প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫৩
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
চোখ মুখে ভয় নিয়ে জড়সড় হয়ে হল রুমের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে ডাকাত ও তার দলবল। তায়েব, তায়েবা, মাহির সোফার উপর পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। হাত পা বাঁধা অবস্থায় সবাই ফ্লোরে বসে আছে। এখনো কারোর বাঁধন খুলে দেয় নি তাঁরা।
আবির একটু নড়াচড়া করে তায়েব এর দিকে তাকিয়ে বললো ” আচ্ছা আমাকে একটু বলবি এখানে হচ্ছে কী..?”
আবিরের কথায় সবাই চোখ ঘুরিয়ে আবিরের দিকে তাকালো। ডাকাতের সর্দার এতোক্ষণ তেমন কাউকে খেয়াল করে নি। কিন্তু আবিরের কথা শুনে আবিরের দিকে তাকাতেই একটা ঝাটকা খেলো। বড় বড় চোখ করে তাকালো আবিরের পাশে থাকা মেয়ের দিকে। বেশ শান্ত দৃষ্টিতে ছবি তাকিয়ে আছে সর্দারের দিকে। চোখ – মুখে তার কোনো ভয় নেই। সর্দার শুকনো ঢোক গিলে একবার উপরের সিঁড়ির দিকে তাকালো আবার চোখ ঘুরিয়ে ছবির দিকে তাকালো। সর্দারের এবার পুরোপুরি শরীর ঘেমে উঠলো।
ছবি কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সর্দার দিকে। আবিরের কথায় মাহির হাত দুটো উঁচু অলসতা ভেঙ্গে বলল
” এখানে ডাকাতি হচ্ছে। দেখতে পাচ্ছ না তুমি..?”
মাহিরের কথায় আবির চোখ কুঁচকে তাকালো তাঁর দিকে। মাহির তা দেখে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে সরদার এর দিকে তাকালো। সরদারের দৃষ্টি অনুসরণ করে ছবির দিকে তাকাতেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। ওইদিকে লাবিব মুখ ফুলিয়ে ছবি র দিকে তাকালো। সেই কখন থেকে ছবি সরদারের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তা দেখেই মূলত লাবিব মুখ ফুলিয়ে আছে। তাঁকে কী কখনো এভাবে চোখ তুলে দেখেছে এক ধ্যানে..? উহু একবার ও না। তাহলে ওও কেনো সরদারের দিকে তাকিয়ে আছে এক ধ্যানে?? ছবির ওই চোখের দৃষ্টি কেবল লাবিব এর দিকেই থাকবে আর কারোর দিকে না।
লাবিব মুখ ফুলিয়ে এবার ছবির উদ্দেশ্যে বললো ” তুই এইভাবে ওই সরদারের দিকে তাকিয়ে আছিস কেনো..?”
লাবিব এর কথায় ছবি ঘাড় ঘুরিয়ে লাবিবের দিকে দৃষ্টি ফেললো। মাহির, তায়েব, তায়েবা হেঁসে উঠলো লাবিব এর কথায়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
তায়েব ঠাট্টার সুরে বললো ” আমার কী মনে হয় লাবিব ভাই জানেন..?”
লাবিব ভ্রু কুঁচকে তায়েব এর দিকে তাকালো তা দেখে তায়েব হেঁসে বলল ” আমার মনে হয় ওরা চোখে চোখে ভাব বিনিময় করছে, বুঝতে পারলেন।”
তায়েব এর কথায় তায়েবা খিলখিল করে হেসে বললো ” আহারে লাবিব ভাই আপনার কপাল পুড়লো বলে।”
তাঁদের এমন কথায় এবার সবাই বিরক্ত হলো। এই পরিস্থিতিতে ও তাঁরা মজা করছে ভাবা যায় এসব?? আজমেরী বেগম এবার বিরক্ত হয়ে বললো ” দাদু ভাই এই রশি তারাতাড়ি কইরা খুইলা দিতাছোস না ক্যান..? আমাগো মুক্ত কর। তারপর দেক এই ওগোরে আমি কী করি।”
মাহির আজমেরী বেগম এর দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে সর্দারের দিকে ঘাড় কাত করে তাকালো। সরদার মাহিরের দিকে তাকিয়ে আবার ছবির দিকে তাকালো তারপর দ্রুত দলদের কিছু ইশারা করলো। তখনই বাড়ির সব লাইট অফ হয়ে গেলো।
” ওওও মাগো বুবু বাতি বন্ধ হোইয়া গেলো ক্যান..?” বেশ ভয়ার্ত গলায় বললো আবিরা বেগম।
” কী জানি কিছুই তো বুঝবার পারতাছি না। ওই মাহির দাদুভাই কই তোরা কারেন্ট গেলো ক্যা..?” মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো আজমেরী বেগম।
মাহির বেশ চিন্তিত গলায় বললো
” কী জানি দাদী কারেন্ট চলে গেলো নাকি..? এই তায়েব দেখ তো কারেন্ট চলে কেনো..?”
