Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২
সাজিয়া জাহান সুবহা

‘ সায়ু দাড়া তো! দোস্ত এমন করছিস কেনো? ‘
পেছন থেকে নাজরাত এবং তোহার এমন অনেক ডাক পড়লেও পাত্তা দিলো না সায়েরী। ক্যাম্পাসের পেছনে অবস্থিত দিঘির ঘাটে এসে বসলো যেখানে আগে থেকেই বন্ধুরা বসে ছিলো। সায়েরী হতদন্ত হয়ে আসতে দেখে ফায়াজ বললো,

‘ কি হয়েছে সায়ু! তোকে এমন দেখাচ্ছে কেনো?
নাজরাত ধপ করে পাশে বসে জবাব দিলো,
‘ কি আর হবে কলেজের দ্যা গ্রেটেস্ট হিরোর গোষ্ঠী উদ্ধার করে এসেছে তারই সামনে। ‘
নুহাশ একথা শুনে চমকে উঠে বললো,
‘ কস কি মামা! সাফওয়ান ভাইরে বকুনিঝকুনি দিয়েছিস তুই? ‘
সায়েরী ঠোঁট উলটে জবাব দিলো,
‘ পাগল হয়েছিস? উনার চোখগুলো দেখলেই আমার আত্মা কেঁপে উঠে। সামনাসামনি কিছু বলবো এমন কিছু কল্পনা করতেই গলা শুকিয়ে আসে। ‘
তার কথা শুনে সাফ্রিন মুখ কুঁচকালো। থমথমে গলায় বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ হুহ! তবুও এতো কথা শুনিয়ে এসেছেন আপনি। থামতে বলেছি কিন্তু ভাঙা রেডিয়োর মতো পটরপটর করে বেজে যাচ্ছে তো বেজেই যাচ্ছে। ‘
সায়েরী গাল ফুলিয়ে বললো,
‘ আমি জানতাম নাকি তোদের এলিয়েন ভাই কবে পেছনে এসে বসেছে। একটু হিন্ট তো দিবি। ‘
তোহা অবাক কন্ঠে বললো,
‘ কতো করে থামতে বলেছি আর কি হিন্ট দিবো? নাকি সাফওয়ান ভাইয়ার সামনেই বলতাম যে সায়ু চুপ কর, তোর মুখের এতো গুণগান ভাইয়া শুনে ফেলছে তো। ‘
তোহাদের কথা বিশেষ পাত্তা না দিয়ে নুহাশ সায়েরীর মাথায় চাপড় মেরে বললো,

‘ যাক এতোদিনে কাজের কাজ কিছু তো করলি তুই। জানোস তো খালি ডিং ডিং করে ঘুরতে, চিপস খাইতে, আবুলতাবুল ভাবতে আর ঘুমাইতে। তোর জামাইয়ের কপালে দুঃখ আছে রে তিন ফুট দুই ইঞ্চি। ‘
তার কথায় ফুঁসে উঠলো সায়েরী,
‘ আমাকে কোন এঙ্গেল থেকে তিন ফুটের মনে হয় রে তোর! আমার হাইট পাঁচ ফুট এক। সেটা নিয়ে সমস্যা থাকলে আমার জামাইয়ের থাকবে। তুই নিজেরটা ভাব। ‘
বিকট আওয়াজে ফোন বেজে উঠলো সায়েরীর। স্ক্রিনে “নীতি আপু” নামটা পড়তেই অপরাধবোধে মুখ চুপসে গেলো তার।

‘ হ্যালো? ‘
‘ কোথায় তুমি সায়েরী! রিহার্সাল তো শুরু হলো বলে। ‘
‘ স..সরি আপু। ‘
‘ যাকে বলার তাকে তো বললেই না। আমাকে শুনিয়ে কি হবে? ‘
‘ তুমি জানো উনাকে আমি ভয় পায়। আচ্ছা আমাকে আবারো বকবে না তো!! যদি আগের মতো থাপ্পড়.. ‘
‘ রিলেক্স সায়েরী, সাফওয়ান মোটেও এমন না যেমন তুমি ভাবো। হ্যাঁ তোমায় কথায় একটু গুমসুম হয়ে আছে। তবে যার তার কথা গায়ে মাখে না সে। জানোই তো। ‘
‘ এটা আর নতুন কি? গুমসুম তো সে সবসময়ই থাকে। না হাসে না ঠিকঠাক কথা বলে। আজ অবধি দেখলাম না নরমাল মানুষের মতো বিহেভ করতে। ‘
‘ হয়েছে আমার বন্ধুর আর গুণগান না গেয়ে গান গাইতে এসো। অপেক্ষা করছি আমি। ‘
‘ আসছি। ‘

কান থেকে মোবাইলটা সরাতেই সায়েরী খেয়াল করলো সবাই গোলগোল চোখ করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
সায়েরী অবাক কন্ঠে বললো,
‘ এমন করে কি দেখছিস তোরা! ‘
নুহাশ কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,
‘ বাহ! জীবনেও তো খেয়াল করলি না আমার কি পছন্দ, অপছন্দ ।আমি যে তোর এতো হ্যান্ডসাম একটা বন্ধু আছি। কখনো কি খেয়াল করেছিস আমি খালি হাসি না কান্দি। কিন্তু সাফওয়ান ভাইরে এতো গভীরভাবে নোটিস করে রেখেছিস দেখি। ব্যাপার কি? ‘
নুহাশের এমন বাক্যে থমথম খেয়ে গেলো সায়েরী। হঠাৎ করেই বন্ধুদের সামনে ভীষণ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে গেলো সে। ফায়াজ তাকিয়ে রইলো সায়েরীর দিকে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো সায়েরীর মুখ থেকে দ্বিরুক্তি শুনার আকাঙ্ক্ষায়। সায়েরী আমতাআমতা করে জবাব দিলো,

