Home রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৮

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৮

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৮
রিক্তা ইসলাম মায়া

সকাল নয়টা। মায়া ঘুম থেকে উঠে রিদকে বিছানায় পায়নি। পেয়েছে লম্বা একটা কোল বালিশ। বালিশটা দেখে মায়া নাক কুঁচকাল। বেরসিক জামাই পেলে মাঝে তো কোলবালিশ থাকবেই। মায়া ওয়াশরুম হতে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হলো। প্রথমে ভেবেছিল গোসল করবে পরে আবার চিন্তা ভাবনা বাদ দিল। শীতে সকালে গোসল করার সাহস মায়ার নেই। রিদ মায়ার উপর রাগ করে দূরে আছে এতে মায়ার ভালোই হয়েছে শীতের সকালে গোসল করার থেকে মায়া বিরতি পেয়েছে। রিদের এই রাগটা পুরো শীত পর্যন্ত চললে মায়ার জন্য মন্দ হয়না। শীতে গোসল করার ঝামেলাও থাকবে অফারটা ভালোই। শুধু রাতে ঘুমানোর জন্য রিদের উষ্ণ বুকটা পেলেই হবে মায়ার। মায়া গুনগুন শব্দে গান গাইতে গাইতে ঘর গোছালো। বিছানা ঝেড়ে ব্ল্যাঙ্কেট ভাঁজ করে রাখল। গায়ে সবুজ রঙের একটা থ্রি পিস পরে। ওড়না দিয়ে মাথার কাপড় টেনে ঘর ছাড়ল। কুয়াশা ভেদ করে রোদ উঠে গেছে তাই শীতবস্ত্র গায়ে জড়াল না। মায়া সিঁড়ি বেয়ে গুনগুন শব্দে গান গাইতে লাগল…

আমি জুয়ান একটা মাইয়া
বুড়া জামাইর কাছে আমায় বাবায় দিসে বিয়া,
অ সে যৌ*ব*ন জ্বা*লা মিটায় নারে মরে কোঁকাইয়া,
বুড়া জামাইর কাছে আমায় বাবায় দিসে বিয়া,,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রিদ ড্রয়িংরুমে সিঁড়ি গোড়ায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল। ফর্সা গায়ে কালো শার্ট প্যান্ট ইন করা। বাম হাতের কব্জিতে একটা ঘড়ি। বাম হাতটা সে পকেটে গুঁজে রেখেছে। ডানহাতে ফোন কানে চেপে। শার্টের দু-হাত সবসময়কার মতো ভাঁজ করে গুটিয়ে রেখেছে। সুফিয়া খান ডাইনিংয়ে খাবার সাজাচ্ছে। আরাফ খান, হেনা খানের সঙ্গে নিহাল খান বসার ঘরে সোফায় বসে কথা বলছেন। দূরত্ব বেশি হওয়ায় আপাতত তারা কেউ মায়ার গান শুনেনি। তবে রিদের কানে মায়ার গানটা পৌঁছেছে। রিদ কান থেকে ফোন সরিয়ে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল কপাল কুঁচকে সিঁড়ির দিকে। মায়া তখনো রিদকে লক্ষ্য করেনি। সে গুনগুনিয়ে একই গানটা বারবার রিপিট করছে। রিদের কাছাকাছি আসতেই মায়া রিদকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে ভেবাচেকা খেয়ে দু-হাতে মুখ চেপে ধরল। অসময়ে মায়ার গানটা গাওয়া ঠিক হয়নি। রিদ গানটা শুনেছে কিনা বলা যাচ্ছে না। তবে রিদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বলছে সে মায়ার গানটা শুনেছে। আবার মায়া ভাবল রিদ তো সবসময়ই মায়ার দিকে এমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। এখনো হয়তো তাই তাকিয়েছে। তাছাড়া মায়ার গুনগুনিয়ে গান রিদ নাও শুনতে পারে যেহেতু দুজনের মাঝে দূরত্ব ছিল বেশ। আর যদি শুনেও থাকে তাহলে কথাটা তো সত্য। মায়ার জামাই তো বুড়োই। দেখতে রিদ খান সুন্দর সুদর্শন হলেই বা কি হবে বয়স তো ত্রিশের বেশি আর বেরসিক পুরুষ। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে মুখ থেকে হাত সরিয়ে মায়া একই গান ফের গুনগুনালো। রিদকে শুনিয়ে গান গাইল….

