Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ১১

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১১

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১১
নূরায়েশা মাহনূর

প্রিন্সিপালের রুমে টানটান এক রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা ঝুলে আছে বাতাসে। প্রিন্সিপালের সামনের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে আছে সাইফ। অপলক নয়নে চারপাশ চষে যাচ্ছে। তার পিছন দিক থেকে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইমন।
তাদের থেকে খান চারেক হাত দূরে বসে আছে তখনকার ছেলেটা। ছেলেটার নাম সজল। এলাকার বিত্তশালী পিতার চশমাধারী বিপত্তি ।সার্টিফিকেটে নাম লেখালেও বইয়ের পাতার প্রতি চিরবৈরী সম্পর্ক তার। তবে কুকর্মের পাঠ্যক্রমে সে এক পরীক্ষিত তুঘলকি পণ্ডিত। ক্লাসরুম হোক কিংবা করিডোর, মেয়েদের দিকে কু-ইঙ্গিত ছুঁড়তে ছুঁড়তে হাঁটাটাই তার প্রাত্যহিক সাধনা।

আর তার এই অপকর্মের আড়ালে সুরক্ষা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার পিতা। কলেজ কমিটির জঘন্য একজন সদস্য । বাবার পরিচয়টাই সজলের রক্ষাকবচ। একটা অভিযোগ আসে, দুইটা তদন্ত হয়, তিনটে সাক্ষী পালিয়ে যায়। চতুর্থ দিনে দেখা যায়, অভিযোগ গায়েব। সবচেয়ে বড় বিদ্রুপ হলো, শিক্ষক মহলে কেউ গলা উঁচু করে বলেনা সজল দোষী। চোখের সামনে শত অপরাধ হলেও, বারবার শাসনের মুখে কুলুপ এঁটে গেছে কর্তৃপক্ষ।
দুর্ভাগ্য কখনো কখনো নিজেই দিকদিশা খুজে নেয়।আর আজকের দিনে সেটা ঠিক সজলের গলা চেপে ধরেছে। আজ তার ভাগ্য খারাপ, অথবা বিধির শুদ্ধতম প্রতিশোধ, সজলের এই আত্মম্ভরিতার কার্নিভাল এসে ঠেকেছে সাইফ নামের এক বিপরীত স্রোতে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

প্রতিপত্তির দেয়ালও কিছু সময় ভেঙে পড়ে,আর আজ সজলের বাবার ঐ প্রাচীরবদ্ধ অহংকারে চিড় ধরেছে সেখান থেকেই। ইতিমধ্যেই খবর পৌঁছে গেছে তার দরজায়। ফোনের অপর প্রান্তে চেনা সেই গর্জন নিয়েই বলেছেন,
– আপনাদের কলেজ কী করে! ওকে ছেড়ে দেন এখনই! আমার ছেলে কোনো বাজে কাজ করতে পারে না!
প্রথমে গলা চড়িয়েছেন, চেনা নিয়মে হম্বিতম্বি করেছেন। অভিজাত ফোনের স্পিকারে শব্দগুলো বাঘের হুংকারের মতো শোনালেও সাইফের কেবল দুটি শব্দ বলেছিলো,
– আপনার ছেলের ভিডিও আমি নিজের মোবাইলে রেখেছি।
শব্দের এমন শীতলতা সজলের বাবার স্পাইন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তখন আর বাঘের গর্জন থাকেনি রয়ে গেছে কেবল হাঁপানির মতোন নিঃশ্বাস। আর তখনই তড়িঘড়ি গাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করে কলেজে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।

– স্যার, আমাদের যেতে হবে… যা করার তাড়াতাড়ি করুন।
টেবিলের গায়ে আঙুল ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে কথাটা বললো সাইফ। প্রিন্সিপাল চমকে উঠে তাকালেন তার দিকে।
আস্তে বললেন,
– ওর বাবা আসুক… তারপর আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।
সাইফ এবার চোখের ভাষায় আগুন ঢেলে দিয়ে বললো,
– কোনো বাবা-টাবার জন্য বসে থাকার দরকার নেই।
ওকে এই মুহূর্তে কলেজ থেকে বহিষ্কার করুন। এর আগেও বহু অভিযোগ উঠেছে এই ছেলের নামে। তখন প্রমাণ ছিল না, আপনারা কিছুই করতে পারবেন না প্রমাণ ছাড়া এই বুলি আওড়েছেন। আজ প্রমাণ আছে, ভিডিও আছে প্রয়োজনে ভুক্তভোগীর জবানবন্দি নিবো৷
প্রিন্সিপালের কণ্ঠে এক চাপা অস্বস্তি,

