Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২
সাজিয়া জাহান সুবহা

গাড়ি এসে থামলো একটা দোতলা বাড়ির সামনে। সিট বেল্ট খুলে নেমে পড়লো সাদিফ। নাজরাত বুঝতে পারলো না কিছুই। তার দিকের দরজা খুলে দিলো সাদিফ। গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে চোখ বুলালো নাজরাত। অবাক কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে এসেছেন সাদিফ? ‘
সাদিফ কিছু বললো না। নাজরাতের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেলো বাড়ির ভিরতে। বাড়ির মুল ফটক খোলা। ক্রস করে ফিতা লাগানো রয়েছে তাতে। সামনে দিকের দুই তিন ধাপ ছোটো ছোটো সিড়ি রয়েছে। সেগুলো পার করতেই শুনা গেলো একটা বাচ্চার আওয়াজ। চঞ্চল পায়ে সে দৌড়ে আসছে সাদিফদের দিকে। সাথে চিল্লিয়ে সবাইকে জানান দিচ্ছে “বউ এসেছে , বউ এসেছে।” দৌড়ে ফিতার নিচ দিয়ে এসে নাজরাতের কোমড় জড়িয়ে ধরলো নাহিয়ান। চমকে উঠলো নাজরাত। হতবাক হয়ে সাদিফের দিকে তাকাতেই দেখলো সে মিটিমিটি হাসছে। নাজরাত বিষ্ময় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

‘ এ..এইটা! এইটা আপনাদের বাড়ি! ‘
মাথা ঝাকালো সাদিফ। নিম্নস্বরে বললো,
‘ ওয়েলকাল টু ইউর ইন-ল’স হাউজ! ‘
মোটেও খুশির কোনো আবাশ ধরা দিলো না নাজরাতের মনে। বরং ভয় এবং অস্বস্তিতে মিইয়ে গেলো সে। কাঁদো কাঁদো মুখ করে সাদিফকে বললো,
‘ আপনি আমাকে না জানিয়ে এখানে কেনো এনেছেন? আমার হাল দেখেছেন আপনি? বাসায় কতো কেউ থাকবে। আমাকে দেখে কি ভাববে বলুন তো! উফফ!! আপনি আগে কেনো জানালেন না… ‘
উত্তেজনায় ছটফট করে উঠলো নাজরাত। তার এমন হাল দেখে সরে গেলো নাহিয়ান। সাদিফ কিছু বলবে এমন সময় কারো পায়ের আওয়াজ পেয়ে দ্রুত মাথায় আঁচল টানলো নাজরাত। বিকট আওয়াজে বেলুন ফুটলো বেশ কয়েকটা। ভয় পেয়ে গেলো নাজরাত। দুই জন ছেলে এবং তিন জন মেয়ে একসাথে বলে উঠলো “সারপ্রাইজ!!”। মুখগুলো পরিচিত হলেও খুব একটা চিনতে পারলো না নাজরাত। সাদিফ পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ আমার বউ কি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে? ভেতরে আসতে দে! ‘
সবার চেয়ে খাটো এবং নাদুসনুদুস টাইপের মেয়েটা কাচি হাতে এগিয়ে গেলো। কিন্তু সাদিফ সেটা হাতে নেওয়ার আগেই মেয়েটা কাচি সরিয়ে হাত বাড়িয়ে বললো,
‘ আগে আমাদের একটু খুশি করো। আজ ঘরের গণ্যমান্য মুরুব্বি বলতে আমরা আছি। তাই আমরা কিছু না পাওয়া অবধি তোমার বউ ঘরে পা রাখতে পারবে না। ‘
‘ এইটা কেমন কথা! এই নিয়ম কবে থেকে শুরু হলো হ্যাঁ? ‘
‘ আজ থেকেই শুরু হয়েছে সাদি ভাইয়া। তুমি ক্যাশ বের করো তাড়াতাড়ি। যতো দেরি করবে ততো তোমার বউয়ের কষ্ট বাড়বে। ‘

সাদিফ কিছু বলতে পারলো না। তার সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করে চলছে পাঁচজন মিলে। শেষমেশ তাদের তোপের মুখে পড়ে মানিব্যাগ বের করলো সে। কিন্তু একসাথে বেশি ক্যাশ না থাকা ক্রেডিট কার্ডটাই হাতিয়ে নিলো বাকিরা৷ অবশেষে কাচি হাতে দিলো নাজরাতের। সে ফিতা কাটতেই হাতে বরণ ডালা নিয়ে এগিয়ে আসলো সাদিফের মা এবং বড়মা, সাথে নিশি ভাবী। নাজরাত দ্রুত পা ছুঁয়ে সালাম করলো দুজনকেই। হাসিমুখে নতুন বউকে বরণ করলো মিসেস সালেহা। হাতের ডালাটা নীশিকে দিয়ে দুহাতে নাজরাতের মুখখানা আগলে ধরলেন তিনি। দুরুদুরু বুক নিয়ে জোরপূর্বক হাসলো নাজরাত। “মাশাল্লাহ” বলে নাজরাতের থুতনি ছুঁয়ে হাতে চুমু খেলো মিসেস সালেহা। কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলো নাজরাত। ঘেমে মুখের অবস্থা নাজেহাল হয়ে আছে। এই অবস্থায় বলছে কিনা মাশাল্লাহ!

