Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৩

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৩

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৩
নূরায়েশা মাহনূর

– ভাই আছেন, আসবো?
চোখের পাতা না ফেলেই মোবাইলের পর্দায় স্থির দৃষ্টি গেঁথে রেখেছিল সাইফ। ইমনের কণ্ঠে মুহূর্তে স্ক্রিন বন্ধ করে দরজার দিকে তাকালো । তার দিকে চাইলো মাত্র একবার, সংক্ষিপ্ত ওজনদার স্বরে বললো,
– আয় ভেতরে।
– অবস্থা সুবিধার না ভাই…খবর ভালো না।
কথাটা বলতে বলতেই ঘরের গভীরে পা ফেলে ধীরে ধীরে খাটের এক কোনায় বসে পড়ল ইমন। সাইফ চোখ তুলে তার দিকে তাকালো, কপালের ভাঁজে প্রশ্নচিহ্নের রেখা। গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

– কী হয়েছে?
– সজলকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ভাই। কালকে নাকি রাতের আঁধারে কোথাও বের হয়েছিল… তারপর থেকে ওর কোনো খোঁজ নেই। সাইদুল এখন আমাদের দিকেই আঙুল তুলছে।
– কিন্তু আমরা তো কিছুই করিনি!
সাইফের কণ্ঠে অবাক বিস্ময়। ইমন এবার কণ্ঠে চাপা উদ্বেগের শিহরণ নিয়ে বলে উঠলো,
– ২৪ ঘণ্টা পেরোবার আগে তারা কিছু করতে পারবে না। তবুও একজন ফোন করে বলেছে আপনার নামে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মামলা বোধহয় একটা করতে পারে।
– আরে বাদ দে এসব মামলা-মকদ্দমার ভয়। সজল কি শিশু যে হারিয়ে যাবে? নিশ্চয়ই কোনো জায়গায় লোকলজ্জার ভয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে।
সাইফ দৃঢ়তা নিয়ে কথাটা বলে উঠতেই ইমন এবার গলার স্বর ধীরে নিচে নামালো। কোনো অজানা আশঙ্কাকে লুকিয়ে বলে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– ভাই… আমার কিন্তু কিছু একটা গোলমেলে লাগছে। অন্য কিছু মনে হচ্ছে আমার।
শব্দগুলো বাতাসে ঠেকলো। সাইফ চোখ কুঁচকে ইমনের মুখের দিকে তাকালো।
– কী মনে হচ্ছে তোর?
– ভাই!
কণ্ঠের ভিতরটা শুকিয়ে এলো ইমনের। একটা শুষ্ক ঢোক গিললো সে, গলার ফাঁকে আটকে থাকা ভয়টাকে গিলে ফেলতে চাচ্ছে। তার কণ্ঠে যে আতঙ্ক লুকোনো ছিলো তা সাইফের চোখ এড়ালো না। মুহূর্তেই কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হলো।
সাইফ মাথা হালকা উপর-নিচ নাড়ালো। ইমনের চোখে চোখ রেখে সে-ইশারায় কিছু একটা বুঝালো। ইমনও সম্মতির সিল মেরে দিলো মাথা ঝাঁকিয়ে। দুই দিকের বোঝাপড়া একমুহূর্তে মূর্ত হয়ে উঠলো নীরবতায়।
সাইফ দুহাতে চেপে ধরলো নিজের চুল, ভেতর থেকে উঠে এল এক চাপা, ভারী জড়ো শ্বাস। নিজের সত্তাকে স্থির করতে চাইলো, কিন্তু ভেতরে ভাঙনের শব্দ স্পষ্ট।

– ভাই… যদি সত্যিই…?
কথাটা শেষ করতে পারলো না ইমন।
– চুপ কর, ইমন।
সাইফের কণ্ঠে আগুন জ্বলে উঠলো। কিন্তু সে আগুন শীতল ভয়ংকরভাবে স্থির।
– এই ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা কর। দ্রুত কোনো ব্যবস্থা কর‍তে হবে। আর যারা পথের কাঁটা হবে তাদেরও সেই ব্যবস্থা করে ফেল। এই ঘটনার সমাপ্তি এখানেই!!
– কী সমাপ্তির কথা হচ্ছে ভাইয়া?
দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকা কণ্ঠটা পাথর ছুঁড়ে দিলো নিস্তব্ধ জলে। সাইফ আর ইমন তড়িঘড়ি করে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো সেদিকে। চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলিমা। চোখে মুখে অনভিজ্ঞ কৌতূহল।সাইফের চোখে এক ঝলক ভয় খেলে গেল, তবে মুহূর্তেই সেটাকে চাপা দিলো অভ্যস্ত দক্ষতায়।
নীলিমা হাসি মাখা মুখে ঘরে ঢুকে পড়লো। ট্রে-টা রাখলো খাটের পাশের ছোট গোল টেবিলটায়। তার কণ্ঠে স্বাভাবিক উদ্বেগের সুর,