‘ বুইড়া প্রেম বুঝে না, হাঁটে কেমন কোঁকাইয়া কোঁকাইয়া। বুড়া জামাইর কাছে আমায় বাবায় দিসে বিয়া।
মায়া রিদকে গানটা শুনিয়ে শুনিয়ে গেয়ে পাশ কাটাতে চাইলে রিদ মূহুর্তে মায়ার চুলের বেণি টেনে ধরল। হঠাৎ চুলে টান খাওয়ায় মায়া মৃদু ‘আহ’ চিৎকারে পিছিয়ে গেল বেণির টানে। মায়ার চিৎকার শুনে সুফিয়া খান ডাইনিং হতে, আরাফ, হেনা, নিহাল খান সোফা হতে রিদ মায়ার দিকে তাকাল। রিদ মায়ার চুলের বেণি হাতে পেঁচিয়ে টেনে দাঁতে দাঁত পিষে বলল….

‘ আমি বুড়ো?
‘ আঁর চুল ছাড়ি দন, আঁই কষ্ট পাইর। আম্মু চান, অনের ফুয়া আঁর লগে কি গরের!
রিদের মাতৃভূমি চট্টগ্রাম হয়েও সে কখনো চট্টগ্রাম ভাষায় কথা বলে না। রিদ, রাদিফের জন্মের পর থেকে তারা শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে অভ্যস্ত। এটা তাদের পারিবারিক শিক্ষা। খান পরিবারের সবাইকে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে দেখা যায় কেউ চট্টগ্রামে ভাষায় কথা বলে না। তবে নিহাল খান, আরাফ খান কিংবা হেনা খানকে প্রায়শই কাজের লোকের সঙ্গে অথবা চট্টগ্রামে মানুষের সাথে চট্টগ্রামের ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। এমন না রিদ চট্টগ্রামের ভাষা জানে না। সে জানে তবে সে কখনো বলে না। কিন্তু মায়া যে এই কয়েকদিনে চট্টগ্রামে ভাষা বেশ রপ্ত করে ফেলেছে সেটা মায়ার মুখে স্পষ্ট চট্টগ্রামে ভাষায় বুঝা গেল। রিদের রাগ বাড়ল। সে দাঁত দাঁত পিষে মায়ার চুল ফের টানল। ধমক স্বরে বলল….

‘ ইউ স্টুপিড।
‘ আম্মু চান না, ইতে আঁর লগে কি গরের!
মায়া ফের সুফিয়া খানকে ডাকল। সুফিয়া খানের কিছু বলার আগে সোফা থেকে আরাফ খান ডাক ছেড়ে রিদকে চট্টগ্রামের ভাষায় বলল….
“রিদ, তুঁই আঁর নাত বৌ’র চুলিয়ল ধরি কেনে টানর? ইবার কষ্ট লাগের না? ইবার চুল ছাড়ি দে।
রিদ চোয়াল শক্ত করে মায়ার দিকে কিড়মিড় করে তাকিয়ে। মায়া রিদের থেকে চুল ছাড়াতে চেয়ে আরাফ খানকে বলল…

‘ দাদাভাই, অঁনেই আঁর কষ্ট অল বুঝুন। মেহেরবানি গরি আঁরে বাঁচান দাদাভাই। অনের নাতিয়ে খালি আঁরে মারে!
আরাফ খান কিছু বলবে তার আগেই ডাইনিং থেকে ভেসে এলো সুফিয়া খানের গম্ভীর গলার স্বর…
‘ রিদ মায়ার চুল ছেড়ে খেতে এসো।
রিদের রাগ থাকা শর্তেও সে মায়ার চুল ছেড়ে দিতেই মায়া রিদকে মুখ বেঁকিয়ে ফের গাইল বলল…
‘ আমি যোয়ান একটা মাইয়া
বুড়া জামাইর কাছে আমায় বাবায় দিসে বিয়া।
খাবার টেবিলে সকলে বসে। রিদের দুপাশে আরাফ খান আর নিহাল খান বসেছে। আরাফ খানের পাশে মায়া তারপর হেনা খান। সুফিয়া খান নিহাল খানের পাশে বসবেন। তিনি সকালে প্লেটে নাস্তা তুলে দিয়ে নিহাল খানকে বেশ তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে রাদিফের কথা জানতে চাইলেন…