মাহিরের কথায় তায়েব পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফোনের ফ্ল্যাশ অন করতে যাবে তার আগেই লাইট জ্বলে উঠলো।
সবাই সামনে তাকাতেই দেখলো ডাকাত সরদার আর তার দলের কেউ নেই। তায়েব, তায়েবা, মাহির দৌড়ে গেলো গেটের বাহিরে। গিয়ে কাউকে না পেয়ে তায়েব বিরক্ত হয়ে বললো ” যা শালা রা দেখি পালিয়ে গিয়েছে।”
তায়েবা কপালে ভাঁজ ফেলে বললো ” দূর কাজের কাজ কিছু হলো না শুধু শুধু এতো কষ্ট করে প্ল্যান করা হলো। ”
মাহির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো
” আর হুদাই টাকা নষ্ট হলো।”
” আর এইসব হয়েছে লামিয়ার জন্য।” বেশ বিরক্ত হয়ে বললো তায়েব। তায়েবা, মাহির তায়েব এর দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে হাঁটা ধরলো বাড়ির দিকে।
হল রুমে সবাই বসে আছে। একটু আগে শুভ্র উপর থেকে এসে হাতের বাঁধন খুলে দিয়েছে।
শুভ্র দু – হাত প্যান্টের পকেটে রেখে তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। তোয়া এক – দু পা এগিয়ে এসে শুভ্রর সামনে দাঁড়ালো। শুভ্র তোয়া কে দেখে হালকা হেসে কোলে তুলে নিয়ে আদুরে গলায় বলল ” ভয় পেয়েছো তুমি..?”
তোয়া মায়া মায়া চোখ করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো ” না হ্যান্ডসাম বয় ভয় পানি তো শুধু একটু পেয়েছি।”
শুভ্র তোয়ার মাথায় চুমু খেয়ে বললো ” একটুও ভয় পাবা না আমি আছি না।”
তোয়া শুভ্রর গলা পেঁচিয়ে কাঁধে মাথা রেখে হামি দিয়ে ছোট্ট করে “হুম” বললো। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তার। শুভ্র তা বুঝতে পেরে তোয়ার পিঠ আলতো হাতে বুলিয়ে দিতে লাগলো।
হামিদা শুভ্রর দিকে তাকিয়ে মলিন গলায় বললো ” শুভ্র লামিয়া কোথায়..?”
শুভ্র দরজার দিকে দৃষ্টি ফেলে বললো ” ঘুমিয়ে আছে।”
হামিদা আর কিছু বললো না। মাহির, তায়েব, তায়েবা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই শুভ্র কে দেখে থেমে গেলো। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে লামিয়া কে খুঁজলো কিন্তু কোথাও লামিয়া কে পেলো না।
শুভ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তিনজনের দিকে। তিনজন তা দেখে দাঁত কেলিয়ে হেঁসে ধীর পায়ে উল্টো দিকে হাঁটা ধরতেই শুভ্র গম্ভীর গলায় বললো ” দাঁড়া তোরা।”
শুভ্রর গম্ভীর গলা শুনে তিনজনের পা থেমে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে শুভ্রর দিকে ফিরে তাকালো অসহায় চোখে। তাদের মুখ দেখে মনে হচ্ছে তাঁরা কিছুই জানে না এসব এর। শুভ্র তোয়া কে লামহার কোলে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো তিনজনের সামনে। বুকে হাত ভাঁজ করে তিনজনের দিকে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো ” তোরা আগের থেকেই জানতি..? বাড়িতে ডাকাত আসবে..?”