– কী হয়েছে ভাইয়া? এমন মুখ গোমড়া কেন?
সাইফ ঠোঁটের কোণে টেনে তুললো এক কৃত্রিম হাসি।চেহারায় নিছক বিরক্তির মুখোশ টেনে বললো,
– আরে, তুই বুঝবি না এসব… বাবার পার্টির ব্যাপার স্যাপার। ঝামেলা সামাল দেওয়ার মতন প্যাঁচের কথাবার্তা তুই কি বুঝবি বল।
কথাটা বলতে বলতেও সাইফের চোখে থরথর করে কাঁপছে একটা শীতল সঙ্কেত যা নীলিমা ধরতে পারলো না। নীলিমা মুখটা ছোট করে একপাশে বসে পড়লো সাইফের ঠিক গা ঘেঁষে। চোখেমুখে অভিমানের ছায়া, ঠোঁটে জমে থাকা কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে উগরে দিলো,

– ভাইয়া, তুই আর বাবা এখন আর আগের মতো আমাকে সময়ই দিস না। সারাদিন এই ঘরে আমি একা একা পঁচে যাই! বাবা তার দৌড়ের উপর থাকে , অফিস-পার্টি এসবে মিশে থাকে । আমি কি কোন ধরণের গৃহসজ্জার অংশ? সাজিয়ে রেখেছিস আমাকে শুধু? তুইও সময় দিস না, তুই তো সারাদিন এই ছাগলটার সাথে ঘুরঘুর করিস!
সাইফ চুপ করে বোনের কথা শুনছে। ইমন সবে চায়ের কাপ তুলছে হাতে। তাপটাপ না দেখেই একটা শান্তির চুমুক দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু এমন সম্মানজনক উপাধি শুনে তার হাতে ধরা কাপটা খানিক কাঁপলো । চোখে-মুখে এমন এক বিস্ময়ের রেখা ফুটে উঠলো, মনে হচ্ছে সে নিজেই জীবনে প্রথম নিজের পরিচয় জানতে পারলো।

– এক্স-কিউজ মি, আপা? আপনি কি কথাটা আমাকে বলেছেন?!
– আপনার গায়ে যেহেতু লেগেছে, আপনাকেই বলেছি।
নীলিমার মুখে নিঃসংকোচ উত্তর। তার জন্য ছাগল শব্দটিই ইমনের আনুষ্ঠানিক নাম। ইমন থমকে গেল। চোখে বিস্ময়ের রঙ আরও ঘন হলো।
– ভাই… আপনে কিছু বলবেন না? আমারে চোখের সামনে দাঁড় করায়া ছাগল বলতাছে ভাই! আমি কিন্তু অনেক রাগ করতাছি। আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে ভাই!
নীলিমা সেদিকে একবার তাকিয়েই ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

– ইশ! যে না, মাথা আবার গরমও হচ্ছে! এক কাজ করুন ভালো করে দেখুন, হয়তো মগজটা পুড়ে তাপ বের হচ্ছে, ধোঁয়া ওঠে কিনা দেখুন, দেখুন !
বলেই এক ভঙ্গিমায় সাইফের কাঁধে হেলে বসলো। ইমন দাঁতে দাঁত চেপে কয়েকটা গরম নিশ্বাস ফেলে নিজের রাগ সামলানোর লড়াই চালিয়ে গেল। তারপর নিজের ভেতরেই নিজেকে সামলাতে সামান্য মাথা নাড়িয়ে বলল,
– কুল ইমন, কুল… এই বাড়িতে তোর কোনোদিনই সম্মান ছিলো না, থাকবেও না। অতএব চায়ের কাপ ধর, দুটো বিস্কুট চিবা, চানাচুর মুখে পুরে দুনিয়ার অপমান গিলে ফেল, এটাই শেষ শান্তির পথ। এমন অপমান তো তোর সয়ে যায় , তোর না হজম ক্ষমতা অসীম?
বলেই ইমন রীতিমতো বেহায়া ভঙ্গিতে নাস্তার ট্রে নিজের দিকে টেনে নিলো। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এক দার্শনিক নিশ্বাস ছাড়লো। ভাবখানা এমন জীবনের সব হতাশা আজ এই চায়ের কাপে চুবিয়ে ফেলে দিয়েছে।

