সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১১
jannatul firdaus mithila
“ নুপুরের ছন্দে, নাচবে আনন্দে!”
ভ্যাবাচ্যাকা খায় অরিন।হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে থেকে আশ্চর্যান্বিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কিহ?”
রৌদ্রের ঠোঁটের কোণে ঠায় লেগে আছে বাঁকা হাসির রেশ। হাতদুটো সময় নিয়ে পড়ালো নুপুর দুটো। মেয়েটার ফর্সা কোমল পায়ের ত্বকে স্বর্নের নুপুর দুটো কী সুন্দর লাগছে! রৌদ্র ধীরেসুস্থে পাদু’টো খানিক উঁচুতে তুলে।নাকের কাছে পাদু’টো ঠেকিয়ে গভীর নিশ্বাস টানে এক-আধবার। পরক্ষণে অরিনের কোমল পায়ের পিঠে ঠোঁট ছোঁয়ায় আলগোছে। অরিন চোখ বুঁজেছে নিরবতায়।অনুভব করছে ছেলেটার বেপরোয়া পাগলামি। ওদিকে রৌদ্রের সে-কি নিয়ন্ত্রণ আজ! নিজেকে একপ্রকার শক্ত রেখে ছেলেটা ঝুঁকে এলো ধীরে ধীরে। অরিনের বন্ধ চোখের পাতায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মুখ নামিয়ে আনে ঠোঁট বরাবর।মেয়েটার বা-দিকের ঠোঁটের কোণে ঠোঁট চেপে রেখে হাস্কি স্বরে বলে ওঠে,
“ আজ সারারাত নাচাবো তোকে হানি!”
অরিনের নিশ্বাস থমকায়। বুক ফুলে উঠে নিঃশব্দে। রৌদ্র সেসবে তোয়াক্কা করেনি। প্রেয়সীকে দু’হাতে আলগোছে টেনে নেয় বুকের ভাঁজে। অতঃপর দুজনেই মত্ত হয় দু’জনায়।রৌদ্র আজ অধৈর্য্য! দিনকে দিন পাগল হচ্ছে ছেলেটা। একবার প্রেয়সীতে ডুবতে পারলেই হলো! দিন দুনিয়া ভুলে নাজুক মেয়েটার ওপর কর্তৃত্ব চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বেপরোয়া যুবক!
বাইরে বইছে দখিনা হাওয়া। থাই গ্লাসের ওপাশে দেখা যাচ্ছে বাইরের সুইমিংপুলের একাংশ। বদ্ধ কামরার প্রতিটি দেয়ালে গুঁজছে প্রাপ্তির শীৎকার ধ্বনি। মিলনের মহেন্দ্রক্ষন চলছে। অরিনের কন্ঠ ফুঁড়ে কেবল বেরুচ্ছে সুউচ্চ শীৎকার ধ্বনি। ভাগ্যিস রুমটা সাউন্ডপ্রুফ! নাহলে যে এতক্ষণে ইজ্জতের রফাদফা হতো ব্যাপকভাবে।
মাথার ওপর দু’হাত উঁচিয়ে বেঁধে রাখা মেয়েটার।ক্লান্ত চোখদুটো বুঁজে রাখা কোনোরকম। কন্ঠে কেবল চিৎকার। ডাক্তার সাহেবের নামের চিৎকার। এটাই তো চেয়েছিলো ডাক্তার সাহেব! সেই সাথে নুপুরের ছমছম শব্দ! সবকিছু মিলিয়ে রৌদ্র আজ লাগামহীন! প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পেরুতেই অরিনটা কেমন নিস্তেজ হয়ে গেলো! চিৎকার থামিয়ে নিবুনিবু চোখে চক্ষু মুদতেই রৌদ্র থামলো একমুহূর্তের জন্য।তৎক্ষনাৎ অস্থির হাতে মেয়েটার দুগালে আলতো হাতে চাপড় বসিয়ে ডাকলো চাপা স্বরে,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ হানি! হেই হানি। চোখ খোলো। চিৎকার করো প্লিজ।তুমি ছটফট না করলে, আমি ফিল পাই না! হেই.. ঘুমাবেনা বলছি!”
