Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮
সাজিয়া জাহান সুবহা

সাদিফ নাজরাতের জন্য আয়োজন করা ছোট্ট স্টেজ টাতে পাশাপাশি বসে আছে দুজন। কেক কাটিং থেকে শুরু করে দু পক্ষের কাজিন ও বন্ধুবান্ধবদের আড্ডা,গ্রুপ ছবি, বর বউয়ের ছবি সব শেষ করে দুজনকে একটু আলাদা স্পেস দিলো সবাই।

নাজরাতের রুমের বারান্দায় গ্রীলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ। নজর নাজরাতের উপরেই আবদ্ধ। যা ক্ষণে ক্ষণে লজ্জায় ফেলছে নাজরাতকে। হাতে থাকা বিশাল গোলাপ গোচ্ছ টাকে বুকে নিয়ে তার ঘ্রাণ নিতে লাগলো নাজরাত। দ্বিতীয় বারের মতো রুমে ঢুকে এই গোলাপ গোচ্ছ টা নাজরাতকে দিয়েছিলো সাদিফ। তখন হুট করেই নাজরাতের মনে পড়লো তাদের প্রথম সাক্ষাৎ এর কথা। সাদিফ বলেছিলো, লাল গোলাপের সুভাসের সাথে সে নাজরাতকে আপন করে নিবে। আজ সে কথা সত্যি হয়েছে। আজ সে সাদিফের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে তার অর্ধাঙ্গিনী হয়ে। নড়েচড়ে দাঁড়ালো নাজরাত। কথা বলার জন্য কোনো টপিক খুঁজতে লাগলো। কারণ এভাবেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে সাদিফের এই উন্মাদ নজর আজ সরবেই না তার উপর থেকে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ আপনি কিছু বলবেন বলেছিলেন আজ। ‘
‘ কোন ব্যাপারে? ‘
‘ সেটাতো আপনার জানার কথা। কিসব অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত নিয়ে ফিলোসোফি ঝেড়েছিলেন। সেসবই ক্লিয়ার করতে হবে এখন। ‘
‘ ফিলোসোফি!! আমার কথাগুলো তোমার ফিলোসোফি মনে হয়েছে? ”
ভ্রুঁ কুঁচকালো নাজরাত। ফুলের বুকেটা গ্রীলের উপর রেখে বললো,

‘ কি ব্যাপার বলুন তো! বিয়ে করেছেন চব্বিশ ঘণ্টা ও হলোনা আর অমনি আপনি থেকে তুমি তে নেমে গেলেন!! ‘
হাসলো সাদিফ! নাজরাতের হাত টেনে তাকে নিজের কাছাকাছি এনে মুখের উপরের ছোট ছোট চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দিলো। নাজরাতকে বুকের সাথে জড়িয়ে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো দূর আকাশে গোলাকার লালছে চাঁদ টার দিকে। সাদিফ নাজরাতের মতো আজ চাঁদটাও যেনো পরিপূর্ণ। নাজরাতের মাথায় থুতনি রেখে অতীতের পাতা উল্টালো সে।

‘ আজ থেকে ঠিক দেড় বছর আগে, অনার্স শেষ করে যেদিন প্রথম জবের এপোইন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়েছিলাম, সেদিন সব বন্ধুরা মিলে টিএসসি তে গিয়েছিলাম। ঘন্টা ধরে আড্ডা আর সাথে ভাজাপোড়া খেয়েছি ইচ্ছেমতো। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সেখানে অনেক স্টুডেন্ট এসে ভীড় জমিয়েছিলো। যেখানে ছিলো ছয় জন ছেলে মেয়ের একটা ঝামেলাযুক্ত গ্যাং। তিন ছেলে তিন মেয়ে। আসার পরপরই ফুচকা স্টলে দুইজন ছেলেমেয়ের ননস্টপ ঝগড়া শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিলো আমাদের। তখনি মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা শান্তশিষ্ট মেয়েটার কন্ঠ কানে আসলো,