তায়েব, তায়েবা, মাহির একে অপরের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে শুভ্রর দিকে তাকালো। মাহির ঠোঁট ভিজিয়ে বললো ” আসলে হয়েছি কী শুভ্র ভাই।”
শুভ্র মাহির কে থামিয়ে দিয়ে বললো
” আসলে নকলে বুঝি না। যেটা জিগ্যেস করছি সেটা বল। তোরা জানতি এসব..?”
মাহির, তায়েব, তায়েবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেনো তাঁরা পণ করেছে আজ তাঁরা মুখ খুলবে না। শুভ্র দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । কিছুক্ষণ আগে লামিয়া কে ও সে জিগ্যেস করেছিলো কিন্তু সে ও এমন মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলো। তাঁরা যে এইভাবে কিছু বলবে না এটা শুভ্র বেশ ভালো ভাবেই বুঝতে পেরেছে। রাশেদ তিনজন কে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শুভ্র রাশেদ কে থামিয়ে দিলো। শুভ্র চোখ ঘুরিয়ে আজমেরী,আবিরা আর রাবেয়া বেগম এর দিকে তাকালো। তাঁরা বেশ ক্লান্ত হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। শুভ্র গলা স্বাভাবিক করে বললো ” দাদী, মণি মা তোমরা রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। এইদিক টা আমরা সামলে নিবো।”
আজমেরী বেগম শুভ্রর কথায় বললো ” এতো বড় একটা কান্ড হইয়া গেলো আর তুমি কি না কইতাছো আমরা ঘুমাইবার যামু..?”
” হুমম ঘুমাতে চলে যাও। আর হ্যাঁ
এখানে যা কিছু হয়েছে তা জানি বাবাই – মামনি রা কেউ না জানে।”
” কিন্তু..!”
” কোনো কিন্তু নয় আমি যা বলছি তাই করো।”
আজমেরী বেগম আর কিছু না বলে চুপচাপ চলে গেলো। তার পিছন পিছন আবিরা বেগম ও। রাবেয়া বেগম শুভ্রর কাঁধে হাত রেখে বললো ” আবরার কিছু বলো না ওদের। ওরা হয়তো সত্যি কিছু জানে না।” বলেই চলে গেলো রুমের দিকে।
শুভ্র এবার তায়েব, তায়েবা মাহির এর দিকে তাকিয়ে বললো ” এখন সত্যি টা তোরা বলবি নাকি আমি অন্য উপায় বের করবো কোনটা..?”
মাহির, তায়েব, তায়েবা একজন আরেকজনের দিকে তাকালো। মাহির শুভ্রর দিকে তাকিয়ে বললো
” আমরা জানতাম না শুভ্র ভাই সত্যি। কিন্তু এটা আমাদের অনেক আগের থেকেই প্ল্যান ছিলো। আমরা কয়েকদিন ধরেই ডাকাত ধরার মিশনে নেমেছিলাম। প্রতি রাতেই কোনো না কোনো ভাবে ফাঁদ পেতে থাকি কিন্তু ধরা পরে না কেউ। কিন্তু আজ সত্যি সত্যি এসে পড়বে জানতাম না। জানলে সবাইকে আগেই বলতাম।”
আবির, লাবিব, সাফওয়ান, আরিফ, শারমিন, লামহা, হামিদা, আয়না, ফারিয়া, হাফসা, রাশেদ, জাহিদ, শুভ্র, ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে তাকালো তিনজনের দিকে। মাহির, তায়েব, তায়েবা ইনোসেন্ট ফেস নিয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। দেখে মনে হচ্ছে যেনো ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানে না তাঁরা।
শুভ্র শীতল কন্ঠে সবাই কে যার যার রুমে চলে যেতে বললো। শুভ্রর কথা শুনে মাথা নাড়ালো কিন্তু কেউ এক পা ও নড়লো না।
সোফার এক কোণে দাঁড়িয়ে মিলি আর মিরা সব দেখছিলো। শুভ্রর কথা শেষ হতেই মিরা দৌড়ে শুভ্রর সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো ” দেখেছো শুভ্র আজকে ওই পাগল মেয়েটা কী করতে গিয়েছিলো আমাদের সাথে। অকারণে কোনো সুস্থ মানুষ পারে এমন করতে..?”