ব্যাথাতুর দৃষ্টিতে তাকায় অরিন। সর্বাঙ্গ জুড়ে অসম্ভব ব্যাথা থাকলেও এমুহূর্তে রৌদ্রের কথা শুনে পেট ফেটে হাসি আসছে তার। লোকটা এতো অধৈর্য্য হলো কবে থেকে শুনি? অরিন ক্লান্ত কন্ঠে কোনমতে বলল,
“ থামুন না! আমার ব্যাথা লাগছে।”
রৌদ্রের গায়ে ধরেনি এহেন বাক্য।সে আলগোছে আরেকটু ঝুঁকে এলো মেয়েটার ওপর। হাত বাড়িয়ে অরিনের হাতদুটো রিবনের গাঁট হতে উম্মুক্ত করে দিয়ে তাকালো মেয়েটার চোখ বরাবর। অরিন চোখ নামায়নি।উল্টো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের পানে। সুদর্শন যুবকের ব্লেডের মত ধারালো চৌকস চোয়ালখানা আপাতত তার খুব কাছে। হুট করে অরিনটার কী হলো কে জানে! তার হাতদুটো কেমন নিশপিশ করতে লাগলো রৌদ্রের গাল ছুঁতে। রৌদ্রের গভীর চাহনি ধীরে ধীরে নিচে নামছে। তার হাতদুটো ইতোমধ্যেই লেপ্টে গিয়েছে মেয়েটার স্পর্শকাতর অঙ্গে। অরিন কাপছে বোধহয় মৃদুমন্দ। নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে হাত উঠিয়ে রাখলো রৌদ্রের চোয়ালে। গালভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতি মিলেছে সেথায়। তা যে বেশ ধারালো। রৌদ্র হঠাৎ মুচকি হাসলো। আলতো করে গাল ছোঁয়ালো অরিনের গালে। মেয়েটার নরম গালে রৌদ্রের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি চুবতেই অরিনটা কেমন হেসে ওঠে নিঃশব্দে। চাপা স্বরে বলে,
“ খোঁচা লাগছে ডাক্তার সাহেব!”
রৌদ্র নিজ কাজে বহাল। মেয়েটার নরম গালে গাল ঘষতে ঘষতে ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে জবাব দেয়,
“ লাগুক!”
অরিন ফের মুচকি হাসলো। রৌদ্রের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ তার সর্বমুখে পাচার হচ্ছে ধীরে ধীরে। অরিন চোখবুঁজে উপভোগ করছে বেশ! অবশেষে মেয়েটার ঠোঁটের কাছে এসে থামলো রৌদ্র। তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় মেয়েটার পানে চেয়ে রইল কিয়তক্ষন। অরিন ধীরেসুস্থে চোখ মেলে।রৌদ্রের গভীর চাহনিতে আটকা পড়ে থমকায় একপল। রৌদ্রের চোখের ভাষায় স্পষ্ট নিরব আহবান। মেয়েটাতে আরেকবার বেভুলার ন্যায় ডুবে যাওয়ার আহবান। অরিন বোকা মেয়ে! রৌদ্রের ওমন দৃষ্টিকে উপেক্ষা করার বদলে গ্রহণ করলো নির্বিঘ্নে!
মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শেষ বস্ত্রবয়ন। বিছানার নরম মেট্রেসের উপর ব্ল্যাঙ্কেট চাপা দিয়ে অসার হয়ে পড়ে আছে বেচারি অরিন। মুখ ঢেকে রেখেছে ব্ল্যাঙ্কেটের নিচে। ওদিকে,অরিনের পায়ের ধারে বিছানার পাশ ঘেঁষে মাটিতে বসে আছে রৌদ্র।ব্যাপক হাঁপাচ্ছে রীতিমতো! যেন খুব বড়সড় একটা যুদ্ধ জয় করে এসেছেন জনাব। কোমরের বেশ খানিকটা নিচে পড়ে রেখেছেন কালো রঙা ট্রাউজারটা।উম্মুক্ত দেহের সর্বত্র ঘামে জবুথবু অবস্থা! মাথার চুলগুলোও কেমন ভিজে নেয়ে একাকার! তার কাঁধের কাছে ঝুলছে অরিনের ফর্সা পদযুগল। রৌদ্র একহাতে একটু একটু করে পানির বোতলে চুমুক বসাচ্ছে। ঢোক গেলার সাথে সাথে যুবকের আকর্ষণীয় এডামস আপেলটার নড়াচড়া বেশ মনোমুগ্ধকর ঠেকছে এমুহূর্তে! যা নিসন্দেহে যে কারো হৃদয় থমকে দিতে সক্ষম হবে এক মুহূর্তেই।
