Home কালকুঠুরি কালকুঠুরি পর্ব ৬৩

কালকুঠুরি পর্ব ৬৩

কালকুঠুরি পর্ব ৬৩
sumona khatun mollika

আজ ৫ আগস্ট ২০২৪,,
সামির এখনো কোমায়। নাজিয়া হাসপাতালে ছুটে এসেছে। সিভানকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল ওর কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না। সিভান নাজিয়াকে আঘাতপ্রাপ্ত দেখে হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,, “তোমাকে কে মেরেছে? বলো কে মেরেছে, এভাবে কে মেরেছে তোমাকে! “
নাজিয়া সিভানকে শান্ত করে বলল, “ যেই মারুক, তোমার কাকা কোথায়? “
সিভান ইশারা করল কেবিনের দিকে। লিমন এসে জিজ্ঞেস করল “ আপনারে এভাবে কেডা মারছে?, নাজের চাচা?

নাজের সাহেব, নুসরাত আর নাজিয়ার বাবা। নাজিয়া মাথা নাড়াতেই সিভান জিজ্ঞেস করল,, “ তোমার বাপ তোমারে এমনে মারছে? “
কাশেমও খেঁকিয়ে উঠলো, “ মারছে মানে? কেন মারছে? “
“ আমি এখানে আসার জন্য ভাঙচুর করেছিলাম তাই। “ সহজ গলায় নাজিয়ার জবাব।
মাহা নাজিয়াকে আগে কখনো দেখেনি। দেখেনি বললেও ভুল হবে, যখন পরিচয় লুকানো ছিল তখন একবার সিভানের সাথে দেখেছিল। দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখল, যুবতী মেয়ে টাকে এভাবে মেরেছে যে ঠোঁট কেটে রক্ত পরছে। গালে শক্ত হাতের থাবার দাগ পরে আছে। হাতের কব্জির কাছেও কেটে গেছে। বাইরে চরম গোলমাল চলছে। এই মুহূর্তে মোটেও নাজেদ সাহেবের সাথে গন্ডগোল করতে যাওয়া সাজেনা। তার ওপর সামির অনুপস্থিত । মেধা এসেছে। সামহার সঙ্গে দেখা করে মাত্র বের হোলো। বাবা মানা করার পরেও সে গন্ডগোল এর মধ্যে বেরিয়েছে। কাশেমের সাথে কথা বলছিল। এটাও জানালো মেধা আবারো বিদেশ চলে যাবে। দিন দুনিয়া ভুলে কাশেম আবারো বলেছিল,, “এবার অন্তত আর ফিরিয়ে দিওনা শ্যামা । আমার ভেতরটা জ্বইল্লা যায়!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মেধা কোনো জবাব দেয়নি। মেধার বাবা শক্ত কণ্ঠে মানা করেছেন কাশেমের সাথে বিয়ে কিছুতেই সম্ভব না। ও একটা পালতু কুকুর। পদ্মায় ভেসে আসা বিপদ। আসামি বললেও ভুল হবেনা । সামিরকে একা জেলে ভরাতো ভুল হয়েছে । সঙ্গে ওর চেলাগুষ্ঠিকেও নিয়ে যেতে হোতো। এটা মাহার অপরাধ । বাকিদের বিরুদ্ধে প্রমাণ যোগাড় করতে পারে নাই৷
নাজিয়ার মুখে মারপিটের কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে কাশেম তার প্রতিবাদ করে ওঠে। নাজিয়াকে বলে” ভাই একবার আমাকে ভাবির দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিল। তাদের রক্ষা করতে গিয়ে আমাকে বেইমানি করতে হয়েছে। এবার তোমাকে রক্ষা করতে বলে গেছে। তোমার জন্য নাহয় স্বার্থপর হবো। তবুও কাশেম হয়েই। তোমার বাবা কোথায় আছে? “।

নাজিয়া চোখের পানি মুছে বলে, “ জানিনা। বাইরে অনেক মারামারি হচ্ছে । ভার্সিটিতে গোলযোগ লেগেছে , প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছে। পুলিশদের অবস্থা চরম ৷ মারামারি করে ছেলেপেলে একাকার অবস্থা “
কাশেম কথা টা শুনে একটু চিন্তিত হোলো। বাঁচাতে হবে! বাঁচাতে হবে, দলের বেশ কজন ছেলেপেলে আজ ভার্সিটি গিয়েছিল। কাশেমেরো যাওয়ার কথা। কিন্তু সামির আর সামহার জন্য যেতে পারছেনা। ডক্টর জানালো সামিরের কন্ডিশন মোটামুটি উন্নত হচ্ছে । লাইফ রিস্ক নেই।
সামহার সাথে দেখা করতে গেলে সামহা ওকে জড়িয়ে ধরে বলে,,