‘ আমার আর কাজ নেই যে উনার মতো একটা দৈত্য দানবকে নিয়ে ভাবতে যাবো আমি? সে যদি পৃথিবীর শেষ ছেলেটাও হয়ে থাকে না তবুও ফিরে তাকাবো না ‘
তার কথায় নাজরাত মেকি হেসে জবাব দিলো,
‘ তুই যদি ভুলে গিয়ে থাকিস তবে আমি মনে করিয়ে দিই। ক্লাস নাইনে থাকতে সাফওয়ান ভাইয়ার উপর তুই কিন্তু হেব্বি ক্রাশ খেয়েছিলি সায়ু। ‘
তোহাও সায় জানিয়ে বললো, ‘ আই এগ্রি। ‘
ফায়াজ চট করে তাকায় সায়েরীর দিকে। আবারো বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে সায়েরী। কোনো রকমে অস্বস্তিভাব টুকু দমিয়ে বিরক্ত কন্ঠে বললো,

‘ সে অনেক পুরনো কথা। অবুঝ ছিলাম তখন। চিনতে পারিনি এই সুদর্শন ছেলেটার আসল রূপ যে একটা যমরাজ। যে জানে শুধু মানুষকে ধমকা ধমকি করতে। আজ অবধি দেখেছিস উনাকে কারো সাথে সুন্দর করে কথা বলতে। নিজেকে রাজা মনে করেন উনি এই কলেজের। টিচাররা অবধি তার অপিনিয়ন মেনে চলে। মানলাম উনি একজন টপার, বড়লোক বাপের ছেলে। তাই বলে কি তাকে মাথায় তুলে রাখতে হবে নাকি হ্যাঁ?’
আয়ান সায়েরীর মাথায় হাত দিয়ে বললো,
‘ বাপ রে!এতো রাগ কেনো পুষে রেখেছিস পিচ্চি? ‘
সায়েরী গাল ফুলিয়ে জবাব দিলো,

‘ উনি আমাকে যে থাপ্পরটা মেরেছিলো।আমি আজীবন মনে রাখবো। আর একদিন না একদিন এর শোধ আমি তোলেই ছাড়বো। দেখে নিস তোরা। ‘
এতোক্ষন নিশ্চুপ হয়ে থাকা সাফ্রিন এবার হতাশ কন্ঠে বললো,
‘ আমিও আছি এখানে। একটু রহম কর তোরা। ‘
নুহাশ মেকি হেসে জবাব দিলো,
‘ তুই আপাতত সাইডে হাঁট। সাফওয়ান ভাইয়ের এতো সুনাম শুনে তোর আবার কলিজা না ফেটে যায়। ‘
সকলের এতো এতো কথায় বিরক্ত হয়ে ফায়াজ বললো,
‘ আচ্ছা হয়েছে তো। সাফওয়ান ভাই থাকুক উনার রাস্তায় আমরা আমাদের রাস্তায়। কেনো আমাদের মাঝে সিনিয়রদের টানতে হচ্ছে? সায়ু, তোর না রিহার্সাল আছে? চল যায়। ‘
সায়েরী মুচকি হেসে বললো,
‘ একমাত্র তুই-ই বুঝলি আমার মনের কথা। চল যায়। ‘
কথার চলে সায়েরী হাত রাখে ফায়াজের কাঁধে। সেদিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে ফায়াজ।

রিহার্সাল রুমে পূণরায় ফিরে আসে সায়েরী। সে এবং তোহা ব্যাতিত বাকিরা রুমের বাইরেই তাদের আড্ডা বসিয়েছে। তোহা নাচের লিস্টে নাম লিখিয়েছে।সায়েরী নীতির সাথে কথা বলে গান নিয়ে। ফাঁকে বেশ কয়েকবার তাকায় দূরে অবস্থানরত গম্ভীর দৈত্য দানবটার দিকে। যে এই মুহুর্তে রাজার মতো হাত নেড়ে নেড়ে উপদেশ দিচ্ছে ছোট বড় অনেক ছেলেকে। হয়তো প্রোগ্রাম নিয়েই ডিসকাশন চলছে। ছেলেগুলো ও কেমন উনার বাধ্য হয়ে সব মনযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছে। হুহ! যত্তসব আদিক্ষেতা!
‘ সায়েরী, তুমি বরং মিহাদের সাথেই ডুয়েটে অংশ নাও। গান রেডি আছে। আর এবার আমরা জুটি হিসেব করেই পারফর্ম করার প্লেনিং করেছি। সমস্যা নেই তো? ‘ নীতি’র সহজ প্রশ্ন৷

‘ না আপু। ‘ সাবলীল ভাবেই সম্মতি দিল সায়েরী।
কয়েকজোড়া জুটি একত্র হয়ে নাচের প্রাক্টিস করছে। সায়েরী তাকালো তোহার দিকে। থার্ড ইয়ারের ইলহাম নামক ছেলের সাথেই তার জুটি মিলেছে। দুজনের চোখেই গোল ফ্রেমের চশমা। যেটা দেখে আনমনেই হেসে উঠলো সায়েরী। দুই চাশমিশ, ভালোই মিলেছে। এমন সময় নীতি’র বন্ধু মিহাদ এগিয়ে আসলো সায়েরীর দিকে। অধর কোণে হাসি টেনে বলে উঠলো,
‘ হেই পার্টনার! প্রস্তুতি কেমন? আমি কিন্তু গানের ব্লকবাস্টার। তাল মিলাতে পারবে তো? ‘
সায়েরী মুচকি হেসে জবাব দিলো,
‘ একবার সুর শুনেই দেখুন। আশা করি আপনার ব্লকবাস্টার ভয়েসের বেশি না হলেও কম হবো না। ‘
মিহাদ অবাক কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ ওহহো!! কনফিডেন্স হ্যা? আই লাইক ইট। এনিওয়ে, গান রেডি আছে। কষ্ট করে গিয়ে ওইযে ব্লু গিটার টা নিয়ে এসো। ‘