– আপনার মুখটা একটু বেশিই চলে রিনা খান আপা, তবে চা দারুণ বানান। চা বানানোর ক্ষেত্রে আপনি জাতীয় সম্পদ! আপনাকে যাদুঘরে রাখা উচিত।
নীলিমা সঙ্গে সঙ্গে চোখ গোল করে সোজা সাইফের দিকে চেয়ে উঠলো।
– ভাইয়া! আমাকে রিনা খান বলছে? ইনডাইরেক্টলি আমাকে দ/জ্জাল বলছে! আমি কি সত্যিই দ/জ্জাল ভাইয়া?
সাইফ শান্ত, চোখে নিষ্প্রাণ বিরক্তি। ইমন চায়ের কাপ হাতে আঁতকে উঠলো।
– আল্লাহ! কী বলেন আপা? আপনি আমাকে এরকম কথা বলতে শুনছেন? ছিঃ ছিঃ… এই অপবাদ! আমি নিতান্তই একজন শান্তশিষ্ট, ঈমানদার, সমাজে লালিত এক নম্র তরুণ। আমি কারো জন্য দ/জ্জাল শব্দ উচ্চারণই করতে পারি না।
নীলিমা চোখ ছোট করে তাকালো তার দিকে। ঠোঁটে টেনে আনলো এক নিষ্ঠুর হাসি।

– আপনার এই ওভার অ্যাক্টিংয়ের জন্য আজ আপনি আমার বানানো নাস্তা খেতে পারবেন না। দেন চায়ের কাপ দেন।
ইমন চায়ের কাপ নিজের বুকে আঁকড়ে ধরলো। এটাই এখন তার জীবনের শেষ অবলম্বন। মনে হচ্ছে কেউ তার সন্তানের কাস্টডি কেড়ে নিতে এসেছে!
ট্রে-টা টেনে নিতে হাত বাড়ালো নীলিমা চোখেমুখে এক সুনিপুণ প্রতিশোধের ঝলক। ঠিক তখনই ইমন খাট থেকে প্রায় লাফ দিয়ে উঠে করুণ ভঙ্গিতে বললো,
– না না না, আপা! আপনি এত সুন্দরি, হৃদয়বতী, পরম মমতাময়ী একজন মানুষ হয়ে… গরীবের মুখ থেকে শেষ খাবারের টুকরোটা কেড়ে নেবেন? আমার এই মুখটা দেখুন আপা… দেখুন কতটা অসহায় আমি।
নীলিমা ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইমন সে ফাঁকেই চালিয়ে গেল,

– আপনি তো পাষাণ নন আপা, আপনি তো কোমলতা দিয়ে গড়া এক ফুলের পাঁপড়ি। আপনার হৃদয় তো ছুঁয়ে দিলে মমতার ধ্বনি তোলে। অন্তত চায়ের কাপে এক চুমুক দেই, শুধু এইটুকু দয়া করুন আপা… প্লিজ!
ইমন আর নীলিমা নিজেদের মতো করে প্রতিদিনের মতই তর্ক-তামাশায় ব্যস্ত। কিন্তু এই হাস্যরসের আবহে সাইফের মন সম্পূর্ণ অন্যখাতে ভেসে যাচ্ছে। চোখে-মুখে অন্যমনস্কতা স্পষ্ট। ঠোঁটের কোণে জমে থাকা হাসিটা নিছক সামাজিক প্রহেলিকা। ইমনের বলা কথাগুলো এখনো তার মগজে ঘূর্ণি তুলছে।
যদি সত্যিই হয়ে থাকে…? না, না আগেই আবেগে ভেসে যাবে না সে। এখন তার দরকার ঠান্ডা মাথা। প্রথম কাজ, সত্যটা জানতে হবে। তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না কোনোভাবে। আর যদি সত্যি হয়… তাহলে? তাহলে এই ঘটনাকে এখানেই মাটি চাপা দিতে হবে।এই খেলা এখনো তার হাতে, আর এই হাতেই হবে সমাপ্তি… চূড়ান্ত আর চিরন্তন সমাপ্তি।

