Home চোখের আড়ালে ভালোবাসি চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৬ (২)

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৬ (২)

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৬ (২)
আয়াত বিনতে নূর

এদিকে দিনের সমস্ত কোলাহল আর ব্যস্ততার মাঝে
আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী দু’জনেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিজ নিজ রুমের দিকে চলে গেলো ফ্রেশ হতে। সারাদিনের কাজের চাপ, আলোচনা আর চিন্তাভাবনায় দু’জনেরই মাথা ভার হয়ে আছে। ড্রয়িং রুমে তখন রাজীব একা বসে।

হাতে ফোন, চোখ স্ক্রিনে আটকানো। কখনো কাউকে কল দিচ্ছে, কখনো মেসেজ টাইপ করছে,
মনে হচ্ছে সে নিজেই যেন বুঝতে পারছে না কি খুঁজছে বা কাকে খুঁজছে।
ঠিক সেই সময়েই— এই এত লোক, এত কথা, এত ব্যস্ততার মাঝখানে হঠাৎ করেই একটা নাম যেন মনে হলো— রিয়া।
আফিয়া চৌধুরীর বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠলো। মাথার ভেতর হঠাৎ একটা প্রশ্ন এসে আঘাত করলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“রিয়া কোথায়?” ও তো সারাদিন বাড়ি ফেরেনি।
এখন পর্যন্ত কেউ ওকে চোখেও দেখেনি। বাড়িতে ঢোকার পর থেকে রিয়া আর নিশি— এই দুইজনকেই যেন কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
চিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠলো আফিয়া চৌধুরীর কপালে। তিনি রাজীবের দিকে তাকিয়ে একটু উৎকণ্ঠার সুরে বললেন,

“রিয়া কোথায় রে রাজীব? তুই তো ওকে নিয়ে এলি না! আর সারাদিন কোনো খোঁজও নেই কেন?”
এই কথাগুলো শুনেই রাজীবের মাথায় যেন কেউ জোরে একটা ধাক্কা দিলো। সত্যি তো! বাড়ি ফেরার পরও রিয়াকে তো একবারও চোখে পড়েনি।
কোথাও কোনো শব্দ নেই, কোনো উপস্থিতি নেই।
রাজীবের বুকের ভেতরটা হালকা অস্থির হয়ে উঠলো। নিজের অজান্তেই মনে মনে ভাবলো,
“কোথায় গেলো মেয়েটা?” “রিয়া তো কোনোদিন এমন দেরি করে না!”

আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রাজীব সরাসরি রিয়ার নাম্বারে কল দিলো। সত্যি বলতে কী—এই মুহূর্তে ওদের সবারই নিজের নিজের কাছে অপরাধী মনে হচ্ছে। এত বড় বাড়িতে, এত মানুষ থাকা সত্ত্বেও একটা মেয়ের অনুপস্থিতি
কারও চোখে পড়েনি। রিয়া যে এখনো বাড়ি ফেরেনি— এই কথাটাই যেন সবার মাথা থেকে মুছে গিয়েছিল। এ
দিকে একেবারে ভিন্ন একটা পরিবেশে— অহনার রুমে। রিয়া আর অহনা দু’জনেই বিছানার ওপর বসে হালকা আড্ডায় মেতে আছে। কলেজের কথা,

পরীক্ষার চাপ, নোটস আর পড়াশোনার নানা হিসাব— সবকিছু মিলিয়ে সময়টা কেটে যাচ্ছিলো অজান্তেই। হঠাৎ করেই রিয়ার ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই রিয়া একটু থমকে গেলো।
“রাজীব ভাইয়ার কল”। তার ভাই কল করেছে। মনে অজানা একটা ভয় ঢুকে পড়লো। তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করলো সে। ওপাশ থেকে রাজীবের গম্ভীর কণ্ঠ,
“কোথায় তুই রিয়া?” “এত রাত হয়ে গেছে, এখনো বাড়ি ফিরিস নি কেন?” “ড্রাইভার তো তোকে নিতে গেছিলো!”
একটার পর একটা প্রশ্ন। প্রতিটা প্রশ্ন যেন চাপ হয়ে নেমে আসছে। রিয়া একটু ঘাবড়ে গেলো।
হাতের তালু ঠান্ডা হয়ে এলো। আসলে কলেজ শেষ হওয়ার পর অহনা জোর করেই রিয়াকে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে। রিয়া প্রথমে যেতে চাইনি।
কিন্তু অহনার জেদ আর অনুরোধের কাছে
শেষমেশ হার মানতে হয়েছে। রিয়া ধীরে ধীরে বললো,