মিরার কথা শুনে শুভ্রর চোখ মুখ কঠিন হয়ে আসলো। দু হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
” তোমার স্পর্ধা কী করে হয় আমার ওয়াইফ কে পাগল বলার..? আমার ওয়াইফ সম্পূর্ণ সুস্থ। অসুস্থ তোমরা বুঝতে পেরেছো..? কোনো সুস্থ মানুষ অন্যের জামাইয়ের উপর নজর দেয় না।” বলেই গটগট পা ফেলে চলে গেলো রুমের দিকে।
মিরা ছলছল চোখে তাকালো শুভ্রর যাওয়ার দিকে। পাঁচটা বছর যাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসে এসেছে সেই মানুষটার এমন ব্যাবহারে মিরা বেশ কষ্ট পেয়েছে।
শুভ্রর কথা শুনে সবাই মিটমিটে হাসছে। তায়েব দু হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে মিরার উদ্দেশ্য গেয়ে উঠলো ” হৃদয়ে মারলি প্রেমের ছুরি রেএএএএ…. মন যেএএ আমার করলি তুইই চুরি…।”
তায়েব এর গান শুনে মাহির, তায়েবা এবার হে হে করে হেঁসে উঠলো। মিরা অশ্রু চোখে তাদের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে।
সকাল হতে না হতে সব কিছুই স্বাভাবিক । গতকাল রাতে ইসলাম বাড়িতে এতো কিছু হয়েছে তা কেউ জানতে পারলো না। অবশ্যই শুভ্র এটাকে ধামা চাপা দিতে চাইছে। কেনো চাইছে সেটা কেবল ই সেই জানে।
ঘাড়ে প্রচুর ব্যাথা অনুভব করতেই ঘুমের ঘোরে কুঁকড়ে উঠলো লামিয়া। পিটপিট করে চোখ খুলতেই দেখলো নিজের রুমে আবিষ্কার করলো। শোয়া থেকে উঠে বসতেই কালকে রাতের ঘটনা মনে পড়তেই বিরক্ত হলো। প্ল্যান টা সাকসেসফুল হয়নি এই ভেবেই রাগ লাগছে তাঁর। কিছুক্ষণ পর শুভ্রর কথা মনে পড়তেই কালকে রাতের চুমুর ঘটনা মনে পড়তেই নিজের মাথার চুল খামচে ধরলো। হায় হায় রাগের মাথায় সে কী করে ফেলছিলো গতরাতে। তারপর কী হয়েছিলো..? মনে করতে লাগলো লামিয়া। ওও হ্যাঁ শুভ্র তাঁকে অনেক কিছু জিগ্যেস করেছিলো কিন্তু সে একটা কথাও বলে নি উল্টো রাগ দেখিয়েছে অনেক পাগলামি করেছিলো। তারপর শুভ্র পকেট থেকে একটা ইনজেকশন তাঁর ঘাড়ে পুশ করতেই লামিয়ার আর কিছু মনে নেই। বিছানা থেকে নেমে কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা চলে গেলো ফ্রেশ হতে।
~ নান্টু ঘটকের কথা শুইন্না
অল্প বয়সে করলাম বিয়া….।
মু…..।
আর কিছু বলতে পারলো না তাঁর আগেই মাথায় এক চাটি পড়লো। তায়েবা রেগে পিছন ফিরতে ফিরতে বললো ” কোন বালের নাতি রে…?”
বলেই পিছনে ঘুরতেই দেখলো জাহিদ দাঁড়িয়ে আছে। তায়েবা জাহিদ কে দেখে রেগে বললো ” কী সমস্যা আমাকে মারলেন কেনো..?”
” তো কী করবো…? আর এসব কী গান গাইছিস..?”
” যা ইচ্ছে গাই তাঁতে আপনার সমস্যা কী..?”
” অনেক সমস্যা আমার। তুই আমাকে ব্লক করেছিস কেনো..?”
” তো কী করবো..? অন্য মেয়েদের ন্যাকামি দেখার সময় নেই আমার।”
জাহিদ ভ্রু কুঁচকে বললো ” অন্য মেয়েদের ন্যাকামি মানে..?”
” হ্যাঁ..!”
” অন্য মেয়ে কোথা থেকে আসলো..?”
” আপনার কমেন্টে দেখি নি আমি মনে করছেন..?”
