এমপি তামিম সরকার শেষ পর্ব
কায়নাত খান কবিতা
—- যদি সুবহা সে-দিন না ম’রে থাকে তাহলে সে কোথায়? আর রেললাইনে লা’শটা কার ছিলো?’’
একটা ঠান্ডা নীরাবতা বয়ে চলে সরকার বাড়ির হল রুম জুড়ে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবার মাথায় ঘুরছে একটা ধাঁধা। কঠিন ধাঁধা। যদি সুবহার এক্সিডেন্ট না হয়ে থাকে তাহলে কার হলো? আর তামিম তো পুরোটা দেখেছে, তাহলে তার ব্রেনে আঘাত পেলো কীভাবে?
পঞ্চ পান্ডব চুপচাপ বসে থাকে। তাদের চোখে শুধু অপরাধ বোধ। সেদিন যদি তারা ও জীপ থেকে নেমে সামনে যেতো তামিমের সাথে, তাহলে হয়তো এই নরক যন্ত্রণা পেতো হতো না তাদের।
—- পরীরররর। পরীরররর যেয়ো নাহহহহ’’
প্রতিদিনের মতো আবার ও আর্তনাদ ভেসে আসে তামিমের রুম থেকে। পরী দাড়াও, পরী যেয়ো না, প্রতিদিনের আর্তনাদ। পঞ্চ পান্ডব চোখ বন্ধ করে ফেলে। কিন্তু তাদের চোখ থেকে পানি পড়া বন্ধ হয় না। আয়েশা সরকার দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে। দু-বছর অনেক কেঁদেছে সে। কিন্তু আজ যখন সত্যিটা কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তখন আর কেঁদে কী হবে?
তানভীর সরকার উঠে দাড়ায়। দাড়িয়ে তামিমের রুমে যেতে থাকে। তিনি দাঁড়ানোর সাথে সাথে বাকিরা ও দাড়িয়ে পরে। তারা ও তার সাথে তামিমের রুমে যাওয়ার জন্য সামনের দিকে পা বাড়াতেই তানভীর সরকার বলে উঠেন।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—- নাহ। এক পাও সামনে না।’’
—- কর্তা?’’
— আজকে বাপ ছেলের মাঝে কেউ এসো না।’’
তানভীর সরকার চুপি সারে উপরে উঠে যায়। যেহেতু সে জানতে পেরেছে সুবহা ম’রেনি,সেহেতু তামিমের কষ্ট পাওয়াটা বৃথা । গত দু-বছর সব থেকে উন্নত চিকিৎসা করে ও তামিমকে ঠিক করতে পারেননি তানভীর সরকার। এর প্রথম কারণ হচ্ছে তামিমের নিজ থেকে ম’রতে চাওয়া। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে না কাঁদা। তামিম সুবহা মর’রার দিন থেকে কাঁদেনি। যার ফলে সে শোকে পাথর হয়ে গেছে। কথায় আছে অল্প শোকে কাতর এবং অধিক শোকে পাথর। তামিমের বেলাতে ও ঠিক সেটাই হয়েছিল।
অধিক শোকে পাথর হয়ে গেছিলো। গত দু-বছর ধরে সে কাঁদেনি। নিজেকে বন্দী করে রেখে সেই রেললাইনের পথে।
তানভীর সরকার সোজা তামিমের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। আজকে তামিমকে কাঁদাতে হবে। সুবহার এক্সিডেন্ট হওয়া থেকে এই অব্দি, তামিম এক বিন্দু ও চোখের পানি ফেলেনি।সে কাঁদে নি। যার ফলস্বরূপ ব্রেনে চাপ পড়ে মানুষিক ভারসাম্য হারিয়েছে। পুরোপুরি পাগল হয়নি সে। তাই তাকে নিজের কক্ষেই রাখা হয়।
তানভীর সরকার এমন অনেক কিছুই করেছে তামিমকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরাতে। কিন্তু বরাবরই মতোই ফলাফল শূন্য। আজ না হয় শেষ চেষ্টা করা যাক।
তানভীর সরকার গিয়ে সোজা তামিমের পাশে দাড়িয়ে পড়েন, যেখানে সে সুবহার ছবি আঁকতে থাকে।
তানভীর সরকারকে দেখার সাথে সাথে তামিম ছবি আকা বন্ধ করে দেয় ।
—– আব্বা, সে আমারে ভালোবাসে নাই।’’
খুব ক্লান্ত সুরে তানভীর সরকারকে বলে উঠে তামিম।
তানভীর সরকার তার হাত তামিমের দু-গালে রাখেন।
— বাসে।’’
— বাসে না আব্বা । পরী বেইমান। পরী চলে গেছে। পরী বেইমান। পরী চলে গেছে। ‘’
রোজকার ন্যায় তামিম আবার ও ভুলভাল বকতে শুরু করে। তার আব্বাজান যখনই আসে, তখনই তার মুখে একটা কথায় আছে, সে আমারে ভালো বাসে নাই আব্বা, পরী বেইমান। পরী চলে গেছে।।
—- তামিম। আমার দিকে তাকান।
ভদ্র ছেলের মতো তার আব্বা জানের দিকে তাকায় তামিম।
— তামিম কাঁদেন। ‘’
— হুম?’’
— কাঁদেন তামিম।’’
তামিম চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে, সে তো দু-বছর ধরে কাঁদেনি। তাকে বলে ও কাঁদানো যায়নি। এখন কী বললেই কাঁদবে? তাহলে তো এতোদিনে ঠিকই কাঁদতো।
তানভীর সরকার বুঝতে পারে এভাবে কাজ হবে না। অন্য রাস্তা অবলম্বন করতে হবে।
পকেট থেকে রিভল’বার বের করে নিজের মাথায় পয়েন্ট করেন তানভীর সরকার।
— আব্বা…..!’’
— আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি তামিম।’’
— আব্বা নামান ওইটা।’’
— নাহ বাবা। আপনাকে একটু একটু করে কষ্ট পেতে দেখার চাইতে মরে যাওয়া অনেক ভালো। ভালো থাকবেন বাবাজান। ‘’
তানভীর সরকার প্রেস করে দেয় তার রি’ভলবার।
—– আব্বাহহহহহহহহহহ।’’
খুব জোড়ে চিৎকার করে ফ্লোরে বসে পরে তামিম। প্রচন্ড হাঁপাতে থাকে সে। শ্বাস প্রশ্বাস ভারি হয়ে আসে। এক পর্যায়ে না পারতে খুব জোড়ে জোড়ে কাঁদতে থাকে তামিম।
—- আপনি ও আমারে ছাইড়া চইলা গেলেন আব্বাহহহ। আপনি ও বেইমানি করলেন আব্বা।’’
— যায় নি বাবা জান।’’
এক গাল হাসি দিয়ে তামিমের কাছে গিয়ে বসে পরে তানভীর সরকার।
বুকের ভেতর থেকে যেনো পাথর নেমে যায় তামিমের। সে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার আব্বাজানকে।
—- আপনি অনেক খারাপ আব্বা।’’
— i know. .
তামিম তার বাবাকে ধরে খুব জোড়ে জোড়ে কাঁদতে থাকে। এ দু_বছরে সে কাঁদেনি। জমে আছে সব দুঃখ গুলো। তার ভিতরে কষ্ট জমে পাথর হয়ে গেছে। বুকটা বেজায় ভারি। আজ অন্তত হালকা হবে তামিমের শূন্য বুকটা।
—– আব্বা আমার পরী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে আব্বা। আপনি কেন আমার পরীকে দেখে রাখলেন না আব্বা। আমি কি নিয়ে থাকবো আব্বা। কেন ওকে দেখে রাখলেন না আব্বা। কেননননন?’’
—- আপনার পরী আপনাকে ছাড়া কোথাও যায়নি বাবা। সে জীবিত। ‘’
একদম নিঃশচুপ হয়ে তামিম। মুখ দিয়ে আর একটি কথা ও বের হয় না তার। তার পরী জীবিত?
—- আপনার পরী জীবিত তামিম।’’
তামিম তাকায় তার বাবার পানে। তার আব্বা জান কখনো মিথ্যা বলে না। আজকে ও হয়তো বলছে না। তার চোখের চাহুনি বলে দিচ্ছে সে সত্যি বলছে। আজ ও সত্যি বলছে।
যাকে মৃত ভেবে নিজের জীবনটা শেষ করে দিয়েছে তামিম সে জীবিত? চোখের সামনে সব কিছু অন্ধকার লাগে তার। বাবার বুকে ঢলে পড়ে যায় সে।
খুব শক্ত হাতে তামিমকে ধরে তানভীর সরকার। মাথায় হাত বুলাতে থাকে। চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পরে।
—- আমি ভদ্র কী হয়ে গেলাম। পুরো দুনিয়াটাই শয়তান হয়ে গেলো।’’
তামিমকে কাঁধে তুলে নিয়ে হাঁটতে থাকে তানভীর। এই বয়সে ও তামিমের মতো দাগড়া যুবককে এমন ভাবে কাঁধে নিয়ে হাঁটতে তানভীর সরকার, যেনো তুলোর বস্তা তুলছে। হয়তো এই জন্য সরকার ভাই ৯০ দশকের ত্রা”স ছিলো।
নাইজেরিয়ার আদি নিবাসী একটি গ্রাম হলো উকডা গ্রাম। যেখানে দূরদূরান্ত থেকে কোনো লোক ভুলে ও যায় না। শোনা যায় সেখানে ব্লাক টিম থাকে। কিন্তু কয়েকবার তল্লাশি করে ও তাদের হুদিস মেলেনি। এই ব্লাক টিম হলো বর্তমানের আরেক আতঙ্কের নাম। লুকপাট- মানুষের অর্গান পাচার তাদের প্রধান কাজ। আর দিন শেষে মেয়ে লোককে নিলামে তোলা।
দূপুর তখন ২:৩০ মিনিট। খাঁ খাঁ রোদ্দুরে উকডা গ্রামের ঠিক মাঝ বরাবর চেয়ার নিয়ে বসে থাকে ব্লাক লিডার। তার পাশে ছানা পালা। আর ঠিক মাঝ বরাবর পায়ে বেড়ি দিয়ে বসে জীর্ণ শীর্ণ বস্তুে বসে থাকে সুবহা। শরীরে অজস্র দাগ। প্রথম প্রথম যখন তার শরীরে এই দাগ গুলো পড়তো তখন খুবই কষ্ট হতো। কিন্তু এই দুই বছরে সয়ে গেছে।
এমন কোনো অত্যা’চার নেই যেটা তার উপরে করা হয়নি। প্রতিদিন মর’তে চাইতো সে। কিন্তু তাকে মা’রা হয়নি। বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। তানভীর সরকারের পতন দেখার জন্য।
—– তোর জন্য খুব কষ্ট হয়রে ছেরি। তুই বেঁচে আছিস জানার পর ও তোর ভা** আসলো না। শুনছি পাগলা হয়ছে বহু আগে। এর থেকে ভালো আমার বিছানায় যাইতি, সুখে থাকতি।’’
হিংস্র বাঘিনীর মতো তাকায় সুবহা কালুর পানে।এই দু-বছরে তাকে বহু বার তার সাথে শারিরীক সম্পর্ক করার জন্য বলা হয়। কিন্তু সে রাজি হয় না। আর কালুদের প্রধান লিডার কাউকে জোড় করে না বিধায় সুবহা নিজের স্বত্বি ধরে রাখতে পারে। নাহলে এই চিল শকুন দ্বারা কবেই সে…..!
