The Silent Manor part 60
Dayna Imrose lucky
আমজাদ এর তির্যক কণ্ঠ দরজা ভেদ করে ওপারে পৌঁছাল।মায়া হোঁচট খাওয়ার মতন আঁতকে উঠল। ব্যস্ত পায়ে মীর এর কাছে গেল।পাশে বসে মীর কে ডাকল।সাড়া নেই। মুখে স্পর্শ করলে হয়ত জেগে উঠবে। কিন্তু মীর এর শরীরে মায়া স্পর্শ করতে ইতস্তত বোধ করল।হাতটি গালের কাছে নিল। কাঁপছে। মীর কে জাগাতে হলে তাঁর শরীরে স্পর্শ করা দরকার।দ্বিধাবোধ এর ক্লান্ত হাতটি মীর এর গালে স্পর্শ করেই দিল।মলিন কণ্ঠে ডাকল মীর কে,কোন সাড়া নেই।
মীর এর ঘোর এত তাড়াতাড়ি কাটবে না।মায়া নিশ্চিত হল। অন্যদিকে আমজাদ তাঁকে ডেকে হয়রান।মায়ার কিছু হল বলে সে একটু আধটু ইতিমধ্যে ভাবা শুরু করেছে।
মায়া মীর কে ছেড়ে ঘরের মূল দরজার কাছে এগোলো।কি করবে ভাবছে। মস্তিষ্কে ভয়া’বহ চাপ প্রয়োগ করল। তেমন কোন উপায় পেল না। সেকেন্ড কয়েক এরকম চুপচাপ থেকে মুখের অভিব্যক্তিতে ঘুমঘুম ভাব আনল।যেন সবেই তাঁর ঘুম ভেঙেছে। বুদ্ধি করে ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। এরপর দরজা অর্ধেক খুলল। দরজা থেকে হাত সরাল না। আমজাদ বললেন “এতক্ষণ কেন লাগল দরজা খুলতে?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”
“শরীর খারাপ লাগছে,কি হয়েছে? কখন থেকে খা’রাপ লাগছে? কাউকে ডাকবি তো?” আমজাদ ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।মায়া তাঁকে উত্তেজিত হতে বারণ করল। “বাবা, সামান্য শরীর ক্লান্ত ছিল,তাই ঘুমিয়ে পড়েছি। তুমি চিন্তা করো না। তুমি এখন এখানে?”
আমজাদ থেমে থেমে বললেন “তোর কথা খুব মনে পড়ছিল। সে-ই ছোট্ট মায়া আজ কত বড় হয়ে গেছে, দু’দিন পর সে পড়ের বাড়ি চলে যাবে,ঘর সংসার সামলাবে!ভাবতেই অবাক লাগছে!”
আমজাদ এর চোখে জল। তাঁর অসহায় মুখখানি দেখে মায়ার চোখেও জলে ভরে উঠল।তবু দরজা থেকে সরে দাঁড়াল না। আমজাদ নিজের চোখের জল আড়াল করে বলল “ঘরের ভেতরে চল,বসে বসে কথা বলি।”
মায়া হঠাৎ করে উচ্চ স্বরে না বলে উঠল। নিমিষেই গলা নামিয়ে ফেলল। আমতা আমতা করে বলল “আসলে বাবা এখন আমি আবার ঘুমাবো।খুব ঘুম পেয়েছে। এরপর থেকে তো ব্যস্তই থাকতে হবে।”
“কিসের ব্যস্ততা!তোর কাজ শুধু বউ সাজা।বাকি কাজ করার জন্য লোকের অভাব নেই।তুই শুধু আরাম আয়েশ করবি।”
মায়ার ইচ্ছে করছে না আমজাদ এর সাথে কথা বলার।কি বলবে,কোন শব্দ সে তৈরি করতে পারছে না। প্রতিটি মানুষের সাথে কথা বলার আলাদা অনুভুতি দরকার। তেমনি নিজের বাবার সাথে কথা বলারও অনূভুতি দরকার। আপাতত মায়া সে অনূভুতি সৃষ্টি করতে পারছে না ভয়ে। আমজাদ জোর করে ঘরে ঢুকে পড়লে সর্বনাশ।মায়ার চোখে ভয়। আমজাদ লক্ষ্য করলেন। এবং বললেন কিঞ্চিত বিষ্ময়কর হয়ে “তুই কোন কারণে ভয় পেয়ে আছিস?