আকাশ আজ নিজ হাতে আঁকা এক জলরঙের ক্যানভাসের মতো লাগছে। নীল আর হালকা কমলা রঙ মিশে তৈরি করেছে এক অপার্থিব আবেশ। পূর্ব দিগন্তে সূর্য তার লাজুক মুখখানা আরো আগেই তুলেছে। আলোর কোমল রেখাগুলো ছুঁয়ে যাচ্ছে শহরের ছাদ।
পাখিরা জেগে উঠেছে অনেক আগেই। কোথাও কাকের ডাক, কোথাও শালিক কিংবা দোয়েলের কুজন। সবকিছু মিলে এক অদ্ভুত আবহ। চা’য়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। সবার জন্য চা করছে মরিয়ম। জানালার পাশে রাখা টবে ফুলেরা আজ একটু বেশিই হাসছে।

কিন্তু অরুণার কোলজুড়ে নিথর হয়ে আছে দৃষ্টি। দেহে জ্বরের দহন; রাতে তার তাপমাত্রা আরো অধিক ছিলো। সকাল হতেই সে চলে এসেছে অরুণার কক্ষে।সারারাত জ্বরের তিব্র দাবদাহে পুড়েছে সে। অরুণা ধীরে ধীরে দৃষ্টির চুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে । কোলের উষ্ণতায় স্থির হয়ে থাকা দৃষ্টির কণ্ঠে হঠাৎই ভেসে উঠলো এক প্রশ্ন। যার কোনো উত্তর নেই এই দুনিয়ার কোনো আয়নায়,
– আচ্ছা বড়মা, মানুষ যদি সবকিছু হারিয়ে ফেলে তখন কি তার আর কিছু পাওয়ার থাকে? নাকি সে শুধু নিঃশেষ হয়ে যায় এই পৃথিবীর আকাশতলে?

অরুণা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। তার চোখে এক দীর্ঘপ্রসার নীরবতা। কারণ সে জানে, জ্বরের ঘোরে দৃষ্টি প্রায়শই এইসব অসঙ্গত আর ভেতরে ভেতরে ক্ষত-বিক্ষত করা প্রশ্ন তোলে। যদিও এগুলোকে শুধুই প্রলাপ বলা যায় না। এগুলো দৃষ্টির হৃদয়ের পুঞ্জীভূত যন্ত্রণার গোপন ভাষ্য, কঠিন কষ্টের অদৃশ্য চিৎকার।
আজ থেকে পাঁচ বছর আগের এক নিষ্ঠুর গোধূলি মুহূর্তে, দৃষ্টির জীবনের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল এক নির্দয় রক্তাভ দৃশ্যপটে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে, দুর্বৃত্তদের হাতে খু/ন হয়েছিল তার মা-বাবা। দৃষ্টির চোখের সামনেই। এই নির্মম প্রত্যক্ষতা তার কৈশোরের কোমলতা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়ে রেখে যায় এক ভয়াল দহনচিহ্ন।

দৃষ্টি ছিল তাদের আদরের একমাত্র সন্তান। নরম তুলোর মতো লালিত-পালিত, অশুভ জগতের স্পর্শ থেকেও দূরে রাখা এক অপার ভালোবাসার কুঁড়ি। কিন্তু নিয়তির এক অজানা কালবৈশাখী হঠাৎ করেই তার সমস্ত রং কেড়ে নিয়ে তাকে দাঁড় করায় এক নিঃসঙ্গ বিপন্নতায়। সে দিন থেকে দৃষ্টি হয়ে পড়ে নিঃসহায় আর শিকড়ছাড়া। আর সেই শূন্যতার ভার বুকে নিয়েই অরুণা প্রতিজ্ঞা করেছিলো এই মেয়েটিকে সে কেবল নিজের পরিচয় দেবে।
তাই সে সিদ্ধান্ত নেয় উজানের সাথে দৃষ্টির বিয়ে দিয়ে তাকে শুধুই ঘরের মানুষ নয়, নিজের মেয়ে হিসেবেই গ্রহণ করবে। যেন দৃষ্টি কারও করুণা না হয়ে আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।ভাঙাচোরা পৃথিবীতে নিজেকে আবার নতুন করে গড়তে পারে।

