ওপর কালো কালারের জ্যাকেট। খুব জোরে ছোটাচ্ছে সে ঘোড়া। এরকম পর্যাপ্ত সময় নিয়ে প্র্যাকটিস করে সে থামল। খুব সাবধানতা অবলম্বন করে ঘোড়ার উপর থেকে নেমে পড়ল। তারপর ঘোড়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে চুমু খেল। মা বাবার পর সে তার নরম দিক কেবল মুনভি কে দেখাতো।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কিন্তু তাছাড়াও যদি তার নরম দিক সম্পর্কে কারো জানা থাকে সেটি হলো তার ঘোড়া মুনসশাডো। কোন এক রাতের আঁধারে তার সামনে চাঁদের ছায়া হয়ে এসেছিল এই ঘোড়া তাই ঘোরাটির নাম সে দিয়েছে মুনসশাডো।মুনসশাডোর সাথে আরো কিছুক্ষণ সময় ব্যয় করে তারপর সেখান থেকে বের হয়ে গেল। এবং সেখান থেকে বের হতে না হতেই তার মুখে আবার সেই আগের গম্ভীর্য ফুটে উঠলো। যেন তাকে দেখলেই যে কোন মানুষ নিঃসন্দেহে বলতে পারবে তার মধ্যে কোন অনুভূতি নেই। অনুভূতি তো দূরের কথা অনুভূতি দিয়ে হৃদয়ে থাকে সেই হৃদয় নেই। কলেজেও তাকে স্টুডেন্ট এবং অন্যান্য তার কলিগরা হার্টলেস হিসেবেই চেনে। অথবা সেলফিশ ম্যান। সে বরাবরই নিজের ভালো আগে বেছে নেয়। কারো কাছে নিজের ভালো দিক সহজে প্রকাশ করে না। তার মতে এগুলো মানুষ সিম্প্যাথি নেওয়ার জন্য করে। কিন্তু সে কারোর সিমপ্যাথি নিতে প্রস্তুত নয়। তার কাছে তার ইগো আগে, এটিটিউড আগে তারপর বাকি সব। কিন্তু হ্যাঁ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সে যতই হৃদয়হীন হোক, এবং স্বার্থপর মানুষ হোক নিজের স্বার্থ খুঁজতে গিয়ে কখনোই অন্য কারোর ক্ষতি করে নি।

মিহাল নিজের ব্ল্যাক মার্সিডিসে উঠে বসলো। তখনই তার ফোনে কল এলো‌। ফোনের স্ক্রিনে নাম্বার দেখে বাঁকা হাসলো এই কলেরই সে অপেক্ষা করছিল।ফোন লাউড স্পিকারে দিয়ে গাড়ি চালাতে লাগলো।
অপর পাশের ব্যক্তিটি বলল__
বস আমি আমার লোকদের দ্বারা যতটুকু জানতে পেরেছি ততটুকুর ভেতর একদম কনফার্ম হয়ে বলছি যে মেয়েটির ফ্ল্যাইট আগামী সন্ধ্যায়।
মিহালের ঠোঁট স্মিত হাসি ফুটে উঠলো।সে ঠোঁটের হাসি বজায় রেখে বলল__

ওয়েল ডান। যে করেই হোক মেয়েটি যেন একদম নিরাপদ ভাবে এখানে পৌঁছায়। কেউ যদি কোন রকম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে প্রয়োজন পড়লে তাকে পথ থেকে সরিয়ে দিবে। কিন্তু হ্যাঁ জানে মারবে না। সেটার জন্য তো আমি আছি। কিন্তু মেয়েটি যেকোনো হালে যেন সঠিক সময় নিজের ফ্ল্যাইট পেয়ে যায়।
উপর পাশের ব্যক্তিটি ওকে বস বলে ফোন কেটে দিল। মিহাল বাঁকা হেসে বলল____
অনেক লুকোচুরি খেলেছিস তুই আমার সাথে। আমার কাছের মানুষ হয়ে তারপর আমাকে ঠকিয়েছিস। আমিও তোর কাছের মানুষের মাধ্যমে তোকে ঠকাবো। তার জন্য যত নিচে নামতে হয় আমি নামবো। কাউকে মাথায় তুলে আছাড় দেওয়ার জন্য আগে নিচে বসে তাকে মাথায় চড়ার সুযোগ দিতে হয়। আমিও তাই করব। কিন্তু তুই আমার হাতে ধ্বংস হবি। যেসব অতীত মাটির তলায় চেপে রেখেছিলাম সেগুলো আস্তে আস্তে মাটি খনন করে বের করব। দেখা যাবে অতীত কে বের করতে গিয়ে মাটি খনন করার সময় হীরা পেয়ে গেলাম।