ভেতর থেকে বৃদ্ধ একজনের গলা ভেসে আসতেই নাজরাতকে নিয়ে ঘরে ঢুকলো সকলে। ছেলেমেয়ে তিনজন তাদের কার্য সিদ্ধি করতে পেরেই হৈ হৈ করতে করতে চলে গেলো অন্যদিকে৷ বিশাল ড্রইংরুমের সোফায় সাদা শাড়ি পরিহিতা বৃদ্ধ মহিলাটির কাছে নিয়ে গেলো নাজরাতকে। তাকেও পা ছুঁয়ে সালাম করলো নাজরাত। বৃদ্ধা হাত টেনে পাশে বসালো নাজরাতকে। থুতনি ছুঁয়ে সাদিফকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
‘ এই সে চাঁদের টুকরো নি, যার জন্য তুই আমার নাতনিরে বিয়া করবিনা বলছিলি? ‘
সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকা সাদিফ বিরক্ত কন্ঠে বললো,
‘ বাজে কথা বলবে না নানুমনি। এসব বলার জন্য আমার বউ দেখতে চেয়েছিলে তুমি? ‘
‘ চুপ কর তুই। আমাকে ফেলে বিয়া করে ফেলছস। আমি কি বুড়ী হয়ে গেছি নাকি যে নাতবউ দেখতে আসতে পারবো না? ‘

‘ নাহ! তুমি বুড়ি হতে যাবে কেনো! তুমি তো এখনো নানা ভাইয়ের ষোড়শী। ‘
‘ হুহ! তুই যা। আমি আমার নাতনির সাথে কথা বলবো। ‘
ভারী অবাক হলো সাদিফ। বউ ঘরে পা রাখলো না,অথচ তাকে পর করে দিলো সকলে মিলে। নতুন বউকে সাদরে বরণ করে ঘরে ঢুকালো কিন্তু তাকে কেউ লক্ষ্যও করলো না! এখন তার প্রাণপ্রিয় নানু তাকে বলছে সামনে থেকে সরতে। বাহ! এইদিনই দেখার বাকি ছিলো। হুট করেই নাজরাতের সাথে চোখাচোখি হলো। সাদিফের বেজার মুখটা দেখে মিটিমিটি হাসছে সে। ভ্রুঁ কুঁচকালো সাদিফ। ইশারায় বুঝালো একবার একা পায় তোমাকে। নানু আবার তাড়া দিতেই সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো সাদিফ।
সাদিফের নানু দুহাত দিয়ে নাজরাতের একহাত টেনে আনলো কোলের উপর। হাসিমুখ বললো,

‘ আমার নাতি কি তোমার পছন্দ হইছেনি বউ? ‘
নানুর প্রশ্নে অবাক হওয়ার সাথে সাথে লজ্জাও পেলো নাজরাত। এভাবে সরকারি কে জিজ্ঞেস করে! তার লজ্জা দেখে হাসলো নানু। হাসিমুখে বললো,
‘ লজ্জা পাওনের কিছু নাই। আমি মোটেও আগের যুগের খ্যাঁক খ্যাঁক করা মহিলাগুলোর মতন না। তোমার কোনো সমস্যা থাকলে আমারে কও। ‘
‘ এমন কিছুই নেই নানু। ‘
— তাইলে তো ভালা। শোনো বউ, আমার ঘরের প্রথম সন্তান সুফিয়া। আর প্রথম নাতি আমার সাদি নানুভাই। আমাদের সবার ভীষণ আদরের সে। আমি ভেবে রাখছিলাম আমার মেঝো ছেলের মাইয়ার সাথে ওর বিয়া দিবো। কিন্তু যেদিন সাদি আমাকে বললো সে তোমারে পছন্দ করে, ছবি দেখাইলো, আমরা কেউ না করবার পারি নাই। (একটু থেমে) ভাবছিলাম শরীলে শক্তি থাকতে থাকতে আমার নাতিরে বিয়া দিমু। ধুমধাম কইরা তোমারে ঘরে তুলমু। কিন্তু…. ‘
থেমে গেলেন বৃদ্ধা। তার অসমাপ্ত কথাটা বুঝতে পারলো নাজরাত। নিম্ন কন্ঠে বললো—