কিন্তু বিয়ের আসর সেদিন এক শূন্য মঞ্চে পরিণত হয়েছিল মুহূর্তের ব্যবধানে। ফুলের গন্ধ, আলোর উজ্জ্বলতা সবকিছুকে উপেক্ষা করে উজান চলে গিয়েছিল। কেনো চলে গেছিলো সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা । অবশ্য অরুণা এখন পর্যন্ত উজানের থেকে কিছু জানতে চায়নি।
অরুণা নিজেও ভালোবেসে সংসার গড়েছিল। উজানের বাবাকে ভালোবেসে সমস্ত সামাজিক কাঠামো ভেঙে এসেছিলো তার ঘরে। আর সেই প্রেমই একদিন অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার নিজের রক্তদের চোখে। উজানের নানা রক্তে-গরম অপমানের আগুনে অরুণাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করেছিলো। তাদের এতটাই ঘৃণা জন্মেছিল যে, উজানের বাবার মৃত্যুবার্তাও তাদের হৃদয়ে সামান্য দয়া জাগাতে পারেনি।

শেষযাত্রায় একটি মুখও ফিরে তাকায়নি। এই পারিবারিক তাচ্ছিল্য, উপেক্ষা, এবং অপমানের ক্ষত উজানের বুকজুড়ে এমনভাবে জমাট বেঁধেছিল যে, সে শপথ করেছিল আর কখনো ওই রক্তের কোনো মুখের দিকেও ফিরবে না।
এদিকে দৃষ্টি অরুণাকে ভালোবাসতো নিজের হৃদয়ের ভিতর থেকে। সে প্রায়ই চলে আসতো এই বাড়িতে, চুপিচুপি। কাছাকাছি হওয়ায় স্কুল শেষে অরুণার বাড়ির পথটা অনেক সহজ ছিল।
দৃষ্টি জানত না, এই বাড়ির দেয়ালের ফাঁকে কতটা পুরোনো ক্ষোভ লুকিয়ে আছে। কতটা জমানো অভিমান জমে আছে উজানের ভেতর। আর উজানের সে অভিমান দগ্ধ হয়েছিল সবচেয়ে বেশি তখনই যখন তার বাবার মৃত্যুতেও সেই পরিবার একটিবারের জন্যও পাশে এসে দাঁড়ায়নি।
দৃষ্টিকে প্রথমদিকে এক রকম সহ্যই করতে পারত না উজান। তবুও সময়ের ব্যবধানে, কেমন করে যেন দু’জনের মাঝখানে জমতে শুরু করেছিল কিছু অদৃশ্য মিল। উজানের সেই কঠিন মুখেও একদিন অদ্ভুত এক ছেলেমানুষি ভঙ্গিতে ধরা পড়েছিল কোমলতা। এক বিকেলে, হালকা কৌতুকের ছলে সে হঠাৎ বলে বসেছিল,

– আচ্ছা দৃষ্টি, তুই কি আমাকে বিয়ে করবি?
দৃষ্টি থমকে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থেকেছিল উজানের দিকে। চোখে কোনো ভয় ছিল না, কেবল অনভ্যস্ত বিস্ময়। তারপর ঠোঁটে ফুটিয়ে তুলেছিল এক নিষ্পাপ হাসি।
– আমার বাবা-মা যেখানে বলবে আমি সেখানেই বিয়ে করবো উজান ভাই।
এই শব্দগুলো দৃষ্টির ঠোঁট থেকে নির্ভার বেরোলেও, উজানের ভেতরে তীক্ষ্ণ শাণিত কিছু গেঁথে বসেছিল সেদিন । সে মুহূর্তেই তার অভ্যন্তরের ক্ষত জেগে উঠেছিল। যে পরিবারের উপস্থিতিও সে মেনে নিতে পারে না, তাদের অনুমতি ছাড়া দৃষ্টি তার হতে পারে না এই চিন্তাই উজানের আত্মমর্যাদায় এক অদৃশ্য আঘাত করে বসেছিল। প্রেমের গন্ধমাখা মুহূর্তটা হঠাৎই রূপ নিয়েছিল এক অপমানের অভিমানে।