” আমার কমেন্ট দেখেছিস মানে..?”
তায়েবা কথা বললো না কোনো। জাহিদ কিছু ভেবে চোখ বড় বড় করে বললো ” মেয়েরা আমার ছবিতে কমেন্ট করেছে সেটার কথা বলছিস..?”
তায়েবা তবুও চুপ থাকলো। জাহিদ সয়তানি হেঁসে বলল ” কোথাও কী কিছু পুড়ছে..?”
তায়েবার রাগ রাগলো এইবার। রেগে জাহিদের হাঁটু বরাবর একটা লাথি মেরে বললো ” না জ্বলতাছে ঠিক এইভাবেই।” বলেই চলে গেলো।
লাথি টা বেশ জোরেই মেরেছে তায়েবা। জাহিদ হাঁটু ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তায়েবার যাওয়া দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো ” পা নাকি লোহা..?”
” দুইটাই…!”
হঠাৎ কারোর কথা শুনে জাহিদ চমকে মাথা তুলে উপরে তাকাতেই দেখলো তায়েব আর মাহির গাছের ডালে বসে দাঁত কেলিয়ে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। জাহিদ ভয়ে ঢোক গিললো। ভাগ্যিস আজকে কিছু করে নি নয়তো এদের জ্বালায় অবস্থা খারাপ হয়ে যেতো।
মাহির মাথা নিচু করে জাহিদ কে বললো ” ভাগ্যিস জাহিদ ভাই আপনার পয়েন্টে ওই লোহা পরে নি তাহলে চুরমার হয়ে যেতো।”
তায়েব হে হে করে হেঁসে বলল
” জাহিদ ভাইয়ের কপাল ভালো। লামিয়া হলো এতোক্ষণে পয়েন্ট বরাবরই শর্ট করতো।”
জাহিদ বিরক্ত হয়ে বললো ” অন্যের প্রেমে বাগড়া দেওয়া কী তোদের কাজ..?”
তায়েব মন খারাপ করে বললো ” কী করুম বলেন তো..? আমাদের তো আর কেউ নেই।”
জাহিদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো
” তোকে ফারিয়ার আশেপাশে দেখলে তোর পা কেটে দিবো হারামি।”
তায়েব মুখ বাঁকিয়ে বললো ” তবুও তোমার বোন আমার কাছেই আসবে।”
” তোকে আমার বোন দিবো না।”
” না দিলে নাই তোমার বোন কে আনবো বলেছি নাকি..? আমি আমার ফারিয়া কে আনবো।”
জাহিদ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কোনো কথা না বলে হাঁটা ধরলো বাড়ির দিকে। এদের সাথে কথা বলে লাভ নেই। এদের সাথে কথা না বলে গলায় কলসি বেঁধে পানিতে ঝাঁপ দেওয়া অনেক ভালো।
ফ্রেশ হয়ে এসে ফোন হাতে নিয়ে সময় চেক করতেই চোখ কপালে উঠে গেলো লামিয়ার। প্রায় একটা বেজে গিয়েছে। এতোক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলো সে। এতোক্ষণে হয়তো বাপ – চাচা, মা – চাচিরা এসে গিয়েছে।
ভেবেই লামিয়া মাহিরের নম্বরে ফোন করতেই মাহির কল রিসিভ করে বলে উঠলো ” ঘুম ভেঙেছে তোর..?”
” হুমম..! কিন্তু তোরা কোথায়..?”
” আমরা তো বাড়িতেই ।”
” মা – বাবা সবাই কী এসে পড়েছে..?”
” হুমম সবাই এসে গিয়েছে তো সেই ভোরে।”
” ওওওহ..! কাল রাতে…।”
মাহির এবার কালকে রাতের পুরো ঘটনা খুলে বলতেই লামিয়া বিরক্ত হলো। কী ভাবলাম আর কী হলো। ভেবেই ফোন কেটে বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে আলমারি থেকে জামা নিয়ে চলে গেলো গোসলে।
দুপুরের খাবার খেয়ে ইসলাম বাড়ির কর্তা আর কর্তিরা বসে আছে হল রুমে। আজ কেউ খাবার খাওয়ার পর পর ই রুমে চলে যায় নি । আনিসুল সাহেব সবাইকে হল রুমে বসিয়েছে কিছু বলার জন্য।
হল রুমে বসে আছে সবাই। খান বাড়িতেও হামিদা দের খবর দিয়েছে তাঁরা জানি ইসলাম বাড়িতে আসে। আনিসুল সাহেব এর কথা শুনে সবাই উপস্থিত হলো ইসলাম বাড়ির হল রুমে।
সবাইকে উপস্থিত দেখে আনিসুল সাহেব নিজের কথা শুরু করলো।
” তোমাদের বিয়ে হয়েছে এক মাস হতে চললো। তাই না..?”