নীলার ব্যাগ পত্র সব কিছু একদম গোছানো শেষ। তার মা চাচীরা মিলে সবকিছু গুছিয়ে দিয়েছে। এক লাগেজে যদি তার কাপড় তো আরেক লাগেজে তার মা চাচী না মিলে নিজেদের হাতে বানানো খাবার ভরে দিচ্ছে। যেমন মুড়ির মোয়া, হাতের বানানো আচার, আমসত্ত, নারিকেলের নাড়ু এইসকল কিছু। এমন সময় তার বাবা চাচারা তার রুমে এলো।নীলা বসে বসে ইবাদ এবং আবিরের সাথে কথা বলছিল।আবির নীলা প্যারিসে চলে গেলেই সেও নিজের মেডিকেলে তে চলে যাবে। বাড়ি সম্পূর্ণ খালি হয়ে যাবে বলে ইবাদের মন খারাপ। এখন সেও জেদ ধরছে যে সে হোস্টেলে চলে যাবে। কিন্তু এত অল্প বয়স হয়ে তো আর তাকে হোস্টেলে দেওয়া যাবে না। আর বাড়ির সব ছোটরা যদি একসাথে চলে যায় তাহলে বড়দের খুব খারাপ লাগবে। তাই নীলা এবং আবির মিলে ইবাদ কে বোঝাচ্ছে।
ইমরান মির্জা,আকাশ মির্জা এবং নিলয় মির্জা লাগেজ খুলে নিজেদের মত দেখতে লাগলেন। যাকে বলে মনের সন্তুষ্টি। হঠাৎ ইমরান মির্জা নারিকেলের নাড়ুর বোয়ম হাতে নিয়ে ভাঙা কণ্ঠে বললেন ____”

হাতের তৈরি নারিকেলের নাড়ু মিনুর খুব প্রিয় ছিল।
সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।আকাশ মির্জা এবং নিলয় মির্জার চোখে পানি। এবং তাদের স্ত্রীরা মিনু কে নিজ চোখে সামনাসামনি না দেখলেও তাদের মুখ থেকে এত প্রশংসা শুনেছেন যে তারাও মিনুর ভক্ত হয়ে গিয়েছেন। তারা এসে নিজেদের স্বামীদেরকে সান্ত্বনা দিলেন। পিছনে আবির ইবাদের সাথে কথা বলাতে ব্যস্ত থাকলেও নীলার মনোযোগ বড়দের দিকে ছিল। বিশেষ করে মিনু নামটা শুনে তার নজর এদিকে চলে এলো। তার মনে আবার পুরোনো করে কৌতূহল জেগে উঠলো। কিছুদিনের ঝামেলা সে এই বিষয় সম্পর্কে ভুলে গিয়েছিল।

এখানে সবাইকে ব্যস্ত দেখে সে চুপচাপ উঠে পরলো এবং নিজের বাবার রুমে চলে গেল। তারপর কিছু একটা খুঁজতে লাগলো। এবং সেই কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি খুঁজেও পেলো। দরজার দিকে গিয়ে আরেকবার উঁকি দিয়ে দেখল কেউ আসছে কিনা। যখন দেখলো কেউই তখন আবার রুমে এসে কাঙ্খিত বস্তুটি খুললো। তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রুও গড়িয়ে পড়ল। এমন কিছু সে জানতে পারবে তা সে কল্পনাও করতে পারে নি। একের পর এক ধাক্কা যেন সে পেয়ে যাচ্ছে। তবুও প্রত্যেকটি ধাক্কা পাওয়ার পর দুর্বল না হয়ে বরং আরো বেশি পাথর হয়ে উঠছে। সে কাঙ্খিত বস্তু জায়গামতো রাখার আগে নিজের ফোন বের করে প্রয়োজনীয় কিছু ছবি তুলে নিল। তারপর চুপচাপ কাঙ্খিত বস্তু জায়গা মতো রেখে রুম থেকে বের হয়ে গেল।