‘ রাদিফ কোথায়? রাতে বাসায় ফেরেনি কেন?
রাদিফ নিহাল খানের পার্টি অফিসে থাকে সবসময় তবে রাতে সে নিহাল খানের সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু কাল সন্ধ্যায় হঠাৎ রাদিফ নিহাল খানকে কাজের কথা বলে কোথায় গিয়েছে সেটা তিনি জানেন না। রাতে দুই একবার কল দিয়েছিলেন তিনি কিন্তু রাদিফের ফোনটা বন্ধ পেয়েছেন। এখন এই বিষয়টা যদি সুফিয়া খানকে জানানো হয় তাহলে নিহাল খানের প্রতি রেগে যাবেন। রাদিফকে তিনি এমনি রাজনীতিতে জড়াতে দিতে চাননি। এখন আবার রাদিফের নিখোঁজ থাকার ব্যাপারটাও সুফিয়া ভালো ভাবে নেবেন না। নিহাল খান খাওয়া ছেড়ে কিছু বলবে তার আগেই রিদ খেতে খেতে গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়ে বলল….

‘ রাদিফ মুরাদপুরে আছে।
নিহাল খান থেকে সুফিয়া খানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রিদের দিকে ঘুরে গেল। তিনি সূচালো ভঙ্গিতে বললেন…
‘ সেখানে কি করছে ও? রাতে বাসায় ফেরেনি কেন?
রিদ কিংবা সুফিয়া খান দুজনের কারও মিথ্যা বলার অভ্যাস নেই। তাঁরা মজা করে হলেও মিথ্যা বলতে চাই না। সেজন্য তাদের কথাবার্তা স্পষ্ট এবং স্ট্রেট হয়। রিদ সত্যিটা বলে বলল…
‘ কিছুটা ডিস্টার্বড তাই বাসায় ফেরেনি।
‘ কিসের ডিস্টার্বড ওহ?
‘ ব্যক্তিগত।

রিদের অল্প কথার উত্তর। সে তখনো খাচ্ছে মনোযোগ সহকারে। রিদের দৃষ্টি খাবারে। অথচ ডাইনিংয়ের সকলে খাওয়া ছেড়ে রিদের মুখের দিকে তাকিয়ে। সুফিয়া খান রিদের মুখে অল্প কথায় ‘ব্যক্তিগত’ শব্দটা শুনে তিনি রাগে চোয়াল শক্ত করলেন। তিনি সহজে বুঝে গেছেন রিদ ‘ব্যক্তিগত’ শব্দ ব্যবহার করে রাদিফের প্রেম জনিত ব্রেকআপ বিষয়টি বুঝিয়েছেন। রাদিফের রিলেশন নিয়ে সুফিয়া খানের শুরু থেকে কোনো মতামত ছিল না। লন্ডনের মেয়েরা লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ প্রেফার করে না। তাঁরা পার্টনারকে সবসময় পাশে চায়। সেক্ষেত্রে রাদিফ বিগত দু-বছর ধরে বাংলাদেশ থাকছে বেশি। গত বছর যাও লন্ডনে দু-তিনবার গিয়েছিল। এই বছর সে একবারও যায়নি। এমনকি লন্ডনে পড়াশোনা করবে না বলেও স্থগিত করেছে সবকিছু। তাই রাদিফের গার্লফ্রেন্ড রাদিফের অনুপস্থিতিতে লন্ডনে কোনো এক নাগরিক ছেলের সঙ্গে লিভিং রিলেশনশিপে জড়িয়েছে। সেটা তিনি আরও কয়েক মাস আগেই শুনেছিলেন। নিহালের নির্বাচনের পরে রিদ মায়াকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ায় তখনো এই খবরটা পেয়েছিলেন তিনি। রিদই জানিয়েছিল। কিন্তু তখন রাদিফ বাবার নির্বাচনে উৎসাহিত থাকায় কেউ তাকে এই খবরটা জানায়নি। কাল রিদ চট্টগ্রামে ফিরে আসিফকে দিয়ে সে এই বিষয়টা রাদিফকে জানায় প্রমাণসহ। আর এতে রাদিফ দীর্ঘ তিন বছরের রিলেশনের শোকে কাতর হয়ে চট্টগ্রামে মুরাদপুরের ফ্ল্যাটে রাতে থেকেছে, বাড়ি ফিরেনি। সুফিয়া খান বেশ শক্ত গলায় রিদকে বললেন…