—— হিংসের পিঠে চড়েছি। কুকুরের পিঠে উঠা সম্ভব না।’’
পেট বরাবর খুব জোড়ে লাথি পরে সুবহার। মাটিতে লুটিয়ে পরে সে। চোখ দিয়ে পানি বের হলে ও এখন আর তেমন একটা ব্যাথা অনুভব হয় না।
সুবহা চোখ বন্ধ করে সেই অভিশপ্ত দিনের কথা ভাবে। যেদিন সে রেললাইনে ছিলো। ট্টেনটি এসেছিলো ঠিকই, কিন্তু তার আগেই সুবহার হাতে টান পড়ে। তার পরিবর্তনে ফেলা দেয়া হয় তারই বয়সি একটি মেয়ের লা’শকে। মেয়েটার পড়নে ও ছিলো সি-গ্রীন শাড়ি। ট্রেন আসার আগ মুহুর্তে তামিম মাটিতে পরে যায়। পরে যায় না, তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়। তারপর শুরু হয় খেলা।
পুরোটা এতোটাই সুক্ষ্ম পরিকল্পনা ছিলো যে, কেউ টের ও পাইনি সব পরিকল্পিত।
সুবহা তামিমের কাছে যাওয়ার আগেই তাকে অজ্ঞান করা হয়। তারপর আর কিছু মনে নেই।
——- এতো মাইর খাস, তাও তেজ কমে না।’’
দাঁতে দাঁত পিষতে থাকে কালু। পরক্ষণে আবার ও নিজের রাগ কন্ট্রোল করে ফেলেসে।
আজ তার বড়ই আনন্দের দিন। তানভীর সরকারকে বাঘে পাবে। এতোদিনের পরিল্পনা, তিলে তিলে করা সুক্ষ পরিকল্পনার ফল আজ পাবে সে। তানভীর সরকার তার পা ধরবে। ভাবতেই শরীরের লোম গুলি দাড়িয়ে যাচ্ছে আনন্দে। ৩০ বছরের পূরানো বদলা আজ নিবে সে। আনন্দের কী শেষ আছে।
বার বার ঘড়ির কাটা দেখছে আর অধৈর্য হয়ে পড়ছে সে। সবাইকে ফোনের ক্যামেরা অন রাখতে বলে।তানভীর সরকার আসবে তার পা ধরবে সেটার ফুল ভিডিও রেকর্ড হবে। আহ কী শান্তি। দূরবীক্ষণ দিয়ে বার বার দেখছে কোনো গাড়ি দেখা যাচ্ছে কি-না।
কয়েক মূহূর্তের ব্যবধানে রাস্তা কাঁপিয়ে একটি হোন্ডা আসতে থাকে তাদের পানে। দূরবীক্ষণ দিয়ে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে কালু। হোন্ডাটি দেখেই চিনে ফেলে,( CB400SF) সরকার ভাইয়ের স্পেশাল হোন্ডা। ৯০ দশকের এই হোন্ডা অনেক কিছুর স্বাক্ষী। কিন্তু এটা তো সরকার ভাই পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। তাহলে আসলো কীভাবে? কপালে কিঞ্চিৎ পরিমাণের ভাজ পরলে ও পরক্ষণেই কালুর মুখে হাসি ফুটে উঠে। কারণ তানভীর সরকার আজ একা। সে একাই আসছে।
প্রায় দু-বছর পর তানভীর সরকারের ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে ভিডিও যায়। সুবহার সাথে হওয়া নির্যা’তনের ভিডিও। পুরো প্রশাসন কাজে লাগিয়ে ও নাম্বার ওয়ালা ব্যক্তিটি কে তার সঠিক হুদিস পাইনি তানভীর সরকার। সুবহা বেঁচে আছে জেনে ও যখন তাকে তামিমের কাছে আনতে পারছে না বলে নিজেকে এক অসহায় পিতার মতো লাগছিলো নিজের কাছে। ঠিক তখনই তার কাছে আসে সুবর্ণ সুযোগ। ভিডিও প্রেরণা দাতা ব্যক্তি তার সাথে দেখা করতে চায়৷ কিন্তু শর্ত একটাই। তাকে একা নাইজেরিয়া আসতে হবে। যদি উপর মহলে খবর যায়, তাহলে ভিডিও প্রেরণ দাতা ব্যক্তি নিজে ফাঁসবে ঠিকই, কিন্তু সুবহা আর জীবিত থাকবে না। অর্থাৎ তীরে এসে তরী ডুববে।
তার উপরে সরকার বাড়ির সর্বক্ষণের খবর তাদের কাছে যাচ্ছে। অর্থাৎ কেউ তো আপন জন ছিলো এর মাঝে।তানভীর সরকার বিনা বাক্যে রাজি হয়ে যায়। সে আসবে এবং একাই আসবে।
হোন্ডাটি একদম কালুর ঢেরার কাছে গিয়ে থামে। কালু উঠে দাড়ায়। সেই এক স্টাইল, এক ধরন। কিছু মানুষের বয়স হলে ও তাদের ব্যক্তিত্বের কোনো পরিবর্তন হয় না, এটার সব থেকে বড় উদাহরণ তানভীর সরকার নিজেই।
——- আরেহহহহ। দেখো দেখো কেডা আইছে, ৯০ দশকের আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্যা গ্রেট, মাফি:য়াদের গড ফাদার। সরকার ভাইইইই। ওহহ সরি। বুড়ো প্রধান মন্ত্রী। পাগল ছেলের অসহায় বাপ। তানভীর সরকার।’’
খুব উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে কালু। উপস্থিত লোকেরা দুই তিনজন ছাড়া কেউ বাংলা বোঝে না। তাই তাদের ছাড়া বাকিরা চুপই রইলো।
—– আরেহহহ, সরকার ভাই, আসেন, আসেন। বসেন। চা, পানি কিছু দেই?’’
