Home ছায়াস্পর্শ ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১ (২)

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১ (২)

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১ (২)
জান্নাত চৌধুরী

হঠাৎ ..
কারো গোঙানির আওয়াজ কানে এলো ইফরাহর। ইফরাহ শরীর কেমন ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। শব্দের উৎস খুঁজতে এদিক-ওদিক তাকলো। তবে ঘরের কোথাও কিছু নেই। ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকলো গঙ্গানির আ‌ওয়াজ। অস্পষ্ট কতগুলো কথা কানে আসছে। কেউ কথা বলছে ? কিন্তু কোথায় কথা বলছে? ইফরাহ ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়, ধীরে ধীরে শব্দ অনুযায়ী পা চালায় সে। কিছু সময়ের মধ্যেই পরপর কয়েকবার ঘোরপাক খেলো সে। তবুও অস্বাভাবিক কিছু নেই‌। তবে কেউ কথা বলছে , সে কথা গুলো হালকা পাতলা প্রবেশ করছে ঘরে। ইফরাহ ক্লান্ত হয়ে ঘরে মেঝেতে বসে পড়লো। মনে মনে বার বার খোদাকে স্বরণ করেছে। কিছটা চেঁচামেচি কানে আসছে এবার!

ইফরাহ শান্ত হয়ে ঘরে কান পাতে। ধস্তাধস্তি হচ্ছে‌, হ্যাঁ ধস্তাধস্তি করছে কেউ। ইফরাহ উৎস খুঁজে পায় না – পুরো ঘরটা ভয়ংকর এক পাতালপুরী মনে হলো তার কাছে। ঠিক রাক্ষুসে নগরী লাগলো , যেথায় অদৃশ্য কত কারবার চলে তবে চোখে পড়ার মতো না। ইফরাহ রাগে ব্যর্থ নারীর মতো মাটির মেঝেতে কয়েকবার হাতের বাড়ি দিতেই খটখট এক শব্দ হলো। ইফরাহ ক্লান্ত মস্তিষ্ক আবারো সজাগ হলো.. সে কিছুটা ঝুঁকে মাটিতে কান পেতে কিছু শুনতে চেষ্টা করলো। তবে কথাগুলো এখন আর কানে আসছে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

উঠে বসলো , আবারো পর পর দুইবার মাটিতে আঘাত করে নিশ্চিত হলো এটা মাটি নয় এস্থানে কাঠের অবস্থান রয়েছে। ভেলকি দিতে নতুন এক সাজসজ্জা এখানে। ইফরাহ কাঠ সরানোর পথ খুঁজলো। প্রথমত কার্পেট সরিয়ে এরপর ভারি মোটা কাঠের লম্বা টুকরো বেশ কষ্টে টেনে সরালো। কি ভয়ংকর অন্ধকার নিচে চোখে। কিছু পড়ে না; গর্তের নিচে তাকিয়ে উঠে দাড়ালো ইফরাহ! ঘরের এক কোণ হতে এক মর্শাল হাতে তুলে আবারো এলো গর্তের কাছে। ওই যে লম্বা এক লোহার সিঁড়ি দেখা যায়। ইফরাহ গায়ের শাল খুলে রাখে , শাড়ির আঁচল কোমড়ে প্যাঁচ মেরে সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নামার আগে মর্শাল মুখে চেপে ধরে।

বড্ড সাহসী লাগছে তাকে। মনের কোণে ভয় জমা হলেও তার লেশ মাত্র চেহারায় নেই। বীরাঙ্গনাদের মতো লৌহ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে সে। গভীরতা যত বৃদ্ধি পায় কথার আওয়াজ তত স্পষ্ট হয়। ইফরাহ শেষ সিঁড়ি পাড় হয়ে মুখ থেকে মর্শাল নামিয়ে নেয়। লোহার সিঁড়ি তাকে আরো এক রাজ্যে নামিয়ে এনেছে। তবে এ রাজ্য গুছানো নয় লন্ডভন্ড এক রাজ্য।

