সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১২
jannatul firdaus mithila
“ মাহি ইজ ইনোসেন্ট মুগ্ধ! তোর প্রয়োজনে ওকে হাতিয়ার বানাস না। ইট উইল বি আ ক্রিপিয়েস্ট থিংস এভার।”
আচমকাই মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে দেখা মিললো এক রহস্যময় হাসির ছাপ।ছেলেটা পেছনে না ফিরেই সামনের দিকে পা চালিয়ে বলল,
“ এন্ড আই লাভ দেট ক্রিপিয়েস্ট থিংস!”
মার্বেলের মেঝেতে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেলো মুগ্ধ।বলিষ্ঠদেহী যুবক অহংকারের ছাপ ধরে রেখে পিছু ফিরে চাইলো না একটিবারও। এদিকে তার চলে যাওয়ার পথে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো রেহান।ছেলেটার চোখেমুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে এক অজানা অসহায়ত্ব!তবে এমনটা কেনো,তা যেন মুড়ে আছে আরেক রহস্যে! রেহান কেমন বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেলছে ঘনঘন। মুগ্ধ চোখের আড়াল হতেই কয়েক পা পেছালো সে।পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ালো করিডরের সোনালী রঙের কারুকার্যময় রেলিঙের দ্বারে। একহাতে মাথার চুলগুলো খানিক চেপে ধরে চোখ বুজঁলো রেহান। নাক দিয়ে উত্তপ্ত নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে বিরবির করে বলল,
“ আমার ভুল! সবটা আমার ভুল! তোকে দেশে ডেকে আনাটাই আমার জীবনের চরম ভুল ছিলো সায়ান। আমি এটা হারে হারে টের পাচ্ছি এখন।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
কথাটা ব’লেই চোখ মেললো রেহান। ফর্সা চোয়ালখানা বেশ খানিকটা দৃঢ় করে সটান হয়ে দাঁড়ালো পরপরই। বা-হাতে ঘাড়ের পিঠে সামান্য ম্যাসাজ করতে করতে ডান হাত গুঁজল পকেটের ফাঁকে।মুহুর্তেই বের করে আনলো নিজের ফোনটা।অতঃপর ফোনের স্ক্রিনে চটপট আঙুল চালিয়ে কল লাগায় মুগ্ধের নম্বরে।ওদিকে বাড়ির মূল ফটকের বাইরে মুগ্ধ ছেলেটা পা রেখেছে কেবল! ওমনি পকেটে গুঁজে রাখা ফোনটা তার কর্কশ শব্দ তুলতেই পা থামালো সে। তড়িৎ পকেট থেকে ফোন বের করে এনে চোখ রাখলো স্ক্রিনের জ্বলতে থাকা নম্বরে। রেহানের নামটা স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে! তা দেখামাত্রই কপালের চামড়ায় গোটাকতক ভাজঁ পড়লো মুগ্ধের।তবুও কলটা রিসিভ করে সে।কানের কাছে ফোন ঠেকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে আওড়ায়,
“ ঘরে সুন্দরী বউ থাকা স্বত্বেও রাত-বিরেতে আমার মত হ্যান্ডসামকে কল দেওয়ার কারণটা কী?”