তানভীর সরকার কিছু না বলে চুপচাপ এসে চেয়ার টেনে নিয়ে পায়ের উপরে পা তুলে বসে পরে। চোখ থেকে কালো চশমা খানা খুলে ফুঁ দিয়ে আবার ও পরে ফেলে।
—— স্বভাব যায় না মূলে।’’
তানভীর সরকারের এতো ভাব হীন কথাবার্তা কালুর খুব একটা পছন্দ হয় না। কথা ছিলো তানভীর সরকার এসে তার পা ধরবে। কিন্তু তা না করে চেয়ার টেনে নিয়ে তাঁকেই চোখ রাঙ্গাচ্ছে।গর্জে উঠে কালু। লাথি দিয়ে সামনের একটি চেয়ার ফেলে দেয়।
—– এটা আমার এলাকা তানভীর। তোর না। শরীরের চামড়া ঝুইলা গেছে, মাগার তেজ কমে নাই দেখি।’’
—–কু’ত্তা যেই এলাকাই যায়, সে এলাকাতেই নিজেকে রাজা মনে করে।’’
—-তানভীররররররর।’’
—- চেঁচা আরো চেঁচা, ভালোই লাগে।অনেক দিন পর কু’ত্তার আওয়াজ শুনলাম।’’
—– এই তানভীরররর। এইইই। তুই কারে কু’ত্তা কস হে? কারেহহহহ? জীবনের ভয় নাই? তোর পোলারে তো পাগলা করছি, আর পুতের বইরে।’’
সুবহার পানে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে খুব জোরে জোরে হাসতে থাকে কালু। জীর্ণ শীর্ণ বস্তু খানা দিয়ে নিজের শরীর ঢাকতে থাকে সুবহা। তার শরীরের দাগ গুলো বলে দিচ্ছে কতটা অমানবিক নির্যাতনের শিকার সে। একটা এতিম মানুষকে কেউ এভাবে অত্যাচার করে। বুকটা কেঁপে তানভীর সরকারের। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার।ঘাড়ের রগ গুলো যেনো এখনই ছিড়ে আসবে বলে।
হাতের ব্রেসলেট ঠিক করতে করতে উঠে দাড়ায় তানভীর সরকার।
—– তোর মায়ের জন্য বড় আফসোস হয় রে কালু্ পয়দা তো করলো, কিন্তু মানুষের জায়গায় কু’ত্তা।’’
—- তানভ….।’’
সম্পূর্ণ কথাটি শেষ করার আগেই খুব জোরে লা’থির আঘাতে মাটিতে ছিটকে পরে কালু, ওরফে কালা মাস্তা’ন। মাটিতে পরে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃস্তব্ধ হয়ে যায় কালু। এটা কী হলো তার সাথে? জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে কালু। এক ঝটকায় উঠে বসে পরে।
—— ওরে শা’লা। তুই আমার এলাকায় আইসা আমরাই ঢোল বাজাইলি।’’
——- অনেক দিন তবলা বাজাই না। তোরে দেখেই বাজাইতে মন চাইলো।’’
—— তুই বাজাবি আর আমি বাজমু? এই ওরে ধর।’’
নিজের লোকদের নির্দেশনা দিয়ে চুপচাপ মাটিতে বসে থাকে কালু। কিন্তু আফসোস!!!! তার নির্দেশ মতো কেউ সামনে এগিয়ে আসলো না। কালু এদিক ওদিক তাকিয়ে তার লোকদের দেখতে থাকে।
—– কেউ নড়লো না? আহ কষ্ট।’’
কালু উঠে শরীররে লেগে থাকা বালি পরিষ্কার করতে থাকে। সে বুঝে গেছে যা বোঝার ।
—– সরকার ভাই। বয়স হলে ও মানুষ টা ঠিকই হা’রামি আছেন।’’
— স্বভাব পাল্টাইছি জাত না। জাত এখনো হারা’মিই আছে।’’
—– জানতাম। আপনি লোক ভালা না। তার উপরে আন্ডারওয়ার্ল্ড চলতো আপনার কথায়, এতো সহজে যে হার মানবেন না এটা আমি জানতাম। নিয়ে আয় রেহহহহ।’’
কালু ডাকার সাথে সাথে কালো পোশাক ধারি কিছু লোক মাথায় রিভল’বার ঠেকিয়ে পাঁচ জন লোককে নিয়ে আসে। তানভীর সরকার শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তাদের পানে। আজ প্রায় ৩০ বছর পর নিজের সঙ্গীদের সাথে দেখা হলো তানভীর সরকারের।
—- আহারে। বুড়া তানভীরের কি কষ্ট। ৩০ বছর পর ৬ বুড়ার রিইউনিয়ন হলো, কিন্তু কেউ কারো কাছে যায় তে পারলো না। সব একসাথে মরবো।’’
তানভীর সরকার কিছু না বলে চুপচাপ আবার ও চেয়ারে বসে পরে।
—– আমি জানতাম তুই এই পোশা কু’ত্তা গুলারে কিনবি তানভীর, তাই আগে থেকেই সব প্ল্যান করে রাখছিলাম। আয় জলদি আয়, পা ধর।’’
তানভীর সরকার তখন ও চুপচাপ বসে থাকে। কপাল কুঁচকে তাকায় কালু তার পানে।
—- কী-রে বুড়া? কথা কানে যায় না? জলদি আয় পা ধর। না-হলে তোর সঙ্গীরা গেলো।’’
