Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৭

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৭

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৭
আয়াত বিনতে নূর

চৌধুরী বাড়িতে রাতের খাওয়া শেষ করে সবাই যে যার মতো নিজের রুমে চলে গেছে। রাজীবও ব্যতিক্রম নয়। নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে বেডে হেলান দিয়ে বসলো। ঘরের আলোটা মৃদু, বাইরে রাত নিঃশব্দ। হাতের ফোনটার স্ক্রিনে চোখ পড়তেই দেখলো—রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই।
হঠাৎ করেই মাথায় এসে পড়লো অহনাকে কল দেওয়ার কথা। বেশি কিছু না ভেবেই সে অহনার নাম্বারে কল দিলো।
অন্যদিকে, অহনা পড়াশোনা শেষ করে ফোনটা পাশে রেখে ঘুমাতে যাচ্ছিলো। ঠিক তখনই ফোনের রিং বেজে উঠলো। বিরক্ত চোখে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকালো।
রাজীব।
তার ফোনে নামটা সেভ করা আছে একটাই শব্দে

““ডিস্টার্ব”।
অহনা কোনো গুরুত্ব না দিয়ে ফোনটা আবার পাশে রেখে দিলো। আয়েশী ভঙ্গিতে শুয়ে পড়লো।
রিং বাজতেই থাকলো… তারপর কেটে গেলো।
এদিকে রাজীব আরও বেশি বিরক্ত হয়ে পড়লো।
কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে সে মেসেজ পাঠালো,
“ফোনটা ধরবে, নাকি আমি নিজেই আসবো? Choice is yours!!”
মেসেজের নোটিফিকেশন দেখেই অহনা আবার ফোনটা হাতে নিলো। বেডে পিঠ ঠেকিয়ে বসে মেসেজটা ওপেন করলো। নিজের মনেই বিরক্ত হয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“এই লোকটার কি কোনো কাজকর্ম নেই রাতদুপুরে আমার কাছে কল করা ছাড়া!”
ঠিক তখনই আবার ফোন বেজে উঠলো।
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলো না অহনা। বিরক্তি চেপে কলটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে রাজীব কিছু বলার আগেই অহনা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলে উঠলো,
“সমস্যা কী আপনার? এতো রাতে কল দিয়েছেন কেন? আর কোনো কাজকর্ম নেই নাকি?”
অহনার কথা শুনে রাজীব হেসে উঠলো। কণ্ঠে স্পষ্ট দুষ্টুমি।

“আছে তো কাজ,”
একটু থেমে বলল,
“তোমার সাথে কথা বলা।”
তারপর হালকা হাসি দিয়ে ,
“আর এমনিতেও তো বলেছিলাম রাতে কল দেবো। মনে নেই?”
রাজীবের কথায় অহনা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। কী উত্তর দেবে ভেবে পেলো না। বিরক্তিটা ঢাকতে না পেরে শেষে রেগেই বলল,

“তাহলে কল দিয়েছেন কেন?”
অহনার বিরক্তিকর কন্ঠস্বর রাজীবের কানে আসতেই, রাজীব হালকা কণ্ঠে বলল,
“এমনিই… তোমার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য কল দিয়েছি।”যাই হোক “কেমন আছো?”
অহনা কথাটা শুনেই আরও বিরক্ত হয়ে উঠলো। কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তির ঝাঁজ,
“এতো রাতে হঠাৎ আপনার আমার খোঁজখবর নেওয়ার কথা মনে হলো?”
একটু নিশ্বাস নিয়ে আবার বলল,

“আপনি কি সত্যিই এতটাই আজব মানুষ? রাতদুপুরে মানুষকে ডিস্টার্ব করা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই?”
অহনার এই কথা শুনে রাজীবের হাসিটা মিলিয়ে গেলো। কণ্ঠটা এবার একটু শক্ত হলো।
“আমি যেটা জিজ্ঞেস করলাম, তার উত্তর কি এটা?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। অহনা বুঝতে পারলো কথাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে এবার শান্ত কণ্ঠে বলল,
“দেখুন, আমার সত্যিই ঘুম আসছে। কালকে চাইলে খোঁজখবর নিবেন। এখন রাখি, ঠিক আছে?”
রাজীব হালকা বিরক্তির হাসি দিয়ে বলল,