“আসলে ভাইয়া… আমি অহনাদের বাড়িতে।”
“সামনেই পরীক্ষা তো… তাই নোটগুলো নিতে এসেছিলাম।” “এখন মাত্র ষোল দিন পর পরীক্ষা—
এই সময়টা খুব ইম্পর্ট্যান্ট।”
কথার ফাঁকে ফাঁকে রিয়া নিজের ভুলটাও স্বীকার করলো,
“আর আমার ফোনে রিচার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিলো,
তাই আর কল দিয়ে বলতে পারিনি… সরি ভাইয়া।”
রাজীবের কণ্ঠে তখন স্পষ্ট বিরক্তি আর চিন্তা,
“অহনার তো ফোন ছিলো! ওর ফোন থেকে কল দিতে পারতিস।” “আজকে সবাই বাড়ি ফিরেছে—
আম্মু, ছোট আম্মু—সবাই তোকে নিয়ে চিন্তা করছে।”
একটু থেমে আবার বললো,

“আচ্ছা, এখন এড্রেসটা পাঠা। আমি নিজেই নিতে আসছি তোকে।”
রিয়া আর কথা বাড়ালো না।শুধু বললো,
“আচ্ছা ভাইয়া।”
কল কেটে গেলো। রাজীব আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো রিয়াকে নিতে।
এদিকে রিয়া দ্রুত ফোন থেকে লোকেশন বের করে রাজীবকে পাঠিয়ে দিলো। তারপর অহনার দিকে তাকিয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিলো। দু’জন একসাথে রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসলো।
রিয়ার বুকের ভেতরটা তখন অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরা— ভুলের অনুশোচনা, পরিবারের চিন্তার ভার আর আসন্ন পরীক্ষার চাপ—
সব মিলিয়ে মনটা ভারী হয়ে আছে।

অহনার বাড়িটা দুই তলা। খুব বেশি বড়ো না, কিন্তু চোখে পড়ার মতো সুন্দর। বাড়িটা জুড়ে একটা পরিপাটির ছাপ— যেন প্রতিটা জিনিস নিজের জায়গায় নিজের মতো করে আছে। না অতিরিক্ত সাজ, না অগোছালো কিছু। সবকিছুতেই একটা শান্ত, ভদ্র পরিবেশ। রিয়া ড্রয়িং রুমে এসে বসতেই
শিউলি রহমান বিষয়টা খেয়াল করলেন। এতক্ষণ তো মেয়েটা রুমেই ছিলো। মায়া মেশানো কণ্ঠে তিনি বললেন,
“কি হলো মা? রুম থেকে বের হয়ে এলে যে?”
রিয়া মুচকি একটা হাসি দিলো। চোখে-মুখে ভদ্রতা আর লাজুক ভাব। নরম স্বরে বললো,
“আসলে আন্টি… ভাইয়া আসছে আমাকে নিতে। তাই…”
শিউলি রহমান একটু অবাক হলেন, আবার মনে মনে হয়তো ভাবলেন— আরো একটু থাকলে মন্দ হতো না।তিনি স্নেহভরা গলায় বললেন,