ওপাশে রেহান খানিক চটলো বোধহয়। মশকরা করার মুডে না থাকায় ভীষণ সিরিয়াস ভঙ্গিতে দাঁত খিঁচে বলল,
“ তুই যা চাচ্ছিস সেটা নিসন্দেহে অপরাধ সায়ান।ঘোর অপরাধ! এটলিস্ট আমি বেঁচে থাকতে এটা হতে দিবো না কখনোই।”
মুগ্ধ এবারেও বাঁকা হাসলো। একহাত পকেটে গুঁজে সামনের দিকে পা বাড়িয়ে কেমন রহস্যময় কন্ঠে বলল,
“ আমার কাজে বাঁধা দিতে আসিস না কিডো! কেননা আমি আমার চলন্ত পথে কোনো ধরনের কাটাঁ পেলে সেটাকে কেবল উপড়ে ফেলি না…”
এটুকু বলেই মুগ্ধ দাঁড়ালো আবারও। নুইয়ে রাখা জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় চোখদুটোকে সামান্য ওপরে তুলে, দৃঢ় চোয়ালকে শক্ত করে ফোটালো তক্ষুনি।চকচকে দাতেঁর সাহায্যে নিচের ঠোঁটটাকে খানিক চেপে ধরে ঘাড় ঘোরালো এদিক ওদিক। পরক্ষণে বেশ শান্ত অথচ নিরেট কন্ঠে বললো,
“ দরকার পড়লে সে-ই পথের কাটাঁকে মাটিতে মিশিয়ে ফেলতে ন্যানো সেকেন্ড সময়ও নেই না আমি!এন্ড… এটা আর কেউ জানুক বা না জানুক, তুই তো বেশ ভালো করে জানিস। সো চয়েজ ইজ ইউরস! গুড নাইট কিডো।”
হুমকি! এ যেন নিরব হুমকি। রেহানের বুক কাঁপছে এবার। হাতদুটোও কাঁপছে থরথর করে। কানে ঠেকিয়ে রাখা ফোনটা কেমন অবহেলায় গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে!বেচারার সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। সে-তো ভাবছে অন্যকিছু। সায়ান মাত্র কী বললো? সে পথের কাটাঁ উপড়ে ফেলবে? তারমানে কী দাড়াচ্ছে? সে আবারও তার অন্য জগতে ফিরে গেছে? সে-কি তবে ছাড়েনি কিছু? রেহানের মস্তিষ্ক ফেটে যাবার যোগাড় এপর্যায়ে। ছেলেটা তক্ষুনি উবু হয়ে বসলো মেঝেতে। অবহেলিত আকারে পড়ে থাকা ফোনটাকে কোনরকমে হাতে তুলে আবারও কল দিলো মুগ্ধের ফোনে। এবার আর কল তুললো না মুগ্ধ! রেহান এপর্যায়ে অস্থির। ব্যস্ত ভঙ্গিতে অনবরত কল দিয়ে যাচ্ছে মুগ্ধের নম্বরে। প্রায় চারটে কল কেটে যাওয়ার পর পঞ্চমবারের কলটা রিসিভ করলো মুগ্ধ। রহস্যময় যুবক উঠে বসেছে নিজের ইকোস ইএসওয়ান স্পিরিট বাইকে। মাথায় চড়িয়েছে কালো রঙা হেলমেট। কানে চলছে ওয়্যারল্যাস হেডফোন। মুগ্ধ হেলমেট পড়াকালীন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আবার কী?”
ওপাশের রেহান কেমন কাঁপছে রীতিমতো। ভয়ে জর্জরিত ছেলেটার সর্বাঙ্গে ইতোমধ্যেই ছুটে গিয়েছে ঘাম। কপাল বেয়ে টুপটুপ করে পড়ছে এক-দু ফোঁটা ঘামের কণা! তার কন্ঠস্বর কাঁপছে কেমন।তবুও নিজেকে সামলে বেচারা রেহান থেমে থেমে কোনমতে বলে ওঠে,
“ তুই..কী এখনো ঐসব বাদ দেসনি সায়ান? এখনো বেরিয়ে আসিসনি ঐ জগত থেকে?”
কালো রঙা হেলমেট পড়ুয়া মুগ্ধ কেমন বাঁকা হাসলো হেলমেটের আড়ালে।দক্ষ হাতে বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট করে রহস্যময় কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ওয়ান্স আ ডেভিল,অলওয়েজ রিমেইনস আ ডেভিল!বাকিটা বুঝে নে!”