মিহাদের কথানুযায়ী রুমের এককোনায় উঁচু টেবিলে রাখা দুইটা গিটার হতে ডার্ক ব্লু গিটারটা হাতে তুলে নিল সায়েরী। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে একটা গিটার নিতে গিয়ে তার উপর থাকা চকচকে কালো গিটার টা স্কিপ খেয়ে ধপ করে পড়লো তার পায়ের উপর। গিটার পড়ার বিকট আওয়াজের সাথে সাথে পায়ের ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো সে । সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে সে। মাত্র সেকেন্ড দুয়েকের সঙ্গে থমকে গেল সব কোলাহল। ভেসে আসল পুরুষালি কন্ঠের উচ্চ গর্জন,
‘ হোয়াট দ্যা হেল ইজ দিস!! একটা গিটার সামলাতে পারছে না, এই স্টুপিডগুলোকে কে গানের জন্য সিলেক্ট করেছে? ‘

আকস্মিক সাফওয়ানের রাগী গলার আওয়াজে চুপসে গেলো সকলে। ব্যথায় পা চেপে ধরে ফ্লোরে বসা সায়েরীর চোখ টলমল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে অপমানে। ছোট বড় এতোগুলো মানুষের সামনে আজ আবারো সাফওয়ান তাকে অপমান করেছে। রুমে অবস্থানরত অনেকেই মুখ টিপে হাসছে সাফওয়ানের অপমানসূচক বাক্যে। যার সম্মুখীন হয়ে মুখ চেপে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো সায়েরী। ঝুঁকে থাকার দরূন কারোরই চোখে পড়লো না সেটা। তোহা দৌড়ে আসলো সায়েরীর কাছে। সেই সঙ্গে নীতি এবং মিহাদ। রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচ জন মানব – মানবীর চোখে মুখেও গমগমে ভাব। ফায়াজের মুখে চাপা রাগ। রাগের মাথায় রুমে প্রবেশ করতে চাইলে আয়ান আটকে ফেলে তাকে। অগত্যা ভেতরের ক্রোধ চেপে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো সে।

হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে তোহা এবং নীতির হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো সায়েরী। গিটারটা এমনভাবে পড়েছে মনে হচ্ছে যেনো পায়ের সব আঙুল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। নীতিদের সাহায্যে বেঞ্চের উপর বসলো সে। তখনই নিচে পড়ে থাকা কালো গিটরটা হাতে তুলে নিলো সাফওয়ান। ময়লা ঝেরে পূণরায় তা তুলে রাখলো টেবিলে। নীতির দিকে তাকিয়ে গমগমে গলায় বললো,
‘ যেমন তেমন মানুষকে পারফরম্যান্স লিস্টে এড করে প্রোগ্রাম খারাপ করবি না, নীতি। আই ওয়ান্ট কানটেসটেন্ট, নট এন্টারটেইনমেন্ট। ‘
অপমানে চোখ খিচে নিলো সায়েরী। নীতি চোখের ইশারায় শাসিয়ে উঠে সাফওয়ানকে। কিন্তু সেদিকে পাত্তা দিলো না সাফওয়ান।

‘ গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক এভ্রিওয়ান। ‘
সাফওয়ানের উচ্চ বাক্যে সবাই আবারো নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। নীতি আলতো করে হাত রাখলো সায়েরীর মাথায়। কান্না চোখেই মলিন হাসলো সায়েরী। বললো,
‘ আমি ঠিক আছি আপু। তোমরা তোমাদের কাজ করো। ‘
মিহাদের দিকে তাকিয়ে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ সরি ভাইয়া, আপনি অন্য কোনো পার্টনার খুঁজে নিন। আমার পার্টনারশিপ আপনার এবং প্রোগ্রামের জন্য ক্ষতি বয়ে আনবে। আমি এসবে না থাকায় ভালো। ‘
মিহাদ তাপ্ত শ্বাস ফেলে জবাব দিলো,
‘ তুমি প্লিজ সাফওয়ানের কথায় মন খারাপ করো না সায়েরী। আসলে গিটারটা ওর ভীষণ ফেবারিট। আমাদেরকেও হাত লাগাতে দেয় না আর তুমি তো… ‘
নীতিও তার কথায় সায় দিয়ে বললো,

‘ সকালের ব্যাপারটা নিয়েই এমন রেগে আছে সে। তুমি মন খারাপ করো না, প্লিইইজ। ‘
সায়েরী জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে বললো,
‘ ইটস ওকে আপু। আমি কিছু মনে করিনি। তোহা! একটু ধরতো, বাইরে যাবো। ‘
রুমের বাইরে গিয়ে বেঞ্চে বসলো সায়েরী। এরই মাঝে ঠান্ডা পানি কিনে এনেছে ফায়াজ। নাজরাত পানি ঢেলে দিলো সায়েরীর পায়ে। তার পাশে অবস্থানরত নুহাশ রাগী কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ শালার বড়লোক্স! টাকা শেষ হয়ে যাবে তবুও এদের দেমাগের গরম শেষ হবে না। কথায় কথায় আবার ইংরেজি মারাই। ইংরেজ মা**রা মইরা গেছে কিন্তু এই আবাল গুলারে ছেড়ে গেছে। ‘
তার কথায় সাফ্রিন চুপ থাকতে পারলো না। রাগ্বত স্বরে বললো,
‘ স্টপ ইট নুহাশ! কথা বলার আগে ভেবে নে এখানে আমিও আছি। ‘
নুহাশ তাকে ব্যাঙ্গ করে জবাব দিলো,