খুব উচ্চস্বরে হাসির শব্দ ভেসে আসে পিছন থেকে। তানভীরের পঞ্চ পান্ডব একসাথে হাসতে থাকে। কালু কপাল কুঁচকে তাকায় তাদের পানে।
—– বড় ভাই, আমি বোকা’চো*** হয়ে গেলাম। এই ফকিন্নির পুত নাকি আমাগো ধরছে।’’
—- মরছে? কেডা মরছে নবাব? কখন মরলো? আমরা তো কাউরে মারি নাই এখনো।’’
—– মরছে না বইয়ার বাচ্চা, ধরছে, ধরছেএএএএএএএএএ।’’
—– ইফ কানা। আস্তে চিল্লা, আমার কান যাইবো গা।’’
—- হেতির আবার কান। পাঁচ কইলে পঞ্চাশ বুঝে।’’
—– চুপ কর কাইল্লা চো’রা। বড় ভাই। ভাই আসসালামু আলাইকুম। ‘’
তানভীর উঠে চোখের ইশারা করে সকলের সালাম নেয়।
——– তো কালু। তুই যেনো কি বলতা ছিলি? ‘’
কালু কিছু না বলে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে। সে যে বিপদের সব থেকে কঠিন দড়জায় দাড়িয়ে সেটা এতোক্ষণে ভালোই বুঝতে পেরেছে। যারা এই ৩০ বছর গা ঢাকা দিয়ে ছিলো হঠাৎ করে তাদের খুঁজে পেয়ে বন্দী করার আনন্দে কালু এটা ভুলেই গেছিলো, তাদের সন্ধান কীভাবে পেলো? আর এতো বছর পরই কেন? যখন সুবহা তার কাছে বন্দী।উপস্থিত সকলে যে তানভীর সরকারের লোক এটা কালু বুঝে যায় । তাই আগ না বাড়িয়ে দৌড়ে সুবহার কাছে গিয়ে তার মাথায় রিভল’বার পয়েন্ট করে।
——— আমি তো মরমু, কিন্তু তোর পুতের প্রাণ ভোমরারে নিয়া মরমু। এখন তো পাগল, পরে পুরা পাগল হইবো।’’
—- যেদিন তামিম জন্ম নেয়, আমি ওয়াদা করছিলাম, এই ছেলের জন্য নিজের হাত পরিষ্কার রাখবো, সব কিছু থেকে দূরে থাকবো। আমি ভুলে ও একটা গা’লি ও দেই নাই তামিমের সামনে। সব সময় তাকে বুকে আগলে রাখছি। যেখানে মায়েরা রাত জাগতো নবজাতক সন্তান নিয়ে, সেখানে আমি রাত জাগতাম। একদম বুকের সাথে মিশে রাখতাম আমার তামিমরে। তার ছোটো বেলা থেকে বড় বেলা সব আমার মুখস্থ ।’’
তানভীর সরকার উঠে দাড়ায়। কালুর দিকে তাকায়। রিভল’বার টি এখনো সুবহার মাথায় তাক করা।
—– আমার তামিম আমার জান। সেই পোলারে তোরা কি করলি কু’ত্তার বাচ্চাআআআআআআআআআআ।’’
পকেট থেকে রিভল’বার বের করে কালুর পায়ে গু’লি মা’রে তানভীর সরকার। হিংস্র বাঘের মতো ছুটে আসে কালুর পানে। এসেই তাকে ইচ্ছে মতো লা’থি মা’রতে থাকে ।
——– আমার ছেলেটা তো ছোটো ছিলো, তোরা কীভাবে পারলি তারে জে”লে টরচর করতে?এই জানো”য়ারের বাচ্চা, এই। তোরা কী করে পারছিলি।
তানভীর সরকারের ক্রোধ আরো বাড়তে থাকে। তাকে এমন হিংস্র রুপে দেখে প্রচন্ড ভয় পেতে থাকে সুবহা। এমন রূপ তো তানভীর সরকারের তারা দেখেনি।
—— দুই দিন তোরা আমার পোলরা পানি দেস নাই। কষ্ট হয় নাই ওর? কীরে কথা বল? কষ্ট হয় নাই? আমার আয়েশা তো পবিত্র। তার শাড়ি খুলতে বিবেকে বাঁধে নাই। আমার তাসকিন। তার কি দোষ ছিলো? তারে দুই টু’করা ক্যান করলি? কিরে? আমার পোলার লাগে নাই? তুই কেমনে আমার পোলারে মার’ছিলিললললললল?’’
মাটিতে পরে থাকা চেয়ার উঠিয়ে কালুর শরীররে জোরে জোরে আঘা’ত করতে থাকে তানভীর সরকার । তার রাগের পারদ যেনো ফেটে পরছিলো।
—— আমার তাসকিন, কত কষ্ট নিয়া মরলো, তার মাথায় কেটে দিয়েছিলি তোরা, একটু ভাবলি না পিচ্চি পোলার কত কষ্ট হবে৷ আমার তামিম তো কিশোর ছিলো। কীভাবে পারলি তারে মার:তে? আমার ছেলের শরীরের দাগ গুলো স্পষ্ট ছিলো। কত কষ্ট দিছোস তারে তোরা। পানি ও তো দেস নাই। মুত দিছিলি আমার পোলারে খাইতে? কু’ত্তার বাচ্চা, তোরে কাট’লে ও তো আমার রা’গ কমবো না রে। ৩০ টা বছর ধরে তোরে খুজতাছি আমি। ৩০ টা বছরররর। আজকে প্রধানমন্ত্রী তানভীর সরকার না। তামিম সরকারের বাপ তানভীর সরকার তোর সামনে। আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গড ফাদার তানভীর সরকার তোর সামনে। এতো সহজ মৃত্যু তো তোর হবে না।’’
আধ ম’রা কালুর পানে তাকায় তানভীর সরকার। তারপর হাত সামনে বাড়ায়।
—— নবাবহহহ?’’