‘ আসলে নানু আমি…. ‘
‘ আরে থাকুক এসব কথা। লেখাপড়া করতে বারণ করছে কে তোমারে! শুনো বউ, সময় থাকতে থাকতে সব কিছু হাতের মুঠোয় নিতে শিখো। তুমি লেখাপড়া করে মাস্টারি করো, ডাক্তারি করো। কিন্তু বিয়া যখন কইরা ফেলাইছো তখন জামাইর বাড়িটাই তোমার আসল বাড়ি। এখন হলেও এইখানে আস্তানা গাড়তে হইবো। ঠিক একবছর পরে হলেও এইখানেই তোমারে আস্তানা গাড়তে হইবো। তাই যা করবা ভাইবা চিন্তা করবা।বেডা মানুষরে এতো ছাড় দেওন ভালা না কই দিলাম। এই যে বিয়া করলা। তুমি এইখানে, জামাই ওইখানে। হে সারাদিন কোথায় থাকে, কি করে এসব তো তুমি দেখতাছো না। জামাইরে আঁচলে আটকাতে শিখো বুঝছো! আমি জানি আমার সাদি মেলা ভালা। কিন্তু তুমি ওর বউ। এখন থেকেই হাতে হাতে রাখো, যাতে রাস্তা গুলিয়ে না ফেলে। ‘
বেশ মনযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো নাজরাত। কিঞ্চিৎ অবাক হলো নানুর ভাবনা চিন্তা দেখে। যেখানে অন্যরা নতুন বউদের সংসার সামলাতে উপদেশ দেয়, সেখানে সাদিফের নানু কিনা আগে জামাইকে বশে আনার কথা বলছে। মুচকি হাসলো নাজরাত। নানু আরো কিছু বলতো এর আগেই হাতে ট্রে নিয়ে হাজির হলো নিশি। ঠান্ডা শরবত, ড্রাই ফ্রুটস, সাথে কিছু স্ন্যাকস। এতো কিছু দেখে নাজরাত বললো,

‘ এতো কিছু কেনো করেছেন ভাবি। আমি খেয়ে এসেছি। ‘
নাজরাতের দিকে নাস্তার প্লেট বাড়িয়ে দিতে দিতে নিশি বললো,
‘ আরে প্রথম এসেছো শশুড়বাড়ি মিষ্টিমুখ না করলে কি হয়! ‘
নিশির এবং নানুর সাথে বসে বেশ অনেক্ষণ গল্প করলো নাজরাত। অবশ্য বাকি দুজন বলে গিয়েছে এবং সে হু হা করেই তাল মিলিয়েছে। রান্নাঘরে সে খাবারের বিরাট তোরজোর চলছে তা দূর থেকেই বুঝতে পারছিলো নাজরাত৷ দুই শাশুড়ী মিলে পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে। এসবে নিশির কোনো হাত নেই। বাড়িতে যখনই কোনো ভারি রান্নার আয়োজন হয়, তখন দুই শাশুড়ী মিলেই সব করে ফেলে। নিশি শুধু হাতে হাতে কাজ করে দেয়৷ এসব কিছুই নিশি বলছিলো নাজরাতকে। দ্বিতীয় দফা সাক্ষাৎকারে নাজরাত বুঝলো নিশি মেয়েটা ভীষণ মিশুক স্বভাবের। নাজরাতের মনে ভয় ছিলো বড়জা হিসেবে তার ব্যাবহার কিরূপ হবে এই ভেবে। কিন্তু নিশির সাথে মিশার পর সেই ভয় কেটে যেতে লাগলো একটু একটু করে। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর সাদিফের মা এগিয়ে আসলো আঁচলে হাত মুছতে মুছতে। নাজরাতদের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ সে কি! তোরা এখনো এখানে বসে আছিস! নিশি মা, যা তো নাজরাতকে তোর রুমে নিয়ে যা। আমি শাড়ি পাঠাচ্ছি। গোসল করে ওকে শাড়িটা পড়িয়ে দিস। সাদিফের বাবা’রা একটু পরেই এসে পড়বে। যা যা। ‘
মিসেস সুফিয়ার কথামতো নাজরাতকে নিয়ে নিজের রুমে গেলো নিশি। গরমে এমনিতেই অবস্থা নাজেহাল হয়ে ছিলো নাজরাতের। তাই বিনা বাক্যে গোসল সেরে নিলো সে। হালকা সবুজ রঙের একটা শাড়ি এবং পেটিকোট দিয়ে গেলো নাজরাতের জন্য। নিশি তার কাছ থেকে একটা গোল্ডেন ব্লাউজ দিলো নাজরাতকে। নাজরাত গোসল করে বেরুতেই সে সুন্দর করে শাড়িটা পরিয়ে দিলো। গোল্ডেন পাড়ের উপর কলাপাতা রঙের শাড়িটাই খুব মিষ্টি লাগছিলো নাজরাতকে। নিচ থেকে নিশির ডাক পরতেই সে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। দরজা অবধি গিয়ে পুণরায় ফিরে তাকিয়ে নাজরাতের উদ্দেশ্যে বললো,