সাফওয়ান, আরিফ, আবির এক সাথে মাথা নাড়ালো। তা দেখে আনিসুল সাহেব বললো ” তাই আমি ঠিক করেছি তোমরা তিনজন কিছুদিনের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিয়ে ঘুরে আসো।”
আনিসুল সাহেব এর কথায় তায়েব লাফিয়ে উঠলো ” বড় চাচা ওরা তিনজন ঘুরবে মানে..? আমরা যাবো না..?”
তায়েব এর কথা শুনে আজমির সাহেব ছেলেকে চোখ গরম দিতেই তায়েব মুখ চুপসে ফেললো।
হামিদা মাথা নিচু করে বললো ” বড় চাচা গেলে সবাই যাবো আর না গেলে কেউ যাবো না। ভাই বোনদের ছাড়া একা একা ঘুরতে ভালো লাগবে না।”
হামিদার কথা শুনে লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবার চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলো। আনিসুল সাহেব বললো ” ওরাও যাবে আমি বলিনি যে ওদের রেখে যেতে। তোমাদের উসিলায় ওরাও ঘুরে আসবে। আমরা সবাই চাই তোমরা গ্রামের বাগান বাড়ি থেকে ঘুরে আসো। ভালো লাগবে তোমাদের।”
আনিসুল সাহেব এর কথা শুনে সবাই মাথা নাড়ালো।
আনিসুল সাহেব আরো কিছু টুকটাক সবাইকে জ্ঞান দিয়ে চলে গেলো। হল রুমে শুধু থাকলো সব ছেলে – মেয়েরা। বাড়ির বড় রা যেতেই লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা হৈহৈ করে উঠলো। আগামীকাল সকাল সকাল রওনা হবে সবাই। তবে গার্ডিয়ান হিসেবে আবিরা এবং আজমেরী বেগম কে নিয়ে যাবে সবাই। সেখানে কয়েকদিন সময় কাটিয়ে ঘুরা ঘুরি করে মাইন্ড ফ্রেশ করেই বাড়িতে ফিরবে। কী কী করবে তা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো সবাই।
আলোচনা পর্ব শেষ করে যে যার রুমে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ আগে গোসল করার কারণে হালকা শীত লাগছে দেখে শরীরে রোদ লাগাতে বাড়ির থেকে বের হয়ে পুকুর পাড়ের দিকে হাঁটা ধরলো লামিয়া।
।
বেলকনিতে চেয়ারে বসে কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছিলো শুভ্র। বেশ কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যাথা করছে তাই মাথা তুলে তাকালো। ঘাড় এদিক ওদিক নাড়াতেই দেখলো লামিয়া ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে পুকুরের দিকে। শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকালো সেদিকে। তারপর কিছু না ভেবে কোল থেকে ল্যাপটপ নামিয়ে সেও বাড়ির থেকে বেরিয়ে এগিয়ে গেলো পুকুরের দিকে।
পিছন থেকে কারোর পায়ের শব্দ পেতেই লামিয়া হাঁটা থামিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো শুভ্র তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো ” কী সমস্যা..?”
” এই দুপুরে এখানে কী করছিস..?”