“ তুমি না ধরলে, আমি মরে যেতাম কাইশসা মামা “
কাইশসা ডাকটা শুনে কাশেমের দুরন্ত মনটা একটু শান্ত হয়। অনেকজন ডেকেছে এই নামে। তবে সামিরের মতো করে ঢেউ তুলে শুধু সামহাই ডাকতে পারে। কাশেম ওকে জড়িয়ে ধরে বলে,,
কাশেমের যেন গলাটা ফেটে কথাগুলো বের হোলো।

“ তোর কিছু হবেনা৷ তুইতো আমার ছোট্ট সোনা, আমার পাকা বুড়ি বল? ভাঙড়ি মামা তোকে খুব ভালোবাসি বাবু! “
“ মামা, আব্বু সুস্থ হয়ে গেলে আমরা আবার তোমার ভাঙড়ি বাড়িতে ফিরে যাব আচ্ছা? “
সামহার কপালে চুমু দিয়ে কাশেম বলল,,
“ আব্বুর রাগ হয়েছে। কাইশসা মামা আর কখনো ফিরে যেতে পারবেনা আব্বুর সাথে”
“ কেনু? “
“ মামা বেইমানি করেছি আব্বুর সাথে। সোনা। দুঃখ দিয়েছি, তাই আব্বু রাগ করেছে “
“ তুমি ফিরে এলে, আমি আব্বুকে বলব রাগ না করতে। কস্ট পেওনা আচ্ছা? “
কাশেম মলিন হেসে বলল” আচ্ছা “।

সেই টুকু ভরসা নিয়ে কাশেম বেরিয়ে যায়। বারবার মেধা আটকাচ্ছিল গন্ডগোল করতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কাশেমের কাছে শোনার সময় নেই। নাজিয়াকে মেধা জিজ্ঞেস করল নুসরাত এবং বাকিরা কবে দেশে ফিরবে। নাজিয়া জানালো “ অতিদ্রুত ফিরে আসবে। আমি জানিয়েছি সামির সিকান্দার এর অবস্থা “
লিমন ব্যাথিত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ছটফটে নাজিয়া মেয়ে টাকে তার সেইপ্রথম দিন থেকে পছন্দ ছিল। কখনো বলে ওঠার সাহস হয়নি। হবে কিভাবে সে স্পষ্ট করে জানে নাজিয়া সামিরকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। সামির বলেছিল দিনশেষে স্বার্থের আঘাতে এও দ্বিতীয় ইনায়া বের হবে। কিন্তু লিমন কখনো বিশ্বাস করেনি। আজো করেনা। ওয়েটিং চেয়ারে বসে সে নাজিয়াকে জিজ্ঞেস করল,,

“ আপা, আপনারে এমনে মারছে কেন? আমারে কন, কাউকে বুইলবোনা। “
“ দয়া দেখাচ্ছেন? নাকি মায়া? “
“ এসব কিছু লয়। জানতে চাইছি। ভাইরে কি জবাব দিমু “
নাজিয়া মুচকি হেসে বলল, “ আমি মরলেও উনার কিছুই আসবে যাবেনা লিমন ভাই। সহজপ্রাপ্য তো! সস্তা মনে হয় ! “
লিমন বলল,, “ নারীর দাম সস্তা হয়না আপা। আপনারে ভাই কুনোদিন ভাবির জায়গা দিতে পারতোনা। কারণটা আমরা জানি। ভাইও তো ভাবির কাছে সহজপ্রাপ্য ছিল। তাই বোধহয় এতসব মারপ্যাচ। আপনারে ভাই কুনোদিনই সস্তা মনে করেনাই। আমরাও করিনি। ভালোবাসা জিনিসটাই এমন। ভালোবাসলে চরম ছ্যাচড়া হওয়া লাগে। “

নাজিয়ার কানে কথা পজিটিভলি পৌছেছে। লিমন একদম ঠিক বলেছে। ভালোবাসলে চরম ছ্যাচড়া হতে হয়। হয়তবা অনেক নিচেও নামতে হয় । নাজিয়া জানেনা ঠিক কতটা নিচে নেমেছে ও। হয়তো অনেক অনেক নিচে। একটা টিস্যু এগিয়ে দিয়ে লিমন ভাবনা ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করল ,
“ কন আপা,, আপনেরে এমনে মারলো কেন? “