‘ ওকে বলো বাসায় ফিরতে। ওর দেবদাস হওয়ার জন্য আমি ছেলে জন্ম দিইনি।
‘ জি।
রিদের সম্মতিতে মায়া বাদে সকলেই রাদিফের ব্রেকআপের বিষয়টা আন্দাজ করতে পারল। মায়াকে যতক্ষণ না পর্যন্ত কেউ ভেঙে কিংবা মুখে বলে বুঝাচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত মায়া ইশারা ইঙ্গিতে কথাবার্তা বুঝে না। মায়া খেতে খেতে ভাবল আজ রিদের সঙ্গে যাবে মুরাদপুরে কিন্তু পরমুহূর্তে কিছুক্ষণ আগে রিদকে উসকানো গানটা মনে করে রিদের সঙ্গে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিল। এরমাঝে সুফিয়া খান ফের রিদকে প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন….
‘ আমরা তোমার বিয়েটার একটা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করতে চাচ্ছি রিদ। যেহেতু তুমি আনুষ্ঠানিক বিয়ে করতে চাচ্ছ না তাই আমরা ভাবছি একটা মেজবান রাখব তোমাদের বিয়ের দাওয়াতের।

তুমি বিয়ে করেছ সেটা আমাদের নিকটতম আত্মীয় স্বজন ছাড়া বাহিরের কেউ জানে না তেমন। আমরা চাচ্ছি একটা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজের সবাইকে জানাতে। তুমি খান পরিবারের বড় ছেলে, তোমার সাথে এই বংশের মান সম্মান জড়িয়ে। তোমার সাথে হঠাৎ মায়াকে দেখলে মানুষ ভাবে তুমি অন্য মেয়ে নিয়ে ঘুরছ। মায়া যে তোমার বউ সেটা সমাজ জানে না। এতে তোমার বউ আর তুমি দুজনই মানুষের কাছে ছোট হচ্ছ। তাই তোমার আনুষ্ঠানিক বিয়েতে আপত্তি থাকায় আমরা আনুষ্ঠানিক মেজবানের আয়োজন করতে চাচ্ছি। সেখানে সমাজের লোক, আত্মীয় স্বজন, তোমার বাবার রাজনীতির সাথে জড়িত সবাইকে ইনভাইট করা হবে। এতে তোমার কোনো আপত্তি হবে বলে আমার মনে হচ্ছে না।

সুফিয়া খানের কথায় উৎসুক সকলে রিদের দিকে তাকিয়ে। মায়াও তাই। রিদ খাওয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াল। টিস্যু নিয়ে মুখ মুছে মায়ার দিকে এক পলক তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। মায়া নিজের উৎসুক দৃষ্টি রিদের থেকে সরাল না। তবে রিদ নিজের দৃষ্টি ঘুরিয়ে সম্মতি দিয়ে বলল….
‘ আপনাদের যেটা ভালো মনে হয় সেটা করুন। আমার এতে আপত্তি নেই।
কথা বলে রিদ চলে যাচ্ছিল। সুফিয়া খান ফের বললেন….
‘ তাহলে আগামী শুক্রবারে মেজবানের ডেটটা রাখি?
‘ আপনার ইচ্ছা।
আজ শনিবার। সামনে শুক্রবারের মেজবানের তারিখ রাখা হয়েছে মানে আর ছয়দিন বাকি অনুষ্ঠানের। সুফিয়া খান রিদের বিয়ের আনুষ্ঠানিক মেজবান রাখতে চাচ্ছেন সেটা নিহাল খান কিংবা আরাফ খান, হেনা খান জানতেন না। সুফিয়া খান আগে আলোচনা করেননি তাদের সঙ্গে। হঠাৎ করেই রিদের সঙ্গে কথা বলে সবার সামনে ডিসিশন নিয়েছেন তিনি, এতে অবশ্যই কারও আপত্তি নেই। নিহাল খান শুধু খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকবার গম্ভীর সুফিয়া খানের মুখটা পরখ করলেন। বউটা আগের থেকে আরও সুন্দর হয়েছে না?