কথাটা বলেই কল কাটলো মুগ্ধ। দারুণ বেগে স্টার্ট দিলো বাইকটা।ওদিকে তার ওমন সোজাসাপটা উত্তরে জ্ঞান হারানোর যোগাড় হয়েছে রেহানের। সে কী তবে সত্যি ভুল করে বসলো? নিজ হাতে ধ্বংস করে ফেললো মাহির সুন্দর জীবনটা? নিজ ভাবনায় নিমগ্ন রেহান।দুষছে নিজেকে বারবার! ভবিষ্যতের জন্য আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে না তার?
রাত বাজে দু’টো! সাই সাই করে হাওয়ার বেগে ছুটছে মুগ্ধের বাইক। বেপরোয়া যুবকের পেশিবহুল বাহুদ্বয় ফুলেফেঁপে উঠছে বারবার। এই বুঝি তারা বেরিয়ে এলো শার্টের তথাকথিত আবরণ থেকে। প্রায় ঘন্টা খানেক পর,মুগ্ধের বাইক এসে থামলো মির্জা বাড়ির কেচিঁ গেটের সামনে। সুউচ্চ পাচঁ তলা বিশিষ্ট বিল্ডিংটির সামনে রয়েছে বেশ বড়সড় একটা ইয়ার্ড।দু’ধারে গাছ-গাছালিতে ঘেরা তবে মাঝে দিয়ে রয়েছে বাড়ির ড্রাইভওয়ে। যা একদম বাড়ির সদর দরজা থেকে মূল ফটক অব্দি বিস্তৃত। মুগ্ধ নিজের বাইক বাড়ির ফটকের ভেতর ঢোকায়নি। উল্টো ফটকের বাইরে কেঁচি গেটের সামনে বাইকটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে, বাইকের চাবি হাতের তর্জনী আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে পা বাড়ালো কেঁচি গেটের ভেতর। তক্ষুনি বাড়ির দারোয়ান হাশেম মিয়া এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন মাথা নুইয়ে। মুগ্ধ চলে যাবার সময় পেছন থেকে ভুলবশত বলে বসলেন,
“ ছোটো সাহেব! বাইক বাড়িতে ঢোকাবেন না? কেউ যদি চুরি করে ফেলে?”
মুগ্ধের চলন্ত পা জোড়া থামলো হঠাৎ। মাথা তখনও পড়ে রাখা হেলমেটটা।সে আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায়। বাড়ির ফটকের দ্বারের ল্যামপোস্টের নিয়নের আলোয় মুহুর্তেই চকচক করে ওঠে সুদর্শন যুবকের বাদামী চোখদুটো। হাশেম মিয়া ভড়কে যান এহেন চাহনিতে। তিনি কেমন আমতা আমতা করছেন এখন।ওদিকে মুগ্ধ হঠাৎ গমগমে গলায় বলে ওঠে,
“ কার ঘাড়ে দুটো মাথা আছে যে কি-না সায়ান মুগ্ধের বাইক নিয়ে যাবে? থাকলে নিয়ে যাক।বহুদিন হয়েছে কারো ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করিনা!”
শান্ত পরিবেশটা মুহুর্তেই ভারি হয়ে ওঠল মুগ্ধের এহেন অপ্রাকৃত বাক্যে।হাশেম মিয়ার হাঁটু কাঁপছে। বেচারা আধবুড়ো মানুষ। মুগ্ধের ওমন কথায় বেচারা যদি হার্ট অ্যাটাক করে বসেন তখন? তখন কী হবে? মুগ্ধ ঘাড় সোজা করলো আবারও। দু’হাত পকেটে গুঁজে ঠোঁটের কোণে শিস বাজিয়ে হাঁটা ধরলো বাড়ির দিকে। ওদিকে তার চলে যাওয়া দেখে ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো হাশেম মিয়া। দ্রুত কোমরের বেল্ট চেপে ধরে, ছুটলেন কেঁচি গেট লাগোয়া নিজ কামরায়। এমুহুর্তেই হাল্কা হতে হবে তার।নাহলে ইজ্জতের রফাদফা হবেই হবে।
বড়সড় কাচেঁর দরজাটায় একহাতে ধাক্কা দিলো মুগ্ধ। বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে বানানো রয়েছে গেস্ট হাউস। মুগ্ধ এসেছে পর থেকে বেশিরভাগ সময় এখানেই থাকছে। এদিকে অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় মুগ্ধ আর বাড়ির ভেতরে ঢুকলো না। পাছে না আবার সবাই জেগে ওঠে!