‘ আচ্ছা জ্বি! ম্যাইনে তো দেখা হি নেহি। ‘
সাফ্রিন দাঁতে দাঁত চেপে চেঁচিয়ে উঠলো, নুহাশ!!
সহসা কান চেপে নুহাশ বলে উঠলো,
‘ ওরে মা! জানি আমার নাম নুহাশ। এতো শিখাতে হবে না। আমার কথায় তোর এতো জ্বলে থাকলে অন্যদিকে যাইয়া পানি ঢাল, যা। ‘
সায়েরী এবারে চুপ থাকতে না পেরে নুহাশকে ঝাড়ি দিয়ে বললো,
‘ চুপ কর নুহাশ। যা হওয়ার হয়ে গেছে। শুধু শুধু কথা বাড়াস না প্লিজ। ‘
নুহাশ বললো,

‘ কিছুই তো হয় নাই রে পিচ্চি। সাফওয়ান ভাই তোরে এতো কথা শুনিয়ে দিলো আর তুই…আসলেই তোদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না। আর এইযে, এই মাইয়া কাঁদছিস কেন? দেখ দেখ শ্যামলা মুখটা লাল করে ফেলছস। আল্লাহ বাচাইছে তুই বিয়ে শাদি করছ নাই এখনো। জামাইয়ের সামনে এমন লাল লাল মুখ নিয়া দাঁড়ালে তো সে হার্ট ব্রেক খাবে। ‘
কান্না চোখেই হেসে দিলো সায়েরী। নুহাশের বাহু চাপড় মেরে বললো, ‘ চুপ কর বাঁদর ছেলে। ‘
নুহাশও মুচকি হেসে বললো,
‘ এই তো এবার না তোরে আমাদের পিচ্চির মতন লাগছে। এসব কান্না টান্না তোরে মানাই না পিচ্চিবুড়ি। যা কিছু হইছে ভুলে যা। এবার একটা গান ধরতো দেখি। এই আমি কল্পনায় তবলা নিইয়া রেডি। শুরু কর।
সায়েরী অবাক কন্ঠে বললো, এখানে!!
তার কথায় আয়ান জবাব দিলো,
‘ এখানে না তো কি স্টেজের আয়োজন করবো তোর জন্য? শুরু কর, আমরা আছি তো চিয়ারআপ করার জন্য। ‘
বন্ধুদের জোরাজোরিতে হার মানলো সায়েরী। মন খারাপ সব ভাসিয়ে দিলো শুভ্র মেঘের ভেলায়। চোখ বুজে ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটিয়ে গলা ছেড়ে সুর তুললো,

তোমার ইচ্ছেগুলো ও ইচ্ছেগুলো…
তোমার ইচ্ছেগুলো ইচ্ছে হলে
আমায় দিতে পারো।
আমার ভালোলাগা,ভালোবাসা
তোমায় দিবো আরো!
তুমি হাতটা শুধু ধরো
আমি হবো না আর কারো ;
তোমার স্বপ্নগুলো আমার
চোখে ফুটছে ঝরসর।
তোমার ইচ্ছেগুলো ও ইচ্ছেগুলো…
তোমার ইচ্ছেগুলো, ইচ্ছে হলে
আমায় দিতে পারো।
আমার ভালোলাগা,
ভালোবাসা তোমায় দিবো আরো!!

খালি গলায়, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গান গাওয়া শেষে চোখ মেলে তাকাতেই চমকে উঠলো সায়েরী। বারান্দায় পরিচিত অপরিচিত মুখের সমাগম। সায়েরী চোখ মেলা মাত্র এক সুরে হাততালি দিয়ে মুখরিত করে তুললো পরিবেশ। মুখে আঙুল ঢুকিয়ে শিস বাজালো নুহাশ। অবাক হলো সায়েরী। মিনিট পূর্বে এই মানুষগুলোই তাকে দেখে বিদ্রুপ করে হাসছিলো। অথচ এখন তারাই সায়েরীর জন্য করতালি দিচ্ছে! মিহাদ এগিয়ে এসে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ ওয়াও!! তোমার কন্ঠ সত্যিই মারাত্মক সুন্দর। আমি ডিসাইড করে ফেলেছি। তোমাকেই পার্টনার বানাবো। ‘
একথা শুনার সঙ্গে সঙ্গে ফায়াজ আচমকা প্রতিক্রিয়া দেখাল, ‘ পার্টনার মানে? ‘
তার এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে এক পলকের জন্য ভড়কে গেল মিহাদ। পরমুহূর্তেই হেসে জবাব দিল,
‘ আমার ডুয়েট পার্টনার ছোট ভাই। এতো হাইপার হচ্ছো কেনো? ‘
কথাটা শুনামাত্র সাফ্রিন থমথমে কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ আপনার বন্ধুর কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে আসুন ভাইয়া। এমন না হয় যে অনুষ্ঠানের দিন আবারো সায়েরীকে এভাবে অপদস্ত হতে হয়! ‘
সাফ্রিনের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো মিহাদ। তার অবাক লাগছে দেখে যে স্বয়ং সাফ্রিন সাফওয়ানের বিরূদ্ধে কথা বলছে। সবাইকে আশ্বস্ত করে সে জবাব দিলো,
‘ ডোন্ট ওয়ারি গাইস। আমি কথা বলছি। অ্যান্ড ইউ (সায়েরী) কিপ ইট আপ। আই জাস্ট ওয়ান্ট ইউর কম্পানি। ‘
মিহাদ যাওয়া মাত্রই মুখ খুলে নুহাশ। সায়েরী কাঁধে একহাত ঠেস দিয়ে ভিজ্ঞদের মতো ভাব নিয়ে বলে উঠলো,
‘ দেখেছিস পিচ্চি! সব কেমন তলবা বাজাতেই সলভ হয়ে গেলো। (কলার উঁচিয়ে)সবই আমার তবলার কামাল। আমি গান গাইতে না বললে তো তুই গাইতি না। আর আমি তবলা বাজিয়ে লোক জড়ো না করলে কেউ শুনতই না তোর এই খরগোশের মতো গলার আওয়াজ। থাক থাক। শুকরিয়া আদায় করতে হবে না। বিরাট বড় আমার দিলখানা। যেখানে বাস করে টিনা, মিনা, জরিনা। তোর শুকরিয়া আমি বিরিয়ানি খাওয়ানোর আগেই গ্রহণ করে নিলাম, যা। মনে করে বিরিয়ানি এক পেকেট কিনে দিস। বেশি দিলেও মাইন্ড করবো না।
সাফ্রিন কপাল কুঁচকে তাকালো তার দিকে। বললো,