রৌদ্র পুরো এক লিটার পানি ঢকঢক করে গিলে নিলো এক নিমিষে! হাতের খালি বোতলটা মেঝেতে রেখে, আলতো করে ঘাড় বাকিয়ে চাইলো পাশে। অরিনের নুপুর পড়া পাদু’টোর পানে কিয়তক্ষন তাকিয়ে থেকে, মুচকি হাসলো সামান্য। চট করে মেয়েটার পাদু’টো চেপে ধরে ঠেসে বসালো বেশ কয়েকটা চুমু। অরিন টের পেলো কি-না কে জানে! তার তেমন কোনো নড়চড় নেই। রৌদ্র এবার উঠে আসে মেয়েটার দিকে। আলতো করে অরিনের মুখ থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরাতে চাইলেই বাঁধ সাধলো অরিন।টেনে ধরে রাখলো ব্ল্যঙ্কেটটা। রৌদ্র নিঃশব্দে হাসলো।বারকয়েক জোরাজোরি করেও যখন কাজ হলোনা তখনি সাহেব মনে কষালেন এক দুষ্ট বুদ্ধি! বিছানায় উবুড় হয়ে শুয়ে মেয়েটাকে ঝাপটে ধরলো শক্ত করে। দুষ্ট কন্ঠে বলে ওঠে,
“ খিদে পেয়েছে হানি!”
অরিন কাপড় সরালো না মুখের ওপর থেকে। খানিক মোচড়ামুচড়ি চালিয়ে ওমন করেই বলল,
“ তো যান না! গিয়ে খেয়ে আসুন।”
রৌদ্র বাঁকা হাসলো এপর্যায়ে।মেয়েটার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
“ খাবার নিজের কাছে আঁটকে রেখে, আমায় কি-না খেতে বলছো? এ আবার কেমন নির্দয়তা হানি?”
তড়িৎ মুখের ওপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট সরালো অরিন। ভ্রু কুঁচকে হতবাক কন্ঠে বললো,
“ আঁটকে রেখেছি মানে? কই আপনার খাবার?”
রৌদ্র ভ্রু উঁচায়।অরিনের দিকে ইশারা করে দুষ্ট কন্ঠে বলে,
“ তুমিই তো আমার খাবার! উমমম!ডেলিশিয়াস খাবার।”
মুখ কুঁচকায় অরিন। বিরক্তি নিয়ে বলে,
“ কিসব কথাবার্তা! সরুন তো।”
রৌদ্র সরেনি। উল্টো মেয়েটাকে বুকের মাঝে ঠেসে ধরে গলায় আচমকা সুর তুললো দুষ্ট ভঙ্গিতে,
“ বরিশালের লঞ্চে উইঠ্যা লইব কেবিন রুম… বন্ধুরে মোর বুকে লইয়া দিবো একটা ঘুম! হায়রে দিবো একটা ঘুম।”
হতভম্ব অরিন।হাসবে না-কি কাঁদবে তা নিয়েই পড়লো মহাবিপাকে। লোকটার মাথাটা কী সত্যি গেছে? অরিন দু’হাতে রৌদ্রের বুক বরাবর ঠেলতে লাগলেই তার হাতদুটো একত্রে চেপে ধরে রৌদ্র। তড়িৎ মেয়েটার কোমরের ওপর উঠে আসে চোখের পলকে। দুষ্ট হেসে চোখ মেরে বলে ওঠে,
“ আনরোমান্টিক সে*ক্সি লেডি একটা!”
অপমানিত বোধ করলো অরিন।হাতদুটো ছাড়াবার প্রয়াস চালিয়ে নাক ফুলিয়ে বলে,
“ ওকে দ্যান! রোমান্টিক কাউকে খুঁজে নিলেই হয়।হুহ্!”
অভিমানীনির অভিমান দেখে হো হো করে হেসে ওঠে রৌদ্র। একহাতে অরিনের হাতদুটো একত্রে চেপে রেখে একটুখানি ঝুঁকে এলো মেয়েটার ওপর। আরেক হাতে আলতো করে অরিনের গ্রীবা চেপে হাস্কিটোনে বলল,
“ মাই সে*ক্সি লেডি! আই ওয়ান্না বাইট ইউ, আই ওয়ান্না ইট ইউ!উফফ..একদম খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে তোকে। এখন কী করব আমি?”