“না তো।”
“তাহলে তোর চোখমুখ এরকম দেখাচ্ছে কেন?”
“ঘুম থেকে উঠলে,চোখ মুখ এমনি দেখায়। তুমি যাও,পড়ে কথা বলব।”
আমজাদ অবাক হলেন মায়ার আচরণে। মুখের উপর কখনো মায়া এভাবে কথা মাঝ পথে থামিয়ে যেতে বলে না।আজ মায়াকে বড্ড উদ্বিগ্ন দেখাল। আমজাদ চোখ ছোট করে মায়ার ঘরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন।মায়া হাতের সাহায্যে দরজাটা আরেকটু নিজের দিকে চাপাল।
আমজাদ বললেন “তুই ঘরের আলো অবধি নিভিয়ে দিয়েছিস!ভয় পাস না!”
“না।আগে ভয় পেতাম,এখন আর পাই না।” বলে মায়া ঢোক গিলল। একবার মেঝেতে একবার চোখ তুলে আমজাদ এর দিকে তাকাল। আমজাদ আর কথা বাড়ালেন না। হঠাৎ বিয়ে হওয়ায় বোধহয় মেয়ের মাথায় খানিকটা সমস্যা হয়েছে ভেবে আমজাদ চলে যান।যেতে যেতে ভাবেন,মায়ার ঘরে এখন শালুক কে পাঠাবেন। নিশ্চয়ই মায়ার কিছু হয়েছে বলে উনার ধারণা।
অন্যদিকে মায়া দরজা লাগিয়ে হাঁফ যেন বাঁচল।ধব করে খাটের উপর বসল।ঘরের বাল্ব না জ্বালিয়ে মোমবাতি জ্বালাল। কয়েকটি মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়াতে সোনালী মৃদু আলো ছড়িয়েছে।মীর এর মুখটা আপছা আলোতে ভেসে উঠল।মায়া দেখল মুগ্ধতা নিয়ে।
আমজাদ এর অধ্যায়-ই শেষ নয়। শালুক, অথবা অন্যকেউ আসবে বলে মায়ার ধারণা। একটু পর পর মায়া কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করে কারো পায়ের শব্দ।কেউ আসছে না।
মীর কখনো মদ্য’পান কখনো করে না।আজ করেছে।মায়া বিভ্রান্তী নিয়ে ভাবছে সে কেন আজ খেলো? বোধহয় মোহিনীর সাথে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে।মায়া নিজ থেকে ভেবে জবাব নিল।
মীর বোঘোরে ঘুমাচ্ছে।মায়া পুনরায় বসা থেকে উঠে পায়চারি করছে।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি থেকে মায়া জানতে পেরেছিল, নেশার ঘোর থেকে একজনকে কিভাবে বেড়িয়ে আনতে হয়। জরিবুটি দিয়ে সুফিয়ান হায়দার এর নেশার ঘোর কাটিয়েছিল।
মায়ার মনে পড়তেই থমকে দাঁড়ায়।সেও এখন মীর এর নেশা কাটাবে।তারজন্য তাঁকে ঘরের বাইরে যেতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।তবু উপায় নেই।করতেই হবে।
_ রান্নাঘরে শালুক, শেফালী।মায়া কখনো রান্নাঘরে আসে না।আজ এসেছে।শালুক তাঁকে দেখে স্বভাবতই ভ্রু কুঁচকে ফেলেন।খুব সহজে তাঁর এই ভ্রু কুঁচকানো মসৃণ হয় না।আজ তো হচ্ছেই না।মায়া গিয়ে শালুক এর কাছেই ঘেঁষে দাঁড়াল। তবে আবিষ্কার করছে কিছু বলার।
বৈঠকখানায় থমাস শন, তৃষ্ণা, শাহানারা, এবং জয়ন্তন বেগম বসে আলাপ আলোচনা করছেন। আমজাদ তাঁদের আড্ডার মাঝ থেকে একবার চোখ রান্নাঘরে ফেলল। মায়াকে রান্নাঘরে দেখে তিনিও কিঞ্চিত অবাক হলেন।তখন অদ্ভুত আচরণ করেছে,আর এখন রান্নাঘরে।বলেছিল ঘুমাবে।আর এখন এখানে।মায়া বরাবরই দুষ্টু।আজও হয়ত, তেমনি কিছু করেছে, যা তাঁকে কিছুটা হলেও স্তব্ধ করেছে। আমজাদ দৃষ্টি নামিয়ে এড়িয়ে গেল।
মায়াকে উসখুস করতে দেখে শালুক বললেন “তুই হঠাৎ এখানে! কিছু চাই!”