‘ তুই কেনো বিনা নোটিশে সব ক্রেডিট নিজের ঘাড়ে তুলছিস বলতো? সেই তো গানের জন্য সায়েরীকেই সিলেক্ট করা হয়েছে। তোর তবলার কথা বলেছে নাকি কেউ? ‘
নুহাশ কলার উঁচিয়ে বেশ ভাব নিয়ে জবাব দিল,
‘ এসব কলেজের প্রোগ্রামে দ্যা গ্রেট নুহাশ সিকদার তবলা বাজাবে? ইঁন্দুরে কামড়েছে নাকি আমাকে? আমার তবলা বাজানো দেখার জন্য এন্ট্রি লাগবে জনগণের। আজ তোদের মতন সস্তা মানুষদের উপর দয়া করে ফ্রি তে শুনিয়ে দিলাম। জানি তোদের কাছে টাকা পয়সা কম। একটু ভিক্ষা দিলাম যা। আর বেশি প্যানপ্যান করবি না সাফানি হাপানি। সাপের মতন ফুসফুস করা সাফওয়ানরে ও কবি যাতে আমার বান্ধবীরে সম্মান দিয়া কথা বলে। নাইলে তোরে আর তোর ওই সাফওয়ান ভাইরে তবলা বাজিয়ে এমন বইরা বানিয়ে দিব যে কিছু শুনার আর ক্ষমতাই থাকবে না। ‘

এই পর্যায়ে রেগে গিয়ে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে হনহনিয়ে চলে গেলো সাফ্রিন। আয়ান তাকে কয়েক থামানোর চেষ্টা করলেও থামলো না সে।
সায়েরী কপাল চাপড়ে বললো,
‘ দিলি তো শেষমেশ মেয়েটাকে রাগীয়ে! তোর এই স্বভাব কোনোদিন যাবে না তাইনা? ‘
কথাটা শুনামাত্র নুহাশ হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
‘ এইটা না গানের লাইন! চল শুরু কর। আমার সাথে মিলবে ভালা। ‘
পূণরায় তবলা বাজিয়ে সুর তুললো নুহাশ সাথে আয়ান এবং ফায়াজ। সব মন খারাপ ভুলিয়ে খোলা বারান্দায় শুনা গেলো ৬ মানব-মানবীর প্রাণখোলা কন্ঠস্বর,

ভুলভাল ভালোবাসি,
কান্নায় কাছে আসি
ঘৃণা হলে চলে যায় থাকি না!
কথা বলি একা একা_ _সেধে এসে খেয়ে ছ্যাকা
কেনো গাল দাও আবার বুঝি না!
খুব কালো কোনো ক্ষণে গান শুনাবো গোপনে
দেখো যেনো আর কেউ শুনেনা!
গান গেয়ে চলে যাবো,বদনাম হয়ে যাবো
সুনাম তোমার হবে হোক না…
আমার এই বাজে স্বভাব
কোনোদিন যাবে না।
আমার এই বাজে স্বভাব
কোনোদিন যাবে না!!

————————🍁
ব্যাথায় কাতর পা নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরলো সায়েরী। কলেজ হতে বাসা অবধি আসার জন্য ফায়াজ নিজে রিকশা ঠিক করে দিয়েছিলো তাকে। সায়েরী অনেকবার বারণ করলেও কানে তুলেনি ফায়াজ। উল্টো ভাড়াটাও মিটয়ে দিয়েছে।
বাসায় ফিরে ড্রইংরুমে এসে সোফায় ব্যাগ ছুড়ে ফেলে নিজেও সোফায় দেহ এলিয়ে দিল সায়েরী। মাথার উপরে ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে। তবুও গা টা জ্বলেপুড়ে উঠছে তার। এই জ্বলন গরমের নয়। এই জ্বলন রাগের। সাফওয়ান ভাইয়ের করা অপমানটুকু বন্ধুরা ভুলিয়ে দিলেও এখন বাসায় এসে আবারো মনে পড়ে গিয়েছে। রাগের সাথে সাথে ভীষণ মন খারপও হলো সায়েরীর। মনে মনে বারবার একটা প্রশ্নই উঁকি দিতে লাগলো,

“উনি কেনো আমাকে সহ্য করতে পারেন না?” কিন্তু পরবর্তীতে মস্তিষ্ক হতে জবাব এলো, তিনি শুধু আমাকে নয়, কাউকেই সহ্য করতে পারেন না। নিষ্ঠুর লোক।”
‘ পায়ে কি হয়েছে সায়ু! ব্যাথা পেলি কি করে? ‘
আবরারের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর কর্ণধার হওয়া মাত্র সোফার হাতল থেকে দু পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসলো সায়েরী।
কিন্তু প্রতিউত্তর করলো না কোনো। তার নিরবতা দেখে আবরার ফের বলে উঠলো,
‘ কথা বলছিস না কেনো? ব্যাথা পেয়েছিস কিভাবে? দেখ তো বৃদ্ধ আঙুলটার একপাশে কিভাবে রক্ত জমে আছে। কতোটা ফুলে গিয়েছে! ‘
সায়েরী গাল ফুলিয়ে জবাব দিলো,