—— বড় ভাই।’’
— রাম’দা দেহহহহ।’’
তানভীর সরকার একবার তার হাতে থাকা রাম’দার পানে তাকায় তো আরেক বার মাটিতে পরে থাকা কালুর পানে।
— ৩০ টা বছর ও র’ক্ততে ভেজে নাই।’’
তানভীর সরকার তার হাতে থাকা রাম’দাতে চু’মু খায়। তারপর কালুর পা বড়াবড় মা’রে। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে কালু। তারপর তার একটা হাতে কো’প মা’রে।
—— জাম্বু?’’
—- বড় ভাই?’’
—– ওটারে সমুদ্রে ফেলার ব্যবস্থা কর। কাটা হাত আর কাটা পা নিয়ে সাঁতার কাটতে মজা পাইবো।’’
—– আগ্গে বড় ভাই।’’
কালু প্রচন্ড চিৎকার চেচামেচি করতে থাকে।কিন্তু কোনো লাভ হয় না। কারণ তানভীর সরকারের ডিকশিনারিতে মাফ বলতে কোনো শব্দ নেই।
—– বড় ভাই। এইডা কী ভাতিজা বউ?’’।।।
তানভীর সরকার তড়িৎ গতিতে তাকায় সুবহার পানে। কী করুন অবস্থা করেছে তার। চোখ দিয়ে আপনাআপনি পানি বেরিয়ে পরে। শরীরে এমন কোনো স্থান নেই যেখানে দাগের চিহ্ন নেই। তানভীর সরকারের চোখে পানি দেখে নবাব বুঝতে পারে এটাই তাদের ভাতিজার বউ। নিজের গলার গামছা খুলে সুবহার শরীরে দিয়ে দেয়।
—– ভাতিজা বউ কিছু মনে কইরো না। আমরা কিন্তু মানুষ ভালা।’’
সুবহা কিছু না বলে চুপচাপ থাকে। তারা যে কতটা ভালো মানুষ এটার নমুনা তো দেখলোই সুবহা।
তানভীর সরকার এসে সুবহার সামনে বসে পরে।
—- বাবা।’’
সুবহার মাথা নিজের বুকে হালকা করে ধরে তানভীর সরকার । চোখ দিয়ে অনবরত পানি পরতেই থাকে।
—— যেদিন তামিম বললো সে তোকে পছন্দ করে, আমি সেদিন থেকেই তোকে নিজের মেয়ে মনে করেছিলাম। আজ আমার জন্য এতো কষ্ট পেতে হলো তোকে। বাবা অনেক খারাপ মানুষ মা। পারলে মাফ করিস।’’
—- বাবারা কখনো খারাপ হয় না।’’
—- ভাতিজা একটা সেই মাইয়া বিয়া করছে রে। একদম লক্ষী। ভাতিজা বউ। আমি ও তোমার আব্বার বয়সি, কিছু মনে কইরো না, একটা কথা জিগায়। তোমারে কি বাজে ভাবে ছুইছে কেউ? আমারে কও ভইরা দিয়া আসতাছি।’’
সুবহা মাথা নেড়ে না বোঝায়। তাকে কেউ বাজে ভাবে ছুইনি।
—– শুধু গায়ে হাত তুলতো ওরা।’’
— ওরা? আর কেডা।’’
সুবহা কিছু না বলে চুপচাপ মাটির পানে তাকিয়ে থাকে। তানভীর সরকার বুঝতে পারে শত্রু তার ঘরেই আছে। না-হলে এখন সুবহার ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
—- তোমার তামিম ঠিক আছে মা।’’
সুবহা তাকায় তানভীর সরকারের পানে। হয়তো তানভীর সরকার বুঝে গেছে তার নিরবতা
—– ফুফিরা বাবা। উনারা প্রায় আসতো আর…!’’
তানভীর সরকারের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। তার ঘরের মাঝেই ছিলো শত্রুরা।
—- বড় ভাই, এই দুই কাল নাগিনী এখন ও পিছা ছাড়লো না আপনার।’’
—- আমি তো মেয়ে মানুষের গায়ে হাত তুলি নারে নবাব।’’
—- সমস্যা নাই বড় ভাই, ব্যবস্থা হয়ে যাইবো। আপনে মা জননীরে নিয়া চলেন। তার চিকিৎসা দরকার।’’
‘’আরশি নগর’’
সুবহাকে দেশে এনেছে আজ দশ দিন হলো।তামিম যেই হসপিটালে রয়েছে সুবহা ও সেই একই হসপিটালে রয়েছে, দু-জনের অবস্থা অত্যান্ত মর্মান্তিক হওয়ায় তাদের দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তামিম তো এটাই জানে না, সুবহা তার খুব কাছে রয়েছে। মানুষিক চাপ দেওয়া যাবে না তাকে। তার উপরে সুবহার অবস্থা ও ঠিক নেই । তাই তাদের আলাদা রাখা হয়।
কিন্তু আজ দু-জনেই যখন মোটামুটি সুস্থ, তানভীর সরকার ঠিক করেন তাদের দেখা করাবেন। আর দূরে রাখা ঠিক হবে না।
সুবহা একটা লাল ড্রেস পরে তামিমের কেবিনে। আসে। সাথে পঞ্চ পান্ডব, তানভীর সরকার এবং আয়েশা সরকার ও। তামিমের চোখ তখন ও বন্ধ। সে যেহেতু মোটামুটি সুস্থ তাকে সুবহার কথা আজ বলাই যায়। তার থেকে বরং তার সাথে দেখা করানোই ভালো।
সুবহা এসে চুপচাপ তামিমের সামনে বসে।তার হাত ধরে।
সুবহা হাত ধরতেই তামিম চোখ তুলে তাকায় তার পানে।
সুবহার দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে ফেলে তামিম। এক ঝাটকায় হাত সরিয়ে ফেলে।
—- এই ছেমরি কে আব্বা? বেসরমের মতো হাত ধরছে।’’
তামিমের কথা শুনে সকলে আকাশ থেকে পরে।তাহলে কী তামিম ভুলে গেলো তার সকালকে?