শালুকের কঠিন গলার প্রশ্ন শুনে মায়া প্রথমে ভয়ে চুপসে গেল। এরপর বলল “আমার তেঁতুলের শরবত লাগবে।”
শালুকের ঠোঁট গোল হয়ে গেল মায়ার কথা শুনে।সে শেফালীর সাথে চোখাচোখি করলেন।হাতে থাকা দুধের পাতিলটা চুলায় রেখে বললেন “এই সময়ে তেঁতুলের শরবত দিয়ে কি করবি?”
মায়া থমথমে মুখে জবাব দিল “লাগবে। সবকিছুর জন্য প্রশ্ন করতে হয় না।কিছু প্রশ্নের জবাব হয় না।” ফটাফট উত্তর দিয়ে দিল মায়া।শালুক নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। হঠাৎ মায়ার আচরণ বদলে যাওয়ার পেছনে সঠিক কারণ ব্যাখ্যা করতে পারলেন না। বললেন “তেঁতুলের শরবত,তাও রাতে!কি হয়েছে! শরীর খা’রাপ?বমি আসছে,মাথা ঘোরাচ্ছে?”
‘তুমিও’তো বাবার মত একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন করে ফেললে।যা বলছি জলদি দাও” শালুক কিছুটা ক্রোধের স্বরে বললেন “হঠাৎ তোর বেয়াদবি বেড়ে গেছে দেখছি,আর দু’দিন পর বিয়ে,আর এখনো তোর আদবকায়দা ঠিক হয়নি।” শালুকের কণ্ঠ হাওয়ায় ভেসে গেল বৈঠকখানায়। আমজাদ শুনলেন শালুকের ধমক। বৈঠকখানা থেকে তিনি শালুকের উদ্দেশ্য বললেন “তুমি মেয়ের সাথে চেঁচাচ্ছ কেন?যা বলছে শুনলেই তো হয়”
শালুকের জবাব আসে “আপনার প্রশ্রয় পেয়েই আজ মেয়েটা মুখে মুখে তর্ক শিখেছে।যেমন বাবা তেমনি তাঁর মেয়ে।”
“বাবার মেয়ে,বাবার মতই তো হব।” বলল মায়া। তাঁর কথা শুনে শেফালী হাসে।
শালুক মায়ার দিকে তাকাল না।হাতের কাজ করতে করতে বললেন “তোদের বংশের সমস্যা।ত্যাড়া ত্যাড়া কথা বলা তোদের র’ক্তে মিশে গেছে।আমি ব..!” এতটুকু বলতেই মায়া তাঁর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল “তুমি বলে এই সংসার করছো,অন্য কেউ হলে করত না।তাই তো!” বলে মায়া চাপা কণ্ঠে হাসে।শালুক জ্বলজ্বল চোখে তাকাল এবার মায়ার দিকে। ঘুরে শেফালী কে উদ্দেশ্য করে বলল “ওকে তেঁতুলের শরবত বানিয়ে দে।নয়ত আমার আরো কথা শুনাতে হবে।”
“আমি শোনার জন্য প্রস্তুত মা। তুমি বলো,ভালোই লাগছে, খারাপ লাগছে না।”
মায়া আর শালুকের কথোপকথন শুনে বৈঠকখানায় বসা আমজাদ হাসলেন নিঃশব্দে। বললেন “যেমন মা তেমনি মেয়ে।”
ঘড়ির কাঁটা এখন ঠিক এগারোটার কাছাকাছি।মায়া মিথ্যা বলে তখন তেঁতুল এর শরবত এনেছে।শালুক সন্দেহের চোখে মায়ার দিকে দেখেছিল বটে। কিন্তু অতিথিদের সামলানোর চক্করে পড়ে মায়ার ঘরে আর আসেনি।
