কালকুঠুরি পর্ব ৬২
sumona khatun mollika
অফিস থেকে ফিরে গিয়ে মাহা পুরো বাসা খুঁজে দেখে সামহা কোথাও নেই। প্রথমে ভেবেছিল আশেপাশেই আছে কোথাও কিন্তু পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুজেও সামহাকে পায়নি ও।বিছানার ওপরে গ্লাস দিয়ে চাপা দেওয়া একটি নোট। যেখানে লেখা,
” রাত ১০ পর্যন্ত সময় রইল। এর মাঝে সামির সিকান্দার এর ফাঁসির আদেশ বাতিল না হলে সামহা সিকান্দার ভুমিকেও আর জীবিত দেখতে পাবেননা। ঠিক ১০ টা বাজার আগে দক্ষিণ পাড়া সংলগ্ন কালকুঠুরি তে সামির সিকান্দার কে ফিরিয়ে দিতে হবে। কোনো গোলমাল করলে সামহাকে মেরে দেব। জয় বাংলা ”
চিন্তিত হয়ে এপাশ ওপাশ করে সেতুকে খুজছিল মাহা। ডাইনিং টেবিলের কাছে সেতু মেঝেতে পরে আছে। মাহা প্রথমে আৎকে উঠেছিল। পানির ছিটে দিতেই সেতু সজাগ হয়ে কান্না জরানো কণ্ঠে বলল,,
” আপ… আপাজান, সামহারে তুইলা নিয়া গেছে। ওইযে সামির ভাইজানের সাথে একটা লম্বা খাম্বার মতো একটা ছুড়া ছিল ও,, ও আমার মুখে, তারপর, সামহা, ”
” শান্ত হও সেতু। শান্ত হও। আমাকে বলো কে নিয়ে গেছে? ”
” সিভান ”
” কি বলছ সেতু? ”
” হ্যা আপাজান, অর সাথে আরেকটা আছিল, রা…. রকি! রকি! ”
” তুমি শান্ত হও। ভয় পেওনা, শান্ত হও সেতু ”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাহা একপর্যায়ে দৌড়ে সেতুকে সঙ্গে করে থানায় পৌছালো। ওকে দেখে সকল অফিসাররা সেলুট জানালো। মাহা সোজা ওসি মাহবুব উদ্দিন এর কাছে গিয়ে রিপোর্ট করল সামহাকে কিডন্যাপ করা হয়েছে এবং হুমকিস্বরূপ এই চিঠি পাঠানো হয়েছে। আপনি দ্রুত সামির সিকান্দার কে সঙ্গে করে রওনা দিন। সামহার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। মাহবুব উদ্দিন হুড়মুড়িয়ে বের হওয়ার পথে মাহা পিছু ডেকে বলল,
“অফিসার, সিভান আমার বাচ্চার মতো নয় বাচ্চাই। খুব খুব খুবি সাবধান ওর যেন কোনো ক্ষতি না হয়। যথাযথ চেষ্টা করবেন প্লিজ ”
মাহার কথায় ইন্সপেক্টর মাথা নাড়ালো। সামিরকে নিয়ে না গেলে সিভান কিছুতেই শান্ত হবেনা বদলে আরো উগ্র হয়ে উঠবে। তাই মাহবুব উদ্দিন কমিশনারের অনুমতিতে সামিরকে ছাড়িয়ে এনেছে। মাহা চলে গেছে প্রধান বিচারপতির কাছে। সামির কিছুই বুঝতে পারছেনা সিভানের কি হয়েছে! তবে অনুমান করতে পারছে সিভান নিশ্চয়ই উল্টোপাল্টা কিছু করেছে। যতই হোক তার নামের পেছনেও সিকান্দার রয়েছে।