“ খেয়ে ফেলুন!”
“ সত্যি?”
“ হুহ্!”
কিয়তক্ষন চুপচাপ তাকিয়ে রইলো রৌদ্র। পরক্ষণে বাঁকা হেসে মেয়েটার থুতনিতে দাঁত বসিয়ে বলল,
“ এবার কেঁদেকেটে পাগল হয়ে গেলেও ছাড়বোনা আমি।মাথায় রাখিস!”
শুকনো ঢোক গিললো অরিন। নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা প্রয়াস চালিয়ে খানিকটা উঠতে নিলেই বাঁধ সাধলো রৌদ্র। মেয়েটার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে দুষ্ট কন্ঠে বললো,
“ কই যাও গো?”
ভয়ার্ত ঢোক গিলে অরিনটা বুকে হাত চেপে রাখলো।কাঁপা কাঁপা কন্ঠে থেমে থেমে বলল,
“ না মানে….একটু ওয়াশরুম যাবো আরকি!”
ভ্রু উঁচায় রৌদ্র। ঠোঁট কামড়ে হাসলো একটুখানি। পরমুহূর্তে বলল,
“ সত্যি?”
অরিন পরপর মাথা ঝাকায়। রৌদ্র সামান্য মাথা কাত করলো। পরক্ষণে কিছুটা সরে গিয়ে বলল,
“ যাও তাহলে।”
অরিনটা চটপট বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইলেই সর্বাঙ্গ কেমন কটমট করে উঠে তার! ভাব এমন, এই বুঝি শরীরের হাড়গোড় ভেঙে গুড়িয়ে পড়বে এক্ষুণি। অরিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে পাশ ফিরলো।রৌদ্রকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে তৎক্ষনাৎ নড়েচড়ে বিছানা ছেড়ে নামলো।তবে এবারেও ঘটলো আরেক বিপত্তি! বেচারি নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে অব্ধি থাকতে পারলোনা! তার আগেই পাদু’টো কেমন ধপ করে বসে পড়লো মেঝেতে। রৌদ্র বিছানায় বসেই ঠোঁট কামড়ে নিঃশব্দে হাসছে। অরিন ঠোঁট উল্টে এবার কেঁদেই ফেলবে যেন।মিনিট খানেক যেতেই রৌদ্র নেমে আসে বিছানা থেকে। একহাঁটু গেঁড়ে বসে অরিনের সামনে। ভ্রু উঁচিয়ে দুষ্ট হেসে বলে ওঠে,
“ এটুকুতেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে অব্ধি পারছো না বউজান। সে-ই তুমিই না-কি বাবু নিবে? এখনো অনেক প্রসেসিং বাকি সোনা!কই এসো।দেই একটা বাবু তোমায়!”
আঁতকে উঠল অরিন। তড়িৎ আতঙ্কিত গলায় বলে ওঠে,
“ না না না! লাগবে না আমার বাবু। প্লিজ লাগবেনা।”
ঠোঁট কামড়ে হাসছে রৌদ্র। আলগোছে মেয়েটার কোমরের পেছনে হাত গলিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো সযত্নে। মনে মনে বেশ হাসলেও বাইরে থেকে মুখাবয়ব একদম স্থির তার। সে অরিনকে কোলে নিয়েই ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। মেয়েটার পায়ের নুপুরের পানে চোখ রেখে দুষ্ট গলায় গান গায়,
“ তবু যদি পরাণ বন্ধু আমার পানে চায়..
নুপুর পায়ে রিনিঝিনি নাচবো সারা গা’য়ে.. ”
“ কোথায় তুমি? অরি কই? রাত কতো হয়েছে হিসেব আছে?”
ফোনের ওপাশ থেকে কবির সাহেবের চিরায়ত কর্কশ কন্ঠ ভেসে আসছে। রৌদ্র কানের মাঝে বামহাতের কনিষ্ঠ আঙুল চেপে রেখেছে। ওদিকে কথার জবাব না আসায় কবির সাহেব ফের খেঁকিয়ে ওঠেন,
“ কি হলো? কথা কানে যাচ্ছে না?”
রৌদ্র এবার গলা খাঁকারি দিলো সামান্য। গম্ভীর কন্ঠে প্রতিত্তোরে বললো,
“ হু? কিছু বললে?”