‘ আমার জন্য এতো উতলা হবে না, ভাইয়া। হওয়ার নাটকও করবে না। এই নিয়ে দুই দুই বার তোমার শাহী পরীবারে জন্ম নেওয়া নবাবজাদা বন্ধু আমাকে সবার সামনে অপদস্ত করেছে। তোমাকে বলছি কেনো! আগের বারও তুমি ওই নিষ্ঠুর লোকটার পক্ষ নিয়েছিলে। এবারেও নিবে, জানি আমি। ‘
আবরার খানিকটা ভাবুক হলো। বললো,
‘ তুই কি সাফওয়ানের কথা বলছিস? ‘
সায়েরী রাগী কন্ঠে শুধালো,
‘ না না। উনার কথা বলবো কেনো!উনার মতো ভদ্র, সুশৃঙ্খল, এতো সহজ সরল একটা ছেলের নামে এমন কথা বলতে পারি আমি? দুনিয়ার সব ভদ্রতা, মানবতা তো তোমার বন্ধুর মাঝে ঢেলে দিয়েছে আল্লাহ! অকর্মা তো আমিই।আমাকে দিয়েই হয়না কিছু। ‘

‘ আরে বাবা রেগে যাচ্ছিস কেনো! কি হয়েছে বল আমাকে। ‘
ভার মুখেই আবরারকে একের পর একেক সব কথা খুলে বললো সায়েরী। কথা শেষে গাল ফুলিয়ে বলে উঠলো,
‘ তুমিই বলো, এখানে আমার দোষটা কোথায়?? ‘
‘ দোষ তো তোর অবশ্যই আছে। (সায়েরী তাকাতেই) আ..ব মা..নে সাফওয়ানের অগোচরে তাকে নিয়ে এসব বলা উচিত হয়নি তোর। জানিস সে এমনিতেই গম্ভীর স্বভাবের। নিজের সব নিজের মধ্যে রাখতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। আর তুই কি করলি? প্রথমে ওর ব্যাপারে উল্টাপাল্টা কথা বলেছিস। পরে আবার ওর গিটার ফেলে দিয়েছিস। রেগে যাওয়াটা স্বাভাবিক।
‘ রাগ উঠেছে বলে কি উনি এভাবে আমাকে অপমান করবে! আমি এখন বড়ো হয়েছি ভাইয়া। আই হ্যাভ এন ইমেজ।

‘ জ্বি। আমার খুব ভালো করেই জানা আছে কতোটা বড়ো হয়েছেন আপনি। একটু পরেই কাকিয়া প্লেট নিয়ে ছুটবে তোর পিছু পিছু। বিনা ফ্রেস হয়েই ঘুমাবি। যখন ইচ্ছা হয় খাবি। তারপর বসে পড়বি তোর ভাবনার ভান্ডার নিয়ে। রাত ১১টা বাজতে বাজতে আাবার ঘুম দিবি। দুনিয়ায় সব অনিয়ম চলেফেরা তোর দ্বারায় সম্ভব। আর নিশ্চয়ই সাফওয়ানের কথা শুনে কেঁদে কেটে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছিস! এই তোর বড় হওয়া না?? ‘
সায়েরী আর জবাব দিলো না। গাল ফুলিয়ে রেখেই চলে গেলো রুমে। পেছন থেকে আবরার বেশ কয়েকবার বললো পায়ে মলম লাগিয়ে নিতে। কিন্তু কথাটা যেনো কানেই ঢুকালো না সায়েরী’র। কেনো শুনবে ওই দৈত্য দানব-টার গুণগান? বাড়ির লোকেরা-ও তার প্রশংসা’য় পঞ্চমুখ। সায়েরী কিছু বললেই তারা ঘোর বিরোধিতা করে জবাব দেয়, ” বড় ভাই হয় তোর, সম্মান দিয়ে কথা বল। ” হুহ! বড় ভাই? কি কচুর বড় ভাই সে? আজ অবধি ভাইয়ের একটা গুণ তো দেখল না তার মাঝে। বড় ভাই না ছাই!

আয়নার সামনে দাড়িয়ে শরীরে একের পর এক কাপড় মেলে ধরে দেখছে নাজরাত। কিন্তু কোনোটাই সুবিধার মনে হচ্ছে না। বিছানার উপর কাপড়ের স্তুপ জমা হয়েছে। কিন্তু কোনোটাই তার পছন্দ মোতাবেক হচ্ছে না তাএ। মুখ ভার করলো সে। একবার ভাবলো এতো ফিটফাট হয়ে যাওয়ার কি দরকার! বিয়ে ভাঙতেই তো যাচ্ছি। কিন্তু না। মেয়েদের সাজগোজ সবার আগে। আর এখন তো পাত্র আসছে তার সাথে দেখা করতে। তাহলে কেনো সাজগোজ করবে না সে!! যে ভাবা সেই কাজ। বিছানার স্তুপ হতে বেছে একটা হালকা গোলাপি রঙের কামিজ গায়ে জড়ালো সে। হালকা পাউডার ব্যাতিত মুখে কোনো প্রসাধনী মাখলো না। শুধু ঠোঁটে একটুখানি লিপবাম। সব শেষে ফোন লাগালো সায়েরীর নাম্বারে। পরপর চারবার রিং যাওয়ার পর শুনা গেলো সায়েরী’র ঘুমু ঘুমু কন্ঠস্বর,

‘ হ্যা..লো!! ”
‘ সায়েরীর বাচ্চা!!! এখনো ঘোড়ার মতো পরে পরে ঘুমাচ্ছিস তুই? সাড়ে ন’টা বাজে। ১০টাই ক্লাস আমাদের। ‘
নাজরাতের এক চিৎকারে ঘুম ছুটে গেলো সায়েরীর। ঢুলু ঢুলু শরীরে উঠে বসলো সে। হন্তদন্ত গলায় শুধালো,
‘ এ..এইযে।৷ উঠে গেছি, একদম উঠে বসে গেছি। লেইট হবে না, পাক্কা। ‘
‘ দুনিয়া উলটে গেলেও তুই ঘুমাতেই থাকবি। এতো ঘুম কই পাস তুই হ্যাঁ!! ‘
পূণরায় বালিশে মুখ গুঁজলো সায়েরী। রসিকতা করে বললো,
‘ কিয়া কারু ইয়ার! সাবকো আতি নেহি,অর মেরি যাতি নেহি। ‘
‘ ডায়লগবাজি পরে করিস। তাড়াতাড়ি আয়। পারলে নাস্তাটা করে আসিস বইন। তোর তো খাওয়া নিয়ে জন্মান্তরের শত্রুতা। ‘
‘ জো হুকুম জাহাপানা। আপনি ১৫মিনিট অপেক্ষা করুন।আমি ২০ মিনিটে স্টেশনে আসছি। ‘