‘ সিড়ির পাশে বা দিকের রুমটা তোমার বরের। চাইলে ঘুরে আসতে পারো। আমি নিচে গেলাম! ‘
নিশির বলার ভঙ্গিমা দেখেই লজ্জা পেয়ে গেলো নাজরাত। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল থেকে টাওয়ালটা খুলে নিলো সে৷ নাজরাতের জানা মতে নিশির হাসবেন্ড ইফাজ তার বাবাদের ব্যাবসা সামলায়। তারমানে দুই শশুড়ের সাথে ইফাজও এসে পড়বে এখন। তাই এই রুমে বেশিক্ষণ থাকা ঠিক হবেনা ভেবে দ্রুত বেড়িয়ে গেলো নাজরাত। কিন্তু কোথায় যাবে? প্রথম দফা শশুড়বাড়ি এসে ভীষণ অসস্তি লাগছে তার। নিশির রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে দোতলার এই মাথা থেকে ওই মাথা অবধি একবার চোখ বুলালো সে। তারপর গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো সাদিফের রুমের দিকে। ভয়,লজ্জা,অস্বস্তি সব চেপে পরপর তিনবার নক করলো দরজায়৷ কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেলো না। অগত্যা রুমে ঢুকে পড়লো সে।

কিন্তু কোথাও সাদিফের দেখা মিললো না। দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে রুমের চারিদিকে চোখ বুলালো সে। হোয়াইট এবং লাইট গ্রীন কম্বিনেশনের চার দেয়াল রুমের। বিশাল বেড, কাবার্ড, সিম্পল ডিজাইনের ড্রেসিং এবং এক কোণায় ছোট্ট একটা টেবিল। যেখানে কিছু ফাইল, কলম এবং একটা ল্যাপটপ রাখা। থাই গ্লাস যুক্ত বারান্দা রয়েছে। জানালায় উড়ছে সাদা পর্দা। বেডের উপরের দেয়ালে সাদিফের বিশাল একটা ফটো ফ্রেম লাগানো। আনমনে সেদিকে এগিয়ে গেলো নাজরাত। ছবিতে সাদিফের মুখে ছড়িয়ে আছে স্বভাব সুলভ হাসি। জ্বলজ্বল করা চোখগুলো যেনো নাজরাতের দিকেই তাকিয়ে আছে। বেডের পাশ থেকে এসে ড্রেসিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল ঝেরে পানি সরাচ্ছিলো নাজরাত। তখনই হুট করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো সাদিফ।

আয়নায় তাকিয়ে চমকে উঠলো নাজরাত। তার চেয়েও দ্বিগুণ চমকালো সাদিফ। সদ্য স্নান সেরে বের হওয়া অর্ধাঙ্গিনীর স্নিগ্ধ রূপ দেখে বুকের ভিতরটা অস্থিরতায় ছটফট করে উঠলো তার। সাদিফের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাজরাত। আয়নাতে চোখাচোখি হলো দুজনের। কলাপাতা রঙের শাড়িটাতে নাজরাতের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ শরীরটা যেনো ফুটে উঠেছে। ভেজা চুলে ভিজে গিয়েছে পিঠের দিকের অংশ। চুল সব কাঁধের একপাশে থাকায় সাদিফের সামনে উন্মুক্ত হয়ে আছে ভেজা চুল লেপে থাকা গলা, ঘাড়। প্রিয়তমার আবেদনময়ী রূপে যেনো রক্ত ছলকে উঠলো সাদিফের প্রতিটা শিরায় শিরায়। চোখ ফিরিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলে স্ব শব্দে দরজা বন্ধ দিলো সে। আওয়াজ শুনে কেঁপে উঠলো নাজরাত। বিগত কয়েক সেকেন্ডে কি হলো বুঝে উঠতে পারলো না সে। আওয়াজ শুনে দ্রুত সাদিফের দিকে ফিরে শাড়ির আঁচল দিয়ে পিঠ ঢাকলো সে। একটা গ্রে কালারের টি-শার্ট এবং ব্ল্যাক ট্রাউজার পরা ছিলো সাদিফ। এলোমেলো ভেজা চুল লেপ্টে রয়েছে কপালে। বুঝায় যাচ্ছে, অল্প কিছুক্ষণ হলো সে স্লান সেরেছে। সাদিফ দরজা বন্ধ করে নাজরাতের চোখে চোখ রাখতেই অস্বস্তিতে গাঢ় হয়ে গেলো নাজরাত। থেমে থেমে বললো,

‘ স..সরি। আম..আমি আসলে, মানে ভাবি ব..বলেছিলো এই রুমে আসতে তাই…. ‘
কথার মাঝেই এক পা দুই পা করে এগিয়ে আসতে লাগলো সাদিফ। যেটা দেখে কথা থেমে গেলো নাজরাতের। আজ যেনো অন্য এক অস্বস্তির বীজ বাসা বেঁধেছে তার মাঝে। বিয়ের দিন রাতেও সাদিফের সাথে সে এক কামরায় সময় কাটিয়েছিলো দীর্ঘক্ষণ। কিন্তু তখন এমনটা লাগেনি। কিন্তু আজ সাদিফের ঘরে এমন অর্ধভেজা শরীর নিয়ে বদ্ধ রুমে তার যেনো দম আটকে আসছে। অস্বস্তিতে চুপসে গিয়েছে মুখ। তার ভেতরের অবস্থাটা হয়তো আন্দাজ করতে পারলো সাদিফ। তাই পাশ কাটিয়ে থাই গ্লাসের সাথে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ালো সে। স্বাভাবিক কন্ঠে জানতে চাইলো,