‘ তোহা! প্লিজ দোস্ত আর ঝগড়া করিস না। কত্তোদিন পর একসাথে ফুচকা খেতে এসেছি। একটু মন ভরে খেতে দে।
খুবই নমনীয় চিকন, শান্ত কন্ঠস্বর। আমি শুধু তখন একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম তাদের ঝগড়া থেমেছিলো বলে। কিন্তু পরবর্তীতে সেই মেয়েটার ফুচকা খাওয়া দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম আমি। এই মেয়ে এমন লোভাতুর ভঙ্গিতে খাচ্ছিলো যে আমারও কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো সর্বদা জঘন্য উপাধি পাওয়া ফুচকা জিনিসটা খুবই সুস্বাদু। পরবর্তীতে নিজের ভাবনার উপর হাসি পাচ্ছিলো আমার। মেয়েটার উপর থেকে চোখ ফিরিয়ে আবারো আড্ডায় মশগুল হলাম। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিলো নীল আকাশ। মিনিটের মধ্যেই ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো। আমরা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে দোকানের ছাউনির নিছে দাঁড়িয়ে পড়লাম। শার্ট ঝেড়ে চোখ ফিরাতেই দেখলাম সেই ফুচকা দোকানের পাশেই ঝুমঝুম বৃষ্টিতে ভিজছে তিন কিশোরী। না চাইতেও পূর্বের সেই মেয়েটার উপর মুগ্ধ হয়েছিলাম। বৃষ্টির পানিতে জ্বলজ্বল করছিলো তার হলদে মুখশ্রী। তিনজনের মুখেই খিলখিল হাসি। কিন্তু আমার অজান্তেই আমি আটকে পরেছিলাম সবার মাঝের সেই লম্বা মেয়েটার হাস্যজ্জল মুখখানায়।

সেদিনের পর ভুলেই গিয়েছিলাম সব। মুগ্ধতা টা শুধু সেই জায়গায় অবস্থানরত কিছু মিনিটের জন্যই ছিলো। নতুন চাকরি, নতুন পরিবেশ, সব মিলিয়ে আমার স্মৃতি থেকে মুছেই গিয়েছিলো সে। তার ঠিক চার মাস পর আমার খুব কাছের একজনের বিয়েতে মেয়ের বাড়ি গিয়ে দ্বিতীয় দফা দেখা মিলেছিলো তার। সেটাই ছিলো বোধহয় আমার সর্বনাশ। কাচা হলুদ শাড়িতে তাকে যেনো হলুদ পরীর মতো মনে হচ্ছিলো আমার নজরে। সর্বাঙ্গে আর্টিফিশিয়াল ফুল, নেচারাল মেকাপ। সেদিন আমি চেয়েও যেনো তার উপর থেকে চোখ সরাতে পারিনি। আমার ভাগ্য বোধহয় খুব ভালো ছিলো সেদিন। গেইটের কাছে যখন একজন একজন করে সবাইকে ফুল দিয়ে স্বাগতম জানাচ্ছিলো, তখন সবার শেষে ছিলাম আমি। সবাইকে সাদা অর্কিড ফুল দিয়ে বরণ করলো।

কিন্তু আমার বেলাতেই ফুল শেষ হয়ে গেলো। তখনই মেয়েটা মিষ্টি হেসে একটা লাল গোলাপ এগিয়ে দিলো আমার দিকে। সেটাই ছিলো তার তরফ থেকে আমার জন্য প্রথম পাওয়া। যা আজও স্বযত্নে রেখে দিয়েছি। বিয়ে বাড়ির সেই রাতের দু’ঘন্টা সময় যেনো আমার কাছে চরম পাওয়া ছিলো। তারপর যেদিন সাফার ফোনে তাদের ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপে মেয়েটাকে দেখলাম, সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম। সাফাকে ইনিয়ে বিনিয়ে মেয়েটার অল্প কিছু ইনফরমেশন নিয়েছিলাম। সাফা সাফওয়ানের মতোই খুবই চতুর স্বভাবের। তাই বেশি খাটাইনি। নিয়ম করে বেশ কয়েকবার কলেজ থেকে আসা যাওয়ার পথে তাকে দেখতাম। তিন বন্ধু ছাড়া অন্য কোনো ছেলের সাথে মেলামেশা ছিলোই না তার। ছেলে বন্ধুরাও ছিলো ভাই সমতুল্য। তাই কোনো আপত্তি কখনোই ছিলো না আমার।