‘ তোরা আমাকে এতো বড় ধোকা দিতে পারলি? নাজ! আজ তুই আমাদের হতে হতেও হবে না জিজুর সাথে দেখা করার জন্য এসেছিস। অথচ আমাকে একটাবারও জানালি না? ‘
সাফ্রিনের অভিমানী কন্ঠ শুনে নাজরাত কপাল কুঁচকে তাকাল। বললো,
‘ এমন সেন্টি খাচ্ছিস কেনো? কাল যখন এসব ঘটেছে তখন তুই ছিলি না সেটা কি আমার দোষ? আর এমন তো না যে আমি ডেইট করতে এসেছি। বিয়ে ভাঙতে এসেছি। তাই এই মিশনে ফোকাস কর। ‘
সাফ্রিন গাল ফুলিয়ে বললো,

‘ কাল ঝামেলার মাঝে বলিসনি ঠিক আছে। কিন্তু আজ সকাল থেকে আমার পাশে বসে টানা তিনটা ক্লাস করলি। অথচ একটাবারের জন্যও কিছু জানালি না? ‘
সাফ্রিনের কথায় বেশ বিরক্ত হয়ে নুহাশ বলে উঠলো,
‘ ধুর বা**।কখন থেকে একই কথারে জিরাফের গলার মতো লাম্বা করে যাচ্ছিস। ওই তোরে বলে নাই তো কি হইছে? তোরে না বলে বিয়া করলে কি ওর বাচ্চা কাচ্চা ডাউনলোড হওয়ার আগেই ডিলেট হয়ে যাবে নাকি হ্যাঁ?
তোহা মুখ কুঁচকে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো নুহাশের কথা শুনে। বললো,
‘ উফফ্!কিসব বাজে কথা। তুই প্লিজ পাবলিক প্লেসে এমন ল্যাংগুয়েজ ইউজ করবি না নুহাশ। লোকে শুনলে কি ভাববে? ‘
নুহাশ বাঁকা চোখে তাকায়। ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বলে,

‘ আসছে আমার ইংরেজের রানী। দ্যা কুইন চার আনা চোখ কানা। ওই তোকে কেউ বলেছে আমার কথায় কান দিতে? হুদাই প্যা প্যা করছিস কেন?’
দুজনের ঝগড়ায় বিরক্ত হয়ে আয়ান বলে উঠলো,
‘ আল্লাহর ওয়াস্তে চুপ কর তোরা। নাজ! কি ব্যাপার বলতো। এখনো আসছে না কেনো সে পাত্র? ‘
সাফ্রিন হঠাৎ বলে উঠলো,
‘ তোরা বললিই না পাত্র কে? কি নাম? আমি কতোবার জানতে চেয়েছিলাম! ‘
ফায়াজ বললো,

‘ তোর জেনে কাজ নেই। একটু পর যখন সামনে আসবে তখন যা যা জানার জেনে নিস। আপাতত চুপ থাক বইন। ‘
সত্যি সত্যিই চুপ হয়ে গেলো সাফ্রিন। এদের সাথে থাকলে মাথার টেম্পারেচার একশো একশো থাকবে। একটু চোখে মুখে পানি ঢালা দরকার। এমনিতেই টানা তিনটা ক্লাস করে অবস্থা নাজেহাল সবারই। মাত্র কিছুক্ষণ হলো রেস্টুরেন্টে এসেছে তারা। সায়েরীকে সাথে নিয়ে ওয়াশরুমের পথে এগিয়ে গেল সাফ্রিন। পেরিয়ে গেলো আরো কয়েক মিনিট। এমন গুমসুম হয়ে অপেক্ষা করে থাকতে তারা তুলনামূলক বিরক্ত।
একপর্যায়ে নাজরাত বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
‘ আল্লাহ মালুম কোন উল্লুককে আমার ঘাড়ে চাপিয়েছে। না আছে কথা বলার সেন্স, না টাইমিংয়ের। ‘
নাজরাত কথাটা শেষ করা মাত্রই তার চোখ গেলো এন্ট্রি গেইটের দিকে। সেই সঙ্গে তাকালো বাকিরা। মোবাইল হাতে রেস্টুরেন্টে ঢুকেছে সাফওয়ান। নজর এমনভাবে মোবাইলে গেঁথে রেখেছে যেনো সে এবং তার মোবাইল ব্যাতিত কোনো প্রাণী বা বস্তু আশেপাশে নেই। বন্ধুরা সবাই একনজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে সাফওয়ান ঠিক ঠিক তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। একহাত পকেটে গুঁজে বরাবরের মতোই গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

‘ তোমরা সবাই এখানে কি করছো? ‘
সাফওয়ান নামক মানুষটাকে যেনো চাইলেই কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। তার রাশভারী স্বভাবের জন্য কেউ কেউ হয়তো তাকে অপছন্দের তালিকায় রেখেছে ঠিকই। কিন্তু তাকে পছন্দ করে এমন মানুষই তালিকায় বেশি। এই যেমন কাল সায়েরীর মন রক্ষার্থে সাফওয়ান কে নিয়ে কতো বাজে কথা বলেছিলো নুহাশ। কিন্তু আজ সাফওয়ানের প্রশ্ন করা মাত্রই ভদ্রতার সহিত জবাব আসলো নুহাশের পক্ষ থেকে।
‘ আসলে ভাইয়া আমরা একসাথে লাঞ্চ করতে এসেছিলাম। ‘
সাফওয়ান গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,