– কিন্তু…
সাইফ এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি কিছু বলতে যাবে এমন সময় শোনা গেলো আরেকটা অনাহূত কন্ঠস্বর।
– কী কিন্তু কিন্তু করছেন স্যার? একটা ছেলে কলেজের মতো একটা সম্মানিত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে মেয়েদের সঙ্গে অসভ্যতা করবে আর তার বিচার করতে আপনাদের এতো সময় লাগে?
দরজার বাইরে থেকে গর্জে উঠলো কণ্ঠস্বরটি। আর মুহূর্তেই দপ্তরের ভারী বাতাস কেঁপে উঠলো। সবার দৃষ্টি ঘুরে গেল দরজার দিকে। সেইখানে দাঁড়িয়ে আছে উজান। উজান এগিয়ে এসে সাইফের পিছনে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তীক্ষ্ণ চোখে সে সরাসরি তাকালো প্রিন্সিপালের দিকে। প্রিন্সিপাল গলায় অস্বস্তি চেপে বললেন,

– আপনি কে?
– একটু আগে যার সঙ্গে অসভ্যতা করা হয়েছে, আমি তার গার্ডিয়ান। দেখতে এলাম, কি ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছেন আপনারা।
ঠিক তখনই উজানের পেছন থেকে আরও একজোড়া পদচারণা ভেসে এলো। ভেতরে এসে থমকে দাঁড়ালো দৃষ্টি। উজান এবার একে একে সব মুখ পরখ করলো। হঠাৎই তার চাহনি আটকে গেল ইমনের মুখে। চোখ কুঁচকে উঠলো। মনের ভেতর একঝটকা বিদ্যুৎ খেলে গেলো। এই ছেলে এখানে কী করছে? গলার কাছে ক্রোধ জমে উঠলো থোকা থোকা হয়ে। অর্থ খোঁজার দরকার হলো না আর । উজানের মস্তিষ্কে ঝড়ের মত একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো, এই ছেলেই কি তাহলে আফরার সঙ্গে…?!
চোয়াল শক্ত হলো, ধমনী ফুলে উঠলো দুই হাত রাগে ফেটে পড়লো যেন। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইমনের কলার দু’হাতে চেপে ধরলো উজান। ব্যাপারটা বুঝতে পারলো দৃষ্টি। একটু উঁচু গলায় বলে উঠলো,

– উজান ভাই! উনি না… ওই যে, ও!
দৃষ্টি হাত তুলে ইশারা করলো কোণার চেয়ারটার দিকে। উজানের চোখ ঘুরে গেল সেদিকে। মুহূর্তেই ইমনের কলার ছেড়ে দিল সে। চোখ নামিয়ে ঠোঁটের কোণে কষে বললো,
– তোকে তো পরে দেখে নিবো…
এরপর নির্ভুল পায়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল উজান। ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে আছে। সামনে গিয়ে হঠাৎই উজান এক হাতে সজলের চুল মুঠো করে চেপে ধরলো। আরেক টানে মুখটা ফিরিয়ে আনলো নিজের দিকে। মুহূর্তেই বজ্রপাত নামলো তার চেতনায়।

– সজল? তুই?
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, নতনয়নে অপরাধীর মতো কুঁকড়ে উঠলো সজল। উজানকে এভাবে সামনে দেখতে হবে, এটা কল্পনাতেও ছিল না তার। লজ্জার দহন আর অপরাধবোধে কেঁপে উঠলো তার সমস্ত অবয়ব। দৃষ্টি কিছুটা থমকে গেল। চোখে ছায়া পড়লো সংশয়ের। কী সম্পর্ক এদের? উজান কীভাবে চিনে এই ছেলেকে? ভ্রু দুটি নিজের অজান্তেই কুঁচকে উঠলো তার।
রাগে উজানের কণ্ঠহীন শরীর আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসতে লাগলো। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে শটান এক চড় বসলো সজলের গালে।