আমি শুধু একটা সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। ভেবেছি একেবারে আমার মাস্টার্স এর পরেই মাকে জানাবো। কিন্তু তার আগেই মা আমার অগোচরে মেয়ে দেখা শুরু করে দিয়েছিলো। যেহেতু ইনকাম ভালো ছিলো তাই সবাই একমত হলো ঘরে বউ নিয়ে আসার। নিশি ভাবী যেদিন একটা মেয়ের ছবি নিয়ে আমার কাছে এসেছিলো, সেদিন প্রথমে খুব অবাক হয়েছিলাম মায়ের এমন কান্ডে। আমাকে না জানিয়ে এতো বড় একটা পদক্ষেপ নেওয়ায় রাগও উঠেছিলো খুব। মা, বাবা,ভাইয়া,ভাবী সবার একই কথা… এখন বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়?

আমি তখন তাদের মুখ ফুটে বলতে পারিনি যে বিয়ে করতে সমস্যা নেই আমার। কিন্তু মেয়ে যে আমি পছন্দ করে রেখেছি সেকথা তাদের কীভাবে বোঝায়!! তাদের ভাবনাতেই ছিলো না একথা যে প্রেম ভালোবাসা আমার পক্ষেও সম্ভব। পরে অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে ভাবীকে বলেছিলাম। ছবিও দেখিয়েছিলাম। ভাবী সোজা গিয়ে ছবিটা মাকে দেখিয়েছিলো। ছবি ছিলো মেয়ের,কিন্তু মা সেটা না দেখে ড্যাবড্যাব করে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। এমন অকওয়ার্ড একটা সিচুয়েশন ছিলো যে কাউকে বলার মতো না।

সেদিন আর কারো সামনেই যায়নি। পরদিন সকাল সকাল অফিসে চলে গিয়েছিলাম, আসার পরেই ইভানের কাছে শুনলাম মা বিয়ের জন্য মেয়ের বাড়িতে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। অতি বিষ্ময়ে খুশি হতেও ভুলে গিয়েছিলাম আমি। মায়ের মুখে দেখলাম মিটিমিটি হাসি। সেদিন বোধহয় জীবনে প্রথম এতো লজ্জা পেয়েছিলাম আমি।
আমার খুশি স্থায়ী হলো না বেশিদিন। ৪৮ঘন্টা পার হতে না হতেই খবর এলো ইন্টারমিডিয়েট শেষ না করে মেয়ে বিয়ে দিবে না তারা। আমি একটু দমে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা নাছোড়বান্দা। পরপরই একই মাসে আরো দু’বার প্রপোজাল পাঠালো মেয়ের বাড়িতে। শেষমেশ তাদের রাজি হতেই হলো। কিন্তু……..
কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেলো সাদিফ। তার বুকে মাথা রেখে চুপটি করে সব কথা শুনতে থাকা নাজরাতের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটলো সাদিফের থেমে যাওয়ায়। বুক থেকে মাথা তুলে সে জানতে চাইলো,

‘ কিন্তু কি? ‘
সাদিফ নাজরাতের কপালে কপাল ঠেকিয়ে লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
‘ কিন্তু যাকে পাওয়ার জন্য এতো আয়োজন সে নিজেই বলে দিয়েছে পরীক্ষার আগে বিয়ে করবে না। এখন আমি তাকে কীকরে বুঝায়, অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে এই হৃদয় ক্লান্ত। এবার তাকে বলো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে এই বুকে ঝরে পড়তে, আজীবনের জন্য। ‘
লজ্জায় লাল হয়ে গেলো নাজরাত। এদিক সেদিক তাকিয়ে শেষমেশ সাদিফের বুকে মুখ ডুবিয়ে লজ্জা নিভারন করলো সে।

