দহনসুধা পর্ব ১১
১৫ জন রাইটার
শেহরাজের কথা শেষ হতে না হতেই উমেরা রেগেমেগে গর্জে উঠল,
“মুখ সামলে কথা বলুন মি. পাটোয়ারী। আমি খু’ন করেছি তার প্রমান কী? না জেনে কারো প্রতি খারাপ ধারণা রাখা, এটা সবচেয়ে বড় গুনাহ!”
তাছিল্য করে হেসে উঠে আবার বলল,
“আমিও বা কাকে কী বলছি! যাদের র’ক্তে বেইমান, নোংরা, নি’কৃষ্ট, জঘন্যতায় ভরপুর, তারা শুনবে ধর্মের কথা? হাস্যকর!”
শেহরাজ অদ্ভুত চোখে তাকায়। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“শেহরাজ পাটোয়ারী অযথা অপবাদ দেয় না। আপনিই বলুন, আপনার এই ব্রেসলেট ওই লা’শের হাতের মুঠোয় এলো কীভাবে মিস. উমেরা ওয়াজেদ?”
“বাহ, শেহরাজ পাটোয়ারী বাহ! মানতেই হবে আপনি একটা মাইন্ডগেইমার। প্রথমে রাতের অন্ধকারের মাঝে আমাকে মে’রে ফেলার প্ল্যান করলেন। আর এখন নিজে খু’ন করে সেটার দায়ভার আমারই ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন? নিজেরা অন্যায় করে অন্যদের ঘাড়ে কীভাবে দোষ চাপাতে হয়, সেটা আপনাদের বংশের থেকে শেখা উচিত।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“মিস. উমেরা ওয়াজেদ। আপনি কিন্তু কথা ঘোরানোর চেষ্টা করছেন।”
উমেরা তেঁতে উঠল,
“আপনি ইচ্ছে করে আমার ব্রেসলেট চুরি করে ওই মেয়েটার হাতে গুঁজে দিয়েছেন মি. পাটোয়ারী। আমি নির্বোধ নই। এতটুকু বোঝার ক্ষমতা আমার আছে।”
শেহরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। এই পাগল মেয়েটা তখন থেকে একই কথা বলে যাচ্ছে। শেহরাজ উমেরার দিকে ঝুঁকে এসে হিসহিসিয়ে বলল,
“আই সোয়ার মিস. উমেরা ওয়াজেদ! ওই খু’নিটা যদি আমি হতাম তাহলে সর্বপ্রথম আপনার মতো আধপাগল পঁচা আলুকে জমিন থেকে বিনাটিকেটে ওপরে ডেলিভারি করে দিতাম।”
রাগে উমেরার শরীর কাঁপছে। একে তো সে বুঝতে পারছে না তার ব্রেসলেট ওই মেয়েটার হাতে কীভাবে গেল। তার উপর এই শয়তানের মিথ্যে দোষারোপ শুনে, ইচ্ছে করছে একটা পাথর তুলে সোজা মাথায় মে’রে লোকটাকে কোমায় পাঠিয়ে দিতে। উমেরা শেহরাজের চোখের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কাপুরুষের ঘরের কাপুরুষরা খু’ন-খারাবি ছাড়া আর কী পারেন? আপনাদের র’ক্তে বিষ দিয়ে খোদাই করা রয়েছে বিশ্বাসঘাতক শব্দ৷ পাটোয়ারীর বংশধর পেছন থেকে কীভাবে ছুরি মা’রতে হয় তা ভালোই জানে।”
শেহরাজের চোখ জোড়া রক্তিম হয়ে উঠল। সে আরো এগিয়ে এসে কিছু বলতে যাবে, তখনই খেয়াল করল ডক্টর মুহিদ তাদের দিকে আসছে। শেহরাজ তৎক্ষনাৎ উমেরার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াল। যেন এতক্ষণ কিছুই হয়নি।
“তোমাদের একে অপরকে দোষারোপ করা শেষ হলে এবার লা’শটিকে নিয়ে ভাবা উচিত। আমার মতে এ বিষয়টা এখন জানাজানি করা উচিত হবে না। তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। আর গ্রামের মধ্যেও একটা হইহুল্লড় পরে যাবে। এতে আমাদেরই ক্ষতি হবে।”
শেহরাজ বাম হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছেন ড. মহিদ। আমিও এটাই ভাবছিলাম।”
ড. মহিদ বলে উঠল,
“কিন্তু ড. শেহরাজ, এতো রাতে লা’শটিকে কোথায় সরাবেন? কীভাবে সরাবেন?”