“আজকের রাতটা থেকে যেতে পারতে মা।”
রিয়া আবারো মিষ্টি করে হাসলো।
হালকা মাথা নিচু করে বললো,
“আসলে আন্টি… আমাকে বা নিশিতাকে একাই কখনো বাড়ির বাইরে থাকতে দেয় না।”
“অনেকক্ষণ তো থাকলাম আন্টি… আরেকদিন আসবো, না হয়।”
এই কথার ভেতরেই ছিলো পরিবারের শাসন,
ভালোবাসা আর দায়িত্বের ছাপ। শিউলি রহমান আর জোর করলেন না। বরং সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে বললেন,
“আচ্ছা মা। তবে মাঝে মাঝে কিন্তু এসো।”
রিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। ঠিক তখনই রিয়ার ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে চোখ পড়তেই বুঝলো— রাজীব ভাইয়া। রিয়া দ্রুত ফোনটা রিসিভ করলো।
ওপাশ থেকে রাজীব বললো,

“কই তুই? আমি গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছি।”
রিয়া তাড়াতাড়ি জবাব দিলো,
“আচ্ছা ভাইয়া, আমরা আসছি।”
বলে আর দেরি না করে কলটা কেটে দিলো।
রিয়া উঠে দাঁড়িয়ে শিউলি রহমানকে এবং বাড়ির সবাইকে ভদ্রভাবে বিদায় জানালো।
ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ দরজা খুলে বাইরে থেকে ঢুকলেন অহনার বাবা— সাইফুল ইসলাম। রিয়াকে দেখে মুখে স্বাভাবিক হাসি ফুটে উঠলো তাঁর।
বললেন,

“আরে! রিয়া মা যে!” “কেমন আছো?”
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে সম্মান দেখিয়ে বললো,
“জি আঙ্কেল, আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
“আপনি কেমন আছেন?”
সাইফুল ইসলাম স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে বললেন,
“ভালো, ভালো।”
তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন,

“তা কোথায় যাচ্ছো মা?” “এসো, রাতের খাবারটা আমাদের সাথে খেয়ে যাও।”
এই বাড়িটায় অতিথিকে আপ্যায়ন করা যেন অভ্যাসেরই অংশ। রিয়া বিনয়ের সাথে বললো,
“না আঙ্কেল… ভাইয়া এসে দাঁড়িয়ে আছে।” “অন্য একদিন আসবো।” “আজ আসি।”
সাইফুল ইসলাম বুঝলেন। আর জোর করলেন না।শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।অহনা তখন বললো,
“আব্বু, আম্মু— আমি রিয়াকে এগিয়ে দিয়ে আসছি।”
সাইফুল ইসলাম আবারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। এরপর ভিতরে চলে গেলেন।
অহনা আর রিয়া একসাথে বাইরে এসে দেখলো—
রাজীব গাড়ির পাশে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হাত ভাঁজ করা, চোখে চিন্তার ছাপ। অহনা আর রিয়াকে একসাথে আসতে দেখে রাজীব সোজা হয়ে দাঁড়ালো আর দু’এক পা এগিয়ে এলো।
তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,

“যা, গাড়ির ভেতরে গিয়ে বস।”
“আমি আসছি।”
রিয়া অহনার দিকে তাকালো। চোখে কৃতজ্ঞতা আর বন্ধুত্বের ছোঁয়া। হালকা হেসে বললো,
“আচ্ছা তাহলে যাই আমি।” “আর পরশুদিন তো কলেজে দেখা হবে।” “তাড়াতাড়ি আসিস।”
অহনা ছোট করে শুধু বললো,
“আচ্ছা…”
এর বেশি কিছু বলার দরকার পড়লো না।
দু’জনেই বুঝে গেলো একজন আরেকজনের কথা।
রিয়া ধীরে ধীরে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে বসলো। রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা মনে করিয়ে দিলো— আরেকটা দিনের আরেকটা অধ্যায় শেষ হয়ে এলো।
রিয়া চলে যেতেই হঠাৎ রাজীব অহনার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেললো।অপ্রত্যাশিত এই আচরণে অহনা চমকে উঠে বিরক্ত গলায় বলল,