– এখনো সেই নোংরা অভ্যেস পাল্টাসনি তোর ?
গর্জে উঠলো উজান। চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে নিস্তব্ধতা, শব্দ হারিয়ে গেছে সময়ের গহ্বরে। সকলে নীরব দর্শকের মতো দেখছে। কেবল একমাত্র ব্যতিক্রম সাইফ। টেবিলের দিকে তাকিয়ে কাঁচের উপর নিজের আবছা প্রতিফলন দেখছে সে। ঠোঁটের কোণে খেলে গেলো তার মৃদু হাসি৷ সেই খেলে যাওয়া তার হাসিটা হাসি নয়, বিষে ভেজানো ব্যঙ্গ। চোখের দৃষ্টিতে লুকানো তাচ্ছিল্যের ধারালো শান।
– উজান ভাই… আমার ভুল হইছে… মাফ করে দেন…
ভাঙা কণ্ঠে মাথা তুলে কথাটা বললো সজল। কথা শেষ হতেই উজানের হাত চেপে বসলো তার চোয়ালের উপর। ধূমায়িত ক্রোধে উজানের চোখ দুটো রক্তজবার মতো জ্বলছে।

– মাফ?
উন্মত্ত হুংকারে ঘরটা কাঁপিয়ে উঠলো তার কণ্ঠ।
– তোকে মাফ করার প্রশ্নই ওঠে না। কোনোদিন না।
ঠিক তখনই সেখানে প্রবেশ করলো সজলের বাবা, সাইদুল। দরজার চৌকাঠ পেরোতে না পেরোতেই চিৎকারে ফেটে পড়লো,
– কই দেখি, আমার ছেলেটা আবার কি কাণ্ড করলো!
বলে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলো ছেলের দিকে। গম্ভীর পরিবেশকে অগ্রাহ্য করেই প্রিন্সিপালের সামনে থাকা একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো সে। চোখ তুলে সোজা তাকালো সাইফের দিকে।
– কী হয়েছে? সমস্যা কোথায়? কী এমন করেছে ও?
সাইফ ঠান্ডা কণ্ঠে জবাব দিলো,

– আপনার ছেলে কী করেছে সেটা বললে আপনি চোখ তুলে তাকাতে পারবেন না, সাইদুল সাহেব।
সাইদুল বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে হাসল,
– আগে বলো না, শুনে নিই। তারপর ঠিক করবো চোখ দেখাবো কিনা।
ইমন পাশ থেকে বলে উঠলো,
– আপনার ছেলে কলেজে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে বেড়ায়। আজকেও এক মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে।
কথা শেষ হতে না হতেই সাইদুল একরাশ অবজ্ঞা নিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো। যেন কোনো ঠুনকো কৌতুক শুনে ফেলেছে সে।

– এই আর এমন কী! ছোট মানুষ, একটু ভুল করে ফেলেছে। আর তাতেই এমন বিচারসভা বসাতে হয় নাকি! তোমরাও পারো বটে!
আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল সাইদুল কিন্তু তার মুখের শব্দগুলো জন্ম নেওয়ার আগেই গর্জে উঠলো সাইফের মুষ্টিবদ্ধ ক্রোধ। মুহূর্তে বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়লো এক ঘুষি, যা থেতলে দিলো সাইদুলের গাল। আঙুলে থাকা রুপোর আংটির ধার কেটে দিয়ে গেলো ঠোঁটের কোনা। লাল রক্তের রেখা গড়িয়ে পড়লো কাঁপতে থাকা থুতনিতে।
সাইদুলের মাথার ভেতর ঘূর্ণি তুললো অচেনা ঝাঁকুনি। চোখের সামনে ছায়া নেমে এলো। দিগভ্রান্ত দৃষ্টিতে হঠাৎ নিঃশেষ হয়ে গেলো আলো। সবাই স্তম্ভিত। চমকে উঠলো উপস্থিত প্রতিটি প্রাণ। প্রিন্সিপালের গায়ে বেয়ে নামলো আতঙ্কের শীতল ঘাম।