সুবহা উঠে দাড়ায়। তার শয়তান সরকার তাকে চিনতে পারছে না?
—- আপনি চিনতে পারছেন না তামিম তাকে?’’
— নাহ আব্বা। ‘’
সকলে বুঝে যায় তামিম ভুলে গেছে তার সকালকে। এতো কষ্ট, কত দূরত্ব, সব পেরিয়ে এসে শেষে তাকে চিনতেই পারছে না তামিম।
সুবহা তামিমের মুখ বরাবর দাড়ায়।
—- আপনি সত্যি আমাকে চিনতে পারছে না?’’
—- নাহ।’’
সুবহা কিছু না বলে পাশ থেকে কাচের বোতল তুলে নিয়ে তামিমের মাথায় বা’রি মা’রে।
— আহহহহহ।’’
—- এবার মনে পড়লো আমি কে?’’
— হুম।’’
— কে আমি?’’
— বউ!”
— কার বউ?’’
— আমার।’’
গটগট করে সুবহা বেরিয়ে আসে কেবিন থেকে।
—- কিছু কইলেই মারে।’’
উপস্থিত সকলে খুব উচ্চস্বরে হেঁসে উঠে। ঠিক দু-বছর আগের পূরনো তামিম সুবহা।
বৃষ্টি স্নিগ্ধ রাতে খালি রাস্তায় গটগট করে হাঁটতে থাকতে সুবহা। বৃষ্টিতে ভিজে পুরো একাকার। রাগে তামিমের গুষ্টি উদ্ধার করতে সুবহা। এতোদিন দূরে ছিলো কোথায় তামিম তাকে জড়িয়ে ধরবে। তা নয়, উল্টো তাকে চিনতে পারলো না।
হাঁটতে হাঁটতে সুবহা লক্ষ্য করে তার পিছনে আরো কিছু পায়ের কদম শোনা যাচ্ছে। সুবহা জানে এগুলো কারা। তাই পাত্তা না দিয়ে হাঁটতে থাকে। পরক্ষণেই হালকা মিউজিক বেজে ওঠে। আর তামিম সুবহার পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। তামিমকে দেখা মাত্র সুবহা হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু কি লাভ। তামিম তো তামিমই, নোবেল প্রাপ্ত বেহায়া স্বামী।
— আমি প্রেমিক।’’
– হ্যাঁ?’’
— আমি কবি।’’
— কবে হলেন?’’
— তুমি সিরিয়াস মেয়ে বেজায় রাগি।’’
— ভালো তো।’’
—- আমি বি’ড়ি খোর।’’
—- সবাই জানে।’’
— আমি আড্ডাবাজ।’’
— এ আর নতুন কী?’’
— পড়াশোনা তোমার কাজ।’’
—- করতে দিয়েছেন?’’
—- তোমার প্রিয় বিড়াল ছানা।’’
— নিয়া তো দেননি। ‘’
—- আমার প্রিয় কুকুর।’’
—- জ্বী স্বভাবের সাথে মিল রয়েছে। ‘’
—– তোমার প্রিয় পাহাড়ি ঝর্ণা। ‘’
—- নিয়ে তো যাননি। ‘’
—- আমার প্রিয় পুকুর। ‘’
— ডুবে মরুন।’’
—- গোলাপ ফুলের জায়গায় আমি, দিলাম তোমায় জবা।’’
—- কোথায়?’’
—- বল তুমি এইবার কি আমার প্রেমিকা হবা?’’
—- গোপাল ফুলের জায়গায়, জবা কেন? সূর্য মূখী দিলে ও আপনার প্রেমিকা হবো না আর।’’
সুবহা আবার ও রাগ করে চলে যেতে থাকে, তামিম আর এক সেকেন্ড ও দেরি না করে সুবহার হাত শক্ত করে ধরে সামনে দাড়ায় করায়। বৃষ্টিতে তামিম সুবহা ভিজে একাকার। পরক্ষণেই তামিম তার জ্যাকেট খুলে সুবহার মাথায় ধরে। খানিকটা আশিকি ২ মুভির সিনের মতো। বৃষ্টিতে জ্যাকেট মাথায় ধরে তামিম সুবহা ভিতরে।
—- ভালো বাসি সকাল।’’
সুবহা আর কথা না বাড়িয়ে তামিমকে জড়িয়ে ধরে। দুটি বছর তারা একে অপরের থেকে দূরে ছিলো। তামিম ও জড়িয়ে ধরে সুবহাকে।
—- তামিম।’’
— জ্বি পরী?’’
— আপনি আমাকে কেন খুঁজে বের করলেন না?’’