রিদ সারাদিন পর মুরাদপুর ফ্ল্যাটে আসল রাদিফের সঙ্গে দেখা করতে। আসিফ রিদের ছেলেপেলের সঙ্গে নিচের অফিসে বসা। নিহাল খানও নিচেই আছেন, আর কিছুক্ষণ পর তিনি বাড়ি চলে যাবেন। কাল রাত থেকে রাদিফ নিজের রিলেশনটা নিয়ে ডিস্টার্বড। হঠাৎ ধাক্কা সামলাতে না পেরে প্রথমে বাচ্চাদের মতো করে হাউমাউ করে কেঁদেছিল রিদ আসিফের সামনে। সে সত্যি ভালোবেসেছিল নিহাকে। বিয়ে করার স্বপ্নও বুনেছিল দুজন। অথচ রাদিফ বুঝতে পারল না স্বপ্ন শুরু রাদিফ একতরফা দেখেছিল নিহাকে নিয়ে। তাঁর ভালোবাসার মানুষটা তাঁকে ভালোইবাসেনি। রিদ ফ্ল্যাটের দরজায় নক করতে গিয়ে দেখল দরজাটা ভেতর থেকে চাপানো।

ড্রয়িংরুম হতে টিভির শব্দ আসছে। টিভিতে কার্টুন চলছে। অন্য সময়ের কথা বাদ, বর্তমানে রাদিফের যে মনমানসিকতা সে এই মুহূর্তে বসে বসে কখনো টিভিতে কার্টুন দেখবে না। রাদিফ বাদে ফ্ল্যাটে কেউ থাকার কথা নয় যে বাচ্চাদের মতো করে বসে বসে কার্টুন দেখবে। রিদ দ্বিধা নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই বিশাল বড় টিভিতে টম এন্ড জেরিকে দেখল দৌড়াদৌড়ি করতে। ড্রয়িংরুমের সোফা খালি, রান্নাঘর হতে টুকটাক শব্দ আসছে হয়তো কেউ কাজ করছে। রিদ ভাবল রাদিফ ড্রয়িংরুমে টিভি ছেড়ে কিচেনে কাজ করছে। রিদ কিচেনের দিকে যেতে গিয়ে মেয়েলি খিলখিল হাসির শব্দ পেল। রিদ কপাল কুঁচকে পিছনে তাকাতেই দেখল একটা মেয়ে ফ্লোরে বসে টি-টেবিলে পিঠ ঠেকিয়ে টিভি দেখছে আর হাসছে। মেয়েটির পিছন রিদের চেনা লাগল। সে এগিয়ে এসে মায়াকে পপকর্ন কোলে টিভি দেখে হাসতে দেখে রিদের কুঁচকানো কপালটা আরও কুঁচকে গেল বিরক্তিতে। এই মেয়েকে সে সকালে বাড়িতে দেখেছিল, এখানে আসল কখন? আসল যখন রিদকে কেন কেউ কিছু বলল না? রিদ বিরক্তির চোখে মায়াকে ধমকে বলল…

‘ তুমি এখানে কি করছো?
‘ পপকর্ন খাচ্ছি।
রিদের উপস্থিতি মায়া স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছে, সে টিভি দেখতে দেখতে রিদকে কথাটা বলল। মায়ার হেয়ালি উত্তরে রিদের বিরক্তি বাড়ল। রিদ বলল….
‘ তুমি এখানে কিভাবে এসেছ?
মায়াও সেইভাবে উত্তর দিয়ে বলল…
‘ গাড়িতে করে এসেছি আর বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে উঠেছি। আপনাদের বিল্ডিংয়ের লিফটটা নষ্ট তাই নিচ থেকে হেঁটে আসতে হয়েছে আমায়। নেক্সট টাইম লিফটটা ঠিক করে রাখবেন কেমন?
মায়ার হেঁয়ালিতে রিদ তৎক্ষনাৎ মায়ার মুখোমুখিতে বসে গেল। মায়ার লম্বা চুলের বেণি টেনে গলায় প্যাঁচিয়ে রিদের মুখোমুখি করে বলল…