একদিকে মাটির ভ্যাঁপসা গন্ধ অপরদিকে মাংস পচার বিষাক্ত ঘ্রাণ। পেটের নাড়ি ভুঁড়ি উল্টে বেড়িয়ে আসতে চাইছে।
ঘরের চার কোণায় বড় বড় কতগুলো ড্রাম রাখা। সেই ড্রাম ভর্তি ভর্তি তরল‌।গা গুলিয়ে আসছে গন্ধে … শরীর ঘেমে উঠেছে‌ অকারণেই। ইফরাহ মর্শাল হাতে শক্ত করে চেপে ধরে একটা ড্রামের কাছে এসে ধামলো‌। এরপর এক আঙ্গুল ডুবিয়ে দিলো তরলে। বিস্ময়ে থ ধরে ইফরাহ ,পুরো ড্রাম ভর্তি রক্ত তরল।
মনে ভয় আরো খানিকা জেকে বসলো যখন দেখলো ঘরের পিছনের মানবদেহের হাড় হাড্ডি পরে রয়েছে। আরো অবাক করা কান্ড হলো, ইয়া বড় বড় কতগুলো হান্ডি পাতিল রাখা এ ঘরে। ঘরের কোণে কয়লা রাখা , চুলা খোদাই করা।

আচমকা কারো চেঁচানোর শব্দ কানে আসতেই দ্রুত ঘাড় ঘুরায় ইফরাহ। ছুটে আসে এক কাঠের দরজার কাছে।
ঘরের দেয়ালের মাঠি কেটে তাতে কাঠের দরজা লাগানো হয়েছে। দরজায় হাত রাখতেই শরীর টা কাটা দিয়ে ওঠে ইফরাহর। লোমকূপ গুলো ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে‌। কয়েকবার দরজায় হাত ছোঁয়ায় , ভেতর থেকে বন্ধ। কি হচ্ছে দরজার ওপর প্রান্তে জানতে হবে তার।
ইফরাহ আশে পাশে তাকায় পথ খুঁজে ঘরের ভিরতের রহস্য জানার। তবে চোখ আটকে যায় এক গুহার পথে। এ পথের শুরু কোথায় শেষ কোথায় তার জানা নেই। তবে ঘরের ভিতরের রহস্য জানার এক একটাই দরজা। যা দরুন এ ঘরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। কাঠের ফাঁক গলিয়ে বদ্ধ ঘরের আলো আসছে। সে ফাঁকায় চোখ রাখে ইফরাহ …
-মাফ ক কর ফারহান … সুযোগ দে –

এক লোক মিনতি করছে। ইফরাহ চেনেনা তাকে , নাম জানে ন। তবে ,
আরাধ্য রূপ তখন ভয়ংকর থেকে ভয়ংকর লেগেছিল ইফরাহর কাছে। মানুষ কিভাবে এতটা মায়া শূন্য হয় ইফরাহ বুঝে না। আরাধ্য এক কোপে যখন মন্ডুটা ধর থেকে আলাদা করছে ; তখন রক্ত তরলের ঘ্রাণ এতটা তৃপ্তি নিয়ে শুকছিলো যেন এই ঘ্রাণ তাকে উন্মাদ করে তুলছে। মুখে এক অদ্ভুত হাসি দেখেছিলো ইফরাহ।
সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছিলো আরাধ্যের পৈশাচিকতা। মন্ডু থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তগুলো বেশ যত্নে এক পত্র ভরে তুলছে রেজা। ইরফাহ হাত আলগা হয়ে মর্শাল টা পড়েই যাচ্ছিলো। বুকের মাঝে হৃদযন্ত্রের ধুক ধুক শব্দটা তার কানে এসে বাজছিলো। হয়তো বেড়িয়ে আসতে চাইছে ;
ইফরাহ কাঁপা কাঁপা, হাত রাখলো বুকের উপর। ধুকধুক শব্দ টা কমলো না আরো বৃদ্ধি পেলো। অনুভূতি এমন যেনো এই বুঝি বুক ফুঁড়ে বেড়িয়ে এলো। ইফরাহ ভাবে ,

