Home লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৬

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৬

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৬
অহনা রহমান

সকাল সকাল রাজ ও রুহি চলে গেল ট্রিপে। ওরা যাওয়ার পর বাড়িটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেছে। হিয়ার এখন ভালো লাগছে না। সে বাড়ি যেতে চাইছে। অথচ নিজের বাড়ি থেকে নিষেধাজ্ঞা এসেছে হিয়া যেন আজ বাড়িতে না যায়৷ আগামীকালকে নাসিমা ও নাফির দাওয়াত রয়েছে ও বাড়িতে। হিয়া যেন একসাথে কালকে যায়। যেহেতু বড় চাচার আদেশ তাই হিয়া অমান্য করতে পারলো না। নাহলে তো কখনই চলে যেতো সে। এখন সে একা একা কি করবে? রুহির সাথে ভালো সম্পর্ক না থাকলেও, ওরা থাকলে বাড়িটা এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে না। সকাল তখন এগারোটা। নাসিমা কলেজে গেছে৷ কি একটা জরুরী প্রয়োজন পড়ে গেছে তাই তাকে যেতেই হলো। বাড়িতে আর কে আছে না আছে হিয়া জানে না। হিয়া মুরগির ছানার মতো চিউচিউ করছে সারা বাড়ি।

এখনো পর্যন্ত হিয়া পুরো বাড়ির কোথায় কি আছে জানে না। রাজদের বাড়িটা বেশ বড়সড়’ই। দোতলা বাড়িটা রুচিশীল ভাবে সাজানো, গোছানো, পরিপাটি। আজ কেউ নেই এই সুযোগে হিয়া বাড়িটা দেখবে৷ যেই ভাবনা সেই কাজ! হিয়া টুকটুক করে ঘুরে দেখতে লাগলো বাড়িটা।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এমনিতে তার মন-মেজাজ ও খুব একটা ভালো নেই। মন ভালো নেই বাড়িটা ফাঁকা তাই। আর মেজাজ ভালো নেই অন্য কারনে। তা হলো, রাজের ওই লম্পট ভাইটা। ওই ব্যাটা হিয়াকে টাচ করে? এত্ত সাহস? শুধু এখানের মেহমান বলে হিয়া তেমন রিয়াক্ট করেনি। তার বাড়ি হলে না, হিয়া ওকে দেখে নিতো! আবার বলে কি’না ব্যাড বয়! ব্যাড বয় তো না পাদের বয়! হিয়া আনমনে এসব ভেবে ভেবে আবার নিজেই নাক সিটকালো। মোটামুটি নিচতলা-উপরতলার সমস্ত কিছু দেখা শেষ। বাকি আছে কর্নারের একটা রুম। দরজা খোলায় রয়েছে। হিয়া জানে না ওখানে কে থাকে বা কি আছে৷ এমনিতেই প্রায় সব রুমে তালা ঝোলানো। শুধু ওই রুমটাই খোলা। হিয়া গেল ওই রুমের দিকে। সে অনেকটা কৌতুহল নিয়েই গেল ওদিকে। রুমটা আধো খোলা। হিয়া দরজার কাছে গিয়ে প্রথমে ভেতরে উঁকি-ঝুঁকি মারলো। কেউ আছে কি’না জানতে হবে তো।

হিয়া দেখলো, রুমটা অনেক সুন্দর করে গোছানো আছে। পুরো বাড়ির এই রুমটাই হিয়ার বেশি ভালো লাগলো। বাবাহ, কে থাকে এই রুমে? হিয়া মাথাটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলো রুমের মধ্যে। রুম দেখতে দেখতে হিয়া যেন নিজের মাঝেই নেই। হঠাৎই কেউ হিয়ার কাঁধে স্পর্শ করলো। হিয়া প্রথমে ব্যাপারটা মাথায়ই নিলো না। পরপর কয়েকবার হিয়াকে স্পর্শ করতে লাগলো। আর হিয়া শুধু বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করতে লাগলো। কিন্তু আচানক হিয়ার টনক নড়লো। ভয়েই তার কলিজা শুকিয়ে এলো। এই এতো বড় বাড়িটাই কেউ নেই। হিয়া শুকনো ঢোক গিলে, ভয়ে ভয়ে পিছনে তাকালো। হঠাৎ নাফিকে দেখে সে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলো। ওকে এভাবে হঠাৎ চিৎকার করতে দেখে নাফিও চিৎকার করে উঠলো। তবে ও ভয়ে করেনি। করেছে হিয়াকে ভেঙিয়ে। হিয়া কিছুক্ষণ পর নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে খেঁকিয়ে উঠলো নাফির উপর।