– সাইফ, কী করছো তুমি! উনি তোমার বয়সে অনেক বড়!
সাইফের চোখ দুটো জ্বলে উঠলো হিংস্র আগুনে। গলা থেমে থেমে ধারালো স্বরে বললো,
– কিন্তু একটা জানোয়ার। আর জানোয়ারের কোনো বয়স হয় না। সেটা বুড়ো হোক বা বাচ্চা, কামড়ালে উত্তর একটাই, পাল্টা ঘাত।
– সাইফ!
গর্জে উঠলো সাইদুল। নাক-মুখ চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে চিৎকার করলো,
– তুমি জানো আমি কী করতে পারি? আমাকে সম্মান দেওয়া উচিত তোমার! আর তুমি আমার গায়ে হাত তুলেছো?
তীব্র রক্তচাপের মধ্যেও সাইফের চোখে একফোঁটা কাঁপন নেই। তার বদলে কণ্ঠে জমে আছে তীব্র এক অবজ্ঞার শীতলতা।

– যারা মুখ ফুটে সম্মান চায় তারা আদৌ কতটুকু সম্মানযোগ্য আংকেল?
সাইফকে বলতে না দিয়ে, মুহূর্তেই বাতাসে জমে থাকা উত্তপ্ত ভার ছিন্ন করে, নীরবতার মাঝখানে কাঁপা কাঁপা দৃঢ় কণ্ঠে কথাটা বলে উঠলো দৃষ্টি। প্রতিটি শব্দ কাঠখড় পুড়িয়ে বের হয়ে এলো তার ভিতর থেকে। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো, দাঁড়িয়ে গেল সজল আর সাইদুলের মাঝখানে।
চোখে নিঃসীম ঘৃণা নিয়ে একবার তাকালো সজলের দিকে। এরপর ধীরে ফিরে তাকালো সাইদুলের দিকে। চোখ দুটো অগ্নিময়, কণ্ঠ বরফে ডুবানো তলোয়ার।

– আপনি কেমন বাবা? যিনি নিজের সন্তানকে ন্যূনতম শিক্ষা দিতে পারেননি! যে বয়সে উচিত ছিলো চরিত্র গড়ার, আপনি তাকে শিখিয়েছেন অন্ধ গর্বে চোখ বুঁজে থাকা। আপনার উচিত ছিলো ওকে কঠিনতম শাস্তি দেওয়া। যদি আপনি আদর্শ কোনো পিতা হতেন,তাহলে এতক্ষণে লজ্জায় আপনার মাথা হেঁট হয়ে মাটি স্পর্শ করতো। কিন্তু আপনি? আপনি গর্ব করেন! তার অপকর্মগুলোকে উল্টো ঢেকে রাখেন! আজ যদি আপনার নিজের মেয়ের গায়ে কেউ হাত দিতো, তাহলে? আপনি পারতেন এমন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে?
একটানা বলা শব্দগুলো তীক্ষ্ণ ফোঁড়নের মতো আঘাত করলো চারপাশে। এরপর সে ফিরে তাকালো সজলের দিকে। চোখে জ্বলে উঠলো অপরাধবোধহীন ঘৃণার জোয়ার।

– যদি আমার হাতে ক্ষমতা থাকতো, আমি আপনাকে আমার হিজাবে হাত দেওয়ার অপরাধে মৌমাছির মৌচাকের নিচে বেঁধে রাখতাম। তারপর এক এক করে ঢিল ছুঁড়তাম সেখানে। প্রতিটি দংশন আপনার চরিত্রহীনতার যন্ত্রণার প্রতীক হতো। আর আমি সেটা খুশি মনে দেখতাম। যেমন নির্লজ্জ বাপ, তেমন তার ছেলেও। ছি!
তীব্র ঘৃণার ছায়া ফেলে রেখে দৃষ্টি ধপধপ করে হেঁটে বেরিয়ে গেলো সেখান থেকে। উজান একবার ধীরে চোখ বোলালো চারপাশে। প্রতিটি মুখে জমাটবাঁধা নীরবতা। কেবল চেয়ারে বসে থাকা সাইফের চেহারা দেখতে পেলো না সে । মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু সাইফ উল্টো দিকে থাকায় তা আর হলো না। এবার সাইদুলের দিকে তাকিয়ে উজান বলে উঠলো,