শেহরাজ আড় চোখে উমেরার দিক এক ঝলক তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“লা’শের ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দিন ড. মুহিদ। আপনি আপনার এই অকৃতজ্ঞ বাদ্যযন্ত্রওয়ালা ছাত্রীকে সামলান। যেন সকালে উঠেই আবার ঢোল না পেটায়।”
উমেরার ক্রোধে শরীর ফেটে যাচ্ছে। তীব্র রাগে আর ভয়ে তার বুক উঠানামা করছে। তবে ড. মহিদের কথায়ও যুক্তি আছে। তাই আর সে কথা বাড়াল না।
অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়ার্ত রাতটা পেরিয়ে পাহাড়ি এলাকায় সূর্যের দেখা মেলে। সকাল হতে দেরি হলেও গ্রামের রোগীদের লাইন বাই লাইন আসতে দেরি হয় না। শেহরাজ সহ বাকি সিনিয়র ডাক্তাররা প্রতেকে তাদের টিম নিয়ে রোগী দেখা শুরু করে দিয়েছে। সবাই স্বাভাবিক। কারন রাতের ঘটেনটা রাতের অন্ধকারে ধামাচাপা পড়ে গেছে। জারা অনেক্ক্ষণ ধরে লক্ষ্য করছে উমেরা কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়ে আছে। কাজে তার মন নেই। একা একা বিড়বিড় করছে। যেন গভীর কোন ভাবনায় ডুবে আছে। আশেপাশে কী হচ্ছে, সেদিকে তার কোনো মনোযোগ নেই। জারা হাতে কাজ রেখে এগিয়ে আসল সেদিকে।
“এই কী হয়েছে তোর বল তো? কী নিয়ে এত চিন্তা করছিস? আমি তোকে লক্ষ্য করছি, কখন থেকে তুই একা একা কী যেন বলছিস। কী হয়েছে হেহ?”
জারার প্রশ্ন শুনে উমেরা চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিল। রাতে তার ওপর হামলা হওয়া থেকে শুরু করে যা যা হয়েছে সবকিছু সে সাবধানতার সাথে এড়িয়ে গেল। যদিও তাকে সব কিছু ভীষণ গভীর ভাবে ভাবাচ্ছে, এই পাহাড়ি এলাকায় তার কোনো শত্রু নেই। জানা শোনাও কেউ নেই। তাহলে হঠাৎ করে তার উপর আক্রমন করার মানে কী? আর কেইবা তাকে মা’রতে এলো? শেহরাজ পাটোয়ারী? হয়তো! এই লোকটাই তো রয়েছে সবকিছুর পেছনে। উমেরা মনে মনে পণ করল, শেহরাজের ভালো মানুষীর আড়ালে যে কুৎসিত, নোংরা চেহারা রয়েছে। সেটা সে উন্মোচন করেই ছাড়বে। আর সেটা সে খুব শীঘ্রই করবে। তার জন্য তাকে যা যা করতে হয়, সেটাই করবে। জারার ধাক্কায় সে ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে। মুখ গম্ভীর করে বলে,
“না, কিছুই হয়নি। রাতে ঘুম হয়নি তাই ভালো লাগছে না কিছু। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে, ব্যস।”
উমেরা সম্পূর্ণ কথা লুকিয়ে গেল। জারা বুঝল না। শুধু সন্দেহের জনিতে বলল, “পাহাড়ি এলাকায় মানুষ আসে স্বস্তির নিশ্বাস নেয়ার জন্য। আর তুই বলছিস অস্বস্তি লাগছে? আচ্ছা একটা কাজ কর। তোর কাজ শেষ কর, তারপর আমরা পাহাড় দেখতে বের হবো। তখন তোর ভালো লাগবে দেখিস।”
“আচ্ছা দেখি।”
“দেখি টেকি না। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর।”
“আচ্ছা বাবা, আচ্ছা।”
আরো কিছু টুকটাক কথাবার্তা বলে নিজেদের টিমের দিকে চলে যায় জারা। উমেরা একপলক তাকায় শেহরাজের দিকে, তাতেই তার মুখ শক্ত কাঠের ন্যায় হয়ে গেল। দেখে মনে হচ্ছে রাতে কিছুই ঘটেনি! একটা মানুষ কতটা হার্টলেস হলে এমন হয় উমেরার জানা নেই। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পাড়ল না। গটগট করে চলে গেল সেখান থেকে।
