লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৭
অহনা রহমান
হিয়া হকচকিয়ে উঠলো। বলল,
“বিয়ে? কার বিয়ে? কেন বিয়ে? কখন বিয়ে? কবে বিয়ে? কার সাথে বিয়ে? বিয়ে মানে কি?”
হেলেনা মাথায় হাত দিলেন। অতিরিক্ত শক খেয়ে মেয়েটা বোধহয় পাগল’ই হয়ে গেছে। তুবা সহ বাকিরা হেঁসে উঠলো সমন্বয়ে। তুবা হিয়ার কাছে এলো। কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“বিয়ে মানে অন্ধকারে বরের ফষ্টিনষ্টি করা!”
হিয়া বিস্ফোরিত নয়নে তাকালো তুবার দিকে। তা দেখে তুবা আবারও বলল,
“আরে বুঝিসনি? ওখে আবারও বলছি, বিয়ে মানে হলো বিয়ে। বিয়ে হলে তুই তোর জামাইয়ের বাড়ি চলে যাবি। সেখানে গিয়ে ইন্টুপিন্টু করতে পারবি। আর বিয়ের সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে, তুই বিনা পয়সায় অন্যের বাড়ির কামলা খাটবি৷ কিন্তু তোর কোনো নাম হবে না৷ শুধু দোষ আর দোষ।”
হিয়া আসলে কি রিয়াকশন দিবে তাই তো ভুলে গেছে। গ্রামাঞ্চলে একটা প্রবাদ বাক্য আছে, ‘ওঠ ছেমড়ি তোর বিয়ে হবে!’ কাহিনি টা এমন হয়ে গেল না? তার বিয়ে অথচ সে কিছুই জানে না? হিয়া ভাবলো সে বোধহয় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। নাহলে এমন অদ্ভুত কাহিনি বাস্তবে ঘটতেই পারে না। এজন্য কাউকে পাত্তা না দিয়ে সে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরলো। একা একাই বলল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ওই শয়তানের জন্য আমি একটু ঘুমিয়ে ও শান্তি পেলাম না খোদা!”
হিয়া গায়ের উপর কাঁথা তুলে আবারও চোখ বন্ধ করে ফেললো। ব্যস এবারেই এসব ফালতু স্বপ্ন থেকে হিয়ার মুক্তি। কিন্তু হিয়ার ভাবনায় এক বালতি পানি ঢেলে হেলেনা জোরছে ডাক দিলেন।
“হিয়া ঝামেলা করিস না। ওঠ মা ড্রয়িংরুমে সকলে বসে আছে।”
হিয়া পুনরায় ধরফরিয়ে উঠে বসলো। তার সাথে হচ্ছে টা কি! মেজাজের খেই হারালো মেয়েটা। বিছানা ছেড়ে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ালো। মেয়েটার পরনে তখন একটা সুতির থ্রিপিস। কাঁচা হলুদ রংয়ের। হিয়া হেলেনাকে বলল,
“কি হচ্ছে আম্মু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কার বিয়ের কথা বলছো তোমরা?”
“কার আবার? তোর বিয়ে হবে। এখন যা দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আয়। ওরা সবাই অপেক্ষা করছে।”
হিয়া চেঁচিয়ে উঠলো,
“আম্মু কিসব বলছো তুমি? আমার বিয়ে? কার সাথে? এভাবে কেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। চলো আমি দেখবো কে অপেক্ষা করছে।”
হিয়া যেতে নিলো বাইরের দিকে। কিন্তু তা হতে দিলেন না হেলেনা৷ হিয়ার হাত টেনে ধরে বললেন,
“আচ্ছা দেখিস আগে ফ্রেশ তো হয়ে আয়। মা তোর আমার উপর বিশ্বাস আছে না? আমি কি তোর কোনো ক্ষতি করবো বল?”
হিয়া সকলের দিকে তাকালো। তার মনে হচ্ছে না এখানে কেউ মিথ্যা বলছে। কিন্তু সবাই হঠাৎ তার বিয়ে নিয়ে পরলো কেন? সবচেয়ে বড় কথা তার মা কিভাবে পারছে? হিয়ার মাথায় কিচ্ছু আসছে না, কিচ্ছু না। হিয়া বলল,
“আম্মু আমার কথাটা বোঝার চেষ্টা করো। এভাবে কারো বিয়ে হয় বলো? আমার বিয়ে হচ্ছে আমিই জানি না। আমার বিয়ে কিন্তু আমার থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন ও মনে করোনি তোমরা?””
“হয় না এখন হবে। আর যেখানে তোর বড় চাচ্চু রাজি আমি রাজি তারপরও তোর কাছে অনুমতি নিতে হবে?” হেলেনা একটু কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন,
“এই শোনার জন্যই বোধহয় তোকে মানুষ করেছিলাম বল? ওদের মতো ভালো নির্ভেজাল ফ্যামিলি এখনকার সময়ে পাবো কি’না সন্দেহ। তোর ভালোর জন্যই তো এমন করা। মাকেও বুঝলি না হিয়া?”