– আপনার ছেলেকে সামলে রাখুন, ফুফা। না হলে পরেরবার মার খেয়ে মরে যাবে।
কথাগুলো ফেলে রেখে পিছন না ঘুরেই বেরিয়ে গেলো সে। সাইদুল হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলো তার চলে যাওয়ার পথের দিকে। এখনো ঠিক করে চিনে উঠতে পারেনি তাকে। চেনা সেই চোখ? সেই কণ্ঠ? উজান… দেশে ফিরলো কবে? আর এসেই বা কী করছে এখানে?মনের ভিতর হঠাৎ ঝড় তুলে দিয়ে, উত্তরহীন প্রশ্নগুলো ফোঁড়ার মতো বিঁধে রইলো সাইদুলের চোখেমুখে।
সব কিছুর অবসান টেনে এবার সাইফ অনড় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। মেরুদণ্ড টানটান করে ডান হাতে থাকা রুপোর মোটা ব্রেসলেটটা একটুখানি ঠেলে তুললো কনুইয়ের কাছে। তারপর সোজা চোখ রেখে তাকালো প্রিন্সিপালের দিকে। রুক্ষ, ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠলো,
– আজকের মধ্যে যদি ওকে বহিষ্কার না করেন, তাহলে বাকি ব্যবস্থা আমি নিজেই নেব স্যার।
শব্দগুলো শেষ না হতেই ঠোঁটে একটুখানি টেনে আনলো সৌজন্যসূচক চূড়ান্ত শীতল এক হাসি। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে পা বাড়ালো দরজার দিকে। যেতে যেতে বাহু থেকে গলায় তুলে নিলো গায়ে থাকা কালো চাদরটা ।

চৌধুরী বাড়ির ছাদখোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি। চোখ তার স্থির আকাশে। অসীম নীলের ভেতরেই খুঁজে ফিরছে নিজের ছেঁড়াখোঁড়া অস্তিত্ব।
সময়… কী অদ্ভুত প্রবাহ তার। কারো অপেক্ষায় থামে না, কারো আহ্বানে দিক বদলায় না। সে শুধু এগিয়ে চলে, নির্মম এক চলাচলের নাম হয়ে। দৃষ্টি গভীর শ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইলো সেই অনন্তগতি আকাশের দিকে।
এই বহমান সময়ই কতকিছু কেড়ে নিয়েছে তার থেকে। কেড়ে নিয়েছে তার ছিলো যত সুখ শান্তি । এখন তো সে কেবল এক কাচের পুতুল মাত্র, আলোয় ঝিলমিল করে বটে, কিন্তু স্পর্শে ভেঙে যাওয়ার ভয় তাকে প্রতিনিয়ত ছুঁয়ে থাকে। তার ভেতরটা… এক বিষাক্ত অতল গহ্বর। বাইরে থেকে যতই শক্ত আবরণে মুড়ে রাখুক নিজেকে, ভিতরে ভিতরে এক অনিঃশেষ যন্ত্রণা শিকল বেঁধে টেনে নিয়ে যায় তাকে অজানা নরকের দিকে।