কিন্তু তাঁকে অনুসরণ করে বুলবুল। বুলবুল তাঁর ঘরের সামনে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়া মীর এর পাশে বসে। কিছু প্রহর ধরে মীরের সৌন্দর্য দেখল।মীর জেগে উঠলে নিশ্চয়ই এখন চলে যাবে।মায়া কখনো চায় সে জেগে উঠুক, আবার চায় সে ঘুমাক।আর তাঁর ঘুমন্ত মুখটা মায়া দেখুক।
তেঁতুলের শরবত চামচের সাহায্যে মীর এর মুখে দিল। পরপর কয়েকবার শরবত দিল তাঁর মুখে।
সময় গুনছে।ঘড়ির কাঁটা গোল হয়ে থেমে থেমে ঘুরছে।মীর এর নেশার ঘোর বোধহয় এখুনি কেটে যাবে।মায়া অধীর আগ্রহে বসে আছে মীরের পাশেই।
মায়া হামি তুলল। ঘুমঘুম পাচ্ছে। কিন্তু এখন ঘুমানো ঝুঁকি তারজন্য।সে খুব কষ্টে জেগে রইল।মীর এর নেশা কাটা সবেই শুরু হয়েছে।হাত পা নাড়াচ্ছে।মাথা এক কাত থেকে আরেক পাশে কাত করল।মায়া এই সুযোগে মীরকে খুব কাছ থেকে ডাকল।মীর টিপটিপ করে চোখের পাতা মেলে।
মীর পুরোপুরি চোখ মেলে তাকাল।আপছা অন্ধকারে ঘরটা ছেয়ে আছে। প্রথমে সবকিছু অচেনা মনে হল। এরপর এদিক ওদিক তাকাতে চেয়ে মায়াকে দেখল। তাঁকে দেখে শান্ত চোখে জিজ্ঞাসা করল “তুমি আমার ঘরে কি করছো? তোমার চরিত্রের ঠিক নেই দেখছি, এত রাতে একটা ছেলের ঘরে এসেছো। তোমার কি মতলব কে জানে!” মায়া মীর এর মুখে এরকম কথা শুনে হেঁসে উঠল। তাঁর হাঁসি বাঁধনহারা।
মীর আবার জিজ্ঞেস করল “হাঁসছো কেন, আগে বলো এই রাতে আমার ঘরে কি করছো?”
“শুনুন মশাই,আমি আপনার ঘরে নই, আপনি আমার ঘরে।”
মীর এবার পুনরায় ঘরের চারপাশ দেখল। সত্যিই এটা তাঁর ঘর নয়। এরপর মনে পড়ল ঠিক ঘন্টা কয়েক আগের ঘটনা।সে মদ্য’পান করে মায়ার ঘরে ঢুকেছিল। তাঁর সাথে রংঢং করে কথা বলছিল। এরপর আর কিছু মনে নেই।
মীর বলল “কেউ এসেছিল?
“না।”
“আমার নে’শার ঘোর কিভাবে কাটালে?”
“তেঁতুলের শরবত দিয়ে।”
“কিভাবে জানলে?
“দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি থেকে। একদিন লেখক সুফিয়ান হায়দার এরকম নে’শা করে ফারদিনাদের বাড়ি ছিল। এরপর ফারদিনা তেঁতুলের শরবত দিয়ে তাঁর নেশা কাটিয়েছিল।”
“আজ তাহলে তুমি কিছু সময়ের জন্য ফারদিনা হয়ে উঠেছিলে।যাক, ভালোই হয়েছে,নয়ত তোমার সাথে এত সুন্দর সময় কাটাতে পারতাম না।”
“এখন আপনি চলে যান” মায়া যেন মীর কে তাড়িয়ে দিচ্ছে।
মীর বলল “দু’দিন পর এমনিতেই বিদেশ চলে যাব।আর তাড়িয়ে দিতে হবে না। তখন কিন্তু মনে পড়বে আমাকে।”
“ছাই পড়বে, আপনাকে আর আমার মনে পড়বে না।যত দ্রুত আলিমনগর ছাড়বেন ততই আমার জন্য মঙ্গল।”
“মেয়েদের বুক ফাটে তবু মুখ ফাটে না।মনে পড়লেও বলবে না।তবু আমি ধরে নিলাম তোমার আমাকে মনে পড়বে!”