‘ দ্যাটস গুড। তবে এখানে দুজনের থাকার কথা ছিলো। তোমরা আলাদা টেবিলে যাও, ফাস্ট! ‘
সাফওয়ানের এমন কথায় অবাক হলো সকলেই। নাজরাতের ব্যাপারটা সাফওয়ানের জানারতো কথা নয়! একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো তারা। সাফওয়ান বিরক্ত হলো। গমগমে গলায় বললো,
‘ সাদিফ ভাই মাত্রই ঢুকবে। আমি কোন ডিস্টার্বেন্স চাচ্ছি না। তাই তোমরা নাজরাতকে রেখে আলাদা হও। তোমরা সাথে থাকলে ডিস্টার্ব করতে হবে না, হয়েই যাবে। ‘
অপরিচিত ছেলেটার সাথে একা কথা বলতে হবে ভেবেই অস্থিরতায় গলা শুকিয়ে আসলো নাজরাতের। অন্যদিকে সাফ্রিন গোলগোল করে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের দিকে। তার মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারছে না যে আসলে হচ্ছে টা কি এখানে।
নাজরাত আমতাআমতা করে জবাব দিলো,

‘ আ..আব মানে ভ..ভাইয়া। আমিই ওদেরকে আসতে বলেছিলাম। আসলে… ‘
অস্বস্তিবোধ করে আর কিছুই বলতে পারলো না নাজরাত। সাফওয়ান নিজেও কোনো প্রতি উত্তর করলো না। নজর গেথে রাখলো মোবাইল স্ক্রিনে। সেকেন্ড পেরুতেই দরজার দিকে তাকিয়ে নড়েচড়ে দাড়ালো সে। পাশে অবস্থানরত সাত মানব মানবীর দিকে তাকিয়ে সাবধান গলায় বললো,
‘ তোমাদের যা ইচ্ছে করো, আই ডোন্ট কেয়ার। বাট বি পোলাইট। হেয়ার ইজ ইউর গেস্ট। ‘
সাফওয়ানের বলতে দেরি। কিন্তু তাদের তাকাতে দেরি নেই। কাঁচের দরজা ঠেলে মাত্র ভিতরে ঢুকলো একজন যুবক। নাজরাত হা করে তাকিয়ে থাকলো সেদিকে। লম্বায় প্রায় ছয় ফিট ছুঁইছুঁই উচ্চতার এক মানব৷ বলিষ্ঠ, পেশীবহুল দেহ। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বক। যাতে লেপ্টে রয়েছে ধবধবে সাদা, ফর্মাল শার্ট। যা কালো প্যান্টের সঙ্গে ইন করেছ। শার্টের হাতা কব্জির উপর থেকে সামান্য গোটানো। হাতে দামি রোলেক্সের ঘড়ি! পলিশড সু! মাথাভর্তি একরাশ চুল! ফর্মাল গেটাপে দুর্দান্ত লাগছে তাকে দেখতে। স্থির চাহনিতে তাকিয়ে রইল নাজরাত। বুকের ভিতরটা হঠাৎ করেই অস্থিরতায় চেয়ে গেলো তার। অতি উত্তেজনায় হাত পায়ের নিশপিশ করছে তার। এসির মাঝে বসেও দরদর করে ঘাম ছড়াতে লাগলো শরীর। এ কেমন অস্থিরতা!

‘ কি চিজ মাইরি! ‘
নিজের অস্থিরতা কমানোর তাগিদে সবে মাত্র পানির গ্লাস হাতে নিয়েছিল। এমন সময় তোহার কন্ঠটা কানে যেতেই চট করে ফিরে তাকালো নাজরাত। তীক্ষ্ণ, ক্ষুব্ধ চাহনি তার। হঠাৎ এই প্রতিক্রিয়ায় ভরকে গেলো তোহা। নাজরাত চোখ কটমট করে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ চারচোখে লাগাম টান। খবরদার নজর দিবি না। হবু দুলাভাই হয় তোর। ‘
নাজরাতের চাপা কন্ঠটা সাফওয়ানের কানে না গেলেও বন্ধুমহলের সকলে শুনলো। অতি বিষ্ময়ে হা হয়ে রইলো তারা। নাজরাতের হঠাৎ পরিবর্তনে যেনো থমকে গেলো সকলে।নুহাশ মিনমিন করে বলতে চাইলো,
‘ আমি যে বললাম ভরপেট খা… ‘
নাজরাত ঝটপট জবাব দিলো,
‘ প্ল্যান ক্যান্সেল। একেবারে আমার বিয়েতে খেতে পারবি। দুলাভাই হয় তোর। এতো টাকা খরচ করার মানেই হয়না।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১

নাজরাতের এহেন রূপ পরিবর্তন দেখে সকলে স্তম্ভিত। নুহাশ দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
‘ তুই এতোবড় মীরজাফর! আল্লাহ এই ধোঁকা সহ্য করবো না, দেইখা নিস। ‘
নুহাশের কথায় পাত্তা দিলো না নাজরাত। সাফওয়ানের সাথে কুশলাদি করতে থাকা সাদিফ নামক ব্যাক্তিটির দিকে তাকিয়ে রইলো নির্বিকারে। হুট করেই চোখাচোখি হলো তাদের। ধ্‌ক করে কেঁপে উঠলো নাজরাতের হৃদপিণ্ড। সাদিফের অগোচরে তোহার গায়ে ঢলে পড়ার অভিনয় করলো সে। নুহাশের দিকে তাকিয়ে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলে উঠলো,
‘ তোমার কথা গায়ে মাখলাম না বন্ধু। কারণ আমার অনুভূতি সব যে এখন তাকে ঘিরে! ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