“ওহ হু… এইভাবে বিষয়টা এড়িয়ে যেতে চাইছো?”
“শোনো মেয়ে, জরুরি কথা বলার জন্যই কল দিয়েছি।”
এই কথাটা শুনে অহনা আর কিছু বললো না। ফোনটা কানে চেপে ধরে চুপচাপ শুনতে লাগলো। ভেতরে ভেতরে একটু অজানা অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করলো।রাজীব এবার স্পষ্টভাবে বলল,
“কালকে আমাদের বাড়িতে একটা পার্টি আছে।”
একটু থেমে জোর দিয়ে বলল,
“তুমি সকাল সকাল আমাদের বাসায় চলে এসো। বুঝতে পেরেছো তো?”
অহনা কিছু বলার আগেই রাজীব আবার যোগ করলো,

“আর হ্যাঁ, আমি ‘না’ শুনতে চাই না।”
এই কথা শুনে অহনার চোখ কপালে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত হয়ে বলল,
“পার্টিতে আমার কী কাজ, হ্যাঁ?”
কণ্ঠে অবজ্ঞা নিয়ে বলল,
“আমি কোনো পার্টিতে যাবো না। আপনি এখন রাখুন তো।”
রাজীবের কণ্ঠ এবার বদলে গেলো। আগের হাসিখুশি ভাব উধাও। গলায় হুমকির সুর,
“যদি না আসো…” “তাহলে তুলো নিয়ে আসবো।”
অহনা অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো। রাজীব আবার বলল,
“এবার তুমি যা ভালো বুঝো।”
তারপর এমন স্বরে বলল, যেন সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া—

“আচ্ছা, রাখি। ঘুমাও।
আর কালকে তাড়াতাড়ি চলে এসো।”
এই কথাগুলো বলেই রাজীব কল কেটে দিলো।
অহনা স্তব্ধ হয়ে বেডে বসে রইলো। কয়েক সেকেন্ড ফোনটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো। নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল,
“এই লোকটার মাথায় কি সত্যিই তার ছেঁড়া আছে নাকি?” “এতো রাতে কল দিয়ে এসব কথা বলে!”
বিরক্তি আর বিস্ময় মিশিয়ে আবার বলল,

“কি আজব লোক রে বাবা…”
আর কিছু ভাবার শক্তি পেলো না অহনা। ক্লান্ত শরীরটা বেডে এলিয়ে দিলো। চোখ বন্ধ করতেই রাজীবের কথাগুলো আবার কানে বাজতে লাগলো,
‘আমি না শুনতে চাই না’ ‘তুলো নিয়ে আসবো’
কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও শেষ পর্যন্ত ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে এলো। ধীরে ধীরে অহনা ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো, অজানা এক অস্বস্তি আর আগামীকালের অজানা ভয় বুকে নিয়েই।

ধরনীতে নতুন এক সকালের শুরু হলো।
ভোরের নরম আলো নিশিতার রুমের জানালা দিয়ে আস্তে আস্তে ঢুকে পড়লো। আলোটা যেন ঘরের প্রতিটা কোণে ছড়িয়ে পড়ে রাতের সমস্ত নিস্তব্ধতা ধুয়ে দিচ্ছিল। নিশিতা তার অভ্যাস অনুযায়ী ভোরেই ঘুম থেকে জেগে উঠলো।
গত কয়েকদিনে বেশ কিছু অনিয়ম হয়েছিল, কিন্তু আজ আর কোনো অনিয়ম হয়নি। চোখ পিটপিট করে চারপাশে তাকাতেই নিশিতা একটু থমকে গেলো।
শরীরটা যেন নড়াতে পারছে না। বুকের ওপর ভারী কিছু অনুভব করলো। হাত-পা নড়ানোর চেষ্টা করেও পারলো না—কিছু একটা শক্ত করে তাকে চেপে ধরে রেখেছে। ধীরে নিচের দিকে তাকাতেই দৃশ্যটা পরিষ্কার হলো।
ফারিস। নিশিতার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্ত ঘুমে তলিয়ে আছে সে। মুখে একরাশ শান্তি, নিঃশ্বাসের ছন্দ ধীর আর গভীর। নিশিতার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠলো।
মনে মনে বলল,