দোতলা বিশিষ্ট গেস্ট হাউসটি পুরোটাই কাঁচের তৈরি। মজার বিষয় হচ্ছে গেস্ট হাউসের ভেতর থেকে বাইরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা গেলেও বাইরে থেকে কেবল কাচঁ বিনে আর কিছুই নজরে পড়েনা। মুগ্ধ ধীর পা ফেলে গেস্ট হাউসের লিভিং রুমে এসে দাঁড়ালো। মাথার হেলমেটটা খুলে নিয়ে রাখলো লিভিং রুমের বড় সোফার এককোণে।অতঃপর নিজেও বসলো তার পাশে।ক্লান্তিতে চোখদুটো একটুখানি বুজঁতেই তার কানে ভেসে আসে কারো পায়ের শব্দ! চট করে চোখ খুললো মুগ্ধ। নড়েচড়ে বসলো সোফার নরম গদিতে। পায়ের ওপর পা তুলে বেশ নবাবী একটা ভাব ধরে গলা উঁচিয়ে আচমকাই বলল,
“ লুকিয়ে থেকে কী লাভ? নতুন করে আমার রুপ বেরোয়নি নিশ্চয়ই!”
কথাটা শেষ হবার ঠিক মিনিট খানেক বাদেই ডাইনিং থেকে বেরিয়ে আসেন তৌসিফ মির্জা। মধ্যবয়স্ক মানুষটার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে কুটিল হাসি। একহাতে ধরে রাখা স্ট্রং হুইস্কির বোতল, আরেক হাতে কাঁচের স্বচ্ছ গ্লাস। তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে আসেন মুগ্ধের নিকট। মুগ্ধ আড়চোখে তাকে দেখেও ঠায় বসে রইলো আগের মত। পায়ের ওপর পা ঝুলছে এখনো। তৌসিফ মির্জা দেখেও না দেখার ভান ধরলেন। এ ছেলে তো বরাবরই এমন।কাউকে কী আর গ্রাহ্য করে? তৌসিফ মির্জা চুপচাপ মুখোমুখি হয়ে বসলেন পাশের সোফাটায়।হাতের হুইস্কির বোতল আর গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে,গ্লাসে সামান্য হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বললেন,
“ কোথায় ছিলে?”
মুগ্ধ পা নাচাচ্ছে পায়ের ওপর! গা-ছাড়া ভাব নিয়ে প্রতিত্তোরে বলে,
“ তা জেনে আপনার কী লাভ?”
রাগ করার বদলে তৌসিফ মির্জা উল্টো দাঁতকপাটি বের করে হাসলেন। গ্লাসে ড্রিংক প্রস্তুত করে মুগ্ধের দিকে এগিয়ে ধরে বলে,
“ নাও!”
মুগ্ধ আলগোছে হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে নিলো। বেশ কায়দা করে গ্লাসটা আঙুলের সাহায্যে ধরে রেখে খানিকটা ঘুরিয়ে অবশেষে চুমুক বসালো একটু।তক্ষুনি তৌসিফ মির্জা পাশ থেকে আঁতকে ওঠে বললেন,
“ আরে আরে! পানি তো মিশিয়ে নাও।আমিতো পানি দেইনি এটায়।”
মুগ্ধ কানেও তুললো না কথাটা।উল্টো একসাথে পুরোটা ড্রিংক গিলে নিয়ে বলল,
“ ওসব আপনাদের মতো মানুষ, যাদের এক ঠ্যাং তরে আরেক ঠ্যাং কবরে থাকে তাদের প্রয়োজন পড়ে।আমার এসব দরকার পড়ে না।”
তৌসিফ মির্জা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বসে রইলেন একমুহূর্ত।মুগ্ধের কথাটায় বেশ অপমানিত বোধ করলেন জনাব।তা যে তার মুখাবয়বেই স্পষ্ট। তিনি কিয়তক্ষন চুপ থেকে আবারও বেহায়ার ন্যায় বললেন,
“ কাজ কতদূর?”