‘ শ্বশুর বাড়ি পছন্দ হয়েছে? ‘
নাজরাত কিছু বলার আগে আবারো সে বলে উঠলো,
‘ অবশ্য এখন পছন্দ না হলেও উপায় নাই। এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গিয়েছো। দিনশেষে তুমি তো আমারই। ‘
চমকে উঠলো নাজরাত। সাদিফের বলা শেষ কথাটা একেবারে বুকে গিয়ে বাঁধলো তার। লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠলো গালজোড়া। সাদিফ মুগ্ধ হয়ে দেখলো সে দৃশ্য। মাথা নেড়ে হেসে ফেললো সে। বুঝলো নাজরাত এখনো খুব একটা সহজ হয়ে উঠেনি তার সাথে। তাই টপিক চেঞ্জ করে রুমের সব ঘুরে ঘুরে দেখালো সে নাজরাতকে। হাত টেনে বারান্দায় নিয়ে স্বাভাবিক কিছু কথা বললো। ধীরে ধীরে সহজ হয়ে উঠলো নাজরাত। এরইমধ্যে রুমের দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। সাদিফ দরজা খোলে দিতেই হাতে একটা গহনার বক্স নিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন মিসেস সালেহা। তাকে দেখেই মাথায় আঁচল চাপলো নাজরাত। বিছানার উপর গহনার বক্স গুলো রেখে নাজরাতের দিকে তাকিয়ে পুণরায় থুতনি ছুঁয়ে হাতে চুমু খেলেন তিনি। লজ্জা পেয়ে গেলো নাজরাত। তাকে বিছানায় বসিয়ে বক্স থেকে স্বর্ণের চেইন, চিকন একজোড়া বালা বের করে দেখালেন তিনি। একপ্রকার ব্যাস্ত হাতেই বক্সটা নাজরাতের হাতে দিয়ে নমনীয় কন্ঠে বললেন,
‘ নিচে তোমার শ্বশুর আব্বারা অপেক্ষা করছে। আমাকে যেতে হবে দ্রুত। তুমি এগুলো পরে দ্রুত নিচে এসো কেমন?

মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতেই ব্যাস্ত পায়ে বেরিয়ে গেলেন মিসেস সালেহা। যেতে যেতে সাদিফকে তাড়া দিয়ে গেলেন দ্রুত নিচে আসার জন্য। নাজরাত বক্সটা নিয়ে ড্রেসিংয়ের সামনে দাঁড়াতেই তার পিছনে এসে দাড়ালো সাদিফ। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে আয়নায় সাদিফের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালো নাজরাত। তার চোখে চোখ রেখে হাত বাড়ালো সাদিফ। মৃদু কন্ঠে বললো ” মে আই??”

জবাবে তার হাতে চেইনটা দিতেই স্ব যত্নে সেটা নাজরাতকে পড়িয়ে দিলো সাদিফ। যতবারই নাজরাতের উন্মুক্ত ঘাড়ে সাদিফের শীতল হাতের স্পর্শ পাচ্ছিলো। ততবারই কেঁপে উঠছিলো নাজরাত। চেইন পরিয়ে দু’হাতে বালা জুড়াও পরিয়ে দিলো সাদিফ। এরপর নাজরাতের ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে মাথায় আঁচল চেপে দিলো সে। ঘোমটার মাঝে লজ্জায় মুখ নামিয়ে রাখা নাজরাতের মুখটা দুই হাতের আদলে তুলে কপালে চুমু এঁকে দিলো। অদ্ভুত অনুভূতি তে কেঁপে উঠলো নাজরাত। সেদিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো সাদিফ। নিজের হাতের মাঝে নাজরাতের হাত নিয়ে দরজা খুলতে খুলতে বললো,
‘ লজ্জা পরেও পেতে পারবেন ম্যাডাম। এখন নিচে চলুন। আপনার শ্বশুর মশাই অপেক্ষা করছে। ‘

পিঠের উপর ধুমধাম কয়েকটা কিল পরতেই মাগো বাবাগো বলে চিল্লিয়ে উঠলো নুহাশ। ঘটনার আকষ্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো সে। যতক্ষণে বুঝতে পারলো কি হয়েছে, ততক্ষণে আয়ানের হাতের বেশ কয়েকটা মাইর খেয়ে ফেলেছে সে। আয়ান পুণরায় মারার জন্য হাত তুলতেই ছুটে পালালো নুহাশ। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধাই করা বসার স্থানটার চারিপাশে গোল গোল করে ঘুরতে লাগলো দুজন। আয়ান গম্ভীরমুখে সতর্কবার্তা দিচ্ছে নিজ থেকে ধরা দেওয়ার জন্য। কিন্তু নুহাশ রাজি না। অবশ্য সে জানেও না তার করা কতো নাম্বার আকামের জন্য এই শাস্তি পেতে হচ্ছে তাকে। শেষে ক্লান্ত গলায় দৌড়াতে দৌড়াতে সে বললো,