হতবাক কবির সাহেব। ধমকে উঠেন পরমুহূর্তেই,
“ কথা বলছি কানে যাচ্ছে না? মনোযোগ কোথায় থাকে তোমার?”
কাউচের ওপর বসে থাকা রৌদ্র কপাল কুঁচকায়। আগপাছ না ভেবে তক্ষুনি বলে,
“ বউয়ের ওপর!”
স্তম্ভিত কবির সাহেব থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন ঘরের বারান্দায়। ছেলে তাকে কী বললো? সে-কি ভুলে বসেছে, এপাশের ব্যাক্তি তার বাবা! এদিকে রৌদ্রের কোনোদিকে তেমন কোনো খেয়াল নেই। কেননা সম্মুখেই বসে আছে অরিন। গায়ে জড়ানো রৌদ্রের লম্বা শার্ট। রৌদ্র সযত্নে খাবার খাইয়ে দিচ্ছে মেয়েটাকে।রাত তো আর কম হলো না।এইতো, আর মিনিট দশেক পরেই বারোটা বাজলো বলে! রৌদ্র আরেক লোকমা ভাত মাখিয়ে মুখে তুললো মেয়েটার।ওমনি ওপাশ থেকে ভেসে আসে কবির সাহেবের বিরাট ধমক!
“ অসভ্য, বেয়াদব ছেলে! আমি তোমার বেয়াই লাগি? আমার সাথে কথা বলার লেহাজটাও কী পানি দিয়ে গুলিয়ে খেয়েছো তুমি?”
হঠাৎ এহেন ধমকে বেচারার কাঁধের ওপর আঁটকে রাখা আইফোনটা তৎক্ষনাৎ ছিটকে পড়লো মাটিতে। হতবিহ্বলতায় নিজের কিছুক্ষণ পূর্বে করা বোকামিতে দাঁতে জিভ কাটলো তক্ষুনি। যাহ! কিসব ভুলভাল বলে বসেছে সে! রৌদ্র তৎক্ষনাৎ মেঝে থেকে ফোনটা তুললো হাতে।বামহাতে ফোন কানে ঠেকিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
“ ইয়ে মানে..আব্বু সরি।ভুলে …. ”
পুরোটা শোনবার ধৈর্য্য নেই কবির সাহেবের। দিলেন আরেক ধমক!
“ রাখো তোমার সরি।বাসায় আসো খালি…তোমার ঐ গালদুটো যদি চড়িয়ে লাল না করেছি তবে আমিও কবির এহসান নই।”
মুচকি হাসলো রৌদ্র। বাবাকে আরেকটু রাগাতে দুষ্ট ছেলেটা কেমন ইচ্ছে করে বলে ওঠে,
“ আব্বু! নতুন নামটা কী এখনি খুঁজে রাখবো?”
রাগে গজগজ করছেন কবির সাহেব। সাপের ন্যায় ফণা তোলাটাই যেন বাকি এমুহূর্তে। তারওপর ছেলের ওমন খিল্লি উড়ানো দেখে তিনি কেমন দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠেন,
“ একবার বাসায় আসো তুমি। এরপর তোমার একদিন আর আমার যে ক’দিন লাগে আরকি!”
শক্ত আলটিমেটামখানা দিয়েই কল কাটলেন কবির সাহেব। রৌদ্র হাসলো নিরবে। অরিন এতক্ষণ চুপচাপ সবটা দেখে গেলেও এখন বুঝি নিজের কৌতুহল গুলো আর ধরে রাখতে পারছেনা মেয়েটা! সে তৎক্ষনাৎ উৎসুক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ কী বললো বড় আব্বু?”
রৌদ্র ঠোঁট কামড়ে আঙুল দিয়ে কপাল চুলকাচ্ছে।অরিনের কথাখানা শুনতেই বলে ওঠে,
“ তোর শ্বশুর মশাই ক্ষেপেছে আমার ওপর। আল্লাহ-ই জানে বাড়িতে গেলে এবার আমার কী হয়।”
সেকেন্ড খানেক স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো অরিন।পরক্ষণেই মেয়েটা কেমন দিলখোলা হাসিতে ফেটে পড়লো।হাসতে হাসতে কাউচের গায়ে এলিয়ে পড়ছে বারংবার। রৌদ্র ভ্রু গোটায়। সন্দিগ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ এতো হাসির কারণটা কী বউজান?”