আচ্ছা, যদি এই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দাগগুলোও মুছে যেতো? যদি কলঙ্কগুলো ধুয়ে গিয়ে নামহীন অতীতে হারিয়ে যেতো? তাহলে কি পৃথিবীর ভার কিছুটা কম হতো তার কাছে? তাহলে কি বুকের ভেতর জমে থাকা এই অনাহুত ক্লান্তি একদিন ধুয়ে যেতো বৃষ্টির মতো?তাহলে কি খুব খারাপ হতো? নিশ্চয়ই খুব খারাপই হতো! নাহলে তো আরো আগেই এই কলঙ্ক দুয়ে মুছে ছাফ হয়ে যেতো।
দৃষ্টি একের পর এক নিশ্বাস ছাড়ছে। প্রতিটা শ্বাস অন্তর্গত অতল ভার নিয়ে আসছে । আজ বুকটা অকারণেই ভারী, একরাশ অস্থিরতা চেপে বসেছে হৃদয়ে। কিছুক্ষণ আগেই গোসল সেরেছে সে। ভেজা চুলগুলো খোলা রেখেই ছাদে দাঁড়িয়েছিল; বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে সেগুলো।

– দৃষ্টি!
হঠাৎ পিছন থেকে ভেসে এলো উজানের কণ্ঠ। আঁতকে উঠলো সে। চমকে গিয়ে তাড়াতাড়ি শাড়ির আঁচলটা মাথায় টেনে নিলো। শরীরটা খানিক সঙ্কুচিত করে ধীরে ঘুরে তাকালো উজানের দিকে।
উজানের চোখ স্থির হলো তার উপর। সময়ের ফ্রেমে আটকে পড়লো উজান। দৃষ্টির মুখের ছায়া, জলছোঁয়া কপাল, ভেজা চুলে বাতাসে ধরা নীলাভ সুবাস সব মিলিয়ে এক অনবদ্য শান্তি ছড়িয়ে ছিল তার চারপাশে।কি স্নিগ্ধ লাগছে তাকে দেখতে!
– তোর সাথে একটু কথা বলতে চাই… প্লিজ।
নীরব কিছু মুহূর্ত পেরিয়ে দৃষ্টি সংযত আবছা কাঁপা স্বরে শুধু বললো,
– হুম।

উজান গভীর এক নিঃশ্বাস ছাড়লো। বুকের কোণে জমে থাকা শত প্রশ্ন এক মুহূর্তে বেরিয়ে আসতে চাইলো। ধীরে গিয়ে দাঁড়ালো ছাদের রেলিঙের পাশে। আকাশে চোখ ফেললো। আধো আলো, আধো অন্ধকারের দোলাচলে চাঁদ বিষণ্ণ কোনো স্বপ্নের মতো ঝুলে আছে। সে চাঁদ দেখলো, আবার দেখলো না। দৃষ্টির ভিতরে গেঁথে থাকা এক অনুভব তাকে অন্য কোথাও টেনে নিচ্ছিল। কিছুটা সময় নির্বাক দাঁড়িয়ে হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,
– তুই আমাকে ভালোবাসিস, দৃষ্টি?
হেসে উঠলো দৃষ্টি। বুক ফাটিয়ে হাসি এলো তার। তবে তা প্রকাশ করলো না। উজানের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে সে তাকালো সুদূরে।

– ভালোবেসে ছিলাম, এখন বাসি না!
উজান স্থির হয়ে গেলো। একটা শব্দ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো, ছিলো? তাহলে নেই কেনো আজ? এই প্রশ্নগুলো ঝড় তুললো উজানের চোখে-মুখে।
– ছিলি মানে? এখন বাসিস না?
উজানের কণ্ঠে বিস্ময়ের রুদ্ধস্বর। ভেতরে কোথাও তীব্র কোনো ছুরির আঁচড়।
– না।
শব্দটা আসলো দৃষ্টির ঠোঁট থেকে নিঃসংকোচে। নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দিলো সে।
– এখন বাসিস না কেনো?
উজানের প্রশ্নটা এবার একটু কাঁপলো। দৃষ্টি এবার একটু হাসলো, কিন্তু সে হাসির কোনো রঙ নেই। কেবল কণ্ঠে ঝরে পড়লো শুষ্ক এক স্বীকারোক্তি।