‘ আয়ান্নার বেটা থাম বলছি৷ আবে হয়েছে কি! আমার মতো মাছুম বাচ্চাটারে এমনে ধাওয়া করছিস কেন? ‘
‘ কি হয়েছে তুই জানিস না? আমার নাম করে কোন মেয়েকে চিঠি দিয়েছিলি তুই? ‘
চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো নুহাশ। তার পেছনে এসে দাড়ালো আয়ান নিজেও। হাঁটুতে ভর দিয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলছে দুজন। নুহাশ বেশ উল্লাসের সাথে প্রশ্ন করলো,
‘ ওই ছিনিমিনি তোকে রিটার্ন চিঠি পাঠিয়েছে নাকি রে!’
ভ্রুঁ কুঁচকালো আয়ান। ধুম করে আবারো কিল বসালো নুহাশের পিঠে। কনুই এর উল্টো পিঠ দিয়ে নুহাশের গলা চেপে ধরে বললো,
‘ আমি জানতাম এই আকাম তুই ছাড়া কেউ করতে পারে না। বল কি বলেছিস ওই মেয়েকে? আমাকে চিঠি পাঠালো কেনো সে? ‘

কোনোমতে আয়ানের হাত থেকে ছুটে বড় বড় শ্বাস ফেললো নুহাশ। আয়ান তখনো উত্তরের অপেক্ষায়। তার গম্ভীর মুখশ্রী দেখে বত্রিশ পাটি দাঁত বের হলে হাসলো নুহাশ। বিরক্ত হয়ে আবারো মারার জন্য আয়ান হাত তুলতেই নুহাশ চট করে ভদ্র ছেলে সেজে আয়ানের হাত ধরে বলল,
‘ আরে ছ্যাতে যাচ্ছিস কেন? তোর উচিত এমন একটা ভালো কাজের জন্য আমাকে ট্রিট দেওয়া। আর তুই! ভালা মানুষের দামই নেই এই দুনিয়ায়! ‘
নুহাশের অযথা কথায় পুণরায় রেগে গেলো আয়ান। বলল, ‘ তুই কি বলবি? ‘
মুখ কাচুমাচু করে নুহাশ জবাব দিলো,

‘ আরে তোর মনে নেই দুদিন আগে ফার্স্ট ইয়ারের একটা মেয়ে দেখে বলছিলি “দোস্ত মেয়েটা সুন্দর তাই না”। আমি ভেবেছি তোর মনে ধরেছে। তাই একটা চিঠি পাঠিয়ে দিলাম। সাথে তোর ফেসবুক আই..আল্লাহ গো!!!!! ‘
নুহাশের কথা শেষ হওয়ার আগে আবারো হাত উঠলো আয়ানের। রাগে শরীর শিরশির করছে তার। সুন্দর মেয়েকে সুন্দর বলবে না তো কি বলবে! তাই বলে মেয়েটাকে চিঠি লিখে ঘোষণা করার কি আছে! মাঠের মাঝখানে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে হাঁপিয়ে উঠলো নুহাশ। তবুও থামলো না একরত্তি। সেই অবস্থাতেই বলতে লাগলো,
‘ মাফ কই ভাই! জীবনেও কোনো মেয়েকে তোর হয়ে কিছু বলব না। তোর বউয়ের বোনের কসম। এবার থাম, বিয়ের আগের সব এনার্জি শেষ হয়ে যাচ্ছে বা*ল। আরে ভাই থাম না। আমি তো তোর উপর দয়া করে ওই ছিনিমিনি কে চিঠি দিয়েছিলাম। আমি জানতাম নাকি ওই মেয়ের যে চয়েস এত্তো খারাপ। যে ফেসবুকে তোর ছবি দেইখা কাত হয়ে যাবে! ‘

এতোক্ষণের দৌড়ঝাঁপে যেই একটু দমে এসেছিলো আয়ান। নুহাশের শেষ কথাটা শুনে আবারো দৌঁড় লাগানো দ্বিগুণ গতিতে। নুহাশকে হাতের নাগালে পেয়ে মনের তৃপ্তির জন্য বেশ দুই ঘা লাগালো পিঠে। শেষে ক্লান্ত হয়ে সটানভাবে শুয়ে পড়লো সবুজ ঘাসযুক্ত মাঠের উপর। পাশে ধপ করে এসে বসলো নুহাশ নিজেও। হাঁপিয়ে উঠা শরীরটাকে শান্ত করে নুহাশ বলল,
‘ চিঠিই তো দিয়েছিলাম বা*ল। তোর কোন জন্মের বউয়ের বোন নিয়ে ভাগছি যে আমার নাজুক শরীরটাকে এতো পিটাইলি? ‘
ক্ষিপ্ত স্বরে আয়ান বলে,