মায়ের কথা শুনে হিয় আর পাল্টা কিছুই বলতে পারলো না। তবে তার কষ্টই হচ্ছে। কেননা, রাজের কাছ থেকে এইবার প্রতিশোধ কিভাবে নেবে সে? সে জানে তার মা তার জন্য বেস্টটাই চয়েজ করবে। কিন্তু সমস্যা হলো সে বিয়ে করে স্বামীর বাড়ি গেলে প্রতিশোধ কিভাবে নেবে? এভাবে ছেড়ে দিতে হবে ওদের? হিয়ার মাথা আর কাজ করছে না। তবে মায়ের চোখের পানি দেখে সে আর কোনো রিয়াক্টই করতে পারলো না৷ চুপচাপ চলে গেল ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে। যাওয়ার আগে হেলেনা পেটিকোট আর ব্লাউজ ধরিয়ে দিলো মেয়েটার হাতে।
সেদিনের কথা, হিয়াকে রুমে পাঠিয়ে নাসিমা বই পড়াতে মনোযোগ দিয়েছেন। ঠিক তখনই তার ফোনে কল এলো। নাসিমা বিরক্ত হয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই অবাক হলেন। কেননা কল করেছে নাফি। অথচ নাফি উপরেই আছে। এখান থেকে এটুকু তাকে ডাকলেই তো হতো। কল দেওয়ার কি মানে আছে? নাসিমা কল রিসিভ করলেন। ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেলেন নাফির কন্ঠস্বর।
“আম্মু আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো।”
“হ্যাঁ বল। ফোন করার কি দরকার। দরকার হলে আমি তোর রুমে আসছি।”
“থাক রুমে আসার প্রয়োজন নেই এখন। তুমি আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো।”
“হ্যা বল।”
“আম্মু আমি রুহির কাজিন হিয়াকে লাইক করি। আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। রাজ রা যাওয়ার পরই ওকে বিয়ে করতে চাই। তুমি ব্যবস্থা করো। যেকোনো মূল্যে। আর নাহলে কিন্তু আমি বিয়েই করবো না।”
নাফির কথা শুনে নাসিমা অবাক হতবাক হলেন। হিয়ার সাথে বিয়ে না হলে নাফি বিয়ে করবে না? এটা কি তিনি ঠিক শুনেছেন? তবে একটা দিক ভালো আছে তা হলো, হিয়াকে তারও পছন্দ ছিলো। কিন্তু ওইদিন রাজ যে বলল, হিয়ার কার সাথে যেন সম্পর্ক ছিলো! নাসিমা সন্দিহান হয়ে নাফিকে বলল,
“কিন্তু ও কি বিয়ে করতে রাজি হবে তোকে? হিয়া কি তোকে পছন্দ করে?”
“না হিয়া আমাকে পছন্দ করে না। তুমি এখন ওর মায়ের কাছে ফোন করবে৷ কথা বলবে৷ দরকার পরে আঁচল পেতে হিয়াকে চাইবে।”
নাসিমা কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে গেলেন। রাজ হলেও না হয় মানা যেত। কিন্তু নাফির মতো লোক কি’না বলছে, আঁচল পেতে হিয়াকে চাইতে?
“আম্মু সব ঠিক থাকলে আগামী কালই বিয়ে হবে। রাজ এলে না-হয় বড় অনুষ্ঠান হবে।”
নাফি কল কেটে দিলো। নাসিমা প্রথমে কিছুক্ষণ থ মেরে বসে রইলো। হিয়াকে তার আগাগোড়াই পছন্দ। কোন সমস্যাই নেই। আর ওসব সম্পর্ক তো এখনকার জেনারেশনের জন্য হাতের মোয়া। বিয়ের আগে সম্পর্ক থাকতেই পারে ওটা কোনো সমস্যা না। সবচেয়ে বড় কথা যে বিয়ে করবে তার যদি সমস্যা না থাকে তাহলে নাসিমার সমস্যা দিয়ে কি হবে?