বন্ধ দরজার বাইরে কান পেতে দাঁড়িয়ে আছে তোহা ও সাফ্রিন। বেশ কিছুক্ষণ অতিক্রম হওয়ার পরেও ভেতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে বিরক্ত হলো দুজন।তোহা বললো,
‘ এরা ভিতরে করছে টা কি বলতো! কিছুই তো শুনা যাচ্ছে না। ‘
‘ সেটাই তো। ভাবলাম চুরি করে এদের কথা শুনে নিবো। পরে নাজকে ইচ্ছে মতো পছাবো। কিন্তু কোথায় কি! ‘
” এই অসভ্য মহিলা! লজ্জা করেনা এভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যের পার্সোনাল কথা শুনতে?”
সায়েরীর হঠাৎ আগমনে ভরকে গেলো তোহা ও সাফ্রিন। একটু অবাকও হলো সায়েরীর গম্ভীর কন্ঠে।
সাফ্রিন আমতাআমতা করে বলে উঠলো,

‘ আসলে আমরা তো… ‘
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ আপনারা তো একা একাই মজা নিচ্ছিলেন। আরে আমাকে কি চোখে পড়েনি তোদের! কিভাবে পারলি আমাকে ফেলে তোরা তোরা চুপারোস্তমি করতে? ‘
তোহা কপাল চাপড়ে বললো,
‘ আবে ড্রামা কুইন! ভেবেছি কি না কি.আচ্ছা চল আয় আয়। ‘
সবার আগে সায়েরী গিয়ে কান পাতলো। ঠিক তার পেছনে বাকি দুজন। সায়েরী নিজের চুল থেকে ক্লিপ বের করে দরজার লক খুলার চেষ্টা করতে লাগলো। মিনিট পেরুতেই সরে গেলো তোহা ও সাফ্রিন।
তোহা মিনমিন কন্ঠে বললো,

‘ স..সায়ু আন্টি তোকে ডা..কছে। চ..চল চলে যায়। ‘
সায়েরী নিজের কাজ চলমান রেখেই জবাব দিলো,
‘ আরে রাখ তোর আন্টি। শালী মিনস আধী ঘারওয়ালি একটা কথা আছে না? তো ঘরওয়ালি হলাম কেনো আর, যদি জিজার রোমেঞ্চে বাগড়া না দিই?’
সাফ্রিন গলা খাঁকারি দিয়ে সায়েরীর মনযোগ পাওয়ার চেষ্টা করলো। বললো,
‘ সায়েরী! বলছি তো চলে আয়। ‘
‘ উফফ্ চুপ কর তো তোরা। কাজ করতে দে। ধুর! এই ক্লিপটা ঘুরছেই না। ‘
তোহা ও সাফ্রিনের আর কোনো আওয়াজ শুনা গেলো না। সায়েরী পুরো দমে ক্লিপ দিয়ে লক খোলার চেষ্টা করতে লাগলো। পেছন তখন কারো গলা খাঁকারি দেওয়ার আওয়াজ আসছে। উহুম! উহুম!! সায়েরী পাত্তা দিলো না। কিন্তু আবারো আওয়াজ আসাতে পেছন ফিরতে ফিরতে বিরক্ত কন্ঠে বললো,

‘ ওই তোদের কি যক্ষা হয়েছে নাকি? এমন করছি…’
পেছনে তাকাতেই আত্মা লাফিয়ে উঠলো সায়েরীর। দুহাত বুকের উপর ভাঁজ করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। তাকে দেখেই যেনো সপ্তম আসমান টুপুস এসে পড়লো সায়েরীর মাথার উপর। খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তোহা ও সাফ্রিনের দিকে চোখ পড়তেই দুজন নজর ঘুরিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে পালিয়ে গেলো। একা সেই স্থানে অসহায় হয়ে সিংহের গুহায় আটকে রইলো সায়েরী। মুখটা কাঁদোকাঁদো হয়ে গেলো তার। সবসময় তাকেই কেনো এই দৈত্য দানবের জালে আটকা পড়তে হয়? এখনি এই বাজে লোক তাকে অপমান করে একশো এক কথা শুনাবে। হলোও ঠিক তাই। দরজার খিলে লাগানো ক্লিপটা হাতে নিয়ে ঘুরেফিরে দেখলো সাফওয়ান। বললো,