“আপনি ধরে নিলেই হবে!” বলে মুখ ভেংচে দিল।মীর মায়ার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল।মায়া নড়চড়ে ঠিক হয়ে বসল।চোখ ভাঁজ করে বলল “এভাবে দেখবেন না ”
“বারে, এভাবে দেখলে কি হবে! দু’দিন পর তো দুলাভাই দেখবে, তাঁর আগে শেষ বারের মত দেখে যাই।”
মায়া আর কিছু বলল না।মীর মোমবাতির আলোয় মায়াকে একবার, দ্বিতীয়বার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল “চলি আমি।” বলে খাট থেকে নামল।মায়া তাৎক্ষণিক বিড়বিড় করে বলল “অস’ভ্য!”
মীর ঝুঁকে মায়ার দিকে চেয়ে বলল “শোনো মেয়ে, বাচ্চা বলে আজ ছেড়ে দিলাম।নয়ত দেখতে আমি মীর কতটা অস’ভ্য হতে পারি।” বলে মীর দরজা খুলে ঘর থেকে বের হতেই,আড়ি পেতে থাকা বুলবুল ঠাস করে ঘরের মধ্যে পড়ে গেল।মায়া ও মীর হকচকিয়ে উঠল। বুলবুল কণুই তে মৃদু আ’ঘাত পেল। শীতের সময় বলে সামান্য ব্যথায় ককিয়ে উঠল।
মায়া বুলবুল কে দেখে ভয়ে আধমরা হয়ে গেল।গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।ঢোক গিলে গলা ভেজাল।তখন মীর কে হুট করে ঘর থেকে বের হতে বারণ করবে ভেবেও ভুলে যায় মীর এর উল্টোপাল্টা কথার জন্য।সে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। কাঁপা গলায় বুলবুল কে বলল “বুলবুল ভাই, তুমি এই সময়ে এখানে?”
বুলবুল হিহি করে হেসে বলল “আমি কিছু দেখিনি।আর কিছু শুনিওনি।”
মীর বলল “তুমি কিছু দেখোনি,আর শোনোনি মানে? কিছু করলে,আর বললে নিশ্চয়ই দেখতে আর শুনতে।”
মায়া মীর কে দেখল।কিসব বলছে লোকটা। মুখে বিঁধছে না অবধি।সে মনে মনে মীর কে আবার গা’লি দিল।
বুলবুল মেঝে থেকে উঠে দাঁড়াল। প্রথমে তাকাল মায়া এরপর মীরকে ক্ষীণ চোখে দেখে বলল “আপনারা এই ঘরে এতক্ষণ কি করছিলেন?”
“তুমি যা ভাবছো তা নয় ভাই,” মায়া কথা শেষ করার আগেই বুলবুল এর কাঁধে হাত রেখে মীর বলল “হুঁ বুলবুল ভাই, তুমি যা ভাবছো সেটাই।”
বুলবুল এর চোখ এবার প্রস্থে বড় হল।মুখের হাঁসি আরো গাঢ় হল।এই হাসির কারণ মায়া খুঁজে পেল না।সে শুধু হা হয়ে রইল।
বুলবুল বলল “আমি যা ভাবছি, সত্যিই তাই?”