নাসিমা কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে কল করলেন হেলেনার কাছে। হেলেনা তখন হিয়ার রুমে ঘর গোছাচ্ছেন। নাসিমার কল পেয়ে তিনি বেশ অবাকই হলেন। কল রিসিভ করার পর কথা বললেন বেশ কিছুক্ষণ। সব বললেও নাসিমা আসল কথাটা বলতে বেশ ইতস্তত বোধ করতে লাগলেন। শেষে ভয়ে ভয়ে বলেই ফেললেন,
“আপা আপনার মেয়েটাকে দেবেন? আমার বড় ছেলের জন্য আপনার মেয়েটাকে চাই। ও আমার বাড়িতে রাজকন্যার মতোই থাকবে। তাছাড়া রুহি তো আছেই এখানে।”
নাসিমার কথা শুনে হেলেনা বিস্মিত হলেন। এসব সবকিছুই তার অপ্রত্যাশিত ছিলো। রুহির মুখ থেকে ওর শাশুড়ির গুনগান শুনে তার ভিষন ইচ্ছে হতো, তার মেয়েটাও যদি এরকম একটা পরিবারে যেতে পারতো! এজন্য নাসিমার প্রস্তাব হেলেনার মনে হলো মেঘ না চাইতেও জল। তিনি রাজি হলেন নাসিমার প্রস্তাবে। নাসিমা আবার হেলেনা কে নিষেধ করে দিলেন এখন যাতে কেউ না জানে। বিশেষ করে রুহি আর রাজ। ওদেরকে সারপ্রাইজ দেওয়া হবে। হেলেনা সরল মনে বিশ্বাস করলেন তা। তিনি কাউকে কিছুই বলেননি। আজকে যখন নাসিমা সকলের সামনে প্রস্তাব রাখলেন তখনই তিনি জানিয়ে দিলেন তিনি রাজি। পরিশেষে সকলেই রাজি হলো। অবশ্য রাজি না হওয়ারও কোনো কারন নেই।
নাসিমা প্রস্তাব রেখে সবাইকে এটাও বলে দিলেন, কেউ যেন রাজ বা রুহিকে না জানায়। সাধারণ ভাবে সকলেই তার কথা মেনে নিলেন। ওরা আসলে সত্যিই চমকে হয়ে যাবে।
হিয়া হেলেনার একটা শাড়ি পরেছে। শাড়ির রংটা লাল। গুলুমুলু মেয়েটাকে লাল শাড়িতে কি সুন্দরই না মানিয়েছে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে গাড় কাজল। ব্যস মুখে আর কোনো মেকাপের চিহ্ন নেই। হিয়াকে ওভাবেই নিয়ে যাওয়া হলো ড্রয়িংরুমে। যেখানে ইতিমধ্যে কাজি সাহেব চলে এসেছেন। এখনই ওদের আকদ হবে। নাফি এটাই চায়। হিয়া ড্রয়িংরুমে গিয়ে চমকে গেল। এখানে তো বাইরের কেউ নেই তাহলে তার বিয়ে হবে টা কার সাথে। হিয়া ভাবলো, হয়তো পাত্রপক্ষ এখনো এসে পৌঁছায়নি। ওদিকে হিয়াকে এমন লাল শাড়িতে দেখে হার্টবিট মিস হলো নাফির। সে বুকে হাত দিলো। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল হিয়ার দিকে। ঠোঁটে সেই বাঁকা হাসি। তার ইচ্ছে পূরন হবে একটু পরই। এই মিষ্টি চেহারার মেয়েটি তার হবে। একান্তই নাফির। জুনায়েদ আহনাফ নাফির। আর তারপর থেকেই তো শুরু হবে সেই খেলা। নিজের ভাইয়ের থেকেই প্রতিশোধ নেবে নাফি!
হিয়া সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। নাফি যেহেতু ওর দিকে তাকানো ছিলো, তাই নাফির দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দু’জনের। হিয়া নাফির দিকে তাকাতেই নাফি চোখ মারলো ওকে। হিয়া যেন হোঁচট খেলো এতে। এখানে এতো গুলো মানুষের সামনে হিয়া রিয়াক্ট করতে পারলো না। ততক্ষণে কামরুল হাসান হিয়াকে ডেকে নিজের পাশে বসালেন। টুকটাক আরও কিছুক্ষণ কথা হলো। তারপর কাজি সাহেবকে বললেন বিয়ে পড়াতে। কাজি সাহেব অনুমতি পেতেই কাজ শুরু করে দিলেন।
হিয়া বারবার দরজার দিকে তাকাতে লাগলো। তাকে বিয়ে করতে কোন মফিজ আসবে তা কে জানে? হিয়া ভাবতে লাগলো যদি তার হবু বর টাকলা হয়? সুগার ড্যাডি হয়? তাহলে হিয়ার মানসম্মান তো সব ধুলোয় মিশে যাবে। হিয়া কিভাবে মুখ দেখাবে রাজ রুহির সামনে? তারপর ভার্সিটিতে গেলেও তো সকলে ক্ষ্যাপাবে। হিয়ার এসব ভাবনার মাঝেই কাজি সাহেব বলে উঠলেন,
লুকোচুরি রোদ্দুর ও তুমি পর্ব ১৬
“মরহুম মোশাররফ করিম নিলয়ের বড় সন্তান জনাব জুনায়েদ আহনাফ নাফির সঙ্গে, বিশ (২০) লক্ষ টাকা দেনমোহরে মরহুম হামিদুল ইসলামের একমাত্র কন্যা আর্শিয়া জাহান হিয়ার বিবাহ প্রস্তাব করছি। এই বিয়েতে আপনি আর্শিয়া জাহান কি রাজি আছেন? রাজি থাকলে বলুন__কবুল।”
বিয়েতে নাফির নাম শুনে হিয়ার মাথায় যেন আকাশটা ভেঙে পরলো। বেচারি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। তার সাথে নাফির বিয়ে হচ্ছে? এতো শক সহ্য করতে না পেরে, হিয়া বেচারি কবুল বলার আগেই ঢলে পরলো কামরুল হাসানের দিকে।