‘ তোরে আরো দুই ঘা দেওয়া উচিৎ ছিলো। জানিস এই চিঠির জন্য তোহা কতো ঝগড়া করেছে আমার সাথে! ওই মেয়ের কি দরকার ছিলো তোহাকে চিঠি দেওয়ার? ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো নুহাশ। কন্ঠে কৌতুহল নিয়ে বললো,
‘ তোকে একটা মেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে, এটা নিয়ে তোহা ঝগড়া করতে যাবে কেনো? ‘
টনক নড়লো আয়ানের। এই কথাটা তো মাথায় আসেনি। সত্যিই তো৷ তোহা হঠাৎ এমন রেগে গেলো কেনো? মাথায় কিলবিল করে উঠলো প্রশ্নগুলো। কিন্তু উত্তর নেই একটাও। চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো আয়ান। পাঞ্জাবির ধুলো ঝেরে আশেপাশে নজর বুলিয়ে বলল,

‘ বাকিরা কই?? ‘
জবাব না দিয়ে ফায়াজকে ফোন লাগালো নুহাশ। ফায়াজ জানালো তারা গেইটের পাশে ফুচকা দোকানে আছে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো বাকি দুজন। গেইট পেরুতেই নজর আসলো শাড়ি পরিহিতা তিন রমনী ফুচকার প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে। কোনো একটা বিষয় নিয়ে কথা চলছে হয়তো, যার কারণে খিলখিল করে হাসছে সায়েরী। পাশেই হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে সাফ্রিন এবং তোহা। সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে সবাইকে পরক করে আয়ানের নজর খুঁজলো ফায়াজ নামক গোপন প্রেমিককে। এবং পেয়েও গেলো। সায়েরীদের চেয়ে কয়েকহাত দূরত্বে গাছের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার মুগ্ধ নজর গেঁথে আছে সায়েরী নামক শ্যামবর্ণা কিশোরীতে।

হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরেছে সায়েরী। কাজল লেপ্টানো চোখে চিকচিক করছে জলকণা। ঝাল খেয়ে রক্তিম আকার ধারণ করেছে নাক,গাল,ঠোঁট। ঘামে ভেজা মুখশ্রীতে গুচ্ছ কয়েক চুল লেপ্টে আছে। মেয়েটার হাসিটা যে কারো মন কেড়ে নিতে বাধ্য। হুট করে কাধেঁ কারো থাবা পড়তেই চমকে উঠলো ফায়াজ। পাশ ফিরতেই দেখলো আয়ানের দুষ্টু হাসিভরা মুখ। কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলো ফায়াজ৷ আয়ান ফায়াজকে কিছু বলার আগেই সায়েরী মাথায় ঠোকা মারলো নুহাশ। সায়েরী বিরক্ত মুখে তাকাতেই বলল,

‘ সবসময় এমন ভ্যাটকি মাছের মতন ভ্যাটকাছ কেন? তুই কি স্বাভাবিক হাসতে পারোস না? ‘
‘ না পারিনা। আমি এমনই। তোর কোনো সমস্যা? ‘
‘ আলবাত সমস্যা। এমন ভ্যাটকি মাছের মতো মেয়েকে কোন ছেলে বিয়ে করতে চাইবে বলতো? মেয়ে হবি সুশ্রী, নম্র। তা না। সারাদিন লাফালাফি, বকরবকর আর এমন খিলখিল। তোর জামাইয়ের কপালে বিরাট দুঃখ আছে রে তিন ফুট দুই ইঞ্চি। তোর এই হাসি শুনে বেচারার ইন্না লিল্লাহ হয়ে যাবে। ‘
সায়েরী কিছু বলার আগেই তার মোবাইল বেজে উঠলো। স্ক্রিনে আবরারের নামটা দেখতেই দ্রুত কল রিসিভ করে কানে ধরলো সে,

‘ ভাইয়া, পৌঁছে গিয়েছো তুমি? ‘
‘ অনেক আগেই। তুই এখনো ক্যাম্পসে? ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ হ্যাঁ মানে কি! ক’টা বাজে দেখেছিস? এক্ষুনি বাড়ি ফিরবি তুই। ‘
‘ ঠিক আছে আমি…. ‘
‘ একা একা বের হওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি সাফওয়ানকে বলেছি। সাফ্রিনের সাথে তোকেও নামিয়ে দিবে বাসায়। ‘
বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে আসলো সায়েরীর। না জানি তার ভাই এই সাফওয়ান নামক মানুষটার মধ্যে কি খুঁজে পায়। সবকিছুতে আগ বাড়িয়ে সাফওয়ান, সাফওয়ান।