– আমি আদৌও আপনাকে কখনো ভালোবেসেছি কিনা আমার জানা নেই। হয়তো ক্ষনিকের মোহকে আমি ভালোবাসা বলে ভুল ভেবেছিলাম। না হলে বলুন তো উজান ভাই, এত সহজে আমি কীভাবে আপনাকে ঘৃণা করতে পারি?
এই শেষ কথাগুলোতে শীতল শ্বাস বয়ে গেলো চারপাশে। বলেই দৃষ্টি মাথা ঘুরিয়ে স্থির চোখে তাকালো উজানের দিকে। সে চাহনিতে কোনো নরমপনা নেই, নেই চেনা কোনো কোমলতা। চোখজোড়া উপপতিত ভালোবাসার উপহাস বয়ে আনছে।
উজান গিলে ফেলতে চাইলো একটা ভারী ক্লান্তি, কিন্তু গলায় কিছু একটা আটকে রইলো। বুকের মাঝখানে জমে থাকা শোকের ভারটা ধীরে ধীরে চাপা দিতে থাকলো তাকে। শ্বাসটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠলো।

– আমার উপর অভিমান জমেছে তোর, তাই না?
– যাদের গায়ে কলঙ্ক থাকে, অভিমান তাদের শোভা পায় না উজান ভাই।
দৃষ্টির কণ্ঠে বিষ, সেই বিষ উজানের শ্রবণইন্দ্রিয় ভেদ করে ঢুকে গেলো মগজ পর্যন্ত ।
– দৃষ্টি!
– হ্যাঁ উজান ভাই আমি একদম ঠিক বলছি। যদি নাই হয়, তাহলে বলুন তো, সেদিন কেনো আপনি আমাকে বিয়ের আসরে রেখে চলে গেলেন? আমি তো ততদিনে আপনাকে নিজের ভেতর আঁকিয়ে ফেলেছি, মনে মনে জেনে নিয়েছি আপনিই হবেন আমার প্রিয়তম, আমার অর্ধাঙ্গ। জীবন আরো একবার সুযোগ দিয়েছিলো আমায়… ভাবলাম, এই বুঝি একটুখানি সুখ আমার হাতের মুঠোয় ধরা দেবে। কিন্তু দেখুন তো সেই সুখ আমায় ছুঁয়ে দেখা তো দূরে থাক, আমার চোখের দৃষ্টির মাঝেও আসেনি।

এই বলে এক তাচ্ছিল্য মাখানো হাসি ছুঁড়ে দিলো দৃষ্টি। ভাঙা মন নিয়ে এক ব্যর্থ প্রেমিকাকে ঠিক যেমন হাসি মানায়। উজান স্থবির দাঁড়িয়ে রইলো। দৃষ্টির প্রতিটা শব্দ আগুনে ভেজা কাঁচের মতো ছিন্ন করছে তাকে। অনন্ত এক অপরাধবোধে, এক অন্তর্জ্বালায় সে পুড়তে লাগলো নিরবে ।
– আমি তখন অনেক কিছুই মেনে নিতে পারিনি, দৃষ্টি।কিন্তু এই পাঁচ বছর আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে আমি বোধহয় তোকে ভালোবেসে ফেলেছি। সেদিন তোর হাত ছেড়ে যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল ছিলো।
– বোধহয়!
দৃষ্টি ঠোঁট বাঁকালো। এক অদ্ভুত শীতল নির্লিপ্তিতায় আবারো বলে উঠলো,

– না উজান ভাই, আপনি কোনো ভুল করেননি। আপনি নিজের জন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। আপনার মতো নিখুঁত পুরুষের আমার মতো একটা মেয়েকে গ্রহণ করার কোনো কারণই ছিল না।
– তবুও…আমাকে কি… ক্ষমা করা যায় না?
উজানের কণ্ঠ ডুবে গেল একরাশ অনুশোচনায়। দৃষ্টি এবার চোখ তুলে স্থির দৃষ্টিতে তাকালো তার চোখে।তারপর এক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,