‘ কি হলো! লক খুলছে না? ‘
‘ নাহ! ‘
‘ হুহ!! ‘
‘ ন..না ম..মানে…আম..মি তো এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। ‘
সাফওয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে নিচ্ছিলো সে। কিন্তু তখনই দরজার দুপাশে দুহাত রেখে তার মাঝে সায়েরীকে আটক করে ফেললো সাফওয়ান। হঠাৎ সাফওয়ানের এমন মুখোমুখি হওয়ায় নিঃশ্বাস আটকে গেলো সায়েরীর। তারউপর সাফওয়ানের শরীরের জেন্টস পার্ফিউমের মাতাল করা সুবাস। ঘ্রাণটা যেনো ঘোরে আটকে ফেলছে সায়েরীকে। সাফওয়ান গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ তোমাকে চঞ্চল আর দুষ্টু স্বভাবের জানতাম। কিন্তু এমন চিপ কান্ড… ‘
সাফওয়ানের কথার মাঝেই হুট করে দরজা খুলে গেলো। দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরী হঠাৎ ব্যালেন্স হারিয়ে পরেই যাচ্ছিলো, ব্যালেন্স রাখতে গিয়ে সে সাফওয়ানের কলার টেনে ধরলো। হঠাৎ আক্রমণে হুমড়ি খেলো সাফওয়ান। সবে মাত্র দরজা খুলে দাঁড়ানো নাজরাতের বুকের উপর এসে পড়লো সায়েরী, আর তার সাথে সাফওয়ান। নিজের শরীরের ব্যালেন্স রাখতে না পেরে পেছন দিকে হেলে পড়লো নাজরাত। দ্রুত তাকে দু’হাতে ঝাপটে ধরলো সাদিফ। সেকেন্ডের মধ্যেই ঘটে যাওয়া আকষ্মিক ঘটনায় ভরকে গেলো চারজনেই। সাফওয়ানের একহাত সায়েরীর কোমরে অন্যটা দরজার ফাটকে। সায়েরী দুইহাতে খামছে ধরে আছে সাফওয়ানের পাঞ্জাবি। আর তাকে ধরে রেখেছে নাজরাত। এবং নাজরাতের শরীরের সব ভার সাদিফের গায়ে।কয়েক সেকেন্ড একে অপরের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো তারা। অবস্থা বুঝতে পেরে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো সবাই। জামা ঠিক করে ফন্দি আঁটতে লাগলো সায়েরী। কীভাবে এদের জেরার মুখ থেকে বাঁচা যায়। সাদিফ ও নাজরাত চরম মাত্রায় অবাক। কি হলো! কেনো হলো, কিছুই মাথায় ঢুকছে না তাদের। সাদিফ কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলো। আর আন্দাজ করতে পেরেই গম্ভীরমুখে সাফওয়ানকে বললো,

‘ তোরা দরজায় কান পেতে কি করছিলি সাফওয়ান? ‘
সাফওয়ান অবাক কন্ঠে বললো,
‘ হোয়াট! আমি! দরজায় কান পেতে! তোমার মনে হয় এমন চিপ.. ‘
সায়েরী হতদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ এক্সেক্টলি! আমিও উনাকে দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে না করছিলাম। যাতে এমন চিপ কান্ড না করে। আর তখনই দরজা খুলে গেলো। খুব ভালো হয়েছে। হে হে হে।আমি যাই তাহলে। শুভ রাত্রি। ‘
একনাগাড়ে সব কথা বলে সেকেন্ডের মধ্যেই উধাও হয়ে গেলো সায়েরী। সাফওয়ান অবাকের অষ্টম পর্যায়ে। এই মেয়ে এতোটা দুর্দান্ত! সব দায় সাফওয়ানের কাঁধে ঝুলিয়ে সে পগারপার হয়ে গেলো! সাদিফ গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ তোর কাছ থেকে এমন কিছু আশা করিনি। ‘
‘ কিসের আশা নিরাশা ভাই! তোমার মনে হয় এমন কিছু আমি করবো? ‘
‘ মাত্রই সায়েরী বললো যে তুই….. ‘
‘ আমাকে ফেলে ওই স্টুপিডটার কথা তুমি বিশ্বাস করছো! ‘
এই পর্যায়ে এসে নাজরাত বলে উঠলো,
‘ হ্যাঁ। স্টুপি…না মানে সায়েরী নিশ্চয় কিছু করেছে। ভাইয়া এমন কিছু কেনো করবে,সাদিফ? আর দেখেননি কেমন পালিয়ে গেছে। ও একটু এমনি। প্লিজ যা হয়েছে ভুলে যাই?’
সাদিফ গম্ভীর মুখে মাথা দোলাল। নাজরাত বুঝাল এটা নিতান্তই একটা দুষ্টুমি। সাদিফ অতশত মাথায় নিল না। দুজনে স্থান ত্যাগ করলো। কিন্তু সেই জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো সাফওয়ান। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চাপলো সে। তার ভাবতেই অবাক লাগছে যে, তার একনজরে মানুষের অন্তর কেঁপে উঠে আর এই মেয়েটা আজ তারই বড় ভাইয়ের সামনে তাকে এমন একটা অকওয়ার্ড সিচুয়েশনে ফেলেছে!