“সমস্যা কী আপনার? আমার হাত ধরেছেন কেন?”
রাজীব কোনো জবাব না দিয়ে শুধু ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি খেলিয়ে নিলো। তারপর হালকা গলায় বলল,
“রাতে কল দিবো।”
অহনা কিছু বলার আগেই রাজীব আবার বলতে শুরু করলো,
“না ধরলে কিন্তু একদম বাসার সামনে চলে আসবো।”
এই কথা বলেই সে অহনার হাত ছেড়ে দিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির ভেতরে উঠে দরজা বন্ধ করলো।অহনা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।রাজীব গাড়ির ভেতর থেকেই একবার অহনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিলো, তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সোজা সামনে এগিয়ে গেলো।আর অহনা?সে যেন কয়েক সেকেন্ড কিছুই বুঝতে পারলো না।তারপর নিজের সাথেই বিড়বিড় করে বলল,

” এই লোকটা কি আমার সাথে ফ্লার্ট করলো নাকি?
কি আজব লোক রে বাবা!”
আর কিছু না ভেবে মাথা ঝাঁকিয়ে সে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো।
এদিকে রাজীব রিয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।তখন বাড়ির প্রায় সবাই যে যার রুমে। শুধু আফিয়া চৌধুরী বসে ছিলেন ড্রয়িং রুমে—রিয়ার অপেক্ষায়।
রাজীব আর রিয়া ঘরের ভেতরে ঢুকতেই আফিয়া চৌধুরী উঠে এসে রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“অহনার বাড়ি গিয়েছিস, ভালো কথা। কিন্তু কাউকে বলে যাবি না? আমাদের চিন্তা হয় না?”
রিয়া চুপ করে রইলো। এখন ভালো করেই জানে—একটা কথা বললেই সেটার জবাবে দশগুণ বেশি কথা শুনতে হবে। রাজীব পরিস্থিতি সামলাতে সামনে এগিয়ে এসে বলল,
” আম্মু, ওর কোনো দোষ নেই। ওর ফোনে রিচার্জ ছিলো না, তাই কাউকে জানাতে পারেনি। তুমি রাগ করো না।” আমি ফ্রেশ হতে গেলাম।

আফিয়া চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে। তোরা ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি সবার জন্য খাবার বাড়ছি।
রিয়া আর রাজীব তাদের রুমে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পর আফিয়া চৌধুরী মেডদের ডেকে খাবার সার্ভ করার নির্দেশ দিলেন। ধীরে ধীরে সবাই ড্রয়িং রুমে এসে হাজির হলো। একসাথে টেবিলে বসলো সবাই। তারপরই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো ফারিস। গিয়ে নিজের বরাদ্দ করা চেয়ারে বসলো—চুপচাপ, গম্ভীর মুখে।আফিয়া চৌধুরী আর আমেনা চৌধুরী খাবার পরিবেশন করতে শুরু করলেন।
হঠাৎ করেই আমেনা চৌধুরী বিরক্ত গলায় বললেন,
” নিশি কোথায়?মেয়েটাকে নিয়ে আর পারি না। সারাদিন রুম থেকে বের হয়নি, এখন আবার খেতেও আসেনি!”
এই কথা শুনেই রিয়ার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। হাতের চামচটা কেঁপে উঠলেও সে কিছু বললো না। চুপচাপ চোখ নামিয়ে খাবার খেতে শুরু করলো— মনের ভেতরে অজানা একটা শঙ্কা আর চাপা ভয় নিয়ে।

কিছুক্ষণ পর উপরতলা থেকে ধীরে ধীরে নামলো নিশিতা। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে নামার সময়ও তার চোখে ঘুমের ছাপ রয়ে গেছে। চুলগুলো
অগোছালো, চোখ দুটো সামান্য ভারী—স্পষ্ট বোঝা যায় সে সত্যিই একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছে।
নিশিতাকে দেখেই আমেনা চৌধুরী একটু বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বললেন,
” সারাদিন শেষে তাহলে বের হলি?কোথায় ছিলি এতক্ষণ?”
নিশিতা চেয়ার টেনে বসতে বসতেই নরম গলায় উত্তর দিলো,
” আসলে আম্মু, বিকালে একটু ঘুমিয়েপড়েছিলাম। আর একটু আগে ঘুম ভাঙলো।”
আমেনা চৌধুরীর মুখের কঠিন ভাবটা একটু নরম হলো। তিনি বললেন,
“আচ্ছা, খেয়ে নে। সারাদিন তো কিছুই খাসনি।”

নিশিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর চারপাশে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
“একি! তোমরা সবাই কখন আসলে? আমাকে ডাকলে না কেনো?”
নিশিতার এই সরল প্রশ্নে টেবিলজুড়ে হালকা হাসির রোল পড়ে গেলো। কিন্তু সেই হাসির মাঝেই রিয়ার মুখটা অদ্ভুতভাবে আরও ফ্যাকাসে হয়ে উঠলো। সে চুপচাপ চোখ নামিয়ে খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন কিছু একটা ভেতরে ভেতরে তাকে কুঁড়ে খাচ্ছে।
আফিয়া চৌধুরী স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,

” আমরা সবাই বিকালেই এসেছি মা। তুই তখন ঘুমচ্ছলি, তাই কেউ ডাকেনি। এখন খেতে বস।”
এরপর তাদের কথার মাঝে আরাফাত চৌধুরী হালকা হাসি দিয়ে নিশিতা আর রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তা তোমাদের পড়াশোনা কেমন চলছে আম্মু?
আরাফাত চৌধুরির কথা শুনে নিশিতা আর রিয়া একসাথে ভদ্রভাবে বলল,
“জ্বি, আলহামদুলিল্লাহ।”
এরপর আবার সবাই নানান রকম বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করলো। ডাইনিং টেবিলটা ধীরে ধীরে গল্প, হাসি আর দৈনন্দিন আলাপে ভরে উঠলো।
ঠিক তখনই নিশিতা খাবারের মাঝখানে হঠাৎ মাথা তুলে তাকালো। আর তাকিয়েই যেন বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।

ফারিস। একদম তার সামনের চেয়ারে বসে আছে।
এক মুহূর্তের জন্য নিশিতার বিশ্বাসই হলো না।
সে তো ভাবতেই পারেনি ফারিস এতক্ষণ ধরেই এখানে আছে। চোখ দুটো বড় বড় করে সে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইলো—কোনো কথা নেই, কোনো নড়াচড়া নেই। নিশিতার সেই অবাক দৃষ্টিটা ফারিসের চোখ এড়ালো না। ঠোঁট কামড়ে হালকা একটা হাসি চেপে রাখলো। তারপর নিঃশব্দে, একেবারে দুষ্টুমি করে চোখ টিপ মারলো।
এই এক মুহূর্তেই নিশিতার গলা শুকিয়ে এলো।
সে হঠাৎ করেই বিষম খেলো। আফিয়া চৌধুরী সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক গলায় বললেন,
‘আস্তে খা নিশি।আবার বিষম খাবি।’

নিশিতা তাড়াতাড়ি পানির গ্লাস তুলে এক নিশ্বাসে প্রায় ফাঁকা করে দিলো। হৃদপিণ্ডটা তখনো জোরে জোরে ধুকপুক করছে। মনে মনে সে ভাবলো—
উনি এখানে, একদম আমার সামনে বসে আছে…
আর আমি এতক্ষণ খেয়ালই করিনি! কখন আসলেন? কখন বসে গেলেন? নিশিতার এমন অমনোযোগী অবস্থা দেখে আমেনা চৌধুরী আবার বললেন,
” কি হলো নিশি? খেয়ে নে ঠিক করে।”
নিশিতা দ্রুত মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। চোখ নামিয়ে আবার খেতে শুরু করলো। কিন্তু প্লেটের খাবারের চেয়ে তার মনটা তখন অনেক দূরে, ঠিক তার সামনের চেয়ারে বসে থাকা সেই মানুষটার দিকেই।
হঠাৎ করেই নিশিতা অনুভব করলো, তার পায়ের সঙ্গে অন্য কেউ মৃদু খেলা করছে।
এক সেকেন্ডেই পুরো শরীরে শিহরণ ছড়িয়ে গেলো।