সিভানের চেহারা কালো কাপড়ে ঢাকা চোখদুটো দিয়ে গড়িয়ে পরছে লাভা। সবাই অবহেলা করলেও কাকা তাকে ভালোবেসেছে সেই কাকাকে সে কিছুতেই হারাতে পারবেনা। ধিরে ধিরে কালকুঠুরির দুইতলায় উঠে যাচ্ছে ও। রকি গিয়ে সামহাকে তুলে এনেছে। সামহা এখন দুইতলায়। সামহার হাত পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। মুখটা বাধা রয়েছে কালো ওড়না দিয়ে । বাধ্য হয়ে রনি ওর মুখটা বেঁধেছে। বড্ড চেঁচাচ্ছিল মেয়েটা। যতই হোক সামিরের মেয়ে বলে কথা ! সামহার ভিষণ রাগ লাগছে। বুঝতে পারছেনা কেন তাকে তুলে আনা হয়েছে। পুরো ঘরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। কেমন ভুতুড়ে বাড়ি, তার ওপর মাত্রই লোড শেডিং হয়েছে। বামপাশের দেয়ালের ওপরে ছোট্ট কিছু ছিদ্র দিয়ে কয়েক ফোঁটা আলোর ছটা এসে পরছে। সেই মুহুর্তেও সামহার মনে পরছে তার আব্বুর কথা। ফাঁসি মানে কি মৃত্যু ? সেটা সামহা জানেনা। জানতে চেয়েও লাভ হয়নি৷ সেতু বা লামু কেওকিছু বলেনি। তবে ফাঁসির মানে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু। একবার আব্বু বলেছিল খারাপের সাথে খারাপই হয় আর এই সামির বাঙ্গি ভিষণ খারাপ!
এসব ভাবতে ভাবতে ওর মনটা বিষণ্নতায় ছেয়ে যায়। চোখদুটো ভিজে ওঠে । গাল বেয়ে গড়িয়ে পরে নোনাজল। আচমকা দড়জা খোলার আওয়াজ হয়। সামহা সোজা হয়ে বসে । বাইরে থেকেও তেমন আলো আসছেনা। কারো আগমন টের পায় ও। কেও ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে । হুট করে লাইটগুলো অন হয়ে যায়। অনেকটা গোডাউনের মতো জায়গা। নাজানি কত বছর ধরে পরিষ্কার করা হয়না। চারপাশের দেয়ালের রঙ চটে গেছে। সামহা চোখ মেলে দেখে একটা ছেলেকে। তাকে কখনো দেখেনি সে। ছেলেটা কালো না ধলো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। পায়ে কেডস, হাতে কালো গ্লাভস পড়নে কালো জ্যাকেট। মুখটা রুমাল দিয়ে বাধা। চোখদুটো দেখা যাচ্ছে শুধু। ছেলেটার হাতে বন্দুক দেখে সামহার একটু ভয় হলো। ছেলেটা গুলিটা নাড়াচাড়া করছে। বেশ খানিকখন পর ও সামহার দিকে এগিয়ে গেল। কিছু না বলে শুধু সামহা চোখের দিকে নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে রইল।
সামহাও ওর ছোট ছোট দৃষ্টি মেলে সামনের ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সিভান শুধু আস্তে মিনমিন করে বলল,,
” তোর চোখদুটাতো হেবি বে, বোরখাওয়ালী সুন্দ্রী ”
সামহা ইশারা করল মুখের বাঁধন খুলে দিতে। সিভান জিজ্ঞেস করল চেঁচাবি না তো? সে দুইদিকে মাথা নেড়ে না জানালে সিভান মুখের বাঁধন খুলে দিল। সামহা প্রথমে আস্তে করে তাকালো। তারপর বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,,
“উফফফ! এ্যাই ছালা বাঙ্গি ক্ষেতের মুলা কে রে তুই, ইশশহ, থোবড়াডা চেগায় দিছে “”
সিভান বন্দুক টা সামহার দিকে তাক করে বলল,,