অরিনের চোখ ভরে আসছে হাসির তোড়ে। মেয়েটা হাসতে হাসতেই বলে ওঠে,
“ ঠিকই আছে! আপনাকে একটু-আধটু টাইট দেওয়াই উচিত!”
হতবাক রৌদ্র। আপন বউটা এখন কেমন পরের বউয়ের ন্যায় কথা বলছে।এ দিনের জন্যই কী বউটাকে সে পেলেপুষে রাখলো? আহারে! অরিনের কথাটা শুনতেই রৌদ্রের বুকে বুঝি তারকাঁটা বিঁধল। সে কেমন মেকি আর্তনাদ করে বলল,
“ হাহ! হাতি যখন ফাঁদে পড়ে, চামচিকাও লাথি বসায়…তা আবারও প্রমানিত হলো!”
মাথা ধরেছে রুহির। আট মাসের উঁচু পেটটা নিয়ে ইদানিং নড়চড় করাটাও যেন ভারি কষ্টের বিষয়। বেচারি বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে কোনমতে। পিঠের পেছনে বালিশ ঠেকানো এক-দুটো।ওদিকে পাদু’টোতেও পানি এসে ফুলে কলাগাছ! বউ পাগল রেহান সাহেব যত্নের সাথে বউয়ের পায়ে গরম তেল দিয়ে মালিশ করছেন। রুহি স্বস্তি পেয়ে চোখদুটো মুদেছে কোনোরকম। ঠিক তখনি ঘরের দোরে টোকা পড়লো তার। রেহান ঘাড় বাকিয়ে দরজার পানে তাকায় একবার। এতো রাতে হুটহাট কার আগমন ঘটলো তা ভাবতেই আরেকবার টোকা পড়লো বন্ধ দরজার গায়ে। রেহান তৎক্ষনাৎ রুহির পানে তাকায়।মেয়েটা কেমন ভোস-ভোস করে নিশ্বাস ফেলছে।বোধহয় ঘুম এসে ধরা দিয়েছে চোখের পাতায়। রেহান ধীরে সুস্থে মেয়েটার পাদু’টো নিজের কোল থেকে নামিয়ে রাখলো বালিশের ওপর। মাঝরাতে মেয়েটার পাদু’টোয় না-কি ব্যাপক ব্যাথা উঠে। সে-তো রেহানই পুরো রাত জেগে মেয়েটার সেবায় সর্বদা নিয়োজিত থাকে।তবুও যদি মেয়েটা একটু শান্তিতে ঘুমোতে পারে আরকি! বালিশের ওপর পা নামিয়ে রেহান উঠে চলে গেলো রুহির মাথার কাছে। এক’হাত রুহির কোমরের পিছে রেখে, আরেকহাত রাখলো পিঠে।অতঃপর ঘুমন্ত রুহিকে বাচ্চাদের মতো আগলে নিয়ে ঠিকঠাক মতো বিছানায় শুইয়ে দেয় রেহান। গায়ে ছড়িয়ে দেয় পাতলা ব্ল্যাঙ্কেট। মাথার কাছের ল্যাম্প-লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে অবশেষে সে পা বাড়ালো দরজার কাছে। ভীষণ সর্তকতার সাথে দরজা খুলতেই সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধকে দেখে একদফা অবাক হলো রেহান। চমকে উঠে বলল,
“ তুই? এতোরাতে এখানে?”
মুগ্ধ থোড়াই এসবের উত্তর দেয়? সে উল্টো খামচে ধরল রেহানের শার্টের কলার। ছেলেটাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে আনলো রুমের।তৎক্ষনাৎ লম্বা করিডরের আরেকপ্রান্তে এনে দাঁড় করালো রেহানকে। রেহান হকচকিয়ে ওঠে মুগ্ধের এহেন হুটহাট কান্ডে। ছেলেটা কেমন হকচকিয়ে বলে ওঠে,
“ সমস্যা কী ভাই? এভাবে টেনেটুনে আনলি যে?”