নাজিয়া কোন ভূমিকা না করে সরাসরি বলতে শুরু করল “ বাড়িতে অনেক গন্ডগোল করছিলাম। যখন শুনলাম সিভান কাল কুঠুরিতে গিয়েছে আর নিজেকে শান্ত রাখতে পারিনি। সামির একদিন বলেছিল জায়গাটা ভালো নয়। যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখা উচিত লালকুঠির এবং কালকুঠুরির সঙ্গে। সিভানেরতো বাহিরে কেউ ছিলনা। কাশেম ভাইকে করেও ভরসা পাইনি। বড় ভাইকে অনেক করে বললাম আমাকে যেতে দাও অন্তত সিভান এর কাছে পৌঁছাতে দাও। ওকে সঙ্গে নিয়ে আমি আবার বাড়ি ফিরে আসবো। ভাইয়া কিছুতেই রাজি হয়নি। মায়ের পা জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেছি। মা আর ভাইয়ের উপর কোন কথা বলতে পারেনি। ছোট ভাইয়ের থেকে খবর পেলাম সামির সিকান্দার এর গুলি লেগেছে । সিভানও আহত এবং সামহাও। ঘরের ভেতরে যা ছিল সবকিছু দিয়ে দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছি কিন্তু ভাঙতে পারিনি কাচের টুকরো ছুটে গিয়ে বড় ভাইয়ের হাতে লেগেছে বাকিটা আর বলতে পারছি না ।”

লিমন জোরে করে হাফ ছেড়ে বসে রইল। কি করবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না। এতদিন সামির তাকে ইন্সট্রাকশন দিত। তার অনুপস্থিতিতে কাশেম। দুজনের কেউ এখন এখানে উপস্থিত নেই। কিন্তু লিমন নাজিয়ার মুখ থেকে এসব শুনে প্রচন্ড রেগে যায় । নিজে থেকে না গেলেও ফোন দিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছে ৷
মাহবুব উদ্দিন, সেতু আর লামুকে সঙ্গে করে গা ঢাকা দিয়েছে। অজ্ঞাত দলের ছেলেপেলেরা পুলিশ কে দেখলে মারধর করছে।৷ গতকাল রাত বারোটায় পুলিশ লাইনে বোমা মেরেছিল । বেশ কিছু পুলিশ আহত এবং নিহত হয়েছে। লামু সন্তানসম্ভবা । তাকে নিয়ে রিস্ক নেওয়া টা মোটেও ঠিক নয়। মাহবুব উদ্দিন চেয়েছিল, সেতু আর লামুকে একটা সেফ জোনে রেখে আবার ফিরে আসবে। মাহা আর সামহাকে রেখে যেতে চায়নি। মাহা বুঝিয়ে বলেছে,

“ হায়াত মওতের কোনো গ্যারেন্টি নেই। আর
কাল আপনি আর আমি যদি একসঙ্গে মরে যাই, সামহা, সেতু, লামু ওদের কি হবে! আমার দায়ে লামুর বাচ্চাটা অকালে বাবা হারাক আমি চাইনা। আপনি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে বেরিয়ে যান। আল্লাহ রক্ষা করবেন ইনশাআল্লাহ “
তারপরে মাহবুব উদ্দিন ও দিন দুনিয়া ভুলে নিজের বাচ্চার কথা ভেবেছে। সামহার জন্য সিকান্দার রা আছে। কিন্তু লামু আর সেতু? ওদের তো একূল ওকূলের কেও নেই এক মাহাবুব উদ্দিন আর মাহা ছাড়া । তাই আহত হাত নিয়েই মাহবুব উদ্দিন ওদের দুজনকে নিয়ে চলে গেছে রামচন্ডিপুরে সেই পুরোনো সামির সিকান্দার এর নানার বাড়িটায়।
মাহা সামহার সামনে গিয়ে বসে। সামহা অন্য দিকে ফিরে তাকায়। মাহা বলে,,

“ এসব নাটক বন্ধ করে ওষুধ খেয়ে নাও “
“ তুমি খাও। “
“ গাল ফুলিয়ে বসে কেন? “
“ তুমি বলেছিলে, যে অন্য কে কষ্ট দেয় , তাকে কেও পছন্দ করে না, তাই আমিও তোমাকে পছন্দ করছিনা “
মাহা বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,, “ অন্যের ভালো করতে গেল৷ নিজে খারাপ হতে হবে এটা কে জানতো। যাইহোক, খাবারটা শেষ করো৷ তাহলে তোমাকে…. “
“ আব্বুর কাছে নিয়ে যাবে “
“ ঠিকাছে “ দুই মিনিট সময় নিয়ে বলল মাহা।