শেষমেশ, বহু বোঝাবুঝি আর নীরব কথোপকথনের পর অরুণা দৃষ্টির মা-বাবাকে রাজি করিয়ে ফেলেছিল। দুই পরিবারের মধ্যে ঠিক হয় দৃষ্টি আর উজান বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। সেই মুহূর্ত থেকে হয়তো দৃষ্টিও উজানকে একটু একটু করে দেখতে শিখেছিল নতুন চোখে। হয়তোবা নিজের ভিতরেই গোপনে এক স্বপ্ন গড়ে তুলেছিল।
কিন্তু বিধির এক নিষ্ঠুর খেলায় সব হিসেব এলোমেলো হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্তের কিছুদিন পরেই এক ভয়াবহ রাত দৃষ্টির সমস্ত পৃথিবী নিঃশেষ করে দেয়। দুর্বৃত্তদের নির্মমতায় নিভে যায় তার বাবা-মা’র প্রিয় মুখ, প্রিয় অস্তিত্ব। শোকের অন্ধকার কেটেছে কি কাটেনি, অরুণা তখনই স্থির করেছিল এখন আর দেরি নয়, দৃষ্টিকে সে নিজের ঘরে আনবে, নিজের মেয়ে করে রাখবে চিরদিনের মতো। তাই তড়িঘড়ি করে ঠিক করা হলো বিয়ের আয়োজন।
কিন্তু সেই আয়োজনের মধ্যেই ঘটে গেল এক কলঙ্কিত অধ্যায়। বিয়ের আসরের মাঝখানে হঠাৎ করেই উজান উঠে চলে গেল। একবারও ফিরে তাকায়নি। একবারও জিজ্ঞেস করেনি কিছু। একবারও ভাবেনি দৃষ্টির কি হবে! এই বিশ্বাসভঙ্গ অরুণার বুকের সমস্ত গর্বকে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছিল। তার হৃদয়ের প্রতিটি রেখায় শুধুই অভিমান জমেছিল।

সে দিনগুলোতে অরুণা একা কেঁদেছে। একবার নয়, বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছে, কী জন্ম দিয়েছিল সে? কেমন সন্তান যে এক শোকস্তব্ধ মেয়ের হাত ধরে থাকার বদলে মাঝপথে ফেলে চলে গেল!
তবে একসময় সে ভাবতে শিখেছিল, হয়তো এই ছেড়ে যাওয়া ছিল আশীর্বাদস্বরূপ। হয়তো এ ভালোই হলো।নিজের সন্তান হয় বলে কি তার চোখ বুজে সব মেনে নিতে হবে? কোনো মেয়েই এমন কাপুরুষ স্বামী চায় না,যে কষ্টের দিনে কাঁধে হাত না রেখে, ঘৃণার বোঝা কাঁধে চাপিয়ে পালিয়ে যায়।
তাই অরুণা এক নীরব সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। উজান যদি দৃষ্টিকে সত্যিই ভালো না বাসে, তাহলে তার যাওয়াই উচিত ছিল। এবং হয়তো, সেদিন না হলে কোনো একদিন সে চলে যেতই।
তবে যতটাই বাস্তব সে যুক্তি দিক মায়ের হৃদয়ের ক্ষরণ তো আর যুক্তিবাদ মানে না। ছেলের সেই আচরণ, আজও অরুণার বুকে অবসানহীন বেদনার মতো গেঁথে আছে।

– আসবো মা?
হুট করে উজানের স্বর শুনে সেদিকে তাকালো অরুণা। এরপর একবার তাকালো দৃষ্টির দিকে। দৃষ্টি পিটপিট করে তাকিয়ে আছে উজানের দিকেই। উজানকে এইভাবে আচমকা আসতে দেখে আস্তে করে কাঁথাটা গায়ে টেনে উঠে বসতে চাইলো সে। কিন্তু অরুনা তাকে চেপে ধরলো। অরুনার হাতের ইশারায় আবারো শুয়ে পড়লো দৃষ্টি। দুজনকে চুপ থাকতে দেখে নিজেই ভিতরে ঢুকে পড়লো উজান। বসলো খাটের একপাশে।
– কি হয়েছে ওর?
– জ্বর এসেছে।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১২

ছোট করে উত্তর দিলো অরুনা। উজান অপলক নয়নে তাকালো দৃষ্টির দিকে। চোখ মুখ কেমন ফুলে আছে। নাকের ঢগাটাও লাল হয়ে আছে। ঠোঁট জোড়া মৃদু কাপছে। উজান এবার অরুনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
– মা তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।
উজানের কথা শুনে দৃষ্টি এবার আর শুয়ে থাকতে পারলো না। কাপড়ের আচল টেনে সে ধিরে উঠে পড়লো। অরুনা এবার আর বাধা দিলো না তাকে। উঠে দাড়াতেই পড়ে যেতে নিলো দৃষ্টি। উজান দ্রুত হাত বাড়িয়ে ধরতে নিলো তাকে। কিন্তু উজান ধরার আগেই নিজেকে সামলে নিলো দৃষ্টি। এরপর গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ১৪