“আপনি একদম ছোট্ট বাচ্চার মতো ঘুমান…”
ঠিক তখনই খেয়াল হলো—ফজরের নামাজের সময় হয়ে গেছে।নিশিতা আর কিছু না ভেবে সাবধানে ফারিসকে নিজের ওপর থেকে সরানোর চেষ্টা করতে লাগলো। ফারিস এতটাই গভীর ঘুমে ছিল যে নিশিতার খুব একটা কষ্ট হলো না। ধীরে ধীরে তাকে পাশে শুইয়ে দিয়ে নিশিতা উঠে দাঁড়ালো। তারপর নিঃশব্দে ওয়াশরুমে চলে গেলো অজু করতে।

ঠান্ডা পানির ছিটা মুখে লাগতেই মনটা একদম শান্ত হয়ে গেলো। যেন ভেতরের সব ক্লান্তি ধুয়ে-মুছে সরে গেল। অজু শেষ করে বের হয়ে মাথায় উড়না জড়িয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়ালো নিশিতা। এই সময়েই হঠাৎ ফারিসের ঘুম ভেঙে গেল। চমকে উঠে বসলো সে।
পাশে তাকিয়ে নিশিতাকে না দেখে বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অজানা ভয় ঢুকে পড়লো। তাড়াহুড়ো করে চারপাশে চোখ বুলালো।

ঠিক তখনই সামনে চোখ পড়তেই ভয়টা যেন ওখানেই থেমে গেল। নিশিতা নামাজে দাঁড়িয়ে আছে। ফারিসের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। মনটা এক নিমিষেই শান্ত হয়ে গেল।
সে আয়েশী ভঙ্গিতে আবার শুয়ে পড়লো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নিশিতার দিকে।
নিশিতার সালাম ফেরানো, মোনাজাতে ঠোঁট নড়া—সবকিছুতেই ফারিস মুগ্ধ। চোখে-মুখে ভালোবাসার ছাপ স্পষ্ট। নামাজ শেষে নিশিতা মোনাজাত করে উঠে ফারিসের সামনে একটু ঝুঁকে হালকা করে ফু দিলো।
ফারিস তখনও মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকেই বলল,

“কখন উঠলি?”
নিশিতা হেসে উত্তর দিলো,
“একটু আগেই।”
এই বলে সে সামনে এগোতেই হঠাৎ ফারিস তার হাত ধরে টান মেরে নিজের ওপর ফেলে দিলো।
হাসিমুখে বলল,
“আমার বউ তো দেখি সব কাজই পারে।”
একটু দুষ্টুমি মেশানো কণ্ঠে বলতে শুরু করে,
“শুধু রান্নাটা বাদে! তাই না বউ?”
ফারিসের খোঁচা মারা কথায় নিশিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ওটাও আস্তে আস্তে শিখে নেবো।”
লাজুক গলায় বলে ,

“এখন ছাড়ুন তো আমাকে।”
ফারিস নিশিতার গালে নাক ঘষে ফিসফিস করে বলল,
“রাগ করছিস নাকি বউ?”
তারপর মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল,
“রাগ করলে তোকে আরও সুন্দর লাগে, বউ পাখি!”
নিশিতা ফারিসের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“খুব… খুব… খুব ভালোবাসি ফারিস ভাই…”
ফারিস আর কোনো কথা বললো না।
শুধু নিশিতাকে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। মাথায় চুমু দিয়ে বলল,

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৬ (২)

“আমিও তোকে অনেক ভালোবাসি পাখি।”
ফারিসের এতটা ভালোবাসায় নিশিতার চোখ দুটো ভিজে উঠলো। সে ধীরে বলে উঠলো—
“আমার কপালে এতো ভালোবাসা আর সুখ… সইবে তো ফারিস ভাই?”
ফারিস নিশিতার কপালে চুমু দিয়ে মৃদু হাসলো।
বলল,
“সইবে কেন জানিস?” “কারণ এই ভালোবাসা আল্লাহ নিজে লিখে দিয়েছেন আমাদের কপালে।”

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৮