মেধার সাথে নাজিয়ার অনেকদিন পরে কথা হোলো । সে বেচারিও বাবার জন্য কাশেমকে মেনে নিতে পারছেনা। নাজিয়া সামিরের কেবিনে গিয়ে ওর পাশে বসলো। দুচোখ ভরে দেখলো, সবসময় চঞ্চল আর উগ্র থাকা সামির সিকান্দার ভিরান এখানে চুপচাপ শুয়ে আছে। স্বপ্নে নিশ্চয়ই মাহাকেই দেখছে। আর কেও না জানুক , না বুঝুক। নাজিয়া বোঝে। সবাই সামিরের কালো হৃদয় টা দেখে। তার মধ্যে যে কি পরিমাণেই রক্তক্ষরণ হয়, সেটা কেও দেখেনা। নার্স এসে তার চেহারা আর হাত ড্রেসিং করার জন্য ডেকে নিয়ে গেলো৷

কাশেম ভার্সিটির বাইরে পৌঁছাতেই দেখরো চারপাশে যা নয় তা অবস্থা । এদের মধ্যে এমন কিছুজনও আছে যাদেরকে কাশেম চেনেও না। এতবছর এলাকায় থেকেও চিনতে না পারা টা অস্বাভাবিক। কাশেমের স্মৃতি শক্তি বেশ প্রখর। নাম ধাম না জানলেও চেহারা বেশ মনে থাকে। রকিকে আহত অবস্থায় পরে দেখে কাশেম ছুটে গিয়ে ওকে ধরে বসে। ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখতেই বোঝে, ও আহত নয়, নিহত! রকির সঙ্গে কাশেমের সম্পর্ক ভাই ভাইয়ের মতো। রকির রক্ত হাতে মেখে কাশেম বসে রইল।
কাশেম?

ডাক শুনে পেছনে ফিরতে ফিরতেই কেও একজন মোটা লোহার রড দিয়ে সজোরে আঘাত বসিয়ে দেয়। মুখ থেকে রক্তছুটে পরে ওর । চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে ছেলেটাকে চেনে কাশেম। রুবেল দেওয়ান এর সহযোগী শিহাব নাম সম্ভবত । কাশেম আর কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই শিহাব হিংস্র জানোয়ারের মতো মোটা লোহার রডটা কাশেমের বক্ষে গেঁথে দেয় । রকির লাশের ওপরেই কাশেম নিথর হয়ে যায়। চোখ দিয়ে গাড়িয়ে পরে অশ্রুকণা । আফসোস রয়ে যায় অনেক। সামহাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল চাপাই নবাবগঞ্জের ভাঙা বাড়িটায়। মুগ্ধ হিসেবে মাহাকে আপা বলে ডাকা হোলোনা, মেধাকে শেষ বারের মতো ভালোবাসি বলা হোলোনা। সবচে বড় আফসোস, শেষ বারের মতো কাইশসা হয়ে পালনকর্তা সামির সিকান্দার এর কাছে ক্ষমা চাওয়া হোলোনা।

রাজপথ রাঙা হয়ে গেল কাশেমের লালরাঙা রক্তে! দুচোখ এঁটে একটা অসমাপ্ত জীবন নিয়ে পারি জমালো না ফেরার দেশে। চোখদুটো আর ছটফট করবেনা, শ্যামাকে এক পলক দেখতে। কানদুটো আর মোচড় খাবেনা সামির ভাইয়ের এর হাতে। মাথা টা আর খাটাতে হবেনা সামিরের উল্টোপাল্টা হিসাব মেলাতে। মাথা আর নিচু করতে হবেনা সাফিনের গালি শুনে। ঠোঁট দুটো আর হাসবেনা সামহা টাকে দেখে। ঘাড়টা আর বইবেনা সিভানের বোঝা।

কালকুঠুরি পর্ব ৬২ (২)

চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। চোখদুটো বন্ধ হওয়ার আগে শুধু দেখতে পেল, মেধা আসছে। ওইতো শ্যামা তার অবাধ্য চুলগুলো ছুটিয়ে বাতাসের বেগে দৌড়ে আসছে।

কালকুঠুরি পর্ব ৬৩ (২)