এই কেমন নরপিশাচের সাথে ঘর বেঁধেছে সে। মানুষ খুন কী তবে এতোই সহজ। চোখের সামনে একজনের মন্ডুটা মাটিতে গড়াগড়ি করছে। তার খন্ডিত দেহের রক্ত দেখেও কী
জ্ঞান হারানো উচিত নয়। আচ্ছা লোক টা কী মায়া ‌হীন মানব ; কেনো এই ধ্বংসযজ্ঞ। তবে কী ড্রাম ভর্তি সব মানুষের রক্ত। ওই যে যাদের হাড় হাড্ডি গুলোর মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তবে কি তাদের রক্ত সংগ্রহে রেখেছে ছোট নবাব। এ রক্তে কাজ কী ? কী করা হয় ;

ইফরাহ ভাবনা ছেড়ে বের হলো। আবারো তাকলো ঘরের দিকে তাকতে দেখলো। আরাধ্য কসাইয়ের মতো দেহের মাংস আলাদা আলাদা করছে। ইফরাহ দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে , আল্লাহ কে ডাকে!
আরাধ্য দেহে থেকে কলিজাটা বের করে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। ইফরাহ শান্ত তাকায় আরাধ্যের রক্তে মাখামাখি হাত আর মুখের দিকে। কিছু সময় তাকিয়ে থেকেই গলগল করে বমি করে দেয় সে। মাথা ঝিম ঝিম করছে ;
কোনো মতে বেড়িয়ে আসে কাল কুঠুরিতে থেকে। কাঠুরির অন্দরে এসে সব ঠিক ঠিক করে রেখে হাফ ছাড়ে। তবে মস্তিষ্কে তখনো আরাধ্যের নিসংশ্ব তার প্রতি ছবি ফুটিয়ে তুলছিলো।

বর্তমান ….
চতুর্থ নাম্বার সিগারেট শেষ করে , ঘরে এলো আরাধ্য। ইফরাহ খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসা। চেহারায় কেমন এক বিষন্নতার দেখা মিলছে। চারিদিকের কিছু খেয়াল নেই তার।
আরাধ্য আস্তে আস্তে হেটে এসে পা জোড়া জড়িয়ে বসলো ইফরাহর,
-“মাফ করবে আমায় ?”
ইফরাহ তাকল। শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে আরাধ্যের মাথায় হাত রেখে বলল ”সরে আসুন এ পথ হতে!
আরাধ্যের চোখে পানি ! ইফরাহর পা দুটো একটু উঁচু করে ঠোঁট ছোঁয়ায় তাতে , ইফরাহ তাকিয়ে দেখলো নিঃশব্দে। আরাধ্য বলল , ”আমার মৃত্যু কি তোমায় কাঁদাবে?
-”খুব বেশি কিছু চেয়ে ফেললাম , যার কারণে মরণ চাইছেন।”
আরাধ্য হাসল , “চাইলে আর কী ? তুমি চাইলে আমার বুক চিরে হৃদয় টাও আমি দিতে রাজি ইরা!

-তবে ?
-উত্তর চেয়েছি , দিয়ে হৃদয় প্রশান্ত করো।
ইফরাহ স্লান হাসল , “মৃত্যু বুঝি এতটাই সহজ!
-“সহজ তো! ভীষণ রকম সহজ- প্রিয়জনের চোখের তীব্র ঘৃণাও তো মৃত্যুর সমতুল্য।
-”ঘৃণা যদি মৃত্যু হয় ! তবে আমি খুনি ! গর্বিত হলাম শুনে –

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১

বহুদিনের শখ পূরণ হলো আমার।
আরাধ্য ঠোঁটে এক হাসি খেলে গেলো। যা ধীরে ধীরে কিছুটা প্রসস্থ হলো। ইফরাহর পা জোড়া ছেড়ে কোলে মাথা রাখল ,
আমার ধ্বংসের শুরু কবে থেকে জানো ইরা …..।

ছায়াস্পর্শ পর্ব ৪১(৩)