“এই মিয়া আপনার সমস্যা কোথায়? কালকে রাতে একবার অসভ্যের মতো আচরন করেছেন আমি কিছুই বলিনি। এখন আবার করছেন।”
হিয়া নাফির দিকে চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে আবারও বলল,
“আপনাকে ফার্স্ট এন্ড লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম মিস্টার নাফি। নেক্সট টাইম আমার ধারেকাছে আসার চেষ্টা করলেও না, আমি আপনাকে দেখে নেবো।”
নাফি এতক্ষণ চুপচাপ হিয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলো। কথা শুনছিলো হিয়ার। মানতেই হবে রাগলে মেয়েটাকে দারুণ লাগে। নাফি মনে মনে বলল,
“ভেবেছিলাম ভালো থাকবো কিন্তু এই মেয়েটি আর ভালো থাকতে দিলো না। সে’ই আমাকে ব্যাডবয় বানিয়েই ছাড়বে।”

মনে মনে এসব বলে নাফি হিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। হিয়া ভয় পেল কিছুটা। রাগের মাথায় আবার বেশি বলে ফেললো না তো? হিয়া এক’পা এক’পা করে পিছনে সরতে লাগলো। আর নাফিও এগোতে লাগলো ওর দিকে। একটা সময় হিয়ার পিঠ ঠেকলো দেয়ালে। নাফিও হিয়ার কাছাকাছি চলে এসেছে। তবে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক দুরত্ব রয়েছে বৈকি! হিয়া জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলো। এই বাড়িতে এখন একটা সিঙ্গেল মানুষ নেই তারা ছাড়া। নাফি যদি তার সাথে উল্টাপাল্টা কিছু করে? হায় আল্লাহ! হিয়ার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছে এক মুহুর্তে। মেয়েটি ভয়ার্ত চোখে তাকালো নাফির দিকে। নাফি তখন হিয়ার দিকেই মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে। ঠোঁটে বাঁকা হাসি তার।
“ক’কি ক’করছেন? এ’ত ক’কাছে ক’কেন এ’এসেছেন?”

নাফি কোন কথা বললো না। তাকিয়ে রইলো হিয়ার পাতলা গোলাপের মতো মিষ্টি ঠোঁটের দিকে। এভাবেই কেটে গেল কিয়ৎক্ষন। আচমকা কি ভেবে যেন নাফি সরে গেল হিয়ার কাছ থেকে। মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলো করে ফেললো সে। হিয়া ভরকে গেল নাফির এই কাজে। নাফি আবারও হিয়ার অনেকটা কাছে চলে এলো। হিসহিসিয়ে বলল,

“আর তো কিছুদিন। আর তারপর? A huge surprise is waiting for you in my heart.”
নাফি এরপর শিস বাজাতে বাজাতে হিয়াকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল সেই রুমটাতে। অর্থাৎ ওটা নাফির ঘর। হিয়া তখন হতবিহ্বল হয়ে আছে৷ বারবার কানে বাজছে নাফির বলা শেষ শব্দ টা৷ ‘মাই হার্ট’ এটা কাকে বলল নাফি? কেনই বা বললো? হিয়ার মাথা ঘুরছে, হাত’পা কাঁপছে। ওখান থেকে হেঁটে যাওয়ায় ওর জন্য দুষ্কর হয়ে গেছে।