মুগ্ধ হাসলো। নিঃশব্দে অথচ বাঁকাভাবে। পা থেকে পা নামিয়ে প্রস্তুতি নিলো উঠে যাওয়ার।তা দেখে মেজাজ চটলো তৌসিফ সাহেবের। মানলেন ছেলেটা ঘাড়ত্যাড়া তাই বলে দশটা কথার পিঠে একটারও কী ঠিকঠাক জবাব দিবেনা সে? তৌসিফ মির্জা চোয়াল শক্ত করে বসে থেকেই বললেন,
“ আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমায়!”
“ আমি বাধ্য নই উত্তর দিতে!”
এপর্যায়ে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেননা তৌসিফ সাহেব। ঘাড় উঁচিয়ে দাঁত খিঁচে বলে ওঠেন,
“ ভুলে যেওনা তোমাকে এখানে কেনো এনেছি! আমার কাজ করার জন্যই কিন্তু তোমাকে…… ”
বাকিটা শেষ হবার আগেই ঘটে গেলো আরেক কান্ড! বেপরোয়া মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ নিজের ডানহাত মুষ্টিবদ্ধ করে সামনে থাকা কাঁচের টেবিলটায় সজোরে বসালো এক ঘুষি। মুহুর্তেই এক বিকট শব্দ তুলে টেবিলটা কেমন চুর্ণ বিচূর্ন হয়ে গুড়িয়ে গেলো মেঝেতে।তা দেখমাত্রই তৌসিফ মির্জা ভড়কালেন।ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালেন মুগ্ধের পানে। মুগ্ধের হাত বেয়ে চুইয়ে পড়ছে লহু।অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা নেই তার।সে কেমন আগুন চোখে তাকিয়ে আছে তার চাচার পানে। ব্লেডের ন্যায় তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা ফুটে উঠেছে আরও দৃঢ়ভাবে। ছেলেটা সময় নিয়ে নিজের কেটে যাওয়া তর্জনী তাক করলো নিজের ঠোঁট বরাবর। ভারী কন্ঠে হিসহিসিয়ে বলল,
“ হুঁশ! ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু শাউট অন মি!”
ভয়ার্ত ঢোক গিললেন তৌসিফ মির্জা। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কোনমতে বললেন,
“ আমি তোমার চাচা হই মুগ্ধ। আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারোনা তুমি!”
ব্যস! এটুকুই বলেছেন বেচারা। তা শোনামাত্রই চট করে দাঁড়িয়ে পড়ে মুগ্ধ। তৎক্ষনাৎ কোমরের পেছন থেকে নিজের রাশিয়ান মডেলের বন্দুকটা বের করে এনে, ঠেকালো চাচার কপালের ঠিক মাঝবরাবর। হকচকান তৌসিফ মির্জা। মুখ দিয়ে শত ফটর ফটর করলেও এসবে বড্ড ভীতু তিনি! বেচারা কেমন নিশ্বাস আঁটকে চেয়ে রইল মুগ্ধের পানে।এদিকে মুগ্ধ বাঁকা হেসে ঘাড় কাত করে সামান্য। রাশভারী গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