‘ আমি উনার সাথে কেনো যাবো। আয়ান অথবা ফায়াজ কেউ পৌঁছে দিয়ে আসবে আমাকে। তোমার বন্ধুর ত্যাড়া ত্যাড়া কথা শুনে ফ্রি সার্ভিস নেওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমি একাই যেতে পারব। ‘
সায়েরীর কথা শেষ হওয়ার আগেই ধমকে উঠলো আবরার।
‘ বাড়াবাড়ি করবি না সায়ু। এমন শাড়ি পরা অবস্থায় ভর দুপুরে রাস্তায় বের হওয়ার কোনো দরকার নেই। সকালে কিছু বলিনি কিন্তু এখন বলছি। তুই সাফ্রিনের সাথেই বাড়ি ফিরবি। ‘
কথা শেষ করেই কল কাটলো আবরার। ভীষণ রকমের মেজাজ খারাপ হলো সায়েরীর। সেই সকাল থেকেই সাফওয়ানের উপর ক্ষিপ্ত ছিলো সে। গানের বেলায় যেই সাফওয়ান একটু নরম সুরে কথা বলেছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে নীতির সামনে বলা “ইডিয়ট” শব্দটা শুনে আবারো মন ভার হয়ে গেলো সায়েরীর। সাফওয়ান কখনো তাকে “এই মেয়ে, মাথামোটা, ইডিয়ট, গাঁধী…” এমন কিছু অপমানসূচক নাম ছাড়া তার নিজ নামে ডাকেনা। এমনকি সায়েরী মনে করতে পারেনা সাফওয়ান তাকে তার নিজস্ব নামে ডেকেছে কিনা কখনো। সে যায় হোক, আপাতত ভাইয়ের হুকুম রক্ষার্থে এই দৈত্য দানবটার সাথেই বাড়ি ফিরতে হবে তাকে। মোবাইল পার্সে ঢুকিয়ে পুণরায় আগের স্থানে ফিরে গেলো সায়েরী। সবার দিকে একনজর তাকিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,

‘ সাফা কই? ‘
‘ মাত্রই বের হয়েছে। ওর গাড়ি এসেছিলো। ‘
ফায়াজের কথা শুনে থ হয়ে গেলো সায়েরী। চলে গিয়েছে মানে কি!
‘ চলে গেলো কেনো! ওর তো আমার সাথে যাওয়ার কথা ছিলো। ‘
সায়েরীর কথা শুনা মাত্রই ফায়াজকে গুতা মারলো আয়ান। ফিসফিস করে বলল,
‘ আর ভদ্র বন্ধু হয়ে থাকিস না। এবার একটু প্রেমিক হওয়ার চেষ্টা কর। ভর দুপুর, একটা রিক্সায় দুজন। এই সুযোগ বারবার পাবি না বন্ধু। ‘

হতভম্ব মুখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে রইলো ফায়াজ। বুঝে উঠতে পারলো কি করবে। এর আগেও বহুবার আসা যাওয়া হয়েছে সায়েরীর সাথে। তবে সেটা নিছক কাকতালীয়। সে কখনোই সায়েরীর সাথে একাকী সময় কাটাইনি। বলতে গেলে চায়নি বন্ধুত্বের খোলস ছেড়ে বাইরে আসুক তার প্রেমিক স্বত্তা। তাই আজ সকালে আয়ানের বলা কথাগুলো শুনার পর হঠাৎ এমন প্রস্তাব শুনে সে হিমশিম খাচ্ছে সিদ্ধান্ত নিতে। ফায়াজ মাত্রই মুখ খুলবে এমন সময় সবার পরিচিত কালো স্করপিউ গাড়িটা এসে থামলো তাদের সামনে। মুহূর্তেই চেহেরার রঙ বদলে গেলো সায়েরীর। সে ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো গাড়িটার দিকে। ঠিক তখনই গাড়ির কালো কাঁচ নেমে গেলো একপাশ থেকে। দৃশ্যমান হলো সাফওয়ানের গম্ভীর মুখশ্রী। নিরবতায় কেটে গেলো কয়েক সেকেন্ড। সাফওয়ান একহাতে স্টেয়ারিং চেপে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো সায়েরীর দিকে । রাশভারি কন্ঠে বলল,

‘ এই মেয়ে! তোমাকে কি নেমন্তন্ন করে গাড়িতে তুলতে হবে? ‘
হঠাৎ আওয়াজে চমকে উঠলো সায়েরী। খানিক নড়েচড়ে বিদায় জানালো বন্ধুদের। গাড়ির পেছনের দরজা খুলতেই হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকা মিহাদকে দেখে চমকে উঠলো সে। সায়েরীর উপস্থিতি বুঝে চোখ খুললো মিহাদ। বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলল,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১১

‘ হেই বিউটিফুল! আসলে আমার একটু রেস্ট দরকার। তাই তুমি কম্ফোর্ট হয়ে সামনে গিয়ে বসো কেমন! ‘
সায়েরী কিছু বললো না। বিরক্ত হয়ে হর্ন চাপলো সাফওয়ান। ইঙ্গিত বুঝে দ্রুত ফ্রন্ট সিটে এসে বসলো সায়েরী। মুহূর্তেই ধুলো উড়িয়ে গেইটের সামনে থেকে প্রস্থান করলো গাড়িটি।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২ (২)