ইরফান বাড়ির সবাই কে বলে বের হয়েছে।আজ সন্ধ্যায় নীলার ফ্ল্যাইট এখন সকাল ১১ টার বাজে। বিকাল তিনটার দিকে নীলা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হবে। দুপুরের মধ্যেই তার নিজের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। বাড়ি থেকে বের হয়ে কাউকে কল দিল। তারপর গাড়ি নিয়ে ছুটলো নিজের গন্তব্যে। যেভাবেই হোক তাকে নীলার প্যারিসে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। নয়তো অনেক বড় বিপদে পড়ে যাবে সে নিজে। আর নীলা দেশে থাকলে তারই লাভ। যেভাবেই হোক নীলার মন গলিয়ে নীলার কাছ থেকে অফিসের নীলার অংশ সে নিজের নামে করবে।

যেটা নিয়ে একবার আশা করেছে সেটা সে হাত ছাড়া হতে দিবে না। চার রাস্তার মোড় দিয়ে এসে গাড়ি চালাচ্ছিল। এমন সময় এক বড় ট্রাক এসে তার গাড়ি ধাক্কা দিল। ফলস্বরূপ সে গাড়ির ব্রেক কষতে গিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা খেল। এবং মাথা লাগলো গাড়ির স্টিয়ারিং এ। কপাল থেকে রক্ত বের হতে শুরু করল। গাড়ির গ্লাস ভেঙে কিছু টুকরা তার গায়ে এসে লাগল। আসলে সবকিছু তার মনের মতই প্ল্যান করা ছিল। কিন্তু সে নিজের চিন্তায় মগ্ন ছিল বলে ভুলে গিয়েছিল এখানে তার প্ল্যান সফল হবে। তাই এক্সিডেন্টে কিছুটা গুরুতর আহত হয়ে গেল। যে এক্সিডেন্ট করেছি সেটার কথা মতোন পালিয়ে গেল। আশে পাশের লোক এসে তাকে গাড়ি থেকে বের করে হসপিটালে নিয়ে গেলাম এবং ভর্তি করিয়ে দিল।

ইকরা নীলার বাড়িতে চলে এসেছে দুজন মিলে একসাথে বের হবে। নীলার বাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়া সোজা। ইকরার বাড়ি কিছুটা দূর তাই চলে এসেছে আগে আগে।ইকরার সাথে তার মা বাবা এসেছে। মেয়েকে এয়ারপোর্ট দিয়ে তারপর ওনারা বাড়ি ফিরে যাবেন। সবাই মিলে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে সবাই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। আরশি আর নিচে খেতে এলো না কারণ নীলার প্রতি সবার আদিখ্যেতা তার পছন্দ হবে না।
সবাই খাওয়া শেষ করে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসল। বড়রা মিলে দুই মেয়েকে এটা সেটা বোঝাচ্ছে যেহেতু প্রথমবার দেশের বাহিরে যাবে একা একা। এমন সময় ইমরান মির্জার ফোনে কল আসলো। তিনি কল ধরতেই কেউ একজন বলল_____

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৭

আমরা হসপিটাল থেকে কল করেছি। আপনার ছেলে ইরফান মির্জার এক্সিডেন্ট হয়েছে। এখন আইসিইউ তে ভর্তি তার গুরুতর অবস্থা।
কথাটি শুনেই ইমরান মির্জার হাত থেকে ফোন মেঝেতে পড়ে গেলে। অস্পষ্ট সরি কেবল বললেন____
ইরফানের এক্সিডেন্ট হয়েছে।
সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িং রুমে নীরবতা নেমে এলো। সবার চোখ মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠলো।

নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৯