মুগ্ধ এবারেও চুপ।একহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রেখে আরেকহাতে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে দক্ষতার সঙ্গে। রেহান একবার আপাদমস্তক চাইলো মুগ্ধের পানে।সুদর্শন যুবকের ব্রাউন কালার করা লম্বা চুলগুলো পেছনের দিকে ঝুঁটি বেঁধে রাখলেও কপালের বেশ খানিকটা ঢেকে আছে এলোমেলো অবাধ্য চুলে। বলিষ্ঠদেহী যুবকের গায়ে জড়ানো অলিভ রঙের একটা কটনের শার্ট। আজকেও মাসেলগুলো বুঝি ফেটেঁ বেরিয়ে আসবে শার্টের আবরন থেকে। রেহানের অবুঝ মনে আজকেও এক অদ্ভুত প্রশ্ন জাগলো।এ ছেলে কী ইচ্ছে করেই এমন শার্ট গায়ে দেয়? যেগুলো পড়লে তার মাসেলগুলো এমন বেরিয়ে আসে? না-কি তার জিম করা বডিটাই একটু বেশি শক্তপোক্ত? রেহান নিজের পানে তাকায় এক ঝলক। আহারে! মুগ্ধের সামনে সে যেন একেবারেই চুনোপুঁটি!
রেহানের ভাবনার মাঝেই মুগ্ধের গম্ভীর কন্ঠ কর্ণকুহরে এসে হানা দিলো। মুগ্ধ ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম্বার দেখিয়ে রেহানকে জিজ্ঞেস করলো,
“ এটা চাশমিসের বাবার নাম্বার না?”
হোঁচট খেলো রেহান! এই চাশমিসটা আবার কে? তার চেনাজানা না-কি? রেহান হতবুদ্ধির ন্যায় মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করে বসে,
“ ভাই বলছিলাম কী..চাশমিসটা কে?”
মুগ্ধ বোধহয় বিরক্ত হলো।এই যে কপালের চামড়ায় বিরক্তির ভাজঁ পড়লো গোটাকয়েক। ছেলেটা গম্ভীর মুখে অনিহা স্বত্বেও বলল,
“ তোর টুইনস শালিকাদের মধ্যে ভীতু যে-ই মেয়েটা। যার চোখ ওপরে উঠেনা কথা বলার সময়। পরপর দুটো কথার মাঝেই নাকের ডগায় আঙুল চালায় যে মেয়েটা। চশমা যার নিত্যসঙ্গী! একগালের চামড়ায় টোল পড়ে সামান্য। কথা বলার সময় যার পাদু’টো সবসময় অস্থির থাকে,সে-ই মেয়েটাই চাশমিস। চিনেছিস এবার?”
হা করে তাকিয়ে আছে রেহান।মাহিকে নিয়ে এতো এতো পর্যবেক্ষণ সে-তো এখন অব্দি করেনি।সেখানে মুগ্ধ মাত্র কয়েকমাসেই এতকিছু কীভাবে জানলো? রেহান হতবাক কন্ঠে আচমকাই বলল,
“ মাহি’র কথা বলছিস?”
মুগ্ধ ভাবলেশহীন। পরপর জবাব দেয়,
“ নাম মনে নেই!”
রেহান আর কথা বাড়ায় না। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে নম্বরটা পরোখ করে বলে ওঠে,
“ হ্যা! এটা তায়েফ আঙ্কেলের নাম্বার। বাট তুই এটা দিয়ে কী করবি?”
মুগ্ধ ভ্রুক্ষেপহীন ভঙ্গিতে ফোনটা পকেটে গুঁজল। রেহানের কাঁধ চাপড়ে বলল,
“ ঘুমাতে যা! রুহি একা আছে।”
রেহান বেশ বুঝলো মুগ্ধ তার কথা এড়িয়ে যেতে চাইছে। সে তৎক্ষনাৎ মুগ্ধকে পেছন থেকে বলে ওঠে,
“ মুগ্ধ!”
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ১০ (২)
মুগ্ধের চলন্ত পা জোড়া থামলো মুহুর্তেই।পেছন থেকে রেহানের অদ্ভুত শান্ত কন্ঠস্বর ভেসে আসে পরক্ষণে,
“ মাহি ইজ ইনোসেন্ট মুগ্ধ! তোর প্রয়োজনে ওকে হাতিয়ার বানাস না। ইট উইল বি আ ক্রিপিয়েস্ট থিংস এভার।”
আচমকাই মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে দেখা মিললো এক রহস্যময় হাসির ছাপ।ছেলেটা পেছনে না ফিরেই সামনের দিকে পা চালিয়ে বলল,
“ এন্ড আই লাভ দেট ক্রিপিয়েস্ট থিংস!”