– জানেন উজান ভাই, জীবন আমার থেকে একে একে সব কিছু ছিনিয়ে নিয়েছে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত আমি নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করেছি।অসহ্য যন্ত্রণার মাঝে হাঁপিয়ে উঠেছিলাম আমি। তারপর এলেন আপনি। ভেবেছিলাম, এই বুঝি মুক্তি…এই বুঝি যন্ত্রণার শেষে একটু শান্তি। কিন্তু না ভাগ্য সেইটুকু পরিণতিও আমার কপালে লেখেনি। প্রতিদিন আমি একটু একটু করে নিজেকে মে’রে ফেলেছি ভিতর থেকে। ভীষণ ইচ্ছে হয়েছিলো, নিজেকে উৎসর্গ করে দিই। কিন্তু পারিনি। কারণ এতটা পাথর আমার হৃদয় নয়। আমি রক্তমাংসের মানুষ। অল্পে জ্বলি, তীব্রে পুড়ি, আর থেকে থেকে নিঃশেষ হয়ে যাই। বলুন তো, এমন জ্বলে-পোড়া খাঁ খাঁ অন্তর নিয়ে কীভাবে আপনাকে ক্ষমা করি আমি? বলুন উজান ভাই… কী দিয়ে ক্ষমা করবো? যেখানে ভেতরেই আর কিছু অবশিষ্ট নেই আমার ?

উজান এবার ধীরে এক পা বাড়িয়ে এলো সামনে। এগিয়ে এসে খুব সন্তর্পণে ধরে ফেললো দৃষ্টির দুটো হাত। আলতো মর্মস্পর্শী স্পর্শে হাতজোড়া টেনে নিলো নিজের দিকে। চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বললো,
– প্লিজ দৃষ্টি… একবার, শুধু একবার ক্ষমা করে দেখ।আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এমন ভুল আর কোনোদিন করবো না। আমরা আবার শুরু করবো…বিয়ে করবো আমরা। আমাদের হবে একটুখানি ঘর, তাতে থাকবে ভালোবাসা, ভরপুর শান্তি। তোর সব কষ্ট আমি মুছে ফেলবো, দৃষ্টি। কথা দিলাম!
দৃষ্টি মৃদু এক হাসি হাসলো। একটা ব্যথার হাসি। যার নিচে চাপা পড়ে আছে হাজার মৃত স্বপ্ন। ধীরে, অতি স্নিগ্ধ ভঙ্গিতে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিলো উজানের থেকে। কণ্ঠ আগের মতোই মৃদু রেখে নরম স্বরে বললো,
– আমি অনেক আগেই নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছি, উজান ভাই। এখন আমার কাছে কিছু নেই দেয়ার মতো। আমি দিনে দিনে নিঃশেষ হবো আর আপনি দেখবেন। দেখতে দেখতেই আপনাকে পেয়ে বসবে এক মরণব্যাধি। এমন এক মরণব্যাধি, যার নাম অনুশোচনা!

বলতে বলতেই দৃষ্টির গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুটি অশ্রুবিন্দু। কিন্তু তার ঠোঁটে আঁকা এক অব্যাখ্যাত আশ্চর্য সাবলীল হাসি। এই দৃষ্টিকে চিনতেই পারলো না উজান। চোখ কথা বলে এক, আর ঠোঁট বলে আরেক। দৃষ্টির চোখে ঝরে পড়ছে এক আশ্রয়চ্যুত অতীত, আর ঠোঁটে খেলে যাচ্ছে এক নির্মম চূড়ান্ততা। এই দ্বৈততা বিভ্রান্ত করে দিলো উজানকে। সে দাঁড়িয়ে গেলো দুটি বিপরীত স্রোতের ঠিক মাঝখানে।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১০

আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলো না দৃষ্টি। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন না তাকিয়েই হাঁটা ধরলো। অজান্তেই মাথার আঁচল পড়ে এলো নিচে, আর সেই পতনের মাঝেই তার পা দুটো হঠাৎ গতি নিলো। চলার ছন্দটা রূপ নিলো দৌড়ে।
এক হাতে চোখের জল মুছতে মুছতেই সে দৌড়ে গেলো সামনে। হাওয়ার বেগে তার লম্বা চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে হাটুর কাছে এসে দুলে উঠলো। আর ঠিক সেই দিকেই অপলক তাকিয়ে রইলো উজান। প্রতিটি শ্বাস আটকে গেলো ফুসফুসের ভেতর।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১২