‘ এখানে কিন্তু আপনার ক্ষমতাবান শাশুড়ি নেই ম্যাডাম, যে আপনাকে বাঁচাবে। আমার সাথে বাড়াবাড়ি করলে সোজা তুলে আছাড় মারব। তখন বুঝিয়েন কিন্তু।
রিদ মায়ার মুখোমুখি বসে। একে অপরের নিঃশ্বাস দুজনের মুখেই আছড়ে পড়ছে। রিদের চোখে চোখ রেখে মায়াও একই হেয়ালি উত্তরে বলল….
‘ শাশুড়ি নেই তো কি হয়েছে? আমার শ্বশুরও কিন্তু কম না। মন্ত্রীর ছেলের বউ আমি বুঝেছেন? গায়ে হাত দিলে জেল কিন্তু কনফার্ম নেতা সাহেব।

‘ শ্বশুরের ভয় দেখান? এই রিদ খান কাউকে ভয় পায় না। জেলে গেলেও আপনাকে বদনাম করে যাব ম্যাডাম। বুঝিয়েন কিন্তু খারাপ মানুষের খপ্পরে পড়েছেন। আমার নামের বদনাম হয়ে যাবেন।
‘ বদনামি পুরুষের বউ হয়ে যদি গায়ে দু-একটা বদনাম মাখতে না পারি তাহলে কিসের বউ হলাম বলুন?
‘ বকবক শিখে গেছেন না? জবান কেটে ফেলি? বোবা করে দিই। দিই?
‘ ভাবি আপনার চিজ পাস্তা।

মায়া কিছু বলবে তক্ষুনি রাদিফ ট্রে-তে মায়ার জন্য পাস্তা বানিয়ে রান্নাঘর হতে বেরোতে মায়াকে ডাকল। রাদিফ রিদকে প্রথমে লক্ষ্য করেনি, কিন্তু রান্নাঘর হতে বেরোতে দেখল রিদ মায়ার মুখোমুখি বসে। রাদিফ জানত রিদ নিচে আছে তাই অবাক হলো না। বরং স্বাভাবিক নেয় জানতে চেয়ে বলল….
‘ ভাই তুমি কিছু খাবে? বানিয়ে আনব?
রাদিফের মনমানসিকতা ভালো নেই অথচ মায়ার জন্য রাদিফ রান্না করছে। রিদ বুঝতে পারল মায়া রাদিফকে সময় দেওয়ার জন্য হয়তো এখানে এসেছে। রিদ মায়াকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে রাদিফ হাতের ট্রে মায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। মায়া বসে থেকে সেটি নিল রাদিফের থেকে। ফ্লোরে রেখে রাদিফকে মায়া বলল….
‘ রাদিফ ভাই আপনি বসুন। আপনার ভাই এখন ফ্রেশ হবেন। উনি বাহির থেকে এসে কিছু খান না ফ্রেশ না হয়ে। আপনার ভাই ফ্রেশ হয়ে আসলে আমি কফি করে দিব। আপনি আমার সাথে বসে পাস্তা খান।
রিদ রাদিফকে প্রশ্ন করে বলল….