“ ট্রিগারটা জাস্ট একবার চাপলেই লাশ বনে যাবেন যে! তখন চাচা কিংবা মামা কোনো আত্মীয়তাই কাজে আসবেনা বুঝলেন? তখন কেবল একটাই পরিচয় হবে আপনার। আর সেটা হচ্ছে — প্রাণহীন নিথর দেহ।আমার ওপর শাউট করার দুঃসাহস করতে আসলে আমি কিন্তু এক সেকেন্ড সময়ও নিবো না এসব করতে। আশা করি সে-ই পরিচয়টা আপনার ভীষণ পছন্দ হবে।”
মাথা ঘোরাচ্ছে তৌসিফ সাহেবের। যেন জ্ঞান হারাবেন এক্ষুণি। মুগ্ধ সময় নিয়ে বন্দুক সরালো চাচার কপাল থেকে। আঙুলের ডগায় বন্দুক নাড়াতে নাড়াতে ঠোঁটে ফের শিস বাজিয়ে হাঁটা ধরলো দোতলার দিকে। ওদিকে তৌসিফ মির্জা বুঝি এতক্ষণে নিজের আঁটকে রাখা দমটা ফেললেন কোনমতে। বুকের ওপর হাত চেপে বেপরোয়া ভঙ্গিতে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে দৌড়ে পালালেন গেস্ট হাউসের বাইরে। তবে দরজার বাইরে পা রাখতেই কিসের সাথে যেন হোঁচট খেলেন মানুষটা।ধুম করে জমিনে পড়বেন তার আগেই একজোড়া শক্তপোক্ত পুরুষালী হাত এসে আঁকড়ে ধরে তাকে।তৌসিফ সাহেব চমকালেন। তড়িৎ চোখ তুলে চাইলেন সামনের মানুষটার পানে। সম্মুখেই দাঁড়িয়ে আছেন তৌকির মির্জা। ঠোঁটে খেলছে রহস্যময় বাঁকা হাসি।চোখে নেই তেমন চমক। তৌসিফ সাহেব সময় নিয়ে নিজেকে সামলালেন। ভাইয়ের হাতদুটোতে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন সোজা হয়ে। ভয়ার্ত কন্ঠে মুখ খুললেন,
“ তোর ছেলে…”
পুরোটা শেষ করতে পারেননি বেচারা। তার আগেই তার কথা বন্ধ হয়ে গেলো তৌকির মির্জার আচমকা শব্দ করা হাসি দেখে। তৌসিফ সাহেব ভ্রু গোটায়। ভাইয়ের এমন হুটহাট হাসির কারণ বোধগম্য না হওয়ায় তিনি হতবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন শুধু! প্রায় কিয়তক্ষন বাদে তৌকির মির্জা অবশেষে হাসি থামালেন।গম্ভীর কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ এতোগুলো বছর ধরে যেই মনস্টারকে আমি আঁটকে রেখেছিলাম, সবার কাছ থেকে দূরে দূরে রেখেছিলাম। তাকে তো তুমিই যেচে পড়ে সবার সামনে আনলে বড় ভাই। সেক্ষেত্রে এইটুকু দেখেই এতো ভয় পেলে হবে?”
হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইলেন তৌসিফ মির্জা। তার ভাই এসব কী বলছে? মনস্টার মানে? তৌসিফ মির্জা নিজ মনে উত্থাপিত প্রশ্নখানা ঠোঁটের কোণে নিয়ে এলেন অবশেষে। বললেন,
“ তোর ছেলে মনস্টার মানে?”