“অপ্সরা, আমার অপ্সরা! তুমি মন খারাপ করছো কেন বলো তো? তুমি কী নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা করছো? আমি আছি তো? এই আর্শিয়ান মির্জা তোমার সকল দুশ্চিন্তা বহন করবে। তোমার দুঃখকে, প্রজাপতির মতো উড়িয়ে দিবে। শুধু আমার হিটলার বাপটার জন্য পারছি না। একটু অপেক্ষা করো আমার অপ্সরা। সব সত্যি আমি তোমার পায়ের কাছে এনে দেবো। তুমি চিন্তা করো না। একটুও না!”
মনের কথা মনের মাঝেই ক্ষয়ে গেল আর্শিয়ানের। সবুজরাঙা উঁচু পাহাড় থেকে টেলিস্কোপের ছোট্ট ছোট্ট দু চোখ দিয়ে তার না পাওয়া প্রিয় মানুষটিকে দেখছে, আর এক নাগাড়ে বিড়বিড় করছে। উমেরাকে গম্ভীর দেখে তার যন্ত্রণা হচ্ছে, তীব্র যন্ত্রণা। গতরাতে সে গিয়েছিল তার অপ্সরার কাছে, তবে হঠাৎ করে কাউকে আসতে দেখে সে পিছিয়ে গেছে। গতরাতের সকল ঘটনার ব্যাপারেই সে অবগত। শুধুু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছে। এই মূহুর্তে তার ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে উমেরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলেত,
“আমি আছি অপ্সরা! আমি তোমার সাথে আছি। আর সারাজীবন থাকবো। তোমাকে কোনো কষ্ট, আঘাত, রাগ, দুঃখ, কান্না, দুশ্চিন্তা কিছু ছুঁতে পারবে না। কেউ না! তোমাকে শুধু আমি ছোঁবো, শুধুই আর্শিয়ান মির্জা ছুঁয়ে দেখবে তোমায়। তুমি শুধুু আর্শিয়ান মির্জার অপ্সরা।”
শুদ্ধ রাতে বাড়িতে ফিরে তেমন কারোর সাথে কথা বলল না। চুপচাপ খাওয়া দাওয়া শেষ করে নিজের রুমে চলে এসেছে। দুপুরে বোনের সাথে একটু কথা হয়েছিল। তখন জানতে পারে আরো দুদিন পাহাড়ি এলাকায় থাকতে হবে গ্রামের লোকজনের চিকিৎসার জন্য। এই সিদ্ধান্ত ডক্টর মুহিদ রোগীর সংখ্যা দেখে হঠাৎ করেই নেয়। আজ বাদে আগামীকাল রোগীদের চিকিৎসা করে রাতের বাসে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। বোনের মুখে সবকিছু শুনে শুদ্ধ রেগে যায়। কারণ ওখানে তাদের জাত শত্রুর বংশধর শেহরাজ পাটোয়ারী রয়েছে। সুযোগ পেলেই ছোবল মা’রার জন্য মুখিয়া হয়ে থাকে। শুদ্ধ উমেরাকে সাবধানে থাকতে বলে এবং আরো কিছু পরামর্শ দেয়। তার বোনটা ঝাঁঝাল ধানিলঙ্কা হলেও বোকা। তাকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে খুব সহজেই বোকা বানানো যায়। এটা নিয়েই সে বেশ চিন্তিত, সোজা সরল বোনটা না আবার কোনো শত্রুর পাল্লায় পড়ে। নয়তো তার আদরের বোনটার সুন্দর জীবন একদম ধ্বংসে পতিত হবে৷
শুদ্ধ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো। তখনই বিছানায় থাকা ফোনটি বিকট শব্দে বেজে ওঠে। ভ্রু কুঁচকে ফোনটা হাতে নিতেই বিরক্তিতে মুখ দিয়ে ‘চ’ সূচক শব্দ বের হয়। শুদ্ধ কল রিসিভ না করেই বিছানায় ছুঁড়ে মা’রল ফোনটা। নিজে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় আরাম করে বসল। কিন্তু লাগামহীন অবাধ্য ফোনটা বেজেই চলেছে৷ থামাথামির কোনো বালাই নেই। এক পর্যায়ে চরম বিরক্তি নিয়ে কল রিসিভ করে ঝাঁঝিয়ে উঠল,
“এই তোর সমস্যা কী বল তো? এত রাতে একজন পরপুরুষকে কল দিতে লজ্জা করে না? হাতের কাছে পাইলে কল দেওয়া বের করে দিতাম বেয়াদব মেয়ে!”