” বেশি বকবক করবিতো মুখের মধ্যে গুলি ভরে দেব। এটা কি চিনিসতো? ”
“ আহাগো সুনাগো আমার, এটা গান*, গুলি করলে উড়ে যাবে প্রাণ, প্রাণের ভয়ে কি ডুবিয়ে দেব মান? “
সিভান হালকা হেসে বন্দুক টা সরালো। ভাবলো একপলক এতো একদম সামিরের মতোই। সামিরও সিরিয়াস মোমেন্টে এমন উল্টো পাল্টা কথা বলে শত্রু পক্ষকে হাসাতে সক্ষম। সিভান চোখ সরালো, এতখন সে সামহার চোখদুটোর দিকে চেয়ে ছিল। দেখতে সব বাপের মতো, চলন, বলন, নাক, ঠোট, তবে চোখদুটো ভিষণ সুন্দর। খুব সম্ভব কাকি সুন্দরির মতো। কিন্তু কাকি সুন্দরীর চোখের ভ্রু হালকা জোড়া ভুরু ছিল। সামহার ভ্রুযুগল মোটেও জোরা নয়। অন্য আরেকটা চেয়ার টেনে সামহার মুখ বরাবর বসলো। গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,,
“ তুই জানিস আমি কে? “
“ জানিনা। জানতেও চাইনা। ইশশ, এত বিচ্ছিরি গরম আর গন্ধ কেন এখানে? এত সুন্দর মিষ্টি একটা বাচ্চাকে কেও এভাবে বেঁধে রাখে? অযোগ্য কিডন্যাপার! “
“ তুই আর মিষ্টি? তোর কথাতেইতো বোঝা যাচ্ছে তুই একটা,,, করোল্লা “
সামহা মুখ ভেঙিয়ে চুপ করে রইলো । সিভানের এই কথা টা আম্মুও বারবার বলত, মুখতো নয় করলার জুস! । সিভান মুখের রুমালটা খুলে ফেলল। বদ্ধ ঘর, বাতাসের চলাচল খুব কম। নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে , কাকা যে কিভাবে এটা পরে থাকতো কে জানে! সামহা সিভানের দিকে তাকিয়ে বলল,,
“ তোমাকে দেখেতো মনে হচ্ছে না তুমি কিডন্যাপার “
“ না না না, আমি কিডন্যাপার কেন হবো, আমিতো বেবিসেটার, এইযে একটা বেবিকে সামনে বসিয়ে রেখেছি “
“ বেশি কথা বলে, বিরক্তিকর, “
“…….. “
সামহা আর কিছুই বলছেনা। সিভান ওর ফোনটা বের করে দেখলো রাত ৯ টা বাজে। অর্থাৎ আর মাত্র ১ ঘন্টা। প্রয়োজনমতো সকল অস্ত্রাদী সাজিয়ে রাখলো। এবারে সামহা একটু ভরকে গেল। মনে পরল সেদিনকার কথা যেদিন আব্বুর রূপোর ছুড়ি দিয়ে সে একটা মানুষ হত্যা করেছিল। কথাটা মাথায় আসতেই ওর মাথাটা একটু ঘুরে উঠলো। এত এত বন্দুকের মধ্যে ওর চোখ গেল শুধুই ওই রূপোয় মুড়োনো ছুড়ির ওপরে। সিভান ওটাই ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিল।
সামিরের হাতে হ্যান্ডকাপ। নির্বিকার ভঙ্গিতে ও মাহবুব উদ্দিন কে জিজ্ঞেস করল কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে। মাহাবুব উদ্দিন বলল,,
” সামির সিকান্দার!, যদি ধরুন দুজনের একজনকে নিতে বলা হয় কাকে নেবেন? সামহা নাকি সিভান? ”
সামির বিচলিত হয়ে গেল। সবার জানা যত ভয়ানক কথাই হোক সামির কখনো ভয় পায়না। এখনও পায়নি। সে কোনো জবাব দিলনা দেখে মাহবুব উদ্দিন আবারো জিজ্ঞেস করল,,