‘ ও কখন এসেছে?
‘ ভাবি দুপুরে এসেছিল আমাদের জন্য খাবার নিয়ে। তোমাকে আর আব্বাকে যে খাবার আমি দুপুরে পাঠিয়েছিলাম তা ভাবিই নিয়ে এসেছিল আমাদের জন্য।
‘ রাত হয়ে গেছে ওকে বাসায় পাঠালি না কেন তাহলে?
রাদিফের কিছু বলার আগেই মায়া বলল…
‘ আমি আজ আপনাদের সাথে এই ফ্ল্যাটে থাকব তাই যায়নি।
রিদ আজ রাদিফের সঙ্গে এই ফ্ল্যাটে থাকবে সেটা সুফিয়া খানকে জানিয়ে এসেছিলেন সকালে। কিন্তু মায়া যে রিদের পিছু পিছু এখানে চলে আসবে সেটা রিদ জানত না। এখন মায়া কিছু না বললে রিদ থাকত কিন্তু মায়া রিদের সঙ্গে এই ফ্ল্যাটে থাকার ইচ্ছা পোষণ করায় রিদ বেঁকে বসল। সে এই ফ্ল্যাটে থাকবে না মায়া আসায়। রিদ ত্যাড়ামি করে মায়াকে শুনিয়ে রাদিফকে বলল…
‘ আমি এখানে থাকব না। আমি বাসায় চলে যাচ্ছি রাদিফ। তুই থাক।
‘ কেন ভাই?

রাদিফ প্রশ্ন করল অথচ রিদ উত্তর করল না। সে এসেছিল ফ্রেশ হতে কিন্তু এখন মায়ার সাথে ত্যাড়ামি করে ফ্রেশ না হয়ে চলে যেতে চাচ্ছে। রিদ ঘুরতেই মায়াও রাদিফের বানিয়ে আনা পাস্তার বাটি নিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। সেও রিদের সঙ্গে চলে যাবে।রাদিফের থেকে বিদায় নিয়ে মায়া রিদের পিছু ছুটে বলল….

‘ আমিও তাহলে চলে যাচ্ছি রাদিফ ভাই। আপনি ভয় পাবেন না কেমন। আসিফ ভাই আপনার সাথে রাতে থাকবে।
রিদ কয়েক কদম সামনে হেঁটেছিল। মায়া রিদের পায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেঁটে কথাগুলো রাদিফকে বলেছিল। রিদ মায়ার কথায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে যেতেই মায়া রিদের পিঠে ধাক্কা খেল পাস্তার বাটি নিয়ে। এতে রিদের পিঠে আর মায়ার জামায় কিছু পাস্তা ছিটকে পড়তেই মায়া তাড়াহুড়ো করে পিছিয়ে গেল জিভে কামড় দিয়ে। রিদ রাগে বিরক্তিতে পিছন ঘুরে তাকাল। রিদের পিঠে মশলার পাস্তা পড়েছে অনুভব করতে রিদ মায়ার দিকে তেড়ে যেতেই মায়া কয়েক কদম পিছনে গেল। রিদ দাঁতে দাঁত চেপে….

‘ স্টুপিড চোখ নেই? আমার পিছন পিছন ছুটছো কেন?
মায়া দাঁড়িয়ে বোকার মতো প্রশ্ন করল…
‘ তাহলে কোথায় যাব?
‘ জাহান্নামে যাও।
‘ সামনে আমার বিয়ে, এখন জাহান্নামে গেলে আম্মু রাগ করবেন। এর থেকে বরং আমাকে আপনার সাথেই নিয়ে চলুন।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৭

রাদিফ মায়ার কথায় ফিক করে হেসে ফেলল ভাঙা মনেও। মায়া তখনো বাটি হাতে দাঁড়িয়ে রিদের সঙ্গে যেতে প্রস্তুত। রিদ রাগে কটমট করে মায়াকে দেখে সে রুমে গেল। এসব মশলা মাখা শরীর নিয়ে সে কখনো বেরোতে পারবে না। গোসল না করা অবধি তার শান্তি নেই। রিদ চলে যেতে মায়া ঠোঁট উল্টালো। রাদিফ হেসে বলল…
‘ আমার জীবনে রিদকে কখনো এতটা ধৈর্যশীল দেখিনি ভাবি। ভাই রগচটা মানুষ সেটা সবাই জানে। আপনি ভাইয়ের জীবনে আসার পর থেকে রিদ ভাই অনেক কিছু কন্ট্রোল করে চলেন। আর নয়তো এখন আপনার জায়গায় যদি অন্য কেউ হতো তাহলে অনাহেষে দু-চারটে থাপ্পড় এমনি খেয়ে ফেলত।

রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ৯