প্রিয় পুরুষের রাগ দেখে সুনেরা হেসে ফেলল। যেন এই রাগটাই সে চেয়েছে। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি রেখে নরম কন্ঠে বলল,
“আমার পুরো সমস্যাটাই হচ্ছে আপনি, অশুদ্ধ সাহেব। আর আপনি তো পরপুরুষ নোন। আপনি আমার ব্যক্তিগত পুরুষ। তাই নিজের ব্যক্তিগত পুরুষকে জ্বালাতন করতে আমার একটুও লজ্জা করে না। বিশ্বাস করুন।”
“এই তুই ভালো হবি না?”
“হবো তো, অশুদ্ধ সাহেব। আপনি একটু আমায় ভালোবাসুন, তাহলেই আমি একদম ভালো হয়ে যাবো। মানুষ তো ভালোবাসায়ই ভালো হয় বলুন।”
“তোর মতো পাগল বট গাছের আঠাকে ভালোবাসার থেকে, চিরকুমার হয়ে থাকাটা শতগুনে ভালো।”
“আপনি আস্ত একটা নিম পাতার গাছ। মুখ থেকে মধুর বাণী বের হওয়ার বদলে শুধু তিতা রস বের হয়। জন্মের সময় কী ভুল করে মধুর বদলে নিম পাতার রস খেয়েছেন?”
“হ্যাঁ, খেয়েছি। আমার কথা এমনেই। আরেকবার কল দিলে, ওই তিতা রসের মধ্যেই তোকে চুবিয়ে মা’রবো বেয়াদব মেয়ে।”
“আমি ম’রতেও রাজি আছি। ব্যক্তিগত পুরুষের হাতে মৃ’ত্যুর সৌভাগ্য কয়জনের হয় বলেন? শুধু ম’রার আগে এইটুকু বইলেন, আপনি আমায় ভালোবাসেন অশুদ্ধ সাহেব। তাহলে আমি হাসতে হাসতে আপনার হাতের মরণ তৃপ্তির সাথে গ্রহণ করবো।”
“ভালোবাসার গুষ্ঠি কিলাই! পাগলের ঘরের পাগল, ফোন রাখ। নয়তো ফোনের ভেতর ঢুকে তোর মাথা থেকে প্রেমলিলার ভুত ছাড়িয়ে দিয়ে আসবো, ইডিয়ট।”
বলেই সুনেরার মুখের ওপর ঠাস করে কল কেটে দিল অশুদ্ধ পুরুষ। সুনেরা বিছানার মাঝে ধপ করে শুয়ে পড়ল। নিজের ফোনটা চোখের সামনে ধরতেই স্ক্রিনে তার অশুদ্ধ সাহেবের সুন্দর চেহারা ভেসে উঠল। সেদিনই এটা লুকিয়ে তুলেছিল। সুনেরার দৃষ্টি ঝাপসা, চোখ জোড়া ছলছল করলেও ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি উঁকি দিচ্ছে। ফোনটা নিজের বুকের মাঝে চেপে ধরে অস্ফুটস্বরে বিড়বিড় করে উঠল,
“আপনি আমায় কবে ভালোবাসবেন অশুদ্ধ সাহেব? মানছি আমি আপনাকে একটু বেশিই ভালোবাসি। তাই এমন পাগলামি করি। কিন্তু আপনি তো পারেন এই পাগলামিটাকে একটু প্রশ্রয় দিতে!”
দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল সুনেরা। তবে ঠোঁটের কোণে হাসিটা লেগেই আছে।
পরেরদিন সকাল বেলায় সবাই মিলে এলাকায় এলাকায় গিয়ে ফ্রী চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। পাহাড়ি এলাকায় অনেক গ্রামে শয্যাশায়ী রোগী রয়েছে, যাদের চিকিৎসাটাও জরুরি। আজকের কাজটা শেষ হলেই শহরে ফিরে যাবে সবাই।
প্রতেকটা টিম আলাদা আলাদা গ্রামে এসেছে। যাদের গুরুতর অবস্থা এবং দেখাশোনার মতো কেউ নেই। এক কথায় নিঃস্ব যাকে বলে। তাদের সবাইকে শেহরাজ পাটোয়ারী নিজ দ্বায়িত্বে, নিজের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেখানেই তাদের চিকিৎসা আর বাকি দেখভাল করা হবে। এতে গ্রামবাসীরা মুগ্ধ শেহরাজের প্রতি, তার কাজের প্রতি। তার শুনাম গাইছে অনেকেই, তরুন বয়সের একজন ডাক্তার এতো উদার হতে পারে। সেটা শেহরাজকে দেখেই সবাই বুঝল। উমেরা এসব আদিখ্যেতা দেখে সহ্য করতে পারছে না। কারণ সে জানে, এসব লোক দেখানোর জন্য করছে শেহরাজ পাটোয়ারী। নাহলে ভালো মানুষীর মুখোশ ধরে রাখবে কীভাবে?
উমেরা ও টিমের দুজন মেয়ে মিলে কয়েকজন বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের চেক-আপ করছিল। তখন একটা মেয়ের হাত লেগে ভুলবশত উমেরার সাদা ডাক্তারির কোর্টে লিকুইড ঔষধ পড়ে যায়। মেয়েটি নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত। তাই উমেরা আর কিছু বলল না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে কিছুটা দূরে টিউবওয়েল রয়েছে। সে নিজের হ্যান্ড ব্যাগ থেকে রুমাল নিয়ে সেদিকে চলে যায়।
“মিস উমেরা ওয়াজেদ আপনি কী এখানে ফিল্ডিং মা’রতে এসেছেন নাকি সেবা দিতে এসেছেন?”
পেছন থেকে শেহরাজের কণ্ঠস্বর শুনে উমেরা চকিতে ঘুরে তাকায়। শেহরাজ পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে। মৃদু বাতাসে চুলগুলো উড়ছে। গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলানো। সব মিলিয়ে দৃষ্টি কেড়ে নেয়ার মতো। অজান্তেই উমরার বুকের ভেতর কিছুটা নড়ে গেল। সে দ্রুত দৃষ্টি সামলে নিয়ে ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“নো, মি. শেহরাজ পাটোয়ারী। আপনার মতো লুকিয়ে চুরিয়ে মার্ডার করতে এসেছি। ভাবছি নেক্সট টার্গেট আপনাকে বানাবো।”
উমেরা তাচ্ছিল্যের সুর শুনে, শেহরাজ বাঁকা হাসল। এক কদম এগিয়ে তার দিকে সামান্য ঝুঁকে বলল,
“আমাকে মা’রতে এসে, নিজেই ম’রে ভুত হয়ে আকাশে উড়াল দিয়েন না, পাতি ডাক্তার সাহেবা।”
“আমি উমেরা ওয়াজেদ। ওয়াজেদ পরিবারের একমাত্র মেয়ে। কখনো হারতে শেখিনি, কিন্তু দুশমনকে কীভাবে হারাতে হয়! সেটা খুব ভালো করেই শিখেছি।”
শেহরাজ ঠোঁট উল্টে বলল,
“হুমমম.. ওয়াজেদ পরিবার আর কিছু পারুক না পারুক। তবে বড় বড় চাপা মা’রতে বেশ ভালোই পারে।”
“চাপা নাকি চরম সত্য! সেটা সময় আসলেই টের পাবেন। এখনি বুঝবেন না উমেরা ওয়াজেদ আসলে কোন ধাতুর গড়া।”
শেহরাজ অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকল তার দিকে। ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
“আপনার মতো ব্রেনলেস ভিতুর ডিমের সাথে কথা বলাটাই বোকামি। সরুন সামনে থেকে, পানি নেবো।”
“আমি আগে এসেছি সরবো না। কী করবেন আপনি? এটা কী নিজের বাপদাদার সম্পত্তি পেয়েছেন? চাইলেন আর পেয়ে গেলেন?”