” ভুতের সাথে নৃত্য করতে আসছি। দেখতে পাচ্ছেন না..?” বেশ বিরক্ত হয়ে বলতে বলতে এগিয়ে সিঁড়ির দিকে গিয়ে বসলো।
শুভ্র কপাল কুঁচকে তাকালো লামিয়ার দিকে তারপর সেও গিয়ে লামিয়ার পাশে বসলো। লামিয়া একবার ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে তারপর অন্য দিকে ঘুরে তাকালো। কেউ কারোর সাথে কোনো প্রকার কথা বললো না। দুজনেই চুপচাপ নীরবতা পালন করতে লাগলো।
পরিবেশ বেশ শান্ত। চারদিকে মৃদু ঠান্ডা বাতাস বইছে । কিছুক্ষণ আগেই গোসল করার কারণে অর্ধ ভেজা চুল গুলো ছেঁড়ে দিয়ে দুপুরের রোদ শরীরে লাগাতে পুকুর পাড়ের সিঁড়িতে বসলো লামিয়া। মাথা নিচু করে পুকুরের পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছে বেশ শান্ত চোখে। তাঁর পাশেই বসে কিছু বলার জন্য হাঁসফাঁস করছে শুভ্র। সূর্যের কড়া এসে পড়ছে শ্যামবর্ণের রমণীর উপর। লামিয়ার মুখে রোদ এসে পড়তেই হালকা বাদামী চোখের মনি গুলো বেশ জ্বল জ্বল করে উঠলো। শুভ্র কে হাঁসফাঁস করতে দেখে লামিয়া মাথা তুলে ভ্রু কুঁচকে তাকালো তাঁর দিকে।
শুভ্র বেশ শীতল দৃষ্টিতে তাকালো এবার লামিয়ার চোখের দিকে। কিন্তু মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে কিছু বলতে চাইছে লামিয়া কে। লামিয়া তা বুঝতে পেরে ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো ” কি হয়েছে..! আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চাইছেন..?”
শুভ্র শুকনো ঢোক গিলে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে লামিয়ার দিকে আবারো তাকালো। মৃদু বাতাসে কোমড় সমান লম্বা চুল গুলো হালকা দুলছে। শরীরে সূর্যের সোনালী আলো এসে পড়তেই তাঁর শ্যামবর্ণের রমণীর কে কেমন সোনার কন্যা মনে হচ্ছে তাঁর। মাথায় জবা ফুল লাগালেই হয়তো শুভ্র এখন গান ধরতো,,
~ একটা ছিলো সোনার কন্যা, মেঘ বরণ কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিলো সেই কন্যার দেশ…!
কন্যার চিরোল বিরোল চুল তাঁর কেশে জবা ফুল..
ওয়েট কিন্তু এই মেয়ের কেশে তো জবা ফুল নেই । শুভ্রর ইচ্ছে করলো কোথাও থেকে একটা জবা ফুল এনে তাঁর কালো ভ্রমরের চুলে গেঁথে দিতে, কিন্তু এখন সে পাবে কোথায় জবা ফুল.? ভাবতে লাগলো শুভ্র।
শুভ্র কে এমন চুপচাপ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লামিয়া বিরক্ত হলো এবার। তাই বেশ তিক্ত কন্ঠে বললো ” কি সমস্যা এভাবে তাকিয়ে কী দেখছেন..?”
শুভ্র গালে হাত রেখে ঘাড় হালকা কাত করে বললো
” একটা সোনার কন্যা কে…!”
লামিয়া বিরক্ত হয়ে ভ্রু জোড়া কুঁচকে জিগ্যেস করলো
” আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলতে চান আপনি আমাকে।”
শুভ্র মাথা উপর নিচে নাড়ালো। অর্থাৎ হ্যাঁ সে কিছু বলতে চায় তাকে।
লামিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো ” তাহলে বলে ফেলুন ফটাফট কী বলতে চান…?”
শুভ্র এবার বেশ অসহায় চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে, লামিয়ার সামনে থাকা চুল গুলো মুখে এসে পড়ছে বাতাসে। শুভ্র হাত বাড়িয়ে লামিয়ার কানের পিঠে চুল গুলো গুঁজে দিয়ে বললো ” কী করে বলবো বলতো..? তোকে এইরকম এলোমেলো দেখলে নিজেকে কেমন গুলিয়ে ফেলি।”
লামিয়া এক ভ্রু উঁচিয়ে শুভ্রর দিকে তাকাতেই শুভ্র নিচের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে আবারো গালে হাত রেখে লামিয়ার হালকা বাদামি চোখের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে গেয়ে উঠলো
প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫২ (২)
~ মায়াবী চোখে কী মায়া
যেনো গোধূলি আবির মাখা
কী নেশা ছড়ালে…
কী মায়ায়য়য়য় জড়ালে…।