” আপনি কি কিছুই বলতে চান না? ”
” ইচ্ছে নেই ”
মাহবুব উদ্দিন কনস্টেবল কে জোরে গাড়ি চালাতে বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। অতঃপর সামিরের দিকে তাকিয়ে বলল,,
” আপনি সামহার জন্মদায়ক হলেও আমি ওকে ছোট থেকে পেলেছি। এই দুই হাতে ওকে হাঁটা শিখিয়েছি। ওর মা যখন পড়াশোনায় ব্যাস্ত ছিল তখন আমি আর আমার স্ত্রী মিলে ওকে সামলেছি। মনে পরে, একবার আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন বাবা কিভাবে হতে হয়? সামহাকে পেয়ে আমি শিখেছি শুধু জন্ম দিলেই বাপ হয়না। সামহা আমারো মেয়ে । ওর কিছু হলে আমার চাকরি যায় যাবে, জেল হয় হবে কিন্তু আমি আপনার ভাতিজা সিভান সিকান্দার কে অন দা স্পট শ্যুট করে দেব।”
সামির হ্যাডকাপ পরা অবস্হায়ই বাহাত উচিয়ে নাকের ঘাম মুছলো । দুই সেকেন্ড সময় নিয়ে মাহাবুব উদ্দিন এর চোখ বরাবর তাকিয়ে হিংস্র কণ্ঠে বলল,,
” মাটির দশ হাত নিচে গাইড়া ফালামু ! ”
” কি!? ”
মাহবুব উদ্দিন রহস্য খেলা ভয়ার্ত চোখে সামিরের দিকে তাকালো৷ প্রশ্ন শুনে সামির নিজের দৃষ্টি স্হির রেখেই বলল,,
” আমার সিভুর কিছু হলে আমি আপনাকে এমনভাবে ধ্বংস করব কেও আপনার একটা অংশও কবর দেওয়ার জন্য খুঁজে পাবেনা। সামহা আমার মেয়ে । আমার অংশ আমার বাচ্চা। কিন্তু সিভান আমার জান। এবং আপনি জানলে অবাক হবেন, আমি অনেক আগেই বাপ হয়েছি। আমরা সিকান্দার! এটা হয়ত আমাদের নিয়ম! ”
মাহবুব উদ্দিন পা টান করে বসে বলল,, ” আপনার কথাটা ঠিক বুঝলাম না সামির সিকান্দার”
” চলুন আপনাকে শর্টকাটে আমাদের বংশের একটা রুলস বোঝাই,, আমার দাদার নাম ছিল সাবের সিকান্দার । তার ছিল তিন ব্যাটা। সালার, সিধু আর সজল সিকান্দার । সজল কিন্তু সুমনা সিকান্দার এর ব্যাটা লয়। অবৈধ । যেমন আমি আর সিভান। বুঝতে পারছেন তো আমার কথা ? ”
” প্লিজ কান্টিনিউ…। ”
” সজল রে পালছে সাবের এর ভাই। আমারে জীবন দিয়া গেছে আমার বাপের ভাই সজল সিকান্দার । আর সিভানরে পালছি আমি। হিসাবমতে সিভান আমার বড় ছেলে। অর গায়ে একটা আঁচড় লাগলে,, আপনারা আমাকে দেওয়ার মতো আর কোনো সাজা খুঁজে পাবেননা। ”
কালকুঠুরি পর্ব ৬১
মাহবুব উদ্দিন শুষ্ক একটা ঢোক গিলল। সঠিক বলেছে সামির। সামির কখনো মুখে না বললেও মাহবুব উদ্দিন ঠিকই বুঝতো সিভানটাকে বড্ড ভালোবাসে ও। সামির মাহবুব উদ্দিন কে না দেখালেও নিজের মনের মধ্যে কুন্ডলী পাকাতে লাগলো সিভানতো জানে সামহা সামিরের মেয়ে তাহলে কেন ও সামহার ক্ষতি করতে চাইবে!
সামির একদম চুপচাপ বসে রইল। মাহবুব উদ্দিন ও মনে মনে ভেবেই নিল প্রয়োজনে লামুকে বিধবা করবে, কিন্তু সামহার কিছু হতে দেবেনা৷