“বেশি কথা বলবেন না। নয়তো মাথায় তুলে মা’রবো একটা আছাড়। তখন সব ফটরফটর বেরিয়ে যাবে। এমনি এমনি বাধ্যযন্ত্র বলি না। সারাক্ষণ শুধু পকর পকর। শালার নারীলোক এতো কথা বলে? কানটা ঝালাপালা হয়ে গেল। নারীরা হবে একটু লাজুক স্বভাবের। আর এটা কি রে ভাই? আসলেই আপনি কোন ধাতুর তৈরি? এসেছেন তো পাকিস্তান নইলে আফগানিস্তান থেকে আমদানি হয়ে। তারা কী কোন বিশেষ বিষাক্ত কিছু মিশিয়ে ছিল?”
উমেরা কথার পরিপার্শ্বে পাল্টা জবাব দিল। তর্জনী আঙুল তুলে সে শেহরাজকে শাসাল,
“খবরদার আমার জন্ম নিয়ে কথা বলবেন না। তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে।”
“স্টুপিড!”
“গালি দিবেন না বলে দিলাম।”
“না, গালি দিব না। আপনাকে কোলে তুলে চুমু দেব, আসেন দুটো চুমু দিয়ে ষোলকলা পূর্ণ করে দেই।”
“ছিহ! অসভ্য লোক। অসভ্যতামির একটা সীমা থাকা দরকার। অবশ্য পাটোয়ারীদের চরিত্র তে নর্দমার চেয়েও নিকৃষ্ট। মুখে লাগাম থাকবে কী করে।”
“আপনার চরিত্র বুঝি দুধে ধোয়া? তাহলে মাঝরাতে আমার কাছে কী করতে এসেছিলেন। আদর খেতে?”
“মুখ সামলে কথা বলুন ড. শেহরাজ!”
“আমার মুখ ঠিকই আছে। নয়তো পরশু রাতে আপনার কুকীর্তির ঘটনা ফাঁস করে এতক্ষণে জেলের ভেতর ভরিয়ে রাখতাম। তখন জেলে বসে থেকে শক্ত রুটির সাথে আপনার মতো পঁচা, পাকা, ধলা কুমড়ার ঘাঁটি খেতেন আর বলতেন, আহ… এত স্বাদ ক্যা!”
দহনসুধা পর্ব ১০
উমেরা আরেকটু এগিয়ে এসে আঙুল তুলল শেহরাজের দিকে। শেহরাজ সে আঙুল মুঠ করে ধরে এক হ্যাচকা টান দিল। ভারসাম্য হারিয়ে উমেরা এসে পড়ল শেহরাজের বুকে। তাদের মধ্যে দূরুত্ব নেই বললেই চলে। আর এই দৃশ্যটাই চোখে পড়ল গ্রামের কয়েকজনের চোখে। মূহুর্তেই জড়ো হলো, এলাকাবাসী। উমেরা চট করে সরে এলো, চোখের সামনে সব এলোমেলো লাগছে। মাথা যেন তাল হারিয়ে ফেলেছে। এমন ঝাপসা লাগছে কেন সব?