তলপেট থেকে অজানা রকমের অনুভূতির ঢেউ ধেয়ে এলো—একটাই কথা মনে হচ্ছিলো, সে যেন পুরোপুরি কম্পিত।
গলা শুকিয়ে গেছে, শব্দ করতে পারছে না।
ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে ফারিসের দিকে তাকালো।
ফারিসের ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টুমি ভরা হাসি এখনও ছাপানো। নিশিতা আরেকটু সরানোর চেষ্টা করতেই ফারিস আরও নিপুণভাবে পা চেপে ধরলো। নিশিতা যেন অস্তিত্বে পড়ে গেলো—হাত-পা হিম হয়ে গেছে, মনটা জড় হয়ে গেছে।

কিছুক্ষণের জন্য টেবিল, খাবার, সবাই—সবকিছু যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। মনের ভেতর একটাই ভাব—এখন কি হবে? শেষমেষ ফারিস ধীরে ধীরে পা ছাড়ল।
নিশিতার বুক কিছুটা স্বাভাবিক স্পন্দন পেলো।ফারিস উঠে দাঁড়ালো, বিশ্রাম মতো এক হাত পকেটে রেখে। ফারিসের উঠা দেখেই আফিয়া চৌধুরী কৌতূহল মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন,
“কি হলো বাবা, উঠে দাঁড়ালি কি?”
ফারিস মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসি দিয়ে উত্তর দিলো,
” আমার খাওয়া হয়ে গেছে, আম্মু।রুমে যাচ্ছি, অনেক টায়ার্ড আমি।”
এই বলে ফারিস ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলায় চলে গেলো। নিশিতা তখন টেবিলে বসেই গভীর নিশ্বাস ফেলল। হৃদয়ের দ্রুত ধকধকানো এখনও থামেনি। মনের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড় চলছে—ভয়, উত্তেজনা, লজ্জা আর কৌতূহল সব মিলিয়ে। বুঝতে পারছিলো, আজকের এই ঘটনা সহজে ভুলে যাবে না।

কিছুক্ষণ পর নিশিতা খাওয়া শেষ করে উপরের তলায় চলে গেলো। সবাই যে যার রুমে চলে যাওয়ার পর ঘর পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। নিশিতা নিজের রুমে ঢুকতেই দরজা টেনে আটকে দিলো।
পিছনে ঘুরে একবার চমকে উঠলো— ফারিস, নিশিতার বেডে শুয়ে আছেন।
শরীরটা আয়েশি ভঙ্গিতে পুরো বিছানার ওপর ছড়িয়ে আছে। নিশিতার চোখ বড় হয়ে গেলো।
” এ কি? আপনি এখানে কি করেছেন? নিজের রুম নেই? নিজের রুমে যান। আমার রুমে কি আপনার?”
নিশিতার কথাগুলো শুনে ফারিস কোনো অতিরিক্ত হেলদুল দেখালো না। হালকা মাথা কেঁপে বা ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি ছাড়া, একেবারে শান্ত, স্থির অবস্থায় শুয়ে রইলো।৷ নিশিতা প্রথমে কিছুটা আঁতকে উঠলেও দেখলো—ফারিস তার কথার কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না।

এটা তার মনকে কিছুটা স্বস্তি দিলো, কিন্তু একই সঙ্গে ভেতরে অদ্ভুত কৌতূহল এবং অস্থিরতা তৈরি করলো। ফারিস শান্ত, অবিচলিত কণ্ঠে উত্তর
দিলো,
“আমার বউ যেখানে, আমিও সেখানে। এবার তাড়াতাড়ি আয়, ঘুম আসছে, ঘুমবো।”
ফারিসের কথা শুনে নিশিতা হা হয়ে তাকিয়ে রইলো। চোখ বড় হয়ে গেলো, মুখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। হঠাৎ মনে হলো, সে যেন মুহূর্তের জন্য সমস্ত বাতাস হারিয়ে ফেলেছে।
“কি… কি বললেন আপনি?”

মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, কিন্তু গলার শব্দটা কেঁপে উঠছিল। এবার নিশিতা রেগে গিয়ে বলল,
“আমি আপনার সাথে ঘুমবো না! কেউ দেখে ফেললে বিপদ হবে!”
নিশিতার কথা শুনে ফারিস বাকা চোখে তাকিয়ে রইল। তার চোখের গভীরতা, ঠোঁটের হালকা ভাঁজ—সব মিলিয়ে নিশিতার মনকে অচেতনভাবে কাঁপিয়ে দিল। হঠাৎ ধীরে, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ফারিস বলল,
” এতো কিছু তোকে ভাবা লাগবে না।এখন তুই আমার কাছে আসবি নাকি আমি তোর কাছে যাব?
নিশিতার বুকটা অচেতনভাবে ধুকধুক করতে লাগলো। ফারিসের হুমকিতে সে ভয় পেয়ে গেলো।
নিশিতা চুপচাপ তাকিয়ে রইল। চোখ বড় হয়ে, মুখে অবিশ্বাস আর সামান্য ভয়ের ছাপ। হৃদয়টা দ্রুত ধকধক করতে লাগল।মনের ভেতরে দ্বন্দ্ব—রাগ, লজ্জা, উত্তেজনা, আর অজানা কৌতূহল—সব একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটু ভেবে সে চুপচাপ ধীরে ধীরে ফারিসের দিকে এগোল। পা আগলে, হাত কেঁপে, কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত এক শান্তি ও স্বস্তি অনুভব করছিল। ফারিসের চোখে নিঃশব্দ আধিপত্য, ভ্রু কুঁচকে হাসি—সব মিলিয়ে নিশিতাকে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তার জায়গায় ঠেলে দিয়েছে।

শরীরের ছোট ছোট নড়াচড়া—হাত হালকা কেঁপে, নিঃশ্বাস কিছুটা থমকে—সবই তার ভেতরের উত্তেজনা প্রকাশ করছে। ফারিস কিছুতেই তাড়া দিচ্ছে না, শুধু তাকিয়ে আছে।নিশিতার মন ধীরে ধীরে বুঝতে লাগল—ভয় আছে, কিন্তু এক অন্যরকম নিরাপদ অনুভূতিও আছে। শেষমেষ, নিশিতা হালকা শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ফারিসের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। নিশিতা শুয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফারিসও ধীরে তার ওপর শুয়ে পড়লো।
বুকে মাথা রেখে নরম কণ্ঠে বললো,

“একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি জান?”
নিশিতার ছোট্ট শরীরের ওপর ফারিস শুয়ে থাকায় কিছুটা দম বন্ধ হয়ে এলো। কিন্তু কিছুতেই সে ভয়ে কিছু করতে পারছে না। চোখ তুলে ফারিসকে দেখলো—সব ভয়ের ভাবনা একদম মুছে গেলো।
হালকা ভোঁতা হাতে ফারিসের চুলে আলতো স্পর্শ করতে শুরু করলো। ফারিস চোখ বন্ধ করে আরাম নিয়ে শুয়ে রইলো।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৬

গভীর ঘুম হয়তো গত সাত বছরে একবারও হয়নি।
মনের মধ্যে এক শান্তি, এক ধরনের মানসিক স্নান—যা তাকে পুরোপুরি শিথিল করে দিয়েছে। হয়তো ফারিসের মানসিক শান্তিই এখন তার নীলাম্বরী। নিশিতা নিজেও সেই শান্তি অনুভব করলো। ফারিসের কাছাকাছি, তার উষ্ণতার কাছাকাছি… মনটা অজান্তেই স্বস্তি পেলো। ঘরটা নিস্তব্ধ, কেবল ফারিসের নিঃশ্বাস আর নিশিতার ছোট্ট হাতের আলতো স্পর্শ। বাইরে রাতের নিস্তব্ধতা, ভিতরে অদ্ভুত এক নীরবতা—সব মিলিয়ে যেন সময় থমকে গেছে।

চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৭