“হুঁ। এখন কি করবি বল।” মীর জিজ্ঞেস করল।
বুলবুল ভেবে বলল “আমি এই কথা কাউকে বলব না, যদি আমাকে অনেক টাকা দেন।”
“আচ্ছা চল,তুই যা চাস তাই দেব, শুধু আজকে আমি আর মায়া কি করেছি এই ঘরে,এসব কাউকে বলবি না।”
বুলবুল মাথা কাত করে বোঝাল।সে কাউকে বলবে না। তাঁরা দু’জন চলে যায় কোথাও।মায়া দরজা লাগিয়ে ধব করে খাটের উপর বসে। বুলবুল দেখে নিয়েছে মীরকে। টাকার লোভে সত্যটা লুকিয়ে যাবে কিনা ভাবছে।
রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।মায়ার চোখে ঘুম নেই।রাত পোহালে একটা শব্দই আজকাল কানে ঘনঘন ভেসে আসছে- মায়ার বিয়ে। বিয়ে নিয়ে ঘেরা কত স্বপ্ন থাকে একজন নারীর।আজ মায়ার সেই স্বপ্ন কেবল দুঃস্বপ্ন এর মত। ইচ্ছে করেও ভেতরে এতটুকু আনন্দ তৈরি করতে পারছে না। মেয়েদের বিয়ের সময় বোধহয় পণ হিসেবে বাবার বাড়ি থেকে সবই দেয়া হয়, শুধু নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে দেয়া হয় না। যদি নিয়ম মেনে যে যাকে ভালোবাসে তাঁকে পেত, তাহলে আজকে বোধহয় মায়াই সবচেয়ে বেশি খুশি হত। সে মীর কে পেত। তাকদির,আজ তাঁর সে-ই খুশি সৃষ্টি হল না।
ঘড়ির কাঁটা এখন বারোটার কাছাকাছি।মায়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে নীরবে।ঘুম নেই চোখে তাঁর।আজ তৃষ্ণা তাঁর সাথে শুয়েছে। তৃষ্ণা ঘুম চোখে মায়াকে ডেকে শুতে বলল।মায়া জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই দূর পশ্চিম এর দিক থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসল।মায়ার কানে আসতেই সে থমকে দাঁড়ায়।সুরটা এতটা স্নিগ্ধ যেন তাঁকে টানছে।ডাকছে।মায়া তৃষ্ণা কে ডাকল ব্যস্ত কণ্ঠে। তৃষ্ণা উঠে আসল বিছানা ছেড়ে বাধ্য হয়ে।আজ তৃষ্ণাও শুনছে বাঁশির সুর। তাঁরা একে অপরের সাথে চোখাচোখি করল।মায়া বলল “শুনেছিস!আমি ঠিক সেদিন এরকম বাঁশির সুরই শুনেছি।আজও সে-ই একই সুর।”
“অদ্ভুত। কিন্তু এত রাতে কে বাজাচ্ছে।!” তৃষ্ণা হতবাক হয়ে গেল।
“চল,আমরা ওদিকে গিয়ে দেখি।কে এই অচেনা বাঁশিওয়ালা! আজকে তো একে দেখতেই হবে।”
“কিন্তু এত রাতে?”
“তো, কিছু হবে না চল।” বলে তাঁরা হাতে টর্চ নিয়ে ধীরস্থির পায়ে সবার নজর এড়িয়ে বাড়ির পেছনের দিকে আসল। বাড়ির পেছনের প্রাচীরে ছোট্ট লোহার দরজা খুলে সুর ধরে হাঁটতে শুরু করল।টর্চ এর আলো নিভিয়ে ফেলেছে। চাঁদের আজ তীব্র আলো মেলেছে। সে-ই আলো ধরেই তাঁরা হাঁটছে।
সামনে এগোতে এগোতে ভেসে আসল ধোঁয়াময় এক নিস্তব্ধতা।বড় ধান ক্ষেতের পাশে শিমুল গাছ।ঠিক সেই গাছের দিকে থেকে ভেসে আসছে সুরটি।মায়া তৃষ্ণা কে বলল “শিমুল গাছের নিচে নিশ্চয়ই কেউ বসে আছে।কারো ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে।”
The Silent Manor part 59
তৃষ্ণা কিছু পা সামনে এগিয়ে গেল।মায়ার ধারণা সঠিক প্রমাণিত হল। শিমুল গাছের নিচে বসেই কেউ বাঁশির সুর তুলছে।সুরের সাথে সাথে যেন ভেসে আসছে ধোঁয়া। তৃষ্ণা মায়ার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল “কে হতে পারে এই বাঁশিওয়ালা?-