তৌকির মির্জা হুট করেই এগিয়ে এলেন এক কদম। অদূর থেকে ভেসে আসা এক টুকরো নিয়নের আলো তক্ষুনি মুখের একপাশে পড়লো তার।তিনি কেমন বাঁকা হেসে চাপা স্বরে বললেন,
“ রাক্ষস! মানুষ খেকোঁ রাক্ষস না,মানুষ মারা রাক্ষস।”
সকাল গড়িয়ে দুপুর নামবার পালা। শনিবার হওয়ায় এহসান বাড়ির কারো তেমন কাজকর্মে যাওয়ার খুব একটা উদ্যেগ নেই। তবে রৌদ্র যাবে।বিকেলের দিকে মহাশয়ের আজও না-কি অপারেশন আছে! সেক্ষেত্রে যাওয়াটা নিশ্চয়ই জরুরী! অরিন আর রৌদ্র বাড়িতে ফিরেছে সকাল সকালই বলতে গেলে। খুব সকাল হওয়ায় বাড়ির কর্তারা ছিলেন হাটাহাটিতে ব্যস্ত।এই ফাঁকে রৌদ্র গা বাঁচিয়ে সে-ই যে ঘরে ঢুকেছে এ ঢোকাই ঢোকা! মহাশয় আরেকটিবারও বের হোননি রুম থেকে।
এদিকে সকাল ১০টা নাগাদ বাড়িতে এসেছে রেহান,রুহি।মেয়েটা সবে আটমাসে পড়েছে। আগের তুলনায় কমপ্লিকেশন বেড়েছে বহুগুণ। সেক্ষেত্রে রেহান তার বউকে নিয়ে রিস্ক নিতে চায়নি মোটেও। তাইতো বউকে নিয়ে চলে এসেছে শ্বশুরবাড়ি।
সকালের খাবার-দাবার সেই কবেই শেষ হয়েছে! বাড়ির গৃহীনীরা মজেছে দুপুরের রান্নার কাজে। বাড়ির কর্তারা বসেছেন ড্রয়িং রুমে। তাশরিক সাহেব কি নিয়ে যেন ড্রয়িং এ সবাইকে একজোট হতে বলেছেন। অনিক অলরেডি নেমেছে ইকরাকে নিয়ে। রেহান ধীরেসুস্থে সিঁড়ি বেয়ে নামছে বউকে ধরে ধরে। যদিও রুহিকে থাকার জন্য নিচের একটি কামরা দেওয়া হয়েছে তবুও মেয়েটা ইচ্ছে করে দোতলায় উঠেছে। এ নিয়ে রেহানের রাগ করার কথা থাকলেও ছেলেটা কী আর তার আদরের বউয়ের ওপর রাগ করে থাকতে পারে? তাইতো কী সুন্দর যত্ন করে বউকে নামাচ্ছে ধীরে ধীরে।
রৌদ্র এসেছে সবার পরে।অরিনটা আসছে পেছনে।মেয়েটা আবার হাঁটতে পারছেনা ঠিকমতো। যদিও রৌদ্র বলেছে কোলে করে নিয়ে আসবে ড্রয়িং রুমে তবে বাঁধ সেধেছে অরিন।এই লোকের নির্লজ্জতার গাড়িতে লাগাম টানা জরুরী। রৌদ্র ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হতেই তাশরিক সাহেব ছুটে এলেন তার নিকট। হাতে দুখানা টিকেট। তিনি কেমন গদগদ কন্ঠে বলতে লাগলেন,
“ এই দেখ! তোর আর অনিকের জন্য সারপ্রাইজ এনেছি।”
রৌদ্র ভ্রু গোটায়। খেয়াল করে তাশরিক সাহেবের হাতের টিকেট দু’টোতে। জিজ্ঞেস করে,
“ কী এগুলো?”
তাশরিক সাহেব আপ্লূত কন্ঠে প্রতিত্তোরে বললো,
“ তোর আর অনিকের হানিমুনের ব্যাবস্থা করেছি।তোদের তো বিয়ে হলো ঠিকই কিন্তু এই-সেই ব্যস্ততায় এখন অব্ধি হানিমুনে যেতে পারলিনা।তাই ভাবলাম এখন নাহয়..!”
সদ্য ড্রয়িং এ পা রেখেছে অরিন। ওমনি কর্ণকুহরে ছোট চাচার কথাটা পৌঁছাতেই মেয়েটা কেমন হতবুদ্ধির ন্যায় বলে ওঠে,
“ হানিমুন? আবারও?”