—- ব্রেন আউট হয়ে গেছিলো সোনা। তুমি নাই ব্রেন ও নাই।’’
— ওটা এমনিতে ও ছিলো না।’’
—- শয়তান ছেমরি। ‘’
— শয়তান সরকার। ‘’
তামিম সুবহাকে ছেড়ে এদিক ওদিক দেখতে থাকে।
— আমি তো এখানে চিপা গলি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছি না সুবহা’’
— আপনি কী অন্য কিছু খুঁজছেন?’’
তামিম খপ করে সুবহার হাত ধরে ফেলে।
—- আয় চিপায় যায়। ‘’
— কিহহহ?’’
— আয় জলদি।’’
— আরেহহহ। আমার হাত ছাড়েন ভাই।’’
— এমন করিস না বইন। আমার আর তর সইতাছে না’’
—– আপনি আমার হাত ছাড়েন ভাই। ‘’
— স্বামী ডাকলে যেতে হয়।’’
— তাই বলে চিপায়।’’
— আয় জলদি।’’
— আপনি আমার হাত ছাড়েন।’’
তামিম সুবহা পানির মধ্যে দাড়িয়ে একজন আরেকজনের হাত ধরে টানাটানি করতে থাকে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কিন্ডারগার্টেনে পড়া ছেলে মেয়ে। বাকিরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে হাসতে থাকে। এরা যে কোনো দিন ও মানুষ হবে না বার বার প্রমাণিত হয়।
‘’ ১৬ বছর পর’’
—- এক থাপ্পড়ে তোর ৬৪ টা দাঁত ফেলে দিবো।’’
— কিন্তু আম্মা দাঁত তো ৩২ টা হয়।’’
— আমি জানতাম তুই এর মাঝে কথা বলবি। তাই তোর তা ও ধরে রাখছি।’’
তূর্য আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ কান ধরে দাড়িয়ে থাকে। পাশে তার ছোটো বোন স্নিগ্ধা। আর পিছনে তাদের চ্যালাপেলা।
—- আব্বাজান কীভাবে এতো ডেঞ্জারাস মহিলা বিয়া করলো।’’
— কীরে কি বললি তুই?’’
— কিছু না আম্মা।
—–মাত্র শুনলাম।’’
— এইভাবে আপনি প্রধানমন্ত্রীর ছেলেকে কান ধরে দাড় করাইয়া রাখছেন, আমার আব্বা জানের তো ইজ্জত আছে আম্মা। ‘’
— সেটা মা’রামারি করার আগে মনে ছিলো না? আজকে তোর আব্বা জান আসুক।’’
—- অনেক ক্ষণ আগেই আসছে।’’
তূর্য ইশারা করে দেখায় তার পিছনে তামিম এবং তানভীর সরকার দাড়ানো। সুবহা পিছনে ঘুরেই হাতে থাকা বেলুনটি সার্ভেন্টদের দিয়ে দেয়,
—- কি ব্যাপার গিন্নি? এতো রেগে আছেন কেন?’’
—- সেটা আপনার ছেলেকে বোঝান তামিম। দুই দিন পর পর ওর মারা মারির খবর আসে। এভাবে আর কত? বড় হচ্ছে তো।’’
তামিম এসে সুবহার সামনে দাড়ায়। তার কপালে থাকা চুল গুলো সরিয়ে ফেলে।
—- আমি বোঝাচ্ছি। আপনি চিন্তা মুক্ত থাকেন।’’
— আমি চাই না তূর্য দ্বিতীয় তামিম সরকার হোক।’’
— হবে না। ভরসা রাখেন।’’
সুবহা আর কিছু না বলে মেয়েকে সাথে নিয়ে অন্দরমহলে চলে যায়। তামিম এবং তানভীর সরকার এসে তূর্যের সামনে দাড়ায়।
—- কেন মেরেছেন তূর্য?’’
—- আপনাকে নিয়ে কথা বলেছে আব্বাজান।’’
—- যেই বলবে, তাকেই মার’বেন?’’
—- নির্ভর করে কাকে নিয়ে বলছে। আপনাকে নিয়ে বললে 100% মর’বে এটা সিউর আব্বা। ‘’
তূর্য আর কিছু না বলে চুপচাপ তার সাঙ্গপাঙ্গ দের নিয়ে যেতে থাকে। তামিম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার পানে। যেনো, তামিম সরকার এবং তানভীর সরকারের মিলিত তৈরি।
— কী ভাবছেন তামিম?’’
— আব্বাজান, ওর মাঝে আমি নিজেকে দেখতে পাই।’’
— আর আমি নিজেকে।’’
তামিম এবং তানভীর চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে। সরকার বাড়ির বড় ছেলে তূর্য সরকার। তামিম সরকারের জান বলা চলে। কিন্তু দিন দিন তার বেপরোয়া গতি তাকে তামিমের থেকে ভয়ংকর করে দিচ্ছে।
সময় চলতে থাকে সময়ের গতিতে। সময়ের সাথে সব কিছু পরিবর্তন হলে ও, পরিবর্তন হয়নি তূর্যের তামিমের প্রতি ভালোবাসা। দিন যাচ্ছে এবং বাবার প্রতি তার পাগলামো বাড়ছে।
Papa meri jaan, Hardum rakhna, ab ye haat sarpar tum.. Papa meri jaan sathe mere chalna, har mil ka patthar tum…tum hi mere….
এমপি তামিম সরকার পর্ব ১০৪
—ভাই?’’
মটুর ডাক শুনে ২৭ বছর বয়সী তূর্য রি’লভবার মোছা বন্ধ করে দেয়।
— মাল রেডি।’’
তূর্য উঠে চেয়ারে বাঁধা লোকটার পানে তাকায়।
—- আমার আব্বা আমার জান। তার ক্ষতি যে করতে চাইবো, তার জীবন আমি বরবাদ কইরা দিবোওওওওও।
এই মটকু, মাললল দে…..!’’