“তোকে খুব সুন্দর লাগছে নাজ! এই সাজসজ্জা আমি আমার নামের করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস দেখ, চোখের সামনে তোকে অন্যের সাথে জড়িয়ে যেতে দেখেও কিচ্ছুটি করার সামর্থ্য ছিলো না আমার।”
আদনানের আইডি থেকে হঠাৎ এমন মেসেজ দেখে চোখ থেকে ঘুম ছুটে গেলো নাজরাতের। মোবাইল বন্ধ করে গভীর শ্বাস ফেললো সে। কোথাও না কোথাও একটু অপরাধবোধ হচ্ছে তার। হয়তো আদনানের এই অনুভূতিগুলো জন্মানোর কারণ তার প্রশ্রয়। এতো মেশামেশা না থাকলে হয়তো বা আজ এই দিন দেখতেই হতো না। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলো সে। তখনই চোখে ভেসে উঠলো সাদিফের হাসিমুখ। ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি হাসি ফুটলো নাজরাতের। কাত হতে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরলো সায়েরীকে। তখনই অনুভব করলো সায়েরীর শরীরের মৃদু কম্পন। সে ভেবেছিলো তার ঘুম কাতুরে বোন এতোক্ষণে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে। কিন্তু সায়েরীকে কাঁপতে দেখে ভরকে গেলো সে। শরীর তো এমন বরফের মতো শীতল। তবে কাঁপছে কেনো এই মেয়ে!!

‘ সায়ু! ‘
‘ হুহ! ‘
‘ এখনো জেগে আছিস তুই! শরীর এতো কাঁপছে কেনো? খারাপ লাগছে? ‘
‘ ভয় লাগছে। ‘
‘ ভয়! আমার সাথেই তো আছিস। ভয় লাগছে কেনো তবে! লাইট জ্বালাবো? ‘
‘ জ্বিন ভুতের ভয় না রে বোন। যমরাজের ভয়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার ভবিষ্যৎ । কাল কলেজে আমি হঠাৎ ওই দৈত্য দানবটার সামনে পড়ে গেলাম। সে তার লাল মরিচের মতো চোখ দিয়ে আমাকে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে এমন লুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর..তারপর আমার ঘাড় ধরে ইয়াআআ জুরে একটা মুচড় দিলো। আল্লাহ!! আমি তো শেষ। খাতাম! টাটা! বাই বাই!! ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭

‘ ধ্যাৎ। যত্তসব ফাউল কথা। এতো যখন ভয় লাগে সাফওয়ান ভাইকে,তাহলে কেনো ফাঁসিয়ে দিয়েছিলি? ‘
‘ তো কি করার ছিলো আর?সদিফ ভাইয়ের সামনে নির্লজ্জের মতো স্বীকার করে নিতাম যে আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তার রাসলীলা শুনছিলাম? ‘
‘ ছিঃ যত্তসব বাজে কথা। ‘
‘ হুহ! এখন তো বাজে লাগবেই। এজন্য প্রাইভেসি পাওয়া মাত্রই ঘন্টা দুয়েক রুমেই কাটিয়ে দিয়েছিলি। ‘
‘ ঘুম পাচ্ছে আমার। গুড নাইট। ‘
‘ যা যা গুড নাইট। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৯