অরিনের ভড়কে যাওয়া কন্ঠে বেকুব বনে গেলেন ড্রয়িং এ উপস্থিত বাড়ির সকলে। সাব্বির সাহেব এতক্ষন বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলেন বোধহয়।ওমনি এহেন বাক্য শুনে কথা বলা থামিয়ে হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। বেচারার জরুরীসব কথাগুলো কই যে পালালো কে জানে! ওদিকে রাফিয়া বেগম তৎক্ষনাৎ মেয়ের এহেন ওলট-পালট কথায় জিভে দাঁত কেটে সরে পড়লেন জায়গা থেকে। কবির সাহেব সদ্য চোখে চশমা এঁটে খবরের কাগজটা খুলেছিলেন কোনরকমে, ওমনি তার হাত থেকে বেচারা কাগজখণ্ড খসে পড়লো মেঝেতে। কবির সাহেব কেমন হা করে তাকিয়ে আছেন মেয়েটার দিকে। আরেকদিকে রয়েছেন তাশরিক সাহেব! দু’হাতে চার’খানা টিকিট চেপে রেখে বোকার মত তাকিয়ে রইলেন শুধু। মাঝে থেকে আর্তনাদ করে বুকে হাত চেপে কপট ভাব নিয়ে বললেন,
“ এই ভাইজান! কী বললো অরি? আবার মানে? এর আগে কবে কী হলো?”
তায়েফ মুখ কুঁচকে তাকান এহেন বাক্যে।চটজলদি পা বাড়িয়ে তাশরিক সাহেবের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন,
“ শরম কর! শরম! তুই চাচা লাগিস ওদের!”
থতমত খেলেন তাশরিক সাহেব। সত্যি তো! হতবিহ্বলের মত কী থেকে কী বলে বসলেন তিনি? নিজের করা এহেন বোকামিতে বেজায় অসন্তুষ্ট তাশরিক সাহেব। তবে মনের দুঃখ তার কমলোনা একটুও। এদিকে রৌদ্র কেমন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। পারে না এক্ষুণি কাঁচা গিলে ফেলতে মেয়েটাকে! অরিন ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিললো পরপর। মুখ ফসকে কথাটা বলে দেওয়াটা সত্যি উচিত হয়নি তার! এবার কী হবে? তার ডাক্তার সাহেব না আবার তাকে তুলে একটা আছাড় মারে! প্রায় মিনিট পাঁচেক পর পরিবেশ ঠান্ডা হলো।কবির সাহেব নিজেকে সংবরণ করে মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠেন।গম্ভীর কন্ঠে ছেলেকে ডাক দিয়ে বলেন,
“ অরির কথার মানে কী রোদ? এর আগে তোমরা বেড়াতে গিয়েছিলে কবে? আমিতো জানতাম তুমি তোমার ফেলোশিপ প্রোগ্রামে গিয়েছো।”
রৌদ্রের আগুন চোখদুটো এখনো মেয়েটার দিকে তাক করে রাখা। সে সময় নিয়ে বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেললো। পরক্ষণে নিজের মুখভঙ্গি যথেষ্ট শান্ত করে পেছনে ফিরে বলল,
“ ওতো কত কথাই বলে আব্বু! সবটাই কী আর ধরা যায়? আমার সাথে বিদেশ গিয়েছে, ঐটুকুকেই ধরে নিয়েছে ঘুরতে যাওয়া! ব্যস এটুকুই।”
ছেলের এহেন কথায় অবিশ্বাসের কিছুই পেলেন না কবির সাহেব। গম্ভীর মুখে আলতো মাথা দোলালেন শুধু। রৌদ্র লোহা গরম দেখে বারি দিয়ে বলল,
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১১
“ কাজ করতে করতে দিশেহারা আমি! কই নতুন নতুন বিয়ে-শাদি করেছি,বউকে নিয়ে একটু-আধটু ঘুরতে যাবো! তা না… হাহ! সবই কপাল!”
ছেলেটার এহেন অভিনয়ে অরিনের শুধু আকাশ থেকে পড়া বাকি। মানে ভাবা যায়? লোকটা তিনমাসের হানিমুন সেরে এসে এখন আবার পরিবারের সামনে কেমন মেকি নাকে কেঁদে ভাব নিচ্ছে! অরিনের এখন খুব করে ইচ্ছে করছে, রৌদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলতে,
“ অভিনয়ে আপনি সেরা রেহহহ ডাক্তার সাহেব!!! ”