হিয়াদের বাড়ি, সময় সন্ধ্যা সাতটা। পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে মানুষ। কারন একটাই___রুহির শশুরবাড়ি থেকে লোক এসেছে। শুধু তাই নয়, হিয়ারও এখন আকদ হবে। ব্যাপারটা বিস্ময়কর না? একটু আগেই নাসিমা নাফির জন্য হিয়াকে চেয়েছেন। ভিষন আন্তরিকতার সঙ্গেই চেয়েছেন তিনি। তাকে ফেরানো কামরুল হাসানের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাছাড়া হেলেনার সঙ্গেও নাকি নাসিমার কথা হয়েছে। হেলেনারও সমস্যা নেই। এইজন্য কামরুল হাসান আর দ্বিমত করেননি। আর এমনিতে বাড়ির বাদবাকি সবাই রাজি৷ মিয়া বিবি রাজি, তো কিয়া কারেগা কাজি! সব কথা ঠিকঠাক হলো। পরিশেষে কামরুল হাসান বললেন,

“তাহলে সবাই যখন চাচ্ছে বিয়েটা হোক তাহলে হয়েই যাক। হিয়া আমার ভাইয়ের মেয়ে নয়, আমার মেয়ে। এই পরিবারে আমার একটি মেয়েকে দিয়েছি, হিয়া ওখানে থাকলে আমি আরও চিন্তা মুক্ত থাকতে হবে৷ আমার কোনো সমস্যা নেই। আজই তাহলে আকদ হোক।”
কিন্তু কথা হচ্ছে, যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া-পড়শীর ঘুম নাই। হিয়ার বিবাহ নিয়ে কথা হচ্ছে অথচ হিয়া কিছুই জানে না। সকালে নাফিদের বাড়ি থেকে আসার পর থেকেই হিয়া নিজের রুমে। ওই নাফির সামনে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। এইজন্য বেচারি সারাদিন আর বের’ই হয়নি।

কামরুল হাসানের কথা শুনে নাসিমা একটু গাঁইগুঁই করছিলেন। কেননা তার বড় ছেলে, বড় ছেলের বিয়ে নিয়ে কত স্বপ্ন আশা। এভাবেই কি হবে নাকি? নেহাৎই নাফির কথা শুনে তিনি এখনই বিয়ের কথাটা বলেছেন। নাহলে তো তিনি ধুমধাম করে বিয়ে দিতেন। আর এখনই বিয়ে? তিনি তো চাইছিলেন, আজকে প্রস্তাব দিবেন আর দু’চার দিন পর আকদ করাবেন। নাসিমার গাঁইগুঁই ধরতে পারলো নাফি। যেহেতু সে মায়ের পাশে বসা ছিলো তাই সে সহজেই ধরতে পারলো। নাফি নাসিমার কানের কাছে গিয়ে চাপা স্বরে বলল,

“আম্মু চুপচাপ রাজি হয়ে যাও। সব ব্যবস্থা আমি করে এসেছি। এখনই কাজি ডাকতে বলো।”
নাসিমা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এই কি তার ছেলে? যে ছেলে সারাজীবন বিয়ের বিপক্ষে ছিলো, আর আজ কি’না সে বিয়ের জন্য এমন করছে?
হিয়া ঘুমিয়ে ছিলো নিজের ঘরে। হঠাৎ দরজার শব্দে তার ঘুম ভাঙলো। ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় সে বিরক্ত হলো। কিছু বলার আগেই বাহিরে থেকে শুনতে পেল মায়ের উদ্বিগ্ন কন্ঠ,

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৫

“এই হিয়া দরজা খোল দ্রুত।”
হিয়া ধরফরিয়ে উঠে বসলো মায়ের ডাকে। হন্তদন্ত হয়ে গেল দরজা খুলতে। সে দরজা খোলার পরপরই হেলেনা, তুবা সহ আরও কয়েকজন হিয়ার রুমে ঢুকলো। হঠাৎ করে সবাইকে দেখে হিয়া তো হতবাক। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই হেলেনা বলল,
“তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। একটু পরই তোর বিয়ে